#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৫৭
সুড়ঙ্গের মুখের সামনে গিয়ে দেখলো সুনেহেরা। সিড়ি দিয়ে চিনির দানা পড়ে আছে। পিঁপড়া লেগে আছে তাতে সারি সারি। সুনেহেরা ভাবলো হয়তো শস্য মজুদ রাখার গোপন গুদাম হবে। এই ভেবে কাওকে জানালো না। কিন্তু এটা বন্ধ করে কি দিয়ে? চাপকল এর হাতল ধরে ফের চাপ দিতেই সেটা আবার বন্ধ ও হয়ে গেল। কী অদ্ভুত জিনিস।
সকালের নাস্তা শেষ করে আর বাগানবাড়িতে বসে থাকা গেল না। এত দূর এসে শুধু ঘরের ভেতর বসে থাকলে কি চলে? সম্রাটের পাঠানো স্থানীয় কয়েকজন পথপ্রদর্শক আসলো তাদের ভ্রমণে পথ চিনতে অসুবিধা যাতে না হয়। তাদের নেতৃত্বেই বের হলো সাহাবাদের রাজপরিবার। শীতের সকাল, নীল আকাশ, চারপাশে পাহাড় আর সবুজ বনভূমি। পথে যেতে যেতে জান্নাত সুনেহেরার হাত ধরে লক্ষী বাচ্চার মত হাটলেও ছোট বিচ্ছু টা বড্ড জ্বালাচ্ছে। যা দেখবে পথে তা ই তার চাই। না দিলে সুনেহেরার হাত ধরে ঝুলে পড়ছে। শাখা আবার বাবার কাঁধে বসে পাহাড় দেখছে মুগ্ধ হয়ে। অনেকটা পথ যাওয়ার পর তারা পৌঁছালো ঝরনার কাছে। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসছে সাদা পানির ধারা।
সূর্যের আলো পড়ে পানির কণাগুলো হীরের মতো ঝলমল করছে। জান্নাত আনন্দে চিৎকার করে উঠলো।
“আম্মা! দেখো! আকাশ থেকে পানি পড়ছে!”
সুনেহেরা আর জান্নাত কিছুক্ষণ পরই জুতো খুলে পানিতে নেমে গেল। দুজনের পানি ছিটাছিটি দেখে শাখাও পানিতে নেমে পড়লো। সাহারা কোল থেকে হাত-পা ছুড়ছে সে ও নামবে পানিতে। অতটুকু ছোট পটল পানিতে নামলে যাবে তলিয়ে। সে ভাবনা কি আছে তার? আবি সাহারা কে নিয়ে অন্যদিকে গেল যাতে ওদের দিকে চোখ ও না যায় আর বায়নাও না করে।
সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। বাইজিদ চুপচাপ মেহেরুন্নেসার হাত ধরে একটু দূরে নিয়ে গেল।
পাহাড়ের ঢালে একটা বড় পাথরের ওপর গিয়ে বসল তারা। নিচে ঝরনা দূরে বন। চারপাশে পাখির ডাক। মেহেরুন্নেসা লাজুক হেসে বলল
“আপনার ছেলে মানুষী গেল না আর”
বাইজিদ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল
“মানুষ মাত্রই ভুল প্রিয়তমা। তোমাকে দেখার আগে আমিও ভাবতাম, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস বোধহয় ফল।”
“আর এখন?”
বাইজিদ দুই হাত গোল করে মুখে দিয়ে বলল
“দেখো ফুলেরা। আমার মেহের এর সৌন্দর্যের কাছে তোমার রঙ ও ফিকে।”
মেহেরুন্নেসা মাথা রেখে দিল তার কাঁধে। অনেকক্ষণ তারা নীরবে বসে রইলো। কিছু কিছু মূহূর্তে কথার প্রয়োজন পড়ে না আসলে। একে অপরকে অনুভব করাটাই ভালোবাসা।
আবিদের মন আজ অদ্ভুত ভালো। ভীষণ ভালো।
চন্দ্রপ্রভা এখন স্বাভাবিক আচরণ করে তার সাথে। বেশ গিন্নি হয়ে উঠেছে। সংসার সামলাচ্ছে, বাচ্চা সামলাচ্ছে। চন্দ্রা শাখাকে নিয়ে হাঁটছে।
দূর থেকে সেটা দেখে আবিদের বুকের ভেতর প্রশান্তির হাওয়া বইতে লাগলো। অবশেষে সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। চন্দ্রা তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছে। এই ভাবনাটুকুই তাকে অসম্ভব সুখী করে তুললো।
সারাদিন পাহাড়, ঝরনা, বনভূমি ঘুরে যখন তারা বাগানবাড়িতে ফিরলো, তখন সূর্য প্রায় ডুবে গেছে। সবাই ক্লান্ত। জান্নাত তো ঘোড়ার গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সাহারার চোখও আধবোজা। শাখা মায়ের কোলে মাথা রেখে বসে আছে।
বাগানবাড়ির সামনে পৌঁছাতেই বাইজিদের কপাল কুঁচকে গেল। একজন রক্ষী দাঁড়িয়ে আছে। তার ঘোড়া হাঁপাচ্ছে। চোখে মুখে ধুলো। চেহারায় আতঙ্ক। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। রক্ষীটা দ্রুত নেমে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো।
“শাহজাদা!”
বাইজিদের বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠলো।
“কি হয়েছে?”
লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“কঠিন বিপদ শাহজাদা….সব্বনাশ হয়ে গেছে”
চারপাশের চমকে গেল। আনন্দের পরিবেশ উধাও। বাইজিদ উত্তেজিত হয়ে বলল
“হেয়ালি না করে বলো কি হয়েছে”
রক্ষী শুকনো ঢোক গিলে বলল
“মারজান… মারজান বেগম সাহাবাদ প্রাসাদে ফিরে এসেছে।”
সুনেহেরার মেরুদন্ড তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে গেলো।
চোখ দুটো জ্বলতে শুরু করেছে। বাইজিদের মুখ শক্ত হয়ে গেল। প্রহরী বুকে হাত দিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
“তিনি একা আসেননি। সাথে অনেক সশস্ত্র লোক ছিল। মহলের অনেক প্রহরীদের হত্যা করা হয়েছে…”
মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো এসব শুনে। রক্ষী মাথা নিচু করে ফেললো। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
“জমিদার বাকের শাহ্ কে বন্দি করেছে তারা।”
সবার মুখ হা হয়ে গেল। বাইজিদের চোখ হয়ে উঠলো কঠিন। এত বছর পর অবশেষে শয়তান আবার নিজের অস্তিত্বের জানান দিল।
বাগানবাড়ির বিশাল হলঘরে সবাই একত্রিত হলো। সুনেহেরা এদিক-ওদিক পায়চারি করছে।
তার চোখে স্পষ্ট রাগ।
“আমি বলেছিলাম না? ওই ডাইনী আবার ফিরবে।”
বাইজিদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথার ভেতর হিসাব চলছে। মারজান হঠাৎ এত সাহস পেল কোথা থেকে? পাঁচ বছর কোনো খবর নেই।
কোনো হামলা নেই। কোনো বার্তা নেই। আর হঠাৎ এসে সরাসরি সাহাবাদ প্রাসাদ দখল? বিষয়টা যতটা সহজ দেখাচ্ছে, ততটা সহজ নয়।
আবিদ নিচু গলায় বলল,
“শাহজাদা, আমরা কি আজ রাতেই রওনা হবো?”
বাইজিদ মাথা নাড়লো।
“না। রাতে বাচ্চাদের নিয়ে নদীপথে যাত্রা করা ঠিক হবে না। ভোর হতেই রওনা হবো।”
তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল
“আজ রাতেই সব প্রস্তুতি শেষ করা হবে।”
সারারাত আর কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারলো না।
মেহেরুন্নেসা জান্নাত আর সাহারাকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে ছিল। দুই মেয়েই কিছু বুঝতে না পেরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। তাদের নিষ্পাপ মুখ দেখে বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠছে তার। এদিকে সুনেহেরা সারারাত জানালার পাশে বসে। চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। চেয়েছিলো রাতেই রওনা হতে। কিন্তু বাইজিদ অনুমতি দেয়নি। ভোর হওয়ার আগেই সবাই গোছগাছ শুরু করলো।
প্রহরীরা মালপত্র গুছিয়ে ফেলেছে। ঘোড়ার গাড়ি প্রস্তুত জাহাজও তৈরি। বাইরে পুরোপুরি আলো হয়নি। শীতের কুয়াশায় এমনিই চারিদিক ঝাপসা। তারা ঘাটে যাওয়ার পর আমিরাবাদের সম্রাট নিজে বিদায় জানাতে এলেন। বয়সী মানুষ। মুখে রাজকীয় গাম্ভীর্য। তিনি এগিয়ে এসে বললেন
“দুঃখজনক সময়ে আপনাদের ফিরে যেতে হচ্ছে। খবরটা শুনেছি আমি। যেকোনো সহযোগিতায় আমাকে খবর পাঠাবেন”
বাইজিদ সম্মানের সাথে মাথা নত করলো।
“পরিস্থিতি বাধ্য করেছে মহামান্য।”
সম্রাট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আশা করেছিলাম আরও কিছুদিন থাকবেন।”
“আমরাও তাই চেয়েছিলাম।”
মেহেরুন্নেসা মৃদু হাসলো। হাসিতে আনন্দ নেই শুধু ভদ্রতা। সম্রাট জান্নাতের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন। সাহারাকেও আদর করলেন।
ছোট্ট শাখা তখনো আধো ঘুমে মায়ের কোলে।
অবশেষে বিদায়ের সময় এলো। বিশাল জাহাজে উঠতে লাগলো সবাই। সেদিন যখন তারা এসেছিল, তখন কত খুশি ছিল বাচ্চারা। নতুন জায়গা দেখার আনন্দ নতুন অভিজ্ঞতার উত্তেজনা। আজ ফিরছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সম্রাট হাত নাড়ছেন।
বাগানবাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
জান্নাত বিষণ্ন মুখে বলল,
“আমরা আবার কবে আসবো?”
মেহেরুন্নেসা মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
“ইনশাআল্লাহ।”
তার নিজেরই ধারণা নেই সামনে কী অপেক্ষা করছে। জাহাজ ধীরে ধীরে আমিরাবাদের ঘাট ছেড়ে সাহাবাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো।
উত্তাল নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলেছে বিশাল জলযান। বাইজিদ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে আছে। মাহাদি প্রাসাদে আছে বলেই অন্তত একটা স্বস্তি কাজ করছে। যতদিন মাহাদি জীবিত, সাহাবাদের পতাকা এত সহজে নামবে না। তবুও বুকের ভেতর অজানা একটা অস্বস্তি আসে। পাঁচ বছর ধরে যে শত্রু নিঃশব্দে অদৃশ্য ছিল সে হঠাৎ ফিরে এসেছে। আর কোনো শত্রুই কারণ ছাড়া ফিরে আসে না। না জানি কতবড় ষড়যন্ত্র নিয়ে এসেছে এই মহিলা। দীর্ঘ নদীপথ, তারপর স্থলপথ। একটার পর একটা দিন কেটে গেল যাত্রার মধ্যেই।
শুরুতে সবাই আশা করেছিল দ্রুত পৌঁছে যাবে যেমনটা দুইদিনেই চলে এসেছিল। কিন্তু শীতের কুয়াশা, নদীর স্রোত আর পথের নানা বাধার কারণে সময় লেগে গেল প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।
পুরো পথ জুড়েই অস্থির ছিল সবাই। বিশেষ করে সুনেহেরা।
অবশেষে ৩ দিন পর বিকেলে দূরে সাহাবাদের পরিচিত মিনারগুলো চোখে পড়লো। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা জান্নাত আনন্দে চিৎকার করে উঠলো
“ওই যে আম্মি, আমাদের বাড়ি!”
কিন্তু তার সেই আনন্দ স্থায়ী হলো না। কারণ একটু একটু করে কাছে আসতেই সবার মুখের রঙ বদলে যেতে শুরু করলো। এটা কি সত্যিই সাহাবাদ? প্রাসাদের চূড়ায় সাহাবাদের পতাকা নেই। তার বদলে উড়ছে কালো রঙের অচেনা পতাকা। মূল ফটকের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীদের কাউকেই চেনে না তারা। অচেনা মুখ। অচেনা পোশাক অচেনা অস্ত্র। বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা দুই মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিল। সুনেহেরার চোখ সরু করে বলল
“এরা কারা?”
ঘোড়ার গাড়িগুলো প্রাসাদের সামনে এসে থামলো। বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে গেল। পুরো প্রাসাদ যেন বদলে গেছে। দরবারের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক ডজন সশস্ত্র সৈন্য।
দরজায় দরজায় পাহারা। প্রাচীরের ওপর তীরন্দাজ। এমনকি বাগানেও সশস্ত্র লোকজন টহল দিচ্ছে। যেন এটা কোনো রাজপ্রাসাদ নয় একটা দখলকৃত দুর্গ। জান্নাত ফিসফিস করে বলল
“আম্মা… এরা কারা?”
মেহেরুন্নেসা উত্তর দিল না। তার নিজেরই উত্তর জানা নেই। বাইজিদ সামনে এগিয়ে গেল। প্রাসাদের বিশাল দরবার কক্ষে প্রবেশ করতেই সবাই আশ্চর্য হয়ে গেলো। নিঃশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ হয়ে এলো। সাহাবাদের সিংহাসনে বসে আছে মারজান। রাজকীয় পোশাক। মাথায় মুকুট।
যেন সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন অবশেষে এসেছে।
তার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সৈন্য। মেহেরুন্নেসার চোখে আগুন জ্বলে উঠলো।
সুনেহেরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“পিশাচিনী!”
মারজান শুধু হাসলো। একটা দীর্ঘ, তাচ্ছিল্যপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল
“স্বাগতম। অবশেষে ফিরলে তোমরা। আমি তো ভেবেছিলাম মরে টরে গেছো”
তার চাইতেও ভয়াবহ ছিল পরবর্তী দৃশ্য খানা।
সুনেহেরা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলো না। মুখের রঙ হারিয়ে গেল। মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো। আবিদ ও হতভম্ব।
এমনকি বাইজিদও কয়েক মুহূর্ত কথা হারিয়ে ফেললো। মারজানের ডান পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাহাদি।
সম্পূর্ণ সুস্থ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক সেনাপতির পোশাকে। হাতে তলোয়ার। সে পাহারা দিচ্ছে মারজানকে। সুনেহেরার ঠোঁট কাঁপতে লাগলো।
“মা… মাহাদি?”
পুরো দরবার নিস্তব্ধ। মাহাদি একবারও চোখ সরালো না। একবারও এগিয়ে এলো না। একটা বারও কথা বললো না সুনেহেরার সাথে ।যেন সে সবসময় মারজানের পক্ষেই ছিল। সুনেহেরার বুকের ভেতর আকাশ ভেঙে পড়লো।
“মাহাদি…”
ফিসফিস করে ডেকে উঠলো সে। এবার মাহাদি তাকালো। তাদের চোখে চোখ পড়লো। কিন্তু মাহাদির মুখে কোনো আবেগ নেই। কোনো অনুশোচনা নেই।বকোনো ব্যাখ্যাও নেই কেন সে এই কাজ টা করছে। কেন সে বাইজিদ এর বিরোধিতা করছে?
মারজানের ঠোঁটের কোণে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠলো। সিংহাসনের হাতলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলল,
“কী হলো? এত অবাক হচ্ছো কেন? আমি তো বলেছিলাম…”
তার চোখ গিয়ে থামলো সুনেহেরার ওপর।
“এই রাজ্য আমার। সম্রাজ্ঞী আমি। কী ব্যাপার আমার ছোট রাজকুমারী। একবার সিংহাসনে বসবে নাকি হুমমম?”
সুনেহেরা দাঁতে দাঁত পিষে ক্রোধ নিয়ে বলল
“ওটা একটা সম্মানিত পবিত্র আসন। কোনো পিশাচিনী কে মানাচ্ছে না ওখানে। এখুনি সরে যাও বলে দিলাম।”
মারজান রেগে ফুলদানি ছুড়ে মারে সুনেহেরা কে। সুনেহেরা সরে যেতেই সেটা অদূরে পরে খটখট শব্দ তুলে।
“তোর তো কৈ মাছের প্রাণ রে। তিন তিন বার মারার চেষ্টা করলাম তবুও মরলি না?”
সুনেহেরা তাকিয়ে আছে মাহাদির দিকে। কী আশ্চর্য! সুনেহেরা কে আঘাত করা হচ্ছে তবুও মাহাদি কিছু বলছে না? এখন তো বিশ্বাস ই করতে পারছে না এটা মাহাদি। যে মানুষটা নিজের জীবন বাজি রেখে বহুবার সাহাবাদকে রক্ষা করেছে। যে মানুষটার জন্য সে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে। সেই মানুষ টা আজ মারজানের পাশে দাঁড়িয়ে। বাইজিদের চোখও স্থির হয়ে আছে মাহাদির দিকে। কিন্তু এখন আবেগ দেখানোর সময় নয়। পরিস্থিতি ভয়াবহ। মারজান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“দেখা তো হয়ে গেল। এবার তোমরা যেতে পারো।”
মেহেরুন্নেসা ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এলো।
“ বাবাকে কোথায় রেখেছো?”
মারজান হেসে উঠলো।
“খুব নিরাপদ জায়গায়। তবে তোমরা যদি বুদ্ধিমানের মতো আচরণ না করো, নিরাপত্তা কতক্ষণ থাকবে বলতে পারছি না।”
বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। তলোয়ার বের করতে তার এক মুহূর্তও লাগবে না।
কিন্তু সমস্যা একটাই, বাকের শাহ্ বন্দি ওই শয়তানির হাতে। মারজানের হাতে এখন সবচেয়ে বড় ঢাল।
প্রাসাদের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে অন্দরমহল পর্যন্ত সর্বত্র সৈন্য মোতায়েন।
সংখ্যায় এত বেশি যে সরাসরি আক্রমণ মানে আত্মহত্যা। আর আক্রমণ শুরু হলেই প্রথম আঘাতটা পড়বে বাকের শাহ্ এর ওপর। এই ঝুঁকি কেউ নিতে পারবে না। অগত্যা সেদিনই সাহাবাদের রাজপরিবারকে প্রাসাদ ছাড়তে হলো।
নিজেদেরই প্রাসাদ নিজেদেরই রাজ্য তবু তারা সেখানে থাকতে পারলো না। জান্নাত বুঝতে না পেরে কাঁদতে লাগলো।
“আমরা আমাদের বাড়িতে যাবো না?”
মেহেরুন্নেসা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিল।
কোনো উত্তর দিল না। বিকেলের দিকে সবাই চলে এলো উত্তরের পুরোনো প্রাসাদে। যে প্রাসাদ একসময় অঙ্কুরের ঘাঁটি ছিল। বহু বছর ধরে গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন সেটাই তাদের আশ্রয়। প্রাসাদে পৌঁছেই সবাই কাজে লেগে গেল। নারীরা থাকার কক্ষ গুছাচ্ছে। প্রহরীরা পাহারা বসাচ্ছে। রান্নাঘর প্রস্তুত করা হচ্ছে। শিশুদের জন্য আলাদা কক্ষ ঠিক করা হচ্ছে। সাহারা আর জান্নাত অবশ্য এটাকে নতুন এক অভিযান ভেবে বেশ আনন্দই পাচ্ছে। শুধু বড়দের মুখের গম্ভীর ভাবটা বুঝতে পারছে না।
রাত নামতেই প্রাসাদের সবচেয়ে ভেতরের গোপন কক্ষে জড়ো হলো সবাই।
বাইজিদ, মেহেরুন্নেসা,সুনেহেরা,আবিদ। চন্দ্রা সব বাচ্চা দের সামলাচ্ছে। মিরানও খবর পেয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে। কক্ষের মাঝখানে বড় একটা মানচিত্র বিছানো হলো। সাহাবাদ প্রাসাদের প্রতিটি প্রবেশপথ চিহ্নিত করা। প্রহরীদের সম্ভাব্য অবস্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাকের শাহ্ কোথায়?
বাইজিদ সবার উদ্দেশ্যে বলল
“বাবাকে উদ্ধার না করে কোনো আক্রমণ হবে না।”
আবিদ সম্মতি দিল।
“ঠিক বলেছেন। প্রথমে বন্দিশালার অবস্থান জানতে হবে।”
মিরান দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল
“মারজান বোকা না। বাকের শাহ্ কে এমন জায়গায় রাখবে যেখানে অন্যান্য সৈন্য পৌঁছাতে পারবে না।”
সুনেহেরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
” খুঁজে বের করবো। মাটি খুঁড়তে হলেও খুঁজে বের করবো।”
মেহেরুন্নেসা অনেকক্ষণ চুপ ছিল। এবার ধীরে ধীরে বলল
“আমার মনে হয় আমাদের ভেতরের খবর দরকার।”
সবাই তার দিকে তাকালো।
“মানে?”
“প্রাসাদের ভেতরে কাওকে ঢুকতে হবে। কে কোথায় আছে, বাবাকে কোথায় রাখা হয়েছে, মাহাদি কেন মারজানের পাশে আছে সব জানতে হবে।”
কাজটা ভয়ংকর। ধরা পড়লে বাঁচার সম্ভাবনা নেই। মারজান নিজের কাছে থাকা এক থলি থেকে ঝপঝপ শব্দে একটা চাবির ছোড়া বের করলো। ছোট-বড় অসংখ্য চাবি তাতে। ফিচলে হেসে বলল
“ যা কেউ পারে না, তা মিরান পারে। এখানে কারাগারের প্রত্যেকটা শিকের চাবি আছে। আমি যাব বন্দিশালায়”
বাইজিদ টেবিলের ওপর রাখা মানচিত্রে আঙুল রাখলো।
“এখন প্রথম কাজ একটা, তা হলো আব্বাকে মুক্ত করতে হবে। তারপর যুদ্ধ পরিকল্পনা”
মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর কাঁধে হাত দিয়ে বলল
“মাহাদির বিষয়টাও জানা দরকার শাহজাদা”
বাইজিদ বাকা হাসলো। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল
“আমি মাহাদিকে বিশ্বাস করি। সে যা করবে তাতে এই রাজ্যের স্বার্থ ছাড়া দ্বিতীয় কিছু থাকবে না”
সুনেহেরা মুখ তুলে তাকালো। বাইজিদ আবার বলল
“যে মানুষ এত বছর সাহাবাদের জন্য জীবন দিতে প্রস্তত থাকে, সে হঠাৎ বিশ্বাসঘাতক হয়ে যাবে আমি সেটা মানতে পারছি না। ঘটনার আড়ালে অন্য কিছু আছে।”
সুনেহেরার চোখে ক্ষীণ আশার আলো ফুটে উঠেছে। এবারের যুদ্ধ শুধু সিংহাসনের জন্য নয়।
সাহাবাদের অস্তিত্ব আর বহু বছরের অন্ধকার ষড়যন্ত্রের শেষ অধ্যায়ের জন্য।
শেষ রাতের দিকে সবাই নিজেদের কক্ষে ফিরে গেল। আবিদের মাথা থেকে চিন্তাগুলো নামছে না। সাহাবাদের বর্তমান যে পরিস্থিতি, মারজানের হঠাৎ ফিরে আসা। আর সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মাহাদি। যে মানুষটাকে বিশ্বাসঘাতক ভাবতে মন সায় দিচ্ছে না। প্রভা জানালার পাশে বসে ছিল। শাখা আর সাহারা অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। জান্নাত ঘুমোলো মাত্রই। কক্ষে মৃদু প্রদীপের আলো। আবিদ নিজের চাদর খুঁজতে গিয়ে ভুলবশত রত্নপ্রভার ব্যক্তিগত থলিটার দিকে হাত বাড়ালো। থলিটা বেশ ভারী লাগলো। কৌতূহলবশত খুলতেই ভেতর থেকে কয়েকটা ভাঁজ করা কাগজ বেরিয়ে এলো। মনে হচ্ছে কোনো মুদ্রাও আছে। কেমন টুনটান শব্দ হচ্ছে।
তোমরা আর আগের মত ভালোবাসছো না আমায়।
আগের মত কমেন্ট ও করছো না কিন্তু পাখিরা ।
কেমন হইছে বলিও অবশ্যই। আর রিয়্যাক্ট দিও। নইলে কিন্তু মাহাদি আর সুনেহেরার ঝামেলা লাগিয়ে দিব
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৩৮ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৭
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫৬
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২