#ডাকপ্রিয়র_চিঠি
#লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
৩৪
সূর্যটা মাথার উপর। তপ্ত গরমে অতিষ্ঠ মানবগোষ্ঠী। ঢাকা ব্যস্ত নগরী, ঘনবসতির এলাকা। মারিদ রাস্তায় জ্যামে আটকে। কপাল কুঁচকে বারবার বাম হাতের ঘড়িতে সময় দেখছে। নিজেদের কনস্ট্রাকশন সাইট ভিজিট করে বাবার অফিসে যেতে জ্যামে আটকা পড়েছে সে। সামনের হলদেটে রঙের পাবলিক বাসটা থেকে বের হওয়া কালো ধোঁয়া জ্যামের বাতাসকে আরও ভারী, বিষাক্ত করে তুলেছে। জ্যাম নড়ার কোনো লক্ষণই নেই; বরং যতদূর চোখ যায়, মনে হচ্ছে সারিবদ্ধ গাড়ির একটা আস্ত মেলা বসেছে রোডে। হাসিব ড্রাইভারের সঙ্গে সামনে বসে। গাড়িতে এসি চলছে। মারিদ বেশ বিরক্ত হচ্ছে গাড়িতে বসে থাকতে। পাশের সিটে অবহেলায় ফেলে রাখা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। স্ক্রিনে মাজিদের নাম ভাসছে।
থানচি থেকে মারিদরা ঢাকা ফিরে এসেছে আজ দশ দিন হতে চলল। এই দশ দিনে হাসান, মাজিদের সঙ্গে মারিদের যোগাযোগ ছিল। শুধু মারিদ একা নয়, মাহবুব মকবুলেরও ফোনে কথা হয় হাসান-মাজিদের সঙ্গে। মারিদের মা সালমা সৈয়দ প্রথম কয়েক দিন কান্নাকাটি করেছেন ছেলে হঠাৎ বিয়ে করে নেওয়ায়, পরে সবার বোঝানোতে উনার কান্নাকাটি বন্ধ হয়েছে। মারিদের বউ নূরজাহানকে সবাই দেখতে চেয়েছিল; কিন্তু নূরজাহানের ছবি মারিদ কিংবা অন্য কারও ফোনে ছিল না বিধায় সৈয়দ বাড়ির কেউ এখনো মারিদের বউকে দেখেনি। মাহবুব হীরা চৌধুরীকে বলেছিলেন উনাদের ফিরে আসার দিনই নূরজাহানের একটা ছবি তুলে নিয়ে আসতে বাড়ির সবাইকে দেখানোর জন্য, কিন্তু নূরজাহান অনেক অসুস্থ থাকায় তিনি এই বিষয়ে পরে আর জোর দেননি। নূরজাহানের সঙ্গে সৈয়দ পরিবারের এখনো কারও কোনো কথা হয়নি। সৈয়দ বাড়ির মানুষ জানে নূরজাহান অসুস্থ, কিন্তু নূরজাহানের আসলে কী হয়েছে সেটা কেউ উল্লেখ করেনি কেউ। মাহবুব নিষেধ করেছেন বাড়িতে কাউকে এসব বিষয়ে না বলতে, সেজন্য মারিদ নূরজাহানের বিয়ে কীভাবে হয়েছে সেটা এখনো গোপন রেখেছে সবাই। বাড়িতে সবাই জানে, মারিদ পছন্দ করে নূরজাহানকে বিয়ে করেছে। হীরা চৌধুরীও বলেছেন মারিদের বউ আসমানের পরীর মতো সুন্দর, তার চুল রূপকথার রাপুনজেলের মতো লম্বা। হীরা চৌধুরীর কথায় সালমা আশ্বস্ত হন মারিদ উত্তম কাউকেই বিয়ে করেছেন বলে।
দুই-তিন দিন ধরে বাসার সবাই মারিদের মাথা খেয়ে ফেলছে মারিদের বউয়ের ছবি দেখতে চায় বলে। মাজিদ এতদিন নৌঘাঁটিতে ছিল বলে নূরজাহানের ছবি কেউ তুলে দিতে পারেনি। সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় আজ শুক্রবারে মাজিদ বাড়িতে ফিরেছে। মারিদকেও নূরজাহানের একটা ছবি তুলে দেওয়ার কথা। মাজিদ-সাজিদ বাদে ওই বাড়িতে কেউ স্ক্রিনটাচ ফোন ব্যবহার করে না। ঘরে হাসান একটা বাটন ফোন চালায়। নূরজাহানের ছোট ভাই আহাদের সঙ্গে এখনো মারিদের দেখা হয়নি। মারিদ মাজিদের ফোনটা রিসিভ করে কানে তুলে সালাম দিয়ে বলল…
‘আসসালামু আলাইকুম ভাই।
মাজিদ সালামের উত্তর দিয়ে বলে…
‘ওয়ালাইকুম সালাম মারিদ সাহেব। আপনার ফোনে নূরজাহানের কয়েকটা ছবি পাঠিয়েছিলাম। আঙ্কেল বলল আপনার আম্মা নাকি নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলতে চান, আমি কি ভিডিও কল দেব এখন?
‘ না এখন না। আমি এখন গাড়িতে আছি। রাতে বাড়িতে ফিরব। আপনাকে আমি আমার ছোট বোনের নাম্বার দিচ্ছি। ওর ফোনে কল করলে আম্মুকে পাওয়া যাবে।
‘জি আচ্ছা, দেন।
মাজিদ কল কেটে দিল। মারিদ মাজিদের হোয়াটসঅ্যাপে সুখের নাম্বারটা পাঠিয়ে মেসেজ চেক করতেই হঠাৎ যেন মারিদের বুক মুচড়ে উঠল স্নিগ্ধ, শান্ত, সরলা নূরজাহানের ছবি দেখে। মারিদ থমকে যাওয়ার মতো ঘোর লাগা দৃষ্টিতে নূরজাহানের ছবিতে ক্লিক করে জুম করল। নূরজাহান সাধারণ একটা সাদামাটা হলদে থ্রি-পিস পরে, মাথায় ঘোমটা টেনে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে। পায়ে একজোড়া স্যান্ডেল, দুপা একত্রে করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। কোনো ফিল্টার নেই, কোনো সাজগোজ নেই, গয়নাগাটি আর না আছে চেহারায় হাসি। শান্ত নদীর মতো স্নিগ্ধ আর পবিত্র লাগছে নূরজাহানকে দেখতে। যে কেউ এক দেখায় এই শান্ত, পবিত্র মেয়েটার প্রেমে পড়তে বাধ্য হবে। যেমন বাধ্য হচ্ছে এই মুহূর্তে মারিদ।
মারিদ নূরজাহানের ছবি তিনটে সেভ করে গ্যালারিতে রাখল। তার মধ্যে প্রথম দেখার ছবিটা নিজের ফোনের ওয়ালপেপারে সেট করে। নূরজাহানের ছবিতে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে স্পর্শ করে বিড়বিড় করে বলে…
‘আমি ডিস্টার্ব হয়েছি। ভীষণ বাড়াবাড়ি রকমের ডিস্টার্ব হচ্ছি অপরিচিতা।
মারিদ বুক ফুলিয়ে বেশ কয়েক বার নিশ্বাস ত্যাগ করে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় বিস্তর জ্যামের দিকে। অপরিচিতাকে তো মারিদ ঠিকই খুঁজে পেয়েছে, কিন্তু আজও অপরিচিতার ছলনার কারণ জানতে পারল না সে। যতক্ষণ না পর্যন্ত অপরিচিতা নিজে থেকে মারিদকে সবকিছু খুলে বলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মারিদ নিজের পরিচয় অপরিচিতাকে দেবে না। অপেক্ষায় থাকবে—কখন অপরিচিতা নিজে সবকিছুর খোলাসা করবে মারিদের কাছে।
মারিদের হঠাৎ কী মনে হওয়ায় হাসিবকে ডাকল…
‘হাসিব?
‘জি স্যার।
‘আমাকে একটা ভালো ফোন কিনে দিস তো।
‘কোন ব্র্যান্ডের কিনব স্যার?’
‘দিস, যেটা ভালো লাগে।’
‘কাকে দেবেন স্যার?’
‘ কাকে দিব সেই কৈফিয়ত দিলে তুই কিনবি নয়তো কিনবি না?
মারিদের ধমকে হাসিব আমতা আমতা করে বলে…
‘আসলে স্যার, ফোনটা কার জন্য এটা বললে ভালো হতো। এখন মানুষ তো ক্যামেরা খোঁজে ছবি-ভিডিও করার জন্য, সেজন্য বলছিলাম আরকি। বয়স্ক মানুষের জন্য ফোন কিনলে তো আর ভালো ক্যামেরার প্রয়োজন হবে না, তাই আরকি।
‘তোর ভাবির জন্য লাগবে।
হাসিব চট করে বুঝে গেল মারিদ নিজের বউয়ের জন্য কিনতে চাচ্ছে। হাসিব আর কথা না বাড়িয়ে ঝটপট বলল…
‘তাহলে আইফোন কিনি স্যার? আইফোনের ছবি-ভিডিও ভালো আসে। লেটেস্ট মডেলেরটা কিনি।
‘কিন।
‘তাহলে স্যার আজকেই কিনে ফেলি?
‘ওকে।
কয়েক মিনিট গাড়ীতে নিরবতা কাটে। মারিদ ফের নিরবতা ভেঙে বলে…
‘আচ্ছা হাসিব? তুই মেয়েদের পোশাক বুঝিস? দায়িত্ব দিলে কিনতে পারবি?
‘ না স্যার পারব না, আমি বুঝি না এসব।
মারিদ রেগে বলে…
‘তাহলে কী বুঝিস বা’ল?
হাসিব আমতাআমতা করে জবাব দেয়।
‘স্যার, আমি তো বিয়ে করি নাই, সিঙ্গেল।
‘তুই সারাজীবন সিঙ্গেলই মরবি।
‘স্যার, এমন বদদোয়া দিয়েন না স্যার। বিয়ে করা আমার ছোটবেলার স্বপ্ন। স্যার, বউয়ের জন্য স্বামী নিজের হাতে শপিং করলে রোজগারে বরকত আসে, ফজিলতও হয়। তাই ম্যাডামের শপিং আপনি নিজে করলেই ভালো হবে।
রাত নয়টার দিকে মারিদ বাসায় ফিরে বসার ঘরে হইচই দেখতে পেল। মা-বাবা, চাচা-চাচী, ফুফু, দাদা, চাচাতো ভাইবোন, সুখ, তাপস—সকলেই উপস্থিত, বসার ঘরে একত্রে বসে আছে সবাই। সালমা চৌধুরীর হাতে সুখের ফোন, তাতে ভিডিও কলে নূরজাহান বসে। নূরজাহানকে ঘিরে উপস্থিত সকলে হৈচৈ করছে। মারিদের বউ হিসেবে নূরজাহানকে দেখে সকলের পছন্দ হয়েছে। মাশআল্লাহ মাশআল্লাহ বলে বলে একেক জন মুখে ফেনা তুলে ফেলছে। ফোনের ওপাশে নূরজাহান এত বড় যৌথ সভা দেখে অস্বস্তিতে বারবার ঘেমে যাচ্ছে। নূরজাহানের পাশে আলেহা, তারানূর, আশনূর, হাসান, মাজিদ, নদী, মাজিদের দুই সন্তান—সকলেই মারিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলছে। ভিডিও কলে সবাই একত্রে জয়েন হয়েছে ঘণ্টাখানিকের বেশি সময় হয়েছে। তারানূর, হাসান বেশ খুশি মারিদের পরিবারের আন্তরিকতা দেখে। হাসান এই নিয়ে কয়েক শ বার মারিদের পরিবারকে দাওয়াত করে ফেলেছে উনাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতে। সৈয়দ শাহ, মাহবুব দুজনই বারবার দাওয়াত গ্রহণ করছে হাসিমুখে। সবাই কবে যাবে, কত দিন থাকবে—এসব আলোচনার আমেজও দেখা গেল সবার মাঝে। সুখ, সুফিয়া, আফিয়া, তামিম, রাতুল, রাদ, তাপস সকলে নূরজাহানকে ‘ভাবী ভাবী’ ডেকে অস্থির।
নূরজাহান গোলাপি রঙের একটা থ্রি-পিস পরে মাথায় ঘোমটা টেনে ভিডিও কলে চুপচাপ বসে। মারিদের পরিবারের কেউ কোনো প্রশ্ন করলে অস্বস্তিতে মাথা নুইয়ে উত্তর দিচ্ছে। মারিদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিবারের নূরজাহানকে ঘিরে হৈচৈ দেখল। বাম হাতে ছোট শপিং ব্যাগে কাগজে মোড়ানো নূরজাহানের জন্য কেনা নতুন আইফোনটি। মারিদ কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ নিজের রুমের দিকে যেতে চাইলে সুখ মারিদকে দেখে চিৎকার করে ডাকে…
‘ভাই, ভাই এদিকে এসো। আমরা সবাই ভাবীর সঙ্গে কথা বলছি। তুমিও আসো।
মারিদের উপস্থিতিতে সকলেই মারিদকে ভিডিও কলে জয়েন হতে বলল। নূরজাহান অস্বস্তিতে পড়ে যায় মারিদের নাম শুনে। সৈয়দ শাহ মারিদকে ডেকে নিজের পাশে বসালেন। মারিদের উপস্থিতিতে নূরজাহানের নত মস্তক আরও নত হয়ে গেল। সবার জোরাজুরিতে মারিদ ভিডিও কলে বসে ফোনের দিকে তাকাতে কপাল কুঁচকে গেল। নূরজাহানের নত মস্তক আরও নত হয়ে যাওয়ায় মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাথার ঘোমটাও বারবার টেনে নিজের মুখ ঢেকে নিচ্ছে। সৈয়দ শাহ নূরজাহানের মুখ দেখতে না পেয়ে নূরজাহানকে ডেকে বলেন…
‘অ নাতবউ, তোমার মাথার ঘোমটা সরাও। তোমার মুখ তো দেখা যায় না।
নূরজাহান ঘোমটা সরাচ্ছে না দেখে পাশ থেকে তারানূর রেগে নূরজাহানের ঘোমটা এক টানে কাঁধে ফেলে বলেন…
‘জামাইর লগে কিয়ের সরম। মাথা তুল, সোজা হইয়া ব। কথা ক জামাইর লগে।
নূরজাহান অস্বস্তিতে দ্রুত মাথায় ঘোমটা টেনে নেয়। মারিদ নূরজাহানকে এক পলক দেখে ছোট করে বলে…
‘সমস্যা নেই দাদী, ঠিক আছে।
নূরজাহান সবার সামনে মারিদের সঙ্গে কথা বলেনি সেটা যদি মারিদের পরিবার খারাপ ভাবে নেয়, সেইভেবে তারানূর নূরজাহানের হয়ে সাফাই গেয়ে বলেন…
‘ছোডো মানুষ। আপনেগোর সামনে সরম পাইতাছে জামাইর লগে কথা কইতে। আমাগো সামনে এহন কথা না কইলে হেরা জামাই-বউ আলাদা কইরা কথা কইব নে।
সৈয়দ শাহ সম্মতি দেন তারানূর বেগমের কথায়। মারিদ নূরজাহানের অস্বস্তি বুঝে উঠতে চাইলে সৈয়দ শাহ টেনে ধরে রেখে তারানূর ও হাসানকে বলেন…
‘আমাদের পরিবারের সবাই আগামী শুক্রবার মারিদের বউকে দেখতে আসতে চাচ্ছিল বিয়াইন। আপনারা যদি অনুমতি দেন তাহলে ওদের পাঠাব।
‘এইহানে অনুমতি লওয়ার কি আছে ভাইসাব? আপনেগো বাড়ির বউ, আপনেরা যহন খুশি তহন আইবেন, যাইবেন, এতে কেউর অনুমতি লওয়ার দরকার নাই।
তারানূরের কথায় সৈয়দ শাহ হেঁসে বললেন…
‘শুনে খুশি হইলাম বিয়াইন। আমার পরিবার তাহলে আগামী শুক্রবারে আসবে নূরজাহানরে দেখতে।
‘ আপনি আইবেন না ভাইসাব?
‘ আমি এতদূরে জার্নি করতে পারি না বিয়াইন। বুড়ো মানুষ, আমার শরীর ছেড়ে দেয়। বুকে চাপ পরে অসুস্থ হয়ে যায়। নাতির বিয়ের দিন একেবারে যাব নাত বউরে আনতে ইনশাআল্লাহ।
তারানূর, হাসান, মাজিদ সকলেই সম্মতি দিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আগামী শুক্রবারে সবাই থানচিতে যাবে মারিদের বউকে দেখতে। আজ রবিবার। আর মাত্র পাঁচ দিন পর। সবার কথাবার্তা শেষ, ফোন কেটে গেল। মারিদ মাত্র অফিস থেকে ফিরেছে বলে সে ক্লান্ত। ফ্রেশ হবে বলে উঠে গেল। সবাই বসার ঘরে বসে তখনো মারিদের বউ ও রিফাতের বউ নিয়ে আলোচনা করছে। দুই ছেলে এক রাতে বিয়ে করেছে। দুই ছেলের বউয়ের জন্য শাড়ি-গহনা কেনা প্রয়োজন। মাহবুব বাড়ির মেয়েদের বলে দিয়েছেন শাড়ি-গহনাগাটি যা যা প্রয়োজন পাঁচ দিনের মধ্যে কিনে নিতে। রিফাত এখনো নিখোঁজ। বাড়ির কারও সাথে যোগাযোগ নেই। এর মাঝে শোনা গেছে সে নাকি কলেজে যায় কিন্তু বাসায় ফেরে না। কেন ফেরে না কেউ জানে না। শান্তা তো রেগেমেগে রিফাতের অনুপস্থিতিতে বলে..
‘নিজের ছাত্রীরে বিয়ে করতে আমরা কইছিলাম? এখন যে আমাদের সাথে রাগ দেখিয়ে বাড়িতে ফিরে না। এখানে আমাদের কী দোষ?
সালমা সৈয়দ শান্তাকে আশ্বস্ত করে বলে…
‘আচ্ছা বাদ দেও। ছেলেমানুষ, রাগ কমলে এমনিই বাসায় ফিরে আসবে। তুমি বরং রিফাতের শ্বশুরবাড়িতে ফোন করে বলে দাও আমরা বৃহস্পতিবারে উনাদের বাসায় আসব রিফাতের বউকে দেখতে। শুক্রবারে মারিদের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার আগে রিফাতের শ্বশুরবাড়িতেও ঘুরে আসলাম। দুই বউকেও দেখা হলো।
শান্তা তনিমার প্রশংসা করে বলে…
‘রিফাতের বউরে আমার পছন্দ হয়েছে ভাবী। মেয়েটা খুব ভালো। আমার সাথে প্রতিদিন ফোনে কথা বলে। মেয়েটার মর্জি-মেজাজ আমার ভালো লেগেছে। যদিও মেয়েটার বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না, তারপরও মেয়েটা ডাক্তারি পড়ছে। আমার রিফাতের সঙ্গে মানাবে ভালো।
‘মানাবে ভালো বলেই তো ছেলে-মেয়েরা নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে। আমার শুধু ওদের থেকে একটাই আশা যেন আমাদের যৌথ পরিবারে মিলমিশ করে থাকে, তাহলেই হলো।
শান্তা ভারী নিশ্বাসে বলে…
‘এই যুগের মেয়ে ওরা। আল্লাহ জানে কেমন হয়। এখন তো দেখছি ভালো, বাকি জীবনটা ভালো হলেই হলো, আল্লাহ ভরসা।
মারিদ নিজের ঘরে গোসল করে সবে বসেছে। হাতে তোয়ালে, মাথা মুছতে মুছতে কফির তৃষ্ণা পেল। মারিদ রেণুকে ডেকে বলবে তাকে একটা কফি দিয়ে যেতে। তক্ষুনি সুখ হাতের ছোট ট্রে-তে দুটো কফি নিয়ে ‘ভাই ভাই’ ডাকতে ডাকতে মারিদের রুমে ঢোকে। সৈয়দ বাড়ির সবচেয়ে চঞ্চল মেয়েটা সুখ। পা দুটো মাটিতে পড়ে না চঞ্চলতায়। আবার পা মাটিতে পড়লে ভণ্ডামিতে কেউ টক্কর দিতে পারবে না। এখন মারিদের রুমে এসেছে মানে কোনো মতলবে এসেছে মারিদের জন্য কফি নিয়ে। মারিদ কপাল কুঁচকে সুখের দিকে তাকায়। সুখ হাতের ট্রে সোফার টেবিলে রেখে দুটো কফি নিয়ে একটা মারিদকে দিল। অপরটা হাতে নিয়ে মারিদের বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে বলে…
‘ভাই, ভাবী তো সেই সুন্দরী! তুমি কীভাবে পটালে সুন্দরী ভাবীকে?
মারিদ ব্ল্যাক কফি খায়। সুখ কফি বানাতে পারে ভালো। নিজের জন্য দুধ কফি আর মারিদের জন্য ব্ল্যাক কফি। মারিদ হাতের তোয়ালেটা ঢিল মেরে সোফায় ফেলে কফিতে চুমুক দিয়ে বলে…
‘তোর সুন্দরী ভাবী আমাকে পটিয়েছে। আমি যাইনি তার কাছে, সে এসেছিল আমার কাছে লাইন মারতে।
কথাটা সত্য। নূরজাহান প্রথমে মারিদকে কল দিয়ে কথা বলত। প্রেমের প্রকাশও নূরজাহানই প্রথমে করেছিল। সেই সুবাদে বলা যায় নূরজাহান মারিদকে পটিয়েছে। অথচ সুখ মারিদের কথা বিশ্বাস করেনি। নূরজাহানের মতো পরী সুন্দরী মেয়ে কখনোই কোনো ছেলেকে পটাতে পারে না। নূরজাহানের রূপ দেখে ছেলেরা এমনিই পটে যাবে। সুখ ধরে নেয় মারিদ মজা করে কথাটা বলেছে। সুখ কফিতে চুমুক দিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলে…
‘ভাই, সত্যি বলো না ভাবীকে কীভাবে পটালে?
মারিদ সত্যিটা সুখকে বললেও সুখ বিশ্বাস করেনি। এবার মারিদ মজা করে বলে…
‘তোর ভাবীকে তাবিজ করে পটিয়েছি। এক তাবিজে আমার বউ হয়ে গেছে। আর কিছু? এবার বের হ।
তাবিজ করে কাউকে বউ বানানো যায়—বিষয়টা হয়তো সুখের জানা ছিল না। সুখ ছোট মানুষ, এসব তাবিজ সম্পর্কে তখনো তেমন ধারণা নেই। তাবিজে মানুষের রোগ ভালো হয় এটা সুখ দেখেছে, শুনেছে, কিন্তু তাবিজে বউ যে পাওয়া যায় সেটা সম্পর্কে অজ্ঞ। মারিদ যদি তাবিজ করে বউ পেতে পারে, তাহলে সুখ জামাই পাবে? সুখ অবিশ্বাস্য গলায় মারিদকে ফের শুধিয়ে বলে…
‘ভাই, তাবিজ করলে কালো জামাই পাওয়া যাবে?
মারিদ ফোন চেক করছিল। সুখের কথায় কপাল কুঁচকে বলে…
‘কালো জামাই মানে?
‘তুমি তাবিজ করে সুন্দরী বউ পেয়েছ। এখন কেউ যদি তাবিজ করে কালো জামাই চায়, তাহলে পাবে?
মারিদ কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুখের মনোভাব বুঝতে চেয়ে ছোট করে উত্তর দেয়…
‘পাবে।
সুখ খুশি হয়ে যায় মারিদের উত্তরে। ঝটপট প্রশ্ন করে জানতে চাই…
‘ভাই, তাবিজ কোন ব্র্যান্ডের নিলে জলদি জলদি কাজ করে? তুমি কোন ব্র্যান্ডের তাবিজ নিয়েছিলে?
সুখ তাবিজ কার জন্য? কিসের কারণে চাচ্ছে সবই মারিদ বুঝতে পারে।
মারিদ সুখের মনোভাব বুঝেও না বুঝার মতো করে বলে…
‘রাদিলের এই সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে, তুই বরং রাদিলের থেকে পরামর্শ নিতে পারিস।
রাদিলের নামটা শুনে সুখ নাক মুখ কুঁচকে বলে…
‘রাদিল ভাই খাটাস। কিছু বলতে গেলে উল্টো কথা বলে খালি। রাদিল ভাইকে দিয়ে হবে না। তুমি বলো না ভাই, কোন ব্র্যান্ডেরটা নিয়েছিলে?।
মারিদ হঠাৎ সুখকে ধমকে উঠে বলে…
‘বের হ রুম থেকে, আমার কাজ আছে।
মারিদের ধমকে অপমানিত বোধ করে সুখ। কফি হাতে বিছানা থেকে উঠে চলে যেতে যেতে মারিদকে বলে গেল…
‘আমি তোমার নামে আব্বার কাছে বিচার দেব ভাই। তুমি ভাবীকে তাবিজ করে বিয়ে করেছ, এটাও সবাইকে বলে দিব।
‘যাহ, বল গিয়ে পাকনি।
রাত প্রায় এগারোটা। মারিদ রুমে ল্যাপটপে কাজ করছে। হঠাৎ ফোনে—প্রথমে রাদিলের, তারপর আননোন নাম্বার থেকে রিফাতের কল আসে। মারিদ প্রথমে রাদিলের সঙ্গে কথা বলে, রাদিল মারিদকে ধানমন্ডির লেকে আসতে বলে। এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আননোন নাম্বার থেকে রিফাত কল দেয়। কল রিসিভ করতেই রিফাত বেশ সিরিয়াস গলায় বলে…
‘যত দ্রুত পারিস ধানমন্ডির লেকে আয় মারিদ।
রিফাতের কণ্ঠে মারিদ কপাল কুঁচকে বলে…
‘তুই এতদিন ধরে কোথায় ছিলি রিফাত? কারও সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত করছিস না কেন?
‘তুই আগে আয়, তারপর সব বলব।
রিফাত কল কেটে দেয়। কান থেকে ফোন নামিয়ে রাখতেই স্ক্রিনে ভাসল নূরজাহানের ছবি। মারিদ কয়েক পলক নূরজাহানের ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বলে…
‘আমরা কারও কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখি দুটো কারণে—ভয়, আর নয়তো স্বার্থে। আপনার কোনটা ছিল অপরিচিতা?
মারিদ কয়েক সেকেন্ড থেমে ফের ক্রোধিত গলায় বলে…
‘একবার ছাড় দিয়েছি বলে বারবার ছাড় দিব না অপরিচিতা। এখন তো আপনি আমার বউ হন, ছেড়ে পালানোর অপশন নাই ? আপনার সাথে আমার বহু হিসাব-নিকাশ বাকি। আপনাকে জবাবদিহিতা করতে হবে, আপনি কিসের লোভে এতটা স্বার্থপর হলেন?’
[গল্পটার ভালো মন্দ রিভিউ দিবেন অবশ্যই ]
# চলিত….
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৯
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৭৫
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১২
-
দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ১ গল্পের লিংক
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৪১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২০