Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৭


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী

#পর্ব ৭

মুহূর্তের মধ্যেই সেই খুনের বাড়িতে পুলিশের গাড়ি এসে থামল। জিপ থেকে স্বয়ং ওসি সাহেব নামলেন। তাকে দেখা মাত্রই উপস্থিত সব পুলিশ অফিসার সটান দাঁড়িয়ে স্যালুট দিলেন। কিন্তু ওসি সাহেবের নজর গেল এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সুদর্শন যুবকের দিকে যার হাতে চকচকে লোহার হ্যান্ডকাফ পরানো। তিনি ভ্রু কুঁচকে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন।

“কী হয়েছে? একে হ্যারাস করেছ কেন?”

অফিসার কিছুটা আমতা আমতা করে বললেন।

“স্যার ও চরম বেয়াদবি করেছে। লিমিট ক্রস আমার নামে উল্টোপাল্টা কথা বলছিল।”

ওসি সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“করেছেটা কী সে?”

অফিসার তখন বাঁধনের সব কথা আর তর্কের বিষয়গুলো বিস্তারিত বললেন। সব শুনে ওসি সাহেব বাঁধনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন।

“এই ছেলে তোমার সাহস তো কম না। পুলিশের সাথে মশকরা করো?”

আহসান রহমান এবার ওসির দিকে অত্যন্ত কাতর হয়ে তাকিয়ে বললেন।

“দেখুন স্যার আমার ছেলেটা একটু জেদি স্বভাবের। প্লিজ ওকে ছেড়ে দিন।”

ওসি সাহেব কোনো কথা না বলে বাঁধনের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর আদেশ দিলেন।

“তোমার মাস্কটা খোলো তো।”

বাঁধন নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের মুখের মাস্কটা সরিয়ে ফেলল। মাস্কটা সরাতেই বাঁধনের পূর্ণ চেহারা সামনে এল। বাঁধনের মুখটা দেখা মাত্রই ওসি সাহেবের হাত থেকে পুলিশের লাঠিটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। তার চেহারার কাঠিন্য মুহূর্তেই উধাও হয়ে সেখানে চরম আতঙ্ক আর সম্মান ভর করল। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে তড়িৎ গতিতে বাঁধনকে স্যালুট ঠুকলেন এবং কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন।

“স্যা… স্যার আপনি এখানে? এই অবস্থায়?”

উপস্থিত সবার চোখ তখন বিস্ময়ে চড়কগাছ। পুলিশ অফিসার তো রীতিমতো ভড়কে গিয়ে ওসির দিকে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললেন।

“স্যার ওকে স্যার বলছেন কেন? কে ও?”

ওসি সাহেব রাগে আর ভয়ে অফিসারের দিকে চিৎকার করে উঠলেন।

“আরে গাধা কী করলি এটা? এনিই তো আমাদের শহরের নতুন এসপি স্যার। যিনি কিছুদিন আগে বিসিএস শেষ করে এক বছরের কঠিন ট্রেনিং দিয়ে এই পদে নিযুক্ত হয়েছেন। আজই ওনার আমাদের জেলায় জয়েন করার কথা ছিল এনিই সেই অফিসার।”

পুরো এলাকা তখন স্তব্ধ। আহসান রহমান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। যে ছেলেকে পুলিশ অপরাধী ভেবে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল সে-ই এখন এই পুরো জেলার পুলিশের প্রধান। বাঁধনের ঠোঁটের কোণে তখনো সেই রহস্যময় শীতল হাসিটা লেগে আছে। সাথে সাথে উপস্থিত সব পুলিশ সদস্য একসাথে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বাঁধনকে স্যালুট জানাল। পুলিশ অফিসার নিজেও এবার ভয়ে ঘামতে শুরু করেছেন তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। তিনি বাঁধনের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন।

“সরি… স..স্যার। আমি আপনাকে চিনতে পারি নাই। বড় ভুল হয়ে গেছে স্যার। প্লিজ ক্ষমা করবেন।”

বাঁধন এবার তার শীতল আর ভারী কণ্ঠে কথা বলা শুরু করল। তার প্রতিটি শব্দে যেন কমান্ডিং পাওয়ার ঝরে পড়ছে। সে অফিসারের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল।

“মানুষ ভুল করে বলেই তার জন্য ক্ষমার জায়গা থাকে। আমি আপনাকে শুধরানোর একটা সুযোগ দিতে চাই। নিজেকে বদলে ফেলুন অফিসার। আর মনে রাখবেন পুলিশের কাজ মানুষকে সেবা দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে হ্যারাস করা নয়। যদি সম্মান নিয়ে চাকরি করতে চান তবে এই কেসটা এখন আপনার হাতে দিলাম। এই দুজন ছেলেকে জেলে নিয়ে এমনভাবে জেরা করবেন যেন সত্যিটা বেরিয়ে আসে। তিনদিনের মধ্যে আমার আসল খুনি চাই। আর লাশকে কীভাবে মারা হয়েছে তার মেডিকেল রিপোর্ট আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমার টেবিলে দেখতে চাই। ক্লিয়ার?”

ওসি সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দরাজ গলায় বললেন।

“ইয়েস স্যার। আমরা এখনই কাজ শুরু করছি।”

পুলিশের লোকজন হুড়মুড় করে এগিয়ে এসে বাঁধনের হাত থেকে হ্যান্ডকাফ খুলে দিল। বাঁধন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। কারো দিকে না তাকিয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে বুক চিতিয়ে বড় বড় পা ফেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

এদিকে আহসান রহমান হাজি রহমান আতিকুর রহমান আর আকাশ সবাই তখন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। যা ঘটল আর যা শুনলেন সবকিছু যেন তাদের মাথার ওপর দিয়ে গেল। শুধু এইটুকু কানে বাজছে যে বাঁধন এই শহরের নতুন এসপি। আহসান রহমান ভাবতেই পারছেন না যাকে তিনি চৌদ্দ বছর আগে রাগের মাথায় পুলিশের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন সেই ছেলেটিই এখন গোটা জেলার প্রধান রক্ষক। পুরো এলাকায় এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এল।

_______

৫ দিন কেটে গেছে। রূপা এখন শারীরিক ভাবে সুস্থ বোধ করছে তবে গত পাঁচটা দিন তার ওপর দিয়ে যেন তুফান বয়ে গেছে। টানা পাঁচদিন সে জ্বরে বিছানায় পড়ে ছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে জ্বর এর আগে তার কখনো থাকেনি কিন্তু এইবার শরীরটা যেন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না।

এদিকে বাঁধন যে এই শহরের নতুন এসপি তা রূপা ছাড়া রহমান বাড়ির সবাই জেনে গেছে। আহসান রহমান নিজের করা ব্যবহারের কথা ভেবে এখন ছেলের সামনে যেতেও লজ্জা পাচ্ছেন। রজনী রহমান অবশ্য মনে মনে ভীষণ খুশি হয়েছেন, বাঁধন আজ এত বড় পদে আসীন হয়েছে বলে। আর শান্তা তো বাঁধনের জন্য রীতিমতো পাগল হয়ে গেছে কিন্তু রজনী রহমানের কড়া নিষেধ থাকায় সে বাঁধনের ব্যাপারে রূপাকে কিছুই বলতে পারছে না।

এই পাঁচদিনে রূপা অনেকবার বাঁধনের সাথে দেখা করতে চেয়েছে কিন্তু বাঁধন যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। বাঁধন এখন ময়মনসিংহের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সকাল ১০টা থেকে ডিউটিতে জয়েন করেছে। সারাদিন কাজের চাপে থেকে সে রাতে অনেক দেরিতে বাড়ি ফেরে যার ফলে রূপার সাথে তার একবারের জন্যও দেখা হয়নি।

জ্বরের ঘোরে রূপা বারবার বাঁধনের মুখটা দেখতে চেয়েছিল কিন্তু তার সেই বড় ভাই একবারের জন্যও ছোট বোনকে দেখতে আসেনি। বাঁধনের এই উদাসীনতা আর অনুপস্থিতিতে রূপার মনে এক আকাশ অভিমান জমেছে।

,,,

সকাল ৯টা। রূপা ধবধবে সাদা কলেজের ইউনিফর্ম পরে তৈরি হয়ে নিচে নামল। গত পাঁচটা দিন সে তীব্র জ্বরের ঘোরে বিছানায় পড়ে ছিল তাই আজ শরীরটা একটু দুর্বল লাগলেও তাকে কলেজে যেতেই হবে। নাস্তা শেষ করে রূপা সোজা শান্তার ঘরের দিকে পা বাড়াল। শান্তা কেন এখনো নিচে নামছে না সেটা দেখা দরকার। শান্তার ঘরে ঢুকে রূপা দেখল শান্তা বিছানায় আয়েশ করে শুয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আপনমনে মিষ্টি মিষ্টি হাসছে।

রূপা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল।

“আপু তুমি বসে আছো? ভার্সিটি যাবে না?”

শান্তা যেন হঠাৎ চমকে উঠল। হড়বড় করে ফোনের লক বন্ধ করে সে কাঁচুমাচু হয়ে অসুস্থতার ভান ধরল।

“না রে আজ শরীরটা একদম ভালো লাগছে না। তুই যা আমি আজ আর যাব না।”

রূপা চিন্তিত মুখে বলল।

“কেন আপু কী হয়েছে তোমার?”

শান্তা পেটে হাত দিয়ে একটা মেকি যন্ত্রণার অভিনয় করে বলল।

“পিরিয়ড রে প্রচণ্ড পেট ব্যথা করছে।”

রূপা আর কথা বাড়াল না।

“ওহ আচ্ছা তাহলে তুমি রেস্ট নাও আমি গেলাম।”

_____

সকালবেলার ব্যস্ত রাস্তায় তখন রিকশা আর ইজিবাইকের জটলা। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বখাটেদের আস্ফালন যেন বেড়েই চলেছে। কলেজের মেয়েদের দেখলেই তারা সস্তার শিস দিচ্ছে আর আজেবাজে মন্তব্য করছে। তাদেরই একজন একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে টিটকরল।

“আরে শা’লা কী মাল রে ভাই। একদম কুচি আপেলের মতো দেখতে।”

ঠিক সেই রাস্তার রোড দিয়ে দাপটের সাথে বাইক চালিয়ে আসছিল বাঁধন। তার পরনে পুলিশের গর্বের ইউনিফর্ম ময়মনসিংহের নতুন এসপি। নেভি ব্লু রঙের একদম টানটান ফিটিং ইউনিফর্মে বাঁধনের সুঠাম দেহভঙ্গি যেন ফেটে পড়ছে। কাঁধের ওপর রুপালি রঙের তিনটি শাপলা রোদ লেগে চিকচিক করছে। মাথায় দামী হেলমেট আর সেই হেলমেটের কাঁচের আড়াল থেকেও তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির তেজ টের পাওয়া যাচ্ছে। তার স্লিট করা বাঁ চোখের ভ্রু-টা যা তাকে এক মারাত্মক হ্যান্ডসাম আর খুনে লুক দিচ্ছে। ফর্সা কবজিতে বাঁধা কালো লেদারের বেল্টের এক বিশাল আকৃতির দামী ঘড়ি। সে এক হাতে বাইক কন্ট্রোল করে অন্য হাতটা আলতো করে স্টাইলে হ্যান্ডেলের ওপর রেখেছে। ইউনিফর্মে বাঁধনকে আজ এতটাই পাওয়ারফুল আর আকর্ষণীয় লাগছে যে রাস্তার মানুষ তার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না। সে বাইক চালিয়ে এগিয়ে আসছে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বাম দিকের গলি থেকে রূপা বেরিয়ে এলো। রূপা দ্রুত পা চালিয়ে মেইন রাস্তায় উঠে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। রূপা যখন সেই বখাটে ছেলেদের কাছাকাছি পৌঁছাল তখন তার সামনে আরও দুটো কলেজের মেয়ে হাঁটছিল। বখাটেদের মধ্যে একটা হিরোঞ্চির মতো দেখতে ছেলে রূপার সামনের মেয়েটির বুকের দিকে কুরুচিপূর্ণভাবে তাকিয়ে বাকি ছেলেদের উদ্দেশ্যে অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠল।

“আরে ভাই দেখ একদম নিচে ঝুলে গেছে। মনে হয় ভেতরে কিছু পরে নাই দুলছে তো দুলছেই।”

কথাটা রূপার কানে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। সামনের মেয়ে দুটো রাগে আর অপমানে মাথা নিচু করে চলে যেতে থাকলেও রূপা নিজেকে সামলাতে পারল না। তার রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে পায়ের জুতো খুলে সেই ছেলেটার সামনে গিয়ে তার গেঞ্জির কলার খামচে ধরল। তারপর কোনো কিছু ভাবার আগেই ঠাস ঠাস করে জুতোর বাড়ি মারতে শুরু করল ছেলেটার গালে আর পিঠে। রূপার চোখের দৃষ্টি তখন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সে চিৎকার করে বলতে লাগল।

“কুত্তার বাচ্চা মা-বোনদের সম্মান করতে জানিস না? যে নারী তোকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেছে যে নারীর বুক ফেটে আসা দুধ খেয়ে তুই বড় হয়েছিস আজ সেই নারীর অঙ্গ নিয়ে নোংরা নজরে কথা বলিস? লজ্জা করে না তোর? যে শরীর থেকে তোর জন্ম সেই শরীরকেই তুই ভোগের বস্তু মনে করিস? তাহলে কি তুই তোর মাকেও এমন নজরে দেখিস?”

রূপার এমন সাহসী রুদ্রমূর্তি দেখে সেই মেয়ে দুটো থমকে দাঁড়িয়ে গেল আশেপাশে আরও অনেক নারী ভিড় জমাল। ঠিক সেই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে বাঁধন তার গর্জন করা বাইকটি নিয়ে সেখানে পৌঁছাল। রাস্তায় জটলা আর একটি মেয়েকে ছেলে পিটাতে দেখে সে রূপার ঠিক পিছনেই হার্ড ব্রেক কষে বাইক থামিয়ে দিল।

হুট করে পুলিশের এসপির ইউনিফর্ম পরা একজন দীর্ঘদেহী অফিসারকে বাইকের ওপর দেখতে পেয়ে উপস্থিত সাধারণ মানুষ আর বখাটেদের কলিজা শুকিয়ে গেল। সবার মনে এক অজানা আতঙ্ক এখন না জানি কী হয়। বখাটেরা থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। কিন্তু রূপার তখন কোনো হুঁশ নেই সে তখনো রাগে অন্ধ হয়ে বাঁধনকে খেয়াল করেনি। সে ছেলেটাকে আরও জোরে জোরে জুতোর বাড়ি মারতে মারতে বলতে লাগল।

“তোরে আজকে আমি মেরেই ফেলবো। মেরে তোকে থু-থু দিয়ে গোসল করাবো। কুত্তার বাচ্চা মেয়েদের সম্মান দিতে না জানলে এই সমাজে তোর মতো জানোয়ারের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। মনে রাখিস নারীরা যেমন জন্ম দিতে জানে তেমনই তোদের মতো পিশাচদের পিষে মারতেও জানে।”

বাঁধনের কাছে এখন পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে গেল কেন মেয়েটা ওই ছেলেকে পশুর মতো পেটাচ্ছে। বাঁধন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার অদম্য সাহস দেখে সে মনে মনে বেশ অবাক হলো। কিন্তু সে মেয়েটার মুখ দেখতে পারছে না কারণ মেয়েটা উল্টো দিকে ঘুরে আছে। বাঁধনের নজর গেল মেয়েটার কাঁধে থাকা কলেজ ব্যাগের ওপর। মুহূর্তেই তার মনে পড়ে গেল পাঁচ দিন আগের সেই বৃষ্টির দিনের কথা। ওই দিন রাস্তায় যে মেয়েটিকে দেখেছিল এই মেয়েটির ব্যাগ হুবহু এক। তবে কি এই সেই মেয়েটা? বাঁধন তার স্লিট করা ভ্রু কুঁচকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

রূপা ইচ্ছেমতো ছেলেটাকে জুতোপেটা করে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘুরে দাঁড়াল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বাঁধনের সাথে তার চোখাচোখি হলো। বাঁধনের হেলমেটের গ্লাসের নিচে সেই চেনা মায়াবী আর তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দেখা মাত্রই রূপা চমকে উঠল। তার বুকের ভেতরটা আবারো সেই অজানায় ধক করে উঠল। এদিকে বাঁধনও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রূপার দিকে। সে ভাবতেই পারেনি আবারো এই মেয়েটির সাথে তার দেখা হবে আর আজকের এই সাহসী রূপ দেখে সে সত্যিই বিস্মিত।বাঁধনের গায়ে বাংলাদেশ পুলিশের ঝকঝকে ইউনিফর্ম দেখে রূপা আরেক দফা স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার মানে কি এই ছেলেটা পুলিশ? সেদিন কি তবে সে কোনো ভূত দেখেনি রক্তমাংসের মানুষই দেখেছিল?

তাদের দুজনের এই নীরব ভাবনার মাঝেই সেই বখাটে ছেলেগুলো সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করল। বাঁধন মুহূর্তের মধ্যে চোখের পলকে তার প্যান্টের বেল্টের হোলস্টার থেকে সার্ভিস রিভলবার বের করল। বাইকের ওপর বসেই অত্যন্ত নিখুঁত নিশানায় হাতটা বাড়িয়ে পরপর ঠাস ঠাস ঠাস করে তিনটা গুলি ছুড়ল। প্রতিটি গুলি সরাসরি গিয়ে বিঁধল পলায়নরত তিন বখাটের পায়ে। গুলির সেই বিকট শব্দে পুরো এরিয়া কেঁপে উঠল। রূপা ভয়ে চিৎকার দিয়ে দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

ছেলে তিনটা নিজেদের পা আঁকড়ে ধরে রাস্তার মাঝখানে লুটিয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় তাদের গগনবিদারী আর্তনাদে আশেপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। বাঁধন অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তার পকেট থেকে স্মার্টফোনটা বের করল। তার চোখেমুখে কোনো দয়া বা অনুশোচনার চিহ্ন নেই বরং এক কঠোর প্রশাসনিক গাম্ভীর্য ফুটে উঠেছে। সে সরাসরি পুলিশ লাইন্সে ফোন দিয়ে অত্যন্ত ভারী আর গম্ভীর কণ্ঠে কমান্ড দিল।

“এসপি ময়মনসিংহ স্পিকিং। ব্রহ্মপুত্র মোড়ে ইমিডিয়েটলি একটা ব্যাকআপ টিম আর অ্যাম্বুলেন্স পাঠাও। তিনটে পটেনশিয়াল ইভটিজারকে নিউট্রালাইজ করা হয়েছে। আই ওয়ান্ট দেম ইন কাস্টডি রাইট নাউ। ওভার।”

রূপা ধীরে ধীরে চোখ খুলে রাস্তার দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। ছেলেগুলো পা ধরে ছটফট করছে আর সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে কালো পিচ ঢালা রাস্তা ভিজে যাচ্ছে। যে মেয়েটিকে নিয়ে ওই নোংরা মন্তব্য করা হয়েছিল তার চোখেমুখে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। সে যেন আজ দীর্ঘদিনের জমানো অপমানের বিচার পেল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের একটি ভ্যান সেখানে এসে পৌঁছাল। গাড়ি থামতেই চারজন পুলিশ অফিসার তড়িৎ গতিতে নেমে সরাসরি বাঁধনের সামনে গিয়ে সটান দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকল। বাঁধন তখনো বাইকের ওপর বসে আছে। সে শীতল চোখে অপরাধীদের দিকে ইশারা করে দরাজ গলায় আদেশ দিল।

“এই তিনটে জানোয়ারকে তুলে ভ্যানে ভরেন। জনসমক্ষে মেয়েদের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস কীভাবে হয় সেটা এদের হাড়হাড়ো বুঝিয়ে দিতে হবে। হাজতে নিয়ে গিয়ে এমনভাবে ট্রিটমেন্ট দেবেন যেন সারাজীবন মনে থাকে যে ময়মনসিংহের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের দিকে তাকানোর পরিণাম কী হয়। যান নিয়ে যান এদের।”

বাঁধনের এই বজ্রকণ্ঠ শুনে পুলিশ সদস্যরা এক মুহূর্ত দেরি না করে ছেলেগুলোকে টেনেহিঁচড়ে ভ্যানে তুলতে শুরু করল। পুরো এলাকা তখন বাঁধনের দাপটে থমথমে হয়ে আছে। ছেলেগুলোকে নিয়ে যাওয়ার পর চারপাশের থমথমে পরিবেশটা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে এল। বাঁধন উপস্থিত উৎসুক জনতার দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে গম্ভীর অথচ দরাজ গলায় বলল।

“আপনারা যার যার কাজে যান এখানে কোনো সিনেমা চলছে না। আর মেয়েরা তোমাদের কলেজের সময় হয়ে যাচ্ছে তোমরা কলেজে যাও। আর শোনো যতদিন এই শহরে আমি আছি ততদিন কোনো বখাটে জানোয়ার তোমাদের দিকে খারাপ নজর দেওয়ার সাহস পাবে না। যদি তোমাদের কাউকে কেউ ডিস্টার্ব করে বা নোংরা কথা বলে তবে ভয় না পেয়ে সরাসরি ৯৯৯ নাম্বারে কল করবে। আমরা অবশ্যই এর বিরুদ্ধে কড়া একশন নেব। এখন যাও সবাই।”

বাঁধনের বজ্রকণ্ঠ শুনে সাধারণ মানুষ ভয়ে আর সম্মানে মাথা নিচু করে দ্রুত যার যার গন্তব্যে চলে গেল। মেয়েরাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে কলেজের দিকে হাঁটা দিল। এদিকে রূপা তখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। তার মানে সেদিন সে কোনো ভূত দেখেনি রক্তমাংসের মানুষই দেখেছিল। যে মানুষটাকে সে ভয়ংকর ভেবেছিল সে-ই এখন এই শহরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এক পুলিশ অফিসার। রূপা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াতে চাইল না। সে ঘাড় নিচু করে উল্টো দিকে ঘুরে হাঁটা দিতেই পেছন থেকে বাঁধনের সেই ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“এই শুনো?”

রূপা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। ভয়ে তার পা দুটো মাটিতে আটকে গেল। সে ভাবল সবার সামনে সে ওই ছেলেটাকে ওভাবে জুতোপেটা করেছে বলে হয়তো এই পুলিশ অফিসার তাকেও এখন ধরে জেলে নিয়ে যাবে। সে কোনোমতে কাঁপতে কাঁপতে বাঁধনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। চোখ দুটো ছলছল করে উঠল তার ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বলল।

“স্যা…স্যার আমি জাস্ট নোংরা কথা বলার জন্য ওই ছেলেটাকে মেরেছি। ও খুব আজেবাজে কথা বলছিল মেয়েটাকে নিয়ে। প্লিজ স্যার আমাকে জেলে নিবেন না।”

রূপার এমন হুটহাট ভীতু রূপ দেখে বাঁধনের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কিছু আগে যে মেয়েটা রূদ্রমূর্তিতে একটা ছেলেকে পেটাচ্ছিল সে এখন একটা ছোট্ট কাঠবিড়ালির মতো ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। বাঁধন বাইকের ওপর আয়েশ করে বসে দীর্ঘশ্বাস টেনে রূপার চোখের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে বলল।

“নাম কী তোমার?”

রূপা মাথা নিচু করে নিচু সুরে বলল।

“র…রূপা।”

রূপা নামটা শোনামাত্র বাঁধনের গম্ভীর মুখটা মুহূর্তের জন্য আরও একটু ভারী হয়ে উঠল। সে রূপার দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল।

“তোমার বাবার নাম কী?”

রূপা এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়ে গেল। তার সামনে এখন দুজন বাবার পরিচয় একজন আহসান রহমান আর অন্যজন তার জন্মদাতা পিতা মারুফ হাসান। এখন কী করবে বর্তমান তার বাবা আহসান রহমানের নাম বলবে পরক্ষণেই ভাবল এই কড়া পুলিশ অফিসার যদি পরে কোনোভাবে জানতে পারে সে মিথ্যে বলেছে তবে নির্ঘাত তাকে জেলের ভাত খেতে হবে। বড় কোনো বিপদের ঝুঁকি না নিয়ে সে তার জন্মদাতার নামই উচ্চারণ করল।

“মারুফ হাসান।”

রূপার মুখে নিজের বাবার নাম না শুনে বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে হয়তো অবচেতন মনে তার সৎ বোন রূপা আশা করছিল। মনে মনে নিজেকেই বোঝাল নাম এক হতেই পারে তাই বলে কি মানুষটাও এক হবে। বাঁধন নিজেকে সামলে নিয়ে রূপার দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করল।

“কোন কলেজে পড়ো?”

রূপা মাথা নিচু করেই জবাব দিল।

“আনন্দ মোহন।”

“কোন ইয়ার?”

“সেকেন্ড ইয়ার।”

হঠাৎ বাঁধনের ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে নাম দেখে সে মুহূর্তেই বাইকের ওপর সোজা হয়ে বসল এবং হ্যান্ডেল ধরে স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের গম্ভীর গর্জন তুলে সে রূপার দিকে তাকিয়ে বলল।

“ঠিক আছে কলেজে যাও। আর কোনো সমস্যা হলে ৯৯৯-এ কল দিও।”

বলেই বাঁধন চোখের পলকে বাইক চালিয়ে ধুলো উড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। রূপা থমকে দাঁড়িয়ে সেই পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে তখন হাজারো প্রশ্ন কে এই মানুষটা। কেন তার চাহনিতে এত চেনা মায়াবী টান। আর এই মানুষটি কি আসলেই পুলিশ। সে কি তবে সেদিন কোনো ভূত দেখেনি।

রানিং।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply