দুইজনাতেই
পর্ব_০৮
লেখনীতেঃ অলকানন্দা ঐন্দ্রি
দ্বিতী তখনও ওভাবেই ঘাড় বাঁকিয়েই তাকানো। অপেক্ষা করছিল সাক্ষ্য ঠিক এরপরেই কোন মিথ্যেটা বলে তা শোনার জন্য। ঠিক এর পরই সাক্ষ্য আরো একবার জিজ্ঞেস করল,
“ তৈরি হয়নি আন্টি? ”
অদিতি আহমেদ কিঞ্চিৎ ভড়কালেন। মেয়ে এত রাতে ঘুরতে বের হবে অথচ তাকে বলল না? কই? তৈরিও তো হলো না। সে তখন থেকে মুখটা কেমন করে বসে আছে। অবশ্য তার মেয়েটাই তো এমন। আস্ত একটা ঘাড়ত্যাড়া। ছোটশ্বাস ফেলে মেয়ের উপর দোষ দিতে দিতেই বললেন তিনি,
“ আর বলো না সাক্ষ্য! আমার মেয়েটাতো একদমই অগোছালো। হয়তো ঘুরতে যাবে মনে ও নেই। ওকে নিয়ে যে কি করি। তুমি একটু এসে বসো। ওকে বলছি আমি। ”
সাক্ষ্য ঠিক তার একটু পরই পা রাখল। বাসায় ডুকেই একনজর ভ্রু বাকিয়ে চাইল দ্বিতীর দিকে। দুইজনেরই ব্রু বাঁকানো। দ্বিতী তৎক্ষনাৎ ই বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। সাক্ষ্যর মুখোমুখি হবে না বলে জেদ দেখিয়ে রুমের দিকে তড়িৎ গতিতে পা বাড়াতেই অদিতি আহমেদ বলে উঠলেন,
“ দ্বিতী, কোথায় যাচ্ছিস? এটা কোন ধরণের অভদ্রতা? সাক্ষ্যকে দেখছিস না? কথা বল ওর সাথে। ”
দ্বিতী শুধু মুখ ভেঙ্গাল। যেতে যেতে পা বাড়িয়েই তেজ নিয়ে বলল,
“ আমি কেন বলব? বান্ধবীর ছেলেকে মেয়ের বর করার জন্য তো তুমি উঠে পড়ে লেগেছিলে। তুমিই বলো কথা। ”
“ দ্বিতী এটা কেমন আচরণ করছো হুহ? এখানে বসে সাক্ষ্যর সাথে কথা বলো। নিয়তো রুমেই বলতো পারো, সমস্যা নেই। কিন্তু এমন অভদ্রের মতো ব্যবহার করবে না। ”
এইটুকু রূঢ স্বরে বলেই দ্বিতীরা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। মেয়ের জামাই বলর কথা। ছেলেটা গম্ভীর, শান্ত, কম মিশে কিন্তু এখন সবার উর্ধ্বে এ ছেলেটা তার মেয়ের জীবনসঙ্গী। অসম্মান করলে চলে? এইটুকু ভেবেই ছোটশ্বাস ফেললেন উনি।
অন্যদিকে দ্বিতী বিরক্ত। তিক্ত বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে ওভাবেই দাঁতে দাঁত চেপর দাঁড়িয়ে রইল। সাক্ষ্য এবারে স্থির চাহনিতে দেখল ভ্রু কুঁচকে। একটা হোয়াইট টিশার্ট,আর স্কাই ব্লু কালারের স্কার্ট। চুলগুলো এলোমেলো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মুখে-চোখে, গায়ে, ঘাড়ে। পুরোটা জুড়েই এলোমেলো ভাব। সাক্ষ্য আড়ালেই হাসল মৃদু। তারপর এগিয়ে দাঁড়াল দ্বিতীর সামনেই। একটু আগে পাল্টা জবাব দিল মেয়েটা? কি ভেবেছে, সাক্ষ্য বুঝেনি? সাক্ষ্য ঠিক ওভাবেই চেয়ে চোখে হাসল। দ্বিতী ততক্ষনে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে সোফাতেই বসল সাক্ষ্যর সামনে। চাহনি তীক্ষ্ণ। যেন এক্ষুনিই সাক্ষ্যকে মাথায় তুলে আঁছাড় দিয়ে শেষ করে দিবে। সাক্ষ্য বোধহয় বুঝল ওর মনবাসনা। দ্বিতী যেভাবে বসা ছিল ঠিক ওভাবেই ঝুঁকে দ্বিতীর দুপাশে হাত রাখল সোফাতেই। ঘাড় ফিরিয়ে একবার চাইল রান্নাঘরের দিকেও। পরমুহুর্তেই ফের ঘাড় ফিরিয়ে দ্বিতীর চোখে নজর ফেলল সরাসরি। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ মারতে চেয়েছিলেন না মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম? নিন মারুন। আপনার হাতে সাত খুনও মাফ। ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকে তাকাল। এই লোক সাক্ষ্যাৎ গিরগিটি । কিভাবে রং চেঞ্জ করে! দ্বিতী ওভাবেই রাগ ফুসে উত্তর করল,
“ আপনাকে মেরে ফেললে আপনার মেয়ে স্টুডেন্টদের কি হবে? ওরাও তো অকালে মরে যাবে। এতজনকে মেরে ফেলার গুনাহ আমি জেনেবুঝে নিজের ঘাড়ে নিব? ”
“ তো কি নিতে চাইছেন ঘাড়ে? আমাকে? ”
দ্বিতী নাক কুঁচকাল। চরম অনীহা দেখিয়ে দ্রুত বলল,
“ কুকুরে কাঁমড় দিছে আমাকে? এতকিছু থাকতে আপনাকে নিব? কেন ভাই? আমার মাথা খারাপ হুহ? ”
সাক্ষ্য এবারে চাপা হাসল। ওভাবেই ফের বলল,
“ নিয়ে তো নিয়েছেন। ”
” কক্ষনো না। ”
” ওকে, একটু আগে কি যেন বললেন? কে উঠে পড়ে লেগেছিল যেন…”
দ্বিতী তৎক্ষনাৎ স্পষ্ট স্বরে উত্তর করল,
“ অবশ্যই আম্মু। আম্মুর জন্যই আমি সেদিন কবুল বলেছিলাম। আম্মুর না বললে আমি জীবনেও আপনাকে বিয়ের কথা ভাবতাম না। ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকায়। যেন হাসি পেল খুব।ভ্রু নাচিয়ে ফের বলল,
“ রিয়েলি? আপনার আম্মু না বললে তো আপনি তাকাতেন ও না এত বছর যাবৎ তাই না? নেহাৎই অদিতি আন্টি বলেছে বলে তাকিয়েছিলেন। ”
দ্বিতীর ইচ্ছে হলো রাগে সাক্ষ্যকে ঠেলে ফেলতে। অথচ পারল না। নির্ঘাত এখন তার আম্মুর সামনে সত্য মিথ্যা বলে দ্বিতীকে কথা শোনাবে। সাক্ষ্য ফের আবারও চোখে হেসে বলল,
“ আপনি তো উঠে পড়ে লাগেননি তাই না দ্বিতীকা? শিওর, রাইট? ”
সাক্ষ্যর মুখে এমন একটা ভাব যেন সে সব জানে।যেন মজা নিচ্ছে। চোখে একটা হাসি খেলছে। দ্বিতীর কাছে তা অসহ্য লাগল কেবল। আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল,
“ শুনুন, আমি উঠে পড়ে লাগিনি মিস্টার, আর নাতো তাকিয়েছি। নেহাৎ ই বাধ্য হয়ে কবুল বলেছিলাম। নয়তো আপনার মতো গিরগিটিকে কখনোই বিয়ে করতাম না। ”
“ করে তো ফেলেছেন। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ ভালো করেছি। আপনার সমস্যা? নাকি অসুবিধে হচ্ছে? ”
“ প্রচুর! আপনি বুঝতে পারছেন না? ”
দ্বিতীর নজর সরু হলো কেবল। বিরক্ত লাগছে ওর এই সাক্ষ্য এহসানকে। রাগে গা জ্বলছে ক্রমশ। চোখ বুঝল ও। তিক্তবিরক্ত হয়ে পরমুহুর্তেই বলল,
“ দূরে সরুন। এমন ঝুঁকে কথা বলে কি প্রমাণ করছেন? ”
“ প্রমাণ করছি যে, আমি বিবাহিত। ”
দ্বিতী চোখ খুলে চাইল। ঠিক সাক্ষ্যর মতো করেই চোখ সরু করে তাকাল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ রিয়েলি? রিয়েলি আপনি বিবাহিত মিঃ সাক্ষ্য এহসান৷ জানতাম না তো। ”
সাক্ষ্য হার মানল না। একইভাবেই ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ জানাব? ”
ঠিক তখনই শোনা গেল রান্নাঘর থেকে আসা পায়ের আওয়াজ। সাক্ষ্য এতোটা সময় ঝুঁকে থাকলেও এবার কি সুন্দর সরে দাঁড়াল। একদম কিছুই করে নি এমন একটা ভাব নিয়ে বুকে হাত গুঁজে ভদ্র ছেলের মতো দাঁড়াল। দ্বিতী ভ্রু কুঁচকাল। ক্ষ্রিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“ ভয় পেলেন নাকি? শুনুন, এত নাটক কোথায় থেকে শিখেছেন ভাই? প্লিজ আমিও শিখব! সাজেস্ট করুন.. ”
“ পড়ালেখাতেই তো ভালো সিজিপিএ তুলতে পারেন না। আবার অভিনয়ে টাইম দিবেন? এবার নির্ঘাত প্রতি সেমিস্টারে ফেইল জুটাবেন? ”
দ্বিতভ রেগে তাকাল। নাকটা ফুলে উঠেছে লাল হয়ে। বলল,
“ তাতে আপনার কি? আমার লাইফ আমি বুঝব। ”
ঠিক ঐ সময়টাতেই দ্বিতীর মা এল। খাবারগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখতে রাখতেই দ্বিতীতে ধমকে বলল
” দ্বিতী! তুমি সাক্ষ্যর সাথে এভাবে কেন কথা বলো? এসব অসভ্যতা বাদ দিবে কবে? ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্যর দিকে চাইল। হেসে বলল,
“ একি! তুমি এখনো দাঁড়িয়ে আছো সাক্ষ্য। দ্বিতী বসতেও বলেনি? আমার মেয়েটা একটু অভদ্র তো। বুঝোতো..বসো বাবা। ”
দ্বিতী শুধু ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কি ভদ্র ছেলে। আহা, কি ভদ্র রূপ! যেন ভাজা মাছটাই উল্টে খেতে পারে না। দ্বিতীর মা আবারও বলল দ্বিতীকে,
“ কোথায় ঘুরতে যাবে বলেছো? গেলে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আসে। ছেলেটা কতক্ষন অপেক্ষা করবে? ”
দ্বিতী শুধু জানাল,
“ যাব না ঘুরতে। আমার কি স্টুডেন্ট আছে? নেই। স্টুডেন্ট থাকলে তাকে নিয়ে ঘুরতে যেতাম। ”
দ্বিতীর মা বোধহয় বুঝে উঠল না কথাটা। ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই দ্বিতী আবারও বলল,
“ বুঝলে আম্মু? সুন্দরী স্টুডেন্টের অভাবে ঘুরতে যেতে পারছি না। আফসোস! মানুষের মতো আমাদের তো সুন্দরী স্টুডেন্ট থাকে না। দুঃখ..”
দ্বিতীর মা কিছুক্ষন চাইল। এরপর বলল,
” উল্টোপাল্টা কথা বাদ দিয়ে তৈরি হও গিয়ে। ছেলেটা দূর থেকে এল। যাও তাড়াতাড়ি..”
“ যাব না আম্মু। এই লোকের সাথে আরো যাব না। ”
দ্বিতীর মা এবার চোখ রাঙালেন। পিছে বলে তা একটা কথা। এভাবে সাক্ষ্যর সামনেই মেয়েটা এভাবে বলছে। ধমকেই পাঠাল এবারে দ্বিতীকে। দ্বিতী বেচারা শুধু রুমেই গেল। তৈরি হলো না। ওভাবেই রুমে গিয়ে রাগ পুষল। এর পর ঠিক আধঘন্টায় দ্বিতীর আম্মুকে দ্বিতীকে তিনবার ডেকেছে।সাক্ষ্য শুধু ঘড়িতে সময় দেখছিল। অবশেষে ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে মোবাইল নিয়ে দ্বিতীকে ম্যাসেজ করল,
“ শুনুন ম্যাম, আর দশ মিনিটের মধ্যে বের না হলে কোলে করেই যাবেন। ওভাবে, অগোছালো হয়েই যাবেন। তবুও যাবেন। আপনার আম্মুর সামনে দিয়েই কোলে করে নিয়ে যাব। সাথে আপনার হাজারটা বাঁধরামো ফাঁস করব। ”
দ্বিতী ম্যাসেজটা দেখে আরো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। ভয় পায় সে সাক্ষ্য এহসানকে? মোটেও না। সাক্ষ্য তার কীর্তি ফাঁস করলে সেও ফাঁস করবে। দ্বিতী যখন এসবই ভাবছিল ঠিক অপর পাশ থেকেই দ্বিতীর আম্মু অনেকগুলো কথা শোনাল। কিছু কড়া কথা, আবার কিছু নরম গলায় বলা কথা। সব মিলিয়ে দ্বিতী অবশেষে মৌন রইল কিয়ৎক্ষন। তারপর নিজেই বিড়বিড় করল,
“ একটা মিথ্যুক, গিরগিটি লোক! ঘুরতে যখন যাবই আপনার মাথাও ঘুরিয়ে ছাড়ব। দেখে নিয়েন। ”
এইটুকু বলে ওভাবেই অগোছালো ভাবেই বের হলো। না চুল বাঁধল, না জামা পড়ল, কিছুই নয়। শুধু মাকে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“ কোথায় তোমার বান্ধবীর ছেলে? চলে গেছে? ”
তার মা শুধু বলল,
“ এভাবেই যাবে? চুলটা অন্তত বাঁধতে?”
“ লাগবে না। ”
দ্বিতীর মা আর কিছু বলল না। দ্বিতী পা বাড়িয়ে গেল। সাক্ষ্যর সামনে যেতেই সাক্ষ্য চোখে হাসল। ঠোঁট আওড়িয়ে বলল,
“ গুড গার্ল! ”
দ্বিতী মুখ কুঁচকাল। মনে হয় এই প্রশংসা শোনার জন্যই সে এসেছে? যত্তসব! অতঃপর সাক্ষ্য দ্বিতীর মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে পা বাড়াল। দ্বিতীও বাড়াল রাগ ফুঁসতে ফুঁসতে। যেতে যেতেই সর্বপ্রথম বলল,
“ মিথ্যেটা কেন বললেন? ”
“ কোন মিথ্যে? ”
“ এসেই যা বললেন। ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল? কখন? নাকি ভুলে অন্য কারোর সাথে প্ল্যান করে এখানে চলে এসেছেন? ”
সাক্ষ্য তাকাল দ্বিতীর দিকে মনোযোগ দিয়েই। অতঃপর যাচাই বাছাই করার মতো ভঙ্গিমা করে বলল,
“ নাহ তো, রাইট পার্সন, রাইট প্লেস, রাইট এড্রেস! ভুল হওয়ার চান্সই দেখছি না। ”
চলবে…..
Share On:
TAGS: অলকানন্দা ঐন্দ্রি, দুইজনাতেই
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৮
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৩
-
দুইজনাতেই পর্ব ৯ ও ১০
-
দুইজনাতেই পর্ব ১১
-
দুইজনাতেই পর্ব ১৮
-
দুইজনাতেই পর্ব ৪০
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৪
-
দুইজনাতেই পর্ব ২৫
-
দুইজনাতেই পর্ব ১২
-
দুইজনাতেই পর্ব ২৯