Golpo romantic golpo মূল্য

মূল্য পর্ব ৫


#মূল্য |০৫|
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
একদিন হঠাৎই ঈশিতা মানে অরিত্রের খালাত বোন নীলার বাসায় আসে কিছু শাড়ি আর কুর্তির অর্ডার দিতে। কাজের কথাবার্তা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ঈশিতা হাসতে হাসতেই নীলাকে বলল,
— ভাবি, আমার জন্মদিনের দিন না তোমারও জন্মদিন ছিলো? ভাইয়া কি গিফট দিলো তোমায়।
নীলা মৃদু হেসে বলল,
— উপেক্ষা আর অপেক্ষা।
ঈশিতা অবাক হয়ে বলল,
— কি বলো? কিছুই দেয়নি।
নীলা আবারও একটি মলিন হাসি দিয়ে মাথা ডানে বায়ে নাড়াল। ঈশিতা তার উত্তর শুনে মন খারাপ করে বলল,
— জানো, আমি তো ভাইয়াকে বকাও দিয়েছি। একজন মানুষের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়েও যদি তার জন্মদিনটাই ভুলে যায়, তাহলে কষ্টটা কত বড় হয় সেটা ভাইয়া বুঝিয়েছিলাম।
নীলা স্বভাব সুলভ একটা ছোট হাসি ঠোঁটের কোণে রেখে বলে,
—যে বুঝার সে শুরুতেই বুঝে। কথায় আছে না, যার হয় না নয়ে জ্ঞান, তার হবে না নব্বইতেও।
অরিত্র মাথা নিচু করে রইল। প্রথমবারের মতো নিজের ভুলটা অন্য কারও মুখে শুনে সে লজ্জা পেল।
দিনকে দিন নীলার বদলে যাওয়া অরিত্রকে কেমন কোণঠাসা করে দিচ্ছে নিজেরই কাছে। সবসময় নীলার এটেনশন পেয়ে অভ্যাসত থাকা অরিত্র, কিছুতেই নীলার পরিবর্তন মেনে নিতে পারছে না। এমন না সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসত না। ভালোবাসে সে তার স্ত্রীকে, তবে বহুবছর হয়ে গিয়েছে সেই ভালোবাসাটা প্রকাশ করেনি সে। বলতে গেলে, সে ভালোবাসার চেয়ে অবহেলাই বেশি করেছে নীলাকে।
ঈশিতার দেওয়া কাজগুলো নীলা সুন্দর ভাবে পাঁচদিনেই শেষ করে তাকে কল দিয়ে জানায়, এসে নিয়ে যেতে। ঈশিতা অফিসের পর অরিত্রের গাড়িতেই তার বাসায় আসে নিজের ড্রেস গুলো নিয়ে। নীলা অরিত্র ও ঈশিতার জন্য চা-নাস্তা বানিয়ে খাওয়ায়। ঈশিতা তার ড্রেসগুলো দেখে সেনঅনেক প্রশংসা করে নীলার,
—ভাবী তোমার কাজ মাশা আল্লাহ অনেক সুন্দর হয়েছে। আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি তোমার কাজের নিখুঁত ফিনিশিং দেখে। তোমার কাজ তো বড় বড় পেইজের ওনারদের কাজকেও পেছনে ফেলে দিবে।
অরিত্রও তখন ড্রয়িংরুমেই ছিল। সেও নীলার কাজে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। তার বউ এত ভালো হাতের কাজ করে সে আজ অব্দি খেয়াল করেনি।
নীলা প্রতিত্তোরে শুধু মুচকি হাসি দেয়। কথাবার্তা, খাওয়াদাওয়া করে ঈশিতা চলে যাওয়ার জন্য রওনা করলে, নীলা বলে–
—ঈশিতা আমার কাজের মূল্য দিলে না?
ঈশিতা থমকে যায় নীলার কথা শুনে। সে একটু দ্বিধান্বিত হয়ে তাকিয়ে থাকে নীলার দিকে। সে তো ভেবেছিল নীলা তার থেকে টাকা নিবে না। এই ভাবনাই সে নীলাকে বলে–
—ভাবী তুমি আমার থেকেও টাকা নিবে?
—টাকা না, আমার কাজের মূল্য সেটা। হ্যাঁ, আর নিবো না কেনো?
—আত্মীয়দের থেকেও তুমি কাজের মূল্য নিবে?
নীলার শান্ত দৃষ্টি ও কাঠকাঠ গলায় বলে–
—করপরেট জবে যেমন প্রফেশনাল লাইফ ও পারসোনাল লাইফকে আলাদা করার নীতি রয়েছে। তেমনই বিজনেসের ক্ষেত্রেও এই নীতিই বিদ্যমান। আমি যদি তোমাকে খুশি হয়ে কিছু গিফট করি সেটার হিসেব আলাদা।
কিন্তু তুমি একজন কাস্টমারের ন্যায় আমার থেকে অর্ডার করেছো, আমিও প্রফেশনাল ভাবেই কাজটা শেষ করেছি। তাহলে সেটার মূল্য নিতে গিয়ে আমি পারসোনাল লাইফের সম্পর্কের কথা কেন ভাববো?
ঈশিতার মুখটা কালো হয়ে যায় নীলার কাঠকাঠ কথা শুনে। সে একবার অরিত্রের দিকে তাকায়। অরিত্র তার মনোভাব বুঝতে পেরে কিছু বলতে চায়, কিন্তু তার আগেই নীলা শান্ত তবে কঠোর গলায় বলে–
—তোমার ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। সব কাজেরই একটা মূল্য রয়েছে, কাজ করা মানুষটিরও। তুমি যদি অন্য পেইজ বা অন্য কোথা থেকে ড্রেস গুলো অর্ডার করতে তাহলে কি তাদেরকে তোমার মূল্য চুকাতে হতো না? তেমনটাই ভাবো এখন।
ঈশিতার মুখটা থমথমে হয়ে যায়। সে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কত পেমেন্ট করতে হবে?
—ছয় হাজার পাঁচশ টাকা।
নীলার কথা শুনে ঈশিতার মুখটা আরো চুপসে যায়। সে এত টাকা নিয়ে আসে নি। দুই হাজারের মতো আছে পার্সে। সে মুখটা কাচুমাচু করে নিয়ে বলল–
—আমার কাছে তো বর্তমানে এত টাকা নেই। দুই হাজার আছে।
—আমার বিকাশ নাম্বার নিয়ে যাও। পরে বিকাশ করে দিও। আত্মীয় যেহেতু এইটুকুন কন্সিডার করতেই পারি।
শেষোক্ত কথাটি ঈশিতার কাছে উপহাস মনে হয়। কিন্তু কাজের মূল্যে নেওয়ার বিষয়ে নীলা তার জায়গায় একদমই সঠিক রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন নারীর ঘরে বসে বিজনেস করা ভীষণ কঠিন একটা বিষয়। আর বিজনেসের বিষয়বস্তু যদি হয় হাতের কাজের তাহলে তো কথাই নেই। দুইদিন পরপর আত্মীয়-স্বজন, নাম মাত্র পরিচিতরাও এসে বিনামূল্যে কাজ করিয়ে নিয়ে যায়। তারা ভাবে আত্মীয় হয়ে এইটুকু সুবিধা তো তারা প্রাপ্য, কিন্তু যে কাজটি সম্পন্ন করে তার কষ্টের কথা একবারও চিন্তা করে না। সেও তো নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করে কাজটি সম্পন্ন করেছে, তাহলে পারিশ্রমিক কি তার হক নয়?
—আচ্ছা দাও।
নীলা তার বিকাশ নাম্বার দিতে নেয়, তার আগেই অরিত্র বলে ওঠে–
—ঈশিতার পুরো টাকা আমি পরিশোধ করে দিচ্ছি নীলা। তোমার ওকে নাম্বার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এটা আমার পক্ষ থেকে ওর জন্য গিফট।
ঈশিতা তাঁকে নাকচ করে দিয়ে বলে–
—না না ভাইয়া। আমিই পরিশোধ করবো, তোমার শুধু শুধু এতগুলো টাকা খরচ করার লাগবে না। কয়দিন আগেই তো আমার জন্মদিন উপলক্ষে “আইফোন সেভেনটিন প্রো ম্যাক্স” গিফট করলে, আজ আবারও।
অরিত্র তাঁকে হালকা গলায় ধমক দিয়ে বলল–
—তুই চুপ থাক, বড়দের কথার উপর কথা বলতে হয় না জানিস না।
ঈশিতা চুপ হয়ে যায় তার কথা শুনে। তার উতড়ে যাওয়া মুখের হাসিটাও ফিরে আসে। অরিত্র তখনই বেডরুমে গিয়ে ঈশিতার ড্রেসের মূল্য নিয়ে এসে নীলাকে দেয়। নীলা চুপচাপ হাত বাড়িয়ে টাকাটা নেয়। তার দৃষ্টি শান্ত হলেও, সেই শান্ত দৃষ্টির সাথে নিজের দৃষ্টি মেলাতে পারে না অরিত্র।
টাকা দেওয়া হয়ে গেলে ঈশিতা চলে যায় তার বাসায়। নীলাও চুপচাপ কিচেনে চলে যায় রাতের খাবার রান্না করতে। অরিত্র ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখতে থাকে। মূলত তার টিভি দেখা একটি বাহানা মাত্র, সে নীলার গতিবিধি, চলাফেরা দেখার জন্যই এখানে বসেছে।
অরিত্র খেয়াল করে দেখে নীলা এক মিনিটের জন্য বসছে না। ঘড়ির কাটার চেয়েও দ্রুত গতিতে সে সবকিছু করছে। একহাত দিয়ে তরকারি নাড়ছে আরেক হাত দিয়ে রুটি বেলছে সকালের নাস্তার জন্য। এরই মাঝে আবার ছুটে যায় রাইস কুকারের কাছে। ভাত হয়ে যাওয়ায় সে সুইচ অফ করে আবারও ছুটে কিচেনে।
এমন ছুটোছুটির মাঝে পরবর্তী দুই ঘন্টা কাটে নীলার। এই দুই ঘন্টায় সে রাতের খাবারের পাশাপাশি সকালের নাস্তার বন্দবস্তও করে ফেলেছে। রুটি বানিয়েছে, সবজি ও ভাজির জন্য সবজিগুলো কেটে রেখেছে। সকালে উঠে রুটি ভাজতে ভাজতে সবজি রান্না হয়ে যাবে। সকালে তাদের রুটি, সবজি অথবা ভাজি, কোনদিন হালুয়া বা ডিম ভাজা আর চা খায়। কিন্তু এর ব্যতীত অন্য কিছু হলে অরিত্র কেমন কাচুমাচু করে।
সব রান্না, গোছগাছ হয়ে যাওয়ার পর নীলা এপ্রোন খুলতে খুলতে এসে ডাকে অরিত্রকে খাওয়ার জন্য।
—আসো ডিনার রেডি।
অরিত্র নীলার দিকে তাকিয়ে দেখে গরম ও ছুটোছুটির দরুন নীলার ফর্সা মুখখানা টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। নীলার চিকচিক করা গলা, ঘাড় দিয়ে তখনও ঘাম চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। তার গায়ে থাকা লেমন কালারের কামিজটিও ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে।
নীলার চোখ-মুখ দেখে যে কেউ বলতে পারবে, মেয়েটা ঠিক কতটা ক্লান্ত। তবে তার এই ক্লান্ত অনেকাংশেই কমে যেতে পারত যদি কিনা সে তার স্বামী নামক বন্ধুটির সাহায্য পেতো।
অরিত্র অনেকটা যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়ায় সোফা থেকে, তারপর ভারী ভারী কদম ফেলে এগিয়ে যায় ডাইনিং টেবিলের কাছে। সে এসে বসতেই নীলা তাঁকে খাবার বেড়ে দিতে থাকে। তাকে খাবার বেড়ে দিয়ে নীলা বলে–
—তুমি খেতে থাকো, আমি একটু চোখেমুখে পানি দিয়ে আসছি।
কথাটা বলে সে আবারও তার কদম ছুটাতে শুরু করে। অরিত্র তার প্রস্থানের পথে নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকে। ভাতের প্লেটের দিকে একবার তাকিয়ে আবারও সেদিকে তাকায়, যতক্ষণ না নীলা ফিরে আসে।
নীলা হাতমুখ ধুয়ে, জামা চেঞ্জ করে এসে দেখে অরিত্র তখনও না খেয়ে বসে আছে। সে অবাক হয়ে অরিত্রকে প্রশ্ন করে–
—কি হলো খাচ্ছো না কেনো?
—তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
অরিত্রের কথাটি শুনে নীলা থমকে যায় এক মূহুর্তের জন্য। কথাটা আহামরি অনেক কিছু নয়, কিন্তু তাও সে থমকায়। তবে কিছু সময়ের মাঝেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে তার বরাদ্দকৃত চেয়ারটিতে বসে নিজের প্লেটেও খাবার বেড়ে নিয়ে খাওয়া শুরু করে। নীরবতার মাঝেই তারা নিজেদের খাওয়া শেষ করে।
খাওয়া শেষে আজ অরিত্র নীলাকে সাহায্য করে ডাইনিং টেবিল সাফ করতে। নীলা তার সাহায্যে অনেক অবাক হলেও তার সাহায্যটুকু নেয়। সকল কাজ শেষ করে তারা যখন শুতে আসে তখন ঘড়ির কাটা দশটা অতিক্রম করেছে।
ছ’ফুট বাই ছ’ফুট বেডের দুই প্রান্তে শুয়ে আছে একজোড়া দম্পতি। তাদের মনের মাঝে অজস্র কথা, অভিমান, অভিযোগ থাকলেও, দূরত্ব নামক সূক্ষ্ম এক দেওয়ালের কারণে তারা দু’জনই আজ নিজেদের কাছে এত অপরিচিত।
অরিত্র নীলার দিকে কাত হয়ে শুলে দেখতে পায়, নীলা সটান হয়ে শুয়ে আছে কপালের উপর হাত রেখে। তার ভারী ভারী নিঃশ্বাসের শব্দে অরিত্র বুঝতে পারে মেয়েটা ঘুমিয়ে গিয়েছে। তারা শুয়েছে দশ মিনিটও হয়নি, এরই মাঝে নীলা ঘুমিয়ে পড়েছে। তার অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণেই যে এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছে সেটা বুঝতে বাকি থাকে না অরিত্রে।
অরিত্র ভীষণ ইচ্ছে করতে থাকে নীলাকে বুকে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করার, আজ সারাদিন কি কি হলো তা জানানোর। যেমনটা আগে খোদ নীলাই করত, আর সে বিরক্ত হতো। কিন্তু তার বিবেক সায় দেয় না ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মেয়েটিকে ঘুম থেকে জাগাতে।
অরিত্র আলতো হাতে নীলাকে টেনে এনে তার বাহুতে শোয়ালে নীলা ঘুমের ঘোরেই নিজের একটা হাত অরিত্রের কোমড়ের উপর রাখে। অরিত্র অবিশ্রান্ত ভাবে নীলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, যতক্ষণ না অব্দি সে ঘুমে ঢলে পড়ে। আগের নীলাকে সে ভীষণ ভাবে মিস করছে। এই নীলা আর ছয়মাস আগের নীলার মাঝে এক আকাশসম পার্থক্য। অরিত্র হয়ত জানে না, স্বামী নামক পুরুষটির অবহেলার কারণেই নীলারা বদলে যায়। নিজেকে গুটিয়ে নেয়, গুছিয়ে নেয় নিজের মতো করে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
#চলবে?
[আজকে পর্বটি বড় করে দিয়েছি। কেমন হয়েছে আজকের পর্বটি সকলে জানাবেন কমেন্টের মাধ্যমে।
আমার লেখায় কোন ভুলক্রুটি থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে। নাইস, নেক্সট কমেন্ট না করে গঠনমূলক মন্তব্য করার চেষ্টা করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply