#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(২৯.১)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়ের মাথায় বসে থাকা শালিকের ডাকাডাকি নিয়ে শুরু হলো চরনন্দীতে শিকদার বাড়ির প্রথম দিন। মাত্র ভোর হয়েছে। ঘন কুয়াশার ফাঁক চিড়ে অল্পস্বল্প উঁকি দিচ্ছে সূর্য।
ফেব্রুয়ারী মাস,শীতেল তপ্ততায় মুড়ে আছে সুমনাদের শিউলিবাড়ির চাল। উঠোন ঝাড়ু দেয়ার খসখসে শব্দটায় জীবনে প্রথম ঘুম ভাঙল পিউয়ের। বেখেয়ালি চোখ গিয়ে পড়ল মুখোমুখি টিনের চালে। অমনি তড়াক করে উঠে বসল মেয়েটা। পাশের খাট গোছানো। রিনি-মিনি নেই। পিউ পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে দমকা হাওয়ার বেগে ছুটে এলো বাইরে।
খালেদা উঠোনে পড়ে থাকা পাতা ঝাড়ু দিচ্ছেন। ব্যস্ত পায়ে গোরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছেন অহিদুল। কলতলা থেকে বালতি ভরে পানি নিয়ে হেমায়েতদের বাড়ির পেছনে যাচ্ছেন রিনির মা,দিতি। পিউ বেশ অবাক হলো,এত ভোর ভোর এদের কাজবাজ দেখে। এখনো রোদ ওঠেনি,কুয়াশার তোড়ে সব পরিষ্কারও নয়। কটা বাজে এখন? বাড়ির সবাই কি উঠেছে? ও
উশখুশ করতে করতে হেমায়েতদের ঘরের পথ ধরল। সেখানকার কাঠের সদর দোর বন্ধ। কেউ ওঠেনি তাহলে! ধূসর ভাইও না?
উফ, যার মাথায় ওদের এই আলাদা বাড়িতে রাখার বুদ্ধিটা প্রথম এসেছিল,তার মাথার সব চুল পড়ে টাক হয়ে যাক। পিউ বারবার উঁকি দিচ্ছিল দেখার চেষ্টায়।
খালেদা খেয়াল করতেই ডাকলেন,
“ ও মাইয়া,ওই!”
ঘুরে চাইল ও।
“ জি দাদি?”
“ এদিক আও।”
পিউ কাছে গিয়ে দাঁড়াল। খালেদা শুধালেন,
“ মিনিরে খোজতাছো?”
ও কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল,
“ জি।”
“ ও আরবি পড়তে গ্যাছে। ওরা দুইবুইন লোকমানগো বাড়ি আরবি পড়তে যায়। মিনি সিফারা পড়ে। রিনি কুরআন-শরীফ লইছে ছয় মাস হইব। তোমরা তো মনে অয় এইসব পারো-টারো না,
না?”
“ পারব না কেন? আমিতো ক্লাস ফাইভেই কোরআন খতম করেছি, আলহামদুলিল্লাহ!”
খালেদা একটু ভীমড়ি খেলেন। পিউ শহুরে মেয়ে,কত বড়ো বংশ!
বাড়িঘর দেখে এসে সবই তো বলেছিল সকলে।
বললেন,
“ ও! বালোই।”
“ আমার বাড়ির কেউ ওঠেনি? মানে মা,বাবা?”
“ ওটছে। তোমার আব্বা আর মাইজ্জা চাচায় হেমাত বাইর লগে আটতে গ্যাছে।
তোমার আম্মারে দেকছি পাক গরে বইয়া কতা কয়। আরডির কতা কইতে পারি না। “
পিউ ধূসরের নামটা মুখে আনতে পারল না। পাছে, মুরুব্বি মানুষ উলটো কিছু ভেবে বসলে!
ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে ভাবল,গিয়ে পুষ্পকেই ঘুম থেকে তুলবে। বেড়াতে এসে কেউ এত ঘুমায়! ওদের ঘরের দিকে পা বাড়াল, আচমকা বাড়ির মূল ফটক হতে ভেসে এলো প্রফুল্ল এক ডাক,
“ পিউপিউ, পিউপিউ!”
চকিতে ঘুরে চাইল মেয়েটা। একটা সাদা হাফ হাতা গেঞ্জি,কালো ট্রাউজার আর সাদা কেডস পরে ছুটে আসছে ইকবাল। ঘামে চোখমুখ একশা। পিউয়ের নজর বিঁধল পেছনে থাকা শ্যামলা মানুষটাতে।
কালো কলার নেক গেঞ্জি, কালো ট্রাউজার আর সাদা কেডস পরে আসছে সেও। পিউ বেশ অবাক হলো, এই ভোর ভোর জগিং,তাও এই গ্রামে! ইকবাল এসে দাঁড়াল আগে। হাঁপাচ্ছিল। ওভাবেই বলল,
“ এত তাড়াতাড়ি উঠে গেলে যে!”
তারপর সতর্ক চোখ নেড়ে ইশারায় পুষ্পর কথা শুধাল। উঠেছে কিনা!
পিউ দুপাশে মাথা নেড়ে বোঝাল, না।
জিজ্ঞেস করল,
“ আপনারা কোথায় গিয়েছিলেন?”
“ ব্যায়াম করতে। আমি তো ভাই যেতে চাইনি। একদিন দৌড়ালে দশদিন আমার গায়ে ব্যথা করে। তোমার দোসর ভাই জোর করে টেনে নিয়ে গেছে।”
ধূসরকে দোসর বলায় হেসে ফেলল পিউ। এর মাঝেই ইকবালের পাশে এসে দাঁড়াল মানুষটা।
পিউ অজানা লজ্জায় গুটিয়ে গেল অমনি। চোখের কোণ তুলে চাইল এক পল। ধূসরও একইরকম ঘেমে জবুথবু। তবে,তার তামাটে শরীর ছোঁয়া ঘামের বিন্দু চকচক করছে। যাওয়ার সময় সামনের সিঁড়ির হাতলে তোয়ালে আর পানির বোতল রেখে গিয়েছিল ধূসর। আগে বোতল খুলে পানি খেল। কেডস খুলে স্লাইড স্লিপার পরল পায়ে। এরপর তোয়ালে দিয়ে মুছল ঘাড়ের ঘাম। পুরোটা সময় তন্ময় হয়ে চেয়ে রইল পিউ।
ইকবাল মিটিমিটি হাসে। অমনি মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি এলো ওর। গলা ঝেরে বলল,
“ পিউপিউ, গ্রামটা কী সুন্দর! চারদিকে শুধু ক্ষেত আর ক্ষেত। গতকাল দুপুরে কী দেখেছ, সকালে আরো বেশি সুন্দর লেগেছে। না দেখলে পুরাই মিস জানো!”
পিউ শুনবে কী! ঘুরেফিরে ব্যস্ত ধূসরের দিকে নজর চলে যাচ্ছে। তবে ইকবালের শেষ কথা কানে এলে বলল,
“ আমি কীভাবে জানব,আপনি তো একা ঘুরে এলেন ইকবাল ভাই! আমাকে কেউ নিলোই না।”
“ তুমি এখন যেতে চাও?”
পিউ মন খারাপ করে বলল,
“ চাইলেই বা,এই ভোরে কে নিয়ে যাবে?
আপুরা তো কেউ ওঠেইনি। আমি কি একা একা যাব!”
“ আরে একা কীসের? ধূসর আছে না?
ইয়ে মানে আমিও তো আছি।”
বলতে বলতে উঠোনের পাকা সিঁড়িটায় ধপ করে বসে পড়ল ইকবাল। ক্লান্ত গলায় বলল,
“ কিন্তু অনেক দৌড়েছি। শরীর চলছে না। কোনো ব্যাপার না,আমার বন্ধু আছে পিউপিউ।
তারপর ধূসরকে বলল,
“ বন্ধু, তোমার উচিত না পিউকে ঘুরিয়ে আনা?”
পিউ উৎসুক হয়ে চেয়ে রইল। ধূসর যেন হ্যাঁ বলে তাই! তবে কুঁচকানো কপাল দেখে মনে হচ্ছে না, বলবে অমন কিছু। ধূসর সত্যিই হাঁ করল মানা করতে, ইকবাল পূর্বেই বলল,
“ আচ্ছা থাক লাগবে না।
পিউ,শুভ ওঠেনি?”
“ জানি না ভাইয়া!”
“ ওকে,একটু অপেক্ষা করো। আমি ডেকে আনছি।”
ইকবাল উঠতে নিলেই এবার স্বদ্যোগে প্রশ্ন ছুড়ল ধূসর,
“ কেন? ওকে ডাকার কী আছে?”
“ ঐ আরকি শুভকে বলি, পিউপিউকে কুয়াশা দেখিয়ে আনবে। আমি তো যেতে পারব না। গরম লাগছে, একটা শাওয়ার নেব। ততক্ষনে কুয়াশা চলে যাবে। শুভর ঘর যেন কোনটা?”
ধূসর থমথমে গলায় বলল,
“ কাউকে ডাকতে হবে না। বাকিরা মরে যায়নি।”
“ মরে যায়নি! বেঁচে আছে? কিন্তু কই,আমি তো আমাকে আর পিউকে ছাড়া এখানে জ্যান্ত কাউকে দেখছি না।”
ধূসর নাক ফুলিয়ে চাইল, সব দাঁত বার করে হাসল ইকবাল। সুরে সুরে বলল,
“ রাগ করো না ধূসর সোনা
রাগলে তোমায় ভালো লাগে না!”
“ শাটাপ ইকবাল!”
পিউ হাত দিয়ে মুখ চেপে , মাথা নুইয়ে নিলো। পেট ফেটে আসা হাসিটা আটকাল খুব কষ্ট করে।
তক্ষুনি কেমন গর্জন ছুড়ে ডাকল ধূসর,
“ অ্যাই!”
শশব্যস্ত চাইল মেয়েটা।
“ জি?”
ধূসর ওর আপাদমস্তক দেখল একপল। গায়ে সাদা চুরিদার শুধু। বলল,
“ চাদর নিয়ে আয়।”
পিউ কণ্ঠে অবিশ্বাস নিয়ে বলল,
“ আপনি সত্যি নিয়ে যাবেন?”
“ নিয়ে আয়,যা।”
অমনি মাথা নেড়েই, মেয়েটা ছুটল ঘরের পথে। এতক্ষণে দুহাতের ভর পেছনে রেখে,শরীর ছেড়ে বসল ইকবাল। ঠোঁটে তার বিজয়ের হাসি। ধূসর সরু চোখে চাইল তখনই। দাঁত চেপে বলল,
“ তোর কপালে দুঃখ আছে!”
হুমকি শুনেও শব্দ করে হেসে ফেলল ইকবাল। হুহা হাসির আওয়াজে নিস্তব্ধ উঠোন ঝুমঝুম করল। পিউ একটা কালো চাদর গায়ে প্যাঁচিয়ে, ছুটে এসে দাঁড়াল তখনই। চুলে দুই ঝুটি করা! নিচেরটুকু গোছানো থাকলেও মাথার তালুর চুল রাতের ঘুমে আলুথালু এখন।
ধূসর আর দাঁড়াল না। হাঁটা ধরল তড়বড়িয়ে। পিউ তাকাতেই ইকবাল বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে ফিসফিস করল,
“ অল দ্য বেস্ট!”
আলোর মতো হাসল ষোড়শী। প্রিয় মানুষের পিছু নিতে ছুটল পা চালিয়ে। খালেদা উন্মুখ হয়ে চেয়ে রইলেন ওদিকে। একটা শেয়ানা মেয়ে,আরেকটা শেয়ানা ছেলের সাথে এই ভোর বেলা একা ঘুরতে যাচ্ছে? বাপ মা জানে এদের!
বৃদ্ধার গোল গোল চোখদুটো দেখে ব্যাপারটা বুঝতে পারল ইকবাল। সিটি বাজাতেই,ফিরে চাইলেন খালেদা। ইকবাল হাত নেড়ে বলল,
“ হাই দাদু,ওই যে ময়লা ওদিকে।”
খালেদা থতমত খেলেন,লজ্জা পেলেন। মাথার আঁচলটা একটু টেনেটুনে,ঝাড়ুটা রেখেই ঘরের রাস্তা ধরলেন দ্রুত। ইকবাল বলল,
“ যাহ,ঝাড় না দিয়েই চলে গেল কেন? আমাকে কি পছন্দ হয়নি?”,
**
ভোরের কুয়াশায় প্রকৃতি এখন সফেদ চাদরের মতো। দুপাশে ধানখেত, সরু মেঠোপথের ঘাসে জমে আছে মুক্তোর মতো শিশির। পেছনে ফেলে আসা পথে ফিরে চাইলে,কিচ্ছু দেখা যায় না। ধূসরের পা জোড়া খুব লম্বা বোধ হয়। প্রতিবার হাঁটতে গেলে ছুটতে হয় পিউকে।
তবে আজ ও লক্ষ্য করল ধূসর চার কদম হাঁটলে,এক বার আড়চোখে পেছন ফিরে চায়। যেন পরোখ করে,ও সাথে আছে কিনা!
আর ব্যাপারখানা বোঝা মাত্রই,পাখির মতো চঞ্চল পিউয়ের মাথায় দুষ্টুমি ভিড়ল একটা।
চট করে সরু-সোজা পথ থেকে সরে গেল সে।
ধূসর সামনে হাঁটতে হাঁটতে ফের পিছু ফিরে চাইল। থমকে দাঁড়াল অমনি। পিউ নেই! ভাবল,
পিছিয়ে পড়েছে। এই গিনিপিগ এত আস্তে হাঁটে! কপালে ভাঁজ নিয়ে দুপা ফেরত এলো সে। গাঢ় কুয়াশার তল না পেয়ে ডাকল,
“ পিউ!”
কোনো উত্তর এলো না।
ধূসর গলার জোর বাড়াল একটু,
“ পিউ!”
এবারেও উত্তর নেই। কেবল বাতাসের বেগ সাই সাই করছে। ওর পোক্ত মুখ টানটান হলো সহসা। ঢোক গিলে আশেপাশে চাইল উদগ্রীব নয়নে। ত্রস্ত ছুটে আসার মতো কয়েক পা এগিয়ে এলো ধূসর। জোরে জোরে ডাকল,
“ পিউ! পিউ!”
চারদিক সুনশান,নীরব। দু একটা পাখির ডাক ব্যতীত সব নিস্তব্ধ যেন। ধূসর ঢোক গিলল আবারো। দাঁড়িয়ে থেকেও মাথার কালো চুল ছুঁয়ে একটা ঘামের কণা কানের পাশ বেয়ে নামল।
দরাজ গলার স্বর ঈষৎ বেকে এলো ডাকতে গিয়ে,
“ প-পিউ,শুনতে পাচ্ছিস? পিউ!”
এক দু সেকেন্ড পরেই একটা খিলখিল হাসি ভেসে এলো বাতাসে। চমকে সেইদিকে ফিরল ধূসর। ধানক্ষেতের ভেতর থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো পিউ। অথচ ধূসরের চোয়াল কঠিন হলো অমনি। ধমকে বলল,
“ এটা কি ফাজলামো করার জায়গা?”
পিউয়ের হাসি নিভে যায়।
মিনমিন করে বলে,
“ আমি তো মজা করছিলাম। ভয় পেয়েছিলেন?”
ধূসর মূহুর্তে ঘুরে হাঁটা ধরল। খরখরে ভাষায় বলল,
“ তোকে নিয়ে ভয় পাওয়ার কী আছে?”
“ তাহলে অত জোরে জোরে ডাকছিলেন কেন?”
ধূসর থামে,দাঁড়ায়। ঝট করে ঘুরে চেয়ে বলে,
“ বেশি কথা বলবি না।
এখানে রেখেই যেন চলে যেতে নাহয়!”
পিউ এই হুমকিতে ভয় পেলো না। ভয় পেলো মানুষের চিবুকের শক্তভাব দেখে। উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ আচ্ছা আর করব না।”
এর কিছু সময় কাটল। সূর্যমুখী ফুলের ক্ষেতের আইল ধরে যাচ্ছিল ওরা। শুভ্র-নরম হাওয়ার মাঝেও ফুলের হলুদ রং বেশ ফুটে আছে। পিউ মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে হাঁটছিল। ধূসর সামনে থেকে বলল,
“ দেখে হাঁট। এসব রাস্তায় গর্ত থাকে।”
“ ঠিক আ…” বাকিটা বলার আগেই ঝুপ করে শব্দ হলো। এই শব্দ কীসের,ধূসর জানে। চোখ বূজে চ সূচক শব্দ করল সে। তিতিবিরক্ত হয়ে ঘুরে চাইল পেছনে। একটা গর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে পিউ। ভেতর থেকে অস্পষ্ট প্রতিধ্বনি আসছে,
“ ধূসর ভাই,আমি পড়ে গেছি। ধূসর ভাই!”
ধূসর গর্তের পাড়ে এসে দাঁড়াল। গম্ভীরমুখটা দেখে পিউ কাঁদোকাঁদো গলায় বলল,
“ আমার কোনো দোষ নেই। লাঠি দিয়ে ঢাকা ছিল তো।”
মানুষটা বিড়বিড় করল দাঁত পিষে,
“ বেয়াক্কেল!”
পিউয়ের মুখখানা আরো ছোটো হয়ে বসে।
“ তুলুন না প্লিজ!”
ধূসর এক হাঁটুমুড়ে বসে হাত বাড়াল। গর্ত অত গভীর ছিল না। তাই সহজেই হাত ধরে উঠে এলো পিউ। দাঁড়িয়ে নিশ্বাসও নিতে পারল না,খেয়াল করল ধূসর অতীষ্ঠ চোখে ওর পায়ের দিকে চেয়ে। পিউ নিজের দিকে চাইল তড়িৎ। দাঁতের নিচে জিভ পড়ল অমনি। কালো চাদর,চুল,কামিজ সবেতে কাদা মেখে গেছে। তার চেয়েও ভয়ানক ব্যাপার,নতুন কেনা স্যান্ডেলের বেল্টও ছিঁড়েছে সাথে। পিউ ভয়ে ভয়ে বলল,
“ আমার কী দোষ? আপনি সব সময় আগে আগে হাঁটেন। আপনার পায়ের সাথে আমি পারি বলুন!”
ধূসর জবাব দিলো না। বরং অন্যমনস্ক মনে হলো তাকে। থুতনিতে হাত ঘষে কী যেন ভাবছে। পিউ মন খারাপ করে পায়ের জুতো খুলে রাস্তার এক পাশে রাখল। এই গ্রামে আসার পর থেকেই ওর পেছনে শনি লেগে আছে। কখনো ফোন ভেঙে যায়,কখনো জুতো ছিঁড়ে যায়।
পিউ মলিন শ্বাস ফেলে ঘাসে পা রাখতে নিলে,বাধ সাধল ধূসর।
“ দাঁড়া।”
থামল মেয়েটা। চাইল প্রশ্ন নিয়ে।
ধূসর নিজের স্লাইড স্লিপার জোড়া খুলে রাখল ওর সামনে। পিউয়ের বিভ্রান্ত মুখে চেয়ে
গলা ঝেরে বলল,
“ ঘাস ভেজা,ঠান্ডা লাগবে। খালি পায়ে হাঁটার দরকার নেই।”
পিউ বিস্ময়াভিভূত,বিমুঢ়। প্রকট চোখ মেলে ওর বিশাল জুতোর দিকে চেয়ে রইল দু মিনিট। বিহ্বল মুখ তুলে বলল,
“ আর আপনি?”
এবার যেন গজগজিয়ে উঠল মানুষটা,
“ আমি তোর মতো মোমের পুতুল নই। কথা না বাড়িয়ে পরতে বলেছি, পরে আয়।”
এই ধমক,এই তর্জন-গর্জনেও আজ ভেতর জুড়িয়ে গেল পিউয়ের। চিবুক নুইয়ে মুচকি হেসে ছোটো ছোটো ফরসা পায়ে ধূসরের পুরুষালি স্লিপার জোড়া পড়ল সে। বড়ো হলো যদিও,তাতে কী! পরতে তো পেরেছে।
ধূসর ফোন বের করে স্ক্রিনে সময় দেখে বলল,
“ সময় বেশি নেই,কী দেখবি দ্যাখ।
এদিকে খেত,এদিকে নদী। কোনদিকে যাব?”
পিউ উচ্ছ্বল গলায় বলল,
“ নদীতে বিকেলে যাব। শুভ ভাইয়া বলেছে আজ নৌকায় ঘোরাবে।”
ধূসরের সাবলীল মুখ অমনি গম্ভীর হয়ে গেল। কেমন গমগম করে বলল,
“ তোর নিজের পা নেই? আরেকজনের মারফতে ঘুরতে হবে কেন!”
“ আমি তো কিছু চিনি না এখানে। আর উনি ছাড়া নেবেনই বা কে! আপনি কি নিয়ে যাবেন ধূসর ভাই?”
ও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“ না।”
পিউ এই উত্তর জানতো। তাই আর খারাপ লাগেনি। ছোট্ট শ্বাস ফেলল, তক্ষুনি চোখ পড়ল সবুজ ঘাসের বুকে জন্মানো হলুদ-সাদা ঘাসফুলের দিকে। পরপর ধূসরের দিকে চাইল পিউ। কলার নেক টিশার্ট ছিল পরনে। ওতে টপ বাটন থাকে দুটো। দুটোই খোলা। পিউয়ের প্রেমিকার মন কেমন ব্যগ্র হয়ে পড়ল। এক অজ্ঞাত দানবীয় সাহস এলো বুকে। ধূসরের পাশ কাটিয়ে ত্রস্ত পায়ে এসেই ফুল ছিড়তে বসল সহসা৷ ধূসর ভ্রু গুছিয়ে ফিরল, ও কী করছে দেখতে। জিজ্ঞেস করার আগেই,আবার ছুটে এসে সামনে দাঁড়াল পিউ। তারপর ঝট করে একটা ফুল গুঁজে দিলো ওর কলারের খাঁজে। ধূসর তাজ্জব,স্তব্ধ। চাইল হতভম্ব চোখে। পিউ
হড়বড় করে অনুনয় করল,
“ সরি সরি, ফেলবেন না প্লিজ! একটু, একটু থাকুক অল্প একটু!”
ধূসর মুখ খোলার আগেই অদূর থেকে ভেসে এলো স্ফূর্ত একটি স্বর,
“ আরে পিউ মা,তুমি এখানে কী করছো?”
পিউ চাইল ঘুরে। হেমায়েত আর আফতাবকে সাথে নিয়ে হেঁটে আসছেন আমজাদ। চোখেমুখে প্রশ্ন তার। এই সাত সকালে মেয়ে এখানে কী করে!
ধূসর বাপ-চাচাকে দেখেই কলার থেকে ফুলটা নামিয়ে আনে। আলগোছে ট্রাউজারের পকেটে ঢোকায় সেই হাত। পিউ বাবাকে একবার দেখে,আবার ফিরল তার দিক। কলারে ফুলটা নেই এখন। ফেলে দিয়েছে? ওর মন খারাপ হলো,আবার বাঁচলোও হয়ত। বাবা-চাচ্চু দেখলে কী ভাবতেন! তবে ধূসর দাঁড়াতে চাইল না। ছুড়ে ছুড়ে বলল,
“ তুই তোর বাপের সাথে আয়। আমার সময় নেই!”
বলেই হাঁটা ধরল ঘুরে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল পিউ। এর মাঝেই বাবারা ওর দুরুত্ব ছুঁয়ে ফেললেন৷ মেয়ের কাঁধে হাত রেখে এগোলেন আমজাদ। ধূসরকে দেখেছেন তারা। তাই আর আগের প্রশ্ন করলেন না। শুধালেন,
“ গ্রাম দেখতে এসেছিলে?”
“ জি আব্বু।”
“ ভালো লাগছে না?”
“ জি।”
“ একী,পায়ে কার জুতো?”
পিউ একটু ঘাবড়ে বলল,
“ আমার জুতো ছিঁড়ে গেছে আব্বু। তাই ধূসর ভাই দিলেন পরতে।”
“ ও আচ্ছা, ফের বাজারে গেলে মনে করিয়ে দিও। এক জোড়াই এনেছিলে?”
“ না,আম্মুর ব্যাগে আরেক জোড়া স্যান্ডেল রেখেছিলাম। কিনতে হবে না আব্বু।”
“ ঠিক আছে। তুমি আরেকটু আগে উঠলে তো টং থেকে চাও খেতে পারতে!”
হেমায়েত এই কথায় আশ্চর্য হলেন বৈকি! মেয়ে মানুষ বাজারের দোকানে বসে চা খাবে? এ কেমন কথা!
****
সকালের নাস্তার পাঠ চুকলো সকাল সাতটার মধ্যে। খেতে খেতে রাদিফ, পিউয়ের কানে কানে বলল কিছু একটা। ও মাথা নাড়ল স্বতঃস্ফূর্ত মুখে। এরপর পাশ ফিরে একইরকম ফিসফিস করে জানাল মিনিকেও। সে মূহুর্তে দুই চোখ বড়ো করে চাইল। ঢোক গিলে বলল,
“ দাদি জানলে গালমন্দ করবে।”
“ আরে কিছু হবে না। লুকিয়ে লুকিয়ে যাব।”
মিনি নিশ্চিন্ত হতে পারল না। তবে শুভ তুলল অন্য কথা,
“ পিউ,পুষ্প আজ নৌকা চড়তে যাবে?”
প্রশ্নটা ওদের করলেও,তার দৃষ্টি ছিল মারিয়ার দিকে। মেয়েটার খেয়াল নেই যদিও। তবে নিজের খাওয়া ফেলে ঘাড় সোজা করে চেয়ে রইল ইকবাল। পুষ্প মিনমিন করে বলল,
“ না মানে রোদ!”
“ কোথায় রোদ? এদিকে তো গাছের জন্যে রোদ কম। মারিয়া,তুমি যাবে তো?”
মেয়েটা পুষ্পর দিকে চাইল। জিজ্ঞেস করল,
“ যাবে পুষ্প,তুমি গেলে যাব?”
পুষ্প জিভে ঠোঁট ভেজায়। মহাবিপাকে পড়েছে সে। কারো আগুন চোখ যে ওকে গিলছে, তা মেয়েটা জানে। সুমনা বললেন,
“ আরে যাবে যাবে। বাড়ি থেকেই তো বলে এলো নৌকায় ঘোরার কথা।”
পুষ্প একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ আ-আচ্ছা।”
ইকবালের মাথা গরম হয়ে গেল শুভর দাঁত বের করা দেখে। ইটের খোয়া মেরে ওই দাঁত ভাঙা যেত যদি!
তবে নিজের রাগটা সে দেখাল না। ফিসফিস করে বলল,
“ ধূসর, আটকা ওদের।”
ধূসর কপাল গোছায়,
“ কেন?”
“ কেন মানে কী,শুনলি না পুষ্পদের ঘুরতে নিয়ে যাবে!”
“ পুষ্পদের নেবে,তাতে তোর কী? তোর গার্লফ্রেন্ডকে তো আর নিচ্ছে না।”
ইকবালের শ্বাসটা আটকে পড়ল ক্ষণিকের তরে। পরপর ঢোক গিলে হাসল ছেলেটা। আমতাআমতা করল,
“ না মানে পিউপিউয়ের জন্যে বলেছি। মেয়েটা বাচ্চা না?”
ধূসর পিউয়ের দিকে আড়চোখ ঘুরিয়ে তাকাল এইবার। পিউ এসব আলোচনায় নেই। রাদিফ,মিনিকে নিয়ে কীসব কানাঘুষা করতে করতেই হঠাৎই উঠে দাঁড়াল ওরা। পায়ে জুতো পরতে দেখে
পুষ্প বলল,
“ এই তোর জুতো কই? এটা তো আমার।”
“ ছিড়ে গেছে আমারটা।”
“ কোথায় যাচ্ছিস?”
“ আসছি আপু।”
“ এখন বের হব তো। সাদিফ ভাইয়া বলল না? সরষে খেতে ছবি তুলে দেবে?”
“ আ,আমি এক্ষুনি আসছি বেশি সময় লাগবে না।”
পিউ ছুটল দূরন্ত পায়ে। পিছু নিলো ওর সঙ্গীরা। রিনি বয়সে একটু বড়ো হওয়ায় কাজবাজে মা-দাদিকে সাহায্য করতে হয়। সেজন্যে বেশিরভাগ শিকদার বাড়ির আড্ডায় থাকে না সে। তাছাড়া,ধূসরকে সামনে দেখলেই লজ্জা পায় খুব। বৌভাতের দিন মুখের ওপর যেভাবে কটা কথা শুনিয়ে দিয়েছিল, রিনির তা আজও মনে আছে!
পিউয়ের ছুটন্ত গতি দেখে সুমনা বললেন,
“ যা,চাও তো খেলো না ও। গেল কই এভাবে?”
আনিস হেসে বললেন,
“ পিউ খুব চঞ্চল। বাড়িতেই স্থির থাকে না। এখানে তো পুরো ওপেন গ্রাউন্ড। চলে আসবে চিন্তা করো না।”
সবাই নিজেদের কথাবার্তায় ব্যস্ত হলো, চা খেলো। আনিস,সুমনা মিলে পুষ্প-মারিয়া, শুভ, রিনি আর সাদিফ সহ বের হলো হেমায়েতের জায়গা জমি ঘুরে দেখার জন্যে। শহুরে মানুষ, গ্রামের হাওয়া খেলেও খুশি হয় কিনা!
পুষ্পকে যেতে দেখেই,ইকবালও ত্রস্ত স্যান্ডেল পড়ল পায়ে। ধূসরকে বলল,
“ কী,যাবি না?”
“ তুই যা।”
ইকবাল বন্ধুর অপেক্ষায় আজ রইল না। তাড়াহুড়ো করে এগোলো ওদের সঙ্গে।
তবে ধূসর ধরল অন্যপথ। ঠিক বাড়ির পেছনের বড়ো পুকুর পাড়ের দিকে হাঁটা ধরল সে।
সুমনাদের বাড়ির পেছনের পুকুর প্রায় ১.৫ একর জায়গা নিয়ে তৈরি। পুরোনো অনেক,জল কালো হয়ে গেছে। চারপাশ ঘেরাও করা ফলের গাছ। মিনি ভয়ে ভয়ে আশেপাশে চাইল। এক পাশে বিরাট-ঘন বাঁশঝাড়,তারপাশেই ওদের পারিবারিক কবরস্থান বলে এদিকটায় গুরুজনরা আসতে দেন না সেভাবে। অথচ কত রকম ফল হয় এখানে। কামরাঙা, বরই পড়ে মাটিতে গলে-পচে গেছে। পেয়ারা ঝুলছে একেক ডালে। আর পিউ এসেছে সেই পেয়ারা খাওয়ার জন্যে। নিজেও এসেছে,ওকেও এনেছে। দোষটা অবশ্য মিনিরই। গল্পে গল্পে বলে ফেলেছিল,এখানকার পেয়ারা অন্য জাতের। ভেতরটা একদম লাল!
আর এই পেয়ারা পিউ কখনো খায়নি। তাই জেদ ধরল। মিনি ভূত-প্রেতের ভয় দিলেও শুনলো না। সে নাকি ভয় পায় না ওসব!
অগত্যা মুখ কালো করে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল মিনি৷ রাদিফ তার পাশে। উচ্ছ্বসিত ছেলেটা। গাছের পেয়ারা পেড়ে খাওয়ার আনন্দ ও এর আগে পায়নি। তবে
গাছ বেশ বড়ো। ডালও সরু! পেয়ারাও সব উঁচুতে। এটার বয়স হয়েছে অনেক। আর এই গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে আনার গুরুদায়িত্ব নিয়েছে পিউ। গায়ের ওরনাটা কোমরে এক ক্রস দিয়ে বাঁধল সে। মিনি কাঁপা গলায় বলল,
“ পিউ, আপু তাড়াতাড়ি করো না!”
“ আরে এত ভয় পেও না। আমি আছি তো!”
পিউ পনিটেইল করা চুল খোপা করার মাঝেই,হুট করে বেড়ার নিচ হতে ঝাক বেঁধে ঢুকল কতগুলো রাজহাঁসের দল। কমসে কম পনেরোটা হবে! মিনির গলার শিরা ফুলে উঠল তা দেখে। আর্তনাদ করে বলল,
“ ওরে,এই ব্যদ্দপ হাঁস তো ঠোকর দেয়।”
রাদিফ ফুঁসে বলল,
“ ঐ হাঁস আমাদের দিকে আসবি না। এলে কিন্তু একদম!”
বলতে বলতে একটা ঢিল তুলেই ছুড়ে মারল ও। ভাবল,হাঁস পালাবে। তবে ছেলেটাকে চমকে দিয়ে হিঁসহিঁসিয়ে তেড়ে এলো ওরা।
মিনি ‘’ আল্লাহ গো” বলে এক ছুট লাগায় অমনি। রাদিফও মরিয়া হয়ে পিছু নেয় তার৷ বিপত্তি বাঁধল পিউয়ের বেলায়। এক সাথে এত হাঁস প্যাকপ্যাক করে তেড়ে আসার দৃশ্যে, বলদ বনে গেল মেয়েটা। সবার সামনে থাকা বড়ো হাঁসটা গলা উঁচিয়ে এমন শব্দ ডাকল, বুকে ধক করে বাড়ি মারল ওর। অমনি ‘’আম্মুউউউউ” বলে এক চিৎকার দিয়ে ভোদৌড় লাগায় পিউ। রাজহাঁস দলবল নিয়ে পেছনে ছুটে আসে।
দৌড়ের ধাক্কায় ওর দু পায়ের স্যান্ডেল দুটো ছিটকে গেল দুদিকে । কোমরের ক্রস করা ওরনা অবধি খসে পড়ল মাটিতে।
পিউ
“ আম্মু বাঁচাও,আম্মু আম্মুউউউ!” বলতে বলতে ছুটছিল। মাঝে ভয়ার্ত চোখ ঘুরিয়ে দেখছিল পেছনে। দুই ডানা ঝাপটে এখনো ছুটে আসছে হাঁসেরা। ওই লম্বা ঠোঁটের এক ঠোকড় খেলে পিউয়ের চামড়া আস্ত থাকবে!
ধূসর বাড়ির পাশ কেটে ওই পাড়ে এলো সবে। তক্ষুনি বিদ্যুতের মতো পাশ কাটিয়ে ছুটে গেল মিনি। একটু ভড়কাল ছেলেটা। মিনির যাওয়ার পথে ভ্রু কুঁচকে দেখল। পরপরই এলো রাদিফ। অমনি ওর কনুই টেনে ধরল ধূসর।
“ কী হয়েছে,ছুটছিস কেন?”
রাদিফ হাঁপাতে হাঁপাতে কথা বলার আগেই,পিউয়ের ‘আম্মু’’ ডাকে চমকে মুখ তুলে চাইল ধূসর। অদূরে পাগলের মতো ছুটে আসা ষোড়শী,আর পেছনে এক ঝাঁক রাজহাঁস দেখে নির্বোধ বনে গেল ও। পিউ তক্ষুনি আরেক বিপদের মুখে পড়ল। টিনের টুকরোতে পায়ের তালু পড়তেই,টাল রাখতে পারল না। মূহুর্তে হোচট খেয়ে থুবড়ে পড়ল মাটিতে।
তুরন্ত “ ওহ শীট” বলে রাদিফকে ছেড়ে ছুটে এলো ধূসর। বাগানে পড়ে থাকা লাঠি তুলে শাসাল, সব হাঁস এক যোগে ঝাঁপ দিলো পুকুরে।
পিউ মাটিতে বসে পা ধরে ককাচ্ছে,মোড়াচ্ছে সাপের মতো। ধূসর ত্রস্ত ওর কাছে এসে বসল। জিজ্ঞেস করল উদ্বীগ্ন হয়ে,
“ কোথায় লেগেছে?”
চোখমুখ কুঁচকে,ঠোঁটে ঠোঁট চেপে পা ডলছিল পিউ। ধূসর বলল,
“ দেখি, হাত সরা।
“ না না,জ্বলছে। জ্বলছে।”
“ জ্বলবে কেন? দেখি,সরা হাত।”
ধূসর জোর খাটিয়ে হাত দুটো ছাড়িয়ে দিলো ওর। পায়ের গোড়ালির নিচে ত্যারছা কাটা ক্ষত দেখে, পিউয়ের মুখের পানে চাইল ফের।
মেয়েটার চোখে পানি। গোঙাতে গোঙাতে বলল,
“ কীসে যেন পা পড়েছে! উফ, জ্বলছে ধূসর ভাই! কেন যে মরতে এসেছিলাম! আম্মু,আম্মু মেরেই ফেলবে আমায়।”
ধূসর চুপ করে মেয়েটার মুখশ্রীতে দেখল। পিউ কাঁদলেও শব্দ নেই। ব্যথায় চোখ টলমল। নিশ্চয়ই জ্বলছেও খুব? ওর চোখ পড়ল পিউয়ের গায়ে। ওরনা নেই। সহসা পেছনে চাইল ধূসর। ওরনার সাথে সাথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জুতো পরে আছে চারদিক। ফের উঠে যায় সে। জুতোর সাথে সাথে ওরনা তুলে আনে। ওরনাটা গলায় প্যাঁচিয়ে দিতেই,পিউ একটু লজ্জা পেলো। নিভন্ত চোখ তুলে চাইতেও পারল না,আচমকা ঝট করে এক হাতের ওপর ওকে তুলে ফেলল ধূসর। থমকে গেল পিউ,ওর কান্না,ওর ব্যথা। অপ্রস্তুতিতে এক হাত ধূসরের গলা প্যাঁচিয়ে ধরলেও,দুই ঠোঁট ফাঁকা করে চেয়ে রইল সে। ধূসর আরেক হাতে ওর জুতো জোড়া নিয়েছে। লম্বা পা বাড়াতেই, পিউয়ের সৎবিৎ এলো এবার। ছটফটিয়ে বলল,
“ ধূসর ভাই এটা গ্রাম!”
“ তো?”
এই রাশভারি প্রশ্নের জবাব পিউ আর দিতে পারল না। ততক্ষণে ধূসর উঠোনে চলে এসেছে। উঠোন ভরা মা,চাচি আর খালেদাদের বাড়ির রমনীরা ছিলেন। সবাই একইসাথে তাকাতেই অস্বস্তিতে গুটিয়ে গেল পিউ।
এতক্ষণ টুল পেতে রোদ পোহাতে বসেছিলেন তারা। সেই গল্প থামল,পিউকে ধূসরের কোলে দেখে। তড়াক,তড়াক করে দাঁড়িয়ে গেল সবাই। শিকদার গৃহীনিরা হায়হায় করে ছুটে এলেন। মিনা আর্তনাদ করে বললেন,
“ কী,কী হলো ওর? হলো কী? এভাবে আনলি যে!”
ধূসর ছোটো করে জানাল,
“ পা কেটে গেছে।”
“ পা! কীভাবে কাটল? কীসে? গেছিল কোথায়?”
ধূসর পিউয়ের জুতো জোড়া মিনার হাতে দিয়ে বলল,
“ বরফ নিয়ে এসো।”
তারপর পিউকে নিয়ে হাকিমুল্লাহদের ঘরে ঢুকল সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছিল রিনি। হঠাৎ ওদের ওইভাবে দেখে থ বনে গেল মেয়েটাও। ওর সামনে দিয়েই পিউকে বিছানায় এনে বসাল ধূসর। তারপর ঝট করে চাইল রিনির পানে।
“ ফাস্ট এইড বক্স আছে?”
রিনি একটু ভড়কায় তেড়ে আসা প্রশ্নে। আশা করেনি তো! বলল,
“ জ-জি!”
“ নিয়ে এসো, যাও।”
ঘাড় নাড়লেও দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা। ধূসর গলার জোর বাড়াল,
“ কী? যাও।”
অমনি দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল সে। ধূসর বিরক্ত মুখটা ফেরাতেই দেখল, এখনো হাঁ করে চেয়ে আছে পিউ। দৃষ্টিতে বিস্ময়ের ভেলকি। অমনি শব্দ করে ওর মুখের সামনে তুড়ি বাজাল ধূসর। নড়ে চড়ে সোজা হলো পিউ। পরপরই হাহুতাশ করে বলল,
“ এখন আমার কী হবে,ধূসর ভাই?”
“ কী হবে!”
“ গ্রামের সবাই দেখে ফেলল আমি একটা ছেলের কোলে উঠেছি। বদনাম হবে,কানাঘুষা হবে। আমার আর বিয়ে হবে না। আমাকে কে বিয়ে করবে?”
ধূসর, পিউয়ের কাঙ্খিত লাইন বলল না। বলল না যে, আমি বিয়ে করব। উলটে দাঁত খিচে বলল,
“ টেনে এক চড় মারলেই বুঝবি, কে বিয়ে করবে!”
তারপর হনহন করে বেরিয়ে গেল বাইরে। পিউয়ের ঠোঁট ভেঙেচুরে চূড়ায় উঠে বসল। এর মাঝেই ঘরে এলেন মায়েরা। চারপাশ ঘিরে বসে পড়লেন ওর। কী হয়েছে, কীভাবে হয়েছে,কতটা কেটেছে,বলে বলে মুখে ফ্যানা তুলে ফেললেন।
**
এদিকে,উঠোনে খালেদা,দিতি আর জহুরাকে বাদ দিয়ে প্রতিবেশি বয়ষ্কা নারী ছিলেন দুজন। এমন দৃশ্যে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে তাদের। এই জীবনে এসব তারা স্বচক্ষে দেখেননি। গুজুরগুজুর করছিলেন দেখে খালেদার ভারি রাগ হলো। এখন এসব কথা পাড়ায় ছড়াবে। আরো কত কাহিনী হবে তখন? বাড়িতে তো আরো মেয়ে আছে। ওদেরও বিয়ে দিতে হবে না? অতিথিদের লেহাজ করার ধৈর্য তার গুড়িয়ে গেল। ধূসর বাইরে এসে দাঁড়াল তখনই। অমনি কোমরে হাত দিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ালেন খালেদা। গজগজিয়ে বললেন,
“ ওই পোলা,তোমার আক্কেল কই?
তুমি অইরম ডাঙ্গর মাইয়াডাড়ে কোলে নেছো ক্যা?”
ধূসর চেহারা গুটিয়ে বলল,
“ তাতে আপনার কী?”
তব্দা খেলেন বৃদ্ধা। হতবাক হয়ে
বললেন,
“ মোর কী! তুমি ওরে কোলে নেবা ক্যা?”
“ তো কী আপনাকে নেব?”
বৃদ্ধার শ্বাস গলায় ঝুলে পড়ল। হকচকিয়ে বললেন,
“ কীইইই?”
“ কোলে কি আপনাকে নেব?”
বৃদ্ধা হাঁসফাঁস করে পেছনে ফিরে চাইলেন। বাকিদের চোয়াল ঝুলে আছে।
জহুরাকে বললেন,
“ এ পোলা কী কয়?”
ধূসর বলল,
“ আমার কোল,আমি কাকে নেব আমার ইচ্ছে। আপনি কৈফিয়ত চাইছেন কেন?”
জহুরার মাথায় হাত। তার বড়ো জা মানুষই এমন। কিন্তু এ ছেলেও তো কম না। খালেদা তখনো বিপাল করছেন,
“ ও জহুরা কী কয় এ পোলায়! এ পোলায় দিহি বড়োগো মানে না। এমন ব্যাদোপ পোলা আইছে কোতাইদ্দা?”
জবা বললেন,
“ কাকি,কাকি ওর একটু মাথা গরম থাকে। আপনি, আপনার আমার সাথে আসুন।”
খালেদাকে টেনেটুনে সরালেন তিনি।
ধূসরের নজর পড়ল রিনির দিকে। কেমন হাঁ করে চেয়ে আছে। ও কপাল কুঁচকে বলল,
“ তোমাকে না ফাস্ট এইড আনতে পাঠালাম?”
থতমত খেয়ে হাতের বাক্সটা এগিয়ে দিলো ও।
“ জি,জি এইত।”
ধূসর বাক্স হাতে ফের ঘরের ভেতর এলো। এ ঘরের চাল নিচু। তার চেয়েও নিচুতে ঝোলানো সিলিং ফ্যান। ধূসর সোজা হয়ে দাঁড়ালেই ঘাড় কেটে যাওয়ার ভয়। ও এসে দেখল,পিউয়ের দুই পাশে দুই মা বসেছেন।
সুমনা-আনিস তো ছেলেপেলে নিয়ে বেরিয়েছিলেন সেসময়। এখনো ফেরেনি কেউ।
ধূসর ফাস্ট এইডের বাক্স মিনার হাতে দিয়ে বলল,
“ পায়ের নিচে দুজায়গায় কাটা। দেখো কোথায় কী লাগবে! আমি বাইরে আছি,দরকার হলে ডেকো।”
“ আচ্ছা বাবা!”
ধূসর যেতে যেতে একপল পিছু ফিরে চাইল। পিউ চেয়ে আছে ব্যাকুল নয়নে। ওই চাউনি সম্পূর্ণ এড়িয়ে মানুষটা ঘর ছাড়ল সবেগে। তবে তার প্রস্থান পথে তখনো উৎসুক হয়ে চেয়ে রইল পিউ। মা যে বকলেন,মেজো মা আদর করলেন,ওসব ওর কানে যায়নি। যখন স্যাভলনের পানিটা ক্ষতয় পড়ল,জ্বলে উঠল জায়গা? পিউয়ের হুশ ফিরল তখন। খালেদা ঘরের এলেন সেসময়। মুখ কালো করে বললেন,
“ ঠ্যাঙের কী অবস্তা?”
রুবায়দা বললেন,
“ ভালোই কেটেছে। ডাক্তার ডাকব ভাবছি।”
“ তুমি গ্যাছালা ক্যা ওইহানে? ওই জাগা খারাপ তোমারে কেউ কয়নায়?”
পিউ মাথা নত করল।
খালেদা মিনার হাত টেনে বললেন,
“ এদিক আও তো। কতা কমু একখান।”
গজ রুবার হাতে দিয়ে উঠে গেলেন মিনা। “ খালেদা ফিসফিস করে বললেন,
“ তোমার এত বড়ো ডাঙ্গর মাইয়াডারে কোলে নেছে ,তুমি কিছু কইলা না ক্যা?”
মিনা হেসে বললেন ,
” কী বলব,পিউ তো ধূসরের ছোট বোনের মতো কাকি!”
উত্তর শুনে বৃদ্ধা কিছু বললেন না। একা একা হাসলেন, বিদ্রুপের হাসি। ভাবলেন,
” পরে মজা বোজবা। এইসব
বুইনের মতো দিয়াই ক্যামনে ক্যামনে
বউ অইয়া যায়।”
চলবে…
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৮.২
-
সমুদ্রকথন পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৩.২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৪