Golpo romantic golpo রাগে অনুরাগে

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৭(প্রথমঅংশ+শেষাংশ)


রাগে_অনুরাগে

পর্ব২৭ (প্রথমঅংশ )

সুহাসিনি_ফাতেহা

ঝিলিক লজ্জায় কোনো কথা খুঁজে পেল না।
চুপচাপ সামনের দিকে হাঁটা ধরলো। বুকের ভেতরটা কেমন দ্রিমদ্রিম আওয়াজে কাঁপিয়ে তুলছে। অদ্ভুত এক অনুভূতি। এই অনুভূতি নামও অজানা। শুধু তুষার ভাইয়ের সামনে এলেই শুরু হয়। মনে হয় যেন আশেপাশের সব মানুষজন চলে আসবে সে আওয়াজে। তার উপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামা শুরু হয়েছে ধরনীজোড়ে। আর বেশিক্ষণ থাকলে নিশ্চিত ভিজে যাবে। তখন মায়ের বকা খেতে হবে। ঝিলিক যখন এসব চিন্তায় বিভোর ঠিক তখনি ভেসে এলো পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠসুর,
“তো ঝিলিক, আমি বুঝি আপনার চলে যাওয়া দেখার জন্যই এখানে দাঁড়িয়ে আছি?”
ঝিলিকের ত্রস্ত পাজোড়া থেমে যায় মুহূর্তেই । বেশিদূর যেতে পারেনি। সবে দুপা সামনে এগিয়েছে। থেমে না গেলেই যেন নয়। লোকটার কণ্ঠসুর এত মারাত্মক শুনায় যে ঝিলিকের বুক কাঁপে। নিজের অজান্তেই হাঁটা থামিয়ে দেয়। তুষার বাইক স্টার্ট দিয়ে খুব ধীর গতিতে মেয়েটার পেছন পেছন এসে পাশে থামাল। পাশে ফিরে তাকাল মেয়েটার মুখ চোখাচোখি।
ঝিলিক চোখ নামিয়ে নিলো। আগে তো তুষার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে এমন লাগতো না। এখন কেন এমন হয়। হাঁসফাঁস করে বলল,
“কেন.. কেন দাঁড়িয়ে আছেন আপনি?”
তুষারের সোজাসাপটা উত্তর এলো,
“অবশ্যই আপনাকে দেখতে।”
ঝিলিকের বুকের ভেতরে ঢুকে গেল ওমন লোভনীয় কথাটা। এমন কথা কখনো শুনছে সে? মনে করতে পারছে না ঠিক। ঝিলিকের ভাবনার মাঝেই তুষার স্রেফ বলল, “বৃষ্টি আসবে মনে হয়। আপনি আমার পেছনে বসবেন?” ঝিলিক যেন আশা করেনি এমন কথা। অবিশ্বাস নিয়ে ঠিক ততটাই দ্রুত জবাব দিলো, “না..না আমি অটো দিয়ে চলে যাবো।” তুষার ঝিলিকের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে চোখ ছোট করে তাকিয়ে থেকে শাসনের সুরে বলল, “হিজাব কই আপনার?” ঝিলিক সহসা জিভ কাটলো। লোকটা এতকিছু খুঁজছে কেন তার? তার দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চয়। সে চোখে চোখ মিলাতে না পেরে বলল, “আসলে….” “কোনো আসল নকল মানবো না। কাল থেকে হিজাব ছাড়া ভার্সিটিতে আসবেন না।” “আচ্ছা।” “বাইকে উঠে বসুন এখন আপনি কোনো অটো পাবেন না।” ঝিলিক বাইকে ছড়তে খুব ভয় পায়। এই বাইকে ছড়েই তার বাবার মৃত্যু হয়েছে। বাইক দেখলেই বাবার রক্তাক্ত দেহ চোখের সামনে ভেসে উঠে। কি ভয়ঙ্কর ছিলো। চারবছর হয়ে গেলেও ঝিলিক আজও বাবার চেহারা ভুলতে পারে না। চোখ নামিয়ে বলল,
“আমার বাইকে ছড়তে খুব ভয় করে।”
“আমি থাকতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই ঝিলিক। আপনি উঠুন! বৃষ্টি আসলে তখন কিন্তু ভিজবেন। জ্বর আসবে কিন্তু।”
ঝিলিক ভাবনায় পড়ে গেল। তুষার ভাইয়ের তাকে নিয়ে এত চিন্তা? তার জ্বর আসা নিয়ে ভাবছে কেন? কত জ্বর নিয়ে দিন কাটিয়েছে। এখন কি বাইকে উঠবে? না উঠলে উনি যদি রাগ করেন। ঝিলিক চুপচাপ তুষারের পেছনে উঠে মাঝে ব্যাগ রেখে বসলো।
তুষারের গম্ভীর মুখে হাসি ফুটলো কেন জানি। তৃপ্তির হাসি। মিররে একবার মেয়েটার ভয়ার্ত মুখের পানে চেয়ে বলল,
“ধরে বসুন না হলে কিন্তু পরে যাবেন।”
ঝিলিক লজ্জয় মরে যাচ্ছে। এইপ্রথম কোনো পুরুষ মানুষের পাশাপাশি বসেছে। অদ্ভুত শিহরণ কাজ করছে সমস্ত দেহে। কাঁপা গলায় বলল,
“ধ..ধরে বসেছি তো।”
“কই ধরে বসেছেন আমি বাইক স্টার্ট দিলে পড়ে গেলে তখন কি হবে?” —- বলে তুষার আর একমুহূর্ত দেরি না করে বাইক স্টার্ট দিলো সাথে সাথেই।
ভয়ে রীতিমত ঝিলিকের গা কাঁটা দিয়ে আসে। সব ভুলে আচমকা সামনের যুবকের শক্ত পিঠ খামছে ধরল। তারপর বলিষ্ঠ কাধ। দুরুত্ব কমলো আগের তুলনায়। তুষার মিররে সব দেখল কিন্তু কিছু বলল না। শান্তি! খুব ধীর গতিতে বাইক নিয়ে গন্তব্য পৌঁছালো। পথিমধ্যেই ঝুম বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টিতে না ভিজার জন্য বাইকে করে এসেও ভিজতে হলো তাদের।
.
.
ঘড়ির কাঁটায় বিকেল চারটা।
তিতলি শাশুড়ি আম্মুর রুমে শাড়ি পরেছে। বাবার বাড়ি যাবে। ফারাজকে কালকে বলেছে হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। কিন্তু জেদি তিতলি যাবেই যাবে। তার আব্বু আম্মুকে না দেখলে বোধহয় মরেই যাবে। সেদিন আব্বু আম্মুকে দেখে ফারাজের লোভে যেতে মন চাই নি। কিন্তু এখন তো দেখে না। ভিডিও কলে দেখলেও মন মানেনা।
ফারিন বেগম পুত্রবধুকে শাড়ি পরিয়ে গলায়,হাতে,কানে, স্বর্ণের গয়না পরিয়ে দিয়েছেন। চোখ জুড়িয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে মা। আমার ছেলে দেখলে চোখ ফিরাতে পারবে না।”
অন্যসময় হলে তিতলি ঠোঁট প্রসারিত করে হাসতো। কিন্তু এখন তার হাসতে ইচ্ছে করে না। ভাল্লুকের উপর রেগে আছে। আজ আসলে একদম কথা বলবে না। চারটা বেজে গেছে এখনো আসে নি।
ফারিন বেগম আবার বললেন,
“ফারাজ যদি তোমাকে কখনো ধমক দেয় সোজা আমার কাছে এসে বলবে ছেলেটা একদম দাদার মতো হয়েছে। তোমার দাদাশ্বশুরও এমন ছিলো।”
তিতলি এবার একটু হাসলো। বলল,
“আচ্ছা আম্মু।”
ফারিন বেগম পুত্রবধুকে একটানা হাসিমুখে ও বললেন,
“তুমি আসার পর থেকে খান বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আগে একা একা মনে হতো সকাল কাটছে না সকাল কাটলে দুপুর কাটছে না। আমি জানি তোমার মা বাবার জন্য কাঁদছো, মন খারাপ করো না। দেখবে ফারাজ ঠিক তোমাকে নিয়ে যাবে প্রথমে রাগ দেখাবে। কিন্তু তোমার জেদের কাছে আমার ছেলে হার মারবে।”
বলে ফারিন বেগম বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।
নাছিমা বেগম সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। কয়দিনে যা বুঝলেন, মেয়েটা বোকাসোকা। যা বলে বিশ্বাস করে নেয়। বোনকে চলে যেতে দেখে মুখ বেঁকিয়ে আস্তে করে বললেন,
“ফারাজকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বাদ দাও ফারাজ আমাকে নিজ মুখে বলছে তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে আমার মেয়ে নীলাকে বিয়ে করবে। এবার বাবার বাড়ি গিয়ে আর না আসলে তোমারই মঙ্গল। সাবধান থাকো।”
তিতলি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। হাসিখুশি মুখমণ্ডল মুহুর্তেই আঁধারে পরিনত হয়েছে। ঠোঁটের হাসিটুকু হারিয়ে ফেলেছে। বুকটা ধুক করে উঠছে ক্ষনে ক্ষনে। চোখ দুটো পানিতে ভিজে উঠেছে। গলা ধরে এলো,
“মিথ্যা…..”
“মিথ্যা বলছি না আর ফারাজ তো তোমাকে দেখতে পারে না এটা তো তুমিও জানো মিথ্যা বলার কি আছে?”
তিতলি আর দাঁড়াতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতে রুমের দিকে দৌড় দিলো।
.
.
ফারাজ খান কলেজ থেকে এসেছেন। কলেজে আজকে একটু বেশি কাজ ছিলো। অনেক টায়ার্ড ফিল করছেন। এইমুহূর্তে গোসল করার চেয়ে উপরে কিছু নেই। রুমে ঢুকেই সর্বপ্রথম তার বেয়াদব বউটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলালো। তীক্ষ্ণ হলো যুবকের চোখের চাহনি। দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কোথায় যাচ্ছো?”
তিতলি কোনো উত্তর করল না। ফারাজের দিকে ঘুরে তাকাল না পর্যন্ত। ভাবখানা এমন সে ফারাজের কথা শুনেনি। কিছুক্ষণ পরপর বুক কাঁপিয়ে নাক টানছে। সপ্তদশীর পেল্লয় মুখখানা এমন যেন ছুঁয়ে দিলেই কেঁদে দিবে। খালা শাশুড়ির কথাগুলো শুনার পর থেকে কেঁদেকেটে ভাসিয়ে ফেলেছে। ফারাজের কথার উত্তর না দিয়ে শাশুড়ির পরিয়ে দেওয়া স্বর্ণ গুলো খুলে ড্রেসিন টেবিলে খুলে রেখে দিচ্ছে।
ফারাজ স্থির দৃষ্টিতে বেয়াদব বউয়ের পুরো মুখ অবলোকন করে। কান্নার দাপটে পুরো মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। চোখ ফুলে উঠেছে। ফারাজের রাগী চেহারা পরিবর্তন হলো মুহূর্তেই। গলায় ধমক আটকে রেখে বলল,
“কাঁদছো কেন?”
তিতলি এবারও কিছু বললো না। ফারাজ রেগে যাচ্ছে । ফোঁস করে শ্বাস নিলো। বেয়াদব বউ তার রাগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এবার সে পূর্বে কিছু জিজ্ঞেস করা ছাড়ায় তিতলির সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। পেশিবহুল হাতের সাহায্যে একটানে বেয়াদব বউকে নিজের সামনে দাঁড় করালো। বা হাতে তিতলির কোমর টেনে নিজের সাথে চেপে ধরল পুরোপুরি । ডান হাতে থুতনি উঁচু করে প্রশ্ন করে,
“কথা বলছো না কেন? আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি!”
তিতলি কেঁপে উঠল। পিটপিট করছে আঁখিদুটি।
তার চোখজোড়া লাল হয়ে গিয়েছে। তাও ফারাজের দিকে তাকালো না। চোখ বন্ধ করে রাখলো। অভিমানে তার কন্ঠে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে,
“আমি কথা বলবো না।”
“রাগিয়ো না আমায়। যখন যেটা প্রশ্ন করবো সাথে সাথে এন্সার চাই।”
“আমি কে আপনাকে রাগানোর?”
“থাপ্পড় খেতে ইচ্ছে করছে?”
“মারেন আমি কিছু বলবো না।”
ফারাজ নিজের রাগ কমানোর জন্য দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় আনমনে। যতটা পারল ঠিক ততটাই শান্ত হয়েই বলল,
“কি হয়ছে?”
তিতলি ফুঁপিয়ে কাঁদে। মাথা নিচু তার।
“আপনি…আমাকে…”
“হু আমি তোমাকে….”
তিতলি এতো চেষ্টা করেও বাক্যটি মুখ দিয়ে বের করতে পারছেনা। পুনরায় মুখ খুলল। পারছেনা! ফারাজকে খুব ধৈর্যবান দেখাল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তিতলি অস্পষ্ট স্বরে শুধালো,’
“ডি…ডিভ!”
“সম্পূর্ণ কথা শুনতে চাই একসাথে।”
তিতলি চুপ হয়ে গেলো। কাঁদতে কাঁদতে আগের কথাটা অর্ধেক রেখেই বলল,
“আপনি…আপনি আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন?”
ফারাজের মুখের ভাব বদলে গেল মুহূর্তেই। বিদ্বিষ্ট চাউনী গভীরতা পেল। গম্ভীর সুদর্শন মুখখানায় আচমকা শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ধরে রেখে মুখ নামালো মেয়েটার কানের কাছে। অতঃপর হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“আমার থেকে তোমার কোনো মুক্তি নেই। গোটা এক জনম আমার সাথে কাটাতে হবে। দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই! আমি হতে দিবো না।”

চলবে।

রাগে_অনুরাগে

পর্ব_২৭ (শেষাংশ )

সুহাসিনি_ফাতেহা

“পরপারে ফের দেখা না হওয়া অবধি আমার কাছ থেকে তোমার কোনো মুক্তি নেই বউ। — ছাড়াছাড়ি নট এলাউ! ফারাজ খানের যেহেতু হয়ে গেছো— তার থেকে ছাড়া পাওয়ার দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই তোমার।”
নত করে রাখা মুখখানা তুলে তড়াক চোখে তাকায় তিতলি। মুহূর্তেই চোখ নামিয়ে নিলো। ওই ধারাল নেত্রদ্বয় অব্ধি পৌঁছাতে তার দৃষ্টিযুগল বিফল হলো। সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে বসে, “আমি…আমি ছাড়বো না আপনাকে। আপনি ছেড়ে দিলেও আপনার কাছেই থেকে যাবো একদম।” তিতলির কথা শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসল রূঢ় মানব! পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ তৎক্ষণাৎ বেয়াদব বউকে নিজের সাথে পুরোপুরি মিশিয়ে নিলো। দেহের সাথে দেহের সংঘর্ষ হতেই,গভীর দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটার মুখখানার পানে। অতঃপর বাঁকা কন্ঠে শুধালো, “তো? ছাড়তে কে বলছে তোমায়? তোমার সামনেই তো আছি — ধরে রাখো! সাথে আমিও যা করার গোসল করার আগেই করে নিই!” ফারাজের ঠোঁটের কোঁণে বাঁকা হাসি যেন প্রজাপতির ন্যায় খেলা করছে। একহাতে শার্টের বোতামে হাত দিয়ে মুখ এগিয়ে আনলো কাছাকাছি। তিতলি মরতে থাকা প্রানীর মতো হাঁসফাঁস করতে শুরু করলো। দুহাতে ফারাজের বুক ঠেলে সরাতে চাইল। কিন্তু ব্যর্থ হলো। কোমরের দুপাশে শক্ত ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেলো৷ গলায় দাঁড়ির খোঁচা খেল। তিতলি নড়েচড়ে উঠলো। এমন স্পর্শে তার বুকের উঠানামার গতি নিয়ন্ত্রনের বাহিরে। ঠোঁট দুটো অনবরত কাঁপছে। চোখদুটো খিঁচে রেখেছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তীব্র হলো। সত্যি মরে যাচ্ছে নাতো?
ফারাজ আচমকা ছেড়ে দিলো। মুখখানা কেমন বদলে গেলো মুহূর্তেই। পরনের শার্ট সোফায় ছু*ড়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলে গেলো,
“পরেরবার নিজ থেকে হুটহাট আপনাকে ছাড়বো না কথাটা বলে কাছে আসতে চাইলে, এখনকার ধরাটা আরো নির্মম ভাবে ধরবো। মাইন্ড ইট!”
বোকার ন্যায় হতবিহ্বল ভাব ধরল তিতলি। নেত্রপল্লব কয়েকবার ঝাপটে তাকাল। সে কি বুঝালো আর ভাল্লুক কি বুঝে নিচ্ছে? তার কথা তাকেই ফিরিয়ে দিলো। তিতলি না ভেবে সোফায় পড়ে থাকা ফারাজের শার্টটা হাতে নিয়ে নাকের কাছে এনে লম্বা এক নিশ্বাস নিলো। চেনাজানা কড়া পারফিউম সহ পুরুষালি শরীরের সুবাস নিমেষেই অবশ করে দিলো তার চারপাশ। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। খারাপ লোক! আমাকে একটু বুঝেন না।”
.
.
এর ভেতরে আরো তিনদিন পেরিয়ে গেছে। কলেজে ফারাজের অত্যন্ত জরুরী কাজ থাকায় তিতলিকে বাবার বাড়ি যেতে দেয়নি। সাথে করেই কলেজে নিয়ে গেছে দুদিন। তার এত কাজ ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরবে, আর বেয়াদব বউ বাপের বাড়ি গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে ঘুমাবে এটা সে মানতে পারবে না। তবে আজ শ্বশুরের সাথে কথা বলে জানিয়েছে কালকে বিকালে দিয়ে আসবে। শ্বশুর অনেক জোর করেছে সাথে যেন সেও যায়। ফারাজ ভদ্রতায় ঠিক আছে যাবো বলেছে। তবে সে যাবে নাকি যাবেনা এটা সোজা তার মনের উপর ডিপেন্ড করে।

.

সন্ধ্যা সাতটা।
শেখ বাড়িতে একটা ছোটখাটো ঝামেলা বেধেছে। তৌসিফ শেখ তুষারকে একটা মেয়ের সাথে দেখেছেন। এটা আলেয়া শেখ সহ ফরিদা বানু সবার কানে চলে গেছে। তুষার বাবার পাশে বসে আছে। সামনের দু সোফায় আলেয়া শেখ ও ফরিদা বানু।
তুষার অনেক ভেবেচিন্তে কোনোরুপ ভনিতা ছাড়াই বাবা মায়ের উদ্দেশ্য বলল,
“আমাকে যার সাথে দেখেছো ও ঝিলিক আব্বু! অয়নের ফুপাতো বোন।”
তৌসিফ শেখ রেগে আছেন নাকি গম্ভীর আছেন তা এ মুহূর্তে বুঝা দায়। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“তো এখন কি করতে বলছিস?”
তুষার বাবার গম্ভীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। অতঃপর সোজা বলল,
“আমি ওকে….”
ফরিদা বানু নাতির মুখের দিকে চেয়ে বললেন,
“কি নাতি? হেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস? তিনদিন ধরে দেইখতাছি তুই ফোন নিয়া কার সাথে কথা কইয়া মনে মনে হাসোস? মাইয়াডার নাম পিলিক নাকি ঝিলিক কইলি?”
তৌসিফ শেখ মাকে বললেন,
“আম্মা যা বলার আমরা বাপ ছেলে বলতেছি। তারপর তোমাদের মতামত দিও।”
আলেয়া শেখ বললেন,
“আমি বরং উঠে চলে যায়। আপনারা বাপ ছেলে কথা বলেন।”
তৌসিফ শেখ স্ত্রীকে বললেন,
“এটা আমার তোমার সবার জানা উচিত! তোমার ছেলে পাড়া পাড়া বাইকে করে যে মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মা হয়ে এটা তোমার জানার প্রয়োজন আছে।”
তুষারের বাবার সাথে প্রায় বন্ধুসূলভ সম্পর্ক। তার কোনো ইচ্ছেতে চাওয়াতে না বলেনি কখনো। সে যেটায় এটা ঠিক বলেছে তার বাবাও মত দিয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তার বাবা রাগ দেখাবে রাজি হবে না সেটা সে খুব ভালো করেই জানে। তাও দুহাতে আঙুল পেঁচিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে বলল,
“আব্বু আম্মু আমি ঝিলিককে বিয়ে করতে চাই! এ নিয়ে তোমাদের সকলের মতামত চাই! তোমরা শুধু হ্যাঁ বলে দাও বাকিটা আমি সামলে নিবো।”
আলেয়া শেখ চেঁচিয়ে বললেন,
“বিয়ে করবি মানে?”
তৌসিফ শেখ এমন কথায় আন্দাজ করছিলেন। তাই চুপচাপ বসে আছেন। হাতের চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বললেন,
“পরিচয় কি? বাপের নাম কি? মায়ের নাম কি? ভাই বোন কয়জন? সব ঠিকানা দে? তারপর ভেবে দেখবো। বিয়ে শুধু বললেই হয়ে যায় না।”
ফরিদা বানু ছেলেকে বললেন,
“নাতি বিয়া করতে চাইতাছে দিয়া দাও বাপ! তিতলির লাহন দেইখা ওগ্গা মাইয়া লই আয়! মাইয়া তো বিয়া দিয়া দিছস! এবার নাতিডারে
বিয়া করায় দাদা, নানা হইয়া যা। তুদের সক্কাল বিয়া করাইছি বইল্লা এহন নাতিন, নাতির গো বিয়া দেইখতাছি।
তুষার খুক খুক করে কেশে উঠল।
ফরিদা বানু আবার দুঃখ করে বললেন,
“নানিত টারে কয়দিন দেহি না। নাতজামাইকে খালি সামনে দেহি সোজা কইয়া দিমু নাতিনরে আর পাইবা না। এহন থেকে আমগো বাড়িত থাইকবো। তুমি ভাইগ্গা যাও মাস্টারি করো চেয়ারে বয় বয়!”
তৌসিফ শেখ মাকে বললেন,
“আম্মা তিতলি কালকে আসবে। তখন যা ইচ্ছে বলিয়ো।”
“আর না নাতাজামাই আইবো নি! নো আইলে রশি দি বাইন্দা নিয়া আয়!”
এর মাঝেই তৌসিফ শেখের ফোন বেজে উঠায় তিনি পকেট থেকে ফোন বের করে দেখেন তিতলি ভিডিও কল দিয়েছে। তিনি সব ভুলে গিয়ে হাসিমুখে ফোন রিসিভ করলেন,
ওপাশ থেকে তিতলি বাবাকে দেখে হাসিমুখে বলল,
“আসাসলামু আলাইকুম আব্বু!”
তৌসিফ শেখ: “ওয়ালাইকুম আসসালাম! কেমন আছো আম্মু?”
তিতলি: “ভালো আব্বু! তুমি ভালো আছো?”
তৌসিফ শেখ : “আলহামদুলিল্লাহ্‌! জামাই কোথায় আম্মু?”
তিতলি: “জানিনা।”
ফোনের সাউন্ড স্পিকার বাড়ানো থাকায় ফরিদা বানু সহ সবাই শুনলো। ফরিদা বানু বললেন,
“দেহি আমারে দে।”– তৌসিফ শেখ মাকে ফোন দিলেন। আলেয়া শেখের সাথে বিকালেও কথা হয়ছে। তুষার ও দুপুরে বোনের সাথে কলেজে দেখা করে এসেছে।
ফরিদা বানু নাতিনকে বললেন, “জানোস না মানে কি? নাতজামাই কই যায়? কি করে? সব খবরাখবর লইয়া রাখবি। রাইতের বেলা বেশিক্ষণ বাইরে থাইকতে দিস না।”
এভাবে সবার সাথে আরো কথা হলো।
.
.
ঘড়ির কাঁটা বারোটায়। দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট ধরে বই খাতা নিয়ে বসে আছে তিতলি। সামনে ফারাজ তিতলিকে নিজের মতোই এটাসেটা বুঝাচ্ছে। একদম মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু তিতলির মন সেদিকে নেই। এইমুহূর্তে সে ভাল্লুককে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছেনা। কি গম্ভীর মুখে তাকে পড়াচ্ছে এই গম্ভীর মুখ দেখেই তার প্রেম প্রেম পায়। ইচ্ছে করে মুখে কয়টা চুমু বসিয়ে দৌড় দিতে। স্যান্ডো গেঞ্জি পরে তার সামনে বসে আছে। সুঠাম দেহের লোমশ বুকের অধিকারী। বুকের উপরের অংশ আরো কতকি এসব অংশ দেখে নিজে নিজে লজ্জা পাচ্ছে সে। চুমু দিবে দিবে ভেবেছে
তার মাঝেই ফারাজ তিতলিকে বলল,
“চোখ বইয়ের দিকে চাই! আমার দিকে নয় হুমম!”
তিতলি মুখ ভেঙচি কেটে বইয়ের দিকে নজর দিলো। খারাপ লোক। একটু তো দেখেছে। কেমন ধমক দিলো। মুখ নাক ফুলিয়ে বলল,
“তাকাচ্ছি না আপনার দিকে। বই আমার স্বামী!”
ফারাজের ভ্রুজোড়া কুঁচকে যায় কৌতুকে। স্কেল হাতে নিলো তৎক্ষণাৎ। কপট রাগ দেখিয়ে হিসহিসিয়ে শুধাল,
“মাইর খেতে ইচ্ছে করে?”
“না আপনাকে চু..চুমু….” অর্ধেক বলে থামল সপ্তদশী! ফের বলল,
“এই না না পড়ছি! মারবেন না প্লিজ! এটা দিয়ে মারলে খুব ব্যাথা পাবো।”
ফারাজ তিতলির দিকে ফিরলো আচমকা। ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
“কি যেন বলে যাচ্ছিলে? আমাকে চুমু পুরো কথাটা শুনতে চাই?”
তিতলি কেঁপে উঠে বলল,
“কিছুনা কিছুনা বইকে চুমু! আপনাকে না।”
ফারাজ খান এখন পড়ানোর মুডে আছে। তাই বেয়াদব বউর কে পড়া জিজ্ঞেস করলো,
নিউটনের প্রথম থেকে চতুর্থ সূত্র পর্যন্ত বলো,
তিতলি কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে উত্তর দিলো,
“নিউটনের প্রথম সূত্র হলাম আমি! দ্বিতীয় সুত্র হলেন আপনি! তৃতীয় সূত্র আমাদের টুনাটুনিরা। চতুর্থ সূত্র আমরা সবাই!” দেখুন হয়েছে কিনা?

চলবে।

[পাখিরা সবাই ভালোবেসে রেসপন্স করবা কেমন? যত বেশি রেসপন্স হবে তত তাড়াতাড়ি নেক্সট পর্ব আসবে ইনশাআল্লাহ্‌!]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply