#বাঁধন_রূপের_অধিকারী
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী || ৫৩||
বৃষ্টিদের বাড়ির ছাদে মেঝের ওপর চিত হয়ে পড়ে আছে বাঁধন। তার বুকের ওপর চেপে বসে আছে আকাশ। দুই হাঁটু মেঝেতে গেড়ে বাঁধনের একটি হাত শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে সে। অন্য হাত দিয়ে আগলে রেখেছে বাঁধনের মুখ। আকাশের দৃঢ় বাহুবন্ধনে বাঁধন যেন অসহায় বন্দি। নিজেকে মুক্ত করতে প্রাণপণে ছটফট করছে। কখনো আকাশের হাত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কখনো বা শরীর মোচড় দিয়ে উঠে বসতে চাইছে। কিন্তু আকাশের কঠিন বাঁধন ভেদ করে মুক্তির পথ খুঁজে পাচ্ছে না। দুজনের টানাটানিতে ছাদের নিস্তব্ধতা যেন মুহূর্তেই চঞ্চল হয়ে উঠেছে। আকাশের মুখজুড়ে কঠোরতার ছাপ। অন্যদিকে বাঁধনের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে বিরক্তি।
ক্রোধে উন্মত্ত আকাশ বাঁধনের দেহের ওপর নিজের সমস্ত শরীরের ভার ন্যস্ত করে।
” বাঁধনের বা’চ্চা। তোরে আজকে খাইছি আমি। “
আকাশের ক্রুদ্ধ অভিব্যক্তির তোয়াক্কা না করে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে বাঁধন। নিজেকে আকাশের কবল থেকে মুক্ত করার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালাতে চালাতেই বলে।
” হেই এডিয়ট। ছাড় আমায়। “
বাঁধনের মুখ বরাবর মুষ্টিবদ্ধ হাত তাক করে ভ্রুকুটি কণ্ঠে বলে আকাশ।
” বল? কেন আমার সাথে এমন করলি? “
আকাশের ক্রোধোন্মত্ত রূপের সম্মুখেও বাঁধনের অভিব্যক্তিতে লেশমাত্র বিচলন পরিলক্ষিত হয় না। বরং সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে ।
” কি করেছি আমি? “
” বৃষ্টির সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছিস। এই কথাটা আমাকে বলিসনি কেন? “
” বললে সারপ্রাইজটা কী থাকত? “
নিমিষেই বাঁধনের শার্টের কলার খামচে ধরে আকাশ। ক্রোধের তীব্রতায় চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে।
” রাখ তোর সারপ্রাইজ। তুই জানিস? আমি কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি তো ভেবেছিলাম আমার জীবন এখানেই থেমে গেছে। আমি বোধহয় বৃষ্টিকে হারিয়ে ফেলব। “
বাঁধন শান্ত কণ্ঠে বলে।
” কিছু পাওয়ার আগে কষ্ট পাওয়া ভালো। নয়তো সহজে কিছু পেয়ে গেলে মানুষ তার কদর করতে জানে না। এখন তুই বুঝতে পেরেছিস বৃষ্টি তোর জীবনে কতটা মূল্যবান। তাই তাকে হারানোর ভয়টাও এখন তোর মনে সবচেয়ে বেশি থাকবে। “
আকাশের ক্রোধের তীব্রতা কিছুটা প্রশমিত হয়ে আসে। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতার রেশ কাটিয়ে দীর্ঘশ্বাস টেনে নেয়। অতঃপর কোমল কণ্ঠে বলে।
” তুই জানিস? আমি অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। “
মুখ বিকৃত করে বাঁধন বলে।
” বালের ভয় পেয়েছিস তুই। যদি সত্যি ভয় পেতি তাহলে আমি সারপ্রাইজ দেওয়ার আগেই তুই বৃষ্টিকে নিয়ে পালিয়ে যেতিস। “
ক্রোধে আকাশের চক্ষুদ্বয় গোল হয়ে আসে। গলার রগ ফুলিয়ে উচ্চকণ্ঠে ডেকে ওঠে।
” বাঁধন। “
দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বাঁধন। অতঃপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে।
” হয়েছে। ছাড় আমায় এখন। “
ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিমাখা হাসির ক্ষীণ রেখা ফুটিয়ে তোলে আকাশ। বাঁধনের মুখপানে চেয়ে কৌতুকমিশ্রিত কণ্ঠে বলে।
” আই লাভ ইউ কো? “
ভ্রুযুগল কুঞ্চিত করে আকাশের মুখের দিকে তাকায় বাঁধন। বিস্ময়মিশ্রিত কণ্ঠে বলে।
” হোয়াট? “
” আই লাভ ইউ বল? “
” বলবো না। “
বাঁধনকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের বাহুবন্ধনে চেপে ধরে আকাশ। কণ্ঠে দুষ্টুমির রেশ মিশিয়ে বলে।
” বল বলছি?। নয়তো এভাবেই ধরে রাখবো যতক্ষণ না বলছিস। “
অধর দংশন করে নিজেকে সংযত রাখে বাঁধন। পরক্ষণেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে।
” I love you. “
নিমিষেই বাঁধনকে ছেড়ে বুকে জড়িয়ে ধরে আকাশ। পরম উচ্ছ্বাসে বলে।
” I love you too. “
কথাটি বলেই বাঁধনের গালে অধর ছুঁইয়ে দেয় আকাশ। তৎক্ষণাৎ তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয় বাঁধন। বাম হাতখানা নিজের গালে চেপে ধরে আকাশের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। দাঁতে দাঁত পিষে বলে।
” এভাবে চুম্মা-চুম্বি করছিস কেন লুজার? রে*প করবি নাকি? “
মেঝেতে ঠেস দিয়ে বসে বাঁধনের দিকে চোখ টিপে দুষ্টুমিমাখা ভঙ্গিতে বলে আকাশ।
” তুই মেয়ে হলে খোদার কসম। এই মুহূর্তে সত্যি তোকে আমি খুশিতে রে*প করে ফেলতাম। “
মুহূর্তেই ক্রোধে ফেটে পড়ে বাঁধন। ক্ষোভে উন্মত্ত হয়ে আকাশের দিকে তেড়ে আসে। তাকে চিৎ করে শুইয়ে বুকের ওপর চেপে বসে একের পর এক সজোরে ঘুষি চালাতে থাকে বুকে।
” শা’লা মাদারচোদ। আই উইল ফা*ক ইউ। “
_______
বৃষ্টিদের বাড়ি থেকে রহমান পরিবারের সকলে সন্ধ্যার সময় ফিরে আসে। সারাদিনের ব্যস্ততা আর ধকল শেষে প্রত্যেকেই বেশ ক্লান্ত। তাই যে যার কক্ষে বিশ্রাম নিতে চলে যায়।
এদিকে বৃষ্টিও ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফ্রেশ হয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। অথচ মনটা তার বেশ ফুরফুরে। হৃদয়জুড়ে বইছে অদ্ভুত এক প্রশান্তির পরশ। আকাশের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। আকাশ তাকে ভালোবাসে। কথাটা ভাবতেই কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগে বৃষ্টির। নিজের মনেই যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না।
হঠাৎই মনে পড়ে যায় অতীতের একটি ঘটনা। একদিন ফুল বিক্রি করার সময় আকাশকে একটি মেয়ের সঙ্গে দেখেছিল । মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়েই ফুল কিনতে এসেছিল সে। দুজনের কথাবার্তা শুনে বৃষ্টির মনে হয়েছিল তারা বুঝি প্রেমিক-প্রেমিকা।স্মৃতিটুকু মনে পড়তেই নিমিষে বদলে যায় বৃষ্টির মনের অবস্থা। হৃদয়জুড়ে জমে থাকা প্রশান্তির জায়গা দখল করে নেয় রাগ। আকাশ আগেও প্রেম করেছে। অথচ এখন তাকে বিয়ে করতে চাইছে। নিজের মনেই ক্ষোভ ঝেড়ে বলে ওঠে।
” কখনোই ওই আকাশ চিটারকে বিয়ে করব না আমি। শা’লা একজনের সঙ্গে প্রেম করবে আর বিয়ে করবে আরেকজনকে। “
মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতেই হায়দার শেখের কক্ষের দিকে পা বাড়াতে যায় বৃষ্টি। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিছানার ওপর পড়ে থাকা ফোনটি শব্দ করে বেজে ওঠে। আকস্মিক শব্দে সামান্য চমকে যায় সে। দ্রুত এগিয়ে এসে ফোনটি হাতে তুলে নেয়। পর্দায় ভেসে থাকা নামটির দিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তে থমকে যায় তার হৃদস্পন্দন।
আকাশ কল করেছে৷ নামটা মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে উঠতেই দোটানায় পড়ে যায় বৃষ্টি। কলটা রিসিভ করবে নাকি করবে না। মনের মধ্যে শুরু হয় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে থাকে। একসময় কলটা কেটে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই আবার বেজে ওঠে ফোনটা। তবুও সাহস করে কলটা রিসিভ করতে পারে না। এবার কল কেটে যাওয়ার পরপরই মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে ওঠে আকাশের একটি বার্তা।
” কল রিসিভ না করলে তোমাদের বাড়িতে এখনই আসব। “
বার্তাটা পড়েই বৃষ্টির চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। এমনিতেই আকাশের সঙ্গে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না সে। তার ওপর এমন হুমকি। এরই মধ্যে আবার বেজে ওঠে ফোনটা। এবার আর উপায় না দেখে ঢোক গিলে নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। তারপর কাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করে ফোনটা কানে ঠেকায়।
” আ-আসসালামু আলাইকুম। “
ওপাশ থেকে ভেসে আসে আকাশের গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
” ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী করছিলে এতক্ষণ?। কল রিসিভ করছিলে না কেন? এডিয়ট। “
আকাশের প্রশ্ন শুনে মুখটা গোমড়া করে বৃষ্টি। ঠোঁট উল্টে বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বলে।
” একটা চিটারের কথা ভাবছিলাম। “
ওপাশে মুহূর্তেই কৌতূহলী হয়ে ওঠে আকাশের কণ্ঠ।
” চিটার। চিটার আবার কে?। “
বৃষ্টি এবারও বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে জবাব দেয়।
” আমার হবু স্বামী। “
” ওহ। আচ্ছা। “
কথাটা উচ্চারণ করেই আকাশ নিজেই থমকে যায়। বৃষ্টির হবু স্বামী মানে তো সে নিজেই। তার মানে, বৃষ্টি তাকেই চিটার বলছে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই বিস্ময়ে হতবাক । পরক্ষণেই বিস্ফারিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে।
” কীইইই৷ আমি চিটার? “
বৃষ্টি নির্বিকার কণ্ঠে জবাব দেয়।
” আমি কি ভুল বলেছি? “
আকাশের বিস্ময় মুহূর্তেই রূপ নেয় বিরক্তিতে। কণ্ঠে ঝাঁজ মিশিয়ে বলে,
” এই মেয়ে৷ আমাকে কোন দিক দিয়ে তোমার চিটার মনে হয়, শুনি? সম্মান দিয়ে কথা বলবে। তোমার হবু স্বামী বলে কথা। “
নাক টেনে নেয় বৃষ্টি । অভিমানী মুখখানা বাঁকিয়ে ঠোঁটে টেনে আনে তাচ্ছিল্যের হাসি। অতঃপর বিদ্রূপ মাখা কণ্ঠে বলে।
” তা৷ আমার হবু স্বামী৷ ভুলে গেছেন বুঝি? একদিন আপনি নিজেই তো একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় এসে আমার কাছ থেকে ফুল কিনেছিলেন। “
কথাটা শুনতেই আকাশের মানসপটে ভেসে ওঠে সেদিনের সেই ঘটনা। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা টেনে হাসতে হাসতেই বলে,
” ওহ, আচ্ছা। সেদিনের কথা তুমি এখনো মনে রেখেছো?। “
বৃষ্টি নাক সিটকে তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়,
” চিটারদের কথা এত সহজে ভোলা যায় নাকি। “
আকাশের মেজাজ বিগড়ে যায়। বিরক্তিতে কণ্ঠস্বর চড়িয়ে ধমকের সুরে বলে,
” এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দেবো বেয়াদব মেয়ে। তুমি জানো, আমি চিটার। আর ওই মেয়েটা কে, তা জানো?। “
বৃষ্টি নির্বিকার কণ্ঠে সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়,
” না। “
বৃষ্টির নির্লিপ্ত উত্তরে আকাশের বিরক্তি যেন আরও খানিকটা বেড়ে যায়। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে ব্যাখ্যা করে বলে,
” ও আমার স্কুলজীবনের ফ্রেন্ড । ওর তো বহু আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। দুটো বাচ্চাও আছে। আমাদের বিয়েতে ও আসবেও। তখন দেখা করে নিয়ো। “
বৃষ্টির মনে উঁকি দেয় চাপা অভিমান। অধরযুগল বাঁকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
” তাহলে সেদিন দুজনে ওমন আচরণ করছিলেন কেন? “
আকাশ ভ্রুযুগল কুঞ্চিত করে পাল্টা প্রশ্ন করে,
” কেমন আচরণ করেছিলাম? “
বৃষ্টি তাচ্ছিল্যভরা শ্বাসে বিদ্ধ করে আকাশকে। অতঃপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
” এমন ভাব করছিলেন, যেন আপনারা দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা। “
কথাটা শুনে আকাশের মুখশ্রীতে ফুটে ওঠে অপ্রস্তুত ভাব। আঙুলের ফাঁকে চুল পেঁচিয়ে মাথা চুলকায় । কীভাবে কথাটা বোঝাবে৷ ভেবে না পেয়ে আমতা আমতা করে বলে,
” আরে, ওটা জাস্ট অ্যাক্টিং ছিল। “
আকাশের মুখে অ্যাক্টিংয়ের কথা শ্রবণ করতেই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায় বৃষ্টি। বিস্ফারিত নয়নে অবিশ্বাসভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
” অ্যাক্টিং? “
” হুম। “
কথাটা শুনে ভ্রুযুগল কুঞ্চিত হয়ে আসে বৃষ্টির। মুহূর্তেই মানসপটে ভেসে ওঠে সেদিনের সেই দৃশ্য। স্মৃতির পরতে পরতে জমে থাকা অভিমান উথলে ওঠে কণ্ঠে। অভিযোগের সুরে বলে,
” কেন করেছিলেন? আপনি জানেন, সেদিন আমার কতটা কষ্ট হয়েছিল? ভীষণ রাগ হয়েছিল আমার। “
বৃষ্টির অভিমানমাখা কথাগুলো শুনে আকাশের অধরকোণে খেলে যায় দুষ্টুমিভরা হাসি। কণ্ঠে মৃদু কৌতুক মিশিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
” ভালোবাসো? “
” উঁহু। “
বৃষ্টির অস্বীকৃতি শুনে দুষ্টুমির রেশ আরও গাঢ় হয় আকাশের কণ্ঠে। হঠাৎ করেই বলে ওঠে,
” আচ্ছা৷ রাখলাম। “
কথাটা কর্ণগোচর হতেই বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে বৃষ্টির। মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যায় অভিমানের সমস্ত আড়াল। কণ্ঠে ঝরে পড়ে ব্যাকুলতা, অধরে ফুটে ওঠে আকুল মিনতি।
” নাহহহ। “
আকাশ মৃদু কৌতুকমাখা কণ্ঠে বলে,
” তো। “
বৃষ্টি অভিমানী কণ্ঠে জবাব দেয়,
” ভালোবাসি না তো। “
বলেই কলটা কেটে দেয় বৃষ্টি। বুকের ওপর হাত রেখে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। হৃদয়জুড়ে ছড়িয়ে আছে একরাশ অস্থিরতা। সেই অস্থিরতার মাঝেই অজান্তে অধরকোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে মিষ্টি হাসি। অভিমানী হৃদয়ের গহিনে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা যেন নীরবেই ধরা দেয় সেই হাসির আড়ালে।
_________
বিছানায় বসে রূপার কোমল কেশে যতনে বেণি গেঁথে দিচ্ছে বাঁধন। নীরব রূপা ক্যান্ডির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। আর বাঁধন আপনমনে তার হার্টওয়াইফের চুলে বেণি গাঁথছে। সময় গড়িয়ে চলে আপন ছন্দে। নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়ানো ঘরখানিতে হঠাৎই কৌতূহলী হয়ে ওঠে রূপা।
” আচ্ছা বাঁধন ভাইয়া?”
বেণি গাঁথার কাজে ব্যস্ত থেকেই মৃদু স্বরে সাড়া দেয় বাঁধন।
” হুম।”
খানিক ইতস্তত করে রূপা। অতঃপর মনের গহিনে জমে থাকা প্রশ্নটি ঠোঁটের আগায় এনে বলে।
” ছোটবেলায় তুমি কী আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলে? “
প্রশ্নটি কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই থমকে যায় বাঁধন। আঙুলের ফাঁকে আটকে থাকা কেশরাশি। অতীতের বিস্মৃত অধ্যায়টি আচমকা ফিরে এসে দাঁড়ায় বর্তমানের দুয়ারে। যে মেয়েটির মাথা ফাটিয়ে ক্রোধের আগুন বুকে নিয়ে দেশ ছেড়েছিল সে। আজ সেই মেয়েটিই তার সমগ্র পৃথিবী। কী বিচিত্র সময়ের পরিহাস। একদিন যে মেয়েটির প্রতি রাগে হৃদয় পুড়েছিল। আজ তারই মায়ায় হৃদয়জুড়ে বসন্ত নামে। পুরোনো স্মৃতির এমন অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তনে বাঁধন বুঝে উঠতে পারে না। হাসবে নাকি কাঁদবে।বাঁধনকে নিশ্চুপ দেখে পুনরায় প্রশ্ন করে রূপা।
” কী হলো? চুপ করে আছ কেন? বলো না?”
গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে সামলে নেয় বাঁধন। মুখে গাম্ভীর্যের আবরণ টেনে গম্ভীর স্বরে জবাব দেয়।
” হুম।”
বাঁধনের নির্লিপ্ত উত্তর শুনে বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যায় রূপার।
” কীহ? তুমি সত্যিই আমার মাথা ফাটিয়েছিলে?”
কথাটি বলেই বাঁধনের দিকে ঘুরে তাকাতে উদ্যত হয়। তৎক্ষনাৎ তাকে ধরে ফেলে বাঁধন। গম্ভীর কণ্ঠে বলে।
” পুরোনো কথা জেনে কি করবে হার্টওয়াইফ ? যা ঘটে গেছে সেসব এখন ডাস্টবিনে পড়ে থাকা ময়লার মতোই অতীত। আমি অতীতকে পেছনে ফেলে এসেছি। তাই সেই পুরোনো ঘটনা নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। আর এ বিষয়ে আমার কাছ থেকে কোনো উত্তরও পাবে না।”
নিমিষেই নিশ্চুপ হয়ে যায় রূপা। মুখে আর কোনো প্রশ্ন উচ্চারিত হয় না। অথচ মনের গহিনে কৌতূহলের ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়ে। যে মানুষটি আজ এত যতনে তার চুলে বেণি গেঁথে দেয়। সেই মানুষটিই একদিন কী এমন কারণে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল? কী ছিল সেই ঘটনার নেপথ্যে? কোন অভিমানে ক্রোধের আগুন বুকে নিয়ে দেশ ছেড়েছিল বাঁধন?উত্তরহীন প্রশ্নেরা মনের আঙিনায় ভিড় জমায়। কৌতূহল ক্রমেই দুর্নিবার হয়ে ওঠে। রূপা মনে মনে সংকল্প করে। অতীত যতই গোপন থাকুক। যতই রহস্যের আবরণে ঢাকা থাকুক সেই অধ্যায়। একদিন না একদিন তাকে জানতেই হবে। যে করেই হোক। বাঁধনের সেই অজানা অতীতের দুয়ার তাকে খুলতেই হবে।
_________
গভীর নিশি। রহমান বাড়ির প্রতিটি মানুষ তখন নিদ্রার গভীরে নিমগ্ন। চারদিকে নিস্তব্ধতার চাদর বিছানো। রাতের নীরবতায় থমকে আছে সমস্ত কোলাহল। সেই নিঝুম প্রহরে বাঁধনের বুকে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে রূপা। স্বামীর বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর যে কী অপরিসীম প্রশান্তি। তা যেন একমাত্র স্ত্রীই হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারে। প্রিয় মানুষের বুকের উষ্ণতায় নিজেকে সঁপে দিয়ে রূপাও ডুবে আছে গভীর ঘুমে।
এভাবেই কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ। হঠাৎ ঘুমের ঘোরেই তলপেটে অদ্ভুত এক ব্যথা অনুভব করে রূপা। সেই সঙ্গে কোমরের নিচের অংশটাও কেমন যেন ভেজা ভেজা লাগে। প্রথমে অনুভূতিটাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে। কিন্তু মুহূর্তের ব্যবধানে ব্যথাটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে সেই যন্ত্রণা। পাশাপাশি ভেজা অনুভূতিটাও যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।
নিমিষেই ঘুমের আবেশ কেটে যায় রূপার। তলপেটের তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে তার শরীর। যন্ত্রণায় মুখ দিয়ে অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে আসে।
” আহহহ।”
আকস্মিক গোঙানিতে বাঁধনের ঘুম ছুটে যায়। মুহূর্তেই চোখ মেলে অস্থির হয়ে ওঠে। দ্রুত উঠে বসে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকায়। কণ্ঠে উৎকণ্ঠা মিশিয়ে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করে।
” কী হয়েছে রূপ? এভাবে চিৎকার দিলে কেন?”
তলপেট চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে রূপা। ব্যথার তীব্রতায় চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রু। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে।
” পেটটা ভীষণ ব্যথা করছে।”
রূপার কাতরতা দেখে মুহূর্তেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে বাঁধন। তড়িঘড়ি ঘরের বাতি জ্বালাতেই আলোকিত হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু বিছানার দিকে চোখ পড়তেই থমকে যায় সে। সাদা চাদরের বুকে স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে টকটকে লাল রক্তের দাগ। আকস্মিক দৃশ্যটিতে বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায় বাঁধনের দৃষ্টি।
ওদিকে রূপার চোখও গিয়ে পড়ে সেই রক্তের দিকে। পরক্ষণেই নিজের কোমরের দিকে তাকাতেই লজ্জায় কুঁকড়ে যায় তার মুখ। লজ্জা আর অস্বস্তিতে মুখখানা মলিন হয়ে আসে। পিরিয়ড শুরু হয়েছে তার। অথচ বিষয়টি বুঝতে না পারায় এতক্ষণ অস্থির হয়ে উঠেছিল।বাঁধন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে।
” তোমার ডেট কবে ছিল?”
ফুঁপিয়ে ওঠে রূপা । যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা মুখখানা নিচু করে অসহায় কণ্ঠে উত্তর দেয়।
” জানি না। ঠিক মনে ছিল না।”
দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বাঁধন। রূপার যন্ত্রণাকাতর মুখখানির দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে ওঠে।
” আচ্ছা ঠিক আছে।”
কথাটি বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি করে না সে। পরম যত্নে রূপাকে কোলে তুলে নেয়। আকস্মিক কাণ্ডে হকচকিয়ে যায় রূপা। বিস্ময়ে চোখ দুটো বড় হয়ে আসে। লজ্জায় মুখখানি রাঙিয়ে তুলে বাঁধনের বুকে হাত রেখে বলে।
” এই। কী করছো তুমি? কোলে নিলে কেন?”
রূপাকে বুকে আগলে বাথরুমের দিকে এগিয়ে চলে বাঁধন। মুখে তার স্বাভাবিক গাম্ভীর্য। স্পষ্ট কণ্ঠে জবাব দেয়।
” চেঞ্জ করবে না? নাকি এভাবেই থাকবে?”
কথাটি শুনে আর কোনো কথা বাড়ায় না রূপা। লজ্জায় মুখখানি নত হয়ে আসে। ঠোঁটের আগায় জমে থাকা কথাগুলোও নিঃশব্দে হারিয়ে যায়। নীরবে বাঁধনের বুকে আশ্রয় নিয়ে থাকে।
বাথরুমের কাছে পৌঁছে রূপাকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় বাঁধন। তারপর দ্রুত ঘরে ফিরে প্যাড আর প্রয়োজনীয় পোশাক নিয়ে আবারও তার কাছে আসে। সেগুলো রূপার হাতে তুলে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করে। হঠাৎ বিছানার দিকে তাকাতেই চোখে পড়ে সাদা চাদরে লেগে থাকা রক্তের দাগ। নিঃশব্দে চাদরটি খুলে সরিয়ে রাখে । অতঃপর বিছানায় বিছিয়ে দেয় পরিচ্ছন্ন আরেকটি চাদর।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে রূপা। কিন্তু তলপেটের যন্ত্রণা তখনও পিছু ছাড়েনি। ব্যথার তীব্রতায় মুখখানি মলিন। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে হটব্যাগটি বের করে পেটের কাছে চেপে ধরে বসে পড়ে বিছানায়। উষ্ণতার পরশে যন্ত্রণাটুকু প্রশমিত করার চেষ্টা করে। তবু মাঝেমধ্যে ব্যথার তীব্রতায় কুঁকড়ে ওঠে তার শরীর।
রক্তমাখা চাদরটি ওয়াশিং মেশিনে রেখে ফিরে আসে বাঁধন। ঘরে ঢুকেই চোখ পড়ে বিছানায় বসে থাকা রূপার দিকে। হটব্যাগটি পেটের কাছে ধরে নিঃশব্দে বসে আছে মেয়েটি । মুখখানিতে অসহনীয় যন্ত্রণার ছাপ। দৃশ্যটি দেখে বাঁধনের মুখের গাম্ভীর্যেও উদ্বেগের রেখা ফুটে ওঠে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রূপার পাশে বসে পড়ে । তারপর স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করে।
” খারাপ লাগছে?”
হটব্যাগের উষ্ণ পরশেও প্রশমিত হচ্ছে না রূপার তলপেটের যন্ত্রণা। বরং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যথাটা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছে। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কিছুতেই যেন স্বস্তি মিলছে না। বাঁধনের প্রশ্ন কানে পৌঁছাতেই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না । হাতের হটব্যাগটি সরিয়ে স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে তাকে আঁকড়ে ধরে। মুহূর্তেই বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট কান্না হয়ে ঝরে পড়ে। হুহু করে কেঁদে ওঠে ।
” ব্যথা করছে। পেটটা ভীষণ ব্যথা করছে। সহ্য করতে পারছি না আমি। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।”
প্রিয়তমার কান্নায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে বাঁধন। তাকে আরও নিবিড়ভাবে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। এক হাতে আগলে রাখে তাকে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চায়।
” বেশি পেইন হচ্ছে হার্টওয়াইফ?”
যন্ত্রণার তীব্রতায় ছটফট করে ওঠে রূপা। তলপেটে হাত চেপে ধরে আরও জোরে কেঁদে ওঠে। চোখের জলে ভিজে যায় বাঁধনের বুক। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে।
” আমি আর সহ্য করতে পারছি না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে আমি আর বাঁচব না। আমাকে একটু আদর করো। একটু ভালোবাসো। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।”
প্রিয়তমার আকুতিতে বাঁধনের বুকটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। যে মেয়েটি একটু আগেও নিশ্চিন্তে তার বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিল। সেই মেয়েটিই এখন যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।ঠোঁট দুটো শক্ত করে কামড়ে ধরে। প্রিয়তমার প্রতিটি আর্তনাদ তার হৃদয়ে তীক্ষ্ণ শেলের মতো বিঁধছে। অথচ চাইলেও সেই যন্ত্রণা নিজের শরীরে টেনে নিতে পারছে না। অসহায় দৃষ্টিতে হার্টওয়াইফের মুখখানির দিকে তাকিয়ে মনে মনে আর্তি জানায় আল্লাহর দরবারে।
” হে আল্লাহ। কেন এত কষ্ট দিচ্ছো আমার প্রাণটাকে? আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না। ওর প্রতিটি আর্তনাদ আমার বুকটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। ওর সব কষ্ট আমাকে দিয়ে দাও আল্লাহ। আমি নির্দ্বিধায় সব সহ্য করে নেব। তবু আমার হার্টওয়াইফকে একটু শান্তি দাও। ওর চোখের জল যে আমি সহ্য করতে পারি না। ওর মুখে হাসি দেখার জন্য আমি সব করতে পারি। শুধু আমার পিচ্চি বউটাকে একটু স্বস্তি দাও।”
মনের গভীরে জমে থাকা সেই আকুতি শেষ হতে না হতেই যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে রূপা।
” উফফফ। মনে হচ্ছে পেটের ভেতর বোমা ফাটছে। উহু। খুব ব্যথা করছে আমার।”
প্রিয়সীর আর্তনাদে দিশেহারা হয়ে পড়ে বাঁধন। দুহাতে তার গাল দুটো আগলে নেয় । কপালে গভীর মমতায় এঁকে দেয় একটি চুম্বন। ব্যাকুল কণ্ঠে ডেকে ওঠে।
” হার্টকুইন আমার। হার্টওয়াইফ আমার। পিচ্চি বউ আমার। লক্ষ্মী বউ আমার। একটু সহ্য করো সোনা। আমার প্রাণপ্রিয় শ্রেয়সী। তোমার কষ্ট দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। বিশ্বাস করো। তোমার সব যন্ত্রণা যদি নিজের বুকে টেনে নেওয়া যেত। তাহলে এক মুহূর্তও দেরি করতাম না।”
রূপার গাল দুটো আলতো করে ছুঁয়ে আবারও কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায় বাঁধন। কণ্ঠে মমতা মিশিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে।
” আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি হার্টকুইন। ইনশাআল্লাহ তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে। তোমার সব ব্যথা কমে যাবে। শুধু একটু ধৈর্য ধরো সুইটহার্ট। আমি তোমার পাশেই আছি। তোমাকে একা কষ্ট পেতে দেব না।”
বাঁধন নানাভাবে রূপাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। কখনো বুকে জড়িয়ে ধরে। কখনো কপালে চুমু এঁকে ব্যথার তীব্রতা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হয় না। রূপার যন্ত্রণা ক্রমেই অসহনীয় হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত স্বামীর বুকের আশ্রয় ছেড়ে বিছানাজুড়ে ছটফট করতে থাকে সে। কখনো এপাশ-ওপাশ গড়াগড়ি খায়। কখনো বালিশ বুকে চেপে ধরে। আবার কখনো যন্ত্রণায় পা দুটো ছুড়তে থাকে। ঠোঁটের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে একের পর এক আর্তনাদ। চোখের জলে ভিজে যায় বালিশ। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
রূপার এমন অবস্থা দেখে বাঁধনও দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্রিয়তমার প্রতিটি আর্তনাদ যেন তার বুকের ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া যেন কিছুই করার নেই তার। অথচ নিজের হার্টওয়াইফকে এভাবে ছটফট করতে দেখা তার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে ওঠে।একসময় অস্থির দৃষ্টিতে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকায়। রাত তখন দুইটা চল্লিশ মিনিট। গভীর নিশির নিস্তব্ধতায় চারদিক ডুবে আছে। অথচ তার ছোট্ট পৃথিবীজুড়ে তখন কেবলই অশান্তি। প্রিয়তমার যন্ত্রণা যেন রাতের সমস্ত নীরবতা ছাপিয়ে তার হৃদয়ে আঘাত হানছে।হঠাৎই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বাঁধন। দ্রুত পায়ে গেস্টরুমে গিয়ে অজু করে নেয়। তারপর জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তাহাজ্জুদের নামাজে। সিজদায় নত হয় তার মস্তক। অথচ বুকের ভেতরটা তখন প্রিয়তমার জন্য আকুলতায় ছটফট করছে। নামাজ শেষ করে দুহাত তুলে মোনাজাতে বসে সে।
কিন্তু দোয়া করতে গিয়েই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না বাঁধন। বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অসহায়ত্ব অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে। চোখের জলে ভিজে যায় মোনাজাতের জন্য তুলে ধরা দুহাত। কাঁপতে থাকে ঠোঁট। ভাঙা কণ্ঠে রবের দরবারে আকুতি জানায়।
” হে আল্লাহ। আমার স্ত্রীকে সুস্থ করে দাও। ওর সমস্ত কষ্ট আমাকে দিয়ে দাও। হে রব। আমি নীরবে সব সহ্য করে নেব। আমার শরীরটাকে হাজার টুকরো করে দিলেও আমি মুখ ফুটে কোনো অভিযোগ করব না। তবু আমার স্ত্রীটাকে একটু আরাম দাও। ওর যন্ত্রণাটা একটু কমিয়ে দাও।”
কথাগুলো বলতে গিয়েই কান্নায় কণ্ঠ আটকে আসে বাঁধনের। দুহাত মুখের কাছে টেনে নিয়ে চোখের জল মুছে আবারও মোনাজাতে মগ্ন হয় সে।
” আল্লাহ। তুমি তো জানো। আমার পৃথিবী বলতে ওই একটা মানুষই। আমার হার্টকুইন। আমার হার্টওয়াইফ। আমার পিচ্চি বউটা। ওর মুখের হাসিটুকু দেখেই আমি বেঁচে থাকি। ওর চোখে একফোঁটা জল দেখলে আমার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে। তাহলে আজ ওর এত কষ্ট তুমি কীভাবে সহ্য করছো আল্লাহ? ওর কান্না যে আমার সহ্য হচ্ছে না। ওর প্রতিটা আর্তনাদে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি কী করব বলো? কোথায় গেলে ওর কষ্টটুকু কমাতে পারব? কী করলে আমার বউটা একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারবে?”
বাঁধনের চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে থাকে। যে মানুষটা সবার সামনে নিজেকে শক্ত রাখে। যে মানুষটা কোনো কিছুর কাছে সহজে হার মানতে চায় না। আজ সেই মানুষটাই নিজের প্রিয়তমার যন্ত্রণার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে। তার সমস্ত শক্তি যেন এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
” হে আমার রব। ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। তুমি তো আমার মনের সব কথা জানো। ওকে ছাড়া আমার পৃথিবীটা যে শূন্য। ওর হাসি ছাড়া আমার সকাল হয় না। ওর মুখটা না দেখে আমার রাত কাটতে চায় না। ও অভিমান করলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ও কাঁদলে আমার সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। সেই মানুষটাই আজ আমার চোখের সামনে এত কষ্ট পাচ্ছে। অথচ আমি কিছুই করতে পারছি না। তুমি বলো আল্লাহ। একজন স্বামী হয়ে আমি কীভাবে আমার স্ত্রীর এমন কষ্টের সামনে অসহায় হয়ে বসে থাকি?”
কান্নায় ভেঙে পড়ে বাঁধন। মোনাজাতের জন্য তোলা হাত দুটো কাঁপতে থাকে। অশ্রুসিক্ত চোখে আকাশের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে । তারপর আবারও মাথা নত করে রবের কাছে আকুতি জানায়।
” আল্লাহ। আমার ভাগ্যের সব সুখ তুমি ওকে দিয়ে দাও। আমার জীবনে যত আনন্দ রেখেছো। সবটুকু আমার হার্টওয়াইফের জীবনে লিখে দাও। ওর ভাগ্যে কখনো কষ্ট রেখো না। ওর চোখে কখনো অশ্রু রেখো না। ওর মুখের হাসিটুকু কেড়ে নিয়ো না। ওকে ভালো রেখো আল্লাহ। ওকে সুস্থ রাখো।
একটু থেমে আবারও কেঁদে ওঠে বাঁধন।
” ও তো কিছুই বোঝে না আল্লাহ। ব্যথায় কাতর হয়ে শুধু আমাকে আঁকড়ে ধরে। আমাকে বলে ওকে একটু আদর করতে। ওর কষ্টটা কমিয়ে দিতে। অথচ আমি ওর কষ্টটুকুও নিতে পারছি না। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া ছাড়া আমি আর কী করতে পারি? ও যখন আমার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদে। তখন আমার মনে হয় নিজের বুকটা চিরে ওর সমস্ত কষ্ট বের করে নিই। ওর জায়গায় আমি অসুস্থ হয়ে যাই। ওর বদলে আমি যন্ত্রণা সহ্য করি। তবু ওকে কাঁদতে দেখতে না হয়।”
দুহাতের তালুতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বাঁধন। বুকের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসা আর অসহায়ত্ব যেন আর ধরে রাখতে পারে না।
” হে আল্লাহ। আমার বউটাকে একটু শান্তি দাও। ওর ব্যথাটা কমিয়ে দাও। আমি আর ওর কান্না সহ্য করতে পারছি না। আমার হার্টকুইনকে হাসিমুখে দেখতে চাই। ওর মুখে আবার সেই মিষ্টি হাসিটা দেখতে চাই। ও যেন আমার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। ও যেন আমার হাত ধরে বলে যে ওর আর কষ্ট হচ্ছে না। শুধু এইটুকু শান্তি দাও আমাকে।”
কণ্ঠ ক্রমেই ভারী হয়ে আসে বাঁধনের। তবু তার আকুতি থামে না।
” আল্লাহ। তুমি যদি আমার ভালোবাসার গভীরতা জানতে চাও। তাহলে আমার বুকের ভেতরটা একবার দেখো। সেখানে শুধু আমার হার্টওয়াইফের নাম লেখা আছে। আমার প্রতিটি দোয়ায় ও আছে। আমার প্রতিটি স্বপ্নে ও আছে। আমার বেঁচে থাকার প্রতিটি ইচ্ছার সঙ্গে ও জড়িয়ে আছে। আমি ওকে নিয়ে অনেক দূর যেতে চাই। ওর হাত ধরে সারাটা জীবন কাটাতে চাই। ওর সঙ্গে হাসতে চাই। ওর সঙ্গে অভিমান করতে চাই। ওর সঙ্গে ছোট ছোট সুখগুলো ভাগ করে নিতে চাই। “
অবশেষে কাঁদতে কাঁদতে কপালটা জায়নামাজে ঠেকিয়ে দেয় বাঁধন। অশ্রুভেজা কণ্ঠে শেষবারের মতো আকুতি জানায়।
” হে আমার রব। তুমি তো সব পারো। তুমি চাইলে মুহূর্তেই সবকিছু বদলে দিতে পারো। আমার হার্টওয়াইফের কষ্টটুকু তুমি কমিয়ে দাও। ওর শরীরটাকে সুস্থ করে দাও। ওর মুখে হাসি ফিরিয়ে দাও। আমি তোমার কাছে আর কিছু চাই না। শুধু আমার স্ত্রীটাকে ভালো করে দাও। ওর চোখের জল মুছে দাও। ওর কষ্টের বদলে আমার ভাগ্যে যত খুশি কষ্ট লিখে দাও। তবু আমার বউটাকে শান্তিতে রাখো। ওকে ভালো রেখো আল্লাহ। আমার হার্টকুইনকে ভালো রেখো।”
চলবে…!
Share On:
TAGS: বাঁধন রূপের অধিকারী, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব সারপ্রাইজ
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৫
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২২
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৬
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় গল্পের লিংক
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৮