#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৪৭
গভীর রাত। মহলের অধিকাংশ মশাল নিভে গেছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে প্রহরীদের টহলের শব্দ ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। সিমরান এর দাফন কার্য সম্পন্ন করে ঘরে ফিরেছে বাইজিদ। আশেপাশে ঘুরঘুর করে বিরক্ত করা মেয়েটার জন্য আজ মন খারাপ হচ্ছে? বাইজিদ নিজেও উত্তর জানে না। বড় এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশে তাকাতেই দেখে মেহেরুন্নেসা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। একটু অপ্রস্তুত হলো যেন। মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এসে বাইজিদ এর বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে।
“আমি কী সম্রাজ্ঞীর দ্বায়িত্ব পালনে ব্যার্থ? আমি আমার দ্বায়িত্ব রক্ষা করতে পারিনি শাহজাদা। আমার মহলের মেয়েদের আমার সামনে হত্যা করা হলো। আমি ঠেকাতে পারলাম না। আমি এই সিংহাসনের যোগ্য না”
বাইজিদ আলতো হাতে আগলে নিল মেহেরুন্নেসা কে। স্বামীর বুকে মাথা ঠেকতেই কান্নার তোপ আরও বাড়লো তার। বাইজিদ মাথায় চুমু দিয়ে বলল
“এভাবে তো ভেঙে পড়া যাবে না সম্রাজ্ঞী। যুদ্ধের ময়দানে তোমার প্রিয়জন শহীদ হবে তোমারই চোখের সামনে। তবুও তলোয়ার এর গতি কমানো যাবে না। এটাই একজন যোদ্ধার পরিচয়। শুধু সিমরান কেন? আমরা নিজেরাও প্রাণ দিতে প্রস্তুত যুদ্ধক্ষেত্রে। এটা তোমাকে বুঝতে হবে প্রিয়া”
মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর বুকে মাথা ঠেকিয়ে কান্নাভেজা কন্ঠে বলল
“চাই না আমার এই সম্রাজ্ঞীর আসন। আপনার আসনে আপনিই বসুন। আমি কেবল আপনার স্ত্রী আর একজন যোদ্ধা হয়েই থাকতে চাই”
“তা হয় না মেহের”
“কেন হয় না?”
বাইজিদ নিচু স্বরে বলল
“তোমাকে যেহেতু সম্রাজ্ঞী আসনে বসিয়েছি, কারণ তো অবশ্যই আছে”
“তো বলুন কী কারণ”
বাইজিদ ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ে
“এই নির্মম ইতিহাসের ইতি টানার কালে আমায় কিছু অন্যায় করতে হবে। যা এই ন্যায় এর সিংহাসনে বসে আমি করতে পারবো না”
কে জানে কথা বুঝলো কিনা মেহের। স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে কাদতে থাকলো অনবরত।
মেহেরুন্নেসা কে এক প্রকার জোর করেই ঘুম পাড়ালো বাইজিদ। বুকের ওপর শুইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এমন সময় পেছনের গোপন পথ দিয়ে মহলে প্রবেশ করল মিরান। কালো চাদরে শরীর ঢাকা। মুখে ক্লান্তি। পোশাক এলোমেলো নয় ঠিক ঠাকই আছে। প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে সে। অন্দরমহলের করিডোর পেরিয়ে সরাসরি চলে গেল বাইজিদ এর কক্ষে। দরজায় শব্দ হতেই বাইজিদ সতর্ক হয়ে উঠল।
“কে?”
“আমি,মিরান।”
কণ্ঠটা শুনেই দ্রুত দরজা খুলে দিল বাইজিদ।
মিরান ভেতরে ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ করে দিল সে। বাইজিদ অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে।
“তুমি? এত রাতে? কি হয়েছে? আর তুমি কোথ থেকেই বা এলে”
মিরান এর চোখে মুখে তারাহুরোর ছাপ। ঘামছে মাত্রাতিরিক্ত। শুকনো ঢোক গিলে বলল
“বেগম কে একটু ডাকা যাবে? খুউব জরুরি সংবাদ আছে”
বাইজিদ এর চোয়াল শক্ত হলো।
“ও অসুস্থ। ডাকা যাবে না। আমাকে বলো”
“আমি এক গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে এসেছি শাহজাদা…”
“কিসের খবর?”
মিরান একবার চোখ বন্ধ করল। তারপর নিচু গলায় বলল
“অর্ষা আর মাইমুনা শেখ কেউ ই বেঁচে নেই।”
মুহূর্তেই থমকে গেল বাইজিদ।
“কি বললে?”
“অঙ্কুর অনেক আগেই হত্যা করেছে তাদের।”
কথাটা শুনে যেন আগ্নেয়গিরি উপচে পড়লো তার মস্তিষ্কে। গর্জে ওঠে বলল
“তুমি জানো এর জন্য আমি তোমার গর্দান নিতে পারি?”
মিরান আবার বলল
“নিলে এক্ষুনি নিন। আমি নিশ্চিত হয়েই এসেছি। ওদের আর খুঁজে লাভ নেই…”
বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের ভেতর ধীরে ধীরে জমে উঠল চাপা ক্রোধ।
“প্রমাণ?”
মিরান বিরক্ত হলো বাইজিদ এর কথায়।
“দীর্ঘদিন পরেও যখন খোঁজ পাবেন না। তখন প্রমাণ পাবেন। গরীবের কথা আবার বাসী হলে ফলে”
মিরান ধপাধপ পা ফেলে বেড়িয়ে গেল। বাইজিদ ও আটকালো না ওকে। রোজ রোজ পালায় আবার ফিরে আসে, অতিষ্ঠ করে তুলেছে সবাইকে। রাজ্যে যখন আর দেখা যাচ্ছে না। তো থাকুক যেখানে খুশি। হারিকেন এর আলো একেবারে কমিয়ে দিয়ে মেহেরুন্নেসার পাশে এসে শুয়ে পড়লো বাইজিদ। মেয়েটার গা টা গরম গরম লাগছে। জ্বর আসবে বোধহয়। মেহেরুন্নেসার গায়ে হাত রাখতেই বলল
“ওকে এতটাও সস্তা ভাবে নেবেন না শাহজাদা। এই যুদ্ধের আড়াল থেকে যে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ করেছে। সে হচ্ছে মিরান”
বাইজিদ চমকে উঠলো মেহেরুন্নেসার কথায়।
“কিসব বলছো? আর তুমি ঘুমাও নি কেন এখনো?”
মেহেরুন্নেসা চোখ বন্ধ রেখেই বলল
“সুনেহেরা আপার ছোঁড়া প্রত্যেকটা তীরে দানব গুলো লুটিয়ে কেন পড়ছিল? তলোয়ার আর বর্ষার খোঁচায় কিচ্ছু হয়নি তাদের। তাহলে ওই তীরে কেন পড়ে যাচ্ছিল সব ভেবেছেন একবার?”
বাইজিদ তখন তলোয়ারের আঘাতে একের পর এক অঙ্কুরের বাহিনী কে ঘায়েল করছে। দেখেই নি কোথ থেকে সুনেহেরা তীর ছুড়েছে। মেহেরুন্নেসা ঠান্ডা লাগা চিকন গলায় বলল
“সেই তীরে মাখানো ছিল বিজ্ঞানী দের তৈরী করা ওষুধ। যা ওদের শরীরে প্রবেশ করার সাথে সাথে মৃত্যু ঘটিয়েছে। আর সেই রাসায়নিক তরল জুটিয়ে দিয়েছে মিরান”
বাইজিদ এর ঠোঁট জোড়া আপনা-আপনি ফাঁক হয়ে গেল।
“তারমানে সুনেরাহ আর মিরান ও এর সাথে জড়িত?”
মেহেরুন্নেসা উত্তর দিল না তার। ছোট্ট করে বলল
“আপনারও ঘুমের প্রয়োজন। সকালে দরবারে জরুরি আলোচনা করার আছে”
******
প্রাসাদের করিডোর পেরিয়ে বাইরে বের হলো মিরান। চারপাশ অস্বাভাবিক নীরব। দূরে কোথাও শুকনো গাছের ডাল কাঁপছে বাতাসে। আকাশে আধখানা চাঁদ। মেঘের আড়াল থেকে বারবার বের হচ্ছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রাসাদের পাশ ঘেঁষে যে পুরোনো কবরস্থানটা আছে, সেদিক দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিল মিরান। মাটির গন্ধ তীব্র।
ভেজা বাতাসে পচা পাতার গন্ধ মিশে আছে।
হঠাৎ কান্নার শব্দ ভেসে আসে মিরানের কানে। তৎক্ষনাৎ পা থামায়। কান্নাটা খুব চাপা শোনা যাচ্ছে। নিস্তব্ধতার মাঝে ভয়ংকর স্পষ্ট। এমন গভীর রাতে কবরস্থানে কাঁদছে কে?
চারপাশে তাকালো। আবার সেই শব্দ। মনে হচ্ছে কেউ বুক ভেঙে কাঁদছে। দূরের শুকনো বাঁশঝাড়টা বাতাসে দুলতেই খসখস শব্দ করছে।
পেঁচার ডাকে পুরো পরিবেশটা আরও গা ছমছমে লাগছে।
সাধারণ কেউ হলে হয়তো দৌড়ে পালাতো।বকিন্তু মিরানের চোখে ভয় নেই। কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে গেল শব্দটার দিকে। কবরগুলোর মাঝখান দিয়ে হাঁটার সময় চাঁদের আলোয় সাদা সাদা কবরগুলোকে কেমন বিভীষিকা ময় লাগছিল।
কোথাও কবরের মাটি দেবে গেছে। কোথাও বুনো ঘাস উঠে আছে। কারও ফিসফিসানির মত শব্দ ভেসে আসছে। আবার কান্নার শব্দ পেল একদম কাছ থেজে।
মিরান একটা বড় শুকনো গাছের পাশ কাটিয়ে সামনে যেতেই পা থেমে গেল। ঠোঁট দিয়ে অস্ফুট শব্দে বের হলো
“শাহজাদি?”
সামনে একটা কাঁচা কবর। কবরের মাটি এখনও পুরো শুকায়নি। সেই কবরের ওপর ঝুঁকে পড়ে কাঁদছে সুনেহেরা। তার সোনালি চুল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। কাঁধ কাঁপছে অবিরাম। চাঁদের আলোয় তার মুখটা ফ্যাকাশে লাগছে ভয়ংকরভাবে। মিরান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কবরটার দিকে চোখ যেতেই বুঝলো সিমরানের কবর।
সুনেহেরা দুই হাতে মাটি চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলছে
“তোকে আমি বলেছিলাম তোর সুদিন আসতে চলেছে। এই মহল থেকে দূরে গিয়ে সুখের জীবন কাটাবি। তোর সুখ সইলো না কেন রে পোড়াকপালি?”
মিরান এগিয়ে এসে দাঁড়ালো সুনেহেরার পাশে।
পায়ের শব্দ পেয়ে সুনেহেরা চমকে মাথা তুলল।
কিন্তু মিরানকে দেখেই আবার চোখ নামিয়ে নিলো। মনে হলো কান্না থামানোর চেষ্টা করছে সে। দ্রুত হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে ফেললো।
মিরান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো কাঁচা কবরটার দিকে। তারপর নিচু স্বরে বলল
“কাঁদুন শাহজাদী। থামলেন কেন?”
সুনেহেরা কিছু বললো না। মিরান আবার বলল “এত শক্ত হয়ে থাকবেন না। সব কষ্ট বুকের ভেতর চেপে রাখলে মানুষ একসময় ভিতর থেকে মরে যায়।”
ফের কান্নায় ভেঙে পড়লো সুনেহেরা। ঠোঁট কাঁপতে লাগলো।আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো মিরানকে। এমনভাবে ধরে আছে যেন আর নিজেকে সামলাতে পারছে না। তার কান্না আবার ফেটে বের হলো।
“ও চলে গেল কেন? আমায় একটু ভরসা কেন করলো না মিরা? এই মিরা বল না।”
মিরান তার মাথায় হাত রাখলো। চুপচাপ শুনতে লাগলো কান্নাগুলো। সুনেহেরা কাঁদতে কাঁদতেই বলল
“আমি….আমি অঙ্কুরকে ছাড়বো না। ও আমার সব শেষ করে দিচ্ছে। প্রথমে অর্ষা আপাকে, বড় মা কে, আবার তিলো আপা কে। এখন আবার সিমরান কেও মেরে ফেলল মিরা। ও আমার সব প্রিয়জন কে কেড়ে নিল”
চট করে কান্না থামালো সুনেহেরা। তড়িৎ বেগে মিরান কে ছেড়ে দাঁড়ালো। চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে কোনো বিষয় হঠাৎ ই মনে পড়লো।
“মি….মিরা, এই মিরা। ও..ওদের সাথে একজন মেয়ে লোক ছিল। হ্যা, হ্যা আমি দেখেছি। ও ই তীর টা ছুড়েছিল ভাবির দিকে। গতকালই ওকে আমি তীরবিদ্ধ করলাম। আজ ও এত দ্রুত কী করে সেরে উঠলো বল তো?”
দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকাতেই সব বুঝে ফেলল। ওই চিকিৎসা বিজ্ঞানী দের ওষুধের ফল। মিরান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“ক্ষত শুকানোর, ব্যাথা দ্রুত কমার অনেক রকমের ওষুধ আছে ওদের কাছে”
সুনেহেরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল
“আমি ওকে মেরে ফেলবো।”
চাঁদের আলোয় সুনেহেরার চোখ দুটো জ্বলছে।
মিরান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এ নারীর চোখের জেদ, অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর অসীম সাহস অঙ্কুর কে পর্যন্ত ভয় পাইয়ে দিয়েছে। মিরান এল টুকরো হাসলো। তারপর শান্ত গলায় বলল
“আপনি একা না। আমি আছি আপনার সাথে। এ রাজ্যের জন্য জীবন দিয়ে দিব”
সুনেহেরা মাথা তুললো। মিরানের চোখে মিথ্যে নেই। দুজনের চোখেই প্রতিশোধের আগুন।
সেদিন থেকেই শুরু এই শয়তান দমন যুদ্ধের। রাজ্য আর প্রজাদের বাচাতে বাঘিনীর রুপ নিয়েছিল সাহাবাদ এর নারীরা। ইতিহাস তা মনে রাখবল
*****
ঘরের ভেতর একের পর এক জিনিস ছুঁড়ে ফেলছে মারজান। কাঁচের পেয়ালা, ভারী ধাতব পাত্র, সাজানো আয়না সব ভেঙে চুরমার করে ফেলছে। ভাঙচুরের শব্দে পুরো কক্ষ তছনছ হয়ে গেছে। মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে আছে কাঁচের টুকরো।
আজ বাকের শাহ্ এই কক্ষে নেই। দরবার শেষে অন্য কক্ষে গেছেন। আর এই সুযোগেই যেন নিজের আসল রূপে ফিরে এসেছে মারজান।
তার চোখমুখ বিকৃত হয়ে আছে রাগে। ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করতে লাগলো
“সব নষ্ট হয়ে গেল…সব…সব, সব”
সামনে থাকা ছোট টেবিলটা উল্টে দিলো সে।
দুম করে পড়ে গেল সেটা। মারজানের চোখে ঘৃণা আর হিংসা জমাট বেঁধে আছে।
“সিমরান টা মরতেই হলে ওই মেহেরুন্নেসার জন্য কেন মরলো? ওকে আমি পুষছিলাম। ওর তো আমার জন্যে প্রাণ দেওয়ার কথা ছিল। আমার সকল কাজ জীবন বাজি রেখে করার কথা ছিল। ও মরতে হলে আমার জন্য মরতো।
তার কণ্ঠে বিষ।
“তীরটা ঠিকঠাক গিয়ে লাগলেই তো সব শেষ হয়ে যেত! ওই ভিখিরির বাচ্চাটা মরে গেলে সব শান্তি ছিল আমার।”
সে পায়চারী করতে লাগলো ঘরময়।
“বেশ ছিল মেয়ে টা। হাতের পুতুলের মত নাচতো। যা বলতাম তাই করতো।”
তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে উঠলো।
“আর এখন? সবাই শুধু মেহেরুন্নেসা… মেহেরুন্নেসা…ওহহহহহহ। হাঁপিয়ে গেছি আমি। কী কৈ মাছের প্রাণ ওই আটকোড়ার হ্যা? বলি অপয়া টা কি মরবে না? নাকি এভাবেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভেজে খাবে আমার কলিজা টা”
ক্রোধে মাথার চুল খামচে ধরে বলল
“সম্রাজ্ঞী হয়ে গেছে না? সম্রাজ্ঞী? সবাই মাথায় তুলে রেখেছে! কত আদিখ্যেতা হচ্ছে তাকে নিয়ে।”
মারজান দাঁতে দাঁত চেপে আয়নার ভাঙা অংশটার দিকে তাকালো। নিজের বিকৃত প্রতিবিম্ব দেখে আরও রেগে উঠলো।
“না…এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না। আমার… আমার রাজত্ব চাই। শুধু সাহাবাদ না আমার গোটা মহাদেশ এর রাজত্ব চাইইই”
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আলমারি খুললো মারজান।
সেখান থেকে একটা কালো চাদর বের করে পুরো শরীর মুড়িয়ে নিলো। মুখটাও ঢেকে ফেললো সাবধানে। চোখদুটো ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না এখন। চারপাশ দেখে নিশ্চিত হলো কেউ নজর রাখছে না। তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। আজ তার গন্তব্য উত্তরের প্রাসাদ।
মহলের পিছনের সরু পথ ধরে দ্রুত হাঁটতে লাগলো সে।
বাইরে বেরোতেই একটু ভয় ভয় করতে লাগলো তার। চারপাশ টা কেমন নীরব। দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। কবরস্থানের কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ থেমে গেল মারজান। ভূত দেখার মত আঁতকে উঠলো। সামনে টান টান হয়ে দুজন দাঁড়িয়ে।
চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল সুনেহেরা আর মিরান দাঁড়িয়ে আছে। মারজানের চোখ মুহূর্তেই কুঁচকে এলো। মিরানও ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
সুনেহেরা সামনে এগিয়ে এলো তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল
“কোথায় যাচ্ছোএত রাতে?”
মারজান চুপ করে আছে। মনে মনে রাগে ফেটে পড়ছে। একেই বলে পেটের শত্রু। জবাব না পেয়ে
সুনেহেরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
“বলো না উত্তরের প্রাসাদে যাচ্ছো। কার? অঙ্কুরের কাছে?”
মারজানের বুক ধক করে উঠলো। কিন্তু মুখ শক্ত রাখলো। সুনেহেরার চোখে পানি চিকচিক করছে, মায়ের এই রুপ কোন সন্তানই সহ্য করতে পারে?
“জানো? তোমাকে মা ভাবতেও এখন আমার ঘেন্না হয়।”
মারজানের চোখ কেঁপে উঠলো। সুনেহেরা থামলো না।
“যে নারী নিজের মানুষদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। যে অঙ্কুরের মত পিশাচের সাথে হাত মেলায়। যে স্বার্থের জন্য নিজের সন্তান কে পর্যন্ত হত্যা করতে পারে। সে মা হওয়ার যোগ্য না।”
মা মেয়ের কথোপকোথন মিরান নীরবে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে। সুনেহেরা কথা বলতে গিয়ে কেঁদে উঠলো
“এই তুমি কেমন মা বলোতো? ভাইজান না হয় তোমার পেটের ছেলে না। মেহের ভাবিও পরের মেয়ে। কিন্তু, তিলোত্তমা আপা? আমি? আমাদের সাথে কেন এমনটা করলে আম….নাহহহ আম্মা নাহহ। মারজান বেগম। বলুন মারজান বেগম। উত্তর দিন আমায়। কেন নিজের সন্তান কে হত্যা করালেন বলুন”
মিরান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল
“কাকে নিজের সন্তান বলছেন শাহজাদি? এই স্বার্থপর মহিলার গর্ভে কেবল আপনার জন্ম। তিলোত্তমা নামকরা বণিক জশদেব বাবুর কন্যা।”
সুনেহেরার চোখ তখন ছানাবড়া। মারজান এর পায়ের তলায় মাটি সরে গেল। সুনেহেরা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
“কি? কি বললি মিরা?”
“জশদেব বাবু একজন হিন্দু লোক। তার বড় ছেলে অনিরুদ্ধ কে মিশরের নামকরা একটা প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণা শিখাচ্ছিল। মিশরীরয় রা চিকিৎসা বিজ্ঞানে সবচেয়ে উন্নত এখনো পর্যন্ত। সেখান থেকে তাকে ধরে আনতে গোটা পরিবার কে হত্যা করে এই মারজান বেগম আর তার সঙ্গী অঙ্কুর মিলে। সেখান থেকে তিলোত্তমা কে নিয়ে আসে এই মহিলা। কাজ করানোর জন্য। যতদিন করাতে পেরেছে রেখেছে। যেই কাজ শেষ। মেরে দিলো”
সুনেহেরা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
“আর হ্যা, সাথে সিমরানের বাবাও ছিল। সবাই বলে ডাকাতের কবলে মারা গেছে তারা। সেই ডাকাতও এই মহান মহিলা”
সুনেহেরা ফ্যাল ফ্যাল করে কেঁদে ফেলল। নিজের মায়ের এমন পিশাচিনী রুপ সে সহ্য করতে পারছে না। মারজান চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মিরান এ দিকে। এই মেয়ে এত কিছু কি করে জানে? মিরান বুকে হাত ভাজ করে দাড়িয়ে বলে
“কি মারজান বেগম? আরও বলব?”
সুনেহেরা কিছু বলতে যাবে এমন সময় মারজান চাদরের আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ ধারালো এক ছুরি বের করে।
“এত কিছু যখন জেনে গেছিস, বেঁচে থেকে কি করবি? তুই হলি পেটের শত্রু। তোকে মারলে পাপ নেই”
মিরান বাঁধা দেওয়ার আগেই ক্যাচ করে ছুরি টা বসিয়ে দিল সুনেহেরার পেটে। সুনেহেরা চিৎকার দিয়ে উঠলো
“আআআহহহহ”
সাথে সাথে ছুরি টা বের করে দিয়ে আবার বসিয়ে দিলো পেটের আরেক পাশে। ছুরিটা বের করে নিয়ে সুনেহেরা কে ছেড়ে দিতেই ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে। মিরান তাকে ধরতে গেলে এক খাবলা বালি ছুড়ে মারে মিরান এর চোখে। মিরান অন্ধের মত হাতরাতে হাতরাতে গিয়ে সুনেহেরা কে ধরে।
“শাহজাদি, শাহজাদি আপনি চোখ বন্ধ করবেন না। আমি এক্ষুনি নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে”
মারজান গলা করে ডাকে
“আরে জলদি আয়। নিয়ে যা এটাকে”
দূর থেকে ধুপধাপ পায়ের শব্দ পাওয়া যায়। কয়েকজন লোক তাদের দিকেই ছুটে আসছে। সুনেহেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে মুখ থেকে শব্দ বের করে
“পালা মিরা। পালা। মিরা….পালা। তোকে…তোকে ওরা ধরার আগে পালা। এখনো অনেক কাজ বাকি তোর”
“শাহজাদি আপনাকে রেখে…..”
“পালাআআআ”
মিরান উঠেই আরেক মুঠো বালি তুলে ছুড়ে মারলো মারজান এর দিকে। সুনেহেরা কে টেনে তুলে তার হাত ঘারের ওপর নিয়ে বন্ধ চোখেই উন্মাদের মত ছুটতে লাগলো। কোথায় যাচ্ছে জানে না। ছুটতে ছুটতে খানিক পথ এসেই সুনেহেরা ধাপ করে বারি খেল এক শক্তপোক্ত ধাতুতে। ঢলে পড়তে নিলেই ধরে ফেলল সামনে থাকা বর্ম পরিহিত লোকটি। সুনেহেরা নিভু নিভু চোখে তাকায়। সামনে দৃশ্যমান মুখটা দেখে অস্ফুট স্বরে বলল
“আপনি এসেছেন আর……”
চোখের মনি উল্টে নিভে গেল সুনেহেরার চোখ জোড়া।
পেইজের রিচ এক্কেবারে ডাউন। নন ফলোয়ার পাঠিকা রা ফলো করে দিও
কেমন হলো জানাইও কেমন? আর রিয়্যাক্ট যেন ৩.৫k হয়। প্রচন্ড জ্বর নিয়েও লিখলাম
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৭
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১