#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;৩১
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
সুনিপুণ হাতে অর্ধেক মাছ কেটে বাকি গুলো বাড়ির পেছনের খালে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এলো তরঙ্গ। এতক্ষণ পাশে বসে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তরঙ্গের মাছ কাটা দেখছিলো তরী। ছেলে হয়ে ও তরঙ্গের মাছ কাটার হাত বেশ ভালো। এবার অবশিষ্ট মাছ গুলো ছাইয়ের সঙ্গে মাখিয়ে ফেলে দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই আচমকা চেঁচিয়ে উঠলো সে;-
–” আরে, আরে! মাছ গুলো ছাইয়ের সাথে ফেলছেন কেন? এত মাছ কেউ নষ্ট করে?”
তরঙ্গ নির্বিকার ভঙ্গিতে মাছ গুলো ফেলে দিয়ে এলো। পর পর চাপ কল চিপে হাত ধুয়ে নিলো সে। অতঃপর, ধীর পায়ে এসে আবার পিঁড়ির উপর বসে পড়লো তরঙ্গ। হাত বাড়িয়ে তরীর ওড়নার কোণায় হাত-মুখ মুছে নিলো সে। রোদের মধ্যে বসে মাছ কাটার দরুন তার সুন্দর মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। তবুও মুখে তার সেই শীতল ভাব।
–” নষ্ট করিনি। এই ছোটো মাছ কেউ খাবে না।”
–” খাবে না মানে? এত গুলো মাছ। মানলাম ছোটো মাছ ফেলেছেন। কৈই, আর শিং মাছ ফেললেন কেন?”
তরী বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলো। যেনো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। চাচির কানে এই খবর পৌঁছালে তার আর রক্ষা থাকবে না। তার মধ্যে তরঙ্গ অর্ধেক মাছই খালে ফেলে দিয়েছে! তরীকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৃদু হেসে তরঙ্গ বললো;-
–” রান্না করে নষ্ট করার চেয়ে ভালো বিড়ালে খাক। ওদের ও তো রূহ আছে। আমার বাচ্চা গুলো।”
তরী ঠোঁট ফুলিয়ে বসে রইলো। গজগজ করে বললো;-
–” তাই বলে পুরোটা ফেলে দিতে হবে? আর কে কার বাচ্চা?”
কথাটা শুনে তরঙ্গ ভ্রু তুলে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ সামনের দিকে ঝুঁকে এলো সে। তরীর মুখে ফু দিয়ে চুল গুলো সরানোর চেষ্টা করলো।
–” এলাকায় যতো গুলো কুকুর, বিড়াল আছে। সব গুলো আমার বাচ্চা। আর আপনি তাদের মা। মানেন বা না মানেন। ওরা আপনার ই বাচ্চা।”
তরী থমকে গেলো। একটু আগের রাগ মুহূর্তেই কেমন লজ্জায় পরিণত হলো। শ্যামবর্ণের দুই গাল মূহুর্তেই র*ক্তি*ম বর্ণ ধারণ করলো। তরঙ্গের মুখে তখন ও চাপা হাসির ঝিলিক। সেটা দেখেই অপ্রস্তুত হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো তরী। তরীকে লজ্জা দেবার নিমিত্তেই এমন অদ্ভুত কথা বলে ছিলো তরঙ্গ। তার কাজ হাসিল হতেই দাঁড়িয়ে পড়লো। আড়মোড়া ভেঙে শক্ত কন্ঠে বললো।
–” মা যদি মাছের কথা জিজ্ঞেস করে। বলবেন তরঙ্গ তার বাচ্চাদের খেতে দিয়ে দিয়েছে। আর কোনোদিন এতো মাছ একসাথে আনলে আজকে যতুটুকু রেখেছি। তাও রাখবো না। মাইন্ড ইট!”
*******
এরই মধ্যে কেটে গেছে পুরো এক সপ্তাহ। মাছ নিয়ে ঝামেলা হয়নি সেদিন। ছেলে থাকাতে কিছু বলতে পারেননি সাহানারা।
এই সাত দিনে তরঙ্গ আর তরীর সম্পর্কের সমীকরণে তেমন পরিবর্তন আসেনি। আগের মতোই ধীর, আর মধুর ছন্দে এগিয়ে চলেছে তাদের ভালোবাসা। একে অপরের প্রতি টান, যত্ন আর অনুভূতির গভীরতা দিনকে দিন গভীর হচ্ছে। এতে অবশ্য বুশরা আর সাহানার গা জ্বলে যাচ্ছে।
সাহানারর স্বভাবে ও কোনো বদল আসেনি। বরং আগের তুলনায় সে এখন আর ও বেশি খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেছে। সুযোগ পেলেই কোনো না কোনো ভাবে তরীর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ছে, ফাঁক পেলেই তার দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন তিনি। বুশরা গতকাল বাপের বাড়িতে গিয়েছে। ফোরকান দেওয়ান ও বাড়ি নেই। তাদের ছাড়া বাড়িটা খানিকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। তবে সংসারের দৈনন্দিন ব্যস্ততা আগের মতোই নিজের গতিতে চলছে।
পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চারপাশ চিকচিক করছে। বাড়ির পেছনের টলটলে পুকুরের পানিতে চাঁদের প্রতিচ্ছবি পড়েছে। ছবির মতো এই সুন্দর দৃশ্য মুগ্ধ চোখে অবলোকন করছে তরী। ছাদের রেলিং এ হাত চেপে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে সে। ওড়নাটা আড়াআড়ি ভাবে গলায় রাখা। চুল গুলোতে বেণুণী পাকিয়ে পিঠে নামিয়ে দিয়েছে তরী। বেশির ভাগ সময় ই কোমর ছড়ানো চুল গুলোতে বেণী পাকিয়ে রাখে মেয়েটা। শ্যামবর্ণের ছোট শরীরটা নিয়ে চলাচলের সময় বেণীটা দুলে উঠে। দৃশ্যটা তরঙ্গের অতিব প্রিয় দৃশ্যের মধ্যে একটি। বর্তমানে মৃদ্যু বাতাসে তরীর পিঠে ছড়ানো বেণুণী থেকে বেরিয়ে আসা চুল গুলো উড়ছে।
গ্রোগাসে সময়টা উপভোগ করার মূহুর্তে; হঠাৎ কোমরের মাঝে কারো আড়ষ্ট হাতের ছোঁয়া পেতেই কেঁপে কেঁপে উঠলো তরী। ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে আসার ক্ষণেই, তরীর কানে ভেসে এলো কয়েকটি শব্দ। পরক্ষণেই সেগুলো বাতাসে বিলীন হয়ে গেল।
–” ভালোবাসি তো চড়ুই বউ।”
তরীর বুঝতে বাকি রইলো না মানুষ টা কে। এই অসভ্য ছেলে বাড়ি ফিরেছে কখন? সে নাকি হলে ছিলো? এভাবে কে পড়াশোনা করে? তরীর জানা নেই। ব্রিলিয়ান্ট না হলে বুয়েটে পড়া লাগতো না ছেলেটার। তরীর মনের কথা নিমিষেই বুঝে নিলো তরঙ্গ।
–” আপনার জন্য মন কেমন করছিলো। তাই চলে এসেছি। এসব পড়ালেখা তো ৫ বছর থেকেই করছি।”
–” ছাড়ুন তো আমাকে। দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলুন।”
ছটপটিয়ে উঠলো তরী। নিজের দু’হাত রাখলো তরঙ্গের হাতের উপর। ছাড়িয়ে নেবার জন্য টানাহেঁচড়া করতেই তরঙ্গ হাতের বাঁধন শক্ত করলো। গ্রীবা চেপে ধরলো তরীর ঘাড়ে। হাস্কিং স্বরে বলে উঠলো সে।
–” উমম, শ্যাম্পুর স্মেল। শান্তিইই।”
তরী আর শান্ত থাকতে পারলো না। বহু কষ্টে বেসামাল অনুভূতি গুলোকে চেপে তড়িৎ গতিতে তরঙ্গের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলো তরী। ওড়না সামলে দ্রুত পায়ে ছুটে নেমে পড়লো সে। এই মাত্র কি হলো তা বুঝতেই তরঙ্গের মিনিট দুই পেরিয়ে গেলো। ঘটনাটা বুঝতেই ফের হাহাকার করে উঠলো সে। কপাল চাপড়ে করুণ কন্ঠে বলে উঠলো তরঙ্গ;-
–” আমি জোয়ান একটা পোলা।
আমার মায় কত শখ কইরা চাচাতো বোনের লগে দিছে আমার বিয়া। আর সেই মাইয়াডা এখন আমারে মানুষ বলেই গণ্য করে না, পাত্তা তো দূরের কথা! শালা আমার শরীরের রগে রগে রোমান্টিকতা। আর এই বেডি আমারে পাত্তাই দেয় না। এতো রোমান্স এখন কার উপর এপ্লাই করবো আমি?”
নিজের কথায় নিজেই খুঁত ধরলো তরঙ্গ;-
–” সরি সরি, মা তো খুশি হয়ে বিয়ে দেয়নি। এইজন্য তরকারি জানটাও খুশি মনে এক্সসেপ্ট করছে না। শালা একবার চান্স পাই। এমন ডান্স দিবো! তোর মুখে শুধু তরঙ্গের নাম ই থাকবে তরকারি জান।”
******
ঘরে ফিরেই তিন্নির পাশে এসে দাঁড়ালো তরী।
বাচ্চাটা হোমওয়ার্ক করছে। লেখা গুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে বিছানায় এসে বসে পড়লো তরী। শীতল কন্ঠে সুধালো সে;-
–” আমি একটু শুচ্ছি। তোর লেখা শেষ হলে আমাকে ডাক দিস।”
লেখার মাঝেই ঘাড় বাঁকিয়ে সম্মতি জানালো তিন্নি। বোনের সম্মতি পেয়ে বালিশ ঠিক করে কোমর অব্দি কাঁথা টেনে শুয়ে পড়লো তরী। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তরীর ক্লান্ত চোখের পাতায় ঘুমেরা এসে হানা দিলো। তরী ঘুমিয়ে পড়তেই দরজায় মৃদ্যু টোকার শব্দ হলো। কলম হাতের মুঠোয় চেপে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো তিন্নি। মাথার দু’পাশে দুটো জুটি বাঁধা তার।
তরীই বেঁধে দিয়ে ছিলো ছাদে যাওয়ার আগে। তিন্নির সাথে সাথে তার জুটি দুটো ও দুলে উঠলো। দরজায় তরঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে। মাথাটা রুমের ভেতরে শরীরের নিচের অংশ বাইরে। তিন্নিকে নিজের দিকে ফিরতে দেখে রুমে প্রবেশ করলো তরঙ্গ। হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এসে তিন্নির জুটি টেনে ধরলো ছেলেটা।
–” কিরে গরু? আমার যে একটা ছোটো বোন ছিলো। সে কোথায়? তুই দেখি ঘাস খাওয়া বাদ দিয়ে ওর পড়ার টেবিলে বসে আছিস। টেমা কি তোর হয়ে ঘাস খেতে গেলো নাকি?”
ভাইয়ের ত্যাড়া কথায় রাগে গাল ফুলিয়ে তরঙ্গের দিকে তাকালো তিন্নি। পুরুষালি ফর্সা হাতটা বাচ্চা হাতের মাঝে চেপে ধরে; ফোকলা দাঁত দিয়ে কামড় বসিয়ে দিলো সে। নিমিষেই হাতের কব্জি লাল হয়ে গেলো তরঙ্গের। গজগজ করতে করতে তিন্নি জবাব দিলো।
–” কে গরু হ্যাঁ? আমি গরু হলে তুমি হাতি।”
–” আমি ভুল বলেছি। তুই আসলে একটা কু*ত্তা। আমার চাচি ভালো বলে, কু*ক্তাটাকে নিজের বাচ্চার পরিচয়ে রেখে গেলো?”
–” ভাইয়া!”
–” ভাইয়া!”
তিন্নিকে কপি করে ভেংচি কাটলো তরঙ্গ। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা তরীর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখলো সে।
–” শোন, চাচি যেহেতু তোকে রেখেই গিয়েছে। তাই কু*ক্তা হোস বা গরু। আমাকেই তো দেখতে হবে। আমার রুমে একটা জিনিস রেখে এসেছি কু*ক্ত তোর জন্য। গিয়ে দেখ যা।”
তরঙ্গের মুখ গলিয়ে কথাটা বেরোতে দেরী হলে ও তিন্নির ছুটতে দেরী হলো না। মুচকি হেসে তরীর পাশে এসে বসে পড়লো সে। ঝুঁকে তাকালো মেয়েটার মুখের দিকে। সে আসার পর থেকে এই মেয়ে এভাবেই শুয়ে আছে। নড়ছে না কেন? তরীর বাম হাত টেনে ফার্লস চেক করলো সে।
–” এভাবে ঝুঁকে কি দেখছেন?”
তরীর ঝাঁঝালো কন্ঠ শুনতেই তীরের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো তরঙ্গ। আমতা আমতা করে বললো সে;-
–” পাঁচ মিনিটের বেশি এক ভাবে শুয়ে থাকবি না। আমার বুকে ব্যথা অনুভব হয়। তোকে এক ভাবে পড়ে থাকতে দেখলে।”
–” এখন কি শোবার সময় ও আপনার দেওয়া বিধি নিষেধ মানতে হবে?”
–” আমি যা বলবো তোকে সব মানতে হবে। নয়তো জানে মে*রে দিবো তোকে। তারপর নিজে ও ম*রে যাবো।”
কথা শেষ করার আগেই তরঙ্গের গলা রোধ হয়ে এলো। তরী উঠে বসলো। পর পর দাঁড়িয়ে পড়লো সে। তরঙ্গের ঘাড়ে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো;-
–” কি হয়েছে তরঙ্গ?”
ঝরঝরিয়ে কেঁদে দিলো তরঙ্গ। তরীকে ঝাপ্টে ধরে সুধালো সে।
–” ভেবেছিলাম আমার সাথে রাগ করে বিষ টিষ খেয়ে নিয়েছি। এক ভাবে শুয়ে আছিস ঘন্টা খানেক ধরে। তোর কিছু হলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো তরীজান?”
( প্রিয় পাঠক মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! হাতের ব্যথায় মরে যাচ্ছি।
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ২৬
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৯
-
She is my Obsession পর্ব ৩৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩৪
-
She is my Obsession পর্ব ১
-
She is my Obsession পর্ব ২৭
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ৩০
-
She is my Obsession পর্ব ২০
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩৭