#শেষ_পাতায়_সূচনা [৫৩.২]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
[গল্পের শেষের কথাগুলো অবশ্যই পড়বেন।]
দিন পেরিয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ পেরিয়ে মাস কেটে যায়। দেখতে দেখতে মিসেস শেখের মৃত্যুর দেড় মাস পার হয়ে যায়। সবকিছু আবার আগের নিয়ম মতো চলতে শুরু করে। যে যার জীবন, কাজকর্ম, সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
পরপর দু’টো ক্লাস শেষ করে ক্যান্টিনের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেয় জিনিয়া। একটু চা-কফির ভীষণ প্রয়োজন এখন তার। একেতো টানা দেড় ঘন্টা বসে ছিল, তার উপর গতরাতে সে আর তাজওয়াদ চুরি করে আইসক্রিম খেয়েছিল। তাজওয়াদকে অবশ্য সে নিজে বেশি খেতে দেয়নি, কিন্তু সে অনেকটা আইসক্রিম খেয়ে ফেলেছিল। যার দরুণ আজ তার গলাটা ব্যথা করছে।
অর্ডার কাউন্টার থেকে লেবু, আদা, এবং পুদিনাপাতা দিয়ে তৈরি রং চা নিয়ে এসে বসে ভার্সিটির মাঠের একটা বটগাছের নিচে জিনিয়া। গরম গরম কয়েক চুমুক চা খাওয়ার পর একটু রিলিফ ফিল করলে, সে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে কল করে তার প্রিয় পুরুষটির কাছে।
টনি পনেরো দিন হলো একটা প্রাইভেট কলেজে চাকরি নিয়েছে। মূলত পূর্ণতাই তাকে এমনটা করতে বলেছে। কারণ টনি ও জিনিয়ার হাবভাব দেখে বুঝা যাচ্ছে তারা নিজেদের রিলেশনটা নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস। ভবিষ্যতে সংসার করার প্ল্যান আছে তাদের। আর এমনটা হলে, টনির নিজের তো কিছু একটা করতে হবে। নাহলে জাওয়াদ দিবে তার বোনকে টনির হাতে?
পূর্ণতা টনিকে তার কোম্পানিতেই ঢুকতে বলেছিল, কিন্তু টনি বরাবরই প্রখর আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ। সে নিজের যোগ্যতায় কিছু করে জাওয়াদের সামনে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে চায়। তাই সে পূর্ণতার কোম্পানিতে যায় নি।
টনির তখন লাঞ্চ আওয়ার চলছে। জিনিয়ার ভার্সিটির কাছেই টনির কলেজ। লাঞ্চ আওয়ার শুরু হতেই টনি বাইক ছুটিয়েছে প্রিয়তমার কাছে আসার জন্য। তাই জিনিয়া কল করলেও সে ধরতে পারে না। জিনিয়া এতে অবশ্য কিছু মনে করে না। সে ভাবে, নতুন নতুন কাজে যোগদান করেছে, তাই হয়ত টনি চাপে আছে। সে ফোনটা কোলের উপর রেখে আবারও চা খাওয়ায় মনযোগ দেয়।
কিন্তু তার শান্তিকে অশান্তিতে পরিণত করতে সেখানে আসে সিফাত ও তার কয়েকজন আমচা-চামচারা। সিফাত এসেই সোজা জিনিয়ার পায়ের সামনে হাঁটু গেঁড়ে হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে বসে পড়ে। চার্মনেসে ভরপুর সিফাত মুখটা খানিকটা উজ্জ্বল করে বলল–
—জানি না, কিভাবে নিজের মনের কথা প্রেয়সীকে জানাতে হয়। তবে আজ আমি আমার মনের কথা তোমায় জানাতে চাই। আই লাভ ইউ জিনিয়া। ভার্সিটিতে তোমাকে প্রথম দিন দেখেই মন দিয়ে বসেছিলাম। তোমাকে নিজের ফাইনাল ডেস্টিনিশন বানাতে চাই আমি। তুমি কি হবে আমার জীবনের ফাইনাল ডেস্টিনিশন? উইল ইউ ম্যারি মি?
জিনিয়া কতক্ষণ তব্দা মেরে বসে থাকে। বিষয়টা বুঝতে তার কিছুটা সময় লাগে। আশেপাশে তখম সবাই চিয়ার-আপ করছে জিনিয়াকে সিফাতের প্রপোজাল এক্সেপ্ট করে নিতে। টনি ততক্ষণে সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। ভার্সিটিতে ঢোকার পরপরই জিনিয়ার একফ্রেন্ডের সাথে তার দেখা হয়েছিল, তার কাছ থেকেই জেনেছে জিনিয়া নাকি ক্যান্টিনের এখানে এসেছে।
টনি ক্যান্টিনে এসে জিনিয়াকে খোঁজার সময় এই গাছতলায় জটলা দেখে এগিয়ে আসে। তারপরই পুরো ঘটনাটা তার চোখের সামনে ঘটে। টনি রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে এগিয়ে যায় সিফাতের দিকে। আজ একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে এই লুচ্চা ব্যাটার।
পূর্বেও বহুবার জিনিয়াকে ডিস্টার্ব করেছে এই ছেলে, কিন্তু টনি বউয়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোন সমস্যা সৃষ্টি করতে চায় না বলে ঝামেলা করেনি এতদিন। কিন্তু আজ যেন সবকিছু সহ্যের বাহিরে চলে গিয়েছে। সিফাত জানে টনি-জিনিয়া রিলেশন আছে তারপরও আজ ভার্সিটিতে কতগুলো স্টুডেন্টের সামনে প্রপোজ করলো তার প্রেয়সীকে। এসব সে প্রেমিক পুরুষ হয়ে সহ্য করতে পারে বুঝি?
জিনিয়া সিফাতকে রিজেক্ট করার জন্য মুখ খুলবে তখনই টনি হাওয়ার বেগে ধেয়ে এসে সিফাতের মুখে দেয় এক জোরদার পাঞ্চ। সিফাত ছিটকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়ে। টনি একটা দিয়েই থেমে থাকে না, সিফাতের পেটের উপর চেপে বসে উত্তম-মধ্যম দিতে থাকে। সিফাতের বন্ধুরা এসে টনিকে পেছন থেকে ঝাপটে ধরে সরাতে চায় তাঁকে সিফাতের উপর থেকে, কিন্তু টনির মধ্যে যেন অসুরে শক্তি ভর করেছে। এমনিতে টনি বক্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ান রয়েছে। তাই তাকে টলানো একটু কষ্টকরই বটে। জিনিয়াও এগিয়ে আসে না টনিকে থামাতে। খাক কয়েকটা মা”র শয়তানটা, এতে যদি উচিত শিক্ষা হয়।
আরো কয়েক মিনিট সিফাত মা”র খাওয়ার পর যখন তার চোখ ও ঠোঁটের কোণ দিয়ে র”ক্ত পড়তে থাকে, তখন জিনিয়া গিয়ে টনিকে সরিয়ে আনে তার উপর থেকে। টনি আসতে চাইছিল না সিফাতের উপর থেকে, জিনিয়া গিয়ে শান্ত গলায় দু’বার বলতেই সে চুপচাপ সরে আসে সিফাতের উপর থেকে। টনির রাগ তখনও আকাশচুম্বী। সে আশেপাশের কারো তোয়াক্কা না করে জিনিয়ার কোমড় চেপে সরে তাঁকে নিজের সাথে লাগিয়ে নেয়। তারপর রাগে হিসহিসিয়ে বলল–
—আমার বউয়ের আশেপাশেও যদি তোর নোংরা ছায়া দেখেছি, তাহলে সেদিনই হবে তোর শেষ দিন। আর সবাই শুনে রাখুন, এই মেয়েটি আমার প্রেয়সী, আমার ব্যক্তিগত নারী। কোন ছেলে এর প্রেমে পিছলে পড়ে প্রপোজ করতে আসার আগে এই কুকুরের অবস্থা স্মরণ করে আসবেন।
সবাই অবাক হয়ে টনির দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটার ফর্সা মুখশ্রী গরমে নাকি অতিরিক্ত রাগে লাল হয়ে আছে সেটা কেউই ঠাহর করতে পারল না। টনির মা”রার হাত আর হুমকি-ধমকি শুনে সবাই ভেবেই নেয় ছেলেটা বোধহয় ক্ষমতাবান কেউ। মেয়েরা তো টনির উপর ক্রাশ খেয়ে উল্টে যায়। টনি আর সময় ব্যয় না করে জিনিয়ার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায় নিজের সাথে।
টনিকে আজকের মতো এত রাগতে কখনোই দেখেনি জিনিয়া। তার বর্তমানে ভীষণ ভয় করছে টনিকে। রেগে হুশ হারিয়ে তাকেই না একটা লাগিয়ে দেয়। সে চুপচাপ উঠে বসে টনির বাইকের পেছনে। টনি বাইক হাই আ্েলস্পিড তুলে তার অফিসের পাশের একটা ক্যাফেতে যাওয়ার জন্য। এত স্পিডে বাইক চলছে দেখে জিনিয়া ভয় পেয়ে যায়। তাই সে টনির কাঁধ চেপে ধরে ভয়ার্ত গলায় বলল–
—জুনায়েদ স্পিড কমান বাইকের, আমার ভয় লাগছে ভীষণ।
মায়ের মৃত্যুর পর জিনিয়া আর আগের মতো নেই। অনেকটাই ভেঙে পড়েছে সে। যার প্রমাণ তার আশেপাশের লোকেরাই। সবাই তাকে আগলে চোখে চোখে রাখে এখন। টনিও এর ব্যতিক্রম নয়। টনি সাথে সাথেই বাইকের স্পিড কমিয়ে চালাতে থাকে। বাইকের স্পিড কমছে দেখে জিনিয়ার ভয়ও কমে যায়।
_______________________________
জাওয়াদ আজ অফিসে লাঞ্চ নিয়ে যায়নি। পূর্ণতা অফিসে যায়নি বলে সেই জাওয়াদের জন্য লাঞ্চ রেডি করে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। গতকালই তাজওয়াদের মান্থলি ক্লাস টেস্ট গুলো শেষ হয়েছে বলে আজ থেকে আগামী দুইদিন তার স্কুল ছুটি। তাই সেও মায়ের আঁচল ধরে হেলতে দুলতে বাবার কাছে যাওয়ার জন্য হাঁটা দেয়।
অফিসে এসে পৌছাতেই তাজওয়াদ লাফিয়ে-কুদিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। সে মায়ের সাথে রেশ করছে, তাদের মধ্যে কে আগে পাপার কাছে পৌছাতে পারে। পূর্ণতা যদিও বরাবরের মতোই ছেলের কাছে ইচ্ছে করেই হেরে যাবে, তাই সে তাজওয়াদের পেছন ডেকে বলল–
—আদর, দৌড়ায় না সোনা বাবা। পড়ে গেলে কিন্তু মাম্মা বকা দিবো।
তাজওয়াদ দৌড় থামিয়ে মায়ের দিকে ফিরে জিভ দেখিয়ে বলে–
—আমি বুঝি তো, তুমি আমাকে হালানোর জন্য এতা বলচো। তাই না মাম্মা? কিন্তু তাজ হালবে না। আমিই পাপাল কাছে তোমাল আগে যাবো।
পূর্ণতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–
—আচ্ছা যেও। কিন্তু এখন দৌড়াদৌড়ি থামাও। কারো সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যাবে বাবা।
কে শোনে কার কথা! তাজওয়াদ দৌড় লিফটে উঠে যায়। পূর্ণতা আস্তে-ধীরেই উঠে। জাওয়াদের অফিসের সবাই পূর্ণতা ও তাজওয়াদের পরিচয় জানে। তাই সবাই পূর্বের থেকে একটু বেশিই সমীহ করে তাদের। তাজওয়াদ তো তার তোতলা তোতলা পাকা কথাতেই সকলের মন জয় করে নিয়েছে।
লিফট নির্দিষ্ট ফ্লোরে এসে থামতেই তাজওয়াদ সবার আগে বেরিয়ে আবারও ছুট লাগায়। মাঝে অনেকেই তাকে কোলে নিয়ে আদর করতে চায়, কিন্তু তাজওয়াদ আজ সবার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে দৌড়াতে থাকে পাপার কেবিনের উদ্দেশ্য।
একসময় সে পূর্ণতার আগেই জাওয়াদের কেবিনে ঢুকে পড়ে। মা’কে হারিয়ে তাজওয়াদ তো ভীষণ খুশি। তাই সে তার পাপার চেয়ারে উঠে খুশিতে লাফাতে থাকে। কিন্তু তার এই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কারণ বিকট এক ধমকে বেচারা ভয় পেয়ে চেয়ার থেকেই নিচে পড়ে যায়।
নিচে পড়ে গিয়ে তাজওয়াদ কাঁদতে থাকে। অশ্রুসিক্ত চোখে সে ধমক দেওয়া ব্যক্তিটির দিকে তাকায়। ব্যক্তিটি হতো আভিরা। সে তাজওয়াদের সামনে এসে কর্কশ গলায় বলল–
—এই ছেলে, কারো রুমে বা কেবিনে ঢুকতে গেলে পারমিশন নেওয়া লাগে জানো না? তোমার মা কোন ম্যানার্স শেখায় নি তোমাকে? স্টুপিড কোথাকার।
তাজওয়াদ কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—আমাল মাম্মিকে নিয়ে কিছু বলবেন না আন্তি। আমাল মাম্মি আমায় চব চিকিয়েছে। এতা আমাল পাপাল অফিস, তাই আমি এচেছি পালমিশন না নিয়ে।
আভিরা আগের থেকেও রুক্ষতা নিয়ে বলল–
—তোমার বাবার অফিস হয়েছে তো কি হয়েছে? এটা একটা কাজের জায়গা, বাসা না। এখানে মিনিমাম ম্যানার্স মেনে চলা তোমার পারিবারিক শিক্ষাকে প্রকাশ করে।
আভিরা এমন ধমকে ধমকে বলা কথাগুলো ছোট তাজওয়াদকে ভয় পাইয়ে দেয়। সে চোখ কচলিয়ে কাঁদতে থাকে। এরই মাঝে পূর্ণতা সেখানে চলে আসে। সে আসলে বাহিরে একজন স্টাফের সাথে জাওয়াদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিল।
হাস্যোজ্জ্বল ছেলেকে এমন কাঁদতে দেখে পূর্ণতা ভরকে যায়। সে তাড়াতাড়ি করে তাজওয়াদের কাছে এসে তাকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, সে কেন কাঁদছে।
তাজওয়াদ তখন ফুপাতে ফুপাতে বলল–
—আন্তিতা আমাকে বীচন বুকি দিচে। স্টুপিড বলেচে, আমি পাপাল কেবিনে ঢুকে চেয়ার উঠেছি দেখে অনেক জোলে একতা ধমক দিয়েছে তাই আমি ভয় পেয়ে নিচে পলে গেছি।
কথাগুলো বলে তাজওয়াদ পূর্ণতার গলায় মুখ গুজে কাঁদতে থাকে। এদিকে এসব কথা শুনে পূর্ণতার মাথা গরম হয়ে যায়। সে চোখ ঘুরিয়ে আভিরার দিকে তাকালে দেখতে পায়, আভিরা নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কোন অপরাধবোধ নেই।
—ওর বাবার কেবিনে ও ঢুকেছে। এমন তো না কেবিনে মিটিং চলছে। তাহলে তাজওয়াদকে এমন করে ধমক দেওয়ার কারণটা কি জানতে পারি আভিরা?
—তোমার ছেলে এসেই চেয়ারের উপর উঠে লাফাতে থাকে। আর মিটিং না থাকলে কি হয়েছে, এটা তো বেসিক ম্যানার্সের মধ্যে পড়ে কোথাও গেলে পারমিশন নিয়ে প্রবেশ করা। যা তুমি তোমার ছেলেকে শিক্ষা দাও নি।
আভিরার কথা শুনে পূর্ণতার রাগের পারদ আরো বাড়তে থাকে। সে তাজওয়াদকে কোলে তুলে জাওয়াদের চেয়ারে বসিয়ে দেয়। তারপর আভিরার সামনে এসে দৃঢ় গলায় চোখে চোখ রেখে বলল–
—আমি আমার ছেলেকে কি শিক্ষা দিয়েছি আর কি দেই নি সেটা তোমার না জানলেও চলবে। তবে আমার মনে হচ্ছে, তোমার বাবা-মা তোমায় ভালো সন্তান হওয়ার শিক্ষা দিতে পারেন নি। নাহলে এইটুকু একটা বিষয় নিয়ে এত বড় সিনক্রিয়েট করতে না। তাও একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার সাথে।
আভিরা রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যায়। সে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল–
—তোমার বাবা-মা কি শিক্ষা দিয়েছেন? এটাই কি, নিজের জন্ম পরিচয়হীন ছেলেকে আরেকজনের নামে চালিয়ে দেওয়া? কই এতদিন তো শুনি নি, মি.জাওয়াদের সন্তান আছে। আর সেই সন্তান এই বাচ্চাটি। শুরুতে যখন দেখা হয়েছিল, তখন তুমিও তো অপরিচিতের মতো ব্যবহার করতে।
রাতারাতি একমাসের মধ্যে এই বাচ্চা মি. জাওয়াদের হয়ে গেলো। পরের পাপ অন্যের ঘাড়ে চেপে দেওয়ার শিক্ষা তো দেখছি তোমার বাবা-মা তোমায় ভালোই দিয়েছে।
আভিরা নিজের নিন্মমানের ভাবনাগুলোই পূর্ণতার সামনে প্রকাশ করে। আসলে সে জাওয়াদের স্ত্রী-সন্তান হিসেবে পূর্ণতা ও তাজওয়াদকে কিছুতেই মানতে পারছে না। সবটা প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই তার মাথায় এসব ভাবনাই ঘুরছিল। আজ তা উগলেই দিল।
আভিরা তার কথা শেষ করে একটা শয়তানি হাসি দেয়। পূর্ণতা দাঁতে দাঁত চেপে দাড়িয়ে আছে। এই মেয়েকে একটা শিক্ষা দিবেই দিবে সে এত বড় কথা বলার জন্য। বাচ্চা ছেলেটাও এখানে উপস্থিত রয়েছে বলে গলা আর বেশি উঁচু করল না।
এরই মাঝে সেখানে জাওয়াদ আসে। সাথে ছিলো আভিরার বাবা মি. অভিক। আজ তারা এসেছিল তাদের আউটলেট গুলোয় কি ধরণের ইন্টারিয়র ডিজাইন করা হবে সেটা সম্পর্কে কথা বলতে। ইন্টারয়র ডিজাইন ফাইনাল হলে সেটা পূর্ণতাদের জানানো হবে পরে।
এই অসময়ে বউ-বাচ্চাকে নিজের অফিসে দেখে জাওয়াদ তো খুশিতে গদগদ হয়ে যায়। সে কেবিনে ঢুকেই পূর্ণতার কাছে চলে যায় আর হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল–
—কি সৌভাগ্য আমার, আজ আমার রাণী আর রাজপুত্র যে আমার অফিসে।
জাওয়াদের হাস্যোজ্জ্বল কথার জবাবে পূর্ণতা গম্ভীর গলায় বলল–
—এসে মনে হচ্ছে ভুলই করেছি। নিজের আর নিজের চরিত্রের আঙুল তুলতে এসেছি মনে হচ্ছে।
পূর্ণতার কথা শুনে জাওয়াদের হাসি মিলিয়ে যায়। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কি বলছো এসব? মানে কি?
পূর্ণতা নিজেকে জাওয়াদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে চলে যেতে চায়। কিন্তু জাওয়াদ তাকে আটকে দেয়। ব্যতিব্যস্ত গলায় আবারও জিজ্ঞেস করে–
—কি হলো, প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কোথায় যাচ্ছো? কে তোমার চরিত্রে আঙুল তুললো? একবার শুধু তুমি বলো। আমি তার হাতসহ ঐ মানুষটিকে ধ্বংস করে দিবো, যে আমার বউয়ের চরিত্রে আঙুল তুলেছে।
জাওয়াদকে সবাই বরাবরই শান্ত মেজাজের মানুষ হিসেবে চেনে। কোন বিপদে আর সমস্যা সে ঘাবড়ে যায় না, বা মেজাজ গরম করে চোটপাট করে না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করে। সেই ঠান্ডা মেজাজের মানুষটি আজ ভীষণ রেগে গিয়েছে। যা স্পষ্ট তার মুখশ্রীতে। আভিরা ভয় পেয়ে যায় জাওয়াদকে রাগতে দেখে, সেই সাথে নিজের করা বোকামির জন্য মনে মনেই আফসোস করতে থাকে।
পূর্ণতা জাওয়াদকে কিছুই বলে না। জাওয়াদ উপায় না পেয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। এবং ছেলের লাল চোখ মুখ দেখে জিজ্ঞেস করে সে কেন কেঁদেছে। তাজওয়াদ নিজের কান্নার কারণ জানায় বাবাকে। সেই সাথে আভিরা পূর্ণতাকে কি বলেছে সেটাও অল্পস্বল্প জানায়। জাওয়াদ তাজওয়াদের বলা বিষয়টা সম্পর্কে পুরোটা জানার জন্য নিজের কেবিনে থাকা সিসিটিভি ফুটেজের রেকর্ড চেক করে।
তার কেবিনে লাগানো সিসিটিভিটা একটা গোপন জায়গায় সেট করা হয়েছে, যা ম্যানেজার আর তার পি.এ. ছাড়া আর কেউই জানে না। মূলত সেইফটি পারপাসের জন্য এমনটা করা হয়েছে। জাওয়াদ সিসিটিভি ফুটেজে বিগত আধা ঘন্টার সব ঘটনা চেক করে। এবং জানতে পারে কেন তার ঘরণী এত রেগে গিয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজ চেক করার পর দেখা যায়, পূর্ণতার থেকে জাওয়াদই বেশি রেগে গিয়েছে। সে সিসিটিভি ফুটেজটা আভিরার বাবা মি.অভিককেও দেখায়। মি.অভিক মেয়ের এমন কর্মে লজ্জায় মাথা নিচু করে নেন। আভিরা ভয়ে একের পর এক ঢোক গিলতে থাকে।
_______
সব কাজ শেষ করে পূর্ণতা রুমে আসে দশটার পর। এসেই তার নজর পড়ে তার প্রিয় পুরুষটির গম্ভীর মুখখানা। সে আজ খেয়াল করেছে, দুপুরের ঘটনাটির পর থেকে জাওয়াদ বেশ চুপচাপ ও গম্ভীর হয়ে রয়েছে। অন্যান্য দিন রাতের খাবার শেষ করে জাওয়াদ আর তাজওয়াদ মিলে অনেকটা সময় খুনসুটিতে মেতে থাকে। কিন্তু বাপ-বেটা দুই জনই চুপচাপ।
তাজওয়াদটা তার পিপির কাছে আজ শান্ত বাচ্চা হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে। সে এখন মাঝে মধ্যে জিনিয়ার কাছেও ঘুমায়। আবার তাদের সাথেও থাকে। জিনিয়া ভাই-ভাতিজার মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে পূর্ণতা দুপুরের ঘটনা জানায়। সব শুনে জিনিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
পূর্ণতা জাওয়াদের সামনে এসে তাকে কোমল গলায় জিজ্ঞেস করে–
—আর কতক্ষণ মুড অফ করে রাখবেন তাজের পাপা? একটু হাসুন না রে মিয়া।
জাওয়াদ ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে দৃষ্টি রেখেই গম্ভীর গলায় বলল–
—আ’ম ইউর হাসবেন্ড, নট মিয়া। আউল-ফাউল কথা বলে মাথা না খেয়ে শুয়ে পড়ো যাও। আমি কাজটা শেষ করে আসছি।
—আপনাকে ছাড়া শুবো না, ঘুমাবোও না। আজ আর কাজ করতে হবে না, কাল করিয়েন।
—কাজের প্রেশার বেশি বর্তমানে। সামনে ঈদ। জেদ করো না লক্ষীটি।
পূর্ণতা বুঝে যায়, তার সাহেবের মন আগামী দু’দিন এমনই থাকবে। কিন্তু পূর্ণতা তো এসব কিছুতেই মানবে না। হঠাৎই তার মাথায় একটা আইডিয়া আসে। সে জাওয়াদের অগোচরে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে কাবার্ডের কাছে চলে যায়। তারপর সবচাইতে পাতলা, ফিনফিনে জরজেটের শাড়ি টা নিয়ে ওয়াশরুমের চলে যায় ফ্রেশ হতে। এবার সেও দেখবে, কিভাবে তার বরের মুড ভালো না হয়ে থাকে।
কাজ করতে করতেই এত রাতে চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজে জাওয়াদ ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে সামনে থাকায়। আর নিজের দুর্বল হৃদয়কে আরো একবার দুর্বল করে তুলে।
দুধে-আলতা গায়ের গড়নের পূর্ণতাকে কালো শাড়িতে চোখ ধাঁধানো সুন্দর লাগছে। তার পরনের শাড়িটা এতটাই পাতলা যে, শাড়ির আঁচল টানার পরও নিচেই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ দৃশ্যমান। সে শাওয়ার নিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাড়িয়ে চুল মুছছে। শাড়ির আঁচল কাঁধের উপর উঠিয়ে রাখার জন্য, তার বাম পাশের লতানো কোমড় পুরোটাই দৃশ্যমান জাওয়াদের কাছে। জাওয়াদ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় বউয়ের অপার সৌন্দর্য দেখতে দেখতেই সোফা ছেড়ে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য বউয়ের কাছে গিয়ে একটু ছুঁয়ে দেওয়ার।
কিন্তু বাঁধ সাধে সোফার সামনে থাকা টি-টেবিল। জাওয়াদ পূর্ণতাকে দেখে একটা ঘোরে চলে গিয়েছিল, যার কারণে আশেপাশের কিছুই তার খেয়ালে ছিল না। এ-র ফলে, জাওয়াদ টি-টেবিলের সাথে জোরদার একটা ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যায়।
ধাম করে পড়ে যাওয়ার আওয়াজে পূর্নতা পেছন ফিরে তাকালে জাওয়াদকে নিচে দেখতে পায়। এতক্ষণ সে আয়নায় নিজের বরের সব কর্মকাণ্ডই লক্ষ্য করছিল। তাই সে জাওয়াদকে পড়ে যেতে দেখে একটু বিচলিত হয় না, বরং উচ্চস্বরে গা দুলিয়ে হেঁসে দেয়। পূর্ণতার এমন মন খোলা হাসিতে জাওয়াদ আরো একবার তার প্রেমে পড়ে যায়।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]
শব্দসংখ্যা~২৩৮৫
[এই কয়েকদিন গল্প দিতে না পারার জন্য, অনেক অনেক সরি। গল্পটা একদম শেষের দিকে। আর ২/৩ টা পর্ব পাবেন সম্ভবত। আর কোন গল্প যখন শেষের পথে থাকপ, তখনই আমি কঠিন রাইটিং ব্লকে পড়ি। যেটা এবারও হচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে গল্পটা শেষ করে আমার এত মাসের কষ্ট মাঠে মা”রা যেতে দিতে চাচ্ছি না। তাই আরকি পর্ব গুলে আসতে দেরি হচ্ছে।
এছাড়া আপনাদের রেসপন্সও আগের থেকে কমে গিয়েছে। যেটা আমার জন্য আরেকটি কষ্টের কারণ।
সম্ভব হলে এই পর্বটিতে বেশি বেশি রেসপন্স করে ২কে+ রিয়াক্ট করে দিয়েন। তাহলে গল্প তাড়াতাড়ি পেলেও, পেতে পারেন।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৩.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৫.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৭.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৯.২