সময়ের চাকা ঘুরে দীপ্র-কুহুর বিয়ের দিন প্রায় এসেই গেল। রাত পোহালেই হলুদের অনুষ্ঠান। আয়োজন নিয়ে প্রায় সকলেই ব্যস্ত ছিলেন। একটু ফুসরত মিলতেই সবাই মিলে বসেছেন আড্ডাতে। জেবা আর ববিতা মিলে নাশতা বানাচ্ছেন। ওদিকে বসার ঘর থেকে হাসির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। জেবা পাকোড়া ভাজতে দিয়ে বললেন,”বাড়িটা কেমন আনন্দে ভরে উঠেছে।”
ববিতা কাজের মাঝেই জবাব দিলেন,”হ্যাঁ, আপা। অবশেষে ছেলে-মেয়ে দুটো এক হচ্ছে। দুজনেই অনেক পাগলামি করেছে। আমাদের উচিত ছিল আগেই এক করে দেয়া।”
“ঠিক বলেছ। কত দূরে ছিল দুজনে। অথচ সম্পর্কটা হালাল হয়েছিল।”
ওনাদের কথার মাঝেই উপস্থিত হলেন দবীর। স্ত্রী আর ভাইয়ের স্ত্রীর কথা শুনেছেন তিনি। তাই মনে মনে আওড়ালেন,”তোমাদের এক করার জন্য ওরা কি বসে আছে? আমার যে ছেলে, হারে হারে চিনি তাকে। মেয়েটাকে এমন ভাবে কবজায় নিয়েছে যে, ওটাও পাগল হয়ে আছে।”
চোখ ঘুরাতেই স্বামীকে দেখলেন জেবা। মুচকি হাসলেন। বললেন,”তুমি উঠে এলে যে?”
“এলাম, জানতে। আর কতক্ষণ লাগবে তোমাদের।”
“হয়েই এসেছে ভাইজান। আপনি বসেন।”
“একটু বের হতে চাচ্ছিলাম।”
“এই সময়ে আবার কোথায় যাবে?”
“ঘুরে আসি একটু। কাছে পিঠেই।”
বলে, দবীর বের হয়ে গেলেন। চারপাশে আঁধার নেমে এসেছে। মফস্বল হওয়াতে কিছু দূর পর পর বাতি জ্বলছে। তবে পরিবেশ নীরব। তিনি হাঁটতে হাঁটতে এলেন ভাইয়ের কবরের কাছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোয়া করলেন। মনটা খুব কাঁদতে চাচ্ছে। তবে চোখ দুটোয় জল নামছে না। তিনি ভাঙা গলায় ডাকলেন,”ভাই, এই ভাই। কেমন আছিস তুই? আমাকে কি এখনো ক্ষমা করতে পারিস না? হয়তো পারছিস না। মানুষ চলে যাওয়ার আগে, আমরা কদর করি না। তোর কদর ও করিনি ভাই। তুই দীপ্রকে চেয়েছিলি। ছোট থেকে সমস্ত স্নেহ দিয়ে বড়ো করেছিলি। সেই আমি কি না, তোকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভাই, আমি ফেরালেও আমার ছেলে কিন্তু ফেরায় নি। বরং ভালোবেসেছে। সবটা দিয়ে ভালোবেসে কুহুকে। ওর এই পবিত্র মনের জন্য কি আমায় ক্ষমা করা যায় না? যায় না ভাই?”
বলতে বলতে ভদ্রলোক কেঁদেই ফেললেন। কাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অহমিকায়। অথচ ভাই চলে যাওয়ার পর, তিনি একটা রাত ঠিক ঠাক ঘুমাতে পারেননি। ছুটে এসে ছেলের সাথে কুহুর বিয়ে ঠিক করেছিলেন। তারপরের কাহিনী গুলোও কম কঠিন ছিল না। সব মিলিয়ে দবীর ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিলেন। সহসাই কাঁধে একটি হাতের ছোঁয়া পেলেন তিনি। একটু চমকে গেলেও মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলেন। ঢোক গিললেন। ছেলের স্পর্শ চিনতে অসুবিধা হয় নি যে।
“আমাকে দয়া করে কোনো প্রশ্ন কোরো না দীপ্র। এটা রিকোয়েস্ট তোমার কাছে।”
দীপ্র সত্যিই কোনো প্রশ্ন করল না। বরং বলল,”পরিবেশটা দেখো, হালকা বাতাস নেমে এসেছে। খানিক বাদে বৃষ্টি নামতে পারে। চা খাবে বাবা?”
দবীরের বুকটা কেমন করে উঠে। তিনি ঢোক গিলেন। কান্না গিলেন। বলেন,”বিল কি তুমি দিবে?”
হেসে ফেলে দীপ্র। বলে,”কেন? পকেটে পয়সা নেই তোমার?”
দবীর গম্ভীর ভাবে বললেন,”নেই।”
“ঠিক আছে। বিলটা না হয় আমিই দিব। বিয়ের অনুষ্ঠান করতে চলেছি। বিয়ে করেছি তোমার ভাইঝিকে। চাচা শ্বশুর হিসেবে না হয় ট্রিট নিলে।”
ছেলের এহেন জবাবে দবীর একদম কথা হারালেন। কিছুটা মন ও ভালো হলো। উল্টো ঘুরে বললেন,”চলো। দু কাপ চা খাওয়াবে।”
বাপ ছেলে সেই যে গেল আর আসার নাম নেই। তাদের রেখেই পাকোড়া খাওয়া হলো। কুহুটা বার বার বাহিরে তাকাচ্ছে। আড্ডায় মন নেই। ওর এহেন আচরণ দেখে কুঞ্জ বলল,”কুহুপু দেখি দাদাভাইকে চোখে হারাচ্ছে।”
সকলের মাঝে ছোট্ট কুঞ্জ এহেন কথা বলে ফেলবে তা কেউ বুঝেনি। ও বড়ো বড়ো চোখে তাকাল। রাত্রি বলল,”দেখেছিস, কুঞ্জ কি পাকা হয়ে গেছে। সব বুঝে।”
কুহুর একটু লজ্জা লজ্জা লাগছে। দাদিজান বললেন,”এটা তো কিছুই না। আমি তোদের দাদা-নানাভাইকে কত যে চোখে হারাতাম। সেই গল্পের কাছে দীপ্র-কুহুর গল্প কিছুই না।”
ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ হলো দীপ্রর। দাদিজানের কথা শুনে দীপ্র বলল,”দাদিজান, এই জায়গায় আমার ঘোর আপত্তি আছে।”
“কেন ভাই? তুমি কি এমন কাণ্ড করেছ যাতে আমাদের গল্পকেও হার মানাবে?”
দীপ্র মুচকি হাসে। দাদিজানের পাশে বসে ফিসফিস করে বলে,”ধরো, তোমার নাতনি প্রেগনেন্ট করে বসে আছি, এটা শুনলে তোমার কেমন লাগবে?”
এ কথায় দাদিজান চোখ বড়ো করে ফেললেন। পাশে থাকা কুহু হাবুলের মতন চেয়ে। দীপ্র হেসে বলে,”মজা করে বললাম।”
রাতের খাবার খেয়ে দীপ্রর পেছন পেছন ঘুরছে কুহু। মানুষটা এত ব্যস্ততা দেখাচ্ছে। এবার ও মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
“আপনি কথা শুনতে চাচ্ছেন না কেন?”
“কাজ করি তো।”
“একটু সময় দেন।’
“আচ্ছা বল।”
বলে ওর মুখোমুখি চায় দীপ্র। কুহু মুখটা ফুলিয়ে রেখেছে। ও বলে,”তখন ওটা বললেন কেন?”
“কোনটা?”
“ওটা।”
“ওটা আবার কী?”
“উফ, আপনি জানেন আমি কি বলছি। তাও কেন না বোঝার ভান ধরছেন?”
খুব বিরক্ত হয়েই বলল কুহু। দীপ্র মৃদু হাসল। হাত বাড়িয়ে ওর কপালের কাছের কিছু চুল টেনে ধরল। আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,”মজা করে বলেছি তো। তবে চাইলেই খুব দ্রুত….
কুহুর বুকটি কেমন করে উঠল। ওর উঠানো চোখ নেমে এল। দীপ্র হেসে বলল,”বাবু চাই?”
এত লজ্জা লাগছে মেয়েটির। দীপ্র আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়। ফিসফিসিয়ে বলে,”কিছুদিন ধরেই আমার মনটা কেমন করছে জান। আমার বাচ্চার মা হবি তুই?”
কুহুর ভেতরটা মুচড়ে উঠে। ও মিশে যায় দীপ্রর বুকে। দীপ্র হেসে ওর মাথার পেছনে হাত রাখে। বুক ভরে দম নিয়ে বলে,”আমি বাবা হতে চাই জান। আমাদের অংশের অস্তিত্ব আনতে চাই। যে শুধু আমাদের হবে। শুধুই আমাদের।”
চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৪