Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ৬


#কালারব্লাইন্ড — ০৬ 

#সোফিয়া_সাফা 

ভ্যালেনিয়ার রাজধানী অ্যাল্টানিয়ার বিত্তশালীদের কাছে ‘দ্য ফল্ট’ এক উন্মাদনার নাম। শহরের মূলধারার ক্রীড়া আয়োজনগুলোর মতো সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত কোনো জায়গা নয় এটি। বরং শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিক এবং বিত্তশালী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গড়ে ওঠা এক প্রাইভেট কমব্যাট সার্কিট। সদস্যপদ কিংবা বিশেষ আমন্ত্রণ ছাড়া এখানে প্রবেশের সুযোগ নেই কারও।

আইনবিরোধী কোনো আস্তানা নয় দ্য ফল্ট; তবে এর কার্যক্রম প্রকাশ্য নয়। এখানে অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রায় নিয়মিত বক্সিং ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পেশাদার ফাইটাররা রিংয়ে নামে আর অভিজাত দর্শকেরা নির্দিষ্ট ফাইটারের ওপর নিজেদের অর্থ বাজি রাখে। কে জিতবে, কে কত রাউন্ড টিকবে; ম্যাচ শুরুর আগেই তা নিয়ে দরকষাকষিতে উত্যক্ত হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।

দ্য ফল্টের একটি বিশেষ নিয়ম আছে, তা হলো, রিংয়ে থাকা মানুষটির ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন থাকবে। প্রতিটি ফাইটার নিজের নামের বদলে একটি রিং-নেম ব্যবহার করে। দর্শকেরা এমনকি খোদ আয়োজকেরা পর্যন্ত জানে না তাদের আসল পরিচয়, জানার প্রয়োজনও বোধ করে না। রিংয়ে কে কতটা শক্তিশালী, সেটাই এখানে প্রধান বিষয়।

আজও দ্য ফল্টের ভূগর্ভস্থ বিশাল হলরুমটা কানায় কানায় পূর্ণ। হলের মাঝখানে অবস্থিত উজ্জ্বল আলোয় বিশাল বক্সিং রিং। হঠাৎ একে একে নিভে গেল হলরুমের সব আলো। দর্শকদের কথোপকথন মুহূর্তেই থেমে গিয়ে অদ্ভুত এক প্রতীক্ষায় পরিণত হলো।

একটু পরেই রিংয়ের প্রবেশদ্বারে আলোর ঝলকানিতে জ্বলে উঠল একটি স্পটলাইট। অডিটোরিয়ামের স্তব্ধতা চিড়ে ঘোষকের ব্যারিটোন আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো মাইক্রোফোনে, “লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন, দ্য ফল্টের আজকের নেক্সট বাউট। রেড কর্নারে—ক্রাকেন। ব্লু কর্নারে—রাউডি।”

নামদুটো উচ্চারিত হতেই রেড কর্নার থেকে একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ রিংয়ের দিকে এগিয়ে এল। ঠিক তার কয়েক মুহূর্ত বাদে অন্য প্রান্তের পর্দাটাও সরে গেল।

​ধীর, অনমনীয় কদমে আলোয় ভেসে উঠল আরেক মানবমূর্তি।

উন্মুক্ত চওড়া বুকের টানটান পেশিগুলোতে ঠিকরে পড়ছে ওপরের স্পটলাইটের আলো। দু’হাতের কবজি থেকে মুঠো পর্যন্ত শক্ত করে প্যাঁচানো সাদা র‍্যাপ। পরনে কেবল একখানা মিশমিশে কালো শর্টস, যার কোমরের সীমারেখায় সাদা টেপের স্পষ্ট দাগ। তবে নজর আটকে যায় তার মুখের ওপর।

​কপাল থেকে গাল বেয়ে নেমে এসেছে কালো আর ধূসর রঙের আঁকাবাঁকা শেড। চোখের নিচে ধারালো দন্তপংক্তির আদলে আঁকা এক অদ্ভুত নকশা; ঠিক যেন সমুদ্রের অতলান্ত থেকে উঠে আসা কোনো শিকারি প্রাণীর মুখাকৃতি। 

​নকশার জটিলতায় মুখের আসল রূপ চেনার কোনো উপায় নেই। তার আবির্ভাবে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে পুরো হলরুমটা যেন উল্লাসে ফেঁটে পড়ল। পুরুষালী চিৎকারের মাঝেই তীব্রতর হয়ে উঠল উন্মত্ত কিছু নারীকণ্ঠ,

“রাউডি! রাউডি! রাউডি!”

অথচ রিংয়ের দিকে এগোতে থাকা রাউডি নামের পুরুষটি কারো দিকে তাকাল না পর্যন্ত। এত শত মানুষের চিৎকার বা উল্লাস; কোনোটাই যেন তার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। এই বিপুল উন্মাদনা যেন তার প্রতিদিনের চেনা অতি চর্বিত পুরনো শোরগোল মাত্র।

ঘণ্টা বাজার শব্দ যেন প্রতিপক্ষ ক্রাকেন শুনতেই পেল না। সে ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি আজ তাকে রাউডির মুখোমুখি হতে হবে; তার ম্যাচআপ তো আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল তাহলে হঠাৎ কীভাবে প্রতিপক্ষ বদলে গেল। যদিও গ্যালারির উন্মুখ দর্শকদের রাউডিকে দেখার ব্যাকুলতার কথা ভাবলে, এমন নাটকীয় পরিবর্তন দ্য ফল্টের ইতিহাসে একেবারেই নতুন কিছু নয়।

​রিংয়ে উঠে বক্সিং গ্লাভস পরতে পরতে শান্ত, শীতল দৃষ্টিতে প্রতিপক্ষকে মেপে নিচ্ছিল রাউডি। রেফারির বারবার আহ্বানে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষমেশ রিংয়ে পা রাখল ক্রাকেন। এরপর শুরু হলো বেটিং পর্ব। ক্রাকেনের পক্ষে বাজি ধরেছে হাতে গোনা কয়েকজন, গ্যালারির বিপুল অর্থ গিয়ে জমা হয়েছে রাউডির নামের ওপর। যারা ক্রাকেনকে সাপোর্ট করছে তারা মূলত রাউডির অপরাজেয় সাফল্য আর অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তায় অন্ধ হয়ে হিংসা মেটাচ্ছে। 

আবারও ঘণ্টা বাজতেই বক্সিং শুরু হলো। প্রথম রাউন্ডেই রাউডি নিজের জয় নিশ্চিত করে হারিয়ে দিল ক্রাকেনকে। চোখেরই পলকে ঘটে গেল সবটা। অবশ্য বাকিদের কাছে তেমনটাই মনে হয়েছে। বলা বাহুল্য রাউডির ফাইটিং স্কিলে বিমোহিত হয়েছিল পুরো হলের সবাই। 

ম্যাচ শেষ হতেই রাউডির হাত উঁচিয়ে ধরে বিজয়ী ঘোষণা করল রেফারি, “অ্যান্ড দ্য উইনার ইজ, রাউডি!”

পুরো হলরুম করতালির শব্দে মেতে উঠল। বিজয়ের উল্লাসকে একপাশে সরিয়ে রেখে রাউডি রিং থেকে নেমে নিজের নির্ধারিত পারিশ্রমিক বুঝে নিল, তারপর শান্ত কদমে হারিয়ে গেল পর্দার আড়ালে। ক্লাবের এক নির্জন প্রান্তে এসে নিজের ব্যক্তিগত রুমে ঢুকে দ্রুত চেঞ্জ করে নিল সে। রুমের বাইরে অপেক্ষা করছিল কঙ্কা। 

রঞ্জক বেরিয়ে আসতেই কঙ্কা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “আই এম সো ইম্প্রেসড, আরএম! আজ একদম ধামাকা করে দিয়েছো। তবে আজকের প্রতিপক্ষ দুর্বল ছিল।”

রঞ্জক আঁড়চোখে তাকাল কঙ্কার দিকে। গলার স্বর সমান্তরাল, “তাই বুঝি?”

“হ্যাঁ, কেমন প্রথম রাউন্ডেই হেরে গেল।”

“অপোনেন্ট দুর্বল ছিল না। বরং চালাক ছিল। বুঝেই গিয়েছিল, আমার সাথে পারবে না। তাই অযথা চেষ্টাও করেনি।”

​“কথাটা অবশ্য ভুল বলোনি।” বলতে বলতেই চট করে রঞ্জকের বাহু দু’হাতে আঁকড়ে ধরে তার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল কঙ্কা। মুখে কৃত্রিম লজ্জার হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আই এম ভেরি প্রাউড অব ইউ। ইঁশ! যদি সবাইকে বলে দিতে পারতাম যে তুমি আমার বয়ফ্রেন্ড তাহলে কতোই না ভালো হতো।”

রঞ্জকের উদাস চোখ জোড়া তখন স্থির হয়ে আছে দূরের কোনো শূন্যতায়। অস্ফুট স্বরে আপন মনেই উচ্চারণ করল সে, “আমার জন্য একদমই ভালো হতো না।”

কঙ্কা খানিকটা চমকে গিয়ে মুখ তুলে তাকাল, “কী বললে তুমি?”

“তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো আমি একজন এমপি পদপ্রার্থী।” বলেই আলগোছে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল রঞ্জক।

কঙ্কা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “ওহ হো, ভুলেই গিয়েছিলাম। তুমি একদম চিন্তা কোরো না আরএম, আমার বাবা তোমার নমিনেশনের ব্যাপারটা দেখে নেবে। শুধু তুমি আমাকে বিয়েটা করে নাও।”

রঞ্জক কেমন যেন অদ্ভুত চোখে তাকাল। যেন কঙ্কা কোনো অজানা ভাষায় বাক্যালাপ করল, আর সে তার বিন্দুবিসর্গও উদ্ঘাটন করতে পারল না। গম্ভীর গলায় বলল, “আর মাত্র একসপ্তাহ বাকি, কঙ্কা। তারপরই ভিএনপি নিজেদের সিলেক্টেড প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করবে।”

“তাই তো বলছি, তুমি বিয়েতে রাজি হয়েই যাও এবার। নইলে আমার বাবা তোমাকে সাহায্য করতে পারবে না।”

রঞ্জক ধীর পায়ে সামনের দিকে এগোতে এগোতে উত্তর দিল, “তিনি চাইলেই পারবেন।”

কঙ্কা দ্রুত তার পিছু নিল, “কিন্তু নমিনেশন পেয়ে গেলে তুমি যদি আমাকে বিয়ে না করো তখন আমার কী হবে?”

রঞ্জক থেকে গেল। চশমার ফ্রেমটা ঠিক করতে করতে বলল, “হোয়াট ডু ইউ মিন? এভাবে বললে যেন আমি তোমাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তোমার সঙ্গে অনেক কিছু করে ফেলেছি।”

কঙ্কা ভুল শুধরে নিয়ে বলল, “আরে আরএম আমি শুধু বোঝাতে চাইলাম, হাতে যখন আর মাত্র একসপ্তাহ আছে তখন সময় নষ্ট না করে আমাদের এবার বিয়ে নিয়ে ভাবা উচিত।”

রঞ্জক পকেটে দু’হাত গুঁজে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল, “বিয়ে নিয়ে এই মুহূর্তে ভাবার মতো মানসিকতা আমার নেই।”

একথা শুনে কঙ্কার নাকের পাটা ফুলে উঠল। রেগেও গেল বোধহয়। গলা সামান্য চড়িয়ে বলল, “তুমি যদি ভেবে থাকো অলিগার্কদের সাহায্য ছাড়াই নমিনেশন পেয়ে যাবে তাহলে কিন্তু ভুল ভাবছো।”

“আমি মোটেও তা ভাবছি না। উপরন্তু এ দেশের রাজনীতির হালচাল তোমার চেয়ে ভালো বুঝি আমি।”

“তাহলে কোন ভরসায় বিয়েটা করতে চাইছো না, শুনি?”

রঞ্জক খানিক ভেবে বলেই দিল, “আরিজ মাহতাবির বলেছেন নমিনেশনের ব্যাপারটা উনিই দেখে নেবেন। আমাকে তা নিয়ে ভাবতে হবে না।”

কঙ্কা যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিশ্বাসই করতে পারল না রঞ্জকের কথা, “হোয়াট! উনি হঠাৎ তোমার সাহায্য করতে চাইছেন কেন?”

রঞ্জক এড়িয়ে যেতে চাইল। গলা দিয়ে বের না হলেও কষ্ট করে বলেই দিল, “আফটার অল উনি সম্পর্কে আমার বাবা হন। অবাক হওয়ার কিছু নেই।”

​কঙ্কা ক্ষিপ্র গতিতে পুনরায় রঞ্জকের হাত আঁকড়ে ধরল, ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, “নিশ্চয়ই এর পেছনে ওনার কোনো স্বার্থ আছে আরএম। নইলে তুমিই ভেবে দেখো, উনি হঠাৎ কেন তোমাকে সাহায্য করতে চাইবেন?”

রঞ্জকের কপালে ভাঁজ পড়ল। নিজের ওপর চেপে থাকা বিরক্তির পারদটা আরও ভারী হলো। আরিজ মাহতাবিরকে কঙ্কা যেটুকু চেনে রঞ্জক তার সন্তান হয়েও সেটুকু চেনে না। বিষয়টা যেন রঞ্জকের দম্ভ চুর্ণ করে দিল। তবে এখন আর মিছেমিছি আফসোস করে কী লাভ! তাকে তো ইতোমধ্যেই আরিজ মাহতাবির ফাঁসিয়ে ফেলেছে।

নিজের ভাবনা চিন্তা সরিয়ে রেখে রঞ্জক গলা চড়িয়ে বলল, “আমার বাবাকে নিয়ে এমন মন্তব্য কোরো না কঙ্কা। তার চেয়ে ভালো তুমি নিজের জন্য নতুন কোনো বয়ফ্রেন্ড খুঁজে নাও।”

শেষোক্ত কথাটা শুনে কঙ্কার চোখে অপার বিস্ময় ফুটে উঠল। রঞ্জক ঘুরে পা বাড়াতেই সে দৌড়ে গিয়ে তার হাত টেনে ধরল, “কী বললে তুমি?”

“বলেছি, নতুন কাউকে খুঁজে নাও। নমিনেশন পেয়ে গেলে আমি খুব বিজি হয়ে যাবো। তোমাকে সময় দিতে পারব না।”

“তুমি কি ব্রেকআপ করতে চাইছো?”

“হ্যাঁ, সেটাই চাইছি।”

“তার মানে তুমি সত্যিই শুধুমাত্র নমিনেশন পাওয়ার আশায় আমার সাথে রিলেশনে গিয়েছিলে?”

রঞ্জক উত্তর দিল না। হ্যাঁ, সে এই জন্যই সম্পর্কে জড়িয়েছিল। নইলে কঙ্কার মতো মেয়ের সাথে সে কোন দুঃখে রিলেশনে যাবে? রঞ্জক চরম বিরক্তিতে হাতটা ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নিয়ে হনহন করে সামনের দিকে পা বাড়াল।

​পেছন থেকে কঙ্কার ক্ষুব্ধ কণ্ঠ ভেসে এল, “আমি তোমাকে এতো সহজে ছাড়বো না আরএম। তুমি ব্রেকআপ করতে চাইলেও আমি করতে দেবো না।”

রঞ্জক তার কথায় পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে গেল আন্ডারগ্রাউন্ড ক্লাব থেকে।

রাত এখন গভীর। আরিজ মাহতাবির বাড়িতে ফিরেছেন কিছুক্ষণ আগেই। হাতমুখ ধুয়ে আলতার হালচাল সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতে যাওয়ার ক্ষীণ ইচ্ছা তাড়া করছে তাকে। মেয়েটা নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে কী না; কে জানে। মনটা যখন দোলাচলে, ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

আরিজ মাহতাবির অনুমতি দিতেই দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল ফারিশ। ঐতিহ্যবাহী মাহতাবির পরিবারে তিন ভাইয়ের মধ্যে আরিজ মাহতাবির জ্যেষ্ঠ। আর ফারিশ তার মেজ ভাইয়ের ছেলে। ফারিশের মুখের অভিব্যক্তি দেখে আরিজ মাহতাবির কিছু একটা আঁচ করতে পারলেন। বিছানার পাড়ে বসে প্রশ্ন করলেন, “আজ আবার কী খবর নিয়ে এলে, ফারিশ?”

সামনা-সামনি এসে দাঁড়াল ফারিশ। ঠোঁটের কোনায় হালকা সৌজন্যের হাসি ফুটিয়ে বলল, “তোমার ছোট ছেলের টাটকা খবর নিয়ে এলাম।”

আরিজ মাহতাবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “আজ আবার কী করেছে সে?”

“কী করেনি বলো, আজও সে দ্য ফল্টে গিয়ে বক্সিং লড়ে এসেছে।”

“এ আর নতুন কী। ও তো প্রায় প্রতিদিনই যায় ওখানে।”

“নতুন কিছু হয়তো নয়, তবে আজও তার পাশে মুবাশ্বির আলবার মেয়েকে দেখা গেছে।”

আরিজ মাহতাবির এবার গুরুত্ব দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালের ফারিশের পানে। ফারিশ নিজের কথা এগিয়ে নিল, “এটাও নতুন কোনো খবর নয়। কিন্তু একবার ভেবে দেখো তোমার ছেলে নিজের বউকে ফেলে রেখে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

আরিজ মাহতাবির থমকে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর জানতে চাইলেন, “ও এখন কোথায়?”

“নিজের ঘরেই আছে এখন।”

“আচ্ছা, তুমি যাও। আমি দেখছি।”

ফারিশ মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।

রঞ্জক নিজের বেডরুমের দরজা জানলা আটকে জুবাকে খাবার দিয়েছে। সারাটাদিন না খেয়ে থাকার কারণে জুবার পেটে তখন প্রচণ্ড খিদে। উড়ে যাওয়ার বুদ্ধি আপাতত পালিয়েছে মাথা থেকে। তাই সুযোগ থাকার পরেও খাঁচা থেকে বের হওয়ার স্পর্ধা দেখায়নি। বের হলেই বা কী? দরজা জানলা যেখানে বন্ধ সেখানে শুধু শুধু বের হয়েই বা কী করবে সে? পালিয়ে যেতে তো আর পারবে না। তাই খাবার সামানে পেতেই ভদ্র পাখির মতো খাঁচার ভেতরে বসেই খাওয়া শুরু করে দিয়েছে।

জুবাকে এমন অনুগত ভঙ্গিতে খেতে দেখে রঞ্জকের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটল। খাঁচার দরজা সাবধানে লক করতে করতে বলল, “খুব ভালো! এই দফায় যদি বেয়াদবি করতে, তবে আরও একদিন না খাইয়ে রাখতাম তোমাকে। কিন্তু তার প্রয়োজন পড়েনি; খুব দ্রুতই সভ্য ও বাধ্য হতে শিখে গেছো দেখছি!”

জুবা চিৎকার চেঁচামেচি করার মতো মুডেও ছিল না। শুধু শুধু এর সাথে চিল্লিয়ে লাভ নেই কোনো। তার চেয়ে সুযোগের অপেক্ষায় থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তাকে এমন নীরবতা পালন করতে দেখে রঞ্জকের কপালে সরু ভাঁজ পড়ল। খাঁচাটার দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে উৎসূক গলায় শুধাল, “কী হলো? কথা বলছো না কেন? সারাদিন না খেয়ে থেকে কথা বলতে ভুলে গেছো নাকি?”

জুবা বিশেষ খেয়াল করল না তার কথায়। খাওয়াতেই নিমগ্ন রইল। রঞ্জকও আর খাটালো না পাখিটাকে। অলস পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটা দিল অ্যাকোয়ারিয়াম ঘরের দিকে। 

মাছগুলোকে খাবার দিচ্ছিলো সে তখনই দরজায় নক করল কেউ। রঞ্জক বিরক্ত হলো, সে ধরেই নিয়েছে এই নক করা ব্যক্তিটি আলতা হতে পারে। ঘরের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুমতি নেওয়ার সৌজন্য এই বাড়ির অন্য কারো নেই; তারা সুযোগ পেলেই ঘরে ঢুকে পেছন থেকে চমকে দিতে অভ্যস্ত। যদিও অন্যান্যদের যাতায়াত তার ঘরে খুবই সীমিত।

বিরক্তি চেপে দরজার পানে পা বাড়াল রঞ্জক। তবে তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি আলতা নয়; আরিজ মাহতাবির।

মুখটা গম্ভীর করে ফেলল রঞ্জক। বাবার চেহারাটা দেখেই ভেতরে জমে থাকা রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শুষ্ক ঠোঁটের ওপর জিভ বুলিয়ে নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “এত ঘন ঘন আমার কথা মনে পড়ার কারণ কী?”

আরিজ মাহতাবির নির্বিকার গলায় প্রসঙ্গ তুললেন, “তুমি নাকি আজও দ্য ফল্টে গিয়েছিলে?”

“হ্যাঁ, তো?”

“কেন গিয়েছিলে?”

বাবার মুখে এমন প্রশ্ন শুনে রঞ্জক একচোট ব্যঙ্গাত্মক হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই দু আঙুলে কপাল চেপে ধরে সোজাসাপ্টা উত্তর দিল, “কেন আবার টাকা কামাই করতে গিয়েছিলাম। নির্বাচনের প্রচারণায় টাকা লাগবে না?”

ছেলের এই খামখেয়ালি উত্তরে আরিজ মাহতাবির খুশি হলেন না, “তোমাকে আমি বলেছি তো নির্বাচনের ব্যাপারটা আমিই দেখে নেবো। তোমাকে তা নিয়ে ভাবতে হবে না।”

রঞ্জকের হাসি থেমে গেল। নিজের ঘাড়ের পেছনের পেশি চেপে ধরে বলল, “প্রয়োজন নেই। শুধু মনোনয়ন পত্রটা পাইয়ে দিলেই হবে। মনোনয়ন ব্যতীত তোমার কাছ থেকে অন্য কোনো করুণা আশা করছি না আমি।”

আরিজ মাহতাবির গভীর শ্বাস ফেললেন, “আমি যখন বলেছি তখন তোমার নমিনেশন লেটার পাশ হয়ে যাবে। তা তুমিও খুব ভালো করেই জানো, তারপরও তোমার তথাকথিত মেয়ে বান্ধবীর সঙ্গে এখনো মেলামেশার প্রয়োজনীয়তা কেন পড়ছে?”

রঞ্জক অবাক চোখে তাকালো। কঙ্কার ব্যাপারে আরিজ মাহতাবির কীভাবে জানে তা ঠিক ভেবে পেল না। আরিজ মাহতাবির তার ভাবনায় ছেদ ঘটালেন, “কী হলো, বলো। কেন তুমি এখনো মুবাশ্বির আলবার মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো? কী প্রয়োজন তোমার? যা কিছু লাগবে সোজা আমাকে বলো, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তবুও অ্যাটলিস্ট লয়্যাল থাকো বউয়ের প্রতি।”

বউয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই রঞ্জকের মেজাজ মারাত্মক ভাবে বিগড়ে গেল। আরিজ মাহতাবিরকে আঘাত করার সুযোগ টুকু ছাড়ল না সে।

“আমার যা প্রয়োজন তা তুমি কিংবা তোমার সেই বউমা দুজনের একজনও দিতে পারবে না আমাকে। তাই তো আমাকে কঙ্কার কাছে যেতে হয়েছে।”

আরিজ মাহতাবির নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকু গোপন করার চেষ্টা করলেন। নেতিবাচক ভাবে কথাটা নিতে চাইলেন না, “কী এমন জিনিস? যা তোমার মতে শুধু ওই মেয়েটাই দিতে পারবে?”

“শুধু ওই মেয়েটাই পারবে তা তো বলিনি। তবে অবশ্যই তোমার আদরের বউমা দিতে পারবে না।”

আরিজ মাহতাবির হাত মুঠ করে নিলেন। উদ্ধত ছেলের গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দেওয়ার প্রবল ইচ্ছেটা বহুকষ্টে দমন করলেন তিনি। ইতিহাস সাক্ষী, যতবারই তিনি রঞ্জকের গায়ে হাত তুলেছেন, ততবারই রঞ্জক ঠোঁটের কোণে এমন এক বিষাদগ্রস্ত হাসি ফুটিয়ে তোলে যা দেখলে তার খুব খারাপ লাগে। রঞ্জক বুকে দু-হাত বেঁধে বাবার সেই মুষ্টিবদ্ধ হাতের দিকেই তাকিয়ে ছিল; হয়তো বুঝতে পারল কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছেন তিনি। 

রঞ্জকের চাউনি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। আগুনে আরেকটু ঘি ঢেলে দেওয়ার ভঙ্গিতে ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলল, “তুমি হয়তো আমার কথাটা বুঝতে পারোনি। আমিই বুঝিয়ে বলছি, একজন বিবাহিত পুরুষ তার বউয়ের কাছ থেকে যা যা এক্সপেক্ট করে তা যদি না পায় তখন সেই পুরুষটির বাইরে নজর দেওয়া ছাড়া আর কী কোনো পথ খোলা আছে?”

ছেলের মুখে এমন সোজাসাপ্টা ও অসঙ্কোচ ইঙ্গিত শুনে আরিজ মাহতাবির চরম লজ্জায় পড়ে গেলেন। তবুও নিজের ভেতরের অস্বস্তি চেপে নিচু গলায় বললেন, “তুমি কি তোমার বউকে নিজের ঘরে এক্সপেক্ট করছো? যদি তাই করে থাকো, আমাকে সরাসরি বলো। আমি অনুমতি দিলেও দিতে পারি। তোমার অন্তত চেষ্টা করে দেখা উচিত।”

রঞ্জক একপ্রকার চটে গিয়ে বলে উঠল, “তোমার মনে হচ্ছে আমি তোমার অনুমতির আশায় বসে আছি? হাউ রিডিকিউলাস! যদি তোমার সেই বউমার মাঝে নূন্যতম যোগ্যতাটুকুও থাকতো, তাহলেও হয়তো আমি মেনে নিতে পারতাম। হাহ! থাক সেসব কথা, আমি যখন তোমার বউমাকে ডিভোর্স দিয়ে আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করে আনবো, তখন দেখো, আমি আমার বউকে কীভাবে আগলে রাখি।”

“সেটাই তো রঞ্জক, সাজানো গোছানো জিনিস সবাই পছন্দ করে। কিন্তু কেউ পরিশ্রম করে সাজিয়ে নিতে রাজি নয়।”

“আমি ফুল দিয়ে ঘর সাজাতে অবশ্যই রাজি। কিন্তু তোমার বউমার মতো আবর্জনা দিয়ে একদমই না।”

কথাটা শোনামাত্র আরিজ মাহতাবিরের সহনশীলতার শেষ প্রাচীরটুকুও যেন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো। তিনি বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে উত্তপ্ত রঞ্জকের সাথে তর্কে জড়িয়ে কোনো সুরাহা হবে না। উপরন্তু সুযোগ পেলেই রঞ্জক আলতাকে নিয়ে আরও অশালীন ও অপমানজনক মন্তব্য ছুড়ে দেবে, যা সহ্য করা তার পক্ষে অসম্ভব।

“আমি বুঝতে পারছি, আলতাকে মেনে নিতে তোমার সময় লাগবে। আমি তোমাকে সময় দিতে প্রস্তুত রঞ্জক। কিন্তু এমন কিছু কোরো না যা ক্ষমার অযোগ্য।”

কথাগুলো শেষ করেই আরিজ মাহতাবির দ্রুতপায়ে প্রস্থান করলেন; রঞ্জককে আর কোনো কটু কথা বলার সুযোগ দিলেন না।

অন্যদিকে, নিজের ঘরের ব্যালকনিতে থাকা কাঠের বেঞ্চে বসে উদাস চোখে রাতের আঁধারের দিকে তাকিয়ে ছিল আলতা। আজ রাতের আকাশটা মেঘলা, ঘন কালো মেঘের আনাগোনা চিরে থেকে থেকে উঁকি দিচ্ছে এক ফালি চাঁদ। দৃশ্যটা খুবই সাধারণ, কিন্তু একাকী আলতার চোখে এই সাধারণ দৃশ্যটাই যেন রূপকথার মতো মনোরম ঠেকছে। হাজারো অগোছালো ভাবনায় ডুবে থাকা কিশোরীর মন কোন অতলে হারিয়ে আছে, তা অনুধাবন করা দুষ্কর।

হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে দরজার বেল বেজে উঠল। দরজা খোলা রাখেনি আলতা, বন্ধই রেখেছে। অপ্রত্যাশিত আওয়াজে শিউরে উঠল তার দেহখানি। ত্রস্ত পায়ে বেঞ্চ থেকে নেমে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। শাড়ির আঁচলটা মাথার ওপর ভালোভাবে টেনে নিয়ে কপাট খুলতেই সামনে স্পষ্ট হলো শ্বশুরমশাইয়ের অবয়ব।

তক্ষণাৎ নতমুখী হয়ে দাঁড়াল আলতা। আরিজ মাহতাবির একপলক লক্ষ্য করলেন পুত্রবধূকে। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখ দুটি বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল; কিশোরীর পরনে শুভ্র, ধবধবে সাদা শাড়ি দেখে।

“এ কেমন পোশাক পরেছো তুমি?” শ্বশুরের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে কেঁপে উঠল আলতা। দুইদিনের এই সংক্ষিপ্ত বৈবাহিক জীবনে প্রথমবার শ্বশুর মশাই কড়া গলায় কথা বলেছে তার সাথে।

আলতা কোনো জবাব খুঁজে পেল না, চুপচাপ ঠোঁট দুটি চেপে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিজ মাহতাবির নিজেকে সামলে নিলেন। মনে মনে ভাবলেন, তার নিজের বাবা পরলোক গমন করেছেন বহুকাল আগে; তারপর থেকে তার মা এমন ফ্যাকাশে, বিবর্ণ সাদা শাড়িই পরতেন। হয়তো অন্য কোনো পোশাকের বিকল্প না পেয়ে বাধ্য হয়েই আলতা গায়ে জড়িয়েছে এটি।

“রাতে খাবার খেয়েছো?” এবার তার কণ্ঠস্বর অনেকটাই নরম হয়ে এল।

​আলতা আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিল।

​”বিকেলে তৈরি থেকো, আমরা দুজন কেনাকাটা করতে বাইরে যাব।”

আলতা আবারও নীরবে মাথা দোলাল। আরিজ মাহতাবির হতাশ হলেন। এই মেয়েটা এতটাই নিঃশব্দ ও শান্ত যে তার সাথে কথা এগোবেন কীভাবে, তা ভেবেই তিনি দিশেহারা বোধ করেন।

“কেউ এসে তোমাকে বিরক্ত করেনি তো?” 

এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে আলতা চমকে উঠে চোখ তুলে তাকাল। আরিজ মাহতাবির থতমত খেলেন। 

আলতা ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিল, “না, কেউ আসেনি। কেবল একজন এসে যথাসময়ে খাবার দিয়ে গেছে।”

​“ওহ, আচ্ছা। ঘুমাও তাহলে। শুভরাত্রি।”

চলবে…

(যারা যারা পড়ছেন সবাই রেসপন্স করুন। তাহলে পরবর্তী পর্ব তাড়াতাড়ি লেখার অনুপ্রেরণা পাবো।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply