জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;১৪
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
–” তোকে বলে ছিলাম না! রাতের অন্ধকারে বেরোবি না রুম থেকে। বেরোলি কেন? এখন যা ঘটবে, তার জন্য আমাকে দায়ী করতে পারবি না।”
অতর্কিতে হামলায় তরী বেশ ভয় পেয়েছে। বাতির মৃদ্যু আলোয় তোতলাতে তোতলাতে তরী প্রশ্ন করলো;-
–” কি…কি কর…বেন আপনি?”
কোনো ভণিতা ছাড়া তরীকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জাপটে ধরলো তরঙ্গ। ভয়ের তীব্রতায় তরীর ছোট্ট শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। একই সঙ্গে ঘেমে গেছে তার শিরদাঁড়া। ভয়ের মধ্যেই, হিতাহিত বোধ শূন্য হয়ে, তরী অচেতন মনে তরঙ্গের পিঠ আঁকড়ে ধরলো। তরঙ্গ মুখ এগিয়ে নিলো তরীর কানের কাছে। কানের লতিতে ছোটো চুমু খেয়ে সুধালো সে।
–” তোর সর্বনাশ আর আমার পৃথিবী জয়।”
–” ক..কি?”
ঘোরের আবেশে তরঙ্গের কথার অর্থ স্পষ্ট করে ধরতে পারলো না তরী। শব্দ গুলো তার কানে এসে মিলিয়ে যাচ্ছিলো। অর্থের কোনো রেখাই আঁকতে পারছিল না তার মনের কোণে। তরঙ্গ ও পুনরায় কিছু বললো না। নীরবতা আষ্ঠে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো দু’জনকে। কিছুটা সময় পেরোতেই ধীরে ধীরে হুঁশ ফিরে এলো তরীর। চোখের পাতা কাঁপলো, শ্বাস প্রশ্বাসে এলো অস্থিরতা। হঠাৎ এক ঝটকায় তরঙ্গ কে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিলো সে। নিজের ভেতরের বিশৃঙ্খলাকে সামলে ওঠার আগেই; দরজা ঠেলে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন বুসরা আর সাহনারা।
অপ্রস্তুত চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলো তরী— বিস্ময় আর সংকোচ মিশে আছে তার দৃষ্টিতে। অথচ তরঙ্গের মধ্যে তেমন কোনো ভাবাবেগের চিহ্ন দেখা গেলো না। সে সব কিছুর উদ্ধে, উদাস এক স্থিরতায় আবদ্ধ। অলস পায়ে এগিয়ে গিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে, চৌকির ওপর বসে পড়লো তরঙ্গ। ঘরের ভারী নীরবতাকে চাপিয়ে আচমকাই বুসরার কণ্ঠ ছিঁড়ে বের হলো কান্নারা। বুসরার সাথে তাল মেলালো সাহনারা। দু’জনের কান্নার শব্দে নিঃশব্দ ঘরটাকে মুহূর্তেই ভারাক্রান্ত করে তুললো। তরী বুঝতে পারলো না তার কি করা উচিত। কান্না মাখা কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন বুসরা।
–” আমার সর্বনাশ হলো রে। দেওয়ান বংশের মান ডুবলো গো। আমি কি জবাব দিবো ওনাকে।”
–” এ তুই কি করলি মা। শেষে কিনা বাড়ির কাজের ছেলের কাছে শুতে এলি?”
চাচির মুখে “শুতে এলি” শব্দ দুটো কানে ভেসে আসতে; মুহূর্তের জন্য জমে গেলো তরী। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলো না সে। তার কাছে এতোটাই অপ্রত্যাশিত ঠেকলো শব্দ দুটো। যে এই সবকিছু ই অবাস্তব মনে হলো। শব্দ দুটো বড্ড অশ্লীল। অশ্লীল ভাবে ইঙ্গিত করা শব্দ অশ্লীল ই হবে। লজ্জা আর ঘৃণার মিশ্র ঢেউ আছড়ে পড়লো তার কায়াময়। রি রি করে উঠলো তরীর ভেতরটা, অপমানের কাঁটা বিঁধে বসেছে হৃদয়ের গভীরে।
কী বলবে, সেই ভাষাটুকু ও খুঁজে পেলো না সে। শব্দ গুলো ঠোঁটের কাছে এসে ও থমকে যাচ্ছে। চাচি ই তো তাকে বালিশ আনতে পাঠিয়ে ছিলেন। তাহলে হঠাৎ এমন কান্না? আর অদ্ভট কথারই বা মানে কী? আর কাজের ছেলের কথাই এলো কোথা থেকে। এখানে তো সে আর তরঙ্গ ছিলো। এবং কি এখনো আছে। প্রশ্ন গুলো মনের মাঝে ভিড় জমালো, কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না সে। অস্বস্তিকর নীরবতা তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে লাগলো। বুসরা আর সাহনারার কান্নার শব্দে তরঙ্গের দুই মামা ঘর ছেড়ে উঠোনে বেরিয়ে এসেছেন। উঠোন থেকেই হাঁক ছাড়লেন বড় মামা।
–” এতো রাতে কাঁদছে কে রে? বিয়ে বাড়িতে এসবের মানে কি?”
ভাইয়ের কন্ঠ পেতেই অন্ধকার হাতড়ে, কাচারি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সাহনারা।
–” ভাইজান এদিকে আসুন। আপনি ই বলে দিন। আমি কীভাবে মুখ দেখাবো ফারহান ভাইয়ের সামনে!”
আলামিন সরকার বুঝলেন না বোনের কথা। ঘুমের ঘোরেই খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি।
–” তোর মুখ তুই তোর ভাসুর কে দেখাতে যাবি কোন দুঃখে। তোর স্বামীকে দেখাতে পারলেই তো হলে। এসব কেমন ফাজলামি সানু।”
ভাইয়ের ধমকে মিইয়ে গেলেন সাহনারা। কান্না থামিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন তিনি।
–” তরী আর রাকিব এক ঘরে ধরা পড়েছে।”
–” কি?”
আর দাঁড়ালেন না আলামিন সরকার। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে কাচারি ঘরে ঢুকে পড়লেন তিনি। ইতি মধ্যে বেশ কিছু মেহমান বেরিয়ে এসেছে নিজেদের থাকার ঘর ছেড়ে। এতক্ষণের নিস্তব্ধ বাড়িটা সবার গুঞ্জনে মূহুর্তে রহস্যময় হয়ে উঠেছে। সবার চোখে কৌতূহল। কি হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করছে। সবাই কে সরিয়ে তরীর নিকট এসে দাঁড়ালেন আলমিন সরকার। নিজেকে যথেষ্ট গম্ভীর করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন;-
–” এসব কি শুনছি তরী মা? আমি তোমাকে নিজের মেয়ের মতোই ভাবি। আমাকে বলো মা, এখানে কি হয়েছে?”
জড়সড় হয়ে থাকা তরী আর ও একটু গুটিয়ে নিলো নিজেকে। আলামিন সরকারের কথা গুলো কানে যেতেই, তার কান্না যেন হঠাৎ করেই তীব্র হয়ে উঠলো। বুকের ভেতর জমে থাকা সব চাপা যন্ত্রণা চোখের জলে গড়িয়ে পড়তে লাগলো নিঃশব্দে।
মাথা নিচু করে বসে থাকায় তরঙ্গের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। সে এখনো সবার চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে। ঘরের অন্যরা তাকে লক্ষ্যই করেনি— নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে, গুঞ্জন তুলছে সবাই। তাদের ধারণা, সে-ই বাড়ির কাজের ছেলে রাকিব। এই ভুল ধারণার ভেতরেই ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে অস্বস্তির আবহ। অথচ সত্যিটা এখনো সবার আড়ালে।
–” আ….মি কিছু ক..করিনি মামা। বিশ্বাস করু..”
–” এখন অস্বীকার করলেই কিছু বদলে যাবে না তরী।”
–” বিশ্বাস করুন মা। আমি সত্যিই কিছু করিনি। আমি তো,,”
–” তুই কি? এখন মিথ্যে কথা বানানোর প্রয়োজন নেই তরী।”
সাহানারা খেঁকিয়ে উঠলেন। তরী ফের কেঁপে উঠলো। আজ আবার তার মনে হলো। মেয়েদের জীবনে মায়ের অস্তিত্ব থাকাটা খুব প্রয়োজন। আজ যদি তার মা বেঁচে থাকতো। তবে তাকে এভাবে অপমান করা হতো না। ফুঁপিয়ে উঠলো তরী।
–” তুই থাম সানু। বেশি কথা বলছিস তুই।”
–” তোমার কি ভাইজান। নষ্টামি তো তোমার মেয়ে করেনি। করলে বুঝতে। নাক তো আমাদের কাটলো। ওর বাপ কে আমি কি জবাব দিবো এখন?”
তরীর ওপর আসা সব অপমান নিরবে হজম করে নিলো তরঙ্গ। কোনো কথা বললো না, শুধু স্থির হয়ে রইলো সে। তার ধূর্ত মস্তিষ্ক অন্য কিছুর অপেক্ষায় আছে। তার সেই অপেক্ষা ছিল একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের জন্য— কখন বিয়ের কথাটা উঠবে! এবং সে তার ভূমিকা পালন করবে। অবশেষে তরঙ্গের অপেক্ষারা ফুরালো।
–” এখন কি চাইছিস তোরা?”
আলামিন সরকারের কথায় চোখ মুছলেন বুসরা। এগিয়ে এসে কান্না ভেজা কণ্ঠে বুসরা সুধালো;-
–” ওদের দু’জন কে বিয়ে দিয়ে দিন ভাই সাহেব।”
সহসা উঠে দাঁড়ালো তরঙ্গ। শরীরের আড়মোড়া ভেঙে, পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মামার পাশে।
–” চাচি ঠিক বলেছেন মামা। আমাদের বিয়ে পড়িয়ে দিন।”
তরঙ্গের কন্ঠ পেতেই বজ্রহতের ন্যায় বুসরা আর সাহনারা তার দিকে তাকালো। এই মূহুর্তে এখানে যেনো তরঙ্গের উপস্থিতি ওনারা আশা করেননি। থতমত খেয়ে সাহনারা প্রশ্ন করলেন;-
–” তুই কখন এসেছিস তরঙ্গ?”
–” তোমরা আসার আগেই।”
–” মানে?”
–” সহজ কথাটা বুঝতে পারছো না। তরকারি জান রাকিব ভাইয়ের সাথে না। আমার সাথে ছিলো।”
কথা শেষ করে সবার উদ্দেশ্যে কূটনীতিক হাসি ছুঁড়ে দিলো তরঙ্গ। ছেলের কথায় বিস্ময়ে ভূত দেখার মতো চমকে গেলেন সাহনারা। সহসা দুই পা পিছিয়ে গেলেন তিনি।
–” তুই কি বলছিস বাপ? এই মেয়ের হয়ে নিজের নামে মিথ্যা কথা বলছিস কেন?”
তরঙ্গ মুচকি হাসলো। অন্ধকারে তার হাসি বোঝা গেলো না।
–” তুমি জানো আমি মিথ্যা কথা বলি না। আমিই ছিলাম তরীর সাথে আম্মু। শুধু ছিলাম না। ও কে জড়িয়ে ধরেছি। এমনকি চুমু ও খেয়েছি। ওই যে, কানের পাশে। খুব নরম ওর কানটা।”
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
কালকের মতো পড়া শেষে মন্তব্য জানাবেন। যতো বেশি মন্তব্য জানাবেন। ততো তাড়াতাড়ি পরের পর্ব পাবেন। আর ছবির গানটা তরঙ্গ, তরীর সাথে মিলে গেছে তাই না।😁)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ১
-
She is my Obsession পর্ব ১২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৯
-
She is my Obsession পর্ব ৭
-
She is my Obsession পর্ব ২
-
She is my Obsession পর্ব ৬
-
She is my Obsession পর্ব ৩১
-
She is my Obsession পর্ব ৫
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২
-
She is my Obsession পর্ব ১৫