#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [১৮]
[•••অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ•••]
সকাল ১০:০০ টা, আনন্দ মোহন কলেজ।রূপা, বৃষ্টি, কেয়া আর নাদিয়া ক্লাসরুমের এক কোণায় বসে আড্ডায় মগ্ন। ক্লাস শুরু হতে এখনো কিছুটা সময় বাকি, তাই পুরো ক্লাসেই ছোটখাটো হৈচৈ চলছে।আর বৃষ্টি তো কলেজে এসেই বাঁধনের বর্ণনা দেওয়া শুরু করে দিয়েছে।লোকটা কত লম্বা, কত হ্যান্ডসাম, কত ভয়ংকর গম্ভীর সব মিলিয়ে যেন সে কোনো সিনেমার হিরো!বৃষ্টির মুখে বাঁধনের প্রশংসা শুনতে শুনতেই নাদিয়া হঠাৎ রূপার কনুইয়ে গুতো মেরে দুষ্টু হাসি দিয়ে শুধাল।
“কিরে, কি শুনছি? ঘরে এত কিউট একটা ভাই আছে আগে বলিস নাই কেন? একটু লাইন পাতিয়ে দে না ফ্রেন্ড থেকে সরাসরি ভাবি হয়ে যাই!”
রূপা বিরক্ত চোখে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় আওড়াল।
“এত দরকার হলে তুই নিজেই গিয়ে পটা।”
নাদিয়া সাথে সাথে নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকের উপর হাত রেখে বলল।
“আরে, তুই আমার ফ্রেন্ড! আর বাঁধন তো তোর ভাই। তুই একটু সাপোর্ট করলেই প্রেম হয়ে যাবে।”
বৃষ্টি এবার স্বপ্নমাখা মুখ করে বেঞ্চে হেলান দিয়ে বলল।
“আহা সোনা লোকটা যতটা হ্যান্ডসাম, ততটাই গম্ভীর। সারাক্ষণ মুখটা এমন করে রাখে যেন দুনিয়ার সব মানুষের উপর রাগ করে বসে আছে।”
কেয়া হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল।
“হুম বুঝতে পারছি। পুরো রাগী বয় টাইপ। শুনতে কিন্তু ইন্টারেস্টিং লাগছে।”
নাদিয়া সাথে সাথে কেয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে ঘোষণা দিল।
“তুই দেখবি কি! আগে পটাবো তো আমি। এখন থেকেই দুলাভাই ডাকার অভ্যাস করে নে।”
বৃষ্টি হো হো করে হেসে উঠল। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল।
“আরে ভাই, ওই মানুষটাকে পটানো মানে আস্ত একটা পাহাড় কাটা! আমার তো মনে হয় না বাঁধন ভাইয়ার কোনো মেয়ের প্রতিই ইন্টারেস্ট আছে। উনাকে সবসময় দেখি গম্ভীর, চুপচাপ যেন হাসতে ভুলে গেছে।”
কেয়া চুলে হাত বুলিয়ে আত্মবিশ্বাসী গলায় আওড়াল।
“তাতে কি হয়েছে? আমি কি কম নাকি! দুইটা রোমান্টিক কথা বললেই পটিয়ে ফেলবো, দেখে নিস।”
ওদের এসব আজেবাজে কথা শুনে রূপার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল।সে বিরক্ত হয়ে দুই কান চেপে ধরে দাঁত কিঁচিয়ে বলল।
“তোরা চুপ করবি? কথা বলার হলে বারান্দায় গিয়ে বল!”
নাদিয়া রূপার কাঁধে হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল।
“আহা ননদিনী এভাবে রেগে যাচ্ছো কেন?”
রূপা দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল।মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে আর একবার কেউ বাঁধনের নাম নিলে সে আজ সত্যিই কাউকে মেরে ফেলবে।এসব ফালতু কথা শোনার একদম মুড নেই তার।ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজার সামনে এসে থামল আকাশ।মুহূর্তেই পুরো ক্লাস চুপ হয়ে । হাতে ফাইল। মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব। চোখেমুখে এতটাই স্ট্রিক্টনেস যে কেউ চাইলেও সহজে দুষ্টুমি করার সাহস পায় না।সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে সালাম দিল।
“আসসালামু আলাইকুম স্যার।”
আকাশ ক্লাসের দিকে একবার ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। Sit down, everyone.”
সবাই চুপচাপ বসে পড়ল।আকাশ টেবিলের উপর ফাইলটা রেখে পুরো ক্লাসরুমে চোখ বুলালো। তারপর দুই হাত টেবিলে রেখে কড়া, অথচ স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণে বলতে শুরু করল।
“Good morning, everyone. I hope all of you are doing well.”
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বলল।
“But remember one thing this is not a place for wasting time. This is a classroom, not a gossip zone.”
কথাটা বলেই সে ক্লাসের কয়েকজনের দিকে কড়া চোখে তাকাল। সাথে সাথে সবাই সোজা হয়ে বসে গেল।আকাশ এবার বই খুলতে খুলতে বলল।
“Now take out your books. And yes… I don’t want to hear any excuses about incomplete lessons today.”
তার কণ্ঠটা ধীরে ধীরে আরো কঠিন হয়ে উঠল।
“If anyone is unprepared, then be ready to leave my class immediately. I hate irresponsibility.”
পুরো ক্লাসরুম মুহূর্তেই থমথমে হয়ে গেল।যে যার বই বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।বৃষ্টি ধীরে ধীরে রূপার কানের কাছে মুখ এনে আতঙ্কিত গলায় ফিসফিস করে বলল।
“এই রে এখন কি হবে? আমি তো পড়াই শিখি নাই!”
রূপা বইয়ের দিকে তাকিয়েই ঠান্ডা গলায় আওড়াল।
“তাহলে বসে বসে গোড়ার ডিম খাও। কারণ মাফের আশা তুমি আমার ভাইয়ার কাছ থেকে করো না। আমার ভাইয়া মাফ করার মতো মানুষই না। সেটা তো তোমাকে নতুন করে বলতে হবে না তুমি ভালো করেই জানো আকাশ ভাইয়া কেমন।”
বৃষ্টির বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে গেল।ভয়ে তার মুখটা একদম নিষ্পাপ হয়ে গেছে। এমন ভাব করছে যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতেও জানে না।এদিকে আকাশ একে একে সবার কাছ থেকে পড়া নিতে শুরু করল।কেউ ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারছে, কেউ আবার আটকে যাচ্ছে। যারা পারছে না, তাদের কাউকে দাঁড় করিয়ে রাখছে, কাউকে কান ধরে দাঁড়াতে বলছে।পুরো ক্লাসে থমথমে পরিবেশ।রূপাকে জিজ্ঞেস করা হলে সে অনায়াসেই উত্তর দিয়ে দিল। আগেই পড়া শিখে এসেছিল।আকাশও কিছু না বলে মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে গেল।এবার পালা এলো বৃষ্টির।মুহূর্তেই তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
সে বড় বড় ঢোক গিলতে লাগল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে ভয়ে।আকাশ বই থেকে চোখ তুলে সোজা বৃষ্টির দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর, কড়া কণ্ঠে প্রশ্ন করল।
“Miss Brishti, answer me.”
বৃষ্টি মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইল।মনে হচ্ছে এখনই কান্না করে দিবে।
কয়েক সেকেন্ড পর আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় বলল।
“স্যা.. স্যার ইয়ে মানে শিখি নাই…”
আকাশ এক সেকেন্ডও দেরি করল না।তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তারপর ঠান্ডা অথচ ভয়ংকর কড়া কণ্ঠে আদেশ করল।
“Stand up properly and hold your ears.”
বৃষ্টি হতভম্ব হয়ে তাকাল।আকাশ এবার আরো কঠিন গলায় শুধাল।
“Didn’t you hear me?”
বৃষ্টি কেঁপে উঠে তড়িঘড়ি করে কান ধরে দাঁড়িয়ে গেল।পুরো ক্লাস চুপ।আর রূপা পাশ থেকে মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।হঠাৎ কি যেন মনে হতেই আকাশ আবার বৃষ্টির দিকে তাকাল।বৃষ্টি তখনো কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা এমন করে রেখেছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ সে-ই।আকাশ কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর, ঠান্ডা কণ্ঠে বলল।
“মিস বৃষ্টি ক্লাস শেষে আপনার বাবার নাম্বারটা আমার কেবিনে দিয়ে যাবেন।”
কথাটা শুনেই বৃষ্টির হাত-পা যেন বরফ হয়ে গেল।কলিজাটা ধক করে কেঁপে উঠল।এই লোকটা তার বাবার নাম্বার চাইছে কেন?পড়া পারেনি বলে কি বাসায় কমপ্লেইন করবে?বাবা যদি জানতে পারে সে পড়া না শিখে কলেজে আসে তাহলে তার রক্ষা নেই!বৃষ্টি ধীরে ধীরে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল।
মুখটা একদম পটিমাছের মতো হয়ে গেছে। চোখ দুটোতে স্পষ্ট আতঙ্ক। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ যেন সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে।তার অসহায় চেহারা দেখে মনে হচ্ছে মুখে কিছু না বললেও চোখ দিয়েই মিনতি করছে।
“স্যার প্লিজ… এবারের মতো মাফ করে দিন, আর হবে না”
বৃষ্টির সেই অসহায়, নিষ্পাপ মুখটা দেখে আকাশের ভেতরে অদ্ভুত একটা মজা কাজ করল।মেয়েটা ভয় পেলেই কেন জানি আরো বেশি কিউট লাগে।তবে মুখে তার কিছুই প্রকাশ পেল না।বরং আরো গম্ভীর মুখ করে বইয়ের দিকে তাকাল সে।আর মনে মনে ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলল।
“ক্লাসে পড়া না পাওয়া, তাই না? দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা তোমাকে।”
ক্লাস শেষ হলেও বৃষ্টি আর আকাশের কেবিনে যাওয়ার সাহস পেল না।
যা হওয়ার হবে তবুও সে কোনোভাবেই নিজের বাবার নাম্বার আকাশকে দিতে পারবে না।লোকটা যদি সত্যিই বাসায় কমপ্লেইন করে দেয় তাহলে আজ তার জীবন শেষ।
_________
কলেজ ছুটির পর আকাশ রূপা আর বৃষ্টিকে সাথে নিয়েই বাড়ি ফিরল।
গাড়ির ভেতর তিনজনই বেশ চুপচাপ। সারাদিনের ক্লাসে সবাই ক্লান্ত।বাড়িতে ফিরেই বৃষ্টি সোজা রুমে ঢুকে ব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল। তারপর জামা কাপড় নিয়ে কোনো কথা না বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।এদিকে রূপা রুমে ঢুকেই চারপাশে তাকাতে লাগল।তার চোখ প্রথমেই ক্যান্ডিকে খুঁজল।
কিন্তু রুমের কোথাও ক্যান্ডিকে দেখা গেল না।বিছানার পাশে নেই সোফার নিচে নেই, আশে পাশে কোথাও নেই। রূপার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।
ক্যান্ডি তো সাধারণত রুম ছেড়ে কোথাও যায় না!সে তাড়াহুড়ো করে ড্রেসও না খুলে ব্যালকনিতে চলে এলো। কিন্তু সেখানেও ক্যান্ডি নেই।
মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর ভয় জমতে শুরু করল।সে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে নিচে নেমে এলো।ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিলেন রজনী রহমান।রূপা হাঁপাতে হাঁপাতে তার সামনে এসে উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল।
“আম্মু, ক্যান্ডিকে দেখেছো?”
রজনী রহমান টিভি থেকে চোখ সরিয়ে অবাক হয়ে বললেন।
“না তো। কেন, রুমে নেই?”
রূপার কণ্ঠে এবার স্পষ্ট অস্থিরতা ফুটে উঠল।
“না মা কোথাও নেই।”
ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে শান্তা বলল।
“ক্যান্ডিকে আমি বাঁধন ভাইয়ার রুমের দরজার সামনে বসে থাকতে দেখেছিলাম। হয়তো ভাইয়ার রুমে ঢুকে পড়েছে। গিয়ে দেখে আয়।”
‘বাঁধনের রুম’ কথাটা কানে যেতেই রূপার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এলো। সে অজান্তেই জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজাতে লাগল।
বাঁধনের রুমে যাওয়ার কথা ভাবলেই তার বুক কেঁপে ওঠছে।লোকটার সামনে দাঁড়ানোই কঠিন আর এখন সরাসরি তার রুমে যেতে হবে!কিন্তু ঠিক তখনই হঠাৎ রূপার মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা।
যেদিন সে ক্যান্ডিকে রাস্তা থেকে তুলেছিল, সেদিন বাঁধন খরগোশটাকে দেখে এমনভাবে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলেছিল যেন জীবনে সবচেয়ে বিরক্তিকর কিছু দেখছে।তাহলে আজ যদি সত্যিই ক্যান্ডি তার রুমে ঢুকে থাকে।আর যদি বাঁধন রাগ করে ক্যান্ডিকে ব্যালকনি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়?ভাবনাটা মাথায় আসতেই রূপার বুকের রক্ত যেন শুকিয়ে গেল।ক্যান্ডিকে হারানোর ভয় মুহূর্তের মধ্যে তার সব ভয়কে হার মানিয়ে দিল।সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না।প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে লাগল, সোজা বাঁধনের রুমের দিকে।
রূপা দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বাঁধনের রুমের দরজার সামনে থামল।দরজাটা হালকা খোলা ছিল।সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকেই পাগলের মতো চারপাশে তাকাতে লাগল।ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে আটকাল বাঁধনের বড়, পরিপাটি করে গুছানো টেবিলটার ওপর।সেখানে নিশ্চুপ হয়ে গোল হয়ে বসে আছে ক্যান্ডি।যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তার নেই।
ক্যান্ডিকে একদম সুস্থ দেখে রূপা চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শান্তির নিশ্বাস ফেলল।মনে হলো বুকের ভেতর থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেছে।
সে ধীরে ধীরে চোখ খুলে আবার চারপাশে তাকাল। রুমে বাঁধন নেই।তবে ওয়াশরুমের ভেতর থেকে ঝিরঝির করে পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। বুঝাই যাচ্ছে বাঁধন ভেতরেই আছে।মুহূর্তেই রূপার বুকটা আবার ধক করে উঠল।তবুও ক্যান্ডিকে নিতে হবে।ঠিক তখনই হঠাৎ তার চোখ ঘুরে গেল পুরো রুমটার দিকে।
এই প্রথম সে বাঁধনের রুমে এসেছে।ছোটবেলায় কখনো এসেছিল কিনা তার মনে নেই, তবে যতদূর মনে পড়ে এই রুমটা সবসময় বন্ধই দেখেছে। বাঁধন বিদেশে থাকার সময় তো দরজায় সবসময় তালা ঝুলতেই দেখত।কিন্তু আজ রুমটার ভেতরে ঢুকে রূপা কয়েক মুহূর্তের জন্য একদম থমকে গেল।পুরো রুমটা যেন কোনো দামি ম্যাগাজিনের ছবি থেকে তুলে আনা।
চারপাশ এত নিখুঁতভাবে গুছানো যে বিশ্বাসই হয় না এটা কোনো ছেলের রুম।
বড় কিং সাইজ বেডটা একদম টানটান করে গুছানো। সাদা-কালো কম্বিনেশনের চাদরে একটুও ভাঁজ নেই।রুমের এক পাশে বিশাল বুকশেলফ। সেখানে সারি সারি ইংরেজি বই, ফাইল আর কিছু মেডেল সুন্দর করে সাজানো।দেয়ালে দামি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট আর্টফ্রেম ঝুলছে।এক কোণায় রাখা আধুনিক ডিজাইনের ল্যাম্পটা পুরো রুমে নরম সোনালি আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।
বড় গ্লাসের জানালার পাশে কালো লেদারের একটা সোফা। সামনে ছোট্ট টেবিলে কয়েকটা ফাইল, ঘড়ি আর একটা দামি গাড়ির চাবি রাখা।আর বাঁধনের কাজের টেবিলটা।সেটা এতটাই নিখুঁতভাবে গুছানো যে দেখে মনে হয় কেউ প্রতিদিন স্কেল দিয়ে মেপে জিনিস রাখে।দামি ল্যাপটপ, ওয়্যারলেস হেডফোন, কালো রঙের ঘড়ি, কিছু অফিস ফাইল আর পাশে একটা সিলভার কলমদানি।
পুরো রুমে একটা ঠান্ডা, পুরুষালি গন্ধ ছড়িয়ে আছে।অদ্ভুতভাবে সেই গন্ধটা রূপার বুকের ভেতর কেমন যেন কাঁপন তুলল।সে ধীরে ধীরে চারপাশে তাকিয়ে মনে মনে একটাই কথা ভাবল।
“মানুষটা যেমন ভয়ংকর গম্ভীর তার রুমটাও ঠিক তেমন।”
রূপার ভাবনার মাঝেই ক্যান্ডি হঠাৎ ছোট্ট লাফ দিয়ে টেবিলের ওপর নড়ে উঠল।
তার পা মাটিতে ছুঁই ছুঁই করে কাঁপছে, আর ছোট্ট কান দুটো বারবার নড়ছে। রূপার চোখ তখনই গিয়ে পড়ল ওর দিকে।মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠল।কারণ ক্যান্ডি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তার পাশেই বাঁধনের ল্যাপটপটা রাখা।একটু এদিক-ওদিক হলেই সরাসরি ধাক্কা খাবে আর এত উঁচু থেকে পড়লে ল্যাপটপটা ভাঙা নিশ্চিত।রূপার শ্বাস আটকে গেল।সে বড় বড় ঢোক গিলতে লাগল, হাত দুটো অস্থির হয়ে উঠল।দৌড়ে গিয়ে ক্যান্ডিকে থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ভয় আর তাড়াহুড়ায় গলার স্বর কেঁপে উঠল।
“ক্যান্ডি সোনা বাবু, নেমে আসো প্লিজ।”
কথাটা শেষও হলো না ঠিকমতো।ক্যান্ডি তখনই ছোট্ট শরীর ঘুরিয়ে নামতে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার এক পা ল্যাপটপের কোণে লেগে গেল।এক সেকেন্ডের জন্য সময় যেন থেমে গেল।ল্যাপটপটা টেবিলের কিনারা থেকে দুলে উঠল,রূপার চোখ বড় হয়ে গেল আতঙ্কে।পরের মুহূর্তেই।
ঠাসসসসসসস…!
ল্যাপটপটা সোজা মেঝেতে আছড়ে পড়ল।ল্যাপটপটা মেঝেতে পড়তেই পরের মুহূর্তেই স্ক্রিনের গ্লাস চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে সাদা ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
টুকরো টুকরো কাঁচের শব্দ যেন সরাসরি এসে রূপার বুকের ভেতর বিঁধল।
সে ভয়েতে কাঁপতে লাগল।শ্বাস আটকে আসছে।ঠিক তখনই ক্যান্ডি আবার ছোট্ট করে নড়ল।টেবিলের ওপর রাখা কলমদানিটাও দুলে উঠল।
“টুপ” করে সেটাও গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
রূপার মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।চারপাশ ঝাপসা লাগছে।পুরো পৃথিবীটা যেন ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে।বাঁধন যদি এসব দেখে ফেলে তাহলে তার আজ রক্ষা নেই।ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।রূপার বুক কেঁপে উঠল।ধীরে ধীরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো বাঁধন।পরনে নেভি ব্লু শার্ট। হাতা দুটো নিখুঁতভাবে কনুই পর্যন্ত গোটানো। শার্টের উপরের দুইটা বোতাম খোলা, সেখান থেকে উঁকি দিচ্ছে তার ফর্সা, শক্ত বুকের অংশ যেটা তাকে ভয়ংকর রকমের পুরুষালি আকর্ষণ এনে দিয়েছে।
নিচে সাদা প্যান্ট আর সাদা জুতো।পুরো মানুষটাকে যেন অদ্ভুত পরিষ্কার আর অভিজাত লাগছে।চুলগুলো ভেজা ভেজা, কিছুটা এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে।মুখে এখনো পানির ফোঁটা লেগে আছে, আলো পড়তেই সেগুলো চিকচিক করে উঠছে তার ফর্সা ত্বকের ওপর।বাম হাতের কবজির নিচে আঁকা কালো ট্যাটুটা যেন হীরের মতো ঝিলিক দিচ্ছে।তার ধারালো চোয়াল, গভীর চোখ আর ঠান্ডা গম্ভীর মুখ মিলিয়ে মানুষটাকে এতটাই মারাত্মক আকর্ষণীয় লাগছে যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য রূপা নিজের ভয়টাই ভুলে গেল। হা করে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে কোনো সিনেমার ভয়ংকর সুন্দর নায়ক হঠাৎ বাস্তবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাঁধনের চোখ গিয়ে থামল রূপার ওপর।সকালের সেই কলেজ ড্রেস এখনো গায়ে। মাথায় সাদা বানি ইয়ার হেডব্যান্ডটা আছে, তবে সকালের ফ্রেশ মুখটা আর নেই।এখন মুখটা ক্লান্ত, ভীত আর নিষ্পাপ লাগছে।চোখ দুটোতে স্পষ্ট ভয় জমে আছে।অদ্ভুতভাবে এই ভীতু, অসহায় রূপটাই মেয়েটাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।বাঁধন না চাইতেও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে।
কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই তার চোখ গিয়ে আটকাল মেঝেতে।সাদা ফ্লোরের ওপর পড়ে আছে তার ভাঙা ল্যাপটপ।স্ক্রিন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে আছে কাঁচের টুকরোর মতো অংশ।মুহূর্তেই বাঁধনের শান্ত চোখ দুটো জ্বলে উঠল।
গোলমরিচের মতো লাল হয়ে উঠতে লাগল তার দৃষ্টি।এই ল্যাপটপটা সে সরকার থেকে পেয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে।আর এর মধ্যেই সেটা এমনভাবে ভেঙে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।শিরাগুলো ফুলে উঠতে লাগল রাগে।
সে আগুন ঝরা চোখে ধীরে ধীরে রূপার দিকে তাকাল।যেন এখনই মেয়েটাকে তুলে আছাড় মেরে ফেলবে।
বাঁধনের সেই ভয়ংকর রাগী দৃষ্টি দেখে রূপার বুক থেকে যেন পুরো পৃথিবীটাই কেঁপে উঠল। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো।শ্বাস আটকে যাচ্ছে।মনে হচ্ছে এখনই কান্না করে দিবে।বাঁধন রাগে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর।সেখানে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে ক্যান্ডি।ছোট্ট কান দুটো নড়ছে ধীরে ধীরে।মুহূর্তেই বাঁধনের বুঝতে বাকি রইল না।এই ছোট্ট খরগোশটাই তার ল্যাপটপটা টেবিল থেকে ফেলে দিয়েছে।
সে রাগে নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল।
তারপর ধীরে ধীরে আগুন ঝরা চোখ তুলে তাকাল ক্যান্ডির দিকে।ছোট্ট খরগোশটা টেবিলের ওপর নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।এক ঝটকায় সে টেবিলের সামনে গিয়ে ক্যান্ডিকে দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে খামছে ধরল।হঠাৎ এমন শক্ত চাপে ক্যান্ডি ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠল। ছোট্ট শরীরটা ভয়ে কাঁপছে, পাগুলো ছটফট করছে।বাঁধন দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল।
” হাউ ডেয়ার ইউ।বিচ্ছু একটা বাচ্চা, তোর এত বড় সাহস আমার জিনিস ভাঙিস।”
তার গলার ভয়ংকর রাগে পুরো রুমটাই যেন থমকে গেল।পরের মুহূর্তেই সে ক্যান্ডিকে সজোরে মেঝেতে আছড়ে মারার জন্য হাত তুলল।আর ঠিক তখনই
রূপার মনে হলো কেউ যেন তার বুকের ভেতর তীর তাক করে ধরেছে।
সে দৌড়ে এসে বাঁধনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।তার লম্বা, ঘন কালো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে সাদা ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ল।কাঁপতে কাঁপতে সে দুই হাত জোড় করল।চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে।কান্নাভেজা, কাঁপা কণ্ঠে সে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে মিনতি করে বলল।
“ওকে মারবেন না প্লিজ, ও ছোট্ট একটা অবুঝ বাচ্চা, না বুঝে ভেঙে ফেলেছে। প্লিজ ওকে কিছু করবেন না আল্লাহর দোহাই লাগে।”
Share On:
TAGS: বাঁধন রূপের অধিকারী, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৩
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৫( প্রশেষ অংশ রিদির শেষ চিঠি)
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭০
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২২
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ২