রাগে_অনুরাগে
পর্ব_৩৪ (এসব কি
)
সুহাসিনি_ফাতেহা
ফারাজ তিতলির কাঁধ থেকে গেঞ্জিটা নামিয়ে দিতে না দিতেই আচমকা করে বসে আরেক কান্ড। রুঢ় মানব আজ কেমন পাগলাটে বনেছে। তালগোল হারিয়ে ফেলে কোনোরুপ বলা-কওয়া ছাড়ায় রমণীর তুলতুলে মসৃণ কাঁধে মুখ ডোবালো। অজস্র চুমু খেয়ে চলেছে সেখানে। গভীর থেকে গভীর হচ্ছে সে-ই বেপরোয়া স্পর্শ। তার পুরুষালী দুঠোঁটের ভেজা স্পর্শ যেন রমণীর কাঁধ থেকে কিছু একটা মুছে ফেলার খেলায় মেতেছে আজ। ঘটনাটা রাগের মাথায় শুরু করলেও তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।
নে শা য় হারিয়ে গিয়েছে ফারাজ। অবাধ্য হাতদুটোও থেমে নেই তার। বারবার রমণীর নরম দেহের এদিক ওদিক বেসামাল গতিতে স্পর্শ করে যাচ্ছে। তিতলি ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলছে। একসাথে ঠোঁট, হাত, ঘনঘন উষ্ণ নিশ্বাস সব মিলিয়ে সুরসুর করে উঠছে তার সবাঙ্গ। সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ম বেড়েছে। চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে। খুব অদ্ভুত, উত্তেজনা, ভালোলাগা, সব মিলিয়ে জড়সড় হয়ে আছে সে। অন্যসময় হলে সে বকবক করতো ছাড়ুন, ছাড়ুন বলে তবে সপ্তদশী আজ চুপচাপ। পায়ের কমে আসা ব্যাথা ফের বেড়ে গিয়েছে ফারাজের পেশিবহুল হাতের রুষ্ট চাপ পেয়ে। ব্যাথা দিয়ে এখন তাকে চুমু দেওয়া হচ্ছে ? সে চুপচাপ পায়ের ব্যাথা নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সহ্য করে গেল। গাল বেয়ে চোখের পানি পড়ছে। অগ্রসর যুবকের নরম ঠোঁটের স্পর্শ কাঁধ থেকে এবার ধীরে ধীরে গলার নিচে নেমে যাচ্ছে। খোঁচা খোঁচা চাপ দাঁড়ির ঘর্ষনে হুল ফুটছে তিতলির নরম দেহে। কানের লতিতে ঠোঁট ছুয়েছে দুএকবার। তিতলি ছটফট করে সরতে চাইলেও পারছেনা। পেছন থেকে ফারাজ তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছে। মুখ তুলে কিছুক্ষণ তিতলির অল্প ফাঁক হয়ে থাকা অধরযুগলের পানে কামুন নেশাক্ত চোখে তাকিয়ে থাকে ফারাজ। হয়তো সে সেডিউস হচ্ছে? এমন হতে থাকলে সে এইমুহূর্তে অনেক কিছু করে বসবে। চোখদুটো বন্ধ করে অনেকটা সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করে তখন।
বউকে প্রতিদিনের মতো তর্ক করতে না দেখে ফারাজের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়েছে। সে চাই বউ তাকে বাঁধা দিক। তিতলির নরম গালে নিজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িযুক্ত গাল চেপে ধরে পরপর গভীর নরম স্বরে বলল,
“উমমমম! কিছু বলছো না কেন আজ?”
তিতলি শুনেও কিছু বলে না প্রথমে। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কাঁধটা ভিজা ভিজা লাগছে তার। আশ্চর্য! তার কাঁধে কি থু থু দিয়েছে নাকি এই লোক? বাঁ হাত তুলে নিজের কাঁধে রাখলো যেখানটায় কিছুক্ষণ আগে ফারাজ চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছিল।
ফারাজ বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আলগোছে নিজের ভেজা ঠোঁটদুটো মুছে নিলো। তিতলির মুখোমুখি বসে হাত বাড়িয়ে নরম চোয়ালখানা ধরে নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে আনলো। তিতলি তাও নিচের দিকে তাকানো। ব্যাথায় কাঁদছে সে। ফারাজ ভাবছে একটা ধমক দিবে ওই ঘটনার জন্য কিন্তু তিতলির চোখের পানি দেখে দমলো। বিচলিত দেখাল তাকে। খসখসে দু হাতের আঁজলায় তিতলির মুখ উঁচু করে মধ্যমা ও তর্জণী দু আঙুল দিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে নরম গলায় বলল,
“পায়ে অনেক ব্যাথা পেয়েছ?”
তিতলি অবাক হয় ফারাজের ভয়েস টোনে।
নাক ফুলিয়ে রাখে সে। নাকের ডগা লাল হয়ে আছে তার। ব্যাথা পায় নি সে। একদম কোনো ব্যাথা পায়নি। ব্যাথা দিয়ে আবার বলছে সে ব্যাথা পেয়েছে? অভিমানে তার কন্ঠে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে,
“আমি ব্যাথা পেলে আপনার কি? এত নাটক করতে হবে না আপনার। আপনি যান!”
ফারাজের মুখের অভিব্যক্তি কঠিন। অন্যসময় হলে হয়তো,সে এ কথার পরিবর্তে তেজ দেখাত রাগ ঝাড়তো। তবে এবারও তার গলার স্বর নরম শুনালো,
“যা জিজ্ঞেস করেছি, ঠিকঠাক উত্তর চাই!”
“পায়ে অনেক ভালোবাসা পেয়েছি!”
ফারাজ বিরক্ত হয় তিতলির ত্যাড়া কথায়। কটমট দৃষ্টিতে তাকায়। এই অবাধ্য বউ তাকে না রাগিয়ে শান্তিতে থাকতে পারেনা। জিভের ডগায় গাল ঠেলে আচমকা মৃদুস্বরে আওড়াল,
“সবসময় আমার রাগ বাড়িয়ে দাও কেন? কখনো কমিয়েও তো দিতে পারো।”
অভিমানী তিতলি আড়চোখে চোখ তুলে তাকালো। দুজনের চোখাচোখি হলো। ফারাজ গভীর দৃষ্টে তাকিয়ে একইভাবে। দৃঢ় তার চাহনি। চোখের পলক ফেলছে না ভুলেও। তিতলি চোখ নামিয়ে নিলো।
সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে, মুখ ঝামটি মে’রে বলে বসে,
“আমি আপনার রাগ বাড়ানো-কমানোর কে?”
সহসা ঠোঁট কামড়ে হাসল ফারাজ। তিতলির দিকে মুখটা সামান্য ঝুঁকিয়ে আনে। পরক্ষণে মানবীর মুখের ওপর সামান্য ফু দিয়ে দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ওয়াইফ! তুমি আমার রাগ বাড়াতে পারো ফের কমাতে ও পারো, ড্যাম আই সোয়ার! সো,কাম ক্লোজার, ট্রাই ইট এন্ড সি!”
তিতলি কিছু বলে না। নাটক করে তার সাথে। মুখ ভেংচি কেটে সেও মনে মনে বলে, ওয়াইফ! তাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে পারে নি আবার বড়বড় কথা।উল্টো এসে শরীরের সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করে তার পায়ে ব্যাথা দিয়েছে। এত পাষাণ লোক সে সতেরো বছরের জীবনে দেখেনি। তবে মনে মনে অনেক খুশি হয় লজ্জা পায় সে। কান্নারত মুখ দেখে সেটা আন্দাজ করা গেলো না। বিছানায় শুয়ে চুপচাপ নরম তুলতুলে বালিশে মুখ ঘুঁজে রাখলো সে।
ফারাজ তিতলি কিছু বলছে না দেখে উত্তরের অপেক্ষা করে না। রাগের মাথায় সত্যি মেয়েটার পায়ে অনেক ব্যাথা দিয়ে ফেলেছে? এতটা নির্দয় মানব হলো কবে সে? তার ডাকে সাড়াশব্দ দিচ্ছিলো না তাই বলে কি? যদিও সে বউকে শাস্তি দিতেই বিয়ে করেছে তবে এখন কেন এমন অনুতপ্ত লাগছে? রুঢ় মানব তক্ষুনি হাত দিয়ে তিতলির পাজোড়া আলগোছে নিজের বলিষ্ঠ উরুর উপর রাখলো। তিতলি হতভম্ব হয় ফারাজের কাজে। তবে কিছু বলেনা। ফারাজ হঠাৎ ডানহাতের সবগুলো আঙুল দিয়ে খুব ধীরে ধীরে স্লাইড করছে তিতলির সম্পূর্ণ পায়ের তলা, পাতা, ও গোড়ালিতে। বড্ড সতর্কতায় যেন সামান্য ব্যাথা না পায়। তিতলির পায়ে অনেক সুড়সুড়ি পায়। পা ছুটাছুটি করে উঠতে নিয়ে তেজ দেখিয়ে বলল,
“সুড়সুড়ি দিচ্ছেন কেন?”
ফারাজ চোখ রাঙিয়ে তাকায়। তারপর গম্ভীর স্বরে হুকুম ছাড়লো,
“চুপ! নড়াচড়া বন্ধ দেখতে চাই! নয়তো এইমুহূর্তে অনেককিছু করে বসবো আমি। আমাকে কিছু করতে বাধ্য করো না।”
সতর্কতা ছু’ড়ে দিয়ে ফারাজ তিতলির পায়ে নিজের হাতের স্পর্শে ব্যাথা কমানোর চেষ্টা করে। এতে যদি ব্যাথা একটু কমে তাতে মন্দ কি?
তিতলি সুড়সুড়ির সাথে সাথে অনেক আরাম পায়। আবেশে দুচোখ ভুঁজে নেয়। সে চাই ফারাজ তাকে এভাবে আদর করুক। ছোট ছোট আদর করুক! তার খেয়াল রাখুক! শাসন করুক! অসুস্থ হলে পাশে থাকুক ! তাকে অনেক ভালোবাসুক,তারজন্য পাগল থাকুক। ঘুরতে নিয়ে যাবে তাকে চোখে হারাবে। এমন ফারাজকে সে কখন পাবে? কখন তার প্রেমে পাগল হবে? তাদের সুন্দর একটা সংসার হবে? টুনাটুনিরা হবে? সপ্তদশী ভাবনায় বিভোর। ঘড়ির কাঁটা সাতটা পঁয়তাল্লিশে। ফারাজ সম্পুর্ন একঘন্টা ধরে তিতলির পা উরুতে নিয়ে ঠিক একই ভাবে স্পর্শ করছে। পাগুলো কত নরম। ধরলেই চাপ বসে বাচ্চাদের মতো। পিচ্চি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে মনে হয়। মনে মনে নিজেই ভাবে, এভাবে মোচড় না দিলেও তো পারতো। অনেক সময় পর বলল,
“ব্যাথা কমেছে এখন?”
তিতলির কোনো শব্দ নেই। ফারাজ আবার ডাকলো,
“ঘুমিয়ে পড়েছো?”
এবারও তিতলি জবাব দিলো না। ফারাজ ও আর ডাকল না। ঘুমিয়ে গেছে ভেবে পা নামিয়ে গায়ে কাঁথা টেনে দেয়। হঠাৎ স্টাডি টেবিলে থাকা তিতলির ফোন বেজে উঠে। আগের ফোনের রিংটোন। এরে যদি তার আগের মোবাইল ঘাটাঘাটি করে তাহলে তো ফেইক আইডির রহস্য জেনে যাবে। আরো ফোনে কোনো লক নেই। তারউপর ফেইক আইডি লগইন করা। তিতলি শুয়া থেকে উঠতে চাইতেই ফারাজের চিবুক শক্ত হয়। সে ডেকেছে বলে ঘুমের ভান ধরে ছিলো আর এখন ফোন বাজছে বলে উঠে যাচ্ছে? যুবক কেমন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“খবরদার উঠার চেষ্টা করবে না একদম! যখন আমি ডাকছিলাম তখন কানে তুলো দিয়ে ছিলে এখন বুঝি তুলো সরে গেছে?”
তিতলি বিছানায় শুয়ে থেকে অন্যদিকে মুখ করে বলল,
“কে কল করেছে আমি দেখবো।”
তখনো একনাগাড়ে ফোন বেজেই চলছে। ফারাজ লম্বা কদমে উঠে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। স্ক্রিনে বড়বড় অক্ষরে লেখা “কলিজার বেস্টফ্রেন্ড সিয়াম+ সুদর্শন পুরুষ এডলফ খান” এমন নাম দিয়ে কেউ কারো নেকনাম দেয়? ভাবতে ভাবতে কল কেটে গেলো। পরপর মেসেজ ও আসলো নোটিফিকেশন এ স্পষ্ট,
“কিরে জানু,কল ধরছিস না কেন? তোর পায়ের কি অবস্থা? মেসেজ দেখলে কল দিস!”
ফারাজের শান্ত মেজাজ তক্ষুনি অশান্ত হয় যেন।
তার মেজাজ খিটখিটে হয়। লক খুলতে গিয়ে দেখল ফোনে কোনো লক নেই। মুহূর্তের মধ্যেই ফারাজ নাম্বারটা ব্লকলিস্টে ফেলে দিলো। কলিজার বেস্টফ্রেন্ড? সাথে আবার কলিজা? ওই ছেলে জানু বলছে? মেয়ে মানুষের আবার কিসের ছেলে বেস্টফ্রেন্ড? ফারাজ কোনোকালেই এসব এলাউ করে না। কলেজে আগে দেখতো সবসময় এই সিয়াম তিতলির কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো গায়ে ঢুলে পড়া স্বভাব। তখন তার এসব দেখে তো এমন রাগ হতো না। কলেজে কত ছেলে মেয়ে কতকিছু করে ওসব তাদের টিচারদের দেখার টাইম নেই। কিন্তু তিতলি তার পেছনে ঘুরায় মাঝেমাঝে তাকালে দেখতো এসব। এসব ভেবে মোবাইলে আরো কিছু ঘাটাঘাটি করতে গেলো কিন্তু তিতলি আস্তে করে ডাক দিলো,
“কে কল করেছে?”
“সেটা তোমার জানতে হবে না।”
কথাটা দ্বারা ফারাজ একপ্রকার হুমকি ঝেড়ে আবার মোবাইলে চোখ দিলো।
তিতলি ভয়ে পেয়ে ব্যাথা পাওয়ার ভান করল আবার। মুখখানায় তার করুণ অসহায় ভাব। যেন সত্যি তার পায়ের ব্যাথায় কেঁদে দিবে এমন ভাব নিয়ে বলল,
“পায়ে অনেক ব্যাথা করছে…”
ফারাজ তিতলির দিকে তাকায় মুহূর্তেই। তিতলির মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে যে মিথ্যা বলছে। মোবাইল টেবিলে রেখে বিছানায় এগোয় আসলো আবার। তিতলি বুক ভরে স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। মনে মনে বলল,
“আল্লাহ বেঁচে গেলাম।”
★
পরেরদিন খান বাড়ির সবার কানে গেলো তিতলির পা মচকে যাওয়ার কথাটা। সবাই দেখতে এসেছেন তিতলিকে। যদিও ব্যাপার টা তেমন সিরিয়াস না। তাও আফজাল খান সহ ফারিন বেগম, ফারাজের নানা নানিও আসলো। ফরিদা বানুর সাথে ছকিনা খাতুনের একটা বন্ধুসূলভ সম্পর্ক হয়েছে। দুজন একি ভাষায় কথা বলে বয়সও এক। মনে হয় পুরানো বান্ধুবি খুঁজে পেয়েছেন তেমন ভাব। বুড়ো মানুষ মুখে কিছু আটকায় না। দুজনে যা তা বলে বলে ড্রয়িংরুম গরম করে দিচ্ছেন।
ড্রয়িংরুমে বেয়াই বেয়াইনেরা সবাই আড্ডা দিচ্ছেন। ফরিদা বানুকে হঠাৎ ছকিনা খাতুন বলে উঠলেন,
নাতিরে কয়বার কইছি নাতবউডারে পোয়াতি বানায় দে নাতি। কোনদিন মরি যায় বয়স তো কম অ নো ভাইবছিলাম নাতির ঘরের পোন্তির গোরে একাকানা দেখি যামু।”
ছকিনা খাতুনের কথাটা ড্রয়িংরুমে সবাই শুনলো। সবার মুখের অবস্থা কেমন যেন হয়ে গেলো। ফারাজ শ্বশুরদের পাশে বসে। কি নিয়ে যেন কথা বলছে। এ কথা শুনে পথিমধ্যেই চুপ হয়ে গেলো সে। তবে মুখের অভিব্যক্তি বিন্দুমাত্র বদলায় নি। বরং গম্ভীর ভাব স্পষ্ট। চোখ তুলে অদূরের সোফায় বসে থাকা তিতলির দিকে তাকালো। তিতলি সবার মাঝে সহসা খুক খুক করে কেশে উঠলো। ফরিদা বানু বললেন,
“নাতিন সরম পাইতাছে।”
তিতলি উপরে মুখ তুলে তাকাতে পারে না। অনেক লজ্জা পেয়েছে সে। অথচ দেখো ওই ভাল্লুক টা কিভাবে তার দিকে তাকালো। সে তো তাকায় নি হঠাৎ ভুল করে চোখ পড়ে গেছে।
ছকিনা খাতুন নাতবউকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“সরম পাইবার কিচ্ছু নাই গো নাতবউ! আমি যা কয় তোমগো ভালার লাইগায় তো কয়।”
ফরিদা বানু পরপর ছকিনা খাতুনের কানে কানে বললেন,
“কথাটা আন্নে খারাপ কন নো মইজি! পোয়াতি কইরা দিলে নাতিনও মনে হইতাছে একটু সোজা অইবো। দৌড়াদৌড়ি কইমবো।”
“এল্লায় তো কয়তাছি!”
আলেয়া শেখ সবার জন্য নাস্তা বানিয়ে এনেছেন। ডাইনিং টেবিলে হড়েক রকমের নাস্তা পানি সাজানো। সবার হাতে হাতে চা তুলে দিলেন তিনি। নাস্তা পানি খাওয়ার জন্য সবাই ডাইনিং টেবিলে বসেছে। আফজাল খান যাওয়ার কথা তুলতেই তৌসিফ শেখ বেয়াইকে বললেন,
মেয়ের যেহেতু পা মচকে গেছে একটু ভালো হোক বেয়াই! কমলে তারপর না হয় যাবে।
আফজাল খানের এতে কোনো সমস্যা নেই। কত ফুন্দিনুন্দি করে পুত্রবধু করেছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ছেলের। তিনি আড়চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। ছেলে আবার কিছু বলে বসবে কিনা? কিন্তু তিনি বেয়াইকে বললেন,
আপনার যা ভালো মনে হয় বেয়াই। পা ভালো হলে না হয় নিয়ে যাবো।
সবাই আফজাল খানের কথায় সায় দিলেন। বড়দের কথার ভেতরে ফারাজ কিছু বলে না।
★
এরই মাঝে কেটে গেছে আরো দশদিন। এইতো সেদিন বিয়ে হলো মনে হয় কিন্তু ক্যালেন্ডারের হিসাবে আজ তাদের বিয়ের একমাসেরও বেশি হয়ে গেছে। ফারাজ তিতলির সম্পর্কে কোনো নতুন পরিবর্তন আসেনি। পাঁচদিনে তিতলির পা ভালো হয়ে যায়। ওই পাঁচদিন তিতলি বাবার বাড়ি-ই থেকেছে। এখন শ্বশুর বাড়ি এসেছে।
তিতলি ফারাজের সাথে আগের মতো বকবক করে না এটা সেটা বলে সারাক্ষণ বিরক্ত করে না। কিছু বললেও ইগনোর করতে চাই। কিন্তু সবার সাথে ঠিকই আগের মতো হেসেহেসে চঞ্চলতায় কথা বলে। তা বোধহয় সহ্য হচ্ছে না ফারাজের। রেগে কিছু বলতে গেলেও তিতলি শাশুড়ির আম্মুর কাছে চলে যায়। কয়দিনে মেয়েটা তার কাছ ঘেষে না মুখে মুখে তর্ক করেনা। ফারাজের রাগ হয় এসবে।
★
তিতলির পেট খারাপ সকাল থেকে। কলেজে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু পেট খারাপ হয়ে গেছে। এতে বরং সেও খুশি কারণ আজকে নিধিরা কেউ যায়নি। ওষুধ খেয়ে এখন একটু ভালোর দিকে। তিতলি আজকে কয়দিন ফেসবুকে ঢুকে না। হোয়াটসঅ্যাপও না। তাই মোবাইল নিয়ে ফেসবুকে ঢুকে মেসেজ অপশনে ক্লিক করলো। দেখলো সিয়ামের অন্য এক আইডি থেকো ১০+ মেসেজ। সবগুলোতে লেখা,
“কী রে তোর কি হয়েছে আমাকে সবকিছু থেকে ব্লক করে দিয়েছিস কেন?”
আরো কত কত মেসেজ। “জামাই,পেয়ে বুঝি আমাদের পর করে দিলি।”
“এই তোর বেস্ট ফ্রেন্ডের নমুনা।”
তিতলি অবাক হয়ে যায় সিয়ামের এসব মেসেজ দেখে। সে কখন ব্লক করলো? হতবিহ্বল হয়ে সিয়ামকে মেসেঞ্জারে কল দেয়। কিছুক্ষণ পর রিসিভ হলো,
কল রিসিভ হওয়া মাত্রই ওপাশ থেকে সিয়াম বলে উঠল,
“কিরে কি হয়ছে তোর? কোন দুনিয়ায় হারাইছিলি? আমাকে সবকিছু থেকে ব্লক করে দিলি কেন?”
তিতলি হতভম্বতার রেশ ধরে বলল,
“আমি তোকে ব্লক করতে যাবো কেন? দেখ আমি ব্লক করিনি মিথ্যা কথা বলিস না।”
সিয়াম ওপাশ থেকে বারবার বলছে,
“তাহলে কে করছে ভূতে?”
“কখন ব্লক করছি তোকে?”
সেদিন তোর পা মচকে যাওয়ায় কি খবর জানার জন্য ফোন করছিলাম কেটে দিয়ে তখন নাম্বার থেকে ব্লক করে দিছিস। কালকে তোকে হোয়াটসঅ্যাপ এ মজা করে বলছিলাম,
“কেমন আছিস বেবি?”
সিন করলি কিন্তু কিছু না বলে ব্লক কেন করেছিস? মেসেঞ্জার নাম্বার হোয়াটসঅ্যাপ সব থেকে ব্লক? স্যারকে পেয়ে বুঝি আমাদের ভুলে গেলি?
তিতলি বিরক্ত হয়। সে কখন ব্লক করলো?
“আমি ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ঢুকিনি। তোকে আমি ব্লক করি নাই বিশ্বাস কর!”
সিয়াস ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ চুপ থাকে। মনে হয় কিছু একটা ভাবে। তারপর মিনিট খানেক পর বলে,
“তোর মোবাইল এটা কি দুলাভাই কিনে দিছে যে সেটা?”
“হ্যাঁ কেন?”
“খাইছে রে, তোর মোবাইল পুরোটা স্যারের মোবাইলে হ্যাক করা আছে মনে হয়। মোট কথা তোর মোবাইলে তুই কি করিস না করিস সব মনে হয় স্যারের কাছে চলে যায়।”
তিতলি বিশ্বাস করে না। কারণ তার মোবাইল কখনো ভাল্লুক ধরে না। আবার কখন হ্যাক করবে? সে বলল,
“দূর রানুমন্ডল! ওনি কেন আমার মোবাইল হ্যাক করবে?”
“তাহলে কে ব্লক করে আমায়? স্যার মনে হয় আমার মেসেজ দেখে….”
সিয়ামের কথার মাঝেই দরজার শব্দ হলো। তিতলি ফোন কেটে দিলো সাথেসাথেই। রুমে ঢুকলো ফারাজ। হাতে অনেকগুলো শপিং ব্যাগ। তিতলি একবার সেদিকে তাকিয়ে না দেখার ভান করে হুহ! কার জন্য এত শপিং করে এনেছে কলেজ থেকে আসতে কে জানে। ফারাজ বিছানায় সবগুলো ব্যাগ একসাথে রাখলো। ২৫ টার কম হবে না। তিতলি যতটা আন্দাজ করলো সবগুলো বোরখা, হিজাব।
ফারাজ শার্ট খুলতে খুলতে নিজে নিজেই গম্ভীর সুরে বলে,
“এখন থেকে কলেজে বোরখা হিজাব পরে যাবে। বাইরেও।”
তিতলি ভ্রু কুঁচকে রাখে। জীবনে কোনোদিন সে বোরখা পরে নি। কালো কালো বোরখা এগুলো সে পরবে? বোরখা পরলে তাকে কেমন দেখাবে সেসব ভাবে সে? তিতলি কপাল কুঁচকে রেখে বলল,
“বোরখা পরলে আমাকে পাড়ার টুম্পা বৌদিদের মতো লাগবে। আমি পরবো না।’
ফারাজ নিজেন পরনের শার্ট টা খুলে সোফায় ফেলেছে। তোয়ালে হাতে নিয়ে শাসনের আদেশ দিলো,
“আমি বলছি মানে তুমি পরবে। এক কথা দ্বিতীয়বার বলা আমার পছন্দ না। আমি যদি বলি তুমি এখন থেকে আমার সামনে জামা ছাড়া থাকবে তুমি থাকবে, আমি যা বলবো তাই করবে ইউ্য ওকে?”
তিতলি নাক সিটকায়। এখন সে শাড়ি পরে না। জামা পরে। আর এই লোক তাকে? “আসতাগফিরুল্লাহ!”
“আমি আপনার কথা শুনবো না। আপনার মন চাইলে আপনি থাকুন আমার কি?”
বলে তিতলি চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে যেতে থাকে। এখন ফারাজ গোসল করতে গেলে সে আর রুমে থাকে না। কখন জানি আবার তোয়ালে খোলে পরে যায়।
ফারাজ কয়েকবার রেগে গিয়ে ডাকে,
“আমার কথা এখনো শেষ হয়নি! দাঁড়াতে বলছি!”
কিন্তু তিতলি শুনেও চলে যায়। ফারাজ জানে কিভাবে বোরখা পরাতে হয়। সেও দেখবে বোরখা ছাড়া কিভাবে বাইরে বের হয়। জানে মেরে ফেলবে না বউকে?
★
ঝিলিককে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে এখন। ছেলে সরকারি চাকরি করে। মেয়েকে নাকি কোথায় দেখেছে। সে হিসাবে বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এখন পরিবার সহ দেখতে আসবে।সাথে আকদ পড়ানো হয়ে যাবে আজ। জিসা বেগম খুব খুশি। মেয়েকে আগেভাগে মেয়েকে শাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছেন। ওদিকে রুমে বসে মেয়েটার কেঁদেকেটে নাজেহাল অবস্থা। সকাল থেকে তুষারকে ফোন করেছে অথচ একটা বার রিসিভ করেনি। এতই ব্যস্তাতা? রিং হয়ে হয়ে কেটে যাচ্ছে প্রত্যেকবার। মেসেজও দিলো অনেকগুলো। কিন্তু তাও সিন করে না। অন্যসময় সে কথা না বললে পাগলের মতো করে। তবে আজ? শেষে মেসেজ দিলো,
“ভালো থাকবেন তুষার ভাই!”
বাইরে পাত্রপক্ষ চলে এসেছে ঝিলিক বুঝতে পারে। হঠাৎ দরজায় টোকা,
“ঝিলিক দরজা খোল। পাত্রপক্ষ রা এসে গেছে।
ঝিলিক কোনোমতে চোখের পানিগুলো মুছে নেয়। হয়তো অনেক ব্যস্ত তাই তার কল মেসেজ দেখছে না। নিজের মনকে শান্তনা দিলো। কান্না করে বেহাল অবস্থা। দরজা খোলো দিলো।
রুমানা বেগম বললেন,
“কেঁদেকেটে এ অবস্থা করছিস কেন? বুঝছি মন খারাপ। ছেলে অনেক ভালো তোর মামারা খোজ খবর নিয়ে দেখেছে।”
ঝিলিক কিছু বলে না। চোখ তুলে তাকানোর শক্তি নেই। রুমানা বেগম ঝিলিককে নিয়ে গেলেন। পাত্রপক্ষকে সালাম দিতে শিখিয়ে দিলেন। নাস্তা পানি পাত্রী সব দেখা শেষে ছেলের বাবা বললেন,
“মাশাআল্লাহ মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়ছে ভাইজান। আজকেই আকদ পড়িয়ে….”
ভদ্রলোকের কথার মাঝেই ড্রয়িংরুমে আরো কয়েকজন মানুষ ঢুকলো। অনেক কষ্টে কেঁদেকেটে বাবাকে বুঝিয়ে নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় পাত্রটা সোজা এসে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে বউ সেজে থাকা মেয়েটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মস্তিষ্ক জোড়ে একটাই প্রশ্ন,
“কার জন্য এত সেজেছে মেয়েটা?”
চলবে।
Share On:
TAGS: রাগে অনুরাগে, সুহাসিনি ফাতেহা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রাগে অনুরাগে সূচনা পর্ব
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৫
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৬
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৩
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ১৯
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৮
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৮(প্রথম অংশ+দ্বিতীয় অংশ)
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ১০
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২২