Golpo romantic golpo

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫১


#নূর_এ_সাহাবাদ

#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৫১

উত্তরের প্রাসাদ থেকে মুখ কালো করে মহলে ফিরলো সুনেহেরা। দুইটার একটা তেও সফল হতে পারেনি। না পারলো বাইজিদ কে ধরতে আর না পারলো ওই সুরঙ্গ অবদি যেতে। তবে দেখতে পেরেছে এই ঢের। মেহেরুন্নেসা কে আগে খবর টা দিতে হবে ভেবে ওর ঘরের দিকেই গেল। কিন্তু মেহের ঘর ভিতর থেকে বন্ধ। ভাবলো সকালে জানাবে। কাচা ঘুম টা না ভাঙানোই ভালো। হুট করেই মনে পড়লো ক’দিন পর একটা পুঁচকে আসবে। ইশশশ কত্ত মজা হবে তখন। খুশিতে গদগদ হয়ে লাফাতে লাফাতে সিড়ি নামতে লাগলো। মেয়ে হলে তো সুনেহেরা খুব সাজাবে ওটাকে। মনের সুখে দুই হাত ছড়িয়ে ঘুরতে লাগলো। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ আোখ আটকালো সিড়ির কোণায়। তড়িৎ বেগে থেমে গেল ঘূর্ণন। লজ্জা পড়ে গেল বেশ। এই লোকটা এই সময় এখানে কি করে?

মাহাদি দুই হাত বুকে গুঁজে দেওয়াল হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সুনেহেরার এই ছেলেমানুষী কর্মকান্ড। কাচুমাচু হয়ে মাহাদির সামনে এসে দাঁড়াতেই মাহাদি বলল

“হুমমম? থামলেন কেন? নাচুন না। নাচুন, নাচুন। নাচবেন ই তো। সবে একটু সুস্থ হয়েছেন। এখনই ঘোড়া ছুটিয়ে এদিক সেদিক যাওয়া শুরু করেছেন আবার ধেই ধেই করে নাচছেন”

সুনেহেরা কপাল কুচকে মাহাদির দিকে তাকায়

“আমরা বিয়ে করবো কবে?”

“আপনি জানেন আমার বয়স কত?”

“কত?”

“আমার বয়স ৩৪ বছর। আর আপনার ১৯।”

সুনেহেরা হাই তুলতে তুলতে বলল

“বড্ড ঘুম পাচ্ছে। বয়স টয়স সকালে দেখবো। গেলাম আমি”

মাহাদি বর্মের আড়াল থেকে মৃদু হাসলো। মেয়েটা যে লজ্জা পেয়ে কথা ঘুড়িয়ে চলে গেল তা ঠিকই বুঝেছে।

***

দেখতে দেখতে নেমে এলো শীত। চারপাশে তখন কনকনে ঠান্ডায় যাচ্ছে। ভোরবেলা পুরো সাহাবাদ সাদা কুয়াশায় ঢেকে যায়। গাছের পাতায় শিশির জমে মুক্তোর মত ঝিলমিল করে। মহলের ভেতরও এখন মোটা পর্দা টাঙানো। আগুনের পাত্র জ্বালিয়ে রাখা হয় কক্ষগুলোতে। মেহেরুন্নেসার শরীরও দিন দিন ভারী হয়ে উঠেছে। হাঁটতে কষ্ট হয়। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয় কখনো একটু হাঁটলেই। তবুও তার শান্তি এতে। কখনো কষ্ট অনুভব করে না। সবার ধারণা ছিল সাহাবাদের নতুন সূর্য আসতে চলেছে।

দিনটা বেশ পার হলো দাসীদের সেবা যত্নে। আর বাইজিদ তো আছেই সারাক্ষণ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্ত্রীর কাছে আসতে ভুলে না। দূরে বানিজ্যিক কাজেও যায় না। এমনিতেই সেই জাহাজের ব্যাপার নিয়ে মেহেরুন্নেসা বড্ড রেগে আছে। আগের মত কথা বলে না। সন্ধ্যা বেলা গরম বিদেশি চা খেল অল্প। ভালোই লাগলো মেহেরুন্নেসার।

বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস বইছে। জানালার কপাট কাঁপছে থরথর করে। হঠাৎই তীব্র ব্যাথা উঠলো মেহেরুন্নেসার পেটে। পেট চেপে ধরে যন্ত্রণায় গোঙিয়ে উঠতেই দাসী ছুটে এলো। গলা করে ডাকলো অন্যদের। পুরো মহল যেন তোলপাড়। দাসীরা দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো।

দাইমা কে খবর পাঠানো হলো। হেকিম ও ডাকা হলো। মহলের নারীরা দ্রুত কক্ষে ঢুকে গেল।

বাইজিদ দরবারে ছিল। খবর পেয়ে সেও দৌড়ে আসলো। ছুটে এসে স্ত্রীর হাত ধরতেই মেহেরুন্নেসা কেঁদে ফেলল। ভাঙা গলায় বলল

“ব্যাথা হচ্ছে। শাহজাদা প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে আমার”

স্ত্রীর কান্নারত কণ্ঠ শুনে বাইজিদের হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়ছে। সে তৎক্ষণাৎ দাসীদের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলো

“দাইমা কোথায়?”

কিছুক্ষণের মধ্যেই বয়স্ক দাইমা এসে পৌঁছালো। বহু প্রসব করিয়েছে সে জীবনে। কক্ষে ঢোকার আগে সবাইকে বের করে দিলো। সে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর শুরু হলো অপেক্ষা।

দীর্ঘ ভয়ংকর অসহ্য অপেক্ষা। কক্ষের ভিতর থেকে মাঝেমধ্যে মেহেরুন্নেসার চিৎকার ভেসে আসছে।

প্রত্যেকটা চিৎকার যেন ছুরি হয়ে বিঁধছে বাইজিদের বুকে। সে বারবার দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার ফিরে আসছে। মুঠি শক্ত করে পায়চারি করছে। ছটফট করছে গলা কা’টা মুরগীর মত। চোখ লাল হয়ে গেছে উৎকণ্ঠায়।

“আমি ভিতরে যাব।”

বাইজিদ এগোতেই দ্রুত সামনে এসে দাঁড়ালো আবিদ।

“না না শাহজাদা। এমন টা করবেন না। এখন ভিতরে যাওয়া যাবে না। একটু ধৈর্য ধরুন”

“আমার স্ত্রী কষ্ট পাচ্ছে! আর তুমি আমাকে বলছো ধৈর্য ধরতে নেওয়াজ?”

“আমি বুঝতে পারছি। আমাদের আল্লাহর কাঋে দু’আ করতে হবে। আপনি শান্ত হোন। মহান বল্লাহ কে স্মরণ করুন।”

বাইজিদ রাগে আবিদের কলার চেপে ধরলো। “আমার মেহের এর কিছু হলে আমি কাউকে

ছাড়বো না।”

আবিদ শান্ত গলায় বলল

“আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।”

বাইজিদ হাত ছেড়ে দিয়ে দেয়ালে ঘুষি মারলো।

তার মাথা কাজ করছে না। ভেতর থেকে আবার মেহেরুন্নেসার কান্না ভেসে এলো। সুনেহেরা কাঁদতে কাঁদতে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

রত্নপ্রভাও চুপচাপ। পুরো মহলে অস্বস্তিকর নীরবতা। সময় যেন থেমে গেছে। অবশেষে দরজাটা খুললো।

সবাই একসাথে তাকালো সেদিকে। দাইমা বেরিয়ে এলো। কিন্তু তার মুখটা অস্বাভাবিক কালো।

চোখ নিচু। সুনেহেরার বুক ধক করে উঠলো।

“কি হয়েছে কাকি? বাবু কাঁদছে না কেন?”

বাইজিদ চোতে উঠলো বৃদ্ধার প্রতি

“আমার মেহের ঠিক আছে তো? কথা বলছো না কেন?”

দাইমা ঠোঁট কাঁপিয়ে তাকালো বাইজিদের দিকে।

তারপর খুব নিচু স্বরে বলল

“সম্রাজ্ঞী বেঁচে আছেন…”

এক মুহূর্তের জন্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সবাই।

কিন্তু পরের কথাতেই যেন পুরো পৃথিবী থেমে গেল।

“কিন্তু সন্তানটা মৃত”

সুনেহেরা চিৎকার দিয়ে দু’হাতে নিজের মুখ চেপো ধরলো। বাইজিদ এর চোখ জোড়া অসম্ভব লাল হয়ে উঠেছে। দাই মাথা নিচু রেখেই বলল

“বাচ্চা টা সকালের দিকেই পেটের মধ্যে মারা গেছিলো”

মৃত সন্তানের জন্ম খবরটা ছড়িয়ে পড়লো মহল জুড়ে। রাতের অন্ধকার হলো আরো বিদঘুটে। কত আশা ভালোবাসা নিয়ে রাত্রি জেগে স্বামী স্ত্রী সন্তানের নাম করণ নিয়ে মিষ্টি ঝগড়া করতো। সেই সন্তান কোলে নিতে না পারলে মেহেরুন্নেসা না দম আটকেই মরে যায়। মহলটায় গত কয়েকমাস ধরে নতুন অতিথি আসার আনন্দে উৎসবের আমেজ ছিল, সেই মহল আজ নিস্তব্ধ।

কারও মুখে হাসি নেই। মশালের দপদপে আলোও কেমন ফ্যাকাশে লাগছে। দরবার কক্ষে চুপচাপ বসে আছেন বাকের শাহ্। তার হাতে তসবিহ।

কিন্তু ঠোঁট নড়ছে না। চোখদুটো স্থির হয়ে আছে শূন্যে। এই বয়সে এসে তিনি ভেবেছিলেন নিজের নাতিকে কোলে নেবেন। সাহাবাদের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারীকে দেখবেন। কিন্তু সবকিছু এভাবে শেষ হয়ে যাবে ভাবেননি। একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো তার বুক চিরে। পাশেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে মাহাদি। আবিদও চুপ। পুরো পরিবেশটাইন ভারী হয়ে গেছে। বাইজিদ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে। তার চোখদুটো লাল। মুখে কোনো শব্দ নেই। মনে হচ্ছে শরীর থেকে প্রাণটাই বের হয়ে গেছে। দাইমা ধীরে এসে বলল

“সম্রাজ্ঞী বারবার আপনাকে ডাকছেন।”

কথাটা শুনে যেন সম্বিৎ ফিরলো তার। এক ছুটে কক্ষে ঢুকলো বাইজিদ। ভিতরে ঝাঝালো ঔষধের গন্ধ। মোমবাতির আলোয় পুরো কক্ষ মলিন লাগছে। পালঙ্কে শুয়ে আছে মেহেরুন্নেসা।

চুলগুলো এলোমেলো। মুখ টা ফ্যাকাশে। চোখদুটো কান্নায় ফুলে গেছে। বাইজিদকে দেখতেই কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসার চেষ্টা করলো সে।

“আ…আমার বাচ্চা কই? আমার বাচ্চা কই শাহজাদা”

বাইজিদের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মেহেরুন্নেসা হাত বাড়িয়ে দিলো তার দিকে। “আমার বাচ্চাকে এনে দিন… আমি ওর কান্না শুনেছি… আল্লাহর কসম আমি শুনেছি…”

বাইজিদ কথা বলতে পারছে। কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর পাঞ্জাবি মুঠো করে ধরে বলল

“ও কাঁদছিল… ও বেঁচে আছে। আমার বাচ্চা বেঁচে আছে। ওই দাই মিথ্যা বলছে। শাহজাদা, শাহজাদা ওনাকে বলুন না আমার বাচ্চা টাকে এনে দিতে”

বাইজিদ দ্রুত তাকে জড়িয়ে ধরলো।

“মেহের…”

মেহেরুন্নেসা এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। “না! না! আমার বাচ্চা মারা যেতে পারে না। আপনি এনে দিন ওকে… আমি একবার কোলে নিবো… একবার…”

তার কান্নায় পুরো শরীর কাঁপছে। বাইজিদ চোখ বন্ধ করে শক্ত করে জড়িয়ে রাখলো তাকে।

কিন্তু তার নিজের চোখও ভিজে উঠেছে।

এই প্রথমবার তার নিজেকে এত অসহায় লাগছে। মেহেরুন্নেসা বুক চাপড়ে কাঁদছে।

“আমি ওকে অনুভব করতাম। ও আমার পেটের মধ্যে নড়তো। কথা বলতো আমার সাথে। আল্লাহ কেন আমার সাথে এমন করলো…”

দাসীরা এসে তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। দাইমা পানি খাওয়াচ্ছে। পুরো কক্ষের সবাই মেহেরুন্নেসাকে নিয়েই ব্যস্ত। এইসবের মাঝে একটা বিষয় কারও খেয়াল হলো না। সুনেহেরা কোথায়? মহলের কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না।

সবাই মৃত শিশুটাকে দেখতে থাকলেও সুনেহেরার মাথায় তখন অন্য চিন্তা। গত দুদিন ধরেই সে অদ্ভুত একটা বিষয় লক্ষ্য করছিল। গভীর রাতে কেউ একজন কালো চাদর মুড়িয়ে গুদামের ভেতরে ঢুকে যায়। তারপর অনেকক্ষণ পর বের হয়। প্রথম দিন গুরুত্ব দেয়নি। দ্বিতীয় দিনেও দূর থেকে দেখেছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ সবকিছু মিলিয়ে তার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। তাই মহলের বিশৃঙ্খলার মাঝেই চুপিসারে বেরিয়ে এলো সে। পিছনের বিশাল সুরঙ্গ টাতে আগের মতই আড়াল দিয়ে ঢুকে পড়লো ভিতরে। তার বুক ধুকপুক করছে। মাটির ঢাকনাটা আগেই একটু সরানো ছিল। সুনেহেরা নিচে নামতেই ঠান্ডা বাতাস এসে লাগলো গায়ে। ভেতরটা অন্ধকার।

দেয়ালে দেয়ালে স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। হাতে ছোট মশাল নিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো সে।

সুরঙ্গটা অনেক গভীর। টুপটাপ পানি পড়ছে।

খুব ক্ষীণ একটা শব্দ কানে এলো। সুনেহেরা থেমে গেল। তারপর আবার একদম স্পষ্ট শোনা গেল।

একটা শিশুর কান্না। সুনেহেরার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। সে তড়িঘড়ি করে শব্দটার দিকে ছুটলো।

সামনের বাঁকটা ঘুরতেই দেখতে পেল কালো চাদর মুড়ি দেওয়া একটা মানুষ দ্রুত হাঁটছে।

তার কোলে কাপড়ে মোড়ানো একটা ছোট্ট শিশু।

আর সেই শিশুই কাঁদছে। সুনেহেরার মাথা ঝনঝন করে উঠলো। সে চিৎকার করে বলল

“এই দাঁড়াও!”

লোকটা পেছনে তাকিয়েই দৌড় দিল। সুনেহেরাও ছুটলো তার পেছনে। সুরঙ্গের ভেতর দৌড়ানোর শব্দ প্রতিধ্বনির মত বাজতে লাগলো। লোকটা শিশুটাকে বুকে চেপে ধরে মরিয়া হয়ে পালাচ্ছে।

সুনেহেরা গতি বাড়িয়ে এক ঝাঁপে তার ওপর পড়ে গেল। দুজন গড়িয়ে পড়লো মাটিতে।

বাচ্চাটা আবার কেঁদে উঠলো জোরে।

“কে তুমি!”

সুনেহেরা লোকটার চাদর চেপে ধরলো।

লোকটাও ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছে।

ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে চাদরটা সরে গেল মুখ থেকে। আর মুখটা দেখেই জমে গেল সুনেহেরা।

চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল তার।

ঠোঁট কাঁপতে লাগলো।

“তু… তুমি? তুমি এই জঘন্য কাজটা করছিলে? আমাদের বংশের সন্তান কে অপহরণ?”

কোমর থেকে বাকানো ছুরি টা বের করতেই আগন্তক বাচ্চাটা ছেড়ে দিল ভয়ে। আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। সুনেহেরাকে ধাক্কা মেরে উঠে দৌড়ে অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে গেল। সুনেহেরা হতভম্ব হয়ে বসে রইলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর দ্রুত শিশুটাকে কোলে তুলে নিলো। বাচ্চাটা ঠান্ডায় কাঁপছে। ছোট্ট মুখটা লাল হয়ে আছে কান্নায়। সুনেহেরার বুক কেঁপে উঠলো।

সে কাপড় সরিয়ে তাকাতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো তার। তারপর আর দেরি করলো না।

শিশুটাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে উন্মাদের মত ছুটতে লাগলো মহলের দিকে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস কেটে ছুটে চলেছে সুনেহেরা। চুল গুলো এলোমেলো। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে গেছে। পায়ের চটি খুলে কোথায় পড়েছে নিজেও জানে না।

খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে। সুরঙ্গের ভাঙা ইট, ধারালো পাথর, শুকনো কাঁচের টুকরো একের পর এক পায়ে বিঁধছে। কেটে রক্ত বের হচ্ছে। কোথাও কাঁটা ফুটছে। কিন্তু সুনেহেরা থামছে না।

তার বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে আছে ছোট্ট শিশুটি। বাচ্চাটা মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে ক্ষীণ স্বরে।

সুনেহেরার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে।

দৌড়াতে দৌড়াতে শুধু একটা কথাই বলছে সে “কিছু হবে না… কিছু হবে না সোনা… আমি আছি, তোমার ফুপি আছে তো”

অবশেষে সাহাবাদ মহলের মশাল দেখা গেল।

সুনেহেরা আরও জোরে দৌড়ালো। ওদিকে মহলে তখন সকলেই ব্যস্ত মৃত শিশুটার শেষ কাজের প্রস্তুতিতে। ছোট্ট কাপড়ে মোড়ানো দেহটা রাখা হয়েছে। কবরও খোঁড়া হচ্ছে। চারপাশ ভারী হয়ে আছে কান্নায়। দাইমা মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে। বাইজিদ নিথর হয়ে তাকিয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা অচেতন প্রায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই মহলের ফটকের দিক থেকে চিৎকার ভেসে এলো।

“ভাইজাআআআন!”

সবাই চমকে তাকালো। দেখলো সুনেহেরা ছুটে আসছে। তার পুরো শরীর কাঁপছে। পোশাক ছেঁড়া। পায়ে রক্ত। চুল এলোমেলো। বুকে আঁকড়ে ধরে আছে একটা শিশু। পুরো মহল স্তব্ধ হয়ে গেল। আবিদ হতভম্ব হয়ে বলল

“শাহজাদি…?”

সুনেহেরা হাঁপাতে হাঁপাতে সোজা সামনে এসে দাঁড়ালো। গর্জে উঠলো রক্তচক্ষু নিয়ে

“বন্দি করো ওই দাইমা কে!”

দাইমার মুখ মুহূর্তেই সাদা হয়ে গেল। সুনেহেরা কাঁপা হাতে শিশুটাকে তুলে ধরলো।

“ভাবি মৃত বাচ্চার জন্ম দেয় নি!”

বাইজিদ বজ্রাহত মানুষের মত তাকিয়ে আছে।

সুনেহেরা চিৎকার করে বলল

“এই মহিলা মৃত বাচ্চা রেখে ভাবির সন্তানকে আরেকজনের হাতে তুলে দিচ্ছিল!”

মুহূর্তেই চারপাশে হইচই পড়ে গেল। দাইমা পেছাতে শুরু করলো।

“মি…মিথ্যা কথা…”

“চুপ!”

সুনেহেরা এমন ভাবে গর্জে উঠলো যে সবাই থমকে গেল। তার চোখ লাল হয়ে আছে ক্রোধে।

“আমি নিজের চোখে দেখেছি! এই বাচ্চাটাকে নিয়ে পালাচ্ছিল একজন। আর ওই মৃত বাচ্চাটা অন্য কারও!”

বাইজিদ এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো।

তার চোখ স্থির শিশুটার দিকে। বাচ্চাটা তখন কাঁদছে। বাইজিদের হাত কাঁপতে লাগলো।

কাপা কাপা কন্ঠে বলল

“আমার… সন্তান…?”

সুনেহেরা চোখ মুছে বলল

“হ্যা ভাইজান… আপনার সন্তান বেঁচে আছে…”

সুনেহেরার কথা শেষ হতেই সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়লো দাইমার ওপর। মহিলা পালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মাহাদি এক টানেই তাকে সামনে এনে ফেলে দিলো। দাইমা কাঁপা গলায় বলতে লাগলো

“আমি কিছু করি নি… আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে…”

বাইজিদের চোখ তখন ভয়ংকর শান্ত। এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। সে দাই কে বলল

“কার আদেশে করেছো?”

দাইমা চুপ। মাহাদি তলোয়ার বের করতেই মহিলা চিৎকার দিয়ে উঠলো।

“আমায় মেরে ফেলবেন না!”

বাইজিদ আর কিছু বললো না। শুধু হাত তুলে ইশারা করলো। সাথে সাথে সৈন্যরা তাকে টেনে নিয়ে গেল কারাগারের দিকে। পুরো মহলে তখন উত্তেজনা। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না এমন ভয়ংকর ষড়যন্ত্র হয়েছে। ওদিকে সুনেহেরা শিশুটাকে শক্ত করে বুকে ধরে দ্রুত ঢুকলো মেহেরুন্নেসার কক্ষে। মেহেরুন্নেসা তখন আধশোয়া অবস্থায়। চোখদুটো ফুলে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। দরজা খুলতেই দুর্বল চোখে তাকালো সে।

তারপর সুনেহেরার কোলে শিশুটাকে দেখামাত্র যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল তার।

“আমার… বাচ্চা…”

কাঁপা হাতে সামনে এগিয়ে এলো মেহেরুন্নেসা।

সুনেহেরা চোখ ভেজা হাসি দিয়ে বলল

“ভাবি আপনার সন্তান বেঁচে আছে।”

মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়লো মেহেরুন্নেসা।

দ্রুত বাচ্চাটাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো। যেন বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলবে। অনবরত কপালে চুমু খাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে

“আমার বাচ্চা… আমার সোনা…”

ছোট্ট শিশুটাও যেন মায়ের গায়ের গন্ধ পেয়েই শান্ত হয়ে গেল। ক্ষীণ স্বরে কেঁদে আবার চুপ করে রইলো। মেহেরুন্নেসা চোখ তাকালো সুনেহেরার দিকে। চোখভর্তি কৃতজ্ঞতা।

“আমি… আমি কীভাবে তোমার ঋণ শোধ করবো আপা…”

সুনেহেরা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো।

“এমন বলবেন না ভাবি। এই রাজ্যের উত্তরাধিকারীকে আমি কিছু হতে দিতাম?”

বাইজিদ এগিয়ে এলো। তার চোখও ভিজে উঠেছে। মেহেরুন্নেসার পাশে বসে শিশুটার দিকে তাকিয়ে রইলো স্থির হয়ে।

এই ছোট্ট কোমল শিশুটা তার সন্তান। তার হাত কাঁপতে লাগলো শিশুটাকে কোলে নিতে গিয়ে।

মেহেরুন্নেসা আলতো করে বাচ্চাটাকে তুলে দিলো তার হাতে। বাইজিদ বুকের কাছে আগলে নিলো শিশুটাকে। তারপর হঠাৎই দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো চোখ থেকে। মৃদু হেসে খুব নিচু স্বরে বলল

“সবাই বলে তোমার বাবা নাকি ন্যায় বিচারক। অথচ তোমার সাথে এত বড় অন্যায় তোমার বাবা ঠেকাতে পারেনি মা।”

সুনেহেরা চোখ মুছে বেরিয়ে গেল। মাহাদি দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত সে। সুনেহেরার ঠোটে এক চিলতে হাসি ফুটলো। পাথর মানব টার অনুভূতি আসছে বোধহয়। চন্দ্রা কে দেখলো চুপচাপ বসে আছে। সুনেহেরা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল

“আসলে পর কখনো আপন হয় না। সেটা তোমাকে দেখে বুঝলাম। এত কিছু হয়ে গেল। একটা বারও গেলে না ভাবির কাছে?”

চন্দ্রা উঠে দাড়ালো

“তোর সাথে আমার কথা আছে”

“আমার তোর সাথে কোনো কথা নেই”

সুনেহেরা দৌড়ে বেরিয়ে গেল মহল থেকে। আজ কেন জানি না তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। মাহাদিও গেল পিছন পিছন। সুনেহেরা বাগানের কাঠের বেঞ্চ টার ওপর বসে কেঁদেই যাচ্ছে। পাশে মাহাদি মূর্তির মত দাড়িয়ে আছে। অল্প কাছে এসে বলল

“আপনার মন ভালো করতে দুই লাইন কবিতা বলব শাহজাদি?”

“সরুন। ভালো লাগছে না আমার।”

“এক বার শুনুন ই না”

সুনেহেরা চুপ। মাহাদি পাশে বসে বলল

“নদীতে অনেক ঢেউ,

আমার নেই কেউ”

সুনেহেরা কটমট করে তাকায়। বাহুতে চাপড় মেরে রেগে বলল

“মশকরা হচ্ছে?”

মাহাদি হেসে বলল

“তাহলে আরেকটা বলি। এটা ভালো লাগবে।

যখন আপনাকে জাগলো দেখার শখ

উড়ে গেল এক জোড়া কানা বক”

সুনেহেরা কান্নার মধ্যেও হেসে ফেলল। ধুপধাপ কিল বসাতে লাগলো মাহাদি কে।

সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করিও। কমেন্ট করো কেমন হইছে। তাড়াহুড়ো করে শপিং শেষ করে আসছি তেমাদের জন্য 🥹🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply