লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
#পর্ব_৩৭
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
আজ আকসার নানিশাশুড়ি এসেছেন ওর শ্বশুরবাড়িতে। সকালে ওর আম্মু আর ইফান এসে দেখে গেছে ওকে। ওর প্রেগন্যান্সির খবরটা শোনার পরে সেদিন এসে ওকে দেখে গিয়েছেন তারা৷ আজ দিন পনেরো বাদে আবার আসলেন। ইশা বেগম খুব জোরাজোরি এবং অনুরোধ করেছিলেন, অন্তত দুপুরে খেয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ইফানের জরুরি কাজ থাকায় তাদের চলে যেতে হয়েছে। জানিয়েছে, আরেকদিন এসে নাহয় থাকবে।
আকসা দুপুরের খাবার খেয়ে ঘরে পা মেলিয়ে আধশোয়া হয়ে শুয়েছিল সবে। ইংরেজিতে বরাবরই ভীষণ দুর্বল। মেজবাহ’র ব্যক্তিগত শেলফে কিছু ইংরেজি পোয়েট্রির বই ছিল। সেগুলো মধ্য থেকে চকচকে প্রচ্ছদের একটা বই তুলে এনে সেটা পড়ে অর্থ বোঝার চেষ্টা করছে। একটা শায়েরী চোখে পরলো,
“Some people arrive like rain,
soft, beautiful, comforting…
only to leave storms behind them”
যার বাংলা অর্থ এমন—
“কিছু মানুষ বৃষ্টির মতো আসে,
কোমল, সুন্দর, শান্তির মতো…
অথচ চলে যাওয়ার আগে
ভেতরে ঝড় রেখে যায়।”
আকসা অনেকক্ষণ সময় নিয়ে বহুকষ্টে শায়েরীটার অর্থ উদ্ধার করতে পারলো। এরইমধ্যে ওকে বই বন্ধ করে রাখতে হলো। ঘরে নানিবু আর ছোট চাচি এসেছেন। ছোট চাচির হাতে একটা ডালা। ডালার ওপরে ঢাকনা দেওয়া। নানিবু পান চিবুচ্ছেন। তিনি একটু গম্ভীর, রসিক আবার রাগী মানুষ বলা চলে। নানিবু এসে আকসার সামনে বসলেন৷ হাত ধরে বললেন, “শরীর সুস্থ তো নাতবৌ? সব খাইতে পারতেছো?”
আকসা কি জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারে না। সব খেতে পারছে কিনা, সে ব্যাপারে ও নিজেই এখনো সন্দিহান। যেহেতু প্রেগন্যান্সির খবর জানার এই অর্ধমাসের মধ্যে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সব ধরনের খাবার খাওয়া হয়নি ওর। এজন্য কোনটা ওর শরীরে সহনীয়, আর কোনটা নয়; সেটা নিজেও জানে না৷ তবুও নানিবুর মন রক্ষার্থে বললো, “জি নানিবু। সবই খেতে পারছি।”
নানিবু ওর হাতে সেই ডালাটা দিয়ে বললেন, “তাইলে এই পিঠাডা খেয়ে দেইখো। তোমার ছোট মামি বানাইলো। তাই নিয়ে আইলাম।”
আকসা ডালার ঢাকনা খুলে দেখলো, একটা মাছের পিঠের আকৃতির পিঠা। নাম জানে না এই পিঠার৷ প্রথমবার দেখছে৷ নানিবু বুঝতে পেরে বললেন, “এডার নাম চন্দ্রপুলি। আমগো গেরামের নীতি হইলো, পুতের বৌ, নাত বৌরা পোয়াতি হইলে তাদের জন্য এই পিঠা বানাইতে হয়। তুমি এইডা খাইও বৌ। পুরা দুই কেজি দুধ দিয়ে বানানি হইছে।”
আকসা মাথা নাড়লো। নানিবু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে হঠাৎ থেমে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার নাতিনডার সাথে ঠিকমতো কথাবাতরা হয়?”
“জি নানিবু।”
“ওর লগে নিয়মিত, বেশি বেশি কথা কবা। স্বামীর লগে কথা কইলে মন ভালো থাকে। বুঝছো?”
“জি নানিবু, বুঝেছি।”
আকসা মাথা নেড়ে সায় জানালেও মনে মনে বিরবির করে বললো, “উনার সাথে কথা বলে আর মন ভালো! ব্যাটা যেসব কথা বলে! ওগুলো শুনলো সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পরবে! ভদ্র-শয়তান!”
নাম নিতে না নিতেই ফোনে মেজবাহ’র কল। নানিবু আর ছোট চাচি ততক্ষণে ঘরের বাইরে চলে গেছেন। মেজবাহ ভিডিও কল দিয়েছে। তা-ও এই অসময়ে। সচারাচর রাত-বিরেতে লোকটার কল আসে। এই অসময়ে তার ফোনকল দেখে আকসা বেশ অবাক হলো। কল রিসিভ করতে দেখলো, মেজবাহ কোয়ার্টারে, নিজ ফ্ল্যাটের বেডরুমে। পরনে একটা খাকি প্যান্ট, এছাড়া আর কিছু নয়। গায়ে কিছুই নেই। নিত্যদিনের ব্যায়াম করে, কয়েক কিলোমিটার দৌড়ব তৈরি করা শরীরটা স্পষ্ট উদীয়মান।
আকসার রীতিমতো বিরক্ত ঠেকছে। মানুষ মানুষকে কল কেন দেয়? নিশ্চয়ই কথা বলার জন্য? অথচ এই লোক ওকে ভিডিওকল দিয়ে ফোনটা সম্ভবত বেডের ওপরে ফোনস্ট্যান্ডের ওপর রেখে চুলে জেল লাগাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, কিছুক্ষণ আগেই গোসল দিয়ে এসেছে৷ এখন আবার গায়ে লোশন মাখছে। বিরক্তির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে আকসা জিজ্ঞাসা করলো, “আপনি কি আমাকে আপনার শরীর দেখানোর জন্য কল করেছেন?”
মেজবাহ যেন তৎক্ষনাৎ কথাটা গায়েই মাখলো না৷ একেবারে নিশ্চিন্তে, বেশ সময় নিয়ে লোশন মেখে এরপর পেছন থেকে রকিং চেয়ারটা টেনে এনে ক্যামেরার সামনে এসে বসলো। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো, “শরীর দেখার বহু মানুষ আছে। কত মেয়ে আমার বডি দেখার জন্য পাগল। সেখানে আমি তোমাকে আমার বডি দেখাতে যাব কেন?”
আকসা মুখ ভেঙচি কাটে। লোকটা এত সেলফ-অবসেসড! একটা মানুষ নিজের প্রতি এতোটা আসক্ত হয় কীভাবে? মেজবাহ চুল পেছনে ঠেলে ঠিক করতে করতে বললো, “এক্সুয়ালি তোমার হালচাল জানতে কল দিয়েছি। তো, কেমন আছো?”
“ভালো আছি।”
আকসা বাঁকা চোখে তাকায়। লোকটার মতিগতি ভালো ঠেকছে না৷ হঠাৎ হঠাৎ কি যে হয় এনার! মেজবাহ এরইমধ্যে আবারও জিজ্ঞাসা করে, “ও কেমন আছে?”
“ও’ কে?”
আকসা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে। মেজবাহ ইতস্তত বোধ করে। তারপর আকসার পেটের দিকে শাহাদাত আঙুল দ্বারা ইশারা করে প্রশ্ন করে, “ও’ আই মিন, আমাদের বেবি কেমন আছে?”
আকসার মেজাজ খারাপ হলো৷ ও দাঁত চেপে বললো, “বেবির বয়স এক মাসও হয়নি। পরিপক্ব অবস্থায় নয় ও। লাথি-ঘুষি কিছুই মারে না। নড়চড়ও করে না৷ তাহলে আমি কীভাবে জানবো, ও কেমন আছে? অসহ্য লোক!”
আকসা রাগে কল কেটে দেয়। ইদানীং যে কি হয়েছে ওর! মেজাজ প্রচন্ড খিটখিটে থাকে। তারওপর মেজবাহ’র অমন আগুনে ঘি ঢালা কথাবার্তা! মেজাজ আরো সপ্তমে চড়িয়ে ছাড়ে।
.
.
রাতের খাবার খেয়ে আকসা ড্রয়িংরুমে কিছু সময় টিভি দেখে এগারোটা নাগাদ ঘরে শুতে এসেছে। আগে বেশিরভাগ সময় রাত একটা-দেড়টা পর্যন্ত ফোনে মুভি, সিরিজ দেখে তারপর ঘুমাতো ও। কিন্তু নানিবু আসার পর কড়া নিয়ম করেছেন, পোয়াতি বউয়ের নিজেকে নিয়ে সচেতন হতে হবে৷ বেশি রাত জাগা যাবে না৷ এসময়ে রাত জাগা মা এবং বাচ্চা— উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। নানিবু যেই ক’দিন থাকবেন, আকসার সাথে ওর ঘরেই ঘুমাবেন। একারণে ঘুম না আসা সত্ত্বেও আকসাকে এগারোটার মধ্যে বিছানায় এসে শুতে হয়েছে।
নানিবু আবার ঘুমকাতুরে মানুষ। বালিশে মাথা রাখার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘুমে বিভোর। এদিকে আকসা শুয়ে শুয়ে সিলিং দেখছে। এরমধ্যে বালিশের পাশে রাখা ফোনের ডিসপ্লে-র আলো জ্বলে উঠতে ফোনটা হাতে নিয়ে নোটিফিকেশন বারে দেখলো, মেজবাহ’র মেসেজ। কি মেসেজ দিয়েছে, সেটা দেখা যাচ্ছে না৷ আকসা লক খুলে হোয়াটসঅ্যাপে গেল৷ একেবারে ওপরে মেজবাহ’র আইডি। কনভারসেশন বক্সে ঢুকতেই নিচে টেক্সটটা সামনে পরলো।
“কল কেটেছো কেন? ফাজলামি করো? রাজশাহী ফিরলে সব ফাজলামি ছুটিয়ে দেবো। দূরে আছি বলে যা খুশি করার সাহস পাচ্ছো, নাহ? একবার শুধু আসতে দাও!”
আকসার টাইপিং স্কিল আবার খুব ভালো। বেশ দ্রুতই টাইপিং করতে পারে৷ ও সেকেন্ড পঞ্চাশেকের মধ্যে রিপ্লাইয়ে লিখলো— “দূরে আছেন যখন, দূরেই থাকুন। কাছাকাছি আসার চেষ্টাও বা করছেন কেন, আর আমার ফাজলামিও বা কেন দেখছেন? যা খুশি-ই করবো আমি। আপনি নিষেধ করার কেউ না!”
মেসেজটা ডেলিভারড হলো। সিনও হলো। তবে কোনো রিপ্লাই আসলো না। সরাসরি কল আসলো৷ আকসা একটা ঢোক গিলে কল রিসিভ করলো৷ কোনো ফর্মাল কথাবার্তা ছাড়াই ফোনের ওপাশ থেকে শোনা গেল, “আমি নিষেধ করার কেউ না, তাই?”
“হ্যাঁ, কেউ না৷ কে আপনি?”
“কে আমি? এসে দেখাবো কে আমি?”
আকসা এই মুহূর্তে হতচকিত হয়। কি জবাব দেবে, বুঝতে পারে না৷ মেজবাহ’র কড়া কন্ঠস্বর শোনা যায় ওপাশ থেকে, “তুমি বিকালে কোনোরকম কথাবার্তা ছাড়া আমার কল কেটে দিয়েছো। এটাকে একপ্রকার ইনসাল্ট করা বলে, জানো তো? ওকে ফাইন! এখন তোমাকে এই অপরাধের কী শাস্তি দেবো, বলো?”
“শাস্তি? কীসের শাস্তি? আমি তো কোনো অন্যায় করিনি!”
“শাট আপ! আমি যখন বলেছি, তারমানে অন্যায় অবশ্যই করেছো। আর এর শাস্তিও তুমি নিশ্চয়ই পাবে৷ ওকে ডান! তুমি বোধহয় নিজের মনমতো শাস্তি চাচ্ছো না। সুযোগ দিয়েছিলাম, বাট “ইউ’আর আ সিলি গার্ল। তোমার আসলে আমার দেওয়া সুইট পানিশমেন্ট পছন্দ, তাইনা?”
আকসা কোনো জবাব দেয় না। ফোনের এপাশে চুপ মেরে শুয়ে থাকে। এদিকে নানিবু এপাশ-ওপাশ করছেন। কখন জানি জেগে যান! আকসা আছে সেই আতঙ্কে। এরমধ্যে মেজবাহ বলে উঠলো, “নাও, এখন শাস্তিস্বরূপ দশটা চুমু দাও। কুইক!”
“চুমু? আপনাকে? আমি? তা-ও আবার দশটা?”
“হ্যাঁ, দশটা।”
আকসা হতবাক না হয়ে পারে না৷ মেজবাহ’র স্বাভাবিক, প্রতিক্রিয়াবিহীন শান্ত কন্ঠস্বর। আকসা নড়েচড়ে দৃঢ় গলায় বলে, “দিবো না চুমু।”
“না দিলে আমি ফিরে এসে যা করবো, সেটা তুমি ইমাজিনও করতে পারছো না। শ্যুড আই মেইক ইউ ইমাজিন ইট?”
“না. . . নাহ!”
মেজবাহ’র গম্ভীর গলার স্বর শুনে আকসার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করলো। ও ধাতস্থ হলো খানিক সময় বাদে।
আকসা ফোনটা কানের সাথে আরো খানিকটা চেপে ধরে উৎকন্ঠা নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, “নানিবু ঘুমাচ্ছে। এখন আমি আপনাকে এই মাঝরাতে চুমু দিবো ফোনের ভেতর থেকে? নানিবু যদি দেখে ফেলে?”
মেজবাহ ফোনের ওপাশ থেকে ভারী গলায় বললো, “দেখলে দেখুক। নানুমণির কি বিয়ে হয়নি? উনার কি স্বামী ছিল না? উনি তো জানে, উনার পাশে একজন বিবাহিত মেয়ে শুয়ে আছে, সেই মেয়ের স্বামীও আছে। ডোন্ট ও্যরি। কিছু হবে না। চুমু দিতে বলেছি, ইমিডিয়েট দিবে। লেইট করলে কিন্তু চুমু আরো কতগুলো বাড়িয়ে দিবো। শাস্তি আরো কঠিন হবে।”
অগত্যা বাধ্য হয়ে ফোনের মধ্যেই আকসা মেজবাহকে চুমু দিতে লাগলো। কি ভয়াবহ টর্চার এটা! সবে যখন ছয়টা চুমু দিয়েছে, ঠিক তখন অন্ধকার ভেদ করে পাশ থেকে নানিবু’র কন্ঠস্বর শোনা গেল—
“কী নাতবৌ? ফোনের মইধ্যে থাইকা চুমু দাও কারে? তোমার সোয়ামীরে?”
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৫
-
সীমান্তরেখা পর্ব ১৯
-
সীমান্তরেখা পর্ব ২৫
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৪
-
সীমান্তরেখা পর্ব ২৭
-
সীমান্তরেখা পর্ব ২৩
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৩
-
সীমান্তরেখা পর্ব ১২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৮