#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
মীর বাড়ির ড্রয়িংরুমে যে ঐতিহাসিক মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে, তার রেশ যেন কাটার নামই নিচ্ছিল না। আরযান মীর যখন সোফায় বসে নিজের কপালে হাত দিয়ে মীর বংশের ছেলেদের রক্তে ‘ডিফেক্ট’ থাকার ঘোষণা দিল, তখন পুরো ঘরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেছে। রাজ তখনও অবনীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে অত্যন্ত নিষ্পাপ মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সে আরযানের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাই, আপনি সাইকোলজির ভাষাটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। আব্রাজ যখন বিশ টাকা দিয়ে পলিটিক্স করে ঘরের শত্রু বউ তুলে এনেছে, তখন মীর বাড়ির ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে গেছে। আমি অবনীকে এনে আসলে মীর বাড়ির মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করেছি। ও আমার পেশেন্ট ছিল, এখন ও আমার লাইফ পার্টনার। নো সাইড এফেক্ট!”
“চুপ কর রাজ!” আরযান এবার সোফা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তাঁর লম্বা, গম্ভীর অবয়বের সামনে রাজের সেই চশমা পরা চটপটে ভাবটা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। আরযান অবনীর বৃদ্ধ বাবার দিকে তাকাল। যিনি লজ্জায় মীর বাড়ির দামি কার্পেটের দিকে তাকিয়ে কাঁপছিল। এগুলো তো অভিনয় কিন্তু এত রিয়েল কেন লাগছে? বাড়ির লোক গুলোকে কি রাজ অভিনয়ের কথা জানায় নি? আর বাড়িতে আনা লাগতই বা কেন? রাজকে তিনি নিষেধ করেছিলেন। রাজ নিজেই বলল, অবনীর কন্ডিশন কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। সংসার করে দেখতে হবে।” কি এক অবস্থা। ছেলেটা কত কি করছে।
“চাচা,” আরযানের কণ্ঠস্বর এবার অনেকখানি মাপা এবং মার্জিত শোনাল। “আপনি সোফায় বসুন। আপনার কোনো অপরাধ নেই। এই মীর বাড়ির ছেলেরা বাইরে যতই ডক্টর বা এমপি হোক না কেন, ঘরের ভেতর পা রাখলেই তাদের মগজের কোনো একটা তার ছিঁড়ে যায়। বিয়ে যখন ও করে ফেলেছে, অবনী এই বাড়ির বউয়ের পূর্ণ মর্যাদা পাবে। তবে এই ছিটগ্রস্ত ডাক্তারকে আমি কীভাবে সাইকোথেরাপি দেব, সেটা এখন আমার ওপর ছেড়ে দিন।”
আরযান এবার রাজ আর আব্রাজের দিকে একসাথে তাকাল। তাঁর চোখ দুটো যেন দুটো জ্বলন্ত কয়লা। “আব্রাজ! তোর অ্যাকাউন্ট আমি ফ্রিজ করেছেই। আর রাজ, আজ এই মুহূর্ত থেকে তোর চেম্বারের সমস্ত ভিজিট আর প্রেসক্রিপশনের টাকা সরাসরি আমার পার্সোনাল অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হবে। মীর বাড়ির টাকা উড়িয়ে তোদের এই বউ আমদানির শখ আমি এক মাসে ঘুচিয়ে দেব। আজ থেকে তোরা দুই ভাই কোনো পার্সোনাল গাড়ি পাবি না। এই শহরে বাসের ভাড়া কত টাকা, সেটা তোরা বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে শিখবি। আজ বিকেলে আবরাজের যে নির্বাচনী পথসভা আছে, সেখানে ও বাসে করেই যাবে।”
আব্রাজ এতক্ষণ নিজের শূন্য পকেটের শোকে কাদা হয়ে ছিল, কিন্তু রাজের এই অবস্থা দেখে সে হঠাৎ করেই সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল। সে রাজের পিঠ চাপড়ে দিয়ে দাঁত বের করে হাসল। “সাবাশ ভাই! তুই তো আমার চেয়েও বড় পলিটিশিয়ান রে! আমি তো তাও সাতটা ভোট গোনার জন্য সারারাত মশার কামড় খেয়েছি, আর তুই একটা সেশন করেই কেল্লাফতে করে দিলি? তবে ব্যাড নিউজ হলো ভাই আমাদের দুজনকে এক লাইনেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখন থেকে বাসের হ্যান্ডেলটা তুই ডান হাতে ধরবি, আমি বাম হাতে ধরব।”
নৈশি চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর খটাস করে রেখে আরযানের দিকে তাকিয়ে বলল, “মিস্টার আরযান, আপনার এই মীর বংশের ছেলেদের অহংকার ভাঙতে বেশি সময় লাগবে না। একজন ক্ষমতার লোভে অন্ধ, আরেকজন প্রফেশনের নামে চোর। এই বাড়িতে আমার থাকাটা একটা পলিটিক্যাল ক্রাইমের মতো মনে হচ্ছে।”
আরযান চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নৈশির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। “তোমার পলিটিক্যাল এজেন্ডা বাইরে রাখবে। কাল সকাল থেকে তুমি আর অবনী দুজনেই ডাইনিং টেবিলে সাঁঝকে সকালের নাস্তায় সাহায্য করবে। এখানে কোনো ভিআইপি ট্রিটমেন্ট নেই। আর সাঁঝ…..!”
আরযানের মুখে নিজের নাম শুনতেই সাঁঝের বুকের ড্রাম বাজা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। সে ট্রেমুখো হয়ে তোতলাতে লাগল, “জি… জি আরযান ভাইয়া?”
“ড্রয়িংরুমের এই জঞ্জালগুলো পরিষ্কার কর। আর রাজ-অবনীর জন্য মেঝের সোফাতেই চাদর বিছিয়ে দে। মীর বাড়ির নিয়মে এদের জন্য কোনো স্পেশাল বাসর ঘর নেই,” আরযান নিজের ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর চালে সিঁড়ি দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। রাজ হা করে তাকিয়ে রইল, “কি বলল? সব ওপেন প্লেসে হবে? নাউজুবিল্লাহ!”
–
আরযান ড্রয়িংরুম থেকে বিদায় নিতেই সাঁঝ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে পেছনের করিডোর দিয়ে পালাবার চেষ্টা করল। তার কাঁধে বসা চিরস্থায়ী শত্রু কাম বন্ধু শালিক পাখি ‘চিকু’ হঠাৎ করে ডানা ঝাপটে চেঁচিয়ে উঠল, “চোর! চোর! চোর!”
“আরে চুপ কর, বজ্জাত পাখি!” সাঁঝ দাঁত কিড়মিড় করে চিকুর ঠোঁট চেপে ধরার চেষ্টা করল। “তোর জন্য আজ আমার জানটা যাবে!”
“কই যাওয়া হচ্ছে, মীর বাড়ির প্রধান তথ্য অফিসার?” পেছন থেকে এক অত্যন্ত পরিচিত, ঠান্ডা এবং ধারালো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
সাঁঝের পুরো শরীর এক মুহূর্তে জমে বরফ হয়ে গেল। সে রোবটের মতো ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। করিডোরের স্তম্ভে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরভিদ। তার পরনে একটা ধূসর রঙের ক্যাজুয়াল শার্ট, হাতা দুটো নিখুঁতভাবে গোটানো। তার এক হাতে একটা কালো রঙের ডায়েরি আর অন্য হাতে একটা ছোট কাঠের স্কেল, যেটা সে অনবরত নিজের হাতের তালুতে ঠুকছে।
সাঁঝ একটা শুকনো ঢোক গিলে অত্যন্ত মাসুম একটা হাসি দেওয়ার চেষ্টা করল। “আরে আরভিদ ভাইয়া! তুমি এখানে? আমি… আমি আসলে ভাবছিলাম আজ আকাশে মেঘ খুব সুন্দর, চিকুকে একটু ছাদ থেকে ঘুরিয়ে আনি। ও তো ঘরের এই গুমোট পলিটিক্স সহ্য করতে পারছে না।”
আরভিদ এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখের চাউনিতে কোনো দয়া নেই। সে কাঠের স্কেলটা দিয়ে সাঁঝের কপালে আলতো করে একটা টোকা দিল। “ছাদ পরে হবে। চুক্তির কথা মনে আছে তো? নাকি তোর স্মৃতিশক্তিও হাওয়া হয়ে গেছে?”
সাঁঝ নিজের কপালটা হাত দিয়ে চেপে ধরে মুখটা কাঁদোকাঁদো করল। “মনে থাকবে না কেন? আমার কি মগজ নেই? কিন্তু ভাইয়া, আমার কোমরটা এখনো বড্ড ব্যথা করছে।”
“নাটক তো তুই নিজেই করেছিস সাঁঝ,” আরভিদ নিজের মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে স্ক্রিনটা সাঁঝের চোখের সামনে ধরল। স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কাল রাতে মীর বাড়ির পেছনের গেটে সাঁঝ কীভাবে ওই স্বাধীন নামের ছেলেটার বাইকের পেছনে বসে হাসিমুখে হাত নাড়ছিল। শালা আবার এসেছে। আরভিদ অত্যন্ত ধীর এবং নিষ্ঠুর গলায় বলল, “ভিডিওটা খুব সুন্দর এসেছে, তাই না? আরযান ভাইয়াকে যদি এটা দেখাই, তবে তোর ওই স্বাধীনতার বারোটা বাজিয়ে ওকে সোজা মীর এভিয়েশনের কোনো কার্গো বিমানে করে আমাজনের জঙ্গলে পাঠিয়ে দেবে। আর তোকে? তোকে এই মীর বাড়ির প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী আজীবনের জন্য গৃহবন্দী করা হবে। এবার বল, তুই কি আমার দেওয়া ডিউটি করবি, নাকি ভাইয়ার থেরাপি নিবি?”
সাঁঝ দুই হাত জোড় করে বলল, “না না! ভাইয়া, দোহাই তোমার! আরযান ভাইয়াকে ওটা দেখিও না। উনি এমনিতেই রাজ ভাইয়ার কাণ্ডে রেগে লাল হয়ে আছেন। এখন ওটা দেখলে আমাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবেন। তুমি যা বলবে আমি তা-ই করব।”
আরভিদ তার ডায়েরিটা খুলে একটা পাতা উল্টাল। “গুড। তাহলে আজকের টাস্ক শোন। নতুন দুই ভাবীর আগমনে মীর বাড়িতে এখন লোকসংখ্যা বেড়েছে। ড্রয়িংরুমের কাঁচের জানালোগুলো সব ধুলোয় মেখে আছে। তুই আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে এই তলার আর ওপরের তলার সমস্ত জানালার কাঁচ একদম চকচকে করে দিবি। একটা দাগও যেন না থাকে। আর হ্যাঁ, চিকুকে খাঁচায় বন্দি করবি। ও যদি আবার আমার কোনো খাবারে বা ফাইলে নিজের ‘পবিত্র অবদান’ রাখে, তবে ওটাকে আমি আজ রাতে চিকু ফ্রাই বানিয়ে খাব।”
চিকু যেন আরভিদের কথা বুঝতে পারল। সে সাঁঝের কাঁধ থেকে উড়ে গিয়ে করিডোরের ঝুলন্ত ঝাড়বাতির ওপর বসে চিৎকার করতে লাগল, “জল্লাদ! আরভিদ জল্লাদ!”
সাঁঝ মনে মনে আরভিদকে এক হাজারটা গালি দিতে দিতে জানালার কাঁচ মোছার কাপড়টা তুলে নিল। সে বালতিতে জল নিয়ে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে লাগল, “আল্লাহ গো! এই মীর বাড়িতে জন্ম নেওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্রাইম ছিল। একেকটা ছেলে যেন এক একটা হিটলারের নাতি! বিশেষ করে ওই আর আরযান কসাইটা! আর কসাইয়ের চামচা আরভিদ কসাই!
–
আরভিদ যখন করিডোরে দাঁড়িয়ে সাঁঝ আর চিকুকে ‘সাইজ’ করে ফিরছিল, তখন তার কান দুটো আসলে সজাগ ছিল দোতলার লাইব্রেরি ঘরের দিকে। মীর বাড়ির এই বিশাল লাইব্রেরিটাই আর্যার একমাত্র শান্তিদায়ক জায়গা। নতুন দুই ভাবীর আগমনে নিচে যে তুমুল মনস্তাত্ত্বিক কুরুক্ষেত্র চলছে, আর্যা নিজেকে তা থেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখে ভারী একটা পলিটিক্যাল সায়েন্সের বইয়ে মুখ গুঁজে বসে ছিল।
আরভিদ ধীর পায়ে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকল। খাটি কাঠের আলমারিগুলোর মাঝখানের সরু গলিতে যেখানে দুপুরের টিমটিমে আলো এসে পড়েছে, ঠিক সেখানে আর্যা একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে আছে। তার চোখের সেই চেনা অহংকার আর দূরত্ব এখনো এক চুল কমেনি।
“নিচে ড্রয়িংরুমে রাজের বিয়ের থেরাপি চলেছে, আর তুমি এখানে বসে রাষ্ট্রের থিওরি পড়ছ, আর্যা?” আরভিদ পকেট থেকে তার সেই চিরচেনা কাঠের স্কেলটা বের করে আর্যার টেবিলের ওপর টক করে একটা শব্দ করল।
আর্যা বই থেকে চোখ না তুলেই অত্যন্ত শীতল গলায় বলল, “মীর বংশের ছেলেদের বিয়ে মানেই একটা নতুন থ্রিলার ড্রামা। ওসব ফালতু ড্রামা দেখার চেয়ে প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ পড়া অনেক বেশি শিক্ষণীয়, । আর হ্যাঁ, আমার টেবিলের ওপর ওভাবে শব্দ করা বন্ধ করো। ডিসিপ্লিন আমারও অপছন্দ নয়।”
আরভিদ এবার একটু ধূর্ত হাসল। সে আর্যার চেয়ারের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল এবং দুহাত টেবিলের ওপর রেখে আর্যাকে নিজের বাহুবন্ধনীর মাঝে এক প্রকার বন্দি করে ফেলল। আর্যার কাঁধের সুতি ওড়নাটা আরভিদের শার্টের বোতামে হালকা আটকে গেল। আর্যা শক্ত হয়ে বসল, কিন্তু তার চোখের পলক নড়ল না।
“প্লেটোর রিপাবলিকে কি কোথাও লেখা আছে আর্যা, যে নিজের বরের সাথে সারাদিন এই বরফের মতো দূরত্ব বজায় রাখতে হয়?” আরভিদ আর্যার কানের খুব কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, “ভাইয়া তো আজ রাজ আর আবরাজের পকেট কেটে জিরো বানিয়ে দিয়েছে। আমার অ্যাকাউন্ট কিন্তু এখনো সচল। সো, পলিটিক্যাল সায়েন্সের বাইরেও যদি তোমার কোনো দাবি-দাওয়া থাকে, বলতে পারো।”
আর্যা ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে আরভিদের চোখের দিকে তাকাল। দুজনের ঠোঁটের দূরত্ব তখন মাত্র এক ইঞ্চি। আর্যা তার চিরচেনা ক্ষুরধার গলায় বলল, “টাকা দিয়ে আর যাই হোক, আর্যাকে কেনা যায় না, মিস্টার আরভিদ। আর তোমার এই ‘কাছে আসার’ টেকনিকটা বড্ড ব্যাকডেটেড। সাইড প্লিজ, আমি নিচে যাব।”
সে যেমনই উঠে দাঁড়াতে গেল, ওড়নাটা আরভিদের শার্টের বোতামে টান খেয়ে আর্যা ব্যালেন্স হারিয়ে সরাসরি আরভিদের শক্ত বুকের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। আরভিদ একহাতে আর্যার কোমর জড়িয়ে ধরে অন্যহাতে তার টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটা ক্যাচ লুফে নিল। আর্যার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লজ্জায় লাল হয়ে গেল, যদিও সে সেটা রাগের আড়ালে ঢাকতে চাইল।
“এটাও কি ব্যাকডেটেড টেকনিক, আর্যা?” আরভিদ মুচকি হেসে বলল, “নাকি পলিটিক্যাল সায়েন্সের নতুন কোনো থিওরি?”
আর্যা আরভিদের বুকে একটা আলতো ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। “লুফে নেওয়ার অভ্যাসটা ভালো, তবে মীর বাড়ির জানালার কাঁচ ভাঙলে কিন্তু আরযান ভাইয়া তোমাকেও বাসের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেবে, মনে রেখো!” সে দ্রুত পায়ে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেল, আর আরভিদ নিজের শার্টের বোতামের দিকে তাকিয়ে একচিলতে তৃপ্তির হাসি হাসল। বাঘিনীকে বাগে আনা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়।
–
আরভিদের দেওয়া দুই ঘণ্টার ‘জানালার কাঁচ মোছা’র শাস্তি কোনোমতে ফাঁকি দিয়ে সাঁঝ তখন দোতলার নিজের ঘরে গিয়ে দরজা দিল। তার বুকের ভেতরের ড্রাম বাজা তো দূর, এখন সেখানে কালবৈশাখী ঝড় বইছে। কারণ আর কেউ নয়, স্বয়ং ‘স্বাধীন’! স্বাধীন তাকে কিছুক্ষণ আগেই হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেছে“সাঁঝ, আসলে শাড়ি পরা নারীদের দিকে তাকালে মনটা কেমন যেন পবিত্র হয়ে যায়। তোমাকে কোনোদিন শাড়িতে দেখলাম না।”
স্বাধীনের এই এক লাইনের মেসেজ পড়ে সাঁঝের মগজের সব কটা তার একসাথে ঝিলিক মেরে উঠল। সে আলমারি ঘেঁটে তার মায়ের একটা পুরনো, আকাশী রঙের পাতলা জর্জেট শাড়ি বের করল। কিন্তু শাড়ি পরা তো দূরের কথা, পিন করতে গিয়ে সে নিজের পেটের কাছে শাড়িটা এমনভাবে পেঁচাল যে ব্লাউজ আর শাড়ির মাঝখানে তার ফর্সা পেটটা অনেকটাই বের হয়ে রইল। আয়নায় নিজেকে দেখে সে নিজেই একটু লজ্জা পেল, কিন্তু স্বাধীনের মনে ‘পবিত্রতা’ জাগানোর জন্য সে এই রূপেই ছাদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সাথে নিল তার সাধের দূরবীন আর ফোনটা, যাতে ছাদ থেকে স্বাধীনকে ছবি তুলে পাঠানো যায়।
দুপুরের পর মীর বাড়ির ছাদটা একদম নিঝুম। আকাশে তখনো হালকা মেঘের আনাগোনা। সাঁঝ ছাদের রেলিংয়ের পাশে গিয়ে দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে আসার গলির দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিল, আর অন্যহাতে ফোনটা দিয়ে এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে সেলফি তোলার কসরত করছিল। পাতলা শাড়িটা বাতাসে বারবার উড়ে যাচ্ছিল, আর সাঁঝ সেটা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল।
“স্বাধীনকে ছবি পাঠিয়ে একদম কাবু করে দেব! তারপর আরভিদ কসাইয়ের ওই ভিডিও ও নিজেই হ্যাক করে ডিলিট করে দেবে, হুহ!” সাঁঝ মনে মনে যখন এই বিশাল ডিজিটাল জয়ের নীল নকশা আঁকছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা অত্যন্ত ভারী, গম্ভীর যমদূতের মতো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“শাড়িটা কি একটু বেশি পাতলা হয়ে গেছে না, সাঁঝ?” এই কণ্ঠস্বর শোনার সাথে সাথে সাঁঝের হাত থেকে দূরবীন আর ফোন দুটোই ছাদের মেঝেতে আছড়ে পড়ল। সে এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল।
ছাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরযান মীর! তাঁর পরনে সেই সাদা শার্ট। আরযানের তীক্ষ্ণ নজর সরাসরি গিয়ে পড়ল সাঁঝের সেই উন্মুক্ত পেটের ওপর, যেখানে বাতাসের ঝাপটায় শাড়িটা পুরোপুরি সরে গেছে। সাঁঝ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দুই হাত দিয়ে নিজের পেটটা ঢাকার চেষ্টা করল, কিন্তু পাতলা শাড়িতে সেটা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে তোতলাতে লাগল, “আ… আরযান ভাইয়া! আপনি এখানে? আমি… আমি আসলে ছাদে ওই… মেঘ দেখতে এসেছিলাম।”
আরযান ধীর পায়ে সাঁঝের দিকে এগিয়ে এলো। তাঁর একেকটা পদক্ষেপ যেন সাঁঝের বুকের ওপর হাতুড়ির মতো পড়ছিল। আরযান সাঁঝের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। দুজনের মাঝখানের দূরত্ব এখন এক সুতোরও কম। আরযানের শরীর থেকে আসা চড়া পারফিউমের গন্ধ আর তাঁর গায়ের তপ্ত নিঃশ্বাস সাঁঝের মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়ল।
আরযান নিচু হয়ে মেঝে থেকে সাঁঝের ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনটা এখনো লক হয়নি, সেখানে স্বাধীনের সেই ‘শাড়ি পরা নারী’র মেসেজটা জলজল করছে। আরযানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় ফোনটা নিজের পকেটে পুরে নিল।
“অন্য পুরুষের চোখের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য মীর বাড়ির মেয়েরা এভাবে পেট বের করা পাতলা শাড়ি পরে ছাদে আসে না, সাঁঝ,” আরযানের গলার স্বর এখন এত নিচু আর ধারালো যে সাঁঝের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
“ভাইয়া… আমি… স্বাধীন জাস্ট ফ্রেন্ড…” সাঁঝের চোখ দিয়ে তখন প্রায় জল চলে এসেছে।
আরযান হুট করেই তার একটা বড়, শক্ত হাত বাড়িয়ে সাঁঝের কোমরটা এক টানে নিজের দিকে টেনে নিল। সাঁঝের নরম শরীরটা আরযানের চওড়া, শক্ত বুকের সাথে মিশে গেল। আরযান অন্য হাত দিয়ে সাঁঝের শাড়ির আঁচলটা টেনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তার উন্মুক্ত পেটের ওপর জড়িয়ে দিল, তারপর পিনটা নিয়ে সজোরে আটকে দিল। এই পুরো সময়টায় আরযানের চোখ ছিল সরাসরি সাঁঝের কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে। এই মুহূর্তে তাঁর হাতের তীব্র মুচড়ে ধরা বাঁধন বলে দিচ্ছিল সাঁঝের ওপর অন্য কারও নজর সে জ্যান্ত থাকতে বরদাস্ত করবে না।
“আজ থেকে এই ফোন আমার কাছে থাকবে,” আরযান সাঁঝের কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আর স্বাধীনতার চোদ্দটা বাজানো আমার জন্য মাত্র দুই মিনিটের কাজ। কাল সকাল থেকে যদি তোকে মীর বাড়ির বাইরে কোনো ছেলের সাথে কথা বলতে দেখি, তবে এই শাড়ি পরা রূপেই তোকে আমি সারাজীবনের জন্য আমার ঘরে তালাবন্ধ করে রাখব। নিচে যা!”
সাঁঝ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তবে মনে মনে বলল, “ইশ আসছে? আমার ঘরে তালাবদ্ধ করব। এই নিমপাতা কি জানে না এটা যে সাঁঝেরও ঘর?” সে শাড়ির কুঁচি কোনোমতে হাতে ধরে, কাঁদতে কাঁদতে ছাদ থেকে নিচে দৌড়ে পালাল। আরযান ছাদের রেলিংয়ে হাত রেখে বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল। “স্বাধীন? মীরের জিনিসে হাত দেওয়ার সাহস তোমার কীভাবে হয়……”
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১২
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৮
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৬(শেষ অংশ)
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৮
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৮
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৭+৩৮
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৩
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১৩