Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৫২


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী ||৫২||

‎আবিদকে শীতল জল পান করাচ্ছে জেইন। বেচারা আকাশের উন্মত্ত রুদ্ররূপ প্রত্যক্ষ করে রীতিমতো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। আতঙ্কে তার বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। দ্রুতগতিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে নিতে হাঁপিয়ে উঠেছে । যেন এই মুহূর্তেও আকাশের ক্রোধের উত্তাপ তার হৃদপিণ্ডে ত্রাসের সঞ্চার করছে।

‎

‎অন্যদিকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ক্রোধে ফুঁসছে আকাশ। বক্ষপিঞ্জর দ্রুত ওঠানামা করছে তার। চোয়ালদ্বয় শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষছে । দৃষ্টিতে তার প্রতিহিংসার দাবানল। মনে হচ্ছে সামান্য উসকানি পেলেই পুনরায় প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করবে।

‎

‎আকাশের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বাঁধন। আকাশের উন্মত্ত দশা দেখে ভেতরে ভেতরে হাসিতে ফেটে পড়ছে সে। অতি কষ্টে অধরযুগল চেপে নিজের হাসি সংবরণ করে রেখেছে।সহসাই বাঁধনের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল আকাশ। অতঃপর দাঁতে দাঁত চেপে রাগত স্বরে বললো,

‎

‎

‎” তুই কেন আমাকে এখানে নিয়ে আসলি। কেন আটকে রাখলি আমাকে। কেন মারতে দিলি না ওই শা’লাকে। “

‎

‎আকাশের কথায় দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে কপালে হাত ঠেকাল বাঁধন। আকাশের উন্মত্ত আচরণে তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললো,

‎

‎” রিল্যাক্স আকাশ। মাথাটা ঠান্ডা কর। তুই এখানে মারামারি করতে আসিসনি। বিয়ে খেতে এসেছিস। সো নিজের ক্রোধ সংবরণ কর। আর একটা কথা মনে রাখিস। যাকে মারার জন্য তুই এমন উন্মাদ হয়ে উঠেছিস। সে কিন্তু আর কেউ নয়। বৃষ্টির হবু হাসবেন্ড। “

‎

‎বাঁধনের শেষোক্ত কথাটি কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই আকাশের চক্ষুদ্বয় অগ্নিবর্ণ ধারণ করল। মুহূর্তেই তার ক্রোধ যেন বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। ক্ষিপ্ত বাঘের মতো গর্জন করে উঠলো,

‎

‎” এর জন্যই তো মারতে চাইছি ওকে। ওর এত বড় দুঃসাহস কী করে হয় আমার কলিজায় হাত দেওয়ার। ও জানে না বৃষ্টি আমার কী। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি স্পন্দনে যার নাম মিশে আছে। তাকে অন্য কেউ নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখবে। আর আমি সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব। এতটা নির্বোধ ভাবিস আমাকে ।”

‎

‎বাঁধন বিস্ফারিত নয়নে আকাশের মুখপানে তাকাল। অতঃপর বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ধমকে বললো,

‎

‎” বেয়াদব। তুই কি এখন খুনখারাবি করবি নাকি। তাও আবার বৃষ্টির হবু হাসবেন্ডকে। একবার নিজের অবস্থানটা ভেবে দেখেছিস। তুই এখানে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছিস। কোনো রণক্ষেত্রে নয়। “

‎

‎বৃষ্টির নামটি উচ্চারিত হতেই আকাশের হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা ভালোবাসা আর হারানোর আতঙ্ক একাকার হয়ে গেল। মুষ্টিবদ্ধ হাতদ্বয় আরও শক্ত হয়ে উঠল। অতঃপর শীতল স্বরে বললো,

‎

‎” প্রয়োজন পড়লে তাই করব। ওই মেয়ে যদি আমার না হয়। তাহলে আর কারও হতে দেব না। বৃষ্টির ওপর শুধু আমার অধিকার। ওকে ভালোবাসার অধিকার শুধু আমার। অন্য কোনো পুরুষ কীভাবে ওর হাত ধরার স্বপ্ন দেখে। কীভাবে ওকে নিজের স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করে। আমি বেঁচে থাকতে সেটা কখনোই হতে দেব না। “

‎

‎বাঁধন বহু কষ্টে আকাশকে সংযত রাখে। দেখতে দেখতে এনগেজমেন্টের মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে আসে। একে একে আমন্ত্রিত অতিথিদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে বিশাল হলরুম। বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে নিচে নেমে আসে রূপা। তাদের সঙ্গী হয় কলেজের দুই বান্ধবী নাদিরা ও কেয়া। বৃষ্টির অবনত মস্তক। যেন তার অন্তর্লীন সংকোচেরই বহিঃপ্রকাশ। পরনে ঝলমলে সাদা গাউন। উপস্থিত কারও দিকে দৃষ্টিপাত করার সাহসটুকুও যেন মেয়েটি সঞ্চয় করতে পারে না।

‎

‎বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে স্টেজের দিকে অগ্রসর হয় সবাই। আকাশ এক পলক বৃষ্টির মুখশ্রীর দিকে দৃষ্টিপাত করেই পরক্ষণে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। বাঁধন জোরপূর্বক টানতে টানতে আকাশকে স্টেজে নিয়ে আসে। আকাশের মুখাবয়বে তখনও ক্রোধের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। দাঁতে দাঁত চেপে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলে ওঠে।

‎

‎” আমি এখানে থাকলে এনগেজমেন্ট সম্পন্ন হবে না। কারও না কারও লা”শ পড়বে। “

‎

‎কথাগুলো বাঁধনের কর্ণগোচর হলেও কোনো প্রত্যুত্তর দেয় না। অবশেষে আংটি পরানোর শুভক্ষণ উপস্থিত হয়। বাঁধন আকাশকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে একেবারে বৃষ্টির সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

‎

‎আকস্মিক পুরুষালি সুগন্ধ নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই চমকে ওঠে বৃষ্টি। অন্তরে ক্ষণিকের জন্য উঁকি দেয় অজানা অনুভূতি। মনে মনে ভাবে। এই বুঝি তার অনাগত জীবনসঙ্গী। নিজের হবু জীবনসঙ্গীর মুখশ্রী একনজর অবলোকন করার অভিপ্রায়ে ধীরে ধীরে অবনত নয়নযুগল ঊর্ধ্বে তুলে তাকায় সে।

‎

‎কিন্তু সম্মুখে আকাশকে প্রত্যক্ষ করতেই বৃষ্টির সমস্ত অনুভূতি যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। বিস্ময়াভিভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। চোখেমুখে ফুটে ওঠে অবিশ্বাসের সুস্পষ্ট ছাপ। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না মেয়েটি। কণ্ঠস্বর যেন কণ্ঠনালিতেই রুদ্ধ হয়ে আসে। অবশেষে আমতা আমতা করে তোতলানো কণ্ঠে বলে ওঠে।

‎

‎” স্যা… স্যার আপনি এখানে? “

‎

‎বৃষ্টির মুখে বিস্ময়মাখা প্রশ্ন শুনে আকাশও যেন মুহূর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তার দৃষ্টি দ্রুত বাঁধনের দিকে সরে যায়। ভ্রু যুগল কুঞ্চিত করে অস্ফুট স্বরে তোতলাতে তোতলাতে বলে,

‎

‎” বৃ-বৃষ্টি। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এই বাঁধন আমাকে এখানে কেন দাঁড় করাল? “

‎

‎বাঁধন পকেট থেকে একটি হীরকখচিত আংটি বের করে। অতঃপর আংটির বাক্সটির ঢাকনা উন্মুক্ত করে সেটি আকাশের সম্মুখে তুলে ধরে দৃঢ়কণ্ঠে বলে।

‎

‎” এত কিছু বুঝতে হবে না। এখন চুপচাপ এই আংটিটা বৃষ্টির আঙুলে পরিয়ে দে। “

‎

‎বাঁধনের কথা শ্রবণ করতেই যেন আকাশের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় বৃষ্টিও। মুহূর্তেই দুজনের দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে অবিশ্বাসের ছাপ। আকাশ বিস্ফারিত নয়নে বাঁধনের মুখপানে তাকিয়ে হতভম্ব কণ্ঠে বলে।

‎

‎” আমি আংটি পরাব মানে? “

‎

‎নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ প্রশ্নে রূপার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। কোমরে হাত রেখে কিছুটা রুষ্ট স্বরে বলে।

‎

‎”তোমার কাল্লা আকাশ ভাইয়া৷ আংটি পরাতে বলছে তো চুপচাপ পরাও না।”

‎

‎রূপার ধমকে আকস্মিকভাবে দু-পা পিছিয়ে যায় আকাশ।মুখাবয়বে ফুটে ওঠে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার ছাপ। ঘাবড়ানো কণ্ঠে বলে।

‎

‎”আমি কেন আংটি পরাব? বৃষ্টির তো আমার সঙ্গে এনগেজমেন্ট হচ্ছে না। ওর তো অন্য কারও সঙ্গে এনগেজমেন্ট হওয়ার কথা। সেই ছেলেটা কোথায়? ও আংটি পরাবে। আমি কেন পরাব?”

‎

‎বাঁধন চোখ পাকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বলে।

‎

‎” পরাবি না? “

‎

‎আকাশের মনে হয়। নিশ্চয়ই তার সঙ্গে নিছক মশকরা করা হচ্ছে। তাই সেও ঘাড়ত্যাড়া ভঙ্গিতে জবাব দেয়।

‎

‎” না। “

‎

‎আকাশের একগুঁয়েমি দেখে রূপা কপালে হাত ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলে ।

‎

‎” খাইছে রে। আকাশ ভাইয়া গেল রে “

‎

‎পরক্ষণেই বাঁধন গলা উঁচিয়ে আবিদকে ডাক দেয়।

‎

‎” এই আবিদ। এদিকে এসো তো “

‎

‎ভিড়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে আবিদ। অতঃপর বাঁধনের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে বিনীত কণ্ঠে বলে ওঠে।

‎

‎” জি ভাইয়া। কিছু বলবেন? “

‎

‎বাঁধন কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই হীরকখচিত আংটিটি আবিদের সম্মুখে তুলে ধরে বলে।

‎

‎” হুম। এই আংটিটা বৃষ্টির আঙুলে পরিয়ে দাও। “

‎

‎কথাটি বলেই বাঁধন আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। বাঁধনের অভিপ্রায় বুঝতে আবিদের একটুও সময় লাগল না। সেও আর কথা না বাড়িয়ে আংটিটি হাতে নিয়ে বৃষ্টির অনামিকায় পরিয়ে দিতে উদ্যত হলো।কিন্তু পরক্ষণেই আকাশের কণ্ঠে প্রকম্পিত হয়ে উঠল গোটা হলরুম।

‎

‎” নাআআআআআআআ “

‎

‎আকাশের বিকট চিৎকারে উপস্থিত সকলের কর্ণপটহ ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। মুহূর্তেই হলরুমের সমস্ত নীরবতা ভেঙে পড়ল হাসির রোল। উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠল। রূপাও নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। খিলখিল করে হেসে উঠল ।আবিদও হাসতে হাসতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,

‎

‎” এই তো। বর মনে হয় অবশেষে রাজি হয়েছে। “

‎

‎আবিদের কথা শুনে আকাশ যেন আকাশ থেকে পড়ল। হতভম্ব হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কী ঘটছে। কেন ঘটছে। কিছুই যেন তার বোধগম্য হলো না।এমন সময় এগিয়ে এলেন হায়দার শেখ। বৃষ্টিকে সস্নেহে বক্ষলগ্ন করে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলেন,

‎

‎” আকাশ বাবা। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আজ এতক্ষণ ধরে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখছ। তার সবটুকুই তোমার আর বৃষ্টির জন্য। আর বৃষ্টির সঙ্গে আজ যার এনগেজমেন্ট হওয়ার কথা। সে আর কেউ নয়। তুমি। “

‎

‎আকাশের সমগ্র অস্তিত্ব যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে রইল । নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। অবশেষে বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে বললো।

‎

‎” মানে? “

‎

‎ঠিক সেই মুহূর্তেই এগিয়ে এলেন আহসান রহমান। আচমকা আকাশের কান টেনে ধরে ভর্ৎসনার সুরে বললেন।

‎

‎” এখনো মানে মানে করছিস? তুই কি ভেবেছিলি। তুই বৃষ্টিকে ভালোবাসবি আর আমরা কিছুই জানতে পারব না? “

‎

‎আহসান রহমানের কথাগুলো আকাশের কর্ণকুহরে প্রবেশ করলেও তার মস্তিষ্ক যেন সেগুলোর অর্থ উপলব্ধি করতে অক্ষম। প্রতিটি ঘটনা তার কাছে অবিশ্বাস্য স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে। নিশ্চয়ই সে কোনো অলীক কল্পনার জগতে বিচরণ করছে। এই মুহূর্তে যা কিছু ঘটছে। তার কোনোটাই বাস্তব নয়।অন্যদিকে বৃষ্টি সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আকস্মিক এই ঘটনাপ্রবাহ তার সমস্ত অনুভূতিকে যেন অবশ করে দিয়েছে। মুখনিঃসৃত একটি শব্দ উচ্চারণ করার শক্তিটুকুও তার অবশিষ্ট নেই। বিস্ময় আর আবেগে তার সমগ্র দেহ যেন হিমশীতল বরফের মতো স্থবির হয়ে রয়েছে।

‎

‎কিছুক্ষণ পর আকাশ অসহায় মুখে আহসান রহমানের দিকে তাকিয়ে বলে।

‎

‎” চাচ্চু। কান ছাড়ো। ভীষণ ব্যথা পাচ্ছি। আর তোমরা এসব কী আবোলতাবোল বকছ? “

‎

‎আকাশের কথায় কর্ণপাত না করে আতিক রহমান এগিয়ে এসে তার অপর কানটিও টেনে ধরেন। অতঃপর ভ্রু কুঁচকে কঠোর স্বরে বলেন।

‎

‎” কিসের আবোলতাবোল? যা শুনছিস তার প্রতিটি কথাই সত্যি। আজ তোর সঙ্গেই বৃষ্টির এনগেজমেন্ট। আর সামনেই তোদের বিয়ে। “

‎

‎কথাগুলো কর্ণগোচর হতেই আকাশের চোখেমুখে বিস্ময়ের ছায়া ঘনীভূত হয়। মুখাবয়বে ফুটে ওঠে অবিশ্বাসের অভিব্যক্তি। একবার আহসান রহমানের দিকে তাকায়। পরক্ষণেই দৃষ্টি ফেরায় আতিক রহমানের দিকে। কিছুতেই যেন ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিজের ভাবনাকে মেলাতে পারে না।

‎

‎”আমার সঙ্গে এনগেজমেন্ট মানে? এ কী করে সম্ভব?”

‎

‎আহসান রহমানের অধরে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। তিনি শান্ত কণ্ঠে জবাব দেন।

‎

‎” ইচ্ছে থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করার নেপথ্যে রয়েছে বাঁধনের মস্তিষ্ক। “

‎

‎আকাশের ভ্রুযুগল কুঞ্চিত হয়। বিস্ময়মাখা দৃষ্টি মেলে বাঁধনের মুখপানে তাকায়। মস্তিষ্কে একের পর এক প্রশ্নের উদয় হয়। অবশেষে অধৈর্য কণ্ঠে বলে।

‎

‎” মানে? “

‎

‎আহসান রহমান এবার সমস্ত রহস্যের জট খুলে দেন।

‎

‎” এই পুরো পরিকল্পনাটাই বাঁধনের। সেই আমাদের জানায় যে তুই বৃষ্টিকে ভালোবাসিস। এরপর আমরা বৃষ্টির বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বিয়ের দিনক্ষণ স্থির করি। বাঁধনই তোকে সবকিছু জানাতে নিষেধ করে। কারণ সে তোকে এমন একটা চমক দিতে চেয়েছিল। তাই আমরা কেউই তোর সামনে কিছু প্রকাশ করিনি। “

‎

‎

‎অবশেষে আকাশের কাছে পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হয়। এতক্ষণে সে বুঝতে পারে যে এতক্ষণ ধরে যা কিছু ঘটছে। তার সবটাই বাঁধনের সাজানো পরিকল্পনা। অবাক দৃষ্টিতে বাঁধনের মুখপানে তাকিয়ে থাকে । আকাশের অভিব্যক্তি দেখে বাঁধনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। ভ্রু নাচিয়ে বলে,

‎

‎” কিরে ছ্যাঁকাখোর। কেমন লাগল সারপ্রাইজটা? “

‎

‎আকাশ তখনো যেন ঘোরের মধ্যে ডুবে থাকে। অবিশ্বাসের আবেশ কাটিয়ে উঠতে না পেরে বিহ্বল কণ্ঠে বলে,

‎

‎” তার মানে সব সত্যি? আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি না? এসব সত্যিই ঘটছে? এটা বাস্তব? “

‎

‎আকাশের কাণ্ড দেখে আহসান রহমান ও আতিক রহমান অবশেষে তার কান ছেড়ে দেন। অন্যদিকে হায়দার শেখ সস্নেহে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেন।

‎

‎” হ্যাঁ বাবা। সব সত্যি। এটা কোনো স্বপ্ন নয়। এখন আর দেরি না করে আমার মেয়ের আঙুলে আংটিটা পরিয়ে দাও। বেশি দেরি করলে কিন্তু আমার মেয়েকে আর তোমার হাতে তুলে দেব না। “

‎

‎কথাটা কর্ণগোচর হতেই মুহূর্তের মধ্যে বাঁধনের হাত থেকে আংটিটা ছিনিয়ে নেয় আকাশ। বৃষ্টির মুখপানে তাকানোরও অবকাশ দেয় না নিজেকে। সাগ্রহে তার হাতখানি নিজের মুঠোয় নিয়ে ঝড়ের গতিতে অনামিকায় আংটিটা পরিয়ে দেয়।

‎

‎আকাশের এমন ব্যাকুলতা দেখে উপস্থিত সবাই হেসে ওঠে। মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা হলরুম। অবশেষে সমস্ত বাধা-বিপত্তির অবসান ঘটিয়ে সম্পন্ন হয় বৃষ্টি ও আকাশের বহুল প্রতীক্ষিত এনগেজমেন্ট।

‎

‎

‎বৃষ্টি এখনো ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। কী ঘটছে। কিছুই যেন বোধগম্য হচ্ছে না তার। সত্যিই কি তার সঙ্গে আকাশের এনগেজমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে? আর সবথেকে বড় কথা। আকাশও তাকে ভালোবাসে! এতদিন ধরে যে অনুভূতিকে সে নিছক কল্পনা ভেবে এসেছে। আজ কি তবে সেই অনুভূতিই বাস্তবের রূপ ধারণ করেছে?

‎

‎নিজের ভাবনার সত্যতা যাচাই করতে হাতের তালুতে চিমটি কাটে বৃষ্টি। ব্যথায় মুখটা কুঁচকে আসে তার। কিন্তু সম্মুখে দৃশ্যমান বাস্তবতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটে না। বরং চোখের সামনে আকাশের হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী ভেসে ওঠে। ঠোঁটের কোণে তার বাঁধভাঙা আনন্দের আভাস। দৃষ্টিতে উচ্ছ্বাসের দীপ্তি।তার মানে সব সত্যি। এ কোনো অলীক কল্পনা নয়। কোনো দিবাস্বপ্নও নয়। সত্যিই তার আকাশ তাকে ভালোবাসে।

‎

‎ভাবনাটা হৃদয়পটে উদিত হতেই বৃষ্টির বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। হৃদস্পন্দনের তীব্রতা ক্রমশ বেড়ে চলে। অন্তরের গভীরে শুরু হয় অনুভূতির প্রবল তোলপাড়। এতদিনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা যেন মুহূর্তেই ডানা মেলে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে।

‎

‎অন্যদিকে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে আকাশ। হঠাৎ করেই বৃষ্টিকে কোলে তুলে নেয় সে। বৃষ্টি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে নিয়ে হলরুমের দিকে ছুটে আসে। তারপর উপস্থিত মানুষের ভিড়ের মাঝখানে বৃষ্টিকে কোলে নিয়েই গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করে। তার মুখে বাঁধভাঙা উল্লাস। কণ্ঠে উন্মাদ প্রেমিকের মতো উচ্ছ্বাস। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সমগ্র হলরুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে ।

‎

‎”ইয়েএএএএএএ! আমি জিতে গেছি! জিতে গেছি আমি! পেয়ে গেছি! পেয়ে গেছি আমি আমার ভালোবাসাকে! পেয়ে গেছি আমার চাঁদকে! আমার চাঁদটা এখন থেকে একান্তই আমার!শুনছিস তোরা সবাই। এই আকাশ পেরেছে! নিজের চাঁদকে নিজের আকাশে আটকে ফেলেছে। হাহাহাহা! আর কেউ পারবি না আমার চাঁদকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে। কেউ না। আজ থেকে বৃষ্টি আমার! শুধুই আমার! আমার হৃদয়ের রানি! আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন৷ এতদিন যাকে দূর থেকে ভালোবেসেছি। আজ সেই আমার বাহুডোরে। আআআআআহ। আমি পেরেছি! আমার ভালোবাসা পেয়েছি৷ আমার বৃষ্টিকে পেয়েছি৷ আমার জীবনের সবথেকে সুন্দর সম্পদটাকে পেয়েছি।ভালোবাসি। ভালোবাসি! ভালোবাসি তোমাকে বৃষ্টি! হাজারবার বলব! লক্ষবার বলব! তবুও আমার ভালোবাসা ফুরাবে না৷ তুমি আমার চাঁদ৷ আমার আকাশের একমাত্র আলো! তোমাকে পেয়ে আজ এই আকাশের আর কিছুই চাই না! কিছুই না।

‎

চলবে…!

রাতে আরেক পর্ব আসবে অপেক্ষায় থেকো৷ আর কেমন হয়েছে কমেন্টে জানিও৷ আর ইশতিয়াক সীমা কাহিনি ৫৩ পর্ব থেকে আসবে৷

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply