Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৭(প্রথমাংশ+শেষাংশ)


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৪৭ [ প্রথমাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

মেঘা তাকালো আড়চোখে । রৌদ্র গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে মেঘার পাশে । আদর মাখানো আবদারি সুরে বলে….

” ক্ষিদে পেয়েছে জান ,, একটু খাইয়ে দে । 

থেমে বলে….

” হাত কেটে গেছে । একলা খাবো কি করে ? কাল আসার আগে আম্মু খাইয়ে দিয়েছে । আজ সারাদিন খাইনি এখনো । ভুলভাল গিলেছি । পেট খারাপ । খালি আছে । না খেলে বমি আসবে । খাইয়ে দে । 

মেঘা আড়চোখে সারার বাবার দিকে তাকায় । অস্বস্তি লাগে তার সামনে । রেহানা শিকদার বসতে বসতে বলেন…

” সারাদিনে খোঁজ মেলে না । এখন আসতে গেলি কেনো ? তোর বাপকে বলিনি এখনো । 

” বললেও ভয় পাই আমি ! আর এসেছি আমার বউয়ের কাছে ‌। তুমি কথা বলছো কেনো ,, চুপচাপ বসে খাও । 

” বাড়িটা আমার, ভুলে যাস না । বউকে নিয়ে আমার বাড়িতেই বসে আছিস । বউয়ের কথা রাত হলেই মনে পড়ে ! 

” তবুও তো পড়ে । কিন্তু কি বলতো , ব্যাড লাক ! তোমার মেয়ের জামাই তোমার মেয়েকে দিনেও মনে করে না ,, আর রাতেও মনে করে না । উফফফ খালামনি,, কি জামাই জুটেছে তোমার মেয়ের কপালে । 

কি রে নাগিন , কি অবস্থা ? ভালো তো ? বাপের বাড়িতে পড়ে আছিস । মদনা জামাই খোঁজ নেয় না কতদিন ? 

রৌদ্রের ভ্যাঙানো স্বর ইভার দিকে । ইভা ফোঁস করে ওঠে । 

” দেখো রৌদ্র ভাইয়া ,, আমার হাসবেন্ড সরকারি চাকরি করে ! অনেক ব্যস্ত থাকে । তোমার মতো লাফাঙা,নেশাখোর নয় । বাজে কথা বলবে না ওনাকে নিয়ে । 

রৌদ্র হাত মুঠিয়ে কিড়মিড় করে উত্তর করলো….

” নাগিনের ঘরের নাগিন ,,, তোর ঐ ঊনসত্তর বছরের বুইড়া ব্যাটা কে নিয়ে বাজে কথা বলার রুচি নেই আমার । আর নেশাখোর কারে বলিস ,, আমার নেশা শুধু আমার ইভারার উপর । ওর নেশায় নেশাগ্রস্ত আমি । বুঝলি ? 

” ঊনসত্তর নয় ,, ঊনচল্লিশ । 

” ঐ একই হলো । ইউ নো , আ’ম টুয়েন্টি এইট । আমার সুইটহার্ট জিতে গেছে । তাই না সুইটহার্ট ?

মেঘা দাঁত পিষে খাবার গেলে কোনো রকমে । রি রি গাঁ জ্বলে ওঠে ওদের দুজনের কথাবার্তায় । 

সারার বাবা গলা ঝাড়েন  । ইভার প্রসঙ্গ ঘাঁটা যাবে না বেশি । রৌদ্র চড়ে গেলে সামলানো মুশকিল । বিয়ে থেকে পালিয়েছিলো ঐ মেয়ে , ভোলেনি রৌদ্র । তিনি বলেন…

” বাবা , উপরে দাও তুমি । আমাদের খাওয়া শেষ । একা খাবে এখানে ? সারা তোমার খাবার উপরে নিয়ে যাবে । তুমি যাও । 

” সারা কেনো ? আমার বউ আছে কি জন্য ? যাচ্ছি উপরে । খালা মনি , আমার বউকে দিয়ে খাবার পাঠাও আমার জন্য । আর হ্যাঁ ,, করলা আছে বাড়িতে ? পারলে একগ্লাস ঝাল ঝাল করলার জুস দিও । আমার ফেভারিট ডিস চেখে দেখার ক্রেভিং হচ্ছে । 

এই বলে ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রস্থান করলো রৌদ্র । 

ও যেতেই রাগে হিসহিস করে ইভা । সামনে বড় মুখ করলেও আরালে আবডালে রৌদ্রের সাথে মেঘা কে সহ্য হচ্ছে না । গা জ্বলে যাচ্ছে হিংসায় । পাঁচ বছর আগে বিরাট ভুল করেছিলো বিয়ে থেকে পালিয়ে । যার খেসারত দিয়ে যাচ্ছে এখনো । 

এ বাড়ির সবাই দিয়ে যাচ্ছে । ইভা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে যাকে , সে কমপক্ষে ওর থেকে পনেরো বছরের বড় । সাধারণ একটা সরকারি চাকরি করে । ফেসবুকে পরিচয় দুজনার । তাও বিয়ের পাঁচ দিন আগে পরিচয় হয়েছিলো । ইভা বড্ড অর্থগৃধ্নু স্বভাবের । ভুজুং ভাজুং বুঝে রৌদ্র কে ছেড়ে আগপিছ না ভেবেই পালিয়েছিলো তাই । আর ওকে পালাতে সাহায্য করেছে সারা । এটা রৌদ্র আর সারা ব্যাতীত কেউ জানে না আজ অবধি । পালানোর পর নিজের একটা দুর্বিষহ জীবন উপহার পেয়েছে ঐ মেয়ে । যে জীবন নিয়ে আফসোস এখন । 

শিকদার বাড়িতেই থাকে ও । ওর হাসবেন্ড খোঁজ নেয় না সেভাবে । এর মধ্যেই জাবিরের জন্ম । তাই , গত বছর দুয়েক থেকে ডিভোর্স টা আটকে আছে । ডিভোর্স হবে ওদের । 

রৌদ্র তখনো সুদর্শন ছিলো । আর এখন দশগুণ সুদর্শন । মাত্রাতিরিক্ত সৌন্দর্য বেড়েছে ‌যুবকের । লোভ লাগে তা দেখে । কয়লা খুঁজতে গিয়ে সোনা হারিয়েছে এই লোলুপ স্বভাবের জন্য । এ বাড়ির সবাই বিভ্রান্ত ইভার উপর । 

মেঘার খাওয়া শেষ । রেহানা শিকদার রৌদ্রের জন্যে খাবার বাড়ছেন প্লেটে । সারা আর মেঘা উঠে দাঁড়াতেই রাগে খ্যাট খ্যাট করে উঠলো ইভা….

” ঢং দেখলে বাঁচি না । স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক নেই । ডিভোর্স হবে দুদিন পর । আর এখন চলছে এই নোংরামি । তাও আবার অন্যের বাড়িতে এসে । কি দরকার ছিলো এ বাড়িতে এসে এসব নোংরামি করার ? 

রেহানা শিকদার রেগে ধমকালেন মেয়েকে….

” ইভা ,, কি হচ্ছে টা কি ? মুখের ভাষা ঠিক কর ! 

” আমি ঠিক করেই বলছি আম্মু । ও তো চলে যাবে কদিন পর । ডিভোর্স দেবে । তাই রৌদ্র ভাইয়ার বাবা ওকে এখানে দূরে সরিয়ে রেখে গেছেন । কিন্তু কি লাভ হলো ? ডিভোর্সের আগ অবধি সেইতো ফষ্টিনষ্টি করেই চলেছে । আর এসবের জন্য আমাদের বাড়িটাই খুঁজে পেলো ? যত্তসব নোংরা মেয়ে…..

মেঘা নাক ফুলিয়ে তাকায় । সারা চড়া গলায় বলে….

” আপু । খবরদার । মেঘা কে নিয়ে একটা খারাপ কথাও মেনে নেবো না আমি । মেঘা রৌদ্র ভাইয়ার বউ হওয়ার আগে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । আর আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েই এ বাড়িতে এসেছে ও । 

” এই করে করে তো মাথায় তুলেছিস ওকে । সেই ছোটবেলা থেকে সহ্য করছি এই মেয়েকে । চাল চুলো নেই । জোর পূর্বক ঘটে যাওয়া একটা বিয়েকে খুঁটি করে পাঁচ বছর আরাম আয়েশে কাটিয়েছে । এখন চলে যাওয়ার আগে আবার আমাদের ঘাড়ে এসে জুড়ে বসেছে । 

” ইভা ,, মুখ সামলে কথা বলো । মেঘা কোনো দিন কোনো অংশে তোমার থেকে কম ছিলো না আমাদের কাছে । ভুলে যেও না এটা । চাল চুলো নেই কার শুনি ? তুমি যে বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছো , সে বাড়িটা দিনে শতবার কেনার ক্ষমতা রাখে মেঘা । সেটা কাবির পরিবারের বউ হিসেবেই হোক , বা ইয়াশের অধিকারে থেকেই হোক । 

তাই মুখ খোলার আগে ভেবেচিন্তে মুখ খুলবে । মেঘার এই বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী তুমি । তোমার বিভ্রান্তিকর কর্মকান্ডের কথা ভুলে যেও না । 

সারার বাবার দাম্ভিক কন্ঠ । ইভা তেঁতে ওঠে….

” আব্বু ,, এই মেয়েটার জন্য তুমি আমাকে কথা শোনাচ্ছো ? 

” শোনাচ্ছি । যেচে পড়ে কথা শুনতে আসছো কেনো তুমি ? 

রেহানা শিকদার উঠে দাঁড়ান । 

” মেঘা ,, রৌদ্রের খাবার নিয়ে ঘরে যা তুই । কারোর কথায় কান দিতে হবে না তোকে । 

ট্রেতে খাবার সাজিয়ে দিলেন তিনি । মেঘা মাথা নামিয়ে রেখেছে । চোখ ছলছল অপমান বোধে । 

সারা আগ বাড়িয়ে বললো ……

” আমাকে দাও আম্মু । আমি পৌঁছে দিচ্ছি । মেঘা দুহাতে ধরতে পারবে না । 

ওর কথা শেষ হতেই মেঘা বড় বড় ধাপে প্রস্থান করলো । 

ঘরে রৌদ্র,, সোফায় বসে হাতের ব্যান্ডেজ খুলছে । বড্ড বিড়ম্বনায় ফেলছে এটা । হাতটা অচল হয়ে আছে পুরো । কিঞ্চিত ব্যাথায় মুখ কুঁচকানো ওর । তীক্ষ্ণাকারে জড়ো হয়েছে অক্ষি লতা । 

মেঘা ঘরে ঢোকে । খট করে দরজার শব্দে চোখ তুলে চায় রৌদ্র । ব্যাথা ঠেলে হাসে এক ফালি । ওষ্ঠ প্রসারিত করে উৎসুক হয়ে বলে….

” অপেক্ষা করছিলাম সানি,, আমার খাবার কোথায় ? 

মেঘা নাক ফুলিয়ে কাঁদো হয়ে তাকালো । 

এই লোকের প্রতি রাগ অভিমান ঘুঁচে গেছিলো । সকাল থেকে না করে হলেও হাজারের অধিক মেসেজ এসেছে মেঘার ফোনে । সবখানে এক বাক্য । কতবার যে ক্ষমা চেয়েছে হিসেব নেই । পুরো ঘর জুড়ে এখানে ওখানে শতাধিক চিরকুট খুঁজে পেয়েছে মেঘা ‌। যেখানেই চোখ হাত পড়েছে , সেখান থেকেই একটা করে চিরকুট পেয়েছে ‌। সব গুলোতে লেখা… Sorry Sweetheart । লেখা খারাপ ,, বাম হাতে লিখেছিলো বোধহয় । 

ক্ষণে ক্ষণে বার্তা পেয়ে হেসেছে মেঘা । ভুলতে বসেছিলো সব ‌। কিন্তু এখন ইভার শোনানো চড়া চড়া কথা গুলোতে মেজাজ বিগড়ে গেছে । লোকটার উপর চরম রাগ উঠলো । পেছনে সারা এসে হাজির । মেঘা মাথা নামিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকলো । রৌদ্র হা বনে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে…

” ওর কি হলো ? 

” তেমন কিছু না, ভাইয়া ! এই যে তোমার খাবার ! 

সারা চেপে গেলো সবটা । টেবিলের উপর খাবারের ট্রে রাখলো । কথা ঘুরিয়ে বললো….

” দেশে ফিরে খোঁজ খবর নেওয়া ছেড়েই দিয়েছো ভাইয়া । আগে তো কল করতে মাঝে মাঝে । কিন্তু এখন আর করোই না ।

” তোর খোঁজ নিয়ে আমি কি করবো ? 

” তাও ঠিক , তুমি তো আবার আমার খোঁজ নিতে না । বড্ড স্বার্থপর তুমি ‌। নিজের আপন জিনিসটা বোঝো শুধু । 

” নিজের টাই বুঝতে চাই শুধু । 

” বোঝো , বেশি করে বোঝো । তবে ভাইয়া একটা কথা বলার ছিলো তোমায় । সুযোগ পাচ্ছিলাম না । 

” বল ! 

” ভাইয়া আসলে ,, ইয়াশ….

” চুপ !

” ভাইয়া শোনো আগে ! 

” চুপ থাক । শুনতে চাই না । 

” না শুনলে জানবে কি করে তুমি ? আর কত জেদ ধরে রাখবে বলোতো ? ও আসছে….

” তাতে আমার কি ? 

” মেঘা কে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসছে ! 

” আমার ইভারা কে নেওয়ার জন্য আমি এসেছি । আমি ব্যাতীত আর কে ওকে নিতে আসবে , তাকে দেখে নেবো আমি । আমার ইভারা শুধু আমার । যে ওকে আমার থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে , তাকে আস্ত রাখবো না আমি । সে যেই হোক না কেনো ! এসেই দেখুক একবার । যে পথে আসবে , সে পথে ওকে ফেরানোর দায়িত্ব আমার ‌।  

” পারবে ? 

রৌদ্র তাকালো । ঠোঁট বাঁকিয়ে তিরষ্কার করে হাসলো । চোখ নামিয়ে বললো…

” পারবো কি–না , তা তোর জানা আছে ভালো করে । চিন্তা করছিস কেন বলতো ? আরে ইয়ার ,, আ’ম রুডভিক কাবির রৌদ্র । ডোন্ট ওয়ারি সিস,,, যা ঘুমা গিয়ে । 

সারা হাসলো এক পশলা ‌। বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে ‌। 

ছোপ ছোপ রক্ত মাখা ব্যান্ডেজ টা ডাস্টবিনে ফেলে রৌদ্র । হাতের অবস্থা আসলেই ছিন্নভিন্ন । জখম স্থান পুরে আসছে ‌। টান ধরেছে ব্যাথার পাশাপাশি । 

মেঘা দেখলে আঁতকে উঠবে । সেভাবে দেখার মতো অবস্থায় নেই এমন দশা । ঢাকতে হবে এই ক্ষত । কিন্তু ব্যান্ডেজ করা যাবে না । 

মেঘা ওয়াশ রুম থেকে বেরোয় । রৌদ্র হাত পেছনে লুকিয়ে ফিরে চায় ওর দিকে । ফের বলে…

” খাইয়ে দে না জান ,, খিদে পেয়েছে তো । 

মুখ মুছলো মেঘা । ভাব খানা এখনো অভিমানী । রৌদ্র কাতর স্বরে বলে….

” সরি বলেছি তো , আর কতবার বলবো ? ক্ষমা কর না এবারের মতো । এরপর মারা তো দূর , রাগি চোখেও তাকাবো না কখনো । সরি সুইটহার্ট…আ’ম রিয়েলি সরি । 

একটু খানি কথা বল ‌। আচ্ছা ,, আমি না রাইনো মুখো । তুই রাইনো মুখো বলেই ডাক আমায় । তবুও কথা বল । 

বলতে বলতে এগোয় রৌদ্র । 

মেঘার এই বাড়াবাড়ি করা , ওকে উপেক্ষা করার কারন রৌদ্রের অজানা নয় ‌। বরং অক্ষরে অক্ষরে জানা । মেঘা আয়নার দিকে ফিরে আছে । রৌদ্র ওর পেছনে দাঁড়িয়ে ওকে টেনে ফেরায় নিজের দিকে । কাছাকাছি দাঁড়ায় অনেকটা দূরত্ব ঘুচিয়ে । 

কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রমনীর গলা হতে পাতলা ওরনাটা খুলে নিয়ে ঝুঁকে আসে মুখ বরাবর । ধক্ করে চায় একবিংশী । রৌদ্রের এমন অকস্মাৎ কারসাজি বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকায় । রৌদ্র ওর খুলে নিয়ে নিজের ডান হাতে পেঁচায় । ঢেকে ফেলে দগ্ধ ক্ষত । 

এতেই রক্ষা পায় রমনী । রৌদ্র ওর বোকা বোকা মুখপানে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসে…

বলে হাস্কি টোনে …

” ওও বউ ,, একটা জিনিস দেই ? 

” কি ? 

মেঘা পাল্টা প্রশ্নে সহসা জানতে চায় ‌। ভয়ার্ত রমনীর মুখাবয়ব । হেসে ফেলে রৌদ্র । ঠোঁট কামড়ে বলে ফিসফিস করে…

” একটা চুমু ! জাস্ট একটা । 

” রাইনো মুখো , মজা করবেন না । সরুন । 

” মজা করছি না সুইটহার্ট । আ’ম সিরিয়াস । চোখ বন্ধ করো…

” দেখুন , ভালো হচ্ছে না কিন্তু । আমি রেগে আছি আপনার উপর । 

” রাগ ভাঙাতেই তো চাইছি । 

” এমন অসভ্যতা করলে আরো বেশি রেগে যাবো । 

” এটাকেই সভ্যতা বলে । 

রৌদ্র ঝুঁকে পরে আরো বেশি । পেছাতে গিয়ে রমনীর কোমর আটকায় মিররের বর্ধিতাংশে । সিটিয়ে যায় মেয়েটা । রৌদ্রের উষ্ণ ধোয়াটে শ্বাস একটু আধটু আঁছড়ে পড়ছে মুখের উপর । 

মেয়েটা চিবুক নামিয়ে নেয় একপাশে । শুল্ক ঢোক গেলে । রৌদ্র এবার হাসে শব্দ করে । বাম হাতে পকেট থেকে কিছু একটা বের করে । নত হয়ে রমনীর সিঁথিতে ঠোঁট ছোঁয়ায় আলগা করে । নাক ছুঁইয়ে চোখ বুজে শ্বাস টানে । বলে সেভাবেই….

” তাকাও ,, কিছু একটা আছে তোমার জন্য । 

একবিংশী বিলম্ব করে না । মাথা তোলে এক ঝটকায় । রৌদ্র সরেছে ততক্ষণে । তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলির সাহায্যে কিছু একটা ধরে বাড়িয়ে দেয় রমনীর মুখের সামনে । বাল্বের আলোয় চিকচিক করে জ্বলে ওঠে জিনিস খানা । সাথে একবিংশীর হরিণী দু’চোখ । বিষ্ময়ে মুখ ফাঁক হয়ে তার ‌। চোখের ঘোরে অবিশ্বাস । 

অবিশ্বাস ধরেই মিনমিনে গলায় অস্ফুটে উচ্চারণ করে….

” রৌদ্র ,,, এটা আমার ? 

চলবে…….

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৪৭ [ শেষাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

মেঘার কন্ঠে উৎকণ্ঠা । বিচলিত সে । চোখে আহ্লাদ ভরপুর । রৌদ্র আলতো করে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায় । চিকচিক করে ওঠে একবিংশী । রৌদ্রের হাতে একটা চেন । যেটা ওর নিজের । ওর মায়ের শেষ স্মৃতি ‌। সেটাকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিলো মেঘা । চোখ ভরে আসে আনন্দের অশ্রুতে । এটা হারিয়েছিলো সে ‌। পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে কত খুঁজেছে , পাওয়া যায় নি । 

মেঘা চেনটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে । ধড়ফড় করে বুক । চুমু খায় পরপর । উদ্বিগ্ন হয়ে ভেজা চোখ তুলে জানতে চায়…

” এটা তো হারিয়ে গেছিলো । কোথায় পেলেন আপনি ? 

” পেয়েছি ! 

” জানলেন কি করে এটা আমার ? 

” তুমি গোটা’টাই আমার । আর আমার বউয়ের কি আছে কি নেই , আমি জানবো না ? 

মেঘা হাসি চওড়া করে । আনচান লাগে উদগ্রীবতায় । অস্থির হয়ে আকস্মিক একটা অপ্রত্যাশিত ঘটন ঘটিয়ে ফেললো । খুশির চোটে হুট করেই দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রৌদ্র কে । সুঠাম বুকে জায়গা করে মাথা গুঁজে নিলো । আকড়ে নিলো লোকটার পিঠ । 

রৌদ্রের সুঠাম শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে রমনীর শক্ত আলিঙ্গন পেয়ে । তব্দা খেয়ে মূর্ত বনে যায় সে । স্তব্ধ হয় নিঃশ্বাস । হাত জোড়া এখনো নিশ্চল । উঠলো না রমনীকে জড়ানোর জন্য । সে যেনো ডুবলো এক অবিশ্বাস্য ঘোরে । যে ঘোর কাটলো একবিংশীর উচ্ছাসে…..

” থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ সো মাচ্…..

আপনি জানেন , এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় একটা জিনিস । আমার আম্মুর শেষ স্মৃতি । হারিয়েছিলাম এটা ,, কত খুঁজেছি জানেন ? কোত্থাও পাই নি । আর আপনি পেয়েছেন এটা ? কোথায় পেয়েছেন , কবে পেয়েছেন ? 

রৌদ্রের নিঃশ্বাস জোরালো হয় ‌। বক্ষ স্পন্দনের সাথে বাড়ে হৃৎপিণ্ডের ওঠানামা । শুল্ক ঢোক গেলে সে । গলা ভিজিয়ে আলগোছে খেই হারানো রমনীর পিঠে হাত তোলে । ধীরে বলে…

” অনেক আগে !

” তাহলে আগে দেন নি কেনো ? 

” ফিরিয়ে দেওয়ার পর উষ্ণ আলিঙ্গনে এমন সুখানুভূতি পাবো জানলে অনেক আগেই দিয়ে দিতাম । 

এহেন হীম কথায় ঘোর কাটে একবিংশীর । ঝট করে রৌদ্র কে ছাড়ে সে । ঠেলে দূরে সরায় । চিবুক নামিয়ে জিভে কামড় বসায় । বেঘোরে কি লজ্জা জনক পরিস্থিতি তৈরি করলো । গাল দুখানা লাল হয়ে আসে ওর । তড়াক করে পিঠ ফিরিয়ে মুখ লুকায় । রক্ষে হয় না তবুও । দর্পণে ভেসে ওঠে রমনীর লালিত রাঙা মুখাবয়ব । যেদিকে খেয়াল নেই তার । তবে রৌদ্রের ঠিকি আছে । তার আছে মাদকিয় দৃষ্টি । 

সে উথাল পাথাল সুখের জোয়ারে ভরা গালে হাসে নিঃশব্দে । এগিয়ে যায় আবার । মেঘা আড়চোখ তুলে থেমে থেমে তুতলিয়ে বলে…..

” আ..আমি জড়িয়ে ধরতে চাই নি । এক্সাইটমেন্টে ভুল করে হয়ে গেছে । 

” এমন ভুল হাজার বার হোক । হাজার বার যেনো এই সুখ পাই আমি । কতটা ভালো লাগে এই অনুভুতি ,, ধারনা আছে তোমার ? 

কান গরম হয়ে আসে মেয়েটার । 

রৌদ্র ওর কাঁধের নিকট ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে বলে….

” দাও ,, পরিয়ে দিই । 

সহসা তাই করলো মেঘা । রৌদ্রের এমন মারাত্মক দৃষ্টির কবল থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি করে ওর হাতে চেইনটা তুলে দিলো । শ্বাস ফেলতে লাগলো বুক ফুলিয়ে । 

রৌদ্র ফিচেল হাসে । রমনীর কাঁধের উপর কুন্ডলি পাকানো খোঁপাটা আলগোছে একপাশে সরিয়ে দেয় । তার ঠান্ডা আঙ্গুল দ্বয়ের মৃদুমন্দ স্পর্শে শরীর শিউরে ওঠে মেঘার । শিরশির করে ওঠে সর্বাঙ্গ । পায়ের নখ খোটে মেঝেতে ‌। চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় । 

তা দেখে হাসি প্রগাঢ় হয় বেপরোয়া লোকটার ওষ্ঠপূটে । চেইন টা আলগোছে পরিয়ে দেয় গলায় । অতঃপর সেটার দিকে অসহায় চোখে তাকায় । কি সুন্দর জ্বলজ্বল করছে ফর্সা গ্রীবায় । এটা অসহনীয় । হিংসাত্মক সত্তা থেকে কেমন আনচান লাগে মনে । নিভে যাওয়া স্বরে বলে সে….

” এটা সবসময় গলায় ঝুলিয়ে রাখা কি খুব প্রয়োজন , সানি ? খুলে রাখলে হয় না ? 

থামে একটু । রমনীকে কাঁপতে দেখে সে । শ্বাস নিতে দেখে ঘন ঘন । কম্পন বাড়িয়ে নত হয়ে হুট করে ওষ্ঠাস্পর্শ আঁকে কাঁধের ভাঁজে । ব্যাস ,, গলে পড়ে রমনী । এক ঝটকায় ফিরে দাঁড়ায় । রৌদ্রের উদরের দু’পাশে হাত রেখে ঠেলে সরায় ওকে । চোখে চোখ রেখে না বোধক মাথা নাড়ায় । কাকুতি করে ধরা গলায়….

” বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে । দূরে সরুন প্লিজ….

” এরকম একটু বেশি বেশি হলে কি খুব ক্ষতি হবে ? প্লিজ….!

” রৌদ্র !! 

” ইয়েস সুইটহার্ট । 

” সরুন ,, আমি ঘুমাবো । 

” খিদে পেয়েছে । 

” খেয়ে নিন একা ! 

” হাতের অবস্থা কাহিল । 

মেঘা চোখ নামায় । ঢোক গিলে পাশ কাটিয়ে সরে আসে । চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানে উপর পানে মুখ তুলে । তিরতির করে কাঁপে সর্বাঙ্গ । কম্পন রুখে টেবিলের দিকে এগোয় রমনী । ট্রে হাতে তুলে নিয়ে ডাকে…

” আসুন । 

ফিক করে হাসে রৌদ্র । অগত্যা এগিয়ে যায় । 

” রাগ কমেছে ? 

রমনী নিরুত্তর । সোফার একপাশে বসলো খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে । রৌদ্র বসে ওর পাশে । মেঘা ভাত মেখে এক লোকমা তুলে ধরে ওর মুখ সম্মুখে । 

চেয়ে থেকেই লোকমা মুখে নেয় রৌদ্র । খেতে খেতে ফিচেল স্বরে টিটকারী মেরে বলে…

” তোর অনেক জিনিস আমার কাছে আছে সুইটহার্ট , আজ থেকে রোজ একটা করে ফেরত দেবো । বিনিময়ে আমাকে সুখানুভূতি দিতে হবে তোকে । 

মেঘা হাত থামিয়ে রেগে তাকালো । জিভে কামড় বসালো রৌদ্র, নিজেকে শুধরে নিলো….

” উহু সরি,,, তোমাকে । 

” চুপ চাপ খেয়ে নিন । 

” আজ বিছানায় শুই ? সোফায় আরাম হয় না ! বিছানায় ঘুমালে তোমাকে আর আলাদা করে নিচে নেমে আমার হাত জড়াতে হবে না । বসে বসে ঘুমাতেও হবে না । 

মেঘা ভ্যাবাচ্যাকা খেলো । থতমত খেয়ে ঘন পলক ঝাপটালো । রৌদ্র ঠোঁট চেপে বলে গলা খাঁকারি দিয়ে….

” কে যেনো কাল রাতে আমার হাতে একশত এগারোটা চুমু খেলো । উঁহু , একশত বারোটা । চোখের কোণে একটা পরশ পেয়েছি । সেটার কথা ভুলে যাই কিভাবে ! 

হা বনে হতবাক বনলো রমনী । এই লোক জানে ? সজ্ঞানে ছিলেন ইনি । না থাকলে জানবেই বা কি করে ? ইশশ্,, কি লজ্জা ! চোখ মুখ লাল হয়ে আসে এক্কেরে । 

হেসে ফেলে রৌদ্র । আরেক লোকমা মুখে তুলে চিবুতে চিবুতে অস্পষ্ট মেকি স্বরে বলে…

” স্বপ্ন দেখেছি হয়তো । তাই না ? স্বপ্নে এসেও শান্তি দাও না ‌। চুমু দিয়ে জ্বালা বাড়িও দাও । 

” চুপ করুন রাইনো মুখো । সবসময় বাজে কথা বলেন…

” বাহ্ , তুমি আমার সুযোগ নিয়ে এসব করে দেখালে ক্ষতি নেই, আর আমি বললেই বাজে হয়ে গেলো ? এমনিতেও , বাজে কম কিছুই হচ্ছে । আরো অনেক কিছুই হওয়ার কথা ছিলো । যে কারনে ডেকেছো আমায় ! 

” কি করলাম আমি ? কখন ডাকলাম ? 

” কি করোনি তাই বলো ? জ্বালিয়েছো আমায় ,, পুড়িয়েছো প্রনয়শিখায় ! তুমি ইনোসেন্ট নও সুইটহার্ট । ভান করো ইনোসেন্ট হওয়ার । 

” আজব , কি করেছি আমি ? 

মেঘা যেনো কিছুই জানে না । রৌদ্র খেতে খেতে ফোন বের করলো । হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে কিছু একটা বের করলো । অতঃপর ফোন ধরলো রমনীর চোখের সামনে । 

” ভুলে গেলে সুইটহার্ট ? এসব কবে হবে ? 

মেঘা বিরক্তি নিয়ে ফোনের দিকে তাকায় । কয়েকটা মেসেজ । ওর নিজের নাম্বার থেকে । এ অবধি সে রৌদ্র কে মেসেজ করে নি কখনো । তাহলে কোথা থেকে ? কি মেসেজ এসব ? আগ্রহ নিয়ে প্রথম তিনটে মেসেজ পড়া মাত্রই পাথরের ন্যায় জমে যায় রমনী । 

চোখ বড় বড় করে সটান হয়ে বসে রয় । বাকিগুলো পড়ার জন্য জবান উঠলো না । দম কুলালো না । মাথা চক্কর দিতেই ঘোলাটে হলো চোখ জোড়া । 

চোখ উল্টায় রমনী ‌। পুরো শরীরে ঝিঁ ঝিঁ ধরে ‌। তৎক্ষণাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে…..

” আস্তাগফিরুল্লাহ…

এসব কি রাইনো মুখো ? 

” আমার রোমান্টিক বউয়ের আকাঙ্ক্ষা । এসব পূরনের জন্যই তো এসেছি আমি । ডেকেছো তুমি ‌। না এসে থাকতে পারি ?

” ছিঃ,, আপনি খুব খারাপ ! ফোন দূরে সরান আমার থেকে ! আমি কখনো ডাকিনি আপনাকে । আপনি মিথ্যে বলছেন । নিজে থেকে আমার ফোন এসব উল্টো পাল্টা মেসেজ সেন্ড করেছেন, তাই না ? 

” লেটস সি ,, ডেট দেখো ‌। আমি ফিরে আসার আগের সন্ধার মেসেজ ‌। তখন তো আমি ছিলাম না । পরের রাতে ফিরেছি…! বাই দ্যা ওয়ে ,, তুমি যে এতো কিছু চাও ,আগে বললেই পারতে ! এভাবে লোক দেখানো ইগনোর করে লাভ কি ? উই আর লিগ্যালি হাসবেন্ড ওয়াইফ । দিস ইজ নট আন-ইউজুয়াল । হতেই পারে…

” আআআআআ ,, চুপ করুন অসভ্য লোক ! মিথ্যে বলবেন না আমার নামে ‌। আমি এসব মেসেজ কক্ষনো দেই নি আপনাকে । 

” সভ্য মেয়ে ,, মিথ্যে বলছি না আমি । আই নো ইউ ওয়ান্ট মি ,, ইউ ওয়ান্ট মি ডেসপারেটলি । আমি পাগল ,, পিচ্চি ভেবে ফেলে রেখে গেছিলাম । দেরি করে ফেলেছি আসতে । এরমধ্যেই পাকনা হয়ে গেছো ভীষণ । আমাকে সিডিউস করছো ? এসব চলে তোমার মনে মনে ? চাইছো এসব ? নটি গার্ল… ধরলে কিন্তু ছাড় পাবে না পরে । 

ক্ষুব্ধ হয়ে এঁটো হাতে রৌদ্রের বাহুতে সজোরে একটা কিল বসালো মেঘা ‌। ভাতের প্লেট কোলে রেখে রেগে মেগে অস্থির হয়ে বললো….

” আপনি আসলেই একটা নির্লজ্জ । বলছি তো, এসব মেসেজ আমি দেই নি আপনাকে । সত্যিই বলছি ।

” দেখতেই পাচ্ছি আমি ‌। তোমার ফোন থেকে ভুত দেয় নি নিশ্চয়ই ! মেরি জান ,,, তুমি যা চাও, আমি সেটা তোমার চেয়েও হাজার গুণ বেশি চাই । ভীষণ ভাবে চাই । একটা বার প্রশ্রয় দাও শুধু ,,

বাকি কথা শেষ করার আগেই মেঘা হাত ছোড়াছুড়ি করে এলোপাথাড়ি আরো কয়েকবার মারলো ওর বাহুতে । রৌদ্র কিঞ্চিত মুখ কুঁচকে ব্যাথাতুর ভঙ্গিমায় বলে…

” ব্যাথা পাই তো , জান ! 

” চুপ করুন ,, আর একবার মুখ খুলেছেন তো মুখ সেলাই করে দেবো আপনার । যান তো ,, আমি কথাই বলবো না । অসভ্য , নির্লজ্জ বেহায়া ইরিটেটিং ম্যান…

প্লেট রেখে উঠে দাঁড়ালো মেঘা । পিছু ডাকে রৌদ্র…

” আরে , আগে খাইয়ে তো দাও । 

” আর পারবো না । 

” ইভারা ,, 

চলবে…….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply