#সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
#পর্ব ৩৪
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
ব্যাপারটা তুমুল মারামারির পর্যায়ে পৌঁছাতো, যদি না বোটের ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা লোকটা সাথের ছেলেদের নিয়ে এসে মেজবাহকে না আটকাতো। মেজবাহ বোধহয় ছেলেগুলোকে মেরে হাওরেই ফেলে দিতো। ম্যানেজার এসে ওকে শান্ত করলেন। ছেলে তিনটের বেয়াদবির জন্য নিজেসহ ওদের দিয়ে মাফ ও চাওয়ালেন। এমন অনাঙ্ক্ষিত ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি বলে ভীষণ আফসোস এবং দুঃখপ্রকাশও করলেন ম্যানেজার।
মেজবাহ শান্ত হয়ে তার সাথে টুকটাক কথা শেষ করে আকসার হাত ধরে ওকে উল্টোপথে রুমের দিকে নিয়ে গেল।
.
.
আকসা বিছানার ওপরে বসে আছে। আর মেজবাহ ওর ঠিক সোজাসুজি বেতের টুলে৷ গম্ভীর মুখে হাত রেখে তাকিয়ে আছে ব্যালকনির দিকে। দমকা হাওয়ায় শার্টের কোণা উড়ছে। সাথে আকসার ওড়নার একপাশও। আকসা ভয় ভয় চাহনিতে দেখছে মেজবাহকে। লোকটার মতিগতি বুঝতে পারছে না। এই মুহূর্তে কি ভাবছে, তার মনে কি চলছে— সেসবও না। আকসা কিয়ৎক্ষণ আগে জাগ্রত মনের ভেতরকার তরতাজা ভয়-ডরকে কোনোমতে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে আমতা আমতা স্বরে বলে উঠলো, “মেজবাহ আমার…”
“শাট আপ! জাস্ট শাট আপ! একটাও কথা না৷ একদম চুপ। কোনো কথা বের হলে মুখ বরাবর ঘুষি মারবো। জীবনে আর ওই মুখ দিয়ে একটা সাউন্ডও বের হবে না!”
মুখে ঘুষি মারার কথা শুনে ভয়ে ঢোক গিলে আকসা চুপ হয়ে গেল। লোকটা এই মুহূর্তে ভয়াবহ পর্যায়ের রেগে আছে। এখন কিছু বলা ঠিক হবে না৷ আকসা ভাবলো, মেজবাহ’র রাগ কমলে, কিছুটা শান্ত হলে তবেই যা বলতে চাইছে, বলে নেবে। এজন্য ও নিশ্চুপ হলো। ওর এই বোবা বনে যাওয়াও বোধহয় মেজবাহ’র সহ্য হলো না। একটানে টুল টেনে একেবারে আকসার কাছ ঘেঁষে বসলো৷ মেজবাহ’র দু’টো পা আকসার আনারকলিতে অর্ধ-আড়াল হওয়া পায়ের সাথে ঠেকলো। ও শিউরে উঠে পা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই মেজবাহ ওর পা চেপে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। আকসা ঠোঁট নাড়ানো মাত্র ওর মুখ চেপে ধরে আলতো কোরে। আকসা পরক্ষণে ছাড়া পেয়ে ভাঙা গলায় বলে, “স্যরি মেজবাহ। আমার ভুল…”
“কীসের স্যরি? হু? স্যরি কীসের জন্য? তোমার কারণে হাতে চোট পেয়েছি সেজন্য? নাকি অগণিত ছেলেকে নিজের শরীর দেখিয়ে আসার জন্য?”
আকসা নতমুখে চুপ হয়ে থাকে। মেজবাহ ইফতেখার স্পষ্টবাদী লোক। একথা যে তুলবে, সেটা আকসার জানা ছিল। ভালোভাবেই জানতো, শনি ওর কপালে অবশ্যই আছে। সেটা বুঝি চলেই এলো!
আকসা আমতাআমতা করে বললো, “আসলেই স্যরি। আমি বুঝতে পারিনি আপনার..”
“বুঝতে পারোনি? হাহ!”
মেজবাহ কটাক্ষের হাসি হাসে। ওর নরম গালে হাত আরো দাবিয়ে দিয়ে বলে, “কচি খুকি তুমি? আরে ছোট একটা বাচ্চা মেয়েও তো সবার সামনে শরীর দেখিয়ে বেড়ায় না। সেখানে তুমি নেচেও এসেছো! বিলিভ মি, তখন থেকে রাগে আমার শরীর চিড়বিড় করছে। ইচ্ছা হচ্ছে, হয় তোমাকে জানে মেরে ফেলি, নাহয় নিজেকে৷ অন্তত ওই দৃশ্য তো ভুলতে পারবো!”
মেজবাহ আকসার কোমর পেঁচিয়ে ধরে কাছে টেনে আনে। বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় একপ্রকার। গলার স্বর হঠাৎ পরিবর্তন হয়। মেজবাহ হিসহিসিয়ে বলে, “ইভেন, নিজেকে মারতে পারলেও; তোমাকে আমি মারতে পারবো না। কি হাস্যকর, তাইনা?!”
আকসা কোনো কথা বলে না। বোবা এবং বধিরের ন্যায় তাকিয়ে থাকে মেজবাহ’র দিকে৷ ওর চোখ-মুখ অবলোকন করতে থাকে৷ যেন বোঝার চেষ্টা করছে মেজবাহ’র কথা। মেজবাহ’র কপালের শিরা-উপশিরা তখনও ফুলে আছে। আকসা সেটা খেয়াল করে পুনরায় ঢোক গেলে৷ ওর গাল টেনে ধরে মেজবাহ বলে, “তোমাকে আমি ডিভোর্স দেওয়ার কথা মাথাতেই আনতাম না৷ এই ডিসিশন কেন নিয়েছি জানো? ডু ইউ নো দ্যাট? তুমি আমার ওয়াইফ হয়ে অন্য ছেলেদের সামনে গিয়ে নাচানাচি করেছো। কী কারণে? হু?”
“আসলে আমি তখন রেগে ছিলাম খুব। রাগের মাথায় কি করে ফেলেছি বুঝতে পারিনি সেসময়ে!”
“রাগের মাথায়? রাগের মাথায় তুমি অতগুলো ছেলের মাঝখানে গিয়ে নাচ-গান করবে? তাহলে তো রাগ কোরে তুমি সব করতে পারবে৷ ওসব ছেলেদের মধ্যে গিয়ে জামাকাপড় সব খুলে নেকড হয়েও ঘুরতে পারবে।”
কথাটা শুনে আকসার কান ঝাঁঝা করতে শুরু করলো৷ ও তড়িৎ একটা হাত মেজবাহ’র মুখে চেপে ধরলো৷ আকুতি ভরা চোখে মেজবাহ’র চোখের দিকে তাকালো। মিইয়ে যাওয়া স্বরে বললো, ”প্লিজ মেজবাহ!”
আকসার অস্বস্তি দেখেও মেজবাহ থামে না। দাঁতে দাঁত পিষে বলে, “কী? করার সময় লজ্জা লাগেনি? এখন শুনতে এতো লজ্জা কীসের?”
আকসা মুখ নুইয়ে ফেলে৷ অনুশোচনায় ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছে ও৷ নিজের ওপরই বিতৃষ্ণা আসছে প্রচন্ড। নিজের গালে নিজেরই চড় মারতে মন চাচ্ছে। এমন মেয়ে তো ও কখনোই ছিল না৷ একটা বিশ্রী তকমা জড়িয়ে গেল গায়ে। হঠাৎ কি হয়েছিল কে জানে! কেন যে বোকার মতো করতে গেল অমন! চোখ থেকে টপাটপ কয়েক ফোটা জল গড়িয়েছে পরলো পরনের আনারকলির ওপরে। ওর চোখে কান্না দেখে মেজবাহ’র গাম্ভীর্যে ঢাকা রাগী মুখের রঙ পরিবর্তন হলো। ও উঠে গিয়ে ব্যালকনির দোলনায় বসলো। ঠিক বসলো না৷ উঠে সেখানে বালিশ আর একটা ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে আধশোয়া হয়ে রুমের ভেতরে অবস্থানরত আকসাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “অনেক রাত হয়েছে৷ আমি যেন আর পাঁচ মিনিটও জেগে থাকতে না দেখি।”
আকসা তড়িৎ লাফিয়ে বিছানায় উঠলো৷ ব্ল্যাঙ্কেট গায়ে টেনে নিয়ে ঘুমানোর তোড়জোড় করলো৷
.
.
আজ হাওরে প্রবেশ করার দ্বিতীয় দিন৷ এক হিসেবে বলা চলে, প্রথম দিন৷ কারণ, গতকাল রাতটা স্থির কেটে যাওয়ায় গুণতির বাইরে পরেছে।
ওরা ওয়াচ টাওয়ার, শিমুল বাগান আর লাকমা ছড়া —ঘুরেছে সারাদিন। তখন বিকালের পারত পরেছে প্রায়। ওরা নীলাদ্রি লেক পরিদর্শন করবে। লেকের কাছে যখন পৌঁছেছে, তখন সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। নীলাদ্রি লেকের পাড়টা মারাত্মক সুন্দর। পাহাড়ের টিলার ন্যায়। সম্পূর্ণ সবুজে আবৃত। সবাই বোট থেকে নামলো সেখানে৷ লেক দেখতে, ঘুরতে এবং ছবি তুলতে ব্যস্ত হলো৷ জনসংখ্যা তো নেহাৎ কম নয়৷ শ’খানেকের বেশি মানুষ নেমেছে লেকটা দেখতে৷ বিশাল বড় লেক৷ নীল তার জলরাশি। আর লেকের পাড় পুরোটা পাহাড়ের মতো। সবুজাভ পাহাড়৷ ওপাশে বোধহয় বন-জঙ্গল। জনবসতি ধারেকাছে তেমন নেই বললেই চলে৷ সুনশান নিরবতা বিরাজমান।
মেজবাহ আফসান আর তাহসিনের সাথে একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ বেশ হাসি-ঠাট্টা চলছে৷ মেজবাহ’র ঠোঁটের কোণে এক চমৎকার হাসি৷ যেটা সাধারণত ওর পরিবেশের সাথে থাকাকালীন ব্যতীত অন্য সময়ে দেখা যায় না।
জেমিরা হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দূরে চলে গিয়েছিল৷ হাউসবোট ছাড়ার সময় হয়ে গেছে তখন। দেড়ঘন্টার মতো পার হয়ে গেছে। আফসান জেমিকে কল করলো। বললো, “তোমরা কোথায়? দ্রুত ফিরে এসো৷ বোট ছাড়ার সময় হয়ে গেছে।”
জেমি বললো, “এইতো আসছি এখনই।”
ওরা ফিরলো পনেরো-বিশ মিনিটের মধ্যে। জেমি দ্রুত পায়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো, “স্যরি৷ ওদিকটাতে গিয়ে ছবি তুলছিলাম আমরা৷ এজন্য লেইট হলো।”
আফসান ওকে ধাতস্থ করে আয়ানকে কোলে নিয়ে ওর হাত টেনে নিয়ে সামনের দিকে সবাইকে নিয়ে এগোতেই জেমি চারপাশে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “আকসা কোথায়?”
আফসান চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,
“আকসা কোথায় মানে? তোমাদের সাথেই না ছিল?!”
জেমি, মিহিরা অবাক হয়ে একে-অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। মেজবাহ কিছুটা পেছনে ছিল। ওদের কথা শুনতে পেয়ে সামনে এগিয়ে এলো৷ জেমি বললো, “আকসা তো সেই ঘন্টাখানেক আগেই এদিকে চলে এসেছিল। আমাদের যে বললো, ওর শরীরটা ভালো লাগছে না, তাই বোটে গিয়ে বসবে। তাই আরো আমরা আসতে দিলাম। কিন্তু… ”
তাহসিনকে খোঁজ নিতে পাঠানো হলো৷ পুরো হাউসবোট তন্ন তন্ন করে খুঁজে এসেছে ও। কোথাও আকসা নেই। এমনকি বোট থেকে জানানো হলো, নীলাদ্রি লেক দেখার জন্য নামা কেউই এখনো পর্যন্ত বোটে ওঠেনি।
মেজবাহ’র কানে কথাটা যাওয়া মাত্র ওর মুখ রক্ত-শূন্য হয়ে গেল। ফ্যাকাশে মুখ ধীরে ধীরে নীল-বিবর্ণ হলো৷ ও চরম উৎকন্ঠিত হয়ে জেমিকে প্রশ্ন করলো, “ওকে লাস্ট কোথায় দেখেছিলে আপু?”
“এই উল্টোপথেই দেখেছিলাম। আসার পথে কতগুলো গাছ পরে। সেই গাছের হতে দৃষ্টির আড়ালে অদৃশ্য হওয়ার পরে আর দেখিনি।”
“তাহলে ও কোথায় গেল!”
মেজবাহ হঠাৎ কি মনে করে দৌড় দিলো পেছনের পথে৷ দৌড়ে সব জায়গায় খুঁজতে ব্যস্ত হলো৷ আকসার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকল৷ তবু আকসা সাড়া দিলো না৷ মেজবাহ ঢোক গিলল৷ এই প্রথম ওর চেহারায় ভয়াবহ আতঙ্ক দেখা গেল৷ আফসান আর তাহসিনও চারপাশে খুঁজে এসেছে। জেমিরাও৷ ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে, বোটের একজন মিসিং। বোটের কয়েকজন যাত্রীরাও এসে ওদেরকে খুঁজতে সহযোগিতা করেছে। তবে আকসাকে কোথাও পাওয়া যায়নি।
রাত হয়ে আসছে। প্রায় সাড়ে আটটা বাজে তখন। বোট ছাড়ার সময় অতিক্রম হলো বলে। তবে ম্যানেজমেন্টের লোকটা এসে মেজবাহকে জানালেন, যতক্ষণ না যাত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ বোট ছাড়বেন না তিনি৷
মেজবাহ অসহায়ের ন্যায় পকেটে হাত রেখে গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল৷ আশেপাশের সম্পূর্ণ পাহাড় খোঁজা হয়ে গেছে। এখন বাদবাকি আছে বলতে শুধু ওই পাড়ের বনজঙ্গল। একটা সরু রাস্তা পেরোলেই জঙ্গলটা৷ মেজবাহ ওপাশে দুশ্চিন্তায় নুইয়ে যাওয়া আফসান-জেমিদের নিকট এগোয়। আফসানের হাতে নিজের ক্রেডিট কার্ড, এটিএম কার্ড এবং ডেবিট কার্ডসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ধরিয়ে দিয়ে বলে, “আপনারা বোটে উঠুন। আমি ফিরছি আকসাকে নিয়ে।”
জেমি ছলছল চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়। মেজবাহ ওকে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে বলে, “ওকে নিয়েই ফিরবো আমি৷ চিন্তা কোরো না।”
মেজবাহ আর সময় নষ্ট করলো না সেখানে। সবাই তখন বোটে উঠে গেছে৷
মেজবাহ আঁধার ভেদ করে ছুটে গেল সরু রাস্তার ওপাড়ে জঙ্গলের দিকে। এই আশায়— যদি ওখানে আকসাকে খুঁজে পাওয়া যায়!
.
.
মেজবাহ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। বন-জঙ্গলের মোটামুটি গভীর এলাকা। এখানে শুধু গাছপালা, ছোটখাটো পশুপাখি ব্যতীত আর কিছু থাকার কথা নয়৷ সেখানে এই অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে কতগুলো মানুষ! অবাক করা ব্যাপার হলো, মানুষগুলো আর কেউ নয়, সেই ছেলে তিনটে! বয়স ওদের কত হবে? তেইশ কি চব্বিশ! উঠতি বয়স। তিনটে ছেলের হাতেই ফোনের ফ্ল্যাশ। এরা বোট ছেড়ে এখানে কেন? কী কারণে? আশ্চর্য!
সবচেয়ে বেশি পিলে চমকে দেওয়ার মতো দৃশ্যটা চোখে পরলো আরো সেকেন্ড কয়েক পরে। মেজবাহ অন্যদিকে মুখ ঘোরাতেই দেখলো, আকসা ওখানে! গাছের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে ওকে! পরনের ওড়না মাটিতে পরে আছে! বেহুঁশের ন্যায় মাথা নুইয়ে ঢুলছে ও! মেজবাহ’র বুকে এক অদ্ভুত খামচির ন্যায় অনুভূতি তৈরি হলো৷ চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলো৷ ভেতরে ভেতরে ভয়াবহ রকমের প্রচন্ড অস্থিরতা তৈরি হলো৷ মেজবাহ’র হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠলো তখন, যেই মুহূর্তে মিনিটখানেকের মধ্যে দেখলো, যেই ছেলেটাকে ও প্রথমে ঘুষি মেরেছিল, সেই ছেলেটা হাতে একটা চ্যালাকাঠ জাতীয় কিছু নিয়ে আকসার গায়ের ওপরে খুব জোরে বা’রি মেরেছে! মেজবাহ’র হাত মুঠো হয়ে এলো৷ পায়ের তলার সবকিছু যেন হাওয়াই বাজি ঠেকলো৷ ও সামনের দিকে পা চালাতে গিয়েও থমকে গেল৷ মেঘের গর্জন বাড়ছে। আবারও বৃষ্টি নামতে পারে৷ আবহাওয়া বেগতিক। এমতাবস্থায় রাগ ও ঝোঁকের বশে কিছু করে বসলে পরিস্থিতিও বেগতিক হতে পারে। ছেলেটা আরো একটা বারি মেরে বলছে, “তোর নাগরের জন্য আমাদের প্রেস্টিজে আঘাত লেগেছে৷ তুইও একটু আঘাত নে৷ এটা তো কম। এখন শুধুই চ্যালাকাঠের বারি দিচ্ছি। একটু পরে তোর ইজ্জতে হাত দেবো৷ প্রস্তুত হয়ে নে।”
মেজবাহ হাত মুঠো কোরে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে নিলো৷ এই মুহূর্তে রাগলে চলবে না৷ ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে৷ ও চারপাশের পরিবেশ ধীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো। ছক কষলো। এরপর পায়ের সামনে ইটের খোঁয়ার দেখতেই চট করে তুলে নিলো৷ মেজবাহ নিজের দীর্ঘদিনের শত্রু মোকাবেলার অভিজ্ঞতা দ্বারা ইটের টুকরো ছেলেগুলো যেখানে দাঁড়ানো, ওদের ঠিক পেছন থেকে দিকে জোরে ছুঁড়ে দিলো৷ ঝোপঝাড়ের মধ্যে শব্দ হতে শুনে ছেলেগুলো একে-অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। সতর্ক হয়ে গেল। কেউ এলো নাকি এদিকে! মোটাবুদ্ধির ছেলের দল খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনজনেই আকসাকে ওখানে বাঁধা অবস্থায় রেখে পেছনের ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঢুকে গেল। মেজবাহ একদম সময় নিলো না। দ্রুত গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে জঙ্গলের সেই এক টুকরো ফাঁকা স্থানে গিয়ে দাঁড়ালো। আকসা ভয়ে, ব্যাথায় এবং আতঙ্কে সব মিলিয়ে পুরোপুরি দুর্বল হয়ে নেতিয়ে পরেছিল। হঠাৎ “আকসা” ডাকটা মেজবাহ’র কন্ঠে শোনামাত্র চমকো মুখ তুলে তাকালো ও৷ মেজবাহ সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ আকসার মুখ তুলতে দেখে ও চটজলদি এগিয়ে গেল। ছেলেগুলোর যাওয়ার পথে একবার চেয়ে খুব সতর্কতার সহিত নিঃশব্দে আকসার বাঁধনের দড়ি খুলতে ব্যস্ত হলো৷ কিছু না থাকায় দড়িটা খুলতে কিঞ্চিৎ বেগ পেতে হলো। দড়ি খুলতেই আকসার হাত টেনে ধরলো ও। ফিসফিসিয়ে বললো, “আমার সাথে চলো আকসা। দ্রুত! এখানে আর এক সেকেন্ডও নয়!”
কথাটা বলে আকসার হাত টেনে ছোটার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে বাঁধা পেয়ে থমকে গেলে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, আকসা এক জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ মেজবাহ প্রথমে বুঝতে পারলো না, ওর কি হয়েছে। উদ্বিগ্নতা নিয়ে বললো, “দাঁড়িয়ে গেলে কেন? ওরা এখনই চলে আসবে!”
“আসুক। এসে যা খুশি করুক আমার সাথে। ইজ্জত লুটুক। মেরে ফেলুক। যা খুশি করুক! আমার আর কিছুই যায় আসে না।”
মেজবাহ’র মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরা চিড়বিড় করে ওঠে আকসার কথা শুনে। ওর কথাবার্তা শুনে হাত তুলতে গিয়েও মুঠো করে নেয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তোমাকে তো! . . পরে দেখছি!”
কথা শেষ করেই ওকে জোরপূর্বক কোলে তুলে নেয় মেজবাহ। ছেলেগুলো ফিরছে বোধহয়! পাতার ওপরে জুতার মড়মড় শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর দু-তিন মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবে। মেজবাহ আকসাকে কোলে নিয়েই অন্ধকারে সামনের দিকে ছুটলো। তখনই পেছন থেকে শোনা গেল, “এই এই পালাচ্ছে! আমাদের ধোঁকা দিয়েছে! ধর ধর! বাঁচতে দিস না৷ নাহলে আমরা কেস খেয়ে যাবো!”
পেছন থেকে জুতার শব্দ শুনতেই মেজবাহ ছোটার হতি বাড়িয়ে দিলো। আকসাকে কোলে নিয়ে এই আঁকাবাঁকা পথে ছোটা অসম্ভব বলে সেকেন্ডের মধ্যে ওকে নামিয়ে দিয়ে ওর হাত শক্ত করে টেনে ধরে ছুটতে শুরু করলো মেজবাহ৷ ততক্ষণে মেঘের ভয়ঙ্কর গর্জন, ঝড়ো-বাতাস আর ঝিরঝিরি বৃষ্টি — সব মিলিয়ে পরিবেশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে৷ ওরা ছেলেগুলোর থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছে৷ তবে ছেলেগুলো ওদের পিছু ছাড়েনি৷ সেটা বহুদূর থেকে ওদের কর্কশ গলার আওয়াজ শুনেই বোঝা যাচ্ছে।
আকসার তখন অবস্থা খুবই খারাপ। আর ছুটতে পারছে না৷ সারা শরীরে ব্যাথা, পায়ে ব্যাথা — সব মিলিয়ে জঘন্য দশা। মেজবাহ একবার আশেপাশে তাকায়৷ একটা মহাভুল করে বসেছে৷ তাড়াহুড়োয় পাহাড়ের ওদিকে না গিয়ে জঙ্গলের গভীরে চলে এসেছে ওরা৷ এখন কি করবে!
মেজবাহ এমন পরিস্থিতিতেও দিশেহারা হলো না।
হঠাৎ জঙ্গলের ভেতরে একটা বড় শিরীষ গাছের নিচে ছোট কাঠের ঘর দেখে যেন কিছুটা স্বস্তি পেল ও৷ এই ঘর সম্ভবত কাঠুরেদের বানানো৷ ওরা এখানে অনৈতিকভাবে গাছ কাটতে এসে এমন ঘর বানায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। আপাতত এটাই কাজে লাগবে ওদের।
আকসাকে কোলে তুলে নিয়ে মেজবাহ দ্রুত পা চালিয়ে ঢুকে গেল সেটার ভেতরে৷ তখনই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল৷ আর ভয়াবহ ঝড়ও৷
.
.
ঘরের ভেতরটা খড়ের গাদায় ভর্তি৷ আর টুকটাক কিছু কেটে রাখা কাঠও আছে সেখানে৷ আকসাকে খড়ের গাদার ওপরে বসিয়ে দিলো মেজবাহ৷ এরপর নিজে ধপ করে বসে পরলো ওর সামনে৷ আকসা তখন ব্যাথায় কুকিয়ে উঠছে। মেজবাহ কাছে এগোলো ওর। ফোনের ফ্ল্যাশ চালু করে সালোয়ার কিছুটা ওপরে উঠিয়ে দিয়ে পায়ে কোথাও কেটেছে কিনা, সেটা পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত হলো৷ না, কাটেনি কোথাও। তাহলে মোচড় খেয়েছে বোধহয়। মেজবাহ ওর পায়েে ব্যাথা কমানোর জন্য পা ধরে উল্টোভাবে আরেক মোচড় দিতেই আকসা সহ্য করতে না পেরে মেজবাহ’র গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখে জোরে “আহ” শব্দ করে ব্যাথায় চিৎকার করে উঠলো৷ মেজবাহ সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চেপে ধরে দাঁত পিষে বললো, “আজেবাজে শব্দ কোরো না৷ আশেপাশে একটা জন্তু-জানোয়ার থাকলেও নেগেটিভ মাইন্ডে নিয়ে নেবে!”
আকসা ভ্রু কুঁচকে মেজবাহ’র ঈষৎ লাল মুখপানে চেয়ে রইলো৷ তখনই দূর থেকে ছেলেগুলোর গলার আওয়াজ শোনা গেল৷ জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে থ্রেট দিচ্ছে ওদের৷ যেখানেই থাকুক, বেরিয়ে আসতে বলা হচ্ছে। আকসা ভয় পেল। আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো মেজবাহ’র আধখোলা শার্টের কলার৷ ভয়ার্ত চাহনিতে চাইলো মেজবাহ’র দিকে৷ বোধহয় ভরসা চাইলো। মেজবাহ ওর ভয় কাটাতে আরো কিছুটা ঘনিষ্ঠ হলো৷ এমনভাবে কাছে টেনে নিলো, যেন আশ্বস্ত করতে চাইলো— আমার কাছে এভাবে থাকলে তোমার কিছুই হবে না৷ একটা হিংস্র পশুও তোমার একটা লোমও ছিঁড়তে পারবে না৷
ওকে ওভাবেই জড়িয়ে ধরে রেখে নিকষ কালো আঁধারে মেজবাহ পূর্ণ দৃষ্টি মেলে চাইলো আকসার দিকে। আকসার চোখে তখনও একরাশ ভয় – আতঙ্ক। এর কারণটাও দিনের আলোর মতো সম্পূর্ণ স্পষ্ট।
নোংরা মেঝেতে খড়ের গাদার মধ্যে আকসার ওড়নাটা পরে আছে। মেজবাহ’র বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ নজরে সেটা পরতেই এক থাবায় উঠিয়ে নিয়ে এলো। একটানে আকসাকে পেছনে ঘুরিয়ে নিল। আকসার পিঠ মিশলো মেজবাহ’র বুকের সাথে। মেজবাহ’র বুকের এই প্রথমবার শোনা হালকা ধুকপুকানির শব্দ যেন আকসার পিঠে জলতরঙ্গের ন্যায় বাজছে। অনুভব করতে পারছে ও।
ওড়নাটা ওর গায়ে পেঁচিয়ে দিলো মেজবাহ। দরজার কপাটে খট করে শব্দ হলো। মেজবাহ’র সতর্ক কর্ণকুহরে শব্দটা পৌঁছাতেই ও আকসার হাতের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সাথে আরো ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ধরে রেখে ফিসফিস করে বলল, “শীট! আকসা?”
আকসা মরা কন্ঠে জবাব দিলো— “হুঁ।”
“ভয় পেও না৷ আমি আছি তো।”
“বাঁচাতে এসেছেন কেন মেজবাহ?”
আকসা বিপরীতে অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটা করলে মেজবাহ কিছু মুহূর্ত স্তম্ভিত থেকে জবাব দেয়, “আ’ম নট শিওর। তবে তোমাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলে রেখে মেজবাহ ইফতেখার রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারতো না৷ এটুকু জেনে রাখো।”
“না! আপনি যদি আজ না বলেন, কেন আমাকে বারবার বাঁচান, আজও কেন বাঁচাতে এসেছেন; তাহলে আমি আপনার সাথে যাবো না। বরং, এখান থেকে উঠে স্বেচ্ছায় ওদের কাছে ধরা দেবো।”
আকসা জেদ ধরলো হঠাৎ। মেজবাহ চোয়াল শক্ত করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। আকসা তখন জবাবের আশায় অধীর হয়ে বসে আছে। তবে কোনো জবাব না পেয়ে ওর জেদ এবার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হলো। ও উঠে দাঁড়িয়ে বললো, “যাচ্ছি তাহলে!”
আকসা পা বাড়াতেই মেজবাহ ওর হাত ধরে একটানে নিজের কোলের ওপরে ফেলে দিলো। টাল সামলাতে না পেরে আকসা ওর গলা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে হালকা খোঁচা দাঁড়িতে মুখ লেপ্টে পরে রইলো। মেজবাহ ওর কোমরে হাত রেখে অপর এক হাতে আকসার মুখ তুলে সামনে ধরলো৷ ফোনের ফ্ল্যাশ তখন খড়ের গাদার মধ্যে পড়ে আছে। আলোটা ঠিক আসছে না৷ সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে থাকা কক্ষের মধ্য থেকে মেজবাহ’র দৃঢ় তেজী কন্ঠস্বর শোনা গেল— “কারণ তুই আমার। শুধু আমার! তুই পুরোটাই আমার! সুতরাং, তোর সেফটির দায়িত্বও আমার। মেজবাহ ইফতেখার তোকে এখানে মরার জন্য ফেলে রেখে যাবে ভেবেছিস? আর তোর ইজ্জতে হাত দেওয়া মানে কী জানিস? মেজবাহ ইফতেখারের কলিজায় হাত দেওয়া! কথাটা মাথায় রাখিস!”
#চলবে
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৩১ [স্পেশাল পর্ব!]
-
সীমান্তরেখা পর্ব ২০
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৩
-
সীমান্তরেখা পর্ব ২২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১১
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৫
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৮
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৪
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৯