Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮৬


প্রণয়ের_রূপকথা (৮৬)

সকাল সকাল বাবা-ছেলের চোখাচোখি হলো। দুজনেই বের হয়েছে মর্নিং ওয়ার্কে। একে অপরকে দেখে কিছু সময় চুপ রইল। তারপর পায়ে পা মিলিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। কিছু দূর যাওয়ার পর দীপ্র বলল,”তুমি অস্বাভাবিক আচরণ করছো বাবা।”
ছেলের এহেন কথার মানে দবীর জানেন। পুরো বুঝেন। এই ছেলে মাঝেমাঝে কেমন বেয়াদব হয়ে যায়। অথচ, তিনি জানতেন, ওর থেকে ভদ্র মানুষ দুটো নেই।
“স্বাভাবিক হও।”
“অস্বাভাবিক হওয়ার মতন কাজ করলে, মানুষ তো অস্বাভাবিক হবেই।”
ছেলের কথার কঠিন জবাবটি দিলেন দবীর। জবাবে দীপ্র বড়ো উদাসীন সুরে বলল,”ভুল সময়ে, এন্ট্রি নিয়েছ।”
দবীর খানিক চুপ রইলেন। তারপর বলতে গেলেন,”তুমি ভুল জায়গায়….
এই অবধি বলে থেমে গেলেন তিনি। ছেলে তার নির্লজ্জ হতেই পারে। তবে তার উচিত লজ্জা ধরে রাখা। তিনি আর জবাব দিলেন না। দম আটকে সামনের পথে হাঁটতে লাগলেন।
বাড়ির ভেতরের কাজ গুলো বেশ কদিন ধরেই করা হচ্ছে। তবে সকাল থেকে কাঁচা ফুল লাগানো শুরু হয়েছে। বাবা-ছেলে হাঁটাহাঁটি করে ফিরলে, জেবা হন্তদন্ত হয়ে বললেন,”তোমাদের দুজনকে নিয়ে পারি না। বাড়িতে এত কাজ। ছেলে মানুষ ছাড়া চলে নাকি। ওরা তো হিমশিম খাচ্ছে। আজ হাঁটাহাঁটি না করলে হোতো না?”
দীপ্র চেয়ার টেনে খাবারের টেবিলে বসল। মা আপাতত যাই বলুক সে কানো নিবে না। কিছুতেই না। কুহু আগে থেকেই বসা ছিল। তার প্লেটে পরোটা আর ডিম ভাজি। ছেলেটা কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই, ওর প্লেট থেকে খাবার খাওয়া শুরু করল। যদিও বিষয়টি নিয়ে কেউ কিছু বলল না। তবু, পরিবেশে একটা শীতল, চাপা হাওয়া বয়ে গেল।
খাবার খাওয়া শেষ হলে, দীপ্র চলে গেল নিজের রুমে। কুহু কী করবে বুঝতে পারছে না। সন্ধ্যায় তার হলুদের অনুষ্ঠান। রাত্রি, কণা দুটিতেই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। ওর কেমন একা একা লাগছে। ও হাঁটতে হাঁটতে উঠান ঘরে আসতেই, জেসমিনের দেখা। বড়ো পিলারের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে গান গাইছে। কুহুকে দেখেই দাঁত কেলিয়ে হাসল।
“আপামনি, আপনি দেহি এহানে। মুখে কিছু দেন নাই।”
“মুখে, কী দিব?”
কুহু ভ্রু বাঁকিয়ে বলল কথাটা। ও বুঝেনি জেসমিনের কথা। জেসমিন ফের হেসে বলল,”হায়, হায়। এরেই মনে হয় কয়, যার বিয়া তার হুস নাই। পাড়া প্রতিবেশির ঘুম নাই।”
কুহু ওভাবেই চেয়ে রইল। জেসমিন বলল,”ঐ দিক চান।”
ওর কথা মতন পাশ ফিরল কুহু। দেখতে পেল, করিডোর জোরে আসন পাতা হয়েছে। সেখানে রাত্রি, কণা, আর হেরা আধ শোয়া হয়ে আছে। মুখে, ফেস প্যাক। চোখে, শসার টুকরো। ওদের পাশে আরো একজনকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই একজনটিকে ঠিক চিনতে পারছে না ও। ওর ভ্রু কুঁচকে যায়। পায়ের কদম বাড়ায়। পরপরই বুঝে যায় এটা আবির। ও চ্যাঁচিয়ে ওঠে।
“আবির ভাইয়া!”
আবির বেচারা আয়েশ করে ঘুমিয়েই পড়েছিল। কুহুর ডাকে হুড়মুড় করে ওঠে। চোখে থাকা শসার টুকরো পড়ে যায় মেঝেতে। কুহু কোমরে হাত দিয়ে বলে,”এটা তুমি! কী করেছ!”
আবির দাঁত কেলিয়ে হাসে। বলে,”রূপচর্চা।”
ওর কথার বিপরীতে কিছু বলার আগেই, অদূর থেকে দীপ্রর গলা শোনা যায়। ছেলেটি এগিয়ে এসে বলে,”কী রে ছাগল। এসব কী?”
“কেন জানিস না?”
দীপ্র মাথা দুলিয়ে বলে,”না। জানি না। তুই বল। আমি শুনি।”
“এসব হলো রূপচর্চা। তুই ও আয়। দেখবি সন্ধ্যায়, একদম ঝকঝকে তকতকে লাগছে।”
এ কথা বলে, দীপ্রকে ফেসপ্যাক লাগাতে গেলেই দীপ্র হাত উঁচু করে বাঁধা দেয়। বলে উঠে,”এসব আমার লাগবে না। তুই ই লাগা।”
ও চলেই যাচ্ছিল। আবির এবার কুহুর দিকে আগায়। বলে,”ওর না লাগুক। কুহু তোকে লাগিয়ে দিই।”
ঠিক সে সময়েই বড়ো হাতের দ্বারা কুহুকে পাশে টেনে আনে দীপ্র। গায়ের সাথে মিশিয়ে বলে,”দূরে যা। আমার বউ এমনিতেই সুন্দর। এসব লাগাতে হবে না।”
বউ শব্দটি শুনেই কুহুর ভালো লাগে। ও দীপ্রর সাথে মিশে থাকে। খানিক লজ্জা ও পায়। ওদিকে দীপ্রর এ কথায় বোধকরি, মেয়ে সমাজের হৃদয়ে আঘাত হানে। পরপর তিনটি মেয়ে চোখে থাকা শসার টুকরো সরিয়ে ফেলে। এক যোগে বলে উঠপ,” তার মানে আমরা সুন্দর না? এটা বলতে পারলে তুমি?”
দীপ্র খানিক চেয়ে রইল। এই হলো মেয়ে জাতির সমস্যা। দু লাইন বেশি না বুঝলে হয় না। ও এসব ভাবতে একটু সময় নেয়। তারপরের মুহূর্তেই চোখ ছোট ছোট করে বলে,”মুখে এসব কী লাগিয়েছিস তোরা। ভূতের মতন লাগছে। সে যাই হোক, আমার বউকে এসব লাগাবি না। না হলে সব কটার খবর আছে।”
ছেলেটি কথা শেষ করে চলে যায়। কুহু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকক। চেয়ে থাকে বাকি মানুষ গুলোও।
দুপুরের পর থেকে কমছে কম, আঠারো বার চা বানানো হয়েছে। যতবার ই আত্মীয়দের আগমন হয়েছে, ববিতাকে চায়ের পানি বসাতে হয়েছে। তিনি একদম দম ফেলার ফুসরতে নেই। বিকালের এই শেষ প্রহরে তিনি একটু বসার সুযোগ পেলেন। তখনই আগমন হলো ওনার শাশুড়ির। তাকে আসতে দেখে, তিনি ওঠতে চাইলে হাত বাড়িয়ে নিষেধ করলেন বৃদ্ধা। ববিতা থামলেন। শাশুড়ি এসে পাশে বসলেন। বললেন,”সারাদিন খুব কাজ করতেছ ছোট বউ।”
“তা তো একটু করা লাগবেই আম্মা। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের অনুষ্ঠান বলে কথা।”
বৃদ্ধার মনটা একটু খারাপ বটে। তিনি দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে বললেন,”একটা কথা বলার ছিল। খারাপ ভাবে নিবা না তো?”
“আম্মা, এভাবে বলছেন কেন? খারাপ ভাবে নিবই বা কেন? আপনি বলেন না আম্মা।”
বৃদ্ধা একটু সময় নিলেন। কেমন যেন ইতস্তত বোধ করছেন। ববিতার দীর্ঘ সাংসারিক জীবনের, সুখ দুঃখের সঙ্গী এই বৃদ্ধা। তাই হয়তো তার মন পড়তে অসুবিধা হলো না। তিনি বৃদ্ধার হাত ধরে বললেন,”আপনি চিন্তা করবেন না আম্মা। আমি কল করব মেজো ভাইজানদের।”
বৃদ্ধার চোখ থেকে পানি নেমে এলো। তিনি সেই পানি টুকু না মুছেই বললেন,”আপন জন রেখে অনুষ্ঠান ভালো না ছোট বউ। না হলে, বলতাম না। ঘরের মানুষ, ঘরে নাই। ভালো লাগে বলো? আর আমি তো মা।”
“আপনাকে এত বলতে হবে না আম্মা। আমি বুঝতে পারি।”
বলে আশ্বস্ত করলেন তিনি। পরপরই চলে গেলেন কল করতে। যদিও তিনি জানেন না, ওরা আসবে কি না। তবে শেষ দায়িত্ব টুকু তিনি ঠিকই পালন করবেন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply