Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪৬


#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব -৪৬

“আমায় ডেকেছেন?”

আবিদের কথায় বসা থেকে উঠে দাড়ালো সিমরান। মাথা নিচু করে হ্যা সূচক মাথা নাড়ালো। আবিদ বুকে হাত ভাজ করে দাঁড়ায়। দরবার মুলতবি হয়েছে ভর দুপুর সময়। ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে। খিদেও পেয়েছে মুখ দেখে মনে হয়। সিমরান এর কথা বার বার গুলিয়ে যাচ্ছে। আবিদ ঘর্মাক্ত কপাল মুছে বলল

“একটু তারাতাড়ি বলবেন? আসলে আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। বেলা গড়াচ্ছে তো তাই আরকি। আমি না গেলে আবার মা না খেয়ে বসে থাকবে”

সিমরান কথা উঠালো

“আপনার মা আমাদের বিবাহের বিষয়টা জানে?”

“জ্বি”

সিমরান আশা করেছিল উত্তর টা না হবে। যদি এই বাহানা নিয়ে বিয়ে টা ভাঙা যায়। আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল

“উনি জানতে চাননি আমার বিষয়ে? দেখতে চাননি আমায়?”

আবিদের দৃষ্টিতে একটু ঘাবড়ে গেল সিমরান। বোধহয় সন্দেহ করছে বিয়ে ভাঙতে চাইছে বলে। কথা কাটাতে বলল

“না মানে, ওনারও তো কিছু স্বপ্ন বা আশা আকাঙ্খা থাকতে পারে পুত্র বধূ নিয়ে। তাই আরকি”

আবিদ ছোট করে বলল

“জমিদার বাবুর যে কোনো সিদ্ধান্তে আমার খুশি। তিনি অধীর অপেক্ষায় আছে কবে আপনাকে ঘরে তুলব।”

সিমরান শুঁকনো ঢোক গিলল। সব তো তার অনুমান এর বাইরে দিয়ে যাচ্ছে।

“দেখা গেছে যাওয়ার পরে যদি আমায় ওনার পছন্দ না হয়”

“জমিদার নিজে আপনাকে দিচ্ছে আমার হাতে। আমার মা আপনাকে রাণীর মত মাথায় করে রাখবে। আর আমিও”

সিমরান চকিতে তাকালো আবিদের দিকে।

“আপনার কাওকে পছন্দ নেই?”

আবিদ অল্প এগিয়ে এসে দাড়ালো সিমরান এর কাছে। সূক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে বলল

“আমার মনে হয় আপনার আছে”

সিমরান এদিক ওদিক চোখ ঘুরায় জড়তা কাটাতে

“আপনার এমন কেন মনে হচ্ছে? আমি কি আপনাকে জিজ্ঞেস করে নিতে পারি না? পরে দেখবো বিবাহের পর আপনার আরেকজনের সাথে সম্পর্ক আছে, আর আ…”

সিমরান এর কথা শেষ হওয়ার আগেই হো হো করে হেসে উঠলে আবিদ। সিমরান বোকা বনে গল তার হাসি দেখে। আবিদ হাসতে হাসতেই বলল

“অত চিন্তা করবেন না। মনে রাখবেন আমাদের বিয়ে জমিদার স্বয়ং বাকের শাহ্ দিচ্ছে। আপনাকে টপকে পরকীয়া করলে উনি আমার গর্দান রাখবেন নাকি?”

“আপনি এবার আসতে পারেন”

আবিদ চলে যেতে নিয়ে আবার পিছন ফিরলো।

“এতটুকু নিশ্চয়তা রাখুন। আপনার কখনো অযত্ন হবে না। আমার এতবড় মহল নেই। যা একটা ঘর আছে, হয়ে যাবে আমাদের। রাণীর হালেই থাকবেন আপনি। আসছি”

সিমরান এর চোখের কোণে জল জমলো। সে থাকতে চায় না রাণী হয়ে। শাহজাদার আশেপাশে থাকতে পারলেই তার শান্তি। কীভাবে ভাঙবে এবার এই বিয়ে? একবার ভাবলো বাকের শাহ্ কে বলবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়লো মেহেরুন্নেসা ক্ষমতার গদিতে বসে। কোনো লাভ হবে না বলে। সিদ্ধান্তঃ নিলো বাইজিদ কে বলবে। মহলের উদ্দেশ্য রওণা হতেই পথিমধ্যে দেখা গেল। সুনেহেরা আর রত্না কি নিয়ে যেন তর্ক করছে। সিমরান একটু এগিয়ে যেতেই শুনলো

“তোর কি মাথা টাথা গেছে? মরতে চাস নাকি তুই? পাগল হয়ে গেছিস? কেন গেছিলি ওই খানে? বল আমায়। তোর কিছু হ…”

সিমরান কে দেখেই মুখ বন্ধ করলো সুনেহেরা। ঘাগড়ার দুই প্রান্ত ধরে রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেল সেখান থেকে। সিমরান ও যাবে এমন সময় দেখলো মাহাদি আরও কয়েকজন সৈন্য নিয়ে বাইজিদ এদিকেই আসছে। সিমরান তারাতাড়ি পা চালায় বাইজিদ কে ধরার জন্য। বাইজিদ ঘোড়ার পিঠে ওঠার সময় সিমরান এসে দাঁড়ালো সেখানে

“শাহজাদা, দাঁড়ান। আমার কিছু কথা আছে আপনার সাথে”

“ফিরে এসে শুনবো”

এক মূহুর্তও দেরি করলো না বাইজিদ। ঘোড়ার লাগাম টেনে ছুটে গেল দ্রুত। সিমরান আশাহত হলো ফের। মন খারাপ করে পা বাড়ালো মহলের দিকে। আজ নিজেকে সত্যিই আশ্রিতা মনে হচ্ছে সিমরান এর। যদি তার পরিবার বেঁচে থাকতো, অবশ্যই বিবাহের ক্ষেত্রে তার মতামত নিতো। এরা কেউ কথা কানেই তুলছে না। আনমনে হয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা খেল। কপাল কুচকে তাকাতেই পাশে দেখলো মেহেরুন্নেসা কে। শক্ত চোখ জোড়ার দৃষ্টি নরম হলো। চাপা কষ্ট নিয়ে বলল

“ক্ষমা করবেন সম্রাজ্ঞী। দেখিনি আমি”

মেহেরুন্নেসা তীক্ষ্ম চোখে তাকায়

“তোমার সেয়ানা পনা আমি বুঝি না ভেবেছ?”

“মানে?”

মেহেরুন্নেসা শক্ত করে চেপে ধরলো সিমরান এর হাত। দাঁতে দাঁত পিষে বলল

“গত রাতে আমি বড় আপার ঘর থেকে ফেরার সময় তোমাকে আমাদের কক্ষ থেকে বের হতে দেখেছি। শাহজাদা দরবারে ছিল,আমিও কক্ষে ছিলাম না। কি করতে গেছিলে তুমি?”

সিমরান ধরা পড়া চোরের মত তোতলাতে লাগলো।

“আ….আমি তো, আমি ওই”

“কি আমি ওই আমি ওই হ্যা? সত্যিটা বলো। বলো ঝুড়িতে করে নিয়ে সাপ ছেড়ে দিয়ে এসেছো ঘরে। বলোওওও। সম্রাজ্ঞী কে হত্যাচেষ্টা? তোমার গর্দান নেব আমি”

সিমরান এর বুকের ভিতর যেন বিদ্যুৎ চমকানোর মত চমকে উঠলো। ধপ করে মেহের এর পায়ে ধরে বসে পড়লো

“সম্রাজ্ঞী, সম্রাজ্ঞী দয়া করুন। আ…আমার কোনো দোষ নেই। আমাকে যা করতে বলা হয়েছে আমি তাই করেছি।”

মেহেরুন্নেসা পা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল সিমরান কে

“বল কে করতে বলেছে?”

সিমরান কাঁদতে কাঁদতে বলল

“আম্মাজান করতে বলেছিল”

মেহেরুন্নেসা সিমরান কে নিয়ে টানতে টানতে দরবারের মাঝখানে ছুড়ে ফেলল। যে ক’জন সভাসদ আছে তারা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় মেহেরুন্নেসার এমন কান্ডে। বাকের শাহ্ অবাক হয়ে মেহেরুন্নেসা কে বলে

“কি হয়েছে আম্মা? ওকে এভাবে আঘাত করছো কেন?”

মেহেরুন্নেসা তীব্র ক্রোধ নিয়ে সিমরান কে বলল

“নিজের ঘাড় বাচাতে চাস তো সবটা স্বীকার কর”

এছাড়া আর সিমরান এর কোনো উপায় নেই। মহলের সকল নারী পুরুরষ এসে ভির করলো দরবারের সামনে। সিমরান সকলের সামনে বলল

“গতকালকে আম্মা আমাকে বলেছিল মেহেরুন্নেসা….. মানে সম্রাজ্ঞীর কক্ষে বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দিতে। উনি সাপুড়ে কে দিয়ে সাপ আনিয়েছে জঙ্গল থেকে। আমিও তাই করেছি”

বাকের শাহ্ এর যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। মেহেরুন্নেসা বলল

“আব্বা, সম্রাজ্ঞী কে হত্যাচেষ্টার শাস্তি কি?”

“অবশ্যই মৃত্যুদন্ড”

মারজান এর রুহ কেপে উঠলো কথাটা শুনে। মেহেরুন্নেসা ফিচেল হাসলো।

“শাস্তি আমি ঘোষনা করছি। আজ থেকে মারজান আর সিমরান আমার খাস দাসী। বলো দুজন, রাজি?”

দুজনের কেউ ই কথা বলে না। মেহেরুন্নেসা গর্জে বলল

“প্রহরী। কারাগারে পাঠাও এদের।”

দুজনে সমস্বরে বলে উঠলো

“নাআআআআ, আমরা রাজি, আমরা রাজি”

মেহেরুন্নেসার ঠোট প্রশস্ত হয়।

****

জমিদার বাড়ির ঘাঁটবাধা পুকুরের সিঁড়িতে বসে কাপড় কাচছিল সিমরান। মেহেরুন্নেসার কাপড় জামা ধোয়ার দ্বায়িত্ব আজ থেকে সিমরানের। আর ঘর পরিষ্কার করার দ্বায়িত্ব মারজান এর। মাঝে মাঝে বিরক্ত মুখে বিড়বিড়ও করছে। আবিদ যদি মহলে এসে এই ঘটনা শোনে অমেক বড় বেইজ্জতি হয়ে যাবে সে। আবার ভাবে, তাহলে তো বিয়েটাও বাতিল হতে পারে। কিন্তু এভাবে সম্মানিত হয়ে বিয়ে বাতিল হওয়ার কোনো মানেই হয় না। ঝুঁকে কাপড় পানিতে ভিজানোর সময় শো শো করে এক তীর গিয়ে বিধলো পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটায়। সিমরান আতঙ্কিত হয়ে উঠে দাড়ালো।

“আক্রমণ!”

পরমুহূর্তেই শোঁ শোঁ শব্দ তুলে আরও কয়েকটা তীর এসে আছড়ে পড়ল পুকুরের পাশের গাছে। একটা কলসি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পানিতে ঢেউ ছড়িয়ে উঠল। সিমরান ভয়ার্ত চোখে মাথা তাকাতেই দেখতে পেল দূর থেকে কালো পোশাক পরা অশ্বারোহী বাহিনী ধেয়ে আসছে। সামনে নাসিরাবাদ এর পতাকা। সৈন্যদের মুখে হিংস্রতা, হাতে জ্বলজ্বলে তরবারি। সৈন্য দের চিৎকার শোনা যায়।

“দুশমন! দুশমন ঢুকে পড়েছে।”

মুহূর্তেই চারদিক বিশৃঙ্খলায় ভরে গেল। ঘোড়ার খুরের শব্দে কেঁপে উঠল মাটি। তীরের পর তীর ছুটে আসতে লাগল। সিমরান চোখে মুখ বুজে উঠে দিলো এক দৌড়। মহলের দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেখতে পেলো মেহেরুন্নেসা তলোয়ার হাতে ছুটে আসছে। সিমরান চলতি পা থামাতে গিয়ে পড়তে পড়তে বাচলো। পিছন ফিরে টেনে ধরলো মেহেরুন্নেসা কে।

“মেহের, মেহের যেও না।”

মেহেরুন্নেসা রক্তচক্ষু নিয়ে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সিমরানের থেকে। সিমরান ছিটকে দূরে পরে ফের উঠে আসলো হাঁপাতে হাঁপাতে। জাপটে ধরলো মেহেরুন্নেসার পা

“যেও না মেহেরুন্নেসা, মাহাদি মহলে নেইইইই। তারা শাহজাদা কে নিয়ে কোথাও বেড়িয়েছে। তুমি তাদের সাথে পেরে উঠবে না। মহলে ফেরত চলো। সব খিলান বন্ধ করে দিতে বলো”

মেহেরুন্নেসা বিশ্বাস করলো না সিমরান এর কথা। তাকে ছাড়িয়ে ছুটে গেল প্রাসাদ প্রাঙ্গণে। শুরু হলো পুরো দমে লড়াই। সৈন্যরাও ঝাপিয়ে পড়লো অঙ্কুরের বাহিনী দের ওপর। চন্দ্রা তলোয়ার হাতে কুপোকাত করতে লাগলো একেক জনকে। সিমরান ভিতরে না গিয়ে ফের এসে দাঁড়িয়েছে মহলের বাইরে। সব মেয়েরা বাইরে, সিমরান এর মন সায় দিচ্ছে না ভিতরে যেতে। সুনেহেরা একের পর এক তীর ছুড়ছে শয়তান গুলোর দিকে। এক পর্যায়ে তারা ফের পরাজিত হলো। পালালো কয়েকজন ঘোড়া ছুটিয়ে। ঠিক তখনই সিমরান এর চোখ পড়লো মূল ফটকের সামনে সাদা ঘোড়ায় এক নারী তীর তাক করছে মেহেরুন্নেসার দিকে। কে জানে কি হলো সিমরান এর। সাত পাঁচ না ভেবে প্রিয় শত্রুর দিকে ছুটে আসা তীরের সামনে বুক পেতে দিল নির্দ্বিধায়। চকচকে তীক্ষ্ণ তীর টা বুকের এক পাশ দিয়ে ঢুকে পিঠ ফুঁড়ে বেড়িয়ে গেল। মরণ নাশা এক চিৎকার দিয়ে উঠলো মেহেরুন্নেসা। হাতের তলোয়ার ফেলে ছুটে এলো সিমরান এর কাছে। কিন্তু মেহেরুন্নেসা আসার আগেই তীর বিদ্ধ সিমরান ছিটকে পড়ে গেল পুকুরে। মেহেরুন্নেসাও ঝাপ দিল তৎক্ষনাৎ। সে ভুলেই গেছে যে সাঁতার পারে না। পানি সেখানে অল্প ছিল নেহাৎ। নয়তো আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটে যেত।

ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল অঙ্কুরের বাহিনী। কয়েকজন আহত সৈন্যকে টেনে নিয়ে দ্রুত ঘোড়া ঘুরিয়ে পালিয়ে গেল তারা। চারপাশে শুধু আতঙ্ক আর ধোঁয়াটে অস্ত্রাঘাত।

মেহেরুন্নেসা আকড়ে ধরলো সিমরান কে। তার চোখ জোড়া বুজে আসছে। রক্তে পুকুরের পানি লাল হয়ে উঠেছে। মেহেরুন্নেসা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদে

“এই সিমরান আপাআআআআ, এই শুনছো তুমি? চোখটা খোলো নাআআআ। আমি নেওয়াজ কে কথা দিয়েছি তোমাদের বিবাহ ধুমধাম করে দিব। সম্রাজ্ঞী কথার খেলাপ করতে পারে নাআআআ। ওঠোওওওও। ওঠোওওওও নাআআআ”

মেহেরুন্নেসার আহাজারি তে সিমরান নিভু নিভু চোখে তাকায়। রক্তাক্ত হাত খানায় মেহেরুন্নেসার গাল ছুঁয়ে বলল

“আ…আমাকে ক্ষমা করে দিও বোন। আ..আস..লে, আসলে আমি অ…অত..অতটাও খারা…খারাপ নই। ছোটবেলা থেকে শাহজাদা কে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম তো। তা…তাই তোমাকে হিংসে করে ফেলতাম। আমি কখনো তোমার ক্ষতি করতে চাইনি। আম্মা…আম্মার কথা না শুনলে। আম্মার কথা না শুনলে আম্মা আমায় চাবুক দিয়ে মারতো। আমি কাওকে কখনো বলতে পারিনি কথা গুলো। আমি….আমি ওই ছোট.. ঘরটা….”

সিমরান গা ছেড়ে দিয়েছে। মেহেরুন্নেসা বুঝলো তার প্রাণপাখি টা উড়াল দিয়েছে দূর অজানায়। সিমরান এর মাথাটা বুকে চেপে ধরে গগনবিদারী কান্নায় ভেঙে পড়লো সম্রাজ্ঞী। এ এক বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হলো সাহাবাদ বাসী। দুই শত্রু একে অপরের জন্য উন্মাদ। একজন প্রিয় শত্রুকে বাঁচাতে নিজে জীবন দিল। আরেকজন শত্রুর মৃত্যু তে উন্মাদের মত কাঁদছে।

“এই সিমরান আপা? এই আপা ওঠো নাআআআ। আমি তোমার শাহজাদা কে কেড়ে নিয়েছিলাম না? তুমি আমায় শাস্তি দাওওওওও। তবুও তুমি যেও নাআআআ”

ততক্ষণে সে অনেক দূর চলে গেছে। প্রহরী রা পানিতে নেমে তাকে ডাঙায় ওঠালো। দাসীরা মেহেরুন্নেসা কে মহলে আনলো। চন্দ্রা পাগলের মত কাঁদছে সিমরান এর লাশের পাশে বসে। তার এক বোন আরেক বোনকে মেরে ফেলল। মারজান নাটকীয় কান্না জুড়ে বসেছে। সকলের এই কান্নাকাটি তে একদম শক্ত সুনেহেরা। সুনেহেরার চোখে এক ফোঁটা পানি নেই। প্রতিশোধের তাড়না তার সব অশ্রু গিলে নিয়েছে। শরীরে আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। এর বদলা খুব ভয়ংকর ভাবে নিবে সে।

***

রাত গভীর। চারপাশে অস্বাভাবিক নীরবতা। উত্তরের প্রাসাদটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অভিশপ্ত দুর্গ। প্রাসাদের চারদিকে মশাল জ্বলছে, প্রহরীরা টহল দিচ্ছে সতর্ক চোখে।

সেসময় দূর থেকে ভেসে এলো ঘোড়ার খুরের শব্দ। প্রথমে আস্তে শোনা গেলেও ধীরে ধীরে তা ভয়ংকর হয়ে উঠল। একজন প্রহরী কপাল কুঁচকে তাকালো সামনে। আরেকজনকে বলল

“ভাই কিছু শুনতে পাচ্ছি?”

“পাচ্ছি তো। কে আসছে বলতো। এই কে রে ওখা….”

কথা শেষ হওয়ার আগেই শোঁ করে একটা তীর এসে বিদ্ধ হলো তার গলায়। সাথের জন চিৎকার দিয়ে উঠলো। কালো পোশাকে ঢাকা একজন অশ্বারোহী ঝড়ের মতো ঢুকে পড়ল প্রাসাদের ভেতর। মুখ ঢাকা কালো কাপড়ে, হাতে রক্তমাখা তরবারি। ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামতেই এক সৈন্য তরবারি উঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর দিকে। সুনেহেরা এক ঝটকায় আঘাত ঠেকিয়ে লোকটার বুক চিরে দিল। চারপাশ রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।

তলোয়ারের ঝনঝন শব্দ, আহতদের আর্তনাদ, আগুনের আলো আর ঘোড়ার শব্দে কেঁপে উঠল পুরো উত্তর প্রাসাদ।

সুনেহেরা রণদেবীর রুপে যম হয়ে এসেছে।

একজন দুজন একের পর এক সৈন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল ওর আঘাতে। তরবারি চালানোর ভঙ্গিটা এত দ্রুত ছিল যে অনেকেই আঘাত আসার আগেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল।

একসময় প্রাসাদের ভেতর আগুন ছড়িয়ে পড়ল। আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করল অঙ্কুরের লোকেরা।

সুনেহেরা রক্তমাখা তরবারিটা শক্ত করে ধরে হুংকার দিল

“বেড়িয়ে আয় কাপুরষ। ঘোষণা ছাড়া আক্রমণ করা কাপুরষ তুই। সাহস থাকে তো আমার মোকাবিলা কর। পিছন থেকে আক্রমণ করিস কাপুরুষের মতো।”

অঙ্কুর বেরোবে মরতে এখন? সুনেহেরা আবার ঘোড়ায় উঠে বসল। নিহত সৈন্যদের পড়ে থাকা দেহ রেখে রাতের অন্ধকার চিরে দ্রুত ছুটে চলে গেল সুনেহেরা।

দীর্ঘ টানা পথ পেরিয়ে অবশেষে সাহাবাদে ফিরল বাইজিদ। ক্লান্ত ঘোড়াটাও যেন হাঁপিয়ে উঠেছে।

আজ মহলের পরিবেশটা অদ্ভুত নীরব ঠেকলো বাইজিদ এর কাছে। চোখ সরু করে মাহাদি কে বলল

“কি হয়েছে বলোতো। সব আছে তো? মহল এমন গুমট লাগঋে কেন?”

“রাত অনেক। সেজন্য হয়তো হুজুর”

বাইজিদ ঘোড়া থেকে নামতেই একজন সৈন্য মাথা নিচু করে এগিয়ে এলো। মুখটা ফ্যাকাশে।

“শাহজাদা…”

বাইজিদের বুক কেঁপে উঠল। কোনো অশুভ ইঙ্গিত তার মনে নাড়া দিয়ে উঠলো।

“কি হয়েছে?”

লোকটা উত্তর দিতে পারল না। শুধু কাঁপা হাতে অন্দরের দিকে ইশারা করল। বাইজিদ দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকল। অন্দরমহলের করিডোরজুড়ে নিস্তব্ধতা। বাতাসে তীব্র ঔষধ আর রক্তের গন্ধ।

হঠাৎই থেমে গেল বাইজিদের পা। মেঝের ওপর সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা নিথর দেহ। চারপাশে কয়েকজন দাসী কান্না চেপে দাঁড়িয়ে আছে।

বাইজিদের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কাপড়টা সরাতেই জমে গেল সে।

“সিমরান।”

বাইজিদ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। বিশ্বাসই হচ্ছে না কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মানুষটাকে দেখে গেছে, এখন সে নিথর পড়ে আছে সামনে। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল বেরোনোর আগের মুহূর্তটা। সিমরান দৌড়ে এসেছিল তার কাছে। মুখভরা অস্থিরতা নিয়ে বলেছিল

“শাহজাদা… আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই…”

তখন তাড়াহুড়োয় থামেনি বাইজিদ। শুধু বলেছিল

“ফিরে এসে শুনবো।”

ফিরে এসে শুনবো! কথাটা মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। বাইজিদ নিচে বসে নিথর সিমরানের ঠান্ডা হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।

“কি বলতে চেয়েছিলেন সিমরান…?”

গলাটা ভেঙে এলো তার। কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কেউ আর বেঁচে নেই। জমিদার দের কবরস্থানে কবর খোড়া হচ্ছে সিমরান এর জন্য। একটু পর তাকে শায়িত করা হবে। বাইজিদ এর চোখ যায় সিড়ির পাশে। প্রাণহীন এর মত বসে আছে নেওয়াজ। মনে হচ্ছে সেও মৃত। চারিদিকে চোখ বোলালো বাইজিদ। সব কেমন মৃত মৃত লাগছে।

বাকের শাহ্ ভেঙে পড়েছেন খুব। সেই যে বন্ধু কে দাফন করে এই মেয়েটাকে নিয়ে আসলো। পিচ্চি মেয়েটা তার হাত ধরে মহলে এসেছিলো। চেষ্টা করেছে সবসময় রত্না আর সুনেহেরার মতন করে রাখতে। তিনি রেখেছেন ও তাই। কত সাধ করে পছন্দের নায়েব টার সাথে বিবাহ ঠিক করলো। নিয়তি এত নিষ্ঠুর কেন হলো তাদের ওপর। এমনই এক রাত ছিল আট বছর আগে। বাইরে তুমুল বর্ষণ। ঝড় বৃষ্টির মধ্যে অর্ষা কে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছিলো নরপিচাশের দল। মেয়েটিকে আর ফিরে পায়নি তারা। রাজ্যের বহু মেয়ে বউ কে নিয়ে গেছে জানোয়ার গুলো। আর কতকাল শোষিত হবে সাহাবাদ? আর কত তাজা প্রাণ কেড়ে নেবে? চারিদিকে সকলকে দেখা গেলেও সুনেহেরা কে দেখলো না বাইজিদ।

মেহেরুন্নেসা মাদুরে অজ্ঞান অবস্থায় পরে আছে। কয়েকজন দাসী মাথায় মানি ঢালছে, পায়ে তেল মালিশ করছে। বাইজিদ সিপাহী কে জিজ্ঞেস করলো

“কি করে হলো এসব?”

“হুজুর, আমরা যে যার কাজে ব্যাস্ত ছিলাম। এমন সময় উত্তর প্রাসাদে থাকা শত্রুদল আচমকা আক্রমণ করে বসে। সেখান থেকেই তীর বিদ্ধ হন উনি”

বাইরে থেকে খবর আসে কবর খনন সম্পন্ন। মৃতদেহ গোসলের জন্য নেওয়া হবে। এতরাতেও রাজ্যবাসী ছুটে এসেছে। মহিলারা ভিড় করেছে।

“আমরা শেষবারের জন্য দেখতো এসেছি। লাশ কোথায়?”

মহিলাটির কথায় বাইজিদ তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। মাহাদি অবাক চেয়ে তার পানে। বাইজিদ মাহাদির দৃষ্টি লক্ষ্য করে বলল

“কি বুঝলে বন্ধু?”

মাহাদি উত্তর দিল না। বাইজিদ ফের বলল

“মৃত্যুর পর মানুষ প্রথমেই নিজের নাম হারায়। প্রিয়জন রাও এসে বলছে লাশ কোথায়?”

মাহাদি চকিতে তাকালো বাইজিদ এর কথা শুনে। আসলেই তো। কেউ তো এসে বলছে না সিমরান কে দেখতে এসেছি। সবাই বলছে লাশ দেখতো এসেছি।

আজকের পর্বটা লিখতে গিয়ে ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। মৃত্যুই পারে মানুষ কে প্রিয় বানাতে 🙃। মৃত্যুর পর মানুষ নিজের পরিচয় হারায়। প্রিয়জন রাও মুখ দেখে গিয়ে গোসল ছাড়া ঘরে ঢোকে না। ছোয়া লাগলে হাত ধুয়ে ফেলে। ইশশশ লাশ ছুঁয়েছে। কিসের এত অহংকার তাহলে জীবনে?

কেমন লাগলো আজকের পর্বটা?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply