#মূল্য | ০২ |
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
[গল্পের শেষের কথাগুলো পড়ার অনুরোধ রইল। ]
ঘটনার দুই দিন পর অরিত্র পনেরো দিনের অফিস ট্যুরের জন্য রওনা দেয় নিজের কয়েকজন কলিগকে নিয়ে। তাদের মধ্যে অবশ্য ঈশিতাও ছিল।
সেখানে যাওয়ার পর প্রত্যেকদিন দুইবার করে নীলার সাথে কথা হতো অরিত্রের। যেমনটা এই পাঁচ বছরের প্রত্যেক ট্যুরের সময় হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে সব নরমালই লাগে। তবে সব স্বাভাববিক থেকেও একটা জিনিস বদলে গেছে। নীলার চোখের চাহনি। সেই চাহনিতে আর অপেক্ষা নেই অরিত্রের জন্য। তার থেকে মূল্য পাওয়ার আকুলতা নেই। তার সান্নিধ্য পাওয়ার ব্যস্ততা নেই।
আগে অরিত্র ট্যুরে গেলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন দিত নীলা নিজেই। তবে এবার আর তা করল না। এখন সে নিজের পায়ের ভীত শক্ত করার ভাবনায় মগ্ন থাকে দিনের বেশিরভাগ সময়।
একদিন অবসর সময়ে নীলা ফেসবুকে রিলস স্ক্রল করতে করতে হঠাৎই একটা হ্যান্ড ব্লক প্রিন্টের করা শাড়ির ভিডিওর উপর চোখ পড়ে তার। সে সময় নিয়ে সেই শাড়ির পেইজটির বেশ কয়েকটা ভিডিও দেখে। ভিডিও দেখতে দেখতে তার মনে পরে যায় তার সোনালী অতীতের কথা।
সে বিয়ের আগে হ্যান্ড ব্লকিংয়ের কাজ করত টুকটাক নিজের জন্যই। গজ কাপড় কিনে এনে নানান ধরণে নকশা করা কাঠের ব্লক দিয়ে নানান ডিজাইন ফুটিয়ে তুলত একখন্ড নকশাহীন কাপড়ের উপর। এমনকি নিজের ড্রেস ডিজাইন করত সে নিজেই।
সেসব ড্রেস পরে কোন অনুষ্ঠানে গেলে আশেপাশের সকলের বেশ ভালোই নজর কাড়ত তার ডিজাইন করা ড্রেসগুলোর। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে আগে টুকটাক সে নিজেই ব্লকিং করে ড্রেস সেল করত। কিন্তু বিয়ের পর শুধু পড়ালেখার সুযোগ টুকুই দিয়েছিল অরিত্রের পরিবার থেকে। এর বাহিরে আর কিছু করার অবকাশ বা অনুমতি ছিল না তার।
নীলা ঠিক করেছে নিজের পায়ের ভীত শক্ত করবে সে। অনেকদিন না করার কারণে ব্লকিংয়ের অনেক কিছু কিছু বিষয় ভুলে গিয়েছে। এরজন্য শুরুতেই একটা অনলাইন কোর্সে ভর্তি হয়ে যায়।
তার এমন অমূল পরিবর্ত ঘটে এই পনেরো দিনের মাঝেই। বাড়ি ফিরে অরিত্র নীলার নতুন কেনা বই আর ব্লকের জিনিস দেখে অবাক জিজ্ঞেস করে–
— এসব কখন থেকে শুরু করলে?
নীলা শান্তভাবে বলল,
— যেদিন বুঝেছি, নিজের পুরো পৃথিবী একজন মানুষকে বানিয়ে ফেলাটা ভুল।
কথাটা শুনে অরিত্রর বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠে। তবে সে নিজের এই খারাপ লাগাটাকে পাত্তা দেয় না। উপরন্তু খানিক ঝাঁজ দেখিয়ে বলে–
—সংসার সামলে এসব করাটা কি খুব জরুরি? আমি তো তোমাকে হাত খরচের জন্য টাকা দেই।
—শুধু টাকা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত বস্তু কেনা গেলেও, সুখ, সম্মান, গুরুত্ব এই অমূল্য বস্তু গুলো কেনা যায় না। এই কথাটা আমি দেরিতে হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছি।
নীলা একদম শান্তভাবে, কোনরূপ ব্যঙ্গবিদ্রুপ ছাড়াই বলে। কিন্তু তার এই শান্ত জবাবই অরিত্রের অহংকারী পৌরষবোধের মূলে আঘাত করে।
নীলা আবারও বলে,
—আর তুমি সংসার সামলানোর কথা বললে, সংসার যেহেতু আমি সামলাই তাহলে সংসার সামলে এরপর কি করবো সেই ভাবনা আমাকেই ভাবতে দাও।
নীলা পরাপর শান্ত জবাবগুলোর প্রতিত্তোরে অরিত্র আর কিছু বলার সুযোগ পায় না। কি-ই বা বলবে, নীলা তো ভুল কিছু বলছে না।
সেদিনের পর অরিত্র খেয়াল করে, তার আর নীলার সম্পর্কে অমূল পরিবর্তন এসেছে। নীলা এখন নিজেকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়ার চেষ্টা করে।
আগে অরিত্র অফিস থেকে ফিরলে নীলা হাসিমুখে দরজা খুলে দিত। এখনও খুলে দেয় দরজা ঠিকই, কিন্তু হাসিমাখা সেই মুখটা নিয়ে নয়। দরজা খুলেই তাড়াহুড়ো করে চলে যায় নিজের কাজে।
আগে অরিত্রর প্রতিটা পছন্দ-অপছন্দ নিয়েই নীলার ব্যস্ততা ছিল। এখন সে নিজের জন্য বেশ কিছু বই কিনছে অবসরের সময়টুকু অরিত্রের জন্য নতুন কোন রান্না ট্রাই না করে নিজেকে দেওয়ার জন্য।
নীলার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি গ্রামের বাড়িতে থাকেন। ঢাকায় তার এক দেবর আর দুই ননদের শ্বশুর বাড়ি রয়েছে। তার আরেক ননদ দেশেই একটা ন্যাশলান ভার্সিটির আন্ডারে ভর্তি হয়েছে। সংসার বলতে রোজ সকালে উঠে নাস্তা বানানো, অরিত্রের সব কিছু তৈরি করে সামনে এগিয়ে দেওয়া, দুপুরের খাবার তৈরি করে দেওয়া, সন্ধ্যায় অরিত্র বাসায় আসলে তাকে নাস্তা দেওয়া। এছাড়া তেমন কোন কাজ নেই বলতে গেলে নীলার। ঘর মোছা ও কাপড় ধোঁয়ার জন্য একজন ছুটা কাজের লোক রাখা আছে।
তাই বলা যায় একটা বিস্তর অবসরের সময় পায় নীলা। সে তার এই অবসরের সময়গুলোতে নতুন নতুন হ্যান্ড ব্লকিংয়ের কাজ করে এখন। অনলাইন কোর্সে ভর্তি হওয়ার দেড় মাসের মাথায় নীলা একটা পেইজও খুলেছে। সেখানে টুকটাক ভিডিও ছাড়ে দিনে। রেগুলার ভিডিও দেওয়ার কারণে পেইজটার ফলোয়ার হাঁটি হাঁটি পা-পা করে বাড়তে থাকে।
সবচাইতে আনন্দের কথা হলো, পেইজ খোলার দশম দিনে নীলা তিনটে ব্লকিং করা শাড়ির অর্ডার পায়। নীলা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় নিজের এহেন সফলতা। সে খুব মনোযোগ দিয়ে কাজগুলো সম্পন্ন করে কাস্টমারকে দেয়। কাস্টমার নীলার কাজের প্রশংসা করে পেইজে ও নিজের আইডিতে একটা রিভিউ পোস্ট দিলে, ধীরে ধীরে নীলার পেইজের ফলোয়ার আরো বেড়ে যায়।
এখন নীলার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে নিজের কাজ নিয়ে। আগে সন্ধ্যায় অরিত্র আসার পর নীলা প্রায়শই তার সাথে চা খেতে খেতে গল্প করার আবদার করত। তখন অরিত্র তাকে বিভিন্ন বাহানা দিয়ে এড়িয়ে যেত। কিন্তু এখন অরিত্র তার সাথে গল্প করার বাহানা খুঁজে, তবে নীলা তার কাজের জন্য কখনো-সখনো সেই অবদার পূরণ করে উঠতে পারে না।
নীলার এই পরিবর্তন অরিত্রকে ধীরে ধীরে ভাবাতে শুরু করে। ছুটির দিনগুলোতে তার সেই ভাবনা লাগামহীন হয়ে পড়ে। নীলা বর্তমানে প্রতিদিনই অন্তত একটা হলেও কাজ পাচ্ছে। নিজের জন্য কিছু করতে পেরে নীলার খুশি চোখে পড়ার মতো অবস্থা। সে রান্নাবান্না, ঘর গোছগাছ শেষ করে দিনের বেশিরভাগ সময় নিজের কাজ নিয়ে বসে থাকে।
আগে অরিত্র ছুটিরদিন গুলো এগারোটা অব্দি ঘুমিয়ে কাটাত। তারপর দুপুরে খেতে খেতে টিভি দেখত। খাওয়া শেষ করে আবার হয়ত ঘুমাত নাহয় ফোন চাপত অথবা অফিসের কাজ নিয়ে বসে থাকত। সপ্তাহের পাঁচটা দিন নীলা সম্পূর্ণ একা ফ্ল্যাটে কাটাত আর চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করত কবে অরিত্রের ছুটির দিন আসবে, আর সে সপ্তাহ জুড়ে জমিয়ে রাখা কথাগুলো তার কাছে উগড়ে দেবে। কিন্তু তা খুবই কম সময় হতো।
আর আজ…. আজ সময় যেন খেলা উলটে দিয়েছে। আজ অরিত্র অপেক্ষা করছে নীলার সাথে গল্প করার জন্য, বিগত পাঁচ বছর ধরে যেমন ভাবে নীলার এটেনশন পেয়ে এসেছে আজও তেমনটা পেতে চাইছে। নীলার জীবন যেন তাঁকে কেন্দ্র করে কাটে সেটা চাইছে, কিন্তু তার কিছুই হচ্ছে না।
দুপুরে খাবার খাওয়ার সময় নীলা একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে খেয়ে চলে গিয়েছে তাদের বাসার অবশিষ্ট খালি রুমটিতে। রুমটিতে তার শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেবর বা কোন গেস্ট আসলে থাকে। নীলা এমনিতে তার কাজগুলো নিজেদের বিশাল বেডরুমের একপাশে করলেও, অরিত্র বাসায় থাকলে সে গেস্ট রুমটাতে কাজ করে। যাতে অরিত্র বিরক্ত না-হয় তার কাজের কারণে। তবে অরিত্রও খাওয়া শেষ করে একটু পরপরই রুম টার সামনে যাচ্ছে আর উঁকি-ঝুঁকি মারছে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
#চলবে?
[লেট মি ক্লিয়ার সামথিং গাইজ, এটা আর পাঁচটা পরকীয়ার গল্প না। গল্পটা নিতান্তই সংসার ও নারী রিলেটেড। একজন নারী যখন ঘুরে দাঁড়াতে চায়, নিজেকে মূল্য দিতে চায় তাহলে ঠিক কি কি করতে পারে আমি আমার এই ছোট গল্প টায় সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করছি। নারীর অবহেলা ভয়ংকর বাজে অনুভূতি। সেই সাথে তার জেদও ভয়ংকর হয়ে থাকে।
হ্যাঁ জানি, সবাই সফল হয় না। কিন্তু আমার গল্পটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একজন নারীও যদি অবহেলা, অপমান সহ্য না করে নিজের জন্য কিছু করার ভাবনাটুকুও আনে, সেটাই হবে আমার এই লেখার স্বার্থকতা।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]
Share On:
TAGS: মূল্য, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৪
-
মূল্য পর্ব সমাপ্ত
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৪.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬০.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৯.২