প্রেমবসন্ত_২ ।৫২।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
জয়া চোখ ছোট ছোট করে নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে আবার নাক কুঁচকে ঘর জুড়ে পায়চারী করছে। রাত তখন খুব বেশি হয়নি। নাজনীন ফোনে কথা বলতে বলতে ঘরে প্রবেশ করল। ভেতরে এসে দেখল জয়া ঘর জুড়ে টোইটোই করছে। জয়া আড়চোখে নাজনীনকে দেখে গুটি গুটি পায়ে ওর নিকটে এসে পাশে বসল পা উঠিয়ে। নাজনীনের খালি হাত টেনে ধরে নিজের পেটের উপর খানিকক্ষণ বুলাল। নাজনীন কানে ফোন চেপে ধরেই কপাল কুঁচকে জয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। শেষে কথা শেষ করে ফোন কান থেকে নামিয়ে বলল,
“কী হয়েছে? এমন মোঁচড়াচ্ছিস কেন?”
জয়া বলল,
“ঝগড়া করার মুড নেই আমার। তুমি কেমন মানুষ? বউয়ের একটু খেয়াল রাখতে পারো না?”
“তোর আবার কী হলো?”
“আমার এই মাস মিস গেছে। সে-খেয়াল আছে তোমার?”
নাজনীন আতঙ্কিত হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। বলল,
“তোকে কিন্তু পানিতে চুবিয়ে মারব জয়া। যদি টেস্ট পসিটিভ আসে তাহলে এক লাথ্যি মারব।”
জয়া মুখ কালো করে বলল,
“এখন সব দোষ আমার? কেমন মানুষ গো তুমি? একে তো আমার মতো একটা ভোলা-ভালা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করেছ, এখন আবার নিজের দোষ আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছ? তোমাকে কিন্তু ছাড়তে আমার দু’মিনিটও লাগবে না।”
নাজনীন তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। পকেটে মানিব্যাগ ঠিক আছে কিনা দেখে তাড়াতাড়ি বাইরে ছুটল। জয়ার পেটে কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। এই মুহূর্তে এই সংবাদ কাউকে না দেয়া অব্দি ওর শান্তি হবে না। মেয়েটা ঘর থেকে বের হলো। বেরিয়ে শাশুড়িকে খুঁজল সব জায়গায়। রেখা বেগম খুলনায় লতা বেগমকে রেখে এসেছেন হাসান আর ফারিহার কাছে। তাকে যে আসতেই হলো শ্বশুরের কথায়। জয়া এদিক ওদিক ঘুরে দেখল, রেখা বেগম বেহরুজ বেগমের ঘরে বসে বসে গল্প করছেন। জয়া হুরমুড়িয়ে ভেতরে ঢুকেই শাশুড়ির আঁচল টেনে ধরে বলল,
“তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।”
বেহরুজ বেগম বললেন,
“আগে পাশে এসে বসো। এত হাইপার হয়েছ কেন?”
জয়া বসল না। উল্টো মুখটা চিন্তিত বানিয়ে মিনমিন গলায় বলল,
“তোমাদের আমার কিছু বলার আছে।”
জয়ার অবস্থা দেখে রেখা বেগম খানিক ভয় পেলেন। টেনে ওকে পাশে বসিয়ে বললেন,
“কী হয়েছে? নাজনীনের সাথে আবার ঝগড়া করেছিস?”
জয়া “না” বলে খানিকক্ষণ চুপ থেকে চিন্তিত গলায় বলল,
“আমি প্রেগন্যান্ট। তোমার ছেলেকে এই কথা বলেছি বলে আমায় মারতে চেয়েছে।”
রেখা বেগম এহেন সংবাদ শুনে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। বেহরুজ বেগম শুকনো ঢোক গিলে বললেন,
“এখন? এই বয়সে? ভাবনা-চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছ?”
জয়া চুপ রইল। আধ-ঘণ্টাও হয়নি, ইতোমধ্যে পুরো বাড়ি ছড়িয়ে খুলনায় পৌঁছে গেছে এই খবর। নাজনীন ছিল বাইরে, গিয়েছিল ফার্মেসিতে। বাড়ি থেকে ঘনঘন ফোন আসার পরও সে ফোন রিসিভ করেনি। চিন্তায় তার মাথা এমনিতেই হ্যাং হয়ে গেছে। আব্দুর চৌধুরী গম্ভীর মুখে বসে আছেন ড্রয়িংরুমে। ভাব খানা এমন যেন নাজনীনকে কাছে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খাবেন।
খানিকক্ষণ পর ব্যস্ত পায়ে বাড়িতে ঢুকল নাজনীন। বাড়ির আনাচে-কানাচে তার খেয়াল নেই। সে সোজা সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল। এমন সময় পেছন থেকে মায়ের ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল নাজনীন। পিছু ঘুরে দেখল ড্রয়িংরুমে বাড়ির অনেকই উপস্থিত। সে খানিক ব্যস্ত গলায় বলল,
“পরে কথা বলব আম্মা।”
রেখা বেগম থমথমে গলায় বললেন,
“তোর সাথে আমার কথা আছে। একটু আমার সাথে আয়।”
নাজনীন এবার সবার দিকে তাকাল। সবাই কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটা ঘাড় চুলকে বলল,
“ঘরে আসো।”
রেখা বেগম এবং আতিয়া বেগম দুজন নাজনীনের পিছু পিছু গেস্ট রুমে প্রবেশ করলেন। জয়া বিছানায় বসেছিল অস্থির হয়ে। নাজনীন ওকে দেখেই ধমক দিয়ে বলল,
“এই, সর এখান থেকে। বসতে দে আম্মাদের।”
জয়া মুখ কালো করে উঠে দাঁড়াল। উনারা বসলেন, এবং একে অপরের দিকে খানিকক্ষণ চোখা-চোখী করে আতিয়া বেগম গলা পরিষ্কার করলেন। তিনি নাতিকে প্রশ্ন করতে পারলেন না। এই বিষয়ে প্রশ্ন করার মতো কিছু পেলেনই না। রেখা বেগম তার অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন,
“জয়া যা বলছে সেটা কী সত্য?”
নাজনীন কপাল কুঁচকে জয়ার দিকে তাকাল। ভাবল জয়া আবার কী বলেছে? প্রেগন্যান্সির কথা আবার বলেনি তো? নাজনীন দাঁত কটমট করে জয়ার দিকে তাকাল। অমন ভাবেই বলল,
“কী বলেছে এই বলদ?”
জয়া মিনমিন করে বলল,
“যা সত্যি তাই তো বলেছি। তুমি তখন থেকে অমন বাঁদরের মতো করছ কেন?”
“মার খেতে ইচ্ছে করছে?”
জয়া মুখ বাঁকিয়ে শাশুড়িকে নালিশ দিয়ে বলে,
“তোমার এমন বাঁদরমুখো ছেলের সাথে আমি সংসার করব না। একে বলো আমার চোখের সামনে থেকে যেতে।”
আতিয়া বেগম ধমকে উঠলেন,
“কী হচ্ছে জয়া? স্বামীর সাথে কেউ এভাবে কথা বলে?”
“তাহলে কিভাবে কথা বলব? এই লোক কথায় কথায় এত রাগ দেখাবে কেন?”
নাজনীন শান্ত হয়ে পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করে দাদির হাতে ধরিয়ে দিয়ে গটগট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দাদি দেখলেন প্যাকেট। অতঃপর খানিক ভেবে জয়ার হাতে প্যাকেটটা দিয়ে বললেন,
“যা, টেস্ট করে আয়।”
জয়া মুখ কালো করে ওয়াশরুমে ঢুকল। রেখা বেগম মলিন মুখে বললেন,
“এই সংবাদ সত্যি হলে আমার খুশি হওয়ার কথা আম্মা। কিন্তু জয়া ছোট মানুষ, সন্তান জন্ম দেয়া কী এতই সহজ?”
আতিয়া বেগম বললেন,
“আল্লাহ দিলে কী আর ফিরিয়ে দিতে পারবে? দেখ কী হয়!”
ওদিকে নাজনীন ছাদে এসে সিগারেট ধরিয়েছে। জারা বসেছিল দোলনায়। মেয়েটা আজ-কাল একা থাকে। বোধহয় একাকিত্ব বড্ড খারাপ ভাবে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। জারা গুনগুন করছিল নিজ মনে। খোলা চুল গুলো বাতাসে উড়ছিল মৃদু বাতাসে। হঠাৎ চোখ গেল ছাদের কিনারায়। আপছা আলোয় নাজনীনকে দেখে কিছুটা স্বর তুলে বলল,
“বউয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে নাকি?”
নাজনীন মেয়েলী কণ্ঠস্বর শুনে কপাল কুঁচকে ছাদের মধ্যখানে তাকাল। দুপা এগিয়ে এসে জারাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঝেতে বসল চুপচাপ। দুই হাঁটুতে হাত রেখে সিগারেটে টান দিয়ে বলল,
“বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করলে যা হয় আরকি।”
জারা মুচকি হাসল।
“আপনার বউটা কিন্তু বড্ড মিষ্টি। এমন আদুরে বউ পেয়েও আফসোস হচ্ছে মশাই?”
নাজনীন বলল,
“আফসোস করার কথা মনেও আনি না। সে আমার অর্ধাঙ্গিনী। হয়তো একটু বোকা কিন্তু ভালোবাসি খুব।”
জারা দোলনা দুলিয়ে দোলনায় পিঠ ঠেকিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল,
“ভালোবাসা সবার কপালে থাকে না। যত্ন করে বুকের মধ্যে আগলে রাখুন।”
নাজনীন খানিক্ষণ জারাকে দেখে বলল,
“অর্ণর সাথে তোমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল শুনেছিলাম।”
“ছিল কিন্তু মানুষটা ভাগ্যে ছিল না।”
“খুব কী ভালোবাসতে?”
জারা হাঁটুতে চিবুক ঠেকিয়ে বলল,
“তার প্রতি আলাদা একটা টান ছিল আমার। ভালোবাসতাম কিনা জানি না, তবে তার স্ত্রী হিসেবে নিজেকে কল্পনা করেছি বহুবার। শখ ছিল আমার একটা সংসার হবে। সেই সংসারে ভালোবাসার কমতি থাকবে না। কিন্তু দেখুন না, আমার তো সংসারই হলো না। আর না হলো সুন্দর একটা পরিবার।”
নাজনীন বলল,
“হয়তো অর্ণ তোমার জন্য ছিল না। সে তো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে আরও ৮ বছর আগে।”
“এটা তার সবাইকে জানানো উচিত ছিল নয়কি?”
“তা বটে। কিন্তু আমরা কীই বা করতে পারি? সে হয়তো অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল। তা-ছাড়া অর্ণ কারোর সাথে তেমন কথা বলে না। যেখানে নিজের পরিবারকে এই খবর জানায়নি সেখানে তুমি…”
জারা ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
“সেখানে আমি উনার কেউ না। যাক, বাদ দিন ওসব কথা। আপনি বরং স্ত্রীর কাছে যান। এভাবে রাগ করে থাকাটা মোটেও ভালো কাজ নয়।”
নাজনীন ধীরে-সুস্থে উঠে দাঁড়াল। আড়চোখে জারাকে দেখে পা বাড়াল নিচে।
জয়া বিছানায় বসে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে। টেস্টে নেগেটিভ এসেছে। নাজনীন ঘরে এসে এই খবর শুনতে পেয়ে গম্ভীর স্বরে মা আর দাদিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমরা এখন যাও। ওর সাথে আমার কথা আছে।”
জয়া শাশুড়ির হাত চেপে ধরে আতঙ্কিত হয়ে বলল,
“আমাকে একা রেখে গেলে এই লোক আমায় মেরেই ফেলবে বড় আম্মা। তুমি আমার সাথে থাকো।”
রেখা বেগম ওর মাথায় হাত বুলোয় দিয়ে ছেলেকে বললেন,
“একদম রাগারাগী করবি না ওর সাথে। ছোট মানুষ বুঝতে পারেনি।”
নাজনীন বলল,
“আচ্ছা।”
উনারা ঘর থেকে বের হলে নাজনীন দরজা আটকে দেয়। এগিয়ে গিয়ে বিছানায় জয়ার সামনে বসে। ওর দুহাত মুঠোয় নিয়ে নরম গলায় বলে,
“আমার দিকে তাকা?”
জয়া তাকায়। নাজনীন ওর চঞ্চল দৃষ্টি জড়ায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে,
“এসব কথা আবার বাড়িতে কেন জানাতে গিয়েছিলি শিওর না হয়ে? সবাই কী ভাবল বল তো? তোর কী মা হওয়ার বয়স হয়েছে এখন? এমন বাচ্চামো কেন করিস?”
জয়া ঠোঁট উল্টে বলল,
“ওইযে বললাম, তাই তো সন্দেহ হয়েছিল।”
“এখন সবাই যে আমাকে ভুল বুঝল? পুরো বাড়ি ছড়িয়ে গেছে এই খবর। হাসান ভাই অব্দি খুলনা থেকে কল করেছেন।”
জয়া মন খারাপ করল। সে চেয়েছিল বাচ্চাটা আসুক। বাচ্চাটা আসলে অন্তত কষ্ট করে পড়তে হতো না। নাজনীন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“হয়েছে। যা হওয়ার হয়ে গেছে। এমন পাগলামি আর করবি না।”
••
ঘনঘন ফোন আসায় অর্ণ ভীষণ বিরক্ত। সে উঠোনে পাটি বিছিয়ে কায়নাতের সাথে শুয়ে ছিল। খোলা আকাশের নিচে আকাশবিলাস করছিল। কায়নাত অর্ণর ফোনে উকি মারল। দেখল, কে যেন কল করছে বারবার। কায়নাত ঘাড় উঁচু করে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কে কল করছে? কল কেন ধরছেন না?”
অর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“চুপ করে শুয়ে থাকো। এই সুন্দর সময়টা নষ্ট করতে চাচ্ছি না আমি।”
কায়নাত ওর বুকে নাক ঘষল। বিড়াল ছানার ন্যায় খানিক গুটিয়ে এসে বলল,
“আমি বাড়ি যাব। সবাই আজ ওখানে আছে। চলুন না বাড়ি যাই?”
“তুমি না আজ এখানে থাকতে চাইলে?”
“বাবারা সবাই চলে যাবে দুদিন যেতেই। আমাদের উচিত তাদের সাথে থাকা।”
অর্ণ খানিকক্ষণ কিছু ভেবে বলল,
“ঠিক আছে। আপনার প্রস্তাবই কবুল করলাম।”
কায়নাত খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। দুজন রেডি হয়ে বাড়ি বাইরে এসে উঠোনে দাঁড়াল। কায়নাত প্রাণটা ভরে দেখল তার সোনায় রাঙানো ছোট্ট সংসার। এখানে সুখের কমতি নেই এক ফোঁটাও। অর্ণ শক্ত করে ওর হাত ধরল। কায়নাত বলল,
“এই বাড়িতে আমরা আবার কবে আসব? “
অর্ণ খানিক ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“যখন তোমায় বড্ড বেশি কাছে পেতে ইচ্ছে হবে।”
মেয়েটা চোখ রাঙাল। ওর বুকে ধাক্কা দিয়ে গটগট পায়ে বের হলো বাড়ি থেকে। ওদের চৌধুরী বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ১০টার কাটা ছাড়িয়েছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই খানিক অপ্রস্তুত হলো ড্রয়িংরুমে বাড়ি ভর্তি মানুষ দেখে। আব্দুর চৌধুরী কপাল কুঁচকে অর্ণর দিকে তাকালেন। চওড়া গলায় বললেন,
“মাথায় কী আক্কেল নেই তোমার? কাল রাত থেকে বাড়ির বাইরে ঘুরছ কেন মেয়েটাকে নিয়ে?”
অর্ণ বড্ড বিরক্ত হলো শ্বশুরের ধমকে। যে পরিমাণ শ্বশুর তাকে আজ অব্দি ধমকেছে ততটুকু বোধহয় নিজের বাবা-মাও গলা তুলে কথা বলেনি। কায়নাতও যেন রং বদলাল। অর্ণর হাত ছেড়ে দিয়ে বাবার কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“উনার কথা ছাড়ুন, আপনারা সবাই খেয়েছেন?”
আব্দুর চৌধুরী খানিক নরম হলেন। কায়নাতকে পাশে বসতে বললেন। কায়নাত পাশে বসা মাত্রই ওপাশ থেকে নিশা হাতের নখ কামড়ে বলল,
“খেয়েছে। একটা নিউজ আছে।”
কায়নাত কপাল কুঁচকে বলল,
“কীসের নিউজ?”
বেহরুজ বেগম ওদের কথা থামিয়ে দিয়ে বললেন,
“কায়নাতকে নিয়ে তোর ঘরে যা। এখানে এসব নিয়ে আলোচনা করতে হবে না।”
নিশা মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। কায়নাতকে নিয়ে ছুটল নিজের ঘরে। অর্ণ চুপচাপ সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালে আব্দুর চৌধুরী ভারী গলায় বলেন,
“এমন বেয়াদব ছেলে জীবনে দুটো দেখিনি। আগে ভাইয়ের ছেলে ছিল বেশ ছিল, কিন্তু মেয়ের জামাই হওয়ার পর থেকে বেয়াদবি পুরো শরীরে ছড়িয়ে গেছে।”
মাশফিক চৌধুরী কপাল চাপড়ে ধরলেন। এখন শুরু হবে জামাই-শ্বশুরের ঝগড়া। তার আন্দাজ সঠিক হলো। অর্ণ ঘুরে দাঁড়িয়ে গমগমে গলায় বলল,
“বিয়ে তো আপনারাই দিয়েছিলেন।”
“তাই বলে তুমি বেয়াদবি করবে?”
“আশ্চর্য! আমি বেয়াদবি কোথায় করলাম?”
“আমরা এসেছি গত পরশু। তুমি একটাবার আমাকে সালাম করে দুটো ভালো-মন্দ কথা জিজ্ঞেস করেছ?”
“এখন কী আপনাকে কোলে নিয়ে আপ্যায়ন করতে হবে চাচ্চু? কাল বাড়ি থেকে যাওয়ার আগেও আপনার সাথে কথা হয়েছে।”
আব্দুর চৌধুরী আব্বা আর মেজ ভাইকে দেখিয়ে বলেন,
“দেখলে তোমরা? কত বড় বেয়াদব হয়েছে এই ছেলে? এই দুটো বেয়াদব ছেলের সাথে দুটো বাচ্চা মেয়ের বিয়ে দিয়ে কত বড় ভুল করেছ তোমরা বুঝতে পারছ?”
অর্ণ নাক-মুখ কুঁচকে সিঁড়ি দিকে হনহন করতে করতে চলে গেল। মাশফিক চৌধুরী ভাইকে শান্ত করতে বললেন,
“তুই কী শুরু করেছিস বল তো? নাজনীন আর অর্ণকে দেখলে এমন করে ক্ষেপে যাস কেন? মেয়ে দুটো কী সুখে নেই?”
কাটা গায়ে যেন নুন লাগল তার। আব্দুর চৌধুরী বরাবরই খানিক গরম মেজাজের। মন মতো কিছু না হলে তার সেই জিনিসের প্রতি খুঁতখুঁত এজীবনে শেষ হওয়ার নাম নেবে না।
তিনি ভাইয়ের ছেলে হিসেবে দুজনকে বেশ পছন্দ করলেও মেয়ের জামাই হিসেবে মোটেও পছন্দ করেন না। বলা চলে যেমন জামাই মেয়েদের জন্য চেয়েছিলেন তার ধারের কাছেও নেই একজনও।
কায়নাত নিশার সাথে ওর ঘরে আসার পর কাল থেকে ঘটে যাওয়া সব কাহিনি শুনেছে নিশার থেকে। কায়নাত অবাক হয়েছে শেহেরের কথা শুনে। তারপর জয়ার কাণ্ড দেখে মুখ কুঁচকে নিয়েছে। ওটুকু মেয়ে কি পাঁকা পাঁকা কাণ্ড গুলোই না করে বাবাহ! ওকে নিয়ে যে নাজনীন সংসার করছে সেটাই তো ওই মেয়ের কপাল। অমন অর্ধেক পাগল মানুষ নিয়ে কে সংসার করতে চায়? কায়নাত ভাবল একবার জয়ার সাথে দেখা করা উচিত। ছোট বোনটা বাড়ি এসেছে দুদিন; অথচ এখন অব্দি মেয়েটার সাথে ভালো করে দুটো কথা বলা হয়নি। কায়নাত নিশার ঘর থেকে বেরিয়ে গেস্ট রুমের সামনে গেল। দরজায় নক করার খানিক বাদেই জয়া এসে দরজা খুলে দিল। বিছানায় নাজনিন পা গুটিয়ে বসে আছে। কায়নাত তাকে দেখে আঁচল ঠিক করে ঘরে প্রবেশ করল। বসল বিছানায়। বোধহয় নাজনীনের সাথে তার দৃষ্টি মিলিত হলো স্বল্প।
“ভালো আছেন?”
নাজনীন কায়নাতের প্রশ্নে মৃদু স্বরে বলে,
“আছি। কেমন কাটল তোমার দিন?”
কায়নাত মুচকি হাসল। বলল,
“খারাপ কাটবে কেন? এত সুন্দর সোনায় মোড়া সংসারে কেউ সুখী না থেকে থাকতে পারে?”
“বেশ ভালো। তোমার পড়াশোনার কী অবস্থা? দাদাজান বলছিলেন এইচএসসি পরীক্ষাটা তুমি খুলনা চৌধুরী বাড়ি থেকে দেবে।”
কায়নাত খানিক্ষণ ভেবে বলল,
“হয়তো চৌধুরী বাড়ি যাওয়া হবে না। আমার এই সময়ে মায়ের কাছে থাকার কথা ছিল, অমন অসুস্থ শরীর নিয়ে একা কাজ করতে বোধহয় বড্ড কষ্ট হয় তার। ভাবছিলাম পরীক্ষার মাস খানিক আগেই মির্জা বাড়ি যাব।”
নাজনীন কপাল কুঁচকে ফেলল। এসব ব্যপার তার জানা নয়। কদিন আগে গ্রামে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। অর্ণ যেহেতু সব ব্যবস্থা করে এসেছে তাই কথা হয়েছিল পরীক্ষাটা চৌধুরী বাড়ি থেকেই দেয়া হবে। তা-ছাড়া সোহেল মির্জাকে দিয়ে মোটেও ভরসা নেই। মেয়েটার সাথে আবার কী করবে না করবে বলা যায় না। তবে কিছু বলাও তো যায় না, মেয়েটারও ইচ্ছে হয় মায়ের কাছে থাকার।
জয়া বিছানায় উঠে কায়নাতের শরীর ঘেঁষে বসল। বাচ্চাদের মতো ওকে খোঁচা মেরে বলল,
“ তুই যাবি এবার আমাদের সাথে?”
কায়নাত বলল,
“এত ঘনঘন যাওয়া ঠিক নয়। তা-ছাড়া তোর ভাই এখন যেতে দেবেন না। কটা দিন যাক, পরীক্ষার আগ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।”
নাজনীন উঠে দাঁড়াল বিছানা ছেড়ে। ভাবল দুই বোনকে একটু একা ছাড়া উচিত। সে ঘর থেকে যাওয়ার পর জয়া লম্বা শ্বাস টেনে কায়নাতের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। কায়নাত মুচকি হেসে ওর মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বলল,
“কী শুনছি এসব? ভুয়া খবর রটাচ্ছিলি কেন?”
জয়া বলল,
“আমি সত্যি ভেবেছিলাম।”
“এসব পাগলামো ছেড়ে মন দিয়ে পড়। যাকগে, মা কেমন আছে? তিনি কেন আসলেন না?”
“ভালো আছে সে। বড় ভাবিকে একা রেখে আসতে চায়নি বলে থেকে গেছে।”
“আমাকে দেখতে চাননি তিনি?”
জয়া ঠোঁট টিপে ধরল। সত্যি বলতে লতা বেগম তেমন কোনো ইচ্ছা পোষণ করেননি বলেই তাকে বেশি জোর দেয়া হয়নি। কায়নাত আর প্রশ্ন করল না। বোনের চুলে হাত বুলিয়েই বলল,
“সংসার কেমন চলছে?”
জয়া চুপটি করে খানিকক্ষণ ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। কী উত্তর দেবে সেটা বোধহয় তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল না। কায়নাত সময় দিল। জয়া বলল,
“মনে হচ্ছে কোনো পুতুল খেলায় আমাকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। বুঝতেই পারছি না, সংসার করছি নাকি পুতুল খেলার মতোন শুধু নেচেই যাচ্ছি।”
“এমন মনে হওয়ার কারণ?”
“কোনো কারণ নেই। অদ্ভুত অদ্ভুত অনুভূতি হয় মাঝে মধ্যে। এই ধর সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের কাজ-বাজ সেরে পরিষ্কার হয়ে কলেজে যাচ্ছি, উনি গিয়ে কলেজ থেকে নিয়ে আসছেন, খাচ্ছি-দাচ্ছি আর উনার সেবা করছি। এর বাইরে কোনো কিছু হচ্ছে না।”
“আর কী চাই?”
জয়া চোখ তুলে কায়নাতের শান্ত বদন খানায় দৃষ্টি বুলিয়ে বলে,
“আমার কথা রাখ, তোর কোনো ইচ্ছে নেই?”
কায়ানাতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ধীরস্থিরভাবে বলল,
“ইচ্ছে নেই কে বলেছে? অবশ্যই আছে। দেখ জয়া, জীবনের পথটা অনেক দীর্ঘ। এই পথে রোদ-বৃষ্টি, সুখ-দুঃখ সব মিলিয়েই আমাদের এগোতে হয়। আমি ভবিষ্যতে নিজেকে এমন একটা শক্ত অবস্থানে দেখতে চাই, যেখানে দাঁড়িয়ে আমার পরিবার গর্ব করে বলতে পারবে— কায়ানাত সুবাহ শুধু চৌধুরী বাড়ির বড় বউ নয়; সে একজন আদর্শ মা, আদর্শ স্ত্রী এবং সব গুনে গুণান্বিত একজন নারী।”
জয়া মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনল। বোনের ভাবনা-চিন্তার সাথে তার মানসিকতা আকাশ সমান তফাত। জয়া বলল,
“তুই খুব খুশি তাই না?”
কায়নাত উত্তর না দিয়ে উঠে খোলা জানালার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে আজ বড্ড বাতাস। প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়ার মতোন শান্তি সেই বাতাসে। মেয়েটার চোখ গেল আঁধারে ঢাকা শহরের দিকে। চোখের কোণায় অল্প-স্বল্প পানি জমলো বোধহয়।
“আমার জীবন বাকি ৫ টা মেয়ের মতো নয়। শুনেছি আমার বাবা ইন্তেকাল করার পর মা তোর বাবাকে বিয়ে করেছিলেন। তারপর থেকে পালক সন্তান হয়ে বড় হয়েছি মির্জা বাড়ি। সেখানে একমাত্র মায়ের কোল ছাড়া কারোর কাছে একটুখানি ভালোবাসা পাইনি আমি। কেউ আদর করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেনি, ‘কায়নাত, ভালো আছিস?’ শুধু মাত্র মায়ের কোলে একটুখানি শান্তি খুঁজে পেতাম। সে কখনো বুঝতেই দেয়নি, আমাকে যে সে পেটে ধারণ করেননি।”
কায়নাত পিছু ফিরে দাঁড়াল। দেয়ালের সাথে হ্যালান দিয়ে জয়ার চোখে চোখ রেখে বলল,
“তুই তো বড় বংশের মেয়ে। কখনও কী অভাবের মুখ দেখেছিস? এই আমি, এমনও দিন গেছে দু’বেলা পেট ভরে খেতে পারিনি। দুটো কাপড় দিয়ে পুরো বছর পাড় করে দিয়েছি। আজ আমার সেই আগের মতো পরিস্থিতি নেই। ভালোবাসার অভাব নেই। শ্বশুর বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ বউ কম নিজেদের মেয়ে বেশি মনে করেন। তোর ভাই, মানুষটাকে প্রথম প্রথম বড্ড কঠিন মনে হয়েছিল। ভেবেছিলাম আমার সংসার বুঝি হবে না লোকটার সাথে। কিন্তু দিন শেষে কী হলো? লোকটা আমি বলতে পাগল। এবার বল, আমি সুখী হব নাতো কে হবে? এমন কপাল নিয়ে কজন মেয়ের জন্ম হয়েছে?”
কায়নাতের ঠোঁটের কোণায় হাসি দেখেও জয়ার হাসি পেল না। মুখটা ভার করে তাকিয়ে রইল বোনের দিকে। ওই ঠোঁটে লেপ্টে থাকা হাসির পেছনে কত দীর্ঘশ্বাস, কত কষ্ট, কত নির্ঘুম রাতের যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে—সেটা উপর ওয়ালা ছাড়া আর কে জানেন?
জয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল। গমগমে গলায় বলল,
“নাটক করিস না আমার সামনে। কাঁদতে ইচ্ছে হলে কাঁদ। অমন করে দুঃখ চেপে রাখলে কষ্ট দ্বিগুণ হয়।”
কায়নাতের ঠোঁট ভেঙে এলো। ঝাঁপসা চোখে জয়াকে দেখে দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতে বসল। বুকে হাত দাবিয়ে বলল,
“মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে আমার। ইচ্ছে করছে ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরতে।”
জয়া আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আম্মার কথা বলছিস?”
কায়নাত ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“তোর আম্মা নয়, আমার মাকে। যে মানুষটা আমায় সারাটা জীবন বুকের মধ্যে আগলে রেখেছে সেই মানুষটাকে।”
(ভালো আছো পাখিরা?)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫০