Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬০(বর্ধিতাংশ)


রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬০(বর্ধিতাংশ)

নিলুফানাজমিননীলা

★★★★
হাসপাতালের সাদা করিডোর চিরে পাগলের মতো দৌড়ে যাচ্ছে আরিয়ান মির্জা। তার দুহাতে আগলে রাখা নিথর শ্যামলিনী, যার শরীর থেকে ঝরা রক্তে ভিজে একাকার আরিয়ানের শার্ট। আরিয়ান ছুটছে আর গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাক্তার ডাকছে। আতঙ্কে আর পরিশ্রমে তার পা দুটো বারবার থমকে যাচ্ছে, চোখের সামনে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। ঠিক তখনই কয়েকজন নার্স স্ট্রেচার নিয়ে হাজির হলেন।
​তৃণাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে দেওয়া হলো। তার চোখ দুটো অর্ধেক খোলা, মণির ভেতরে এক অদ্ভুত কম্পন যেন শেষবারের মতো তার রাগী সাহেবকে দেখে নিতে চাইছে সে। আরিয়ান তৃণার বরফশীতল হাত দুটো নিজের মুঠোয় পুরে ডুকরে কেঁদে উঠল,
“আমাকে ছেড়ে যেও না শ্যামলিনী, তুমি না থাকলে তোমার এই রাগী সাহেব মরে যাবে! নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাবে সে!”
​ডিউটি ডাক্তার তৃণার অবস্থা দেখেই আতঙ্কিত হলেন। নার্সদের উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বললেন,
“শিগগিরই ইমার্জেন্সি রুমে নিয়ে যান! প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে!”

​তৃণাকে নিয়ে যাওয়া হলো ইমার্জেন্সি রুমের ভেতরে। আরিয়ানের প্রবেশ নিষেধ। দরজার ওপাশে তখন মির্জা বাড়ির সবাই এসে পৌঁছেছে, রিনিও এসেছে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে। কিন্তু আরিয়ান কারো দিকে তাকাচ্ছে না। সে ইমার্জেন্সি রুমের দরজার কাঁচের ফাঁক দিয়ে ঝাপসা চোখে দেখছে ভেতরের তৎপরতা। সেখানে স্বয়ং উপস্থিত আছেন ডক্টর উমর হাওলাদার, তৃণার বাবা। একজন বাবা আজ তার সমস্ত চিকিৎসা জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই করছেন নিজের মেয়ে আর অনাগত নাতির জীবন ভিক্ষা নিতে।
​আরিয়ান বিড়বিড় করে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগল,
“আমি তো চেয়েছিলাম তোমার চোখের নেশার গভীরে সর্বনাশ হতে, তোমার প্রেমে সর্বনাশ হতে। আর তুমি কিনা বিচ্ছেদের আগুনে আমার সর্বনাশ করতে চাচ্ছো? শ্যামলিনী, এতটাও আশা করিনি আমি।”

​যন্ত্রণায় আরিয়ান করিডোরের ফ্লোরে ধপ করে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরল সে, মনে হচ্ছে মস্তিষ্কের ভেতরে প্রবল কোনো ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। ঠিক কতক্ষণ পর জানা নেই, ইমার্জেন্সি রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসলেন উমর হাওলাদার এবং অন্য চিকিৎসকেরা। উমর সাহেবের মুখটা ঘামে ভেজা, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।
আরিয়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে উমর হাওলাদারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠে তখন হাজারো উৎকণ্ঠা আর ভয়। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“বাবা, তৃণা? তৃণা কেমন আছে এখন?”

​ডক্টর উমর হাওলাদার তার ক্লান্ত মুখে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটিয়ে তুললেন। আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললেন,
“ভয় নেই বাবা, তৃণা এখন বিপদমুক্ত। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা যে তোমার সন্তানও একদম ঠিক আছে। তৃণা দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা।”

​কথাটা শোনামাত্র আরিয়ানের বুকের ভেতর থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেল। এতক্ষণের সেই দমবন্ধ করা আতঙ্ক এক লহমায় বদলে গেল এক অনির্বচনীয় সুখে। তার ঠোঁটের কোণে ফোটা সেই হাসি যেন মির্জা বাড়ির সবার মুখে এক মুহূর্তে খুশির জোয়ার নিয়ে এল। বাড়ির বড়রা কৃতজ্ঞতায় চোখ মুছলেন, আর আরিয়ানের মনে হলো সে যেন এক নতুন পৃথিবী ফিরে পেয়েছে।
​আরিয়ান ব্যাকুল হয়ে বলল,
“বাবা, আমি কি একবার তৃণার সাথে দেখা করতে পারি? প্লিজ!”

​উমর সাহেব মৃদু স্বরে বললেন,
“এখন দেখা না করাই উত্তম হবে। তৃণা এখনো অচেতন অবস্থায় আছে, ওর প্রচুর বিশ্রামের প্রয়োজন।”

​আরিয়ান প্রায় মিনতি করে বলল,
“প্লিজ বাবা, একবার যেতে দিন। আমি কোনো বিরক্ত করব না, কথা দেব না। শুধু একনজর দেখব আমার শ্যামলিনীকে। ও ঠিক আছে এটা নিজের চোখে না দেখলে আমি শান্তি পাচ্ছি না।”

​উমর হাওলাদার জামাতার চোখের আকুতি দেখে আর না করতে পারলেন না। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে যাও, তবে খুব অল্প সময়ের জন্য।”
​অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথেই আরিয়ান নিঃশব্দে কেবিনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ধবধবে সাদা বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে তার প্রাণের প্রিয়তমা। তৃণার সেই মায়াবী শ্যামল বর্ণের মুখটা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর মানসিক চাপে আরও ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। আরিয়ান ধীর পায়ে তৃণার বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। তার সারা শরীর এখনো ভয়ে কাঁপছে।
​আরিয়ান তৃণার বেডের পাশে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। পরম মমতায় তৃণার গলা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল ছেলেটা। তার তপ্ত চোখের জল তৃণার গলার কাছে আছড়ে পড়ছে। আরিয়ান পাগলের মতো তৃণার কপাল, চোখ আর সারা মুখশ্রীতে অসংখ্য আদুরে চুম্বন আঁকল, এ যেন তার ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
​হঠাৎ করেই আরিয়ানের নজর গেল তৃণার পেটের দিকে। ওই ছোট্ট কামরার ভেতরে, তৃণার শরীরের গভীরে এখন তাদের দুজনের এক নতুন অস্তিত্ব বড় হচ্ছে। তাদের ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ ফসল। ভাবতেই আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে হাসি আরও গভীর হলো। সে আলতো করে তৃণার পেটের ওপর হাত রাখল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এরপর থেকে তার শ্যামলিনী আর এই ছোট্ট প্রাণের দিকে কোনো বিপদের আঁচও লাগতে দেবে না সে।
★★★
গোধূলির শেষ আভাটুকু মুছে গিয়ে প্রকৃতির বুকে এখন অন্ধকারের চাদর। সন্ধ্যার শান্ত হিমেল বাতাস বয়ে যাচ্ছে মির্জা বাড়ির বারান্দা দিয়ে। হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে আজ দুইদিন হলো তৃণা ঘরে ফিরেছে। সেই ভয়াবহ রাতের ধকল আর রক্তক্ষরণের ধকল কাটিয়ে উঠতে ডক্টর কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তৃণার বিশ্রামের ব্যাপারে। সেদিন হাসপাতালে পৌঁছাতে আর সামান্য দেরি হলে হয়তো এই অনাগত প্রাণকে বাঁচানোই সম্ভব হতো না।
​আরিয়ান যেন এখন তৃণার ছায়া হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর নিজ হাতেই ওকে খাইয়ে দিয়েছে, ভেজা তোয়ালে দিয়ে শরীর পরিষ্কার করে দিচ্ছে পরম মমতায়। তৃণা একটু নড়াচড়া করতে চাইলেই আরিয়ান যমদূতের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়। কোনো কাজই সে তৃণাকে করতে দিচ্ছে না।
​তৃণার ঠিক সামনে বসে আরিয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
“শোনো শ্যামলিনী, আজ থেকে কোনো কিছু নিজ হাতে করার চেষ্টা করবে না। যখন যা প্রয়োজন হবে, আমাকে বলবে। আমি চব্বিশ ঘণ্টা তোমার পাশেই আছি, বুঝলে?”

​তৃণা আরিয়ানের এই অতিরিক্ত আগলে রাখা দেখে একটু অবাক হয়ে বলল,
“আপনি এমন করছেন কেন? আমি তো এখন ঠিক আছি। শরীরও অনেকটা স্বাভাবিক। সাত-আট মাস পার হলে না হয় আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হতো, তখন পাশে থাকলেই চলবে। এখনকার সব কাজ আমি একাই করে নিতে পারব।”

​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে জেদি বালকের মতো বলল,
“একদম না! একা একা হাঁটতেও দেব না তোমাকে। প্রয়োজনে ছোট বাচ্চাদের মতো কোলে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াব, তবুও তোমাকে পা ফেলতে দেব না।”

​আরিয়ানের এই পাগলামি দেখে তৃণা মুখ ফুলিয়ে খুব ধীর স্বরে আক্ষেপের সুরে বলল,
“মরে গেলে তো এতক্ষণে দাফনও করে দিতেন।”

​তৃণা কথাটি শেষ করার আগেই আরিয়ান বিদ্যুৎবেগে ওকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তৃণার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে আরিয়ান বলল,
“উঁহু, ভুল বললে শ্যামলিনী। আমি তোমার দাফনে অংশ নিতে পারতাম না। কারণ ওই দিন পাশাপাশি দুটি কবর খুঁড়তে হতো। একটিতে খোদাই করে লেখা থাকত ‘আরিয়ান মির্জা’ আর ঠিক তার পাশেরটিতে লেখা থাকত ‘মিসেস আরিয়ান মির্জা’।”

​আরিয়ানের বুকের ধুকপুকানি তখন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল তৃণা। যে মানুষটি বাইরে এত কঠোর আর রাগী, তার ভেতরে যে ভালোবাসার এমন এক বিশাল সমুদ্র লুকিয়ে আছে, তা অনুভব করে তৃণার চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আরিয়ানের বুকেই নিজের মাথাটা সঁপে দিল।
তৃণা অনেকক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে রইল। বাইরের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়েছে, সাথে ঘরের ভেতরের নীরবতাও। আরিয়ান তৃণার চুলের ভাঁজে আঙুল চালাতে চালাতে খুব শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
​“ওইদিন অতটা ঝুঁকি নিয়ে একা কেন বের হলে শ্যামলিনী? আর তুমি বাড়ি থেকে বলে গিয়েছিলে যে বাবা তোমাকে যেতে বলেছেন, অথচ বাবা তো সেদিন তোমাকে কোনো কলই দেননি। কেন এমন করলে?”

​তৃণা আরিয়ানের বুকের ওপর থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল। তার চোখে তখনো সেই দিনের আতঙ্কের রেশ। সে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
​“সেদিন আপনাকে কল দেওয়ার পর আমি যখন সোফায় বসেছিলাম, তখন হঠাৎ আমার ফোনটা বেজে ওঠে। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি স্ক্রিনে বাবার নাম্বার ভাসছে। আমি কল ধরতেই ওপাশ থেকে আব্বু খুব রুগ্ন স্বরে বলল যে উনি নাকি ভীষণ অসুস্থ। আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? ওপাশের কণ্ঠস্বরটা হুবহু আব্বুর মতোই ছিল! উনি বারবার বলছিলেন যে উনি আর বাঁচবেন না, শেষবারের মতো আমাকে একনজর দেখতে চান। আব্বুর ওই হাহাকার ভরা আকুতি শুনে আমি স্থির থাকতে পারিনি। বাড়িতে আপনি বা মেজ ভাইয়া কেউ ছিলেন না, শুধু মা আর বড়মা ছিলেন। তাই দেরি না করে ওদের জানিয়েই আমি পাগলের মতো বেরিয়ে পড়ি।”

​তৃণা এক মুহূর্ত থামল, যেন সেই ভয়ংকর দৃশ্যগুলো তার চোখের সামনে আবার ভেসে উঠছে। সে আবার বলতে শুরু করল, “রাস্তায় যখন ট্যাক্সির জন্য দাঁড়ালাম, হঠাৎ একটা কালো গাড়ি আমার সামনে এসে থামল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ি থেকে লোক নেমে আমার মুখে রুমাল চেপে ধরল। এরপর সব অন্ধকার… যখন জ্ঞান ফিরল, তখন নিজেকে ওই মেঝেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আবিষ্কার করলাম।”

​আরিয়ান পুরো ঘটনাটা এখন পরিষ্কার জানে। পুলিশের জেরায় তামিম, খলিল আর রৌশনারা বেগম সবকিছু স্বীকার করেছে। সেদিন উমর হাওলাদার তাড়াহুড়ো করে নিজের ফোনটা কেবিনে রেখেই অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে গিয়েছিলেন। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিল খলিল। সে ফোনটা চুরি করে এবং নিজের কণ্ঠ বিকৃত করে উমর হাওলাদারের নকল করে তৃণার কাছে ফোন দেয়। স্রেফ সম্পত্তির লোভে ভাগ্নিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে খলিল যে এত বড় জাল বিছিয়েছিল, তা ভেবেই আরিয়ানের ঘেন্না হচ্ছে।
​আরিয়ান তৃণার মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিল। তার অশান্ত মনটাকে শান্ত করার জন্য নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে শ্যামলিনী, যা হয়েছে তা নিয়ে আর একদম ভেবো না। এখন সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো। এবার শান্ত হয়ে ঘুমাও তো।”

​তৃণা আর কোনো কথা বাড়াল না। অসুস্থ শরীর আর ক্লান্ত মন নিয়ে সে লক্ষ্মী মেয়ের মতো বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আরিয়ানের হাতের ওম আর আশ্বাসে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার দুচোখের পাতায় গভীর ঘুম নেমে এল। আরিয়ান একদৃষ্টে তৃণার শান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে রইল।
★★★
ক্যাফের এক কোণের টেবিলে বেশ অনেকটা সময় ধরে বসে আছে রিনি। চারদিকে মানুষের কোলাহল আর কফির তীব্র ঘ্রাণ থাকলেও তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। মাথার ভেতর অবিরাম ঘুরপাক খাচ্ছে এক অদ্ভুত চিন্তা। আজ সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আর দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছে।
​গত বেশ কিছুদিন ধরেই সে তূর্ণার সাথে অনেকটা সময় কাটাচ্ছে। এই ছোট্ট মেয়েটা যে কবে তার এত আপন হয়ে গেল, রিনি নিজেই তা বুঝতে পারেনি। এর আগে জীবনে কখনো কাউকে এতটা নিজের বলে মনে হয়নি তার। আর তূর্ণার প্রতি এই মায়ার টানেই সে আজ এত বড় একটা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
​রিনি আজ মেহরাব দেওয়ানকে এই ক্যাফেতে দেখা করার জন্য ডেকেছে। মেহরাব আসার কথা দিয়েছেন, কিন্তু প্রায় আধা ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তার কোনো দেখা নেই। রিনি অধৈর্য হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আজ যে প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে, মেহরাব দেওয়ান সেটা কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা ভেবেই তার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছে।
​হঠাৎ টেবিলের উল্টোপাশে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলতেই রিনি দেখল, মেহরাব দেওয়ান দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের ভাবনায় এতটাই মগ্ন ছিল যে, তিনি কখন এসে দাঁড়িয়েছেন রিনি টেরই পায়নি। সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,
“আপনি কখন আসলেন? আমি আসলে খেয়ালই করিনি।”
​“এই তো, মাত্রই এলাম। কী এত ভাবছিলেন গভীর মনোযোগ দিয়ে?” উল্টোদিকের চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠেই কথাটা বললেন মেহরাব।
​রিনি প্রসঙ্গ এড়াতে দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
“তেমন কিছু না। তূর্ণা কী করছে?”

​“আমি তো এখনো বাসায় যাইনি। হয়তো খেলাধুলা করছে,” মেহরাব একদৃষ্টে রিনির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা আমাকে হঠাৎ এভাবে ডেকে পাঠালেন যে?”
​রিনি কয়েক সেকেন্ড একদম চুপ করে রইল। নিজের হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে মুঠি পাকিয়ে সাহস সঞ্চয় করে বলল,
“আমি এখন আপনাকে যে কথাটা বলব, সেটা আপনি কীভাবে নেবেন বা কী রিয়্যাক্ট করবেন, আমার সত্যিই জানা নেই।”

​মেহরাব কিছুটা কৌতূহলী হয়ে বললেন, “বলে ফেলুন।”
​রিনি আর কোনো ভনিতা করল না। একবুক সাহস নিয়ে সরাসরি মেহরাবের চোখের দিকে তাকিয়ে আচমকা বলে উঠল,
“আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?”

​কথাটা শুনে মেহরাব দেওয়ান যেন আকাশ থেকে পড়লেন। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। চরম বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে তার মুখ দিয়ে কেবল একটি শব্দই বেরিয়ে এল,
“হোয়াট?”
রিনি শুকনো ঢোঁক গিলল। কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“অন্তত তূর্ণাকে দেখাশোনা করার জন্য হলেও প্লিজ আমাকে বিয়েটা করুন।”

​মেহরাব দেওয়ান হঠাৎ করেই যেন ফেটে পড়লেন। ক্যাফের শান্ত পরিবেশের তোয়াক্কা না করে উচ্চস্বরে ধমকে উঠে বললেন,
“আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? এক বাচ্চার বাবাকে বিয়ে করতে চাইছেন! আমার স্ত্রী রাধিকা মারা গেলেও আমি এখনও তাকেই ভালোবাসি। আর আমার মেয়েকে আমি একাই মানুষ করতে পারব, এর জন্য আমার অন্য স্ত্রীর প্রয়োজন নেই।”

​রিনির চোখে হঠাৎ করেই জল এসে গেল। মেয়েটা সাধারণত এত সহজে কাঁদার মতো নয়, কিন্তু আজ সে নিজেকে সামলাতে পারল না। ভীষণ আকুতি ভরা কণ্ঠে সে বলল,
“প্লিজ, আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। আমাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে হবে না, আর আমি কখনো আপনার কাছে স্বামীর অধিকারও দাবি করব না। শুধু আপনার মা-মরা মেয়েটার কাছে থাকার একটা সুযোগ আমাকে দিন। আমি না হয় আপনার বাড়ির সব কাজ করে দেব, তূর্ণার দেখাশোনা করব। আমাকে না হয় বাড়ির কাজের লোক হিসেবে রেখে দিয়েন। আপনাকে আমার কোনো খরচও চালাতে হবে না, আমি নিজেই নিজের খরচ চালাতে পারব। শুধু সমাজের চোখে আমাকে বৈধভাবে তূর্ণার মা হওয়ার অধিকারটুকু দিন।”

​কথাগুলো বলতে গিয়ে রিনির কণ্ঠ বারবার ভেঙে আসছিল। কিন্তু মেহরাব দেওয়ানের চোয়াল রাগে আরও শক্ত হয়ে গেল। তিনি সপাটে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দুই হাত টেবিলের ওপর রেখে রিনির দিকে কিছুটা ঝুঁকে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
​“আমার ইচ্ছে করছে ঠাস করে আপনার গালে একটা চড় বসিয়ে দিতে! নির্লজ্জ মেয়ে দেখেছি, তবে আপনার মতো এমন বেহায়া ও নির্লজ্জ আমি জীবনেও দেখিনি। এরপর থেকে খবরদার আপনি আমার আশেপাশে ঘেঁষার চেষ্টা করবেন না! বিশেষ করে তূর্ণার আশেপাশে তো নয়ই। এখন আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, আপনি নিশ্চয়ই আমার মেয়ের মাথায় এসব উল্টাপাল্টা কথা ঢুকিয়েছেন, যার কারণে তূর্ণা সবসময় শুধু আপনার কথাই বলে!”

​রিনি হতবাক হয়ে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। মেহরাবের প্রতিটি কথা যেন তপ্ত সিসার মতো রিনির কানে বিঁধছিল। মেহরাব আরও নিষ্ঠুর হয়ে বলল,
“আপনার মায়ের কীর্তি সব আমার জানা আছে। স্রেফ টাকার লোভে ওমর হাওলাদারকে বিয়ে করে কীভাবে তার মেয়ে তৃণাকে তিলে তিলে অত্যাচার করেছিল সেটা কি ভুলে গেছেন? আপনার রক্তেও কি সেই একই বুদ্ধি বইছে? তবে শুনে রাখুন, মেহরাব দেওয়ানের সাথে এসব বুদ্ধি খাটিয়ে কোনো লাভ হবে না। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড? যদি আমার সম্পত্তির ওপর এতই লোভ থাকে, তবে সরাসরি বলুন, এই মুহূর্তে আপনার কত টাকা লাগবে আমি ভিক্ষা দিয়ে দিচ্ছি!”

​রিনির দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়ল। অপমানে তার শরীর রী রী করে কাঁপছে। জীবনে আর যাই হোক, এতটা নিচুতর অপমান সে কখনো সহ্য করেনি। মেহরাব আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না, হনহন করে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেলেন। আশেপাশের টেবিলের মানুষগুলো উৎসুক চোখে রিনির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করছে। অপমানে কুঁকড়ে যাওয়া রিনি কোনোমতে নিজের ব্যাগটা হাতে নিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এল।
​রাতের অন্ধকার রাস্তায় একা হেঁটে চলেছে রিনি। বারবার হাত দিয়ে চোখ মুছছে কিন্তু চোখের জল যেন বাঁধ মানছে না। পরনে একটা সাধারণ শাড়ি, এলোমেলো চুল তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক সর্বহারা পথিক। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারের একটা নির্জন বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়ল সে। মুখটা দুই হাতে ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল রিনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাহাকার ভরা কণ্ঠে বলে উঠল,
“আমার মায়ের অপরাধের শাস্তি কেন আমায় দিচ্ছ খোদা? আমি তো এত ধৈর্যশীল নই!”

​ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে এক ছিনতাইকারী নিঃশব্দে এসে রিনির পাশে রাখা ব্যাগটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু রিনি যেন আজ মৃত্যুকেও ভয় পাচ্ছে না, সে বিদ্যুৎবেগে লোকটির হাত চেপে ধরল। ছিনতাইকারী ভয়ংকরভাবে হাত ছাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে দৌড় দিতে চাইলে রিনি আর্তনাদ করে নয়, বরং হিমশীতল কণ্ঠে বলে উঠল,
“আপনার কাছে কি কোনো ছু’রি বা মা’র’ণা’স্ত্র নেই?”

​ছিনতাইকারী এমন আজব কথা শুনে থমকে দাঁড়াল। সে জীবনে অনেক ভুক্তভোগী দেখেছে, কিন্তু এমন কথা কেউ কোনোদিন বলেনি। সে অবাক দৃষ্টিতে রিনির দিকে তাকালে রিনি আবারও বলল,
“ছু’রি থাকলে আমাকে মেরে দিন না! ব্যাগটা তো নিয়ে নিলেন, ওটার ভেতর ক্রেডিট কার্ড আছে, আমি পাসওয়ার্ড বলে দিচ্ছি। অনেক টাকা পাবেন, শুধু আমাকে শেষ করে দিন।”

​ছিনতাইকারী লোকটা হয়তো রিনির চোখেমুখে ফুটে ওঠা সেই চরম হাহাকার দেখে ভয় পেয়ে গেল। রিনির কণ্ঠে কোনো নাটক ছিল না, ছিল এক ভয়ংকর সিরিয়াসনেস। লোকটা সম্ভবত ভাবল রিনি কোনো পাগল বা আইনের কেউ, সে তড়িঘড়ি করে ব্যাগটা সেখানেই ফেলে দিয়ে প্রাণের ভয়ে উল্টো দিকে দৌড়ে পালাল।
​রিনি ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে কেমন পাগলের মতো খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বিড়বিড় করে বলল,
“বিচিত্র এই পৃথিবী! একটা সামান্য ছিনতাইকারীও আমাকে বুঝল না!”

চলবে…

(আগে চারহাজার রিয়েক্ট হতো আর এখন তিনহাজারও হয় না। আজ আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, যত তাড়াতাড়ি তিন হাজার রিয়েক্ট পূরণ হবে তত তাড়াতাড়ি পরবর্তী পর্ব পাবেন)

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply