Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৮.২


কাছেআসারমৌসুম!_(৬৮.২)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

অয়ন নিজস্ব কেবিনে পেশেন্ট দেখতে বসেছে। আজকে সিরিয়াল পড়েছে বেশি। এত এত বাচ্চা এসেছে! ভীড় লেগেছে কেবিনের সামনে। সামনের চেয়ারটাতেও দেড় বছরের একটা বাচ্চা বসেছিল। স্ক্যাবিজের সমস্যা! পুরো ঘা হয়ে গেছে। অয়ন চেইক আপ করে ওষুধপত্র লিখে দেয়। শিশুবিদ হিসেবে অল্পতে অনেক সুনাম হয়েছে ওর! ব্যস্ততার মাঝেই মুঠোফোনটা বাজল। ও ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ইউশার কল। স্ক্রিনে ‘little cherry’ লেখাটা ভাসছে। অয়ন ফোস করে শ্বাস ফেলে এসে বসল চেয়ারে। যেন জানে ইউশা কী কী বলবে এখন! ততক্ষণে ভেতরে থাকা নারী বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। এখন পরেরজন আসার কথা। এসিস্ট্যান্ট উঁকি দিয়ে শুধালেন,” স্যার, পরেরজন পাঠাব?”
“ বসতে বলুন। আমি ডাকব।”
“ আচ্ছা স্যার।”
স্ক্রিনের সবুজ বাটন প্রেস করতেই,ওপাশ থেকে ইউশা হড়বড় করে বলল,
“ অয়ন ভাই,হ্যালো,অয়ন ভাই কোথায় তুমি?”
তুমি,তুমি খেয়েছ? নাস্তা করেছ সকালে?”
অয়ন ভ্রু কুঁচকে নেয়। ইউশার গলার স্বর আধোভাঙা। বলল,
“ কখন উঠেছিস?”
“ আমি? এইত উঠেই তোমায় কল দিলাম। বড়ো মা বলল তুমি নাকি সেই ভোরে চলে গেছ। সেও তোমায় দেখেনি। তাই ভাবলাম কিছু খেলে কিনা।”
শেষ দিকে স্বরটা নেমে গেল ইউশার। মিনমিন করে বলল। অয়নের ঠোঁটের কোণে এক ছটা হাসি ফুটল অমনি। যাক,কেউ অন্তত ভাবে ওকে নিয়ে। বলল,
“ খাইনি,খাব। আজ অনেক প্রেশার। সাতটা থেকে সিরিয়াল পড়েছে.”
“ খেয়ে নাও আগে। পরে দেখো। শরীর না চললে মাথা চলবে কী করে?”
“ তুই খেয়েছিস?”
“ না।”
“ খেয়ে নে।”
ইউশা এক পল চুপ থেকে বলল,
“ আগে তুমি খেয়ে জানাও,তারপর।”
অয়ন মৃদূ হেসে বলল,
“ তোর আমাকে নিয়ে একটু বেশিই চিন্তা হয়, ইউশা?”
ইউশার বুক শুকিয়ে গেল প্রশ্ন শুনে। অস্থির চিত্তে ভাবল,
“ নাহলে আর কাকে নিয়ে হবে? তুমিই যে আমার সব।”
জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ হ্যাঁ মানে,ওই বড়ো মা বলছিল…”
অয়ন কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
“ আমায় নিয়ে এত ভাবিস না, ইউশা। আমি ঠিক আছি। বরং আজ একটু বেশিই ঠিক আছি মনে হচ্ছে।”
শেষ টুকুতে অয়নের স্বর উচ্ছ্বল শোনাল। যেন খুশির ছাপ বইছে গলায়। ইউশা কপাল কুঁচকে ফেলল। কাল রাতে যা হলো,যেভাবে আহাজারি করে কাঁদছিল অয়ন তাতে অমন স্বর অস্বাভাবিক না? কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না। ছোটো করে বলল,
“ আচ্ছা।”

ফোনটা রাখল অয়ন। কী ভেবে হাসল একটু। মাথায় তুশির কথা ঘুরে বেড়াল শুধু। মেয়েটার আজ ওইভাবে পালিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, সার্থর সাথে একটা বিস্তর ঝামেলা চলছে ওর। ঠিক যাচ্ছে না ওদের দাম্পত্য! আর এই ঝামেলাটুকু কি অয়নের জীবনে তুশিকে ফেরানোর দ্বিতীয় সুযোগ হতে পারে না?

সার্থর চেক আপের অ্যাপোয়েন্টমেন্ট পড়েছে সাড়ে এগারটা নাগাদ । এখন বাজে দশটা ছাব্বিশ। একেবারে তৈরি হয়ে নিচে নামল সে।
ইউনিফর্ম পরেছে৷ ডাক্তারের চেম্বার থেকে সোজা থানায় যাবে। গত সপ্তাহে ছুটি কাটিয়েছে অনেক। শরিফ জানাল,ফের দুটো চাইল্ড রেইপ কেস জমা হয়েছে। সামনে আবার বিস্তর ছোটাছুটি। ওকে দেখেই তনিমা বললেন,
“ সার্থ,খাবি না?”
সার্থ টেবিলে চোখ বোলাল। বাড়ির পুরুষ কেউ নেই এখানে। কেবল হাসনা আর মিন্তু বসে আছে। জয়নব নাহয় ঘরে খাবেন,কিন্তু বাকিরা কোথায়? ঐ চোরটাও তো নেই…
সার্থ একবার স্টোর রুমের বন্ধ দরজায় দেখল। চেয়ার টেনে বসল ধীরেসুস্থে।
তনিমা প্লেট-গ্লাস এগিয়ে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“ রুটি দেব,না পরোটা?”
“ এসব না। টোস্ট বানিয়ে দাও।”
“ আচ্ছা।”
তনিমা ঘাড় নেড়ে রান্নাঘরে চললেন। রেহণূমা দুপল উশখুশ করে বললেন,“ তুশি খাবে না?”
সার্থ বুঝল, ভদ্রমহিলা জানেনই না তুশি ওর ঘরে নেই। উত্তর দিলো,
“ পরে খাবে হয়ত।”
“ কাল রাগের বশে মেরে দিয়েছিলাম। পরে এত খারাপ লেগেছে। মাথা ঠিক রাখতে পারিনি।”
হাসনা শুধালেন,
“ তোমগো মইদ্যে অহন সব ঠিক হইছে? হইল বুজাপড়া?”
“ হয়েছে।”

এরপর আর কথা হলো না। সার্থ টোস্টের গায়ে মাখন লাগিয়ে খেল চুপচাপ। তনিমা বললেন,
“ তুশিকে দেখলাম কাল স্টোর রুমে ছিল। সব ঠিকঠাক হলে তো…”
সার্থ জবাব দিল,
“ ওর ইচ্ছে হয়েছে তাই ছিল। বিয়ে করেছি বলে তো ওর ফ্রিডম নিয়ে যাইনি। যখন মন চাইবে যাবে আমার ঘরে। এত ভেবো না।”
গুরুজনেরা বুঝলেন এদের মনোমালিন্য ঠিক করে মেটেনি। নাহলে নতুন বর-বউ এমন আলাদা থাকবে কেন? কিন্তু এ নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাইলেন না। ছেলেটা এমনিই সকালে খায় না,আজ একটু বসলো! খাক।
সার্থ ওপরের দিকে এক পল চোখ বুলিয়ে বলল,
“ অয়ন খেয়েছে?”
“ না,বাড়িতে নেই।”
“ ইউশা?”
“ ক্লাসে চলে গেল।”
“ ওহ।”
সার্থ খাওয়া শেষ করে দাঁড়াতেই তনিমা বললেন
“ তোর না আজ চেক আপে যাওয়ার কথা?”
“ যাচ্ছি।”
“ জানাস কিন্তু!”
সার্থ মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল। যখন সদরের চৌকাঠ পার করল সে,বন্ধ হলো ওই দরজাটা স্টোর রুমের দরজা আস্তে করে খুলল তুশি। প্রথমে মাথা বের করে ভালো মতো দেখল সার্থ সত্যিই গিয়েছে কিনা!
এরপর নিজের শীর্ণ শরীরটা বাইরে এনে দাঁড়াল। বা হাতে বইখাতার পাহাড়,ডান হাতে বিশাল কালো লাগেজ নিয়ে একটু দম নিলো তুশি। তারপর হুড়মুড় করে পা বাড়াল দোতলার দিকে। লাগেজের চাকা টানার খটখটে শব্দে ডায়নিং রুমের সবার নজর এদিকে ঘুরে গেল । তনিমা অবাক হয়ে বললেন,
“ ওমা,কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
মিন্তু উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ আপু, তুমি কি আবার পালাচ্ছ?”
তুশি মুখ ছোটো করে জানাল,
“ পালাতে হলে কি দোতলায় যাব? ঘরে যাচ্ছি।”
হাসনা মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,
“ ও,নাতজামাইয়ের গরে যাইতাছোস? ক্যান আর আলেদা থাকোন যাইতাছে না? আর থাকপি না তোর ইসটোর রুমে?”
তুশি লজ্জা পেলো,বিব্রত হলো। ঠোঁট উলটে হাঁটতে থাকল শুধু।
তনিমা-রেহণূমা একে অন্যের দিক চেয়ে ঠোঁট চেপে হাসলেন।
রেহণূমা বললেন,
“ তা নাস্তা কি খাওয়া হবে? নাকি ঘরে দিয়ে যাব।”
“ খাব না। কারো দিতে হবে না। যে আমাকে কথায় কথায় বকে,মারে তার নাস্তা সেই খাক।”
রেহণূমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুপাশে মাথা নাড়লেন। তুশি গলা চড়িয়ে ডাকল,
“ আসমা আপা,আসমা আপা?”
আসমা ছুটে এলো।
“ যে?”
তুশি বলল,
“ আমার ঘরে আরো কিছু ব্যাগ আছে। তুমি একটু ওপরের ঘরে দিয়ে যেতে পারবে?”
“ আইচ্ছা। ইউশা আফার ঘরে দিয়ামু?”
তুশির কণ্ঠ মিহি। খুব অস্বস্তি নিয়ে বলল,
“ না,ওনার।”
আসমা কেন যেন হাসল। সব দাঁত বের করে বলল,
“ ঠিকাছে।”

ঘরের দরজা ঠেলে বড়ো করে শ্বাস নিলো তুশি। সার্থ মাত্র তৈরি হয়ে গেছে। ওর মন কাড়া পারফিউমের গন্ধটা দেওয়ালে দেওয়ালে লেগে আছে এখনো। তুশি নরম চোখে সমস্ত রুমটায় দেখল আরেকবার। এক ফালি তৃপ্তিতে টলমল করল বুকটা। এই ঘরে ও থাকবে? এটা ওর স্বামীর ঘর,ওর ঘর! কত স্বপ্ন বুনতো এক সময়। কত কল্পনা সাজিয়েছে এই চার দেওয়ালের ছোট্ট জায়গাটাকে নিয়ে। আজ তা সত্যি হলো,তবে অন্যভাবে এই যা!

হাতের জিনিসপত্র নামিয়ে রাখল তুশি। আসমা একেকটা ব্যাগ এসে দিয়ে গেল এর মাঝে। কোলবালিশ,কাঁথা নিয়ে কাউচে রাখল তুশি। বইখাতা রাখল টেবিলে। জামাকাপড় রাখার জন্যে তিন পাল্লার চওড়া কাবার্ডের একপাশ টেনে খুলল। এই দিকটা সার্থর কাপড় দিয়ে ভরতি। ভাঁজে ভাঁজে তার জামাকাপড়! পাঞ্জাবি,শার্ট,কোর্ট, টাই প্যান্ট সব কিছু। তুশি মাঝের পাল্লা টেনে খুলতেই কুঁচকে গেল কপাল। সম্পূর্ণ খালি এখানটা। ও তড়িঘড়ি করে পরের পাল্লা টানল। এখানেও সার্থর কাপড় রাখা। কী আশ্চর্য! দুপাশের দুই পাল্লায় ওনার জামাকাপড়, তাহলে মাঝেরটা খালি কেন? এটা কি কোনোভাবে ওর জন্যে ফাঁকা?
ভাবতেই বুকের বা পাশ ছুঁয়ে একটা ঠান্ডা দুধ-সাদা স্রোত নামল তুশির। মুচকি হাসল মাথা নুইয়ে। পরপরই ভেংচি কাটল। হুহ,বিটকেলের মাথায় যতসব বিটকেলি বুদ্ধি। যেন আগে থেকে জেনে বসে আছে ও এই ঘরে আসবে। আলমারিতে জায়গাও রাখা হচ্ছে তাই? অয়ন সকালে অমন না করলে ওকে কে আনতো এখানে?
অথচ তুশির ঠোঁটের মুচকি হাসি কমল না। ওইভাবেই সার্থর কাপড়গুলোয় হাত বোলাল একবার। হঠাৎ মনোযোগ পড়ল ওর পুলিশি ইউনিফর্মের দিকে। কয়েক সেট ইউনিফর্ম এখানে! শার্ট,প্যান্ট, বেল্ট,এমনকি মাথার পিক ক্যাপটাও এক জায়গায় আলাদা করে খুব সুন্দর ভাবে গুছিয়ে রাখা। ইস,মানুষটা কত গোছালো। আর তুশি? ওর জুতো থাকে এক দিকে,জামা থাকে আরেকদিকে।
তুশি কী ভেবে যেন ইউনিফর্ম ছুঁলো। মনের ধার কেমন করে উঠল অমনি। ইউনিফর্মের শার্ট আর পিক ক্যাপটা টেনে আনল হাতে। ওরনা নামিয়ে রেখে প্রথমে শার্টটা জামার ওপর দিয়েই গায়ে পরল তুশি। কলারে নাক ডুবিয়ে লম্বা শ্বাস টানল। সার্থর শরীর থেকে ব্লুবেরির ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তুশির গা কাঁপে ওই গন্ধে৷ মাথা ঝিমঝিম করে। মনে হয় আষ্ঠেপৃষ্ঠে ও মানুষটাকে জড়িয়ে আছে। তুশি হাসল একা একা।
শার্টের নিচ থেকে তিনটে বোতাম লাগাল। তারপর ছুটে এলো আয়নার সামনে। মাথায় পরল ক্যাপটা। ওকে দেখতে কেমন লাগছে? পুলিশের বউ মনে হচ্ছে, নাকি পুলিশই! তুশি
ক্যাপ নেড়েচেড়ে দেখল নিজেকে। দুই আঙুল দিয়ে মিছিমিছি পিস্তল বানিয়ে আয়নার দিকে তাক করে বলল,
“ হ্যান সেপ!”
তক্ষুনি পেছন থেকে শুধরে দিলো কেউ। একটা নিম্নভার কণ্ঠস্বর বলল,
“ দ্যাট উইল বি, হ্যান্ডস আপ!”
তুশির বুক ছলকে উঠল,ঐ হঠাৎ গলার শব্দে। চমকে ফিরল পেছনে। খোলা দরজার সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সার্থ। দুই পকেটে দুটো হাত,শরীরটা একটু কাত হয়ে মেশানো সেথায়। গালের ভেতর জিভ ঘুরানো সেই চিরচেনা হাসিটায় লজ্জায় নুইয়ে গেল তুশি! ঝট করে ঘুরে গেল আবার। জিভ কেটে চোখ খিচে ভাবল,
“ লোকটা না মাত্র বেরিয়ে গেল? আবার এলো কী করে? আল্লাহ,মান সম্মান কিচ্ছু বাকি নেই।”
তুশি টের পেলো মেঝেতে বুটের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শক্ত পা ফেলে এগিয়ে আসছে সার্থ। কণ্ঠে তার দুষ্টুমি,
“ দেশের কোথাও দেখছি নিরাপত্তা নেই। একজন এ এসপির নিজের ঘর থেকেই তার ইউনিফর্ম চুরি হয়ে যাচ্ছে!”
তুশি মুখ গোজ করে বলল,
“ আমি চুরি করছিলাম না।”
সার্থ এপাশ থেকে ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ক্যাপ উলটো পরেছিল তুশি। হাত বাড়িয়ে ক্যাপটা ঘুরিয়ে আবার ঠিক করে দিলো ও। ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ পাথর তবে গলল?”
“ আমি পাথর নই, আমি ভালো। পাথর তো আপনি।”
“ তাহলে এই পাথরে ফুল ফুটিয়েছে কে?”
তুশি চোখ নামিয়ে নেয়।
“ আমি কী করে জানব!”
সার্থর নজর পড়ল কাউচে। বালিশ কাঁথা দেখে বলল,
“ ওগুলো ওখানে কেন?”
“ আমি ওখানে ঘুমোবো তাই।”
“ তাহলে বেডের কী কাজ?”
তুশি চটাং চটাং জবাব দেয়,
“ আমি এমনি এমনি আপনার রুমে আসিনি। এসেছি দ্বায় পড়ে। থাকব,ঘুমাব ব্যাস। এর বেশি আমার থেকে কিছু আশা করবেন না।”
সার্থ তাজ্জব হয়ে বলল,
“ তুমি আমাকে কপি করছো?”
তুশি থতমত খেয়ে গেল। আসলেই তো,কথাটা বললই তো আগেকার সেই বিটকেলের মতোন। যে এসে গম্ভীর শব্দে নিষ্ঠুরের মত ওকে দুটো লাইন বলেছিল- আমার থেকে কোনো এক্সপেকটেশান্স রেখো না।
সার্থ বলল,
“ ওখানে শোবে তুমি তাই না? আলাদা ঘুমোবে?”
তুশির মুখ শক্ত,
“ হ্যাঁ।”
“ শোয়াচ্ছি।”
সার্থ হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেল হঠাৎ। তুশি একটু বোকা বোকা হলো। লোকটা কী করতে চাইছে আবার? সার্থ দরজার বাইরে গিয়ে জোরে জোরে ডাকল,
“ আব্বাস,আব্বাস…আসমা,আব্বাসকে ডাকো।”
আসমা লনের দিকে ছুটে যায়। আব্বাস ফিরে আসে তার চেয়েও দ্রুত। সামনে দাঁড়াতেই সার্থ কাউচ দেখিয়ে বলল,
“ এটাকে এক্ষুনি রুমের বাইরে নিয়ে ফেলবে। সাথে আরেকজন নিয়ে এসো,যাও। গো ফাস্ট!”
“ জি জি।”
তুশির ঠোঁট হাঁ হয়ে গেল। আর্তনাদ করে বলল,
“ এমা কেন? আমি ঘুমোবো বললাম তো।”
ততক্ষণে আব্বাস লোক আনতে ছুটেছে। সার্থ ভেতরে আসতেই ও বলল,
“ এটা কী হলো? সোফা বাইরে কেন যাবে?”
“ এমনি।”
“ এরকম গা জোরামি করলে আবার চলে যাব।”
সার্থ খুব আস্তে দাঁত খিঁচে বলল,
“ গিয়ে দেখো। পা ভেঙে কোলে বসিয়ে রাখব। একবার নিজের ইচ্ছেয় যখন আমার রুমে ঢুকেইছ,আলাদা হওয়ার কথা ভুলে যাও।”

তুশি নাক ফোলায়। ভীষণ সাহস নিয়ে দেখাতে চায়,ও ভয় পায় না। যেই ঘুরে হাঁটা ধরল,সঙ্গে সঙ্গে হাতের কনুইয়ে হ্যাচকা টান মেরে এক ঝটকায় বিছানায় ফেলে দিলো সার্থ। তুশি চিৎ হয়ে পড়ল ওই তুলতুলে তোষকের ওপর। মাথার ক্যাপটাও খসে পড়ে গেল কোথাও।
উঠতে নিলেই বাঘের মতো তেড়ে এসে, ওর দুই হাত মাথার দুইপাশে চেপে ধরল সার্থ। মুখের ওপর ঝুঁকে বলল,
“ খুব তেজ তাই না? ভুলে যাচ্ছ আমি কে? নরম হয়েছি বলে গরম হতে পারব না?”
তুশি ছটফট করে বলল,
“ ভালো হচ্ছে না কিন্তু,ছাড়ুন!”
“ কাল না বললে স্পেস চাও? আজ নিজেই এত কাছে চলে এসছো,এখন ছাড়ি কী করে?”
তুশি কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,
“ আমি শুধু ঘুমোতে এসেছিলাম।”
“ আমার সাথে? কেন? আমাকে ছাড়া থাকতে পারছিলে না?”
“ মোটেই তা নয়। বললাম তো একটা কারণে এসেছি।”
“ আচ্ছা?”
তুশি লক্ষ্য করল সার্থর হাবভাব ভালো না। শরীরটা একটু একটু এগোচ্ছে,ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ও রেগেমেগে বলল,
“ আবার শুরু করবেন না।”
“ আমার রুমে আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি।”
“ মগের মুল্লুক নাকি?”
সার্থ হাত দুটো আর শক্ত করে ধরল। এক হাঁটু তুলে রাখল ওর কোমরের পাশে। তুশির মনে পড়ল সেই পার্টির রাতের কথা। সোফাতে সেদিনও লোকটা ওকে এইভাবে আষ্ঠেপৃষ্ঠে আটকে ফেলেছিল। অমনি হকচকিয়ে বলল,
“ কী হচ্ছে কী?”
“ কাল আমার ঘুমোতে কত কষ্ট হয়েছে জানো? সদ্য বিবাহিত পুরুষ,অথচ পাশে বউ নেই। এই ভুলের জন্যে তোমাকে একটা পানিশমেন্ট দিতে ভীষণ ইচ্ছে করছে তুশি। দেই?”
সার্থর কণ্ঠ খাদে নেমে যায়। হুট করে,হুট করেই কেমন পালটে যায় চোখমুখ। তুশি ঢোক গিলে বলল,
“ পা-নি-শিমেন কী কীসের!”
“ ঘুম হয়নি। ছটফট করেছি। ক্ষমা চাও।”
“ কীহ?”
“ না চাইলে ছাড়ব না।”
তুশি আজ আর তর্কবিতর্ক চাইল না। দরজাটা ঠা করে খোলা! তার মধ্যে বিছানায় ওকে এইভাবে চেপে ধরা হয়েছে। আব্বাসের তো লোক নিয়ে এখনই আসার কথা। মামলা শেষ করতে ঝটপট বলল,
“ ক্ষমা করে দিন,ক্ষমা করে দিন।”
সার্থ ক্রুর হাসল,
“ এভাবে না। বলো, আমি বুঝতে পারিনি আমার অপরাধ মার্জণা করুন।”
তুশি নাক-মুখ কোঁচকায়,কিন্তু বলতে নেয় কথাটা। অথচ হাঁ করতেই সার্থ বলল,
“ উহু বাংলায় না,ইংরেজিতে বলো।”
এবার তুশি মিইয়ে গেল। ফাটা বেলুনের মতো মুখ করে আওড়াল,
“ আই, ইউ, ইয়র… উফ
এত বড়ো কথার ইংরেজি আমি জানি নাকি?”
সার্থ কাঁধ উচিয়ে বলল,
“ আমি শিখিয়ে দিচ্ছি…
বলো, আই ব্যাডলি ওয়ান্ট টু টেস্ট ইয়র লিপ্স।”
“ আই…”
“ ওয়েইট!”
সার্থ এক হাত দিয়ে চটপট ওর ফোন বের করল। তুশি তব্দা খেয়ে বলল,
“ ফোনে কী করবেন?”
“ প্রমাণ রাখব। যাতে আর এরকম না করো।”
“ এসবের আবার কী দরকার…”
“ তুমি তোমার কথা বলো।”
“ কী যেন বলব?”
সার্থর মাঝে তাড়া নেই। বলে দিলো সেই আগের মত আস্তেধীরে ,
“ মিস্টার হাজবেন্ড, আই ব্যাডলি ওয়ান্ট টু টেস্ট ইয়র লিপ্স।”
তুশি চিবুক নুইয়ে নিলো। হাজবেন্ড মানে তো ও জানে। সার্থকে প্রথম বার এই সম্বোধন করবে,গাল লাল করে উচ্চারণ করল,
“ মিসটার হাজেবেন্ড আই ব্যাডলি ওয়ান্ট টু…
টেস্ট ইয়র লিপ্স!’’
সার্থ দুষ্টু হেসে ক্যামেরা নামাল। সরিয়ে রাখল পাশে। তুশি বলল,
“ হয়েছে না? এবার হাত ছাড়ুন,উঠুন৷”
“ এত তাড়া কীসের? আগে যা বললে তা করো।”
তুশি ভ্রু কুঁচকাল,
“ কী করব?”
“ টেস্ট মাই লিপ্স।”
সার্থ ঠোঁট বাড়াতেই তুশি হতভম্ব হয়ে বলল
“ এই, এটার মানে কী?”
“ মানে পরে বোঝাব। নাউ ডু ইট…”
“ আপনি নিশ্চয়ই আমার সাথে প্রতারণা করেছেন। কী যেন বলে…”
সার্থ বলে দিলো,
“ চিটার।”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ তাই। আপনি ওটাই করেছেন।”
“ করেছি।”
“ ছি, বিটকেল,বেইমান, শয়তান.”
“ এত কথা ভালো লাগছে না। যা বলেছ তা করো,নাহলে ভিডিও লিভিংরুমের টেলিভিশনে ছেড়ে দেবো।”
“ কীইইইইই?”
তুশির অগোছালো চোখটা হঠাৎ দরজায় পড়ল। তুরন্ত, থমকে গেল চেহারা। ছটফটিয়ে চাপা কণ্ঠে বলল,
“ দি-দিদুন,দিদুন…”
সার্থ নিরুৎসাহিত বলল,
“ হ্যাঁ দিদুন,তো? আজ আর বোকা হচ্ছি না।”
তুশি অসহায় কণ্ঠে বলল,
“ সত্যিই দিদুন এসছে।”
সার্থ একটা আঙুল তুশির ঠোঁটে স্লাইড করতে করতে বলল,
“ আসুক না! আজ দিদুন কেন,গোটা বাড়ির মানুষ এলেও ছাড়ব না।”
পেছন থেকে কেউ বলল,
“ তা ভালো কথা,কিন্তু দরজাটা অন্তত বন্ধ করে নাও।”
সার্থর দুষ্টুমি থমকে যায়। ঝট করে পিছু ফিরল সে। জয়নব মুচকি হেসে বললেন,
“ আমি কি একটু পরে আসব?”
সার্থ ছিটকে সরে এলো। চ সূচক শব্দ করে ঘাড় ডলল এক হাতে। তুশি চোখ মুখ খিচে উঠে দাঁড়াল কোনোরকম। দুজন দুদিকে ফিরে রইল। যেন মরে গেল অস্বস্তিতে। জয়নব গলা ঝেরে বললেন,
“ চেক আপ করবে বলেছিলে,তাই দেখতে এসেছিলাম গিয়েছ কিনা!”
“ না,থ্যাংকস। আসছি।”
কেমন তাড়াহুড়ো করে ফোনটা পকেটে তুলেই বেরিয়ে গেল সার্থ। জয়নব বললেন,
“ থ্যাংক্স কী জন্য দিলো? অসময়ে আসার জন্যে বুঝি?”
তুশির কুণ্ঠা চড়া হলো আরো। কী যে করবে বুঝতেই পারল না। পালানোর রাস্তা আছে কোথাও? উশখুশ করতে করতে নাক, গলা-ঘাড় ঘষল নিজের।
জয়নব ডাকলেন,
“ তুশিইই…বসতে বলবে না আমাকে?”
মেয়েটার সংবিৎ ফিরল বোধ হয়। কেমন হড়বড়িয়ে বলে,
“ হ্যাঁ মানে দিদুন,শুয়ে আছো কেন বোসো না।”
“ হ্যাঁ?”
“ না না,না না। মানে বসে আছো কেন দাঁড়াও না। না না, সরি সরি দাঁড়িয়ে আছো কেন বসো না।”

জয়নব হেসে ফেললেন। কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ এত লজ্জা পেতে হবে না। তোমাদের দুজনের সব ঠিক হোক আমি খুব করে চাই।”
প্রশ্রয় পেয়ে দিদুনের বুকে মাথা রাখল তুশি। নিষ্প্রভ চোখে ভাবল,
“ সব কি সত্যিই ঠিক হবে? মানুষটা যে এখন অবধি ওর অভিমানই বুঝলো না। ক্ষমাও চাইল না। আর না একটুখানি সাফাই দিলো আজও! ভালোবাসলে বলে না কেন? কেন বলছে না,তুশি সব ভুলে এসো আবার এক হই?”

“চলবে…
পর্ব বড়ো হচ্ছিল,তাই প্রথমাংশ দিলাম। পরবর্তী শীঘ্রই পাবেন। ❤️

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply