Golpo romantic golpo মন বোঝে না

মন বোঝে না পর্ব ২০


#মন_বোঝে_না (২০)

#সানা_শেখ

আবরারের দেওয়া চুড়িগুলো সামনে নিয়ে বসে আছে সারাহ। চুড়িগুলো সে ফেলে না দিয়ে রেখে দিয়েছিল আবরারকে ফেরত দেয়ার জন্য, তৃতীয়বারের মতন আজকে চুড়িগুলো দেখছে সে। সবগুলো চুড়িই ভীষণ সুন্দর। সারাহ চুড়ি পরে না, চুড়ি তার তেমন পছন্দও নয়। তবে আজ আবরারের দেয়া চুড়ি থেকে দুহাত ভরে চুড়ি পড়ল সে। হাত নাড়াতেই ঝুনঝুন শব্দ তুলল চুড়িগুলো। আস্তে আস্তে মনে করতে লাগল শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আবরারের বলা প্রত্যেকটা কথা, আর প্রত্যেকটা ঘটনা।

আবরারকে ভাবতে গিয়ে আনমনেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু আবিরকে মনে পড়তেই ধপ করে নিভে গেল সেই হাসিটুকু। তার ভালোবাসায় কোনো খুঁত ছিল না। সে সত্যি সত্যিই মনপ্রাণ উজাড় করে আবিরকে ভালোবেসেছিল। আবির তার সঙ্গে কী করেছে মনে হতেই ঘৃণায় গা রিরি করে উঠল। আবিরকে সামনে পেলে এক দলা থুতু তার মুখের উপর ফেলত সারাহ।

তার অনুভূতি নিয়ে এত বাজেভাবে কেন খেলল আবির? ওই অসভ্য চরিত্রহীন ছেলেটার সঙ্গে কেন দেখা হয়েছিল তার?

আবিরকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলো সারাহ, ওই চরিত্রহীন ছেলেটাকে আর কোনোদিন ভাববে না সে। হাতের চুড়িগুলোতে ঝুনঝুন শব্দ তুলে দেখতে লাগল।

চলে গিয়েও আবার ফিরে এসেছিলেন আমজাদ খান। বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে মিষ্টি মুখ করে তারপর গেছেন আবার। হসপিটালের কাছাকাছি যেতেই ছেলের কল আসে। রিসিভ করতেই আবরার জানায় সারাহ রাজি হয়ে গেছে। বিয়ের পাকা কথা বলে তারপর যেন সে ফেরে। ছেলের কথায় আবার ফিরে এসে বিয়ের পাকা কথা বলে গেছেন।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ঠিক এক মাস পর সারাহ আর আবরারের বিয়ে।

.

উচ্চ শব্দের গান শুনে নিচে নেমে এলো ফারিশ। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে দেখল টিভিতে গান চালিয়ে ফাইয়াজ আর ফাহিম উরাধুরা নাচ করছে। তাও আবার তার অপছন্দের একটি গান।

Babujee jara dhire chalo,

bijlee khadee yaha bijlee khadee

Naino me chingariya,

gora badan sholo kee ladee Aye

Babujee jara dhire chalo,

bijlee khadee yaha bijlee khadee

Naino me chingariya,

gora badan sholo kee ladee

O giree giree giree giree bijlee giree

Oh ispe giree uspe giree…..

দুজনের মাজা দুলানি আর নাচ দেখে ফারিশ এগিয়ে আসতে আসতে চেঁচিয়ে উঠল,

“ফাইয়াজ!”

নাচ থামিয়ে পিছু ফিরতেই ফারিশকে দেখতে পেল ফাইয়াজ, যে কিনা খ্যাপা ষাঁড়ের মতন তেড়ে আসছে তাদের দুজনের দিকে। ফাহিমকে ফেলে রেখেই দৌড় শুরু করল বাড়ির মেইন দরজার দিকে। ফাহিম কী করবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ।

ফারিশ এগিয়ে এসে টিভি অফ করে দিলো। ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে শাসানোর সুরে বলল,

“তোমাকে কতবার বলেছি এসব গান আর সিন ফাহিমকে দেখাবে না নিজেও দেখবে না?”

“আমার কী দোষ? ফাহিম-ই তো দেখতে চাইল।”

“দেখতে চাইলেই দেখাতে হবে? আর এই রাতের বেলা এভাবে গান ছেড়ে নাচছো অন্যদের ঘুমের ডিস্টার্ব হবে না?”

ফাইয়াজ চুপ করে রইল। ফারিশ ছোটো ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,

“লাইট অফ করে গিয়ে পড়তে বসো। সারাক্ষণ শুধু বাঁদরামি।”

ফারিশ সিঁড়ির দিকে হাঁটা শুরু করতেই ফাইয়াজ বলল,

“তুমি বলেছিলে হেরে গেলে আমাদের শপিং করাবে আর ডিনারে নিয়ে যাবে।”

ফারিশ পিছু ফিরলেও কিছু বলল না। আমজাদ খান বাড়িতে না এলে সে সত্যিই নিয়ে যেত। আজকে নেয়নি তো কী হয়েছে? আগামীকাল নিয়ে যাবে।

*****

দুই বাড়িতে বিয়ের প্রস্তুতি চলছে পুরো দমে। বিয়ের শপিং শেষ। আজ রাতে সারাহর মেহেন্দি অনুষ্ঠান। বাড়িতে আত্নীয় স্বজনে ভরে গেছে।

ফুয়াদ হাসান বোনের শ্বশুরবাড়ির সবাইকে ইনভাইট করেছিলেন, তবে কেউ আসবে না সেখান থেকে। কোন মুখে আসবে?

আবির শত শতবার চেষ্টা করেছে সারাহর সঙ্গে যোগাযোগ করার তবে সফল হয়নি। সারাহ নিজের ফেসবুক আইডি ডিলেট করে দিয়েছে আগেরটা। আগের সিম কার্ডও খুলে ফেলেছে ফোন থেকে।

আবির নামের কোনো অস্তিত্ব আর তার জীবনে নেই, এই নাম আর তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না তার উপর। সে মেনে নিয়েছে নিজের ভাগ্যকে।

ফারিশ চিৎপটাং হয়ে শুয়ে ফোনে কথা বলছে আবরারের সঙ্গে। দৌড়াদৌড়ি করে কাজ করতে করতে সে কাহিল হয়ে পড়েছে।

আবরার আফসোসের সুরে বলল,

“ভীষন আফসোস হচ্ছে নিজের একটা কলিজা না থাকায়।”

ফারিশ কপালে কয়েক ভাঁজ ফেলে বলল,

“কেন? তোর কলিজা নেই?”

“আরে ভাই, এই কলিজা সেই কলিজা না।”

“তবে?”

“তোর কলিজার মতন একটা কলিজা। যদি আজকে একটা কলিজা থাকতো তবে তোর সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দিতাম। তোর বোন আমার, আমার বোন তোর।”

ফারিশের ভাঁজ পড়া কপাল টানটান হলো। স্বাভাবিক গলায় বলল,

“নেই তো কী হয়েছে? মামাকে বল, আমি অপেক্ষা করব তোর কলিজার জন্য। আমি আবার অত ধৈর্যহীন না।”

“তোর ধৈর্য আছে বুঝলাম। কিন্তু তুই কী সুগার ড্যাডি হতে চাইছিস, ফারিশ?”

“আশ্চর্য! সুগার ড্যাডি কেন হতে যাব?”

“এখন যদি আমার বোন হয়, তবে সে বিয়ের উপযুক্ত হতে হতে তোর বয়স কত হবে?”

“যতই হোক তাতে কী হয়েছে? তখনো আমি মনের দিক থেকে পঁচিশ বছরের তাগড়া যুবকই থাকবো।”

ওপাশ থেকে ভেসে এলো হা হা হাসির শব্দ। ফারিশ নিজেও হেসে ফেলল। আবরার হাসি বন্ধ করতেই শুনতে বাবার ডাক। বলল,

“রাখছি, আব্বু ডাকছে।”

“আচ্ছা।”

*****

আজ পবিত্র জুমআর দিন, সঙ্গে সারাহ আর আবরারের জীবনের নতুন সূচনার দিন। সারাহকে ব্রাইডাল সাজে সাজানো হয়েছে। সুন্দর লাগছে তাকে। সে এখন বউ সেজে অপেক্ষা করছে আবরারের জন্য। আবরার আসছে তাকে সারা জীবনের জন্য নিজের করে নিতে।

সারাহকে নিজের করে পাওয়ার আনন্দে আবরার হাসি মুখে কতবার চোখের পানি ঝরিয়েছে হিসেব নেই তার। নিজের সবচেয়ে পছন্দের মানুষটাকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়ার পর নিজের করে পাওয়া যে কতটা আনন্দের তা আবরার কীভাবে বোঝাবে? সে তো সারাহকে পাওয়ার সব আশা ছেড়েই দিয়েছিল।

হঠাৎই সারাহর কানে ভেসে এলো বর এসেছে বর এসেছে। তার সঙ্গে থাকা বেশির ভাগ মেয়েই ছুটে যেতে লাগল বর দেখার জন্য। সারাহ বুকের ভেতর মৃদু কম্পন অনুভব করল। নার্ভাস হয়ে পড়ল সে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর হাতে গোনা কয়েকবার আবরারের সঙ্গে কথা হয়েছে তার, তাও খুব বেশি প্রয়োজনেই। সামনাসামনি দেখা হয়নি একবারও।

আবরার গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। তার ডান হাত এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। ভাঙা হাত নিয়েই বিয়ে করতে চলে এসেছে। উঁহু কথাগুলো তার বা অন্য কারো নয়, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফাইয়াজ বিড়বিড় করে বলল কথাগুলো।

আবরারকে দেখে ফারিশ মুচকি হাসল। দুই গম্ভীর ছেলের ঠোঁটে আজকাল হাসি লেগেই থাকে।

বরকে নিয়ে স্টেজের দিকে এগোল সবাই। আবরারের হার্টবিট বেড়ে গেছে, সারাহকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে মন। আজ এক মাস পর সারাহকে দেখবে সে, আর আজকেই সারা জীবনের জন্য নিজের করে নিবে।

আচ্ছা বউ সাজে তার মায়াবিনীকে কেমন লাগছে? পুতুলের মতন? নাকি আরও বেশি সুন্দর আর মায়াবতী?

সারাহকে নেওয়ার জন্য তার রুমে এলেন ফুয়াদ হাসান। তার সঙ্গে ফারিশ, ফাইয়াজ, ফাহিম আর নিতু সুলতানা-ও এসেছেন। ব্যস্ততার কারণে নিতু সুলতানা মেয়ের কাছে আসার সুযোগই পাচ্ছিলেন না।

সারাহর পাশে সারাহর নানি বসে আছেন প্রথম থেকেই। তার সেই ছোট্টো নাতনিটা আজ কত বড়ো হয়ে গেছে। আজ তার বিয়ে। নিজের মেয়ে না হওয়া সত্ত্বেও ধুমধাম করে সারাহর বিয়ে দিচ্ছেন ফুয়াদ হাসান। অবশ্য সারাহ যে তার নিজের মেয়ে নয়, এমনটা তিনি ভাবেনই না। চার ছেলেমেয়েই তার কাছে সমান।

সবাইকে দেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে সারাহ। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখজোড়া হতে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। নিতু সুলতানা সারাহর চোখের পানি মুছে দিতেই তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল সারাহ। নিতু সুলতানা নিজেও মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন।

সারাহর কান্না থামছেই না, মাকে ছেড়ে আবার দূরে থাকতে হবে ভেবেই তার শুধু কান্না পায়। আব্বু-আম্মু আর ভাইদের ছেড়ে সে কীভাবে থাকবে? ফাহিম কার সঙ্গে ঘুমাবে এখন থেকে? ফাইয়াজ কার সঙ্গে ঝগড়া করবে, বাজি ধরবে?

সবাই সারাহর কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগল। ফাইয়াজ বলল,

“আর কত কাঁদবি? চৌদ্দ ঘণ্টা ধরে মেকআপ করলি, এভাবে কাঁদলে তো তোর মেকআপ উঠে যাবে।”

ফুয়াদ হাসান টিস্যু পেপার দিয়ে সারাহর চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন,

“পাগল মা আমার। এভাবে কাঁদতে হবে? একেবারে পাঠিয়ে দিচ্ছি নাকি? আজকে যাবে আবার আগামীকালই নিয়ে আসবো।”

সারাহ হেঁচকি তুলতে লাগল। তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে চোখের পানি ভালোভাবে মুছে রুম থেকে বের হলো সবাই। সারাহর দুপাশে তার বাবা আর ভাইয়েরা। চার বাবা ছেলের পরনে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা। সবাইকে একসঙ্গে চমৎকার লাগছে।

স্টেজ থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়েই ঘোমটার আড়াল থেকে স্টেজের দিকে তাকাল সারাহ। বর বেশে সিনা টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে আবরার সাহিল খান। সারাহর হৃৎপিণ্ড ছলাত করে লাফিয়ে উঠল আবার। দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। এক পা এক পা করে এগোতে লাগল বাবা আর ভাইদের সঙ্গে। ক্যামেরায় একের পর এক ক্লিক হচ্ছে। চারপাশের পরিবেশ এখন শান্ত, মৃদু শব্দে গান বাজছে সাউন্ড বক্সে। আর দুজন মানব মানবীর হৃৎযন্ত্র জোরে জোরে শব্দ তুলছে।

আবরার পলকহীন তাকিয়ে আছে বধু বেশে এগিয়ে আসা সারাহর দিকে। অবশেষে আজ তার মায়াবিনী তার হতে যাচ্ছে। তার অপেক্ষার পালা আজ শেষ হবে।

সারাহ আর আবরার পাশাপাশি বসে আছে। সামনের ছোটো টেবিলটায় রাখা ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পেপার। কাজী সাহেব আবরারের পাশে চেয়ারে বসে আছেন। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সবাই।

কাজী সাহেব পেপারটা রেডি করে সারাহর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“এখানে সই করে দাও।”

সারাহ কলমটা হাতে নিলো। তার হাত থরথর করে কাঁপছে। মনে হচ্ছে হাতে ঝড় শুরু হয়েছে। সই করতে নিয়েও বারবার থেমে যাচ্ছে। সবাই বলছে লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে শান্ত হয়ে সই করতে, তবে সারাহ পারছে না। বারবার তার হাত থেমে যাচ্ছে। কলমটাও ঠিকভাবে ধরতে পারছে না।

আবরার সারাহর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, সারাহ চোখ তুলে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল। আবার সই করতে নিয়েও থেমে গেল।

তার আর আবিরের এনগেজমেন্টের দিনও সারাহর হাত এভাবেই কাঁপছিল। সে ঠিকভাবে আবিরকে আংটিও পরাতে পারছিল না।

আবিরের কথা স্মরণ হতেই তার উপর জেদ ভর করল। থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতেই সই করে ফেলল দ্রুত।

সই করার সময় আবরারের হাতটাও কাঁপতে লাগল। সামান্য নিজের নাম লেখাটাও যে এত সহজ নয় তা আবরার আজ বুঝতে পারল। এতক্ষণ ভাবছিল সারাহ নিজের নাম লিখতে গিয়ে কেন এভাবে কাঁপছে। অথচ ছেলে মানুষ হয়ে সে নিজেই কাঁপতে শুরু করেছিল।

কবুল বলার সময় সারাহর গলা দিয়ে আওয়াজ বের হতে চাইছিল না। আবরারকে কবুল বলতে বলার পর আবরার সারাহর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মায়াবিনীর মুখ পানে তাকিয়ে থেকেই সে কবুল বলল। দ্বিতীয়বার বলতে বলার পর বলে দিলো, তৃতীয়বার বলার সময় তার গলা জড়িয়ে এলো, চোখজোড়ায় পানি জমলো। খুশিতে তার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে। ফারিশ মুচকি হেসে নিজের চোখজোড়া মুছলো। আদরের বোনের জীবনে সঠিক মানুষের আগমন, আর প্রিয় বন্ধুর খুশি দুটোই তাকে আবেগ প্রবন করে তুলছে।

কাজী সাহেব আর হুজুর সাহেব স্টেজ থেকে নেমে গেলেন। আবরার সারাহর কাছাকাছি এসে বসল। সারাহর বুকের ধুকপুক শব্দ বেড়ে গেল আরও। আবরার তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে বলল,

“তোমার হাতটা ধরি?”

সারাহ চোখ তুলে তাকাল সদ্য হওয়া নিজের বরের মুখের দিকে। চোখাচোখি হলো দুজনের। সঙ্গে চোখে চোখে কথাও হয়ে গেল। অনুমতি পেয়ে সারাহর নরম হাতটা নিজের পুরুষালি হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করল আবরার। মৃদুস্বরে বলল,

“এই যে ধরলাম, মৃত্যুর আগে আর ছাড়ছি না। যদি কখনো আমার কোনো কাজে বা আচরণে কষ্ট পাও, বলবে আমি নিজেকে শুধরে নিবো।”

.

বাসর ঘরে লম্বা ঘোমটা টেনে বসে আছে সারাহ। আবরার এখনো রুমে প্রবেশ করেনি। বিদায়ের সময় সারাহর সে কী কান্না! মাকে আর ছোটো ভাইকে ছাড়তেই চাইছিল না। তার সঙ্গে সঙ্গে তার নানি, মা আর ছোটো ভাইও অনেক কেঁদেছে। কোনোভাবেই সারাহকে গাড়িতে তোলা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।

ফারিশ আর ফাইয়াজ এবাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছিল। সারাহর জ্ঞান ফেরার পর তাকে বাসর ঘরে রেখে যাওয়ার পর দুজন চলে গেছে। দুজনকে বিদায় দিতে গিয়েছিল আবরার, তাও ঘণ্টা খানিক আগে, এখনো তার আসার খবর নেই।

দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে মুখ তুলে তাকাল সারাহ। আবরার এসেছে। সারাহর হৃৎপিণ্ড আবার জোরে জোরে লাফাতে লাগল। পরনের শাড়ি খামচে ধরে শক্ত হয়ে গেল।

আবরার ধীর পায়ে এগিয়ে এলো তার কাছে। সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো। সারাহ মৃদুস্বরে সালামের জবাব দিলো দৃষ্টি নত রেখে। আবরার বিছানায় উঠে তার সামনে বসল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ঘোমটা তুলে ফেলে দিলো পেছনে। উন্মুক্ত হলো মায়াবিনীর মায়াবী চেহারা। আবরার বুকের বাম পাশে ডান হাত চেপে ধরে বলল,

“হায় হায়! এই চোখ জোড়ায় কী মায়া!”

সারাহ তাকিয়ে রইল আবরারের মুখের দিকে। আবরার বুকে হাত চেপে ধরে ঘাড় কাত করে রেখেই আবার বলল,

“মায়াবিনী, আমাদের প্রথম দেখার কথা মনে আছে তোমার?”

সারাহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“ভার্সিটিতেই তো প্রথম দেখা হয়েছিল, তাই না?”

আবরার মুচকি হেসে দুদিকে মাথা নাড়ল। সারাহর চোখে চোখ রেখে বলল,

“তুমি একবার শপিংমলে গিয়ে একজনের সামনে পড়ে গিয়েছিলে মনে আছে?”

সারাহ মাথা নেড়ে বলল,

“হুম। যা লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?”

আবরার কিছু বলার আগেই সারাহ চোখজোড়া বড়ো বড়ো করে আবার বলল,

“ওই লোকটা আপনি ছিলেন?”

আবরার ঠোঁটে হাসি ধরে রেখেই মাথা নেড়ে বলল,

“হুম। সেদিন তুমি আছড়ে পড়েছিলে আমার সামনে, অথচ আমি আছড়ে পড়েছিলাম তোমার মায়ায়। তোমার ভীত, লজ্জা রাঙা চেহারা আর চোখজোড়াকে আমি আজও ভুলতে পারিনি, মায়াবিনী। তোমাকে ভেবে ভেবে কত রাত জেগেছি নিজেও জানি না। সেদিনের পর পাগলের মতন কত খুঁজেছিলাম তোমায়। ভার্সিটির ক্যাম্পাসে তোমাকে দেখে কতক্ষন তাকিয়েছিলাম হিসেব নেই। লুকিয়ে লুকিয়ে তোমাকে কত দেখেছি তুমি ভাবতেও পারবে না। অবশেষে আজ তুমি আমার, মায়াবিনী।”

আবরার সারাহর হাতজোড়া টেনে চুমু খেলো। আরেকটু এগিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। সারাহ চুপ করে বসে রইল আবরারের বুকের মধ্যে লেপ্টে। সে আর কোনোদিনও আবরারকে কষ্ট দিবে না। গুটিয়ে রাখা হাতজোড়া মেলে নিজেও জড়িয়ে ধরল আবরারকে।

দুজন একে অপরের হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে, যা অবাধ্য হয়ে ছুটছে দ্রুত গতিতে।

চলবে……………

আগামী পর্বে গল্প শেষ হবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply