Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭০


সোফিয়া_সাফা

ফিরে দেখা অতীত <৮>

(A/N: পুরোটা পর্বের সংলাপ গুলো স্প্যানিশ ভাষায় হলেও বোঝার সুবিধার্থে বাংলায় লেখা হলো)

​ওটির বাইরের করিডোর জুড়ে এক ভারী নিঃশব্দতা বিরাজ করছে। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। চেয়ারে শরীর ছেড়ে দিয়ে বসে আছে লুহান; প্রতিটি সেকেন্ড কাটছে যেন এক-একটি বছরের মতো।
উদ্যানও বসে আছে ঠিক পাশের চেয়ারটায়। অনি আর সোহম দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। উদ্যানের গম্ভীর মুখখানা দেখে তারা আর ফিরে যাওয়ার কথা তোলার সাহস পায়নি।

আরো কিছুক্ষণ প্রতিক্ষায় থাকার পর ওটির দরজার ওপরের লাল আলোটা নিভে গেল। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার। লুহান ছিটকে উঠে দাঁড়াল। টলটলে পায়ে এগিয়ে গেল ডাক্তারের দিকে, তার কণ্ঠস্বর কাঁপল আতঙ্কে।
​“ডাক্তার, আমার বোন… এঞ্জেল কেমন আছে? ও কি খুব কষ্ট পাচ্ছে? আমি কি একটু ওর কাছে যেতে পারি?”

ডাক্তার কোনো উত্তর দিলেন না। ধীরস্থিরভাবে মুখের সার্জিক্যাল মাস্কটা খুলে নিলেন। তার ক্লান্ত দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ। এই নীরবতা লুহানের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। অবশেষে ডাক্তার বিড়বিড় করে বললেন, “আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছি।”

একটু থেমে তিনি আবারও বললেন, “স্কিন গ্রাফটিং চলাকালীন হঠাৎ তার অবস্থা খারাপের দিকে যেতে শুরু করে। পোড়া জায়গা থেকে ইনফেকশন অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছিল। একপর্যায়ে সে সেপটিক শকে চলে যায় এবং…”

লুহানের মনে হলো পায়ের তলা থেকে মাটিটা মুহূর্তেই ধসে গেছে। পৃথিবীটা তার চোখের সামনে দুলতে শুরু করল। ডাক্তার মাথা নাড়লেন; কণ্ঠটা আরও নিচু হয়ে এলো তার, “আই’ম সরি, উই কুড’নট সেইভ হার।”

ডাক্তার চলে গেলেন, কিন্তু লুহান সেখানে স্থির দাঁড়িয়ে রইল না। অসার হয়ে সে করিডোরের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরোলো, “কী বললেন? আমার এঞ্জেল… আমার এঞ্জেলকে বাঁচাতে পারেন নি?”

অনি ছুটে এসে তাকে সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু লুহান ততক্ষণে ভেঙে পড়েছে। সোহম চলে গেল এঞ্জেলকে মর্গে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে।

“এঞ্জেল, তুই এভাবে চলে যেতে পারিস না। তুই তো বাঁচতে চেয়েছিলি এঞ্জেল। আমি তোকে হারাতে পারবো না বোন। ফিরে আয় প্লিজ। আমি তোকে নিজের কাছে রাখবো, তোকে কারো কাছে থাকতে হবে না। তোর ভাই তোকে অনেক ভালো রাখবে।”

এঞ্জেলকে যখন স্ট্রেচারে করে বের করে আনা হলো, লুহান উন্মাদপ্রায় হয়ে সেদিকে দৌড়ে গেল। কাপড়ের ওপর দিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও সে থমকে গেল। জড়িয়ে ধরতে পারল না; এঞ্জেল ব্যাথা পাবে এটা ভেবে।

“এঞ্জেল! এঞ্জেল আমি ভয় পাচ্ছি। তুই কেন এমন করছিস? তুই না আমার কাছে থাকতে চেয়েছিলি, আমি তখন তোকে রাখতে পারি নি। কিন্তু এখন রাখবো তো… তোর ভাই রাখবে তো তোকে। আমি তোকে শপিং মলে নিয়ে যাবো—অনেক গুলো ড্রেস কিনে দেবো।”

লুহানের কণ্ঠ বুজে এল কান্নায়, তবুও সে আর্তনাদ করে চলল, “তুই না সবসময় জিজ্ঞেস করতি, তুই এঞ্জেল হলে ডানা নেই কেন? আমি তোকে ডানা কিনে দেবো। তুই মন খুলে উড়ে বেড়াবি। এই এঞ্জেল! তুই তো এঞ্জেল। এঞ্জেল কেন মরে যাবে? এঞ্জেলরা কি মরে যায়? যায় না তো! তাহলে আমার এঞ্জেল কেন ম`রে যাবে?”

পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা উদ্যানের চোখ লালবর্ণ ধারণ করল। হঠাৎই সে বুকের বাঁ পাশটা শক্ত হাতে খামচে ধরল। শ্বাস প্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে এল তার। চোখের সামনে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল ফেলে আসা দিনগুলো। যেদিন সে প্রথম জানতে পেরেছিল তার মা প্রেগন্যান্ট, তারপর তাদের মৃত্যু। বাবার ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট; সবকিছু যেন আগুনের মতো তাকে গ্রাস করতে চাইল।

কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই একটা ভারী কিছু পতনের শব্দ হলো—‘ঠাস!’ অনি চমকে পেছনে তাকাতেই তার কলিজা শুকিয়ে গেল। চিৎকার করে উঠল সে, “তেহ!”

লুহানকে ছেড়ে দিয়ে অনি দৌড়ে গেল উদ্যানের কাছে। ততক্ষণে উদ্যান জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। অনি লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে উদ্যানকে ইমার্জেন্সিতে নেওয়ার ব্যবস্থা করল।

প্রায় দুই ঘণ্টা পর উদ্যানের চোখের পাতা কাঁপল, আধবোজা চোখে তাকিয়ে দেখল—সোহম, অনি আর লুহান তার শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। উদ্যানের চেতনা ফিরেছে দেখে উপস্থিত ডাক্তার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি অতি সন্তর্পণে উদ্যানের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্কটা সরিয়ে দিলেন। শান্ত গলায় বললেন, “ওনার হার্টবিট আচমকাই একদম স্লো হয়ে গিয়েছিল। প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা পেয়েছিলেন হয়তো। মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনে সাময়িক বিঘ্ন ঘটায় উনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন।”

অনি উদ্বেগের সাথে জানতে চাইল, “চিন্তার কিছু নেই তো ডাক্তার?”

ডাক্তার রিপোর্টগুলো আরেকবার খুঁটিয়ে দেখে আশ্বস্ত করলেন, “তেমন কোনো কিছু ধরা পড়েনি। শুধু কয়েকদিন একটু বিশ্রামে থাকবেন।”

কথাটা শেষ হতে না হতেই উদ্যান ঝটকা দিয়ে উঠে বসল। আলুথালু চুলে একবার হাত বুলিয়ে কোনো কথা না বলে বড় বড় পা ফেলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল সে। ডাক্তার হতভম্ব হয়ে গেলেও বাকিরা নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করল।
,
,
,
চার্চে ফাদারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে লুহান আর অনি। পাশে সোহম ও উদ্যান। লুহানকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছে অনি। ছেলেটা এখন কাঁদছে না, কেবল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনেই কাঠের কফিনের মধ্যে শুইয়ে রাখা হয়েছে এঞ্জেলকে। গায়ে তার ফেইরি ড্রেস। ঝলসে যাওয়া গায়ে শুভ্র ড্রেসটা বড্ড বেমানান দেখাচ্ছে।

লুহান একবার ভেবেছিল মাকে কল করবে। পরক্ষণেই বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মাকে বিরক্ত করে আর কী হবে? এতোদিনে সে অনেকবার লুকিয়ে লুকিয়ে এসেছিলেন এঞ্জেলকে দেখতে। তার নতুন স্বামী একদমই চান না স্ত্রীর কোনো পিছুটান থাকুক। আর লুহানের মাও চান না আবারও ডিভোর্সি হতে। এঞ্জেলের চিকিৎসার খরচ এতোদিন তাদের বাবাই দিচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ ক’টা দিন লুহান তাকে অনেকবার কল করার পরেও তিনি রিসিভ করেন নি। এমনকি নম্বরটা ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দিয়েছিলেন তখনই লুহান বুঝে গিয়েছিল; রক্তের সম্পর্কের শেষ সুতোটাও ছিঁড়ে গেছে। তারা এখন আক্ষরিক অর্থেই অনাথ।

প্রার্থনা শেষে এঞ্জেলকে নিয়ে যাওয়া হলো কবরস্থানে। যখন কফিনটা গর্তের ভেতর নামানো শুরু হলো, তখন আর লুহান নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। পাগলের মতো আর্তনাদ করে বাধা দিতে চাইল।
“না! এঞ্জেল কীভাবে থাকবে ওখানে? আমার বোনটা অন্ধকারে ভয় পাবে না?”

উদ্যান দৃশ্যটা সহ্য করতে পারল না। সে দ্রুত পায়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে অন্যদিকে চলে এল। একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দিল সে; ধোঁয়ার আড়ালে লুকাতে চাইল নিজের অস্থিরতা। ওদিকে উন্মাদপ্রায় লুহানকে জাপ্টে ধরে রাখতে সোহম আর অনির অবস্থাও তখন নাজেহাল।
,
,
,
এঞ্জেল চলে গেছে পাঁচ বছর হতে চলল। এই পাঁচটি বছরে উদ্যানকে নিংড়ে জন্ম নিয়েছে এক অনুভূতিহীন দানব। চব্বিশ বছরের উদ্যান এখন আর সেই দিশেহারা তরুণ নয়; সে এখন মেক্সিকোর অন্ধকার জগতের এক উদীয়মান নক্ষত্র। তাদের গড়া ‘সোলার সার্কেল’ মূলত ‘ব্ল্যাক সার্কেল’-এর একটি সাব-ইউনিট হলেও, পুরো মেক্সিকোতে এখন এটি এক ত্রাসের নাম। বিখ্যাত নয়, বরং কুখ্যাত হিসেবেই এর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে দাবানলের মতো।

বর্তমানে উদ্যান এই এলাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর একচ্ছত্র অধিপতি। সে এখন একজন ডিস্ট্রিবিউশন কাপো। প্রতিটি মিশনে প্রায় নিখুঁত সাফল্য আর নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের অসাধারণ ক্ষমতার কারণে কার্টেল বসদের নজর এখন তার ওপর। মেক্সিকোর অগণিত কার্টেলের ভিড়ে ব্ল্যাক সার্কেল প্রথম সারির হলেও, অন্যান্য বড় দলগুলোও উদ্যানকে নিজেদের ডেরায় টানার জন্য মরিয়া। অনেকে তাকে ‘সেগুন্দো’ বা সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হওয়ার টোপও দিয়েছে। কিন্তু উদ্যানের উত্তর সবসময়ই ছিল সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি; সেটা হলো, ‘নো।’ সে নিজেই যেখানে বিশ্বাসঘাতকদের ঘৃণা করে সেখানে সে নিজেই কীভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবে?

সন্ধ্যার আবছা আলোয় উদ্যান নিজের ঘরে ছিল। সবেমাত্র শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে সে। একদিকে ভার্সিটির পড়াশোনা, অন্যদিকে কাজ; দুটো দিক সামলাতে গিয়ে তার শরীর আর মস্তিষ্ক ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে যায়। ঠিক তখনই সোহম ঘরে ঢুকে উত্তেজিত গলায় বলল, “তেহ, তুই জানিস কে এসেছে?”

তখনো ক্লান্তিতে উদ্যানের চোখ বুজে আসছিল। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কে এসেছে? মেক্সিকোর প্রাইম মিনিস্টার নাকি?”

সোহম চোখ বড় বড় করে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, “মজা করছি না রে! এল সেগুন্দো এসেছে। তাও আবার কোনো আগাম বার্তা না দিয়ে!”

উদ্যানের হাতটা থেমে গেল। সোহম তার কাঁধ ধরে ঝাকুনি দিল, “কী রে! তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।”

উদ্যান খুব একটা আমলে নিল না। গায়ের শার্টটাই ঠিক করতে করতে ড্রইংরুমের দিকে হাঁটা ধরল। সোহম পেছন থেকে প্রায় অসহায় কণ্ঠে বলল, “আরে বাবা, ওমন ক্যাজুয়াল লুকেই যাবি নাকি? ওটা এল সেগুন্দো!”

উদ্যান কোনো কথা না বলে ড্রইংরুমে পা রাখল। দেখল সোফায় বসে এক ব্যক্তি খুব সূক্ষ্ম নজরে চারপাশটা জরিপ করছে। লোকটা উদ্যানের চেনা; পুরো গ্যাং-এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, ‘এল সেগুন্দো’। এর আগে অনেকবার বিভিন্ন পার্টি বা বারে তার সাথে দেখা হয়েছে। কিন্তু এভাবে হুট করে ব্যক্তিগত পরিসরে হানা দেওয়ার কারণটা কী?

উদ্যান তার দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজেও আশেপাশে তাকাল। তাকে সামনে দেখে এল সেগুন্দো উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন, “হ্যালো হার্দিন, কেমন আছো?”

​উদ্যান করমর্দন করল ঠিকই কিন্তু তার কণ্ঠে বাড়তি কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেল না, “নট ব্যাড। আপনি?”

“ভালো কীভাবে থাকি বলো, তুমি তো থাকতেই দিচ্ছো না।”

উদ্যান প্রত্যুত্তরে টেবিলে রাখা ট্রে থেকে এক গ্লাস টেকিলা তুলে নিয়ে এল সেগুন্দোর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “সে কী! আমি তো জানতাম আমরা একে অপরের হিতাকাঙ্ক্ষী। এখন তো উল্টোটা মনে হচ্ছে।”

সেগুন্দো অবাক চোখে তাকালে উদ্যান আবার বলল, “যারা আমাদেরকে ভালো থাকতে দেয়না, তাদের তো আমরা শত্রুর নজরেই দেখি, তাই না?”

এল সেগুন্দো সশব্দে হেসে উঠল, “আরে না না! তোমাকে শত্রুর নজরে দেখব? মাথা খারাপ নাকি?”

​উদ্যান নিজে সোফায় বসে তাকেও বসতে ইশারা করল। লোকটা বসতেই উদ্যান সরাসরি কাজের কথায় উপনীত হলো, “তা বলুন ‘এল সেগুন্দো’, কোনো বিশেষ প্রয়োজন? নাকি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ?”

“আসার ইচ্ছে ছিল এমনিতেই, কিন্তু সাথে একটা জরুরি প্রয়োজনও জুড়ে গেছে।”

​“সে যাই হোক, একটা খবর দিয়ে আসতে পারতেন।”

এল সেগুন্দো একটু ঝুঁকে এসে তীর্যক হেসে বলল, “জানিয়ে এলে হার্দিনকে এভাবে পেতাম নাকি?”

উদ্যান কথা বাড়াল না। শুধু টেবিল থেকে টেকিলার গ্লাস তুলে নিজেও গলা ভিজিয়ে নিল।

এল সেগুন্দো সোজা হয়ে বসল, “এল হেফে তোমাকে ইনভাইট করেছেন, হার্দিন। আগামীকাল তোমার উপস্থিতি তার একান্ত কাম্য।”

মুহূর্তের জন্য উদ্যানের হাতের গ্লাসটা স্থির হয়ে গেল। পুরো মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ড যার আঙুলের ইশারায় চলে, সেই ‘এল হেফে’ তাকে ডেকেছেন? সে চকিত নয়নে তাকাতেই এল সেগুন্দো মুচকি হাসলেন, “তোমাকে এই প্রথম এতটা অবাক হতে দেখলাম। ভাগ্যিস নিজে এসে খবরটা দিয়েছি, নইলে এই এক্সপ্রেশনটা মিস হয়ে যেত।”

উদ্যান যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না, “এল হেফে… সত্যিই আমাকে ডেকেছেন?”

এল সেগুন্দো তার দিকে একটা কার্ড এগিয়ে দিল, “এই নাও ইনভাইটেশন লেটার। সশরীরে উপস্থিত থেকো।”

উদ্যান কার্ডটা হাতে নিল। পুরোটা পড়ে তারপরই নিশ্চিত হলো। এল সেগুন্দো উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আগে শেষবার বলল, “আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছো, ঠিক কীভাবে তুমি আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছো না।”

উদ্যান কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। শুধু উঠে দাঁড়িয়ে আরেকবার হাত মেলালো।

পরদিন সন্ধ্যার ঠিক পরপরই ‘THUNDER estate’-এর সুবিশাল লৌহফটকের সামনে এসে দাঁড়াল উদ্যান ও তার দল। বাংলোর আভিজাত্য আর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় দেখে এক মুহূর্তের জন্য যে কেউ থমকে যাবে। এল সেগুন্দো নিজেই এগিয়ে এসে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল। উদ্যানের নিজেরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে, স্বয়ং ‘এল হেফে’ তাদেরকে নিজের ব্যক্তিগত ডেরায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

অন্দরে পা রাখতেই দেখা গেল লিভিং রুমের বিশাল সোফায় বসে আছেন এল হেফে। সামনের টেবিলে ফাইলের স্তূপ, যেগুলোতে তিনি গভীর মনোযোগে চোখ বোলাচ্ছেন। লোকটার বয়স আন্দাজ করা কঠিন, তবে তার চেহারার অভিজ্ঞতা আর চাউনি বলে দিচ্ছিল তিনি পঁচানব্বইয়ের কোঠায় না হলেও পঞ্চান্নর গণ্ডি অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছেন।

এল হেফেকে কাজে নিমগ্ন দেখে উদ্যানরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর তিনি মুখ তুলে তাদের দিকে তাকালেন এবং সোজা হয়ে বসলেন। উদ্যান এক কদম এগিয়ে গিয়ে বিনম্র কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “শুভ সন্ধ্যা, এল হেফে।”

এল হেফে সামান্য মাথা নাড়িয়ে তাদের বসতে ইশারা করলেন। সামনে থাকা রাজকীয় কফির মগটা হাতে নিয়ে তিনি বেশ সহজ ভঙ্গিতেই শুরু করলেন, “হার্দিন, আমি তোমার সোলার সার্কেলের ওপর গত কয়েকদিন ধরে নজর রাখছি। সত্যি বলতে, তোমাদের কাজের ফলাফল খুবই ইমপ্রেসিভ।”

উদ্যান কেবল সংক্ষেপে জবাব দিল, “ধন্যবাদ।”

“এটা আমাদের ফার্স্ট মিট-আপ রাইট? কেমন অনুভব করছো তুমি? আর ইউ ফিলিং নার্ভাস?”

উদ্যান শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “নার্ভাস নই, এল হেফে। বরং আপনার মতো একজন মানুষের সামনে বসার সুযোগ পেয়ে আমি অভিভূত। ইটস ওয়ান অফ দ্য বেস্ট ডে অফ মাই লাইফ।”

উদ্যানের উত্তরের পরিপক্বতা দেখে এল হেফে খুশি হলেন। তিনি সেগুন্দোর মুখে শুনেছেন উদ্যান স্বল্পভাষী। যে কথা কম বলেও অনেক বড় বড় কাজ নির্বিঘ্নে করে ফেলতে পারে। এল হেফের একটা ইশারায় দুজন মেইড ট্রে হাতে এগিয়ে এল। একজনের কাছে সফট ড্রিংকস, অন্যজনের কাছে হার্ড ড্রিংকস। উদ্যান শান্তভাবে সফট ড্রিংকসের গ্লাসটা তুলে নিল, যা দেখে অনি, লুহান ও সোহমও তাকে অনুসরণ করল।

​“ডোন্ট ইউ লাইক টেকিলা?” এল হেফে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন।

​উদ্যান বিনয়ের সাথে উত্তর দিল, “অ্যাকচুয়ালি আই লাইক টেকিলা বাট ইটস আ গেসচার। আমি চাই না আপনার সাথে কথা বলার সময় সামান্যতম ড্রাংক হয়ে যেতে।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এল সেগুন্দো অলক্ষ্যে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উদ্যানের ব্যক্তিত্ব যেভাবে এল হেফেকে প্রভাবিত করছে, তাতে তার নিজের পদমর্যাদা নিয়ে সে শঙ্কিত।
এল হেফে উদ্যানের বাচনভঙ্গি দেখে ইমপ্রেস হলেন। ছেলেটার মাঝে যেন আলাদাই একটা ব্যাপার স্যাপার আছে। কিছু তো একটা আছে, কেন ছেলেটার চারপাশের বাতাবরণ এতোটা ইনটেন্স?

“তুমি কি বিশেষ দুজনের সাথে পরিচিত হতে চাইবে হার্দিন?” এল হেফের প্রশ্নে উদ্যান কৌতূহলী চোখে তাকাল, “অবশ্যই, এল হেফে।”

ইশারা পাওয়া মাত্রই একজন মেইড ওপরের তলায় গেল। মিনিট দুয়েকের মাথায় একই রকম দেখতে দুজন যুবক সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। জমজ হলেও তাদের ফ্যাশন সেন্স আর অভিব্যক্তিতে ছিল আকাশ-পাতাল তফাত। একজনের ঠোঁটে লেগে আছে অমায়িক হাসি, অন্যজনের মুখে রাজ্যের বিরক্তি; যেন কাঁচা ঘুমে কেউ ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।

তারা পাশে এসে দাঁড়াতেই এল হেফে পরিচয় করিয়ে দিলেন, “মিট দেম। মাই সনস, রিদম অ্যান্ড রিহান।”

রিদম সহাস্যে উদ্যানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “উনিই হার্দিন, তাই না পাপা?”

​উদ্যান আড়চোখে একবার রিদমের আঙুলের দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। এল হেফে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি চিনলে কী করে?”

“এল সেগুন্দোর বাড়িতে সেদিন যে পার্টি হলো না? সেদিন আমি ওনাকে দূর থেকে দেখেছিলাম।” রিদম বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল।

“ঠিক আছে, পরিচিত হয়ে নাও গিয়ে।” বাবার অনুমতি পেয়ে রিদম দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে হাত মেলাল প্রত্যেকের সাথে। রিহানও অনিচ্ছাসত্ত্বেও পেছনে পেছনে এল। পরিচয় পর্ব শেষ করে সবাই সোফায় আসন গ্রহণ করার পর পরিবেশটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল।

এল হেফে এবার কাজের কথায় এলেন, “তোমাদের ডাকার পেছনে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। আমি তোমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিশনে পাঠাতে চাই।”

রিদমের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। এসব মিশন ফিশনে যে সে আগ্রহী নয় সেটা স্পষ্ট। বাকিরা মনোযোগ দিলেও রিহান কেবল তার বাবার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে রইল। তাদের বাবা একজন কাপোর সাথে মিশনে পাঠাতে চাইছে, ব্যাপারটা তার ইগোতে লেগেছে।

এল হেফে বুঝিয়ে বললেন, “তোমাদের নরওয়ে যেতে হবে। এটা কোনো বড় টাস্ক নয়, তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের লক্ষ্য থাকবে রিভেল গ্যাং, অ্যাটেনশন ও আইনি ঝামেলা এড়িয়ে প্যাকেজ সেইফলি ডেলিভার করা। আন্ডারস্ট্যান্ড?”

উদ্যান সোজা হয়ে বসে সাবলীল কণ্ঠে জবাব দিল, “আন্ডারস্টুড।”

​“চমৎকার। আগামীকাল রাতেই তোমাদের ফ্লাইট।”

এল হেফে মিশনের খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দেওয়ার পর উদ্যান তার দল নিয়ে ‘থান্ডার এস্টেট’ ত্যাগ করল। কিন্তু লিভিংরুমে রয়ে গেল এক থমথমে অস্বস্তি। রিহান তখনও তার বাবার সামনে বসে ছিল। রিদম আঁচ করতে পারছিল, রিহান যেকোনো মুহূর্তে এক পশলা তর্কের ঝড় তুলবে। সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো; রিহান হঠাৎ ফেটে পড়ল, “আর ইউ সিরিয়াস পাপা? তুমি ওই সাধারণ কাপোটার সাথে আমাদের মিশনে পাঠাবে?”

এল হেফে যার নাম মিস্টার ট্রুয়েনো। ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবারও নিজের নথিপত্রে মনোনিবেশ করলেন। শান্ত গলায় বললেন, “কেন, তুমি কি একা যেতে চাইছো? চাইলে যেতেই পারো। নিজেদের কাজ নিজেরা করাই ভালো, কি বলো?”

বাবার এমন সপাটে উত্তরে রিহান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, “আমি সেটা বলতে চাইনি। বলতে চেয়েছি, আমাদের যাওয়ার দরকার কী? ওরাই যাক!”

“কেন, কাজটা কি শুধু ওদের? তোমার কোনো আইডিয়া আছে, এই প্যাকেজটা সঠিক ভাবে ডেলিভার করতে পারলে আমাদের কতোটা প্রফিট হবে?”

“মানলাম পাপা যে কাজটা আমাদেরও। তাই বলে কি সশরীরে মিশনে অংশ নিতে হবে? বাই অ্যানি চান্স আমাদের যদি কিছু হয়ে যায়? আর ওই কাপোটাই যে পেছন থেকে ছুরি মারবে না সেটাই বা কে বলতে পারে?”

ছেলের এহেন যুক্তি ট্রুয়েনোকে বিরক্ত করে তুলল। রিদম পরিস্থিতি সামলাতে মাঝপথে কথা বলতে চাইল, “পাপা তো জেনে-বুঝেই যেতে বলছে, হান। তুই কেন অতিরিক্ত ভাবছিস?”

“তুই তো চুপই থাক রিদ। আমি সিওর ওই কাপোটা ইচ্ছা করেই আমাদেরকে বিপদে ফেলে দেবে। আরে আমরা না থাকলেই তো ওর সবচেয়ে বেশি লাভ। কার্টেল বস হওয়ার পথটা সহজ হয়ে যাবে ওর জন্য।”

ট্রুয়েনো তপ্তশ্বাস ফেললেন। দুটো ছেলের একটাকেও তিনি মনের মতো গড়তে পারেন নি। এটা হয়তো তারই ব্যর্থতা। তিনি শক্ত গলায় বললেন, “তোমার সত্যিই মনে হচ্ছে ওর কার্টেল বস হওয়ার পথে তোমরা দুজন সবচেয়ে বড় বাধা?”

“হ্যাঁ অবশ্যই, তোমার ছেলে আমরা। ভবিষ্যতে বস তো আমাদের মধ্যে থেকেই একজন হবে। সেটা কি ও জানে না? সেক্ষেত্রে আমাদেরকে মে’রে ফেলে নিজের পথটা কেন ক্লিয়ার করে রাখতে চাইবে না?”

“আমার মনে হচ্ছে তুমি খুব বেশিই ভয় পেয়ে যাচ্ছো হান। এতোটা ভয় নিয়ে তুমি কীভাবে ভবিষ্যতে বস হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করছো? যেই তুমি নিজের লাইফ নিয়েই দ্বিধাগ্রস্থ সেই তুমি কীভাবে পুরো গ্যাংকে নিরাপত্তা দেবে? আমার তো মনে হচ্ছে তুমি কার্টেল বস হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পরের দিনই অন্য কোনো রিভেল গ্যাং হামলা করে বসবে আমাদের টেরিটোরিতে।”

রিহান স্তম্ভিত হয়ে গেল, “পাপা! তুমি এসব কী বলছো?”

“ভুল কী বললাম? নিজের দলের একজন কাপোকে তুমি এত ভয় পাচ্ছো, তাহলে শত্রুদের সামনে টিকবে কীভাবে? আমার তো মনে হয়, তুমি ভয়ে আমাদের মিত্রদের সাথেও বসে কথা বলতে পারবে না। শোনো রিহান, বস হওয়ার জন্য শুধু বেঁচে থাকাটাই যথেষ্ট নয়; তার জন্য চাই দুঃসাহস, প্রখর বুদ্ধি আর ইস্পাতকঠিন চিত্ত।”

রিহান পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে গেল। ট্রুয়েনো থামলেন না, “আমি চাই তোমরা এই গুণগুলো আয়ত্ত করো। সেই জন্য মিশনে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমি এটা বলছি না যে আমাদের গ্যাং-এর কাপো বলেই তুমি একদম নিশ্চিন্তে থাকবে কিংবা সব কাজ তার ওপর ছেড়ে দিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবে। ভবিষ্যতে যদি ‘এল হেফে’ পদবি অর্জন করতেই চাও তাহলে আগে যোগ্যতা অর্জন করো। কাপোকে তুমি পরিচালনা করবে; আশা করি। কারণ সেটাই নিয়ম। আর এটাই তোমাদের টাস্ক।”

রিদমের চোখেমুখে ঘোর লাগলেও রিহানের হাতের মুষ্টি রাগে সাদা হয়ে এল। তার কাছে বাবার এই যুক্তিগুলো প্রহসন মনে হলো। এটা কেমন কথা? উত্তরাধিকার সূত্রে ভবিষ্যতে তারাই তো কার্টেল বস হওয়ার যোগ্য। আবার আলাদা করে কেন এতো বিচিত্র বিচিত্র যোগ্যতা অর্জন করতে হবে?

“হান! উল্টো পালটা চিন্তা করা বন্ধ করো। তোমাদের কোনো ক্ষতি হলে হার্দিনও পার পাবেনা সেই বিশ্বাস রাখো পাপার প্রতি।”

রিহান ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “ইয়ার্কি করছো পাপা? আমাদের কোনো ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর ওকে মে’রে ফেললেও বা আমাদের কী লাভ হবে?”

ট্রুয়েনো উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “তোমরা যদি নিজেদের নিরাপত্তাটুকুও নিশ্চিত করতে না পারো, তবে সেই ব্যর্থতা শুধুই তোমাদের।”

“হ্যাঁ পাপা আরও কিছু বলে বুঝিয়ে দিতে হবে না যে আমরা ম’রে গেলেও তোমার কিছুই যাবে আসবে না।” তীব্র অভিমানে কথাটি ছুড়ে দিয়ে রিহান নিজের ঘরের দিকে রওনা হলো। কথাটা শুনে ট্রুয়েনোর খারাপ লাগল। তিনি পিছু ডাকলেন, “ঠিক আছে, তোমাদের একেবারেই মন না চাইলে যেতে হবে না।”

রিদম এবার ধীর গলায় বলল, “রিহান না গেলেও আমি যাব পাপা। হার্দিনকে দেখে আমি কোনো নেগেটিভ আভাস পাইনি। বরং ওনার চারপাশটা পজেটিভ এনার্জিতে ভরপুর।”

রিহান পিছু না ঘুরেই শক্ত গলায় বলল, “আমিও যাবো।”

ছেলের জেদ দেখে ট্রুয়েনোর ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল, “ব্রেভো! তাহলে এই প্রজেক্টের জন্য একটা মাস্টারমাইন্ড প্ল্যান তৈরি করে ফেলো। আমি চাই মিশনটা তোমাদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হোক।”

রিহান এবার পিছু ফিরে দাঁত চেপে হেসে বলল, “তাহলে ওরা কি স্রেফ তামাশা দেখতেই সঙ্গে যাবে পাপা?”

“আমি বলেছি তোমরা ‘পরিচালনা’ করবে। মানে মাস্টারমাইন্ড হবে তোমরা, আর ওরা হবে সেই প্ল্যানের এক্সিকিউটর। তোমাদের নির্দেশ অনুযায়ী ওরা কাজ করবে।”

​রিহান একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। রিদম মিনমিনিয়ে বলল, “আমি কোনো প্ল্যান ট্যান করতে পারবো না পাপা। রিহান আর আমি মিলে যে করবো তাও রিহান রাজি হবে না।”

ট্রুয়েনো ক্লান্ত হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন, “ইটস ওকে।”

পরদিন বিকেল।
‘থান্ডার এস্টেট’-এর বিশাল কনফারেন্স হলে এক থমথমে পরিবেশ। রাজকীয় ঝাড়বাতির আলোয় হলের ভেতরটা চকচক করছে। উদ্যান তার দলের বাকিদের নিয়ে নির্ধারিত আসনে বসল। কিছুক্ষণ পর এল হেফে ট্রুয়েনো গম্ভীর গলায় ঘোষণা করলেন, “ব্রিফিং শুরু করা যাক।”

উদ্যান উঠে দাঁড়িয়ে নিজের তৈরি করা ছকটা সবার সামনে তুলে ধরতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে ট্রুয়েনো বললেন, “রিহান, তুমি প্ল্যাটফর্মে গিয়ে সবাইকে তোমার প্ল্যানটা বুঝিয়ে বলো।”

রিহান একবার উদ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখল উদ্যানও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। বিপরীতে সে মুখ বাকিয়ে প্লাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালো এবং খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের পরিকল্পনাটি ব্যাখ্যা করতে শুরু করল। রিহানের কথা শেষ হওয়ার পর ট্রুয়েনো কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। তার চোখে কোনো সন্তুষ্টি নেই তবুও তিনি তা প্রকাশ করলেন না।
“প্ল্যানটা খারাপ নয়, কারো কিছু বলার আছে?”

চেয়ার সরিয়ে ধীরস্থিরভাবে উঠে দাঁড়াল উদ্যান। “আমি কিছু বলতে চাই, এল হেফে।”

​ট্রুয়েনো হালকা করে মাথা নাড়তেই উদ্যান রিহানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। একবার আড়চোখে তার দিকে তাকিয়েই উদ্যান ড্রয়িং বোর্ডে মার্কার টানল। “এই প্ল্যানে বেশ কয়েকটা হোল আছে।”

উদ্যান একে একে কাটাছেঁড়া শুরু করল; কোথায় টাইমিং মিসম্যাচ হতে পারে, কোন পয়েন্টে পুলিশের কড়া নজরদারি থাকে, আর কোথায় গিয়ে রিভেল গ্যাং তাদের ঘিরে ফেলতে পারে। যার দরুন রিহানের মুখের গড়ন শক্ত হয়ে উঠল। সবশেষে উদ্যান নিজের বিকল্প প্ল্যানটা সংক্ষেপে তুলে ধরল।
​পুরো হলে পিনপতন নীরবতা। ট্রুয়েনো বুঝলেন, অভিজ্ঞতায় আর বুদ্ধিতে উদ্যান তার ছেলের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে।

রিহান চোখ কটমট করে চেয়ে ছিল বাবার দিকে। ট্রুয়েনো পড়ে গেলেন দোটানায়। এই প্রথম রিহান কোনো মিশনে অংশ নিচ্ছে, আবার নিজে প্ল্যানও বানিয়েছে। এখন তিনি যদি সেটার মূল্যায়ন না করেন, তবে পরবর্তীতে রিহান কি আর কোনো মিশনে পার্টিসিপ্যান্ট করতে চাইবে? অনেক ভেবেচিন্তে তিনি বললেন, “আমরা রিহানের প্ল্যানটাই ফলো করব।”

তার কথা শুনে রিহানের ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। বাকিরা বেশ নারাজ হলো। উদ্যান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। যেন কিছুই হয়নি। সে গিয়ে নিজের সিটে বসে পড়ল।

নিরাপত্তার খাতিরে ব্যক্তিগত জেটের বদলে তারা সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে নরওয়ের ফ্লাইট ধরল। এটি ছিল উদ্যানের দেওয়া একমাত্র পরামর্শ যা ট্রুয়েনো গ্রহণ করেছিলেন।
গাড়িতে ওঠার তোড়জোড় চলছিল, রিহান আগে ভাগেই ফ্রন্ট সিটে উঠে বসে পড়েছে। উদ্যান বাকিদের নিয়ে এগোচ্ছিল তখনই ট্রুয়েনো নিভৃতে তার কাঁধে হাত রাখলেন, “রিদম আর রিহানের নিরাপত্তার দায়িত্ব কিন্তু তোমার ওপর, হার্দিন। আশা করি আমার কথাটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছ।”

অনি, সোহম আর লুহান মনে মনে প্রচন্ড বিরক্ত হলো। একে তো উদ্যানের প্ল্যানটা বেস্ট হওয়ার পরেও তিনি গুরুত্ব দেন নি, তার ওপর আবার নিজের ছেলেদেরকেও মাথার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।

উদ্যান ছোট করে বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না এল হেফে, আমি ওনাদের সেইফলি ফিরিয়ে আনবো।”
,
,
,
ওসলো গার্ডেনমোয়েন এয়ারপোর্টে যখন তাদের ফ্লাইট ল্যান্ড করল, তখন ঘড়িতে স্থানীয় সময় ২০টা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখা গেল দিগন্তজোড়া শুভ্র তুষারপাত আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরোতেই দেখা গেল রিহান আগে থেকেই গাড়ি ঠিক করে রেখেছে। দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তিতে সবার শরীর তখন ভেঙে আসছিল। গাড়িতে উঠে রিহান যখন ম্যাপে লোকেশন সেট করছিল তখন উদ্যানের খটকা লাগল। সে আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করল, “আমরা হোটেলেই যাচ্ছি তো নাকি?”

রিহান পেছনের সিটে বসা উদ্যানের দিকে ফিরে রহস্যময় হাসল। তারপর ম্যাপে লোকেশন সেট করে দিতে দিতে বলল, “না! আমরা সরাসরি ডেলিভারি কমপ্লিট করতে যাচ্ছি।”

গাড়ির ভেতর সবাই চমকে একে অপরের দিকে তাকাল। উদ্যান এবার বেশ কঠোর গলায় বলল, “এতো তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না। আমরা এখন হোটেলে উঠি তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে আগামীকাল ১০ টা বাজে রওনা হবো।”

রিহান মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আমি যা বলবো তাই হবে। বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন নেই আমার। কেননা আমি তোমাদের মতো দুর্বল নই ওকে? আর তুমি হয়তো জানো না এই মাসে এখানে ২৪ ঘন্টাই রাত থাকে।”

“আমি ১০ টা বাজে যাবো বলেছি, সকালে যাবো তা তো বলিনি। আর তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো তোমার প্ল্যানেও হোটেলে থাকার কথাটা উল্লেখ ছিল।”

“হুম ছিল। আর আমি লক্ষ্য করেছিলাম তোমার প্ল্যানেও এটাই ছিল। তাই আমি প্ল্যান চেঞ্জ করে ফেলেছি।”

উদ্যানের চটে গেল। দাঁত চেপে বাংলায় বিড়বিড় করে উঠল সে, “গবেট কোথাকার! তোর মাথায় আদৌ ব্রেন বলতে কিছু আছে? নাকি পুরোটাই গোবর দিয়ে ভর্তি!”

রিহান ভ্যাবাচেকা খেয়ে চেয়ে রইল। সে বাংলা বোঝে না ঠিকই, কিন্তু উদ্যানের গলার সুরটা তার মোটেই ভালো লাগল না। “তুমি আমাকে বকা দিলে, তাই না? কোন ভাষায় বকা দিয়েছো? ওয়েট আমি পাপাকে এক্ষুণি কল দিয়ে বলছি।”

অনি পরিস্থিতি সামলাতে জোর করে দাঁত বের করে হাসল, “আরে না না রিহান! ও তোমাকে বকা দেয়নি। ও বলেছে তুমি আসলেই দারুণ বুদ্ধিমান, যা বলবে তাই হবে!”

সোহম মুখ টিপে হাসল ঠিকই, কিন্তু লুহানের চোখে তখন স্পষ্ট আতঙ্ক। রিহান যেভাবে মাতব্বরি করছে তাতে তারা নির্ঘাত একটা না একটা মা’রা খাবেই খাবে।

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৬৫০+

(গুরুত্বপূর্ণ বার্তা: রেসপন্স পর্যাপ্ত পেলে খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্ব দিয়ে দেবো। পরবর্তী পর্বেই আমরা বর্তমানে ফিরব।

শুনুন!

আবেশ, মেহেক আর লামহাকে নিয়ে লেখা #একলামহাআবেশ_মেহেক ই-বুকটি পড়ে ফেলুন এখনই। সেখানে উদ্যান আর ফুলও আছে। সেই সাথে একটা বড়সড় স্পয়লারও পেয়ে যাবেন। অফার চলাকালীন ই-বুকটি পেয়ে যাবেন মাত্র ৩০ টাকায়। তাই দ্রুতই সংগ্রহ করে পড়ে ফেলুন।
লিংক কমেন্টে!)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply