অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ২৭
এতদিন পর খালাতো ভাই রাসেলকে দেখে রিদি বিস্ময় মাখানো গলায় বলল।
“আরে রাসেল ভাইয়া! আপনি? কখন এলেন?”
রাসেল হালকা হেসে আন্তরিকতার সুরে বলল।
“এই তো মাএ, মামু আসতে বলেছিল। আমি একটু দোটানায় ছিলাম, কিন্তু তুমি এসেছ জানলে কালকেই চলে আসতাম। যাই হোক, কেমন আছো?”
রিদি ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটিয়ে সৌজন্যের সাথে বলল।
“এই তো আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি?”
রাসেল খানিকটা মাথা চুলকালো। তারপর চোখের কোণে দুষ্টুমি আর কিছুটা মুগ্ধতা মিশিয়ে ধীরলয়ে বলল।
“হুম, আলহামদুলিল্লাহ ভালো ছিলাম। কিন্তু এখন তোমার সাথে কথা বলে মনটা আরও ভালো হয়ে গেল।”
রাসেলের বাড়তি প্রশংসা শুনে রিদি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও মুখে তা প্রকাশ করল না। সৌজন্য বজায় রেখে স্থির থাকল। রাসেল পুনরায় উৎসুক হয়ে শুধাল।
“তা কতদিন আছো এখানে?”
রিদি ধীরলয়ে দায়সারা উত্তর দিল।
“সেটা আব্বু-আম্মু জানে।”
রাসেল এবার বেশ খোশমেজাজে প্রস্তাব দিল।
“চলো না, একটু ঘুরে আসি। অনেক দিন হলো গ্রাম দেখা হয় না, দুজনে মিলে ঘুরে আসি?”
রিদি সরাসরি না করে দিয়ে গম্ভীরভাবে বলল।
“না না ভাইয়া, আপনি ঘুরে আসেন। আমি যাব না।”
কিন্তু রাসেল যেন নাছোড়বান্দা। সে রিদির অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ঝট করে ওর ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। অনুনয়ের সুরে বলল।
“আরে চলো, কিছু হবে না। অনেক দিন তোমার সাথে দেখা হয় না, আজ একটু সময় কাটাই।”
রিদি বেশ বিরক্ত হলো। সে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই রাসেল একরকম জোর করে ওকে টেনে হাঁটা শুরু করল। কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ রাসেল পাথরের মতো থমকে গেল। রিদি চমকে সামনে তাকাতেই দেখল শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখ-মুখ রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। রাসেল অপ্রস্তুত হয়ে রিদির হাত ছেড়ে দিল এবং শুভ্রকে হাসিমুখে জড়িয়ে ধরে বলল।
“হেই ব্রো! ঈদ মোবারক।”
শুভ্র তাকে জড়িয়ে ধরল না। একদম শান্ত কিন্তু বরফশীতল কণ্ঠে প্রতিউত্তর দিল।
“ঈদ মোবারক।”
শুভ্র এবার তীক্ষ্ণ নজরে রিদির দিকে তাকাল। রিদি অপরাধবোধ থেকে মাথা নিচু করে ফেলল। রাসেল শুভ্রকে ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল।
“ব্রো, তুমি থাকো তাহলে। আমি আর রিদি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”
শুভ্র ল্যাপটপের মতো লৌকিকতাও যেন এক ঝটকায় বন্ধ করে দিল। সে রাসেলের দিকে তপ্ত চোখে তাকিয়ে একদম স্পষ্ট গলায় বলল।
“তোমার ঘোরার ইচ্ছে হয়েছে তো ঘুরে আসো, কিন্তু রিদিকে নিয়ে যেতে পারবে না। ইটস ইম্পসিবল।”
রাসেল শুভ্রর কথার অন্তর্নিহিত ঝাঁজটা ধরতে পারল না। সে কিছুটা অবাক হয়ে শুধাল।
“কিন্তু কেন ব্রো? অনেক দিন পর দেখা, তার ওপর ঈদ। একটু আধটু ঘুরে আসা তো যা-ই যায়।”
শুভ্র এবার রিদির দিকে একপলক তাকিয়ে রাসেলের দিকে ফিরে গম্ভীর স্বরে বলল।
“বাসায় আরও মানুষ আছে। তুমি বরং ঈশানকে নিয়ে যাও, ও এখনও আমাদের এলাকাটা ভালো করে দেখেনি। আর হ্যাঁ, আজকে যে রিদির হাত ধরলে, এই ভুলটা নেক্সট টাইম আর করবে না। ডোন্ট ইউ এভার ডেয়ার টু টাচ হার এগেইন। না হলে কী হবে, আমি নিজেও জানি না। আই উইল মেক ইউ রিগ্রেট।”
রাসেল আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না। সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই শুভ্র রিদির হাত শক্ত করে চেপে ধরে একরকম টেনে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। রাসেলের মাথার ওপর দিয়ে যেন সব কিছু বয়ে গেল। সে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ধুর! মনটাই খারাপ হয়ে গেল। এতদিন পর নিজের ক্রাশের সাথে দেখা হয়েছে, কত আশা করেছিল একটু ঘুরবে, সময় কাটাবে কিন্তু শুভ্র সব আশায় জল ঢেলে দিল।
শুভ্র রিদিকে প্রায় টেনেই ছাদের নির্জনতায় নিয়ে এল। রিদি নিজের হাতটা ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে বলল।
“ছাড়ুন! আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই। আপনি একটা আস্ত কিপটে।”
শুভ্র রিদির কবজিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখেমুখে তখন আগ্নেয়গিরির লাভা। সে রিদির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে একদম স্পষ্ট গলায় বলল।
“শোন, আমি একদম সোজা সাপটা কথা বলতে পছন্দ করি। তুই রাসেলের থেকে দূরে থাকবি। ইটস এ ওয়ার্নিং। ওর আশেপাশেও যেন তোকে না দেখি।”
রিদি অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধাল।
“কিন্তু কেন? রাসেল ভাইয়া কী করেছে? অযথা কেন ওনার সাথে কথা বলব না?”
শুভ্র এবার রাগে দাঁতে দাঁত চেপে ধরা গলায় বলল।
“রিদি, আমি এসবের কোনো কৈফিয়ত দিতে চাই না। তোকে দূরে থাকতে বলেছি মানে তুই দূরেই থাকবি। দ্যাটস ইট।”
রিদি কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে পারল না রাসেল কী এমন অপরাধ করল। সে জেদের সুরে পালটা প্রশ্ন করল।
“আপনি তো অদ্ভুত মানুষ! আমি কারণ ছাড়া একটা মানুষের সাথে কেন কথা বলা বন্ধ করব?”
শুভ্রর মাথা রীতিমতো গরম হয়ে যাচ্ছে। রিদির এই তর্কা-তর্কি ওর সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে একটা চড় বসিয়ে গাল লাল করে দিতে। সে কোনোমতে লম্বা শ্বাস ফেলে রাগটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। তারপর বেশ গম্ভীর স্বরে বলল।
“আমার এখন তোর সাথে ফালতু তর্ক করার একদম ইচ্ছে নেই। আমি বলেছি মানে ওর সাথে কথা বলবি না। ডোন্ট আর্গু উইথ মি।”
রিদি মুখ বাঁকিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল।
“আমি আপনার কথা শুনতে বিন্দুমাত্র বাধ্য নই।”
এবার শুভ্র হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। এক ঝটকায় রিদিকে নিজের বুকের একদম কাছে টেনে আনল। শুভ্রর তপ্ত আর রাগী নিঃশ্বাস রিদির কপালে এসে আছড়ে পড়ছে। সে হিসহিসিয়ে ঠান্ডা গলায় শুধাল।
“আমার কথা শুনতে তুই বাধ্য। জাস্ট ডোন্ট ফরগেট আই এম ইয়োর হাজব্যান্ড। তোর ভালো-মন্দের ওপর আমার পুরো অধিকার আছে। এরপরে যদি আমি ওকে তোর আশেপাশে দেখি, তবে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না। মাইন্ড ইট!”
বলেই সে পকেট থেকে দশ টাকার কয়েকটা কচকচে নোট, বিশ টাকার নতুন নোট, একশো টাকার চকচকে নোট আর সাথে এক হাজার টাকার একটা নতুন নোট সবগুলো রিদির হাতের মুঠোয় একরকম গুঁজে দিয়ে গটগট করে ছাদ থেকে নেমে গেল।রিদি হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে একদম থমকে গেল। এতগুলো নতুন আর কচকচে নোট দেখে ওর চোখ জোড়া যেন আস্ত রসগোল্লা হয়ে গেছে। প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও পরক্ষণেই ওর মনে পড়ল ও সালামি চেয়েছিল। তার মানে এগুলো সব সালামির টাকা! রিদি খুশিতে আত্মহারা হয়ে দ্রুত টাকাগুলো গুনে দেখল পুরো দুই হাজার টাকা!
পুকুরপাড়ে একলা বসে পুকুরের শান্ত জলে মাটির ঢেলা ছুড়ছিল শুভ্রা। মনটা ওর একদম ভালো নেই, আর এই সবকিছুর মূলে ওই ঈশান। একটুখানি দুষ্টুমি করে উইশ করেছিল বলে ওইভাবে বাচ্চাদের মতো ভাইয়ার কাছে বিচার দিতে হলো? স্রেফ ওর জন্যই আজ বড় ভাইয়ার কাছে কড়া বকুনি খেতে হয়েছে।
হঠাৎ শুভ্রার পাশে এসে নিঃশব্দে বসল ঈশান। শুভ্রা আড়চোখে একবার তাকে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে অভিমানে গজগজ করে উঠল।
“এখান থেকে চলে যান আপনি। আমি কোনো সালামি-টলামি নেব না, লাগবে না আপনার টাকা।”
ঈশান মনে মনে হাসল। সে-ও একটা মাটির ঢেলা তুলে নিয়ে জুতমতো পুকুরে ছুড়ে মারল। তারপর বেশ উদাসীন গলায় বলল।
“তোমাকে কে বলল আমি তোমাকে টাকা দিতে এসেছি? আমি তো এখানে এমনিই একটু বসে থাকতে এসেছি।”
শুভ্রা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঈশানের দিকে তাকাল। ঈশান এবার দাঁত বের করে এক গাল হেসে দিয়ে শুধাল।
“কী হলো? এইভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছো কেন?”
শুভ্রা রাগে গলার স্বর সপ্তমে চড়িয়ে বলল।
“আপনার সাথে আমি কথাই বলব না ঈশান ভাইয়া। থাকেন আপনি এখানে বসে, আমি গেলাম।”
বলেই শুভ্রা ঝটকা মেরে উঠে যেতে চাইল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে ঈশান শুভ্রার ডান হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল। আচমকা এই টানে শুভ্রা ভারসাম্য সামলাতে না পেরে সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল ঈশানের প্রশস্ত বুকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন চারপাশ থমকে গেল। ঈশান শক্ত করে শুভ্রার কোমর জড়িয়ে ধরে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। মেয়েটা যে এত পলকা আর দুর্বল, তা ওর জানা ছিল না। শুভ্রা না চাইতেও ঈশানের ঘামভেজা মুখটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। ঈশান চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে রাখায় ওর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়েছে। শুভ্রা যেন ঘোরের মধ্যে একধ্যানে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। ধীরে ধীরে ঈশান চোখ মেলল। শুভ্রাকে অতটা কাছ থেকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। গলা পরিষ্কার করতে সে হালকা কেশে উঠল। শুভ্রার ঘোর কাটল। সে তড়িঘড়ি করে ঈশানের বুক থেকে সরে গিয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু ঈশান আবার টান দিয়ে ওকে নিজের পাশে বসিয়ে দিল। শাসন মেশানো নরম গলায় বলল।
“আরে! কোথায় যাচ্ছ? বসো এখানে। আমি কি এখানে একা একা বসে থাকব নাকি?”
শুভ্রা ঠোঁট উল্টে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল।
“তাতে আমি কী করব? আপনি এখানে একা বসে থাকবেন নাকি বউ নিয়ে বসে থাকবেন, সেটা তো আপনার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।”
‘বউ’ শব্দটা কানে যেতেই ঈশান হঠাৎ কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। সে দুই হাত পেছনে মাটিতে ভর দিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
“আহারে! বউ! এই শব্দটা আর মুখে এনো না। শুনলেই পরানে লাগে, কলিজাটা পুড়ে খাক হয়ে যায়।”
শুভ্রা ভ্রু কুঁচকে ওর নাটকীয়তা দেখে অবাক হয়ে শুধাল।
“এতই যখন জ্বালা, তো বিয়ে করে নিলেই তো পারেন?।”
ঈশান একটা লম্বা শ্বাস টেনে স্মৃতিচারণ করার মতো করে বলল।
“জানো, যখন আমার বয়স মাত্র সতেরো ছিল, তখন একবার আমতা আমতা করে আব্বুকে বিয়ের কথা বলেছিলাম। আব্বু সেদিন হাতের কাছে থাকা ডালের ঘুঁটনি নিয়ে যে দৌড়ানি দিয়েছিল না! সেই থেকে বিয়ের কথা আর মুখেও আনি না।”
শুভ্রা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঈশানের বলার ভঙ্গি দেখে সে খিলখিল করে হেসে উঠল। ঈশান সরু চোখে ওর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে তপ্ত গলায় বলল।
“তুমি হাসছ? আর এদিকে আমার পরান পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে!”
শুভ্রা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে বলল।
“আহারে! ইস! কী কষ্ট আপনার!”
ঈশান আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি সুর করে গেয়ে উঠল।
-বিয়ার বয়স হয়ছে আমার-
-আপনারো তো কম না-
-দুইজনে এক হয়য়া গেলে-
-বলেন না গো কেমন হয়-
ঈশানের গান গাওয়ার ভঙ্গি দেখে শুভ্রার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার উপক্রম। ঈশান অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শুভ্রার দিকে। হাসলে মেয়েটার দুই গালে ছোট ছোট টোল পড়ে ইশ, কী মিষ্টি লাগে দেখতে! কিন্তু এই মিষ্টির স্বাদ নেওয়ার অধিকার ঈশানের নেই, তাই সে তড়িঘড়ি করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। আকাশের চাঁদে হাত দেওয়ার মতো বোকামি সে করতে চায় না। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে ঈশান শুধাল।
“তা ম্যাডাম, আপনার রাগ কি এবার একটু কমেছে?”
শুভ্রা হাসি থামিয়ে একটা লম্বা নিশ্বাস নিল। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল।
“তার মানে আপনি এতক্ষণ আমার রাগ ভাঙানোর জন্যই এই ঢং করছিলেন?”
ঈশান ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে অবলীলায় বলল।
“উমম, ধরো তাই।”
শুভ্রা এবার মুখ ঘুরিয়ে জেদের সুরে বলল।
“এত সহজে রাগ ভাঙেনি আমার। যদি সত্যি রাগ ভাঙাতে চান, তবে আমার একটা কথা রাখতে হবে।”
ঈশান উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“বলো, কী কথা?”
শুভ্রা চোখ উজ্জ্বল করে জানাল।
“আসলে অনেক দিন ধরে গ্রামটা ভালো করে দেখা হয় না। আমার সাথে গ্রাম ঘুরতে বের হতে হবে। গ্রামে প্রচুর পেয়ারা আর আম গাছ আছে, ওখান থেকে ফল চুরি করতে হবে।”
শুনেই ঈশানের চোখ চড়কগাছ। সে বিষম খেয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
“হোয়াট! ফল চুরি?”
শুভ্রা কাঁধ উঁচিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল।
“হ্যাঁ। ডিসিশন আপনার যাবেন কি না। না গেলে নাই, আর আপনার সাথে আমার কোনো জন্মেও কথা নেই।”
রাসেলকে এবার চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে ইমন, মিহি আর পাখি। উঠোনময় এক চোট দৌড়ানি চলছে সালামির জন্য। উপায়ান্তর না দেখে রাসেল শেষমেশ জান বাঁচাতে বড় একটা পেয়ারা গাছে চড়ে বসল। মিহি নিচ থেকে গাছের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“ভাইয়া, ওভাবে ঝুলে থেকে লাভ নেই। আপনি কি আর নামবেন না? যখনই নামবেন, তখনই ধরব!”
রাসেল মগডালে বসে কাঁচুমাচু মুখে বলল।
“বোন, দেখ। আমি একজন বেকার মানুষ। চাকরি-বাকরি কিছু করি না। আমি এত টাকা কই পাব? তোদের তিনজনকে ৫০ টাকা দিচ্ছি, যা সবাই মিলে দোকানে গিয়ে কিছু খেয়ে আয়।”
ইমন দুই কোমরে হাত দিয়ে ত্যাড়ামি করে বলল।
“আমাদের কি তোমার কাছে ভিক্ষুক মনে হয়? যে ৫০ টাকা দিবা আর আমরা অমনি ভিক্ষা নিয়ে চলে যাব?”
পাখি এবার সুর মিলিয়ে কড়া গলায় বলল।
“দেখেন রাসেল ভাইয়া, ভালোই ভালোই টাকা দিয়ে দেন বলছি। নাহলে কিন্তু আমরা ছাড়ার পাত্র নই। খবর আছে আপনার!”
রাসেল এবার গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে আয়েশ করে বসল। অবজ্ঞার সুরে বলল।
“একটা পয়সাও দেব না। কী করবি তোরা? দেখি কী করতে পারিস।”
মিহি এবার রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গাছে ধাক্কা দিতে শুরু করল। ইমন আর পাখিও দমে যাওয়ার পাত্র নয়, ওরাও যোগ দিল। গাছটা কিছুটা ছোট হওয়ায় ধাক্কার চোটে মড়মড় করে নড়তে শুরু করল। মনে হচ্ছে এখনই ডালপালাসহ ভেঙে পড়বে। রাসেল ওপর থেকে ভয়ার্ত চোখে ডাল শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠল।
“আরে আরে! কী করছিস তোরা? থাম বলছি! পড়ে যাব তো!”
ইমন নিচ থেকে পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে চিল্লিয়ে বলল।
“টাকা না দেওয়া পর্যন্ত তুমি ওখানেই বসে থাকো। আর আমরা নিচ থেকে তোমাকে দোল দেই। এনজয় দা রাইড, ব্রো!”
ঠিক সেই মুহূর্তে শুভ্র ফোনে কথা বলতে বলতে ঘর থেকে উঠোনে বেরিয়ে এল। খুদে বাহিনীর এই কাণ্ডকারখানা দেখে সে কড়া গলায় ধমক দিয়ে উঠল।
“কী হচ্ছে এখানে? গাছটাকে এইভাবে দোলাচ্ছিস কেন তোরা?”
শুভ্রর গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে যেতেই ইমন, পাখি আর মিহি চমকে গিয়ে তটস্থ হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। শুভ্র তখনো গাছের মগডালে বসে থাকা রাসেলকে খেয়াল করেনি। সে ভ্রু কুঁচকে পুনরায় শুধাল।
“গাছটাকে এভাবে দোলালি কেন?”
ইমন কাঁচুমাচু মুখে বলল।
“আসলে রাসেল ভাইয়ার কাছে সালামি চেয়েছিলাম। উনি টাকা দেওয়ার ভয়ে গাছে উঠে বসে আছেন, তাই ওনাকে নামানোর জন্য সবাই মিলে একটু দোল দিচ্ছিলাম।”
ইমনের কথায় শুভ্র এবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে গাছের দিকে তাকাল। দেখল রাসেল ডাল আঁকড়ে ধরে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। শুভ্রকে দেখে রাসেল অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁত বের করে একটু হেসেই ফেলল। সে ওপর থেকেই কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে বলল।
“আসলে ব্রো, সবাই যে হারে টাকা চাইছে, এতগুলো টাকা দেওয়া কি হুট করে সম্ভব বলো?”
শুভ্র রাসেলের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার ফোন কানে ধরে কথা বলতে বলতে সামনের দিকে এগোতে লাগল। ঠিক তখনই রাসেল সুর পালটে হঠাৎ বেশ দরাজ গলায় বলে উঠল।
“দিব দিব, তোদের সবাইকে টাকা দিব। কত টাকা লাগবে বল তোরা? আরে, আমি তো এতক্ষণ সবার সাথে জাস্ট মজা করছিলাম!”
রাসেলের এই ভোলবদল দেখে শুভ্রর পা দুটো থমকে গেল। সে খানিকটা অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল। যা দেখল, তাতে তার রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাতের ফোনটা কানের পাশে সজোরে চেপে ধরল সে মনে হচ্ছে অতিরিক্ত চাপে ফোনটা এখনই মড়মড় করে ভেঙে ফেলবে।সামনে এসে দাঁড়িয়েছে রিদি। সে ভ্রু কুঁচকে অবাক বিস্ময়ে গাছের দিকে তাকিয়ে রাসেলের কাণ্ড দেখছে। রাসেল মূলত রিদিকে দেখেই টাকা দিতে রাজি হয়েছে। আর যাই হোক, নিজের ক্রাশের সামনে অন্তত নিজেকে ফকির প্রমাণ করাটা বড্ড লজ্জার বিষয়।
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ২
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১২