#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন___(২৬)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
পুরো বাসের ভেতর থমথমে। ঠিক গুমোট মেঘে আকাশ ছেঁয়ে যাওয়ার মতো! যেন
ঝড় ছুটবে যখন-তখন। ওয়াজিদ ক্লান্ত ছিলেন। সবে সবে একটু তন্দ্রা ভাব লেগেছিল,তক্ষুনি কানের পাশে আমজাদের কর্কশ চিৎকারে ছুটে গেল সেটুকু। ধড়ফড়িয়ে সতর্ক চোখদুটো মেললেন তিনি। করিমুল এমনিই বয়ষ্ক মানুষ। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তারও। কে? কে?
করে লাফিয়ে-চড়িয়ে উঠলেন। বাকিদের অবস্থা ততোধিক দুরুহ। মুখচোখ চিন্তায়, অস্থিরতায় শুষ্ক প্রায়। আতঙ্কে ওষ্ঠাগতপ্রাণ নিয়ে বাবার পাশে বসে ফ্যাসফ্যাস করছিল পুষ্প। এর মাঝেই তড়াক করে বসা থেকে দাঁড়ালেন আমজাদ। পুষ্পর সাথে সাথে ইকবালের বুকটাও ছ্যাৎ করে উঠল। তুরন্ত ‘’ ধূসর রে! বলে এক লাফ দিয়ে ওর পেছনে গিয়ে লুকাল ছেলেটা। ধূসরের চওড়া পিঠে নিজেকে আড়াল করে হাঁসফাঁস করল,
“ ভাই বাঁচা,বাঁচা আমায়।”
ধূসর জিভে পাতলা ঠোঁট ভেজায়, কথা গোছানোর প্রস্তুতি স্বরুপ! তবে আমজাদকে দেখে মনে হলো না কিছু শুনবেন তিনি। রেগেমেগে গর্জাবেন,এর মাঝেই ওয়াজিদ প্রশ্ন করে বসলেন,
“ কী হয়েছে ভাইসাহেব? কোনো সমস্যা? কাকে নামানোর কথা হচ্ছিল?”
আমজাদের যেন খেয়াল পড়ল, বাসে শিকদার বাড়ির লোক ব্যাতীত আরো ভিন্ন মানুষ আছে। ওয়াজিদ,করিমুল ছাড়াও অদূরে বসা মারিয়াটাও ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে এদিকে।
ভদ্রলোক খানিক নুইয়ে এলেন। শত হলেও ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ির লোক।
গলার স্বর নামল একটু,
“ না মানে…”
ওয়াজিদের তক্ষুনি নজর পড়ল ধূসরের পেছনে নীল পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা পরা গাট্টাগোট্টা ছেলেটাতে। ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বললেন,
“ ইকবাল না?”
নিজের নাম শুনে মাথাটা বের করে একটু উঁকি দিলো ইকবাল।
ওয়াজিদ বললেন,
“ আরে,তুমি কখন এলে?আমি তো জানতামই না,তুমিও যাচ্ছ! এসো, এসো এদিকে এসো।”
আমজাদ শিকদার নাকটা কুঁচকে আনিসের দিকে চাইলেন অমনি। তারপর দেখলেন আবার মিনাকেও। যেন বুঝতে চাইলেন – হচ্ছেটা কী?
আফতাব পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করলেন,“ ইকবাল অনেক মিশুক তো, আনিসের
বিয়েতে দুজনের বেশ খাতির জমেছিল।”
ভদ্রলোক বিস্ফোরিত গলায় বললেন,
“ কীহ!”
অসহায় চোখে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক। আমজাদ চ সূচক শব্দ করে দাঁত পিষলেন রাগে। এদিকে ওয়াজিদের ডাকে ইকবাল ধূসরের দিকে তাকাল। নীরবে জানতে চাইল- যাব?
চোখের মণি নেড়ে যেতে বোঝাল ধূসর। অমনি ঢোক গিলে, দোয়া পড়তে পড়তে এগিয়ে এলো ইকবাল। আমজাদকে ভয়ে ভয়ে দেখে,ওয়াজিদের পাশের খালি জায়গায় বসল।
ফুঁসছিলেন আমজাদ। হাত নিশপিশ করছিল। একটা চড় মেরে এই ছেলেকে যদি অক্কা পাওয়ানো যেত! ওয়াজিদ বেশ গদগদ হয়ে পড়েছে। খুশি গলায় বলছে,
“ তুমি যে কী ভালো করেছ এসে! আমি নিজেও ভাবছিলাম একবার তোমার কথা ধূসরকে বলব কিনা। বিয়েতে তো আমাদের সবার তোমাকে চমৎকার লেগেছিল ইকবাল। আব্বাজান তোমার কথা অনেক বলেন। দারুণ মজার ছেলে তুমি। কী যে হাসিয়েছ সেদিন সত্যি!”
আমজাদ বিড়বিড়িয়ে বললেন,
“ হাসাবেই তো,জোকার না?”
মিনা হাত টানলেন স্বামীর। ইশারা করলেন পাশে বসতে। বসা মাত্র বললেন,
“ মাথা ঠান্ডা করুন। ছেলেমানুষি করছেন কেন?”
“ ছেলেমানুষি! তুমি তো কোনো কথাই বলো না। তোমার আদরের ছেলে বাদর উদ্দিন,কাকে জিজ্ঞেস করে এই লাফাঙ্গাটাকে ডেকেছে,আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। বাসটা শুধু থামুক।”
ওয়াজিদ তক্ষুনি ডেকে বললেন,
“ আমজাদ ভাই, খুব ভালো কাজ করেছেন ইকবালকে ডেকে। সময়টা দারুণ কাটবে তাহলে, তাই তো?”
মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ঠোঁট টেনে হাসলেন আমজাদ। তাল মেলাতে বললেন, জি।
ইকবাল এদিক ফিরে ঠোঁট চেপে হাসল। ওয়াজিদ গল্প জুড়ে দিয়েছেন। বাসে এতগুলো ফ্যাকাশে চোখমুখ যেন নজরেই পড়ছে না। সুমনা-আনিস বারবার সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছেন নিজেদের।
ইকবাল ঘামছিল। ভয় ওর কাটেনি। আমজাদ ঠিক কাঁধের পেছনে বসে। নিশ্চিত আগুন আগুন চোখ দিয়ে তাকাচ্ছে? নাহলে ইকবালের ঘাড় এমন পুড়ে যাচ্ছে কেন?
এদিকে পুষ্পর অবস্থা আরো শোচনীয়। এখানে আর বসে থাকা যাচ্ছে না। একে তো ইকবাল কীভাবে এলো,সেই চিন্তা! কেন এলো সেই চিন্তা! আবার বাবা ওকে কী করবে সেই চিন্তা! এত কিছুর যন্ত্রণায় ওর মনে হলো এখান থেকে উঠে যাওয়া শ্রেয়। মিনমিন করে বলল,
“ আমি, আমি মারিয়াপুর কাছে যাই আব্বু। আপু একা তো!”
আমজাদ কপাল কুঁচকে ঘাড় নাড়লেন। মেজাজ খুব খারাপ। পুষ্প আস্তেধীরে উঠে যাচ্ছিল। বাসও দুলছিল খুব। ধাক্কায় পা টলে পড়তে গেল, ধড়ফড় করে ওর হাতটা চেপে ধরল ইকবাল। চমকে চাইল পুষ্প। ইকবাল হাত ধরেছে দেখে,বুকের গতি থামল ওখানেই। ত্রাসে মুখটা বিবর্ণ করে বাবার পানে চাইল সে।
ইকবাল শুধু তার মাই লাভকে থুবড়ে পড়া থেকে বাঁচাতে ধরেছিল। অত কিছু তো মাথায় ছিল না। যখন হুশ এলো,নার্ভাস হয়ে পড়ল নিজেও। পরিস্থিতি সামলাতে হেহে করে হাসল ছেলেটা। সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
“ সাবধানে হাঁটো আপু।”
পুষ্প হাতটা ছাড়িয়ে নেয়৷ বাবা-মায়ের পানে চেয়ে ঢোক গেলে ফের। আমজাদ উঠে এলেন অমনি। ইকবালের দিকে একবার রুক্ষ চোখ ফেলে,মেয়ের হাত ধরে নিজ দায়িত্বে জায়গায় দিয়ে এলেন। পুষ্প উদাস মুখে বসতেই মারিয়া ফিসফিস করল – কিছু কি হয়েছে? সব এমন চুপচাপ হয়ে গেল ক্যানো?”
সাদিফ ছিল অনেকটা সামনে। অথচ কীভাবে যেন কথা শুনে ফেলল ছেলেটা। মূহুর্তে উত্তর দিলো,
“ কারণ,সবার ম্যালেরিয়া হয়েছে।”
মারিয়া দাঁত চেপে পুষ্পকে বলল – “দেখলে?
এত চিন্তার মাঝেও ফিক করে হেসে ফেলল মেয়েটা। বলল,
“থাক ছাড়ো,মজা করছে।”
আপাতত সব ঠান্ডা এখানে। কোনো শোরগোল নেই,চ্যাঁচামেচি নেই। তবে আমজাদ যে নীরবে ফুঁসছেন এখনো ধূসর তা জানে। অথচ ঠোঁট কামড়ে বিজয়ী হাসল তাও।
পরপরই স্বীয় চিকণ চাউনিজোড়া ঘুরিয়ে ফেলল,করিমুলের পাশে বসা এক সতেজ স্নিগ্ন
শালুকের দিকে। পরনে হলুদ চুরিদার,দুপাশে দুটো পনিটেইল! কিন্তু মুখচোখ দেখে মনে হলো,মেয়েটা কারো ওপর বিরক্ত ভীষণ। ফোনে কপাল কুঁচকে কিছু দেখতে দেখতে বারবার বাসের বাইরে তাকাচ্ছে। হরিণের মতো চোখ নাড়িয়ে খুঁজছে যেন কাউকে!
ধূসরের নজর সরলো আজমলের আওয়াজে। ড্রাইভারকে বললেন,
“ ঘাটে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে? আমার ছেলেটার একটু ওয়াশরুম পেয়েছে।”
“ এইত স্যার
৫ মিনিট।”
রাদিফ প্যান্টের ওপর থেকে নিজের গুপ্ত জায়গা ঠেসসেঠুসে রাখল। যে করেই হোক,পাঁচ মিনিট চেপে রাখতে হবে। নাহলে এক ফোঁটাও যদি বাসের মধ্যে পড়ে,ছিঃ মারিয়াপুর সামনে পুরো ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে না!
****
ঘাটের পথ আঁকাবাঁকা বেশ। উঁচু-নীচু ঢাল দিয়ে ভরতি। তবে দুপাশে গাছপালার কারণে রোদ নেই। ছায়ার সঙ্গে শীতেল আবহাওয়া ঘুরছে চারিদিক। পিউ জানলা একটু টেনে দিলো। ধুলো উড়ছে। কাচ ভেদ করে উদগ্রীব নয়নে চেয়ে রইল বাইরে। গুলশানের বাইরে ওর আনাগোনা এর আগে হয়নি। ফ্যামিলি ট্যুরে যখন যা গিয়েছে সব রাতে। এত কাছ থেকে প্রকতি দেখেনি। আল্লাহর সৃষ্টি কত সুন্দর!
বাস থামল নির্দিষ্ট পার্কিং-এর জায়গায়। ধূসর সামনে থাকায় সবার আগে নামল। এরপর সাদিফ,পিউ করিমুল থেকে একে একে সকলে। পিউয়ের মুখটা ভীষণ হাসিহাসি।
পদ্মা নদীর কথা তো লোক মুখে মুখে। সেই নদী আজ ও এত কাছ থেকে দেখবে! ভাবতেই কী রোমাঞ্চকর লাগছে! তবে মেয়েটার এই খোশমেজাজ বেশিক্ষণ টিকলো না। ফোনে ফের টুং করে উঠল। এবার চ সূচক শব্দ করল পিউ। না চাইতেও মেলল ইনবক্সটা। লেখা,
“ সাদায় শুভ্রমেঘ বলেছিলাম,কিন্তু হলুদে তুমি পরীর চেয়েও কম নও। আর এই যে ঘাড়ের সাথে নুইয়ে দুপাশে চুল বাঁধো না?
দেখতে এত মিষ্টি লাগে প্রহর্ষা!”
পিউ মহাবিপন্ন শ্বাস ফেলল। বিরক্তি ফুটে উঠল ওর চেহারায়। পাশ কাটিয়ে ধূসর যাচ্ছিল,পিউ ত্রস্ত ধাপ করে ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে দেয়। মেয়েটার এই তাড়াহুড়ো গতি দেখে,একটু থমকায় ধূসর। ফিরে চায় ভ্রু কুঁচকে। উত্তরে পিউ দাঁত বার করে হাসল। জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় যাচ্ছেন ধূসর ভাই?”
ধূসর আর জবাব দিলো না। চলে গেল হনহনিয়ে। পিউ ঠোঁট উলটে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোথায় কোন আশিক যে ও জুটিয়ে ফেলেছে কে জানে! যে দিন নেই,রাত নেই প্রেমের আলাপ করেই যাচ্ছে ম্যাসেযে। অথচ যে বৃষ্টির আশায় পিউ দু বছর ধরে চাতকের মতো চেয়ে আছে আকাশে, তার তো মেঘেরও দেখা নেই!
ধূসর একটা পানির বোতল নিয়েছে। ঠান্ডা পানি হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখেমুখে ছেটাল। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারল না,কোত্থেকে আফতাব এসেই ওর কনুই ধরে টেনেটুনে নিয়ে চললেন কোথাও। গিয়ে দাঁড়ালেন এক কোণে। রেগে রেগে বললেন,
“ কী দরকার ছিল ইকবালকে এখানে ডেকে আনার?”
“ কেন?”
“ ক্যানো আবার প্রশ্ন করছো? ভাইজানের মুখটা দেখেছ? সারা পথ কত আনন্দ করছিল,এখন এক ফোটা হাসি নেই। দেখো একবার মানুষটাকে!”
বাবার হাত অনুসরণ করে,অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা চাচার পানে চাইল ধূসর। পেছনে দুই হাত ক্রস করে বেঁধে, কপাল কুঁচকে মিনার সাথে গজগজ করছেন তিনি। ধূসর ফের বাবার দিকে চেয়ে বলল,
“ ওহ।”
আফতাব মহাশ্চর্য হয়ে বললেন,
“ ওহ! ব্যাস? এটা একটা কথা? তুমি কি কোনোদিন নিজের ভুল বুঝবে না? নাকি বুঝতে পারো,কিন্তু স্বীকার করবে না!”
ধূসর সোজাসাপটা বলল,
“ বাবা, ইকবাল আমার বন্ধু। আমি যেখানে যাব,সেখানে ও থাকবেই। আমি ওকে আমার বন্ধু কম ভাই বেশি মনে করি এটা বাড়ির সবাই জানে। চাচ্চুরই বরং এই ব্যাপারে একটু ম্যাচিউর্ড হওয়া উচিত!”
“ ধূসর! বাজে কথা বলো না। হ্যাঁ, ইকবাল তোমার বন্ধু। আমার কোনো আপত্তি নেই তোমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে। কিন্তু, যেখানে ভাইজান থাকেন, সেখানে ওকে না আনলেই পারতে। ভাইজান ওকে পছন্দ করেন না জানো না? ইকবাল নিজেও কম বিব্রত হয়েছে আজ? শুধু আর শুধুমাত্র ওয়াজিদের জন্যে ভাইজান চুপ করে গিয়েছেন। নাহলে ভাবতে পারছো,বাসের মধ্যে কী ঘটতো?”
“ এসব তুমি আমাকে বলছো কেন?”
“ তো,আর কাকে বলব শুনি?”
“ যে ওকে ডেকেছে,তাকে বলো।”
আফতাব বুঝলেন না।
“ কে ডেকেছে?”
“ ছোটো মাকে জিজ্ঞেস করো,যাও।”
আফতাব গুলিয়ে গেলেন। নিশ্চিত হতে বললেন,
“ সুমনা ডেকেছে?”
ছেলের উত্তরের আশাও তিনি করলেন না। এত তাজ্জব হয়েছেন,জবাব নিতে উতলা কদম বাড়ালেন রাতারাতি। বাবার পায়ের বেগ দেখে পানির বোতলে চুমুক দিতে দিতে বাঁকা হাসল ধূসর!
“ আমি কোনো কথা শুনব না,তুমি ওর হয়ে কোনো সাফাই গাইবে না। হয় ঐ ছেলে যাবে,নাহয় আমি।”
“ আহা একটু বোঝার চেষ্টা করু…”
সুমনা আর আনিসকে আসতে দেখে মিনার ফিসফিস থামল। দুজন এসে মাথা নুইয়ে দাঁড়ালেন। সুমনা আনত স্বরে বললেন,
“ আমি খুব দুঃখিত ভাইজান! এইসব আমার জন্যে হলো।”
আমজাদ প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন।
“ ইকবাল তো ধূসরের খুব ভালো বন্ধু। আপনাদের সব ফ্যামিলি প্রোগ্রামেও দেখেছি। তাই ভাবলাম,ও আপনাদের খুব কাছের কেউ। এজন্যে ট্যুরের প্রোগ্রামটা ঠিক হতেই,আমিই ওকে ইনভাইট করেছিলাম।”
আমজাদ আকাশ থেকে পড়লেন।
“ তুমি ডেকেছ?”
“ জি ভাইজান! আপনি এত রেগে যাবেন জানলে কখনো করতাম না।
এখন আপনি যদি চান,আমি নাহয় ওকে চলে যেতে বলব। তাতে যতই আমি ছোটো হই,আমার অসম্মান হোক,বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি না কেন,আপনি যা চাইবেন তাই হবে ভাইজান!”
আমজাদ আচ্ছা জ্বালায় পড়লেন। এখন জেনে-বুঝে তো বাড়ির বউকে বাইরের ছেলেপেলের সামনে ছোট হতে দেয়া যায় না। তেতো-মুখে বললেন,
“ থাক,ডেকেছ যখন আর বলার দরকার নেই!”
মূহুর্তে শ্বাস ফেললেন আনিস। হেসে বললেন,” দেখেছো বলেছিলাম না,ভাইজান কারোর অসুবিধে হোক এমন কিছু কখনো চাইবে না।”
সুমনাও মাথা নেড়ে হাসলেন। মিনা ভারি অবাক হলেন দুটোর এত মিনসে হাসাহাসি দেখে। সুমনার সাথে ইকবালের তেমন কথা বলাও দেখেননি উনি। সেখানে বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে আনা!
এ দুটো নিশ্চিত ধূসরের সাথে মিলে এই কাজ করছে। ভদ্রমহিলা মাথা নুইয়ে ঠোঁট চেপে হাসলেন। গলা ঝেরে বললেন,
“ হলো এবার? ঠান্ডা হলো মাথাটা? খাবেন না? বেলা গড়িয়ে যায় যে। খাব কখন,আর যাব কখন?”
“ হ্যাঁ চলো। আনিস দেখো তো,কোন হোটেলটা ভালো হবে!”
“ জি জি ভাইজান দেখছি।”
***
“ আচ্ছা পুষ্প,ইকবাল ভাইয়ের সাথে শিকদার আঙ্কেলের কেসটা কী?”
মারিয়ার কথায় পুষ্প কপাল কুঁচকে বলল,
“ কীসের কেস?”
“ এই যে ভাইয়া উঠতেই আঙ্কেল অমন নামাও নামাও করলেন! উনি তো ধূসর ভাইয়ার খুব ভালো বন্ধু তাই না। সেই প্রাইমারি থেকে নাকি একই স্কুলে পড়েছেন! তাহলে আঙ্কেল ওনাকে পছন্দ করেন না কেন?”
নিজের প্রচণ্ড ভালোবাসার মানুষটাকে নিজেরই বাবা পছন্দ করে না! এই কথা কি হাসিমুখে মেনে নেয়া যায়? পুষ্পরও ভারি মন খারাপ হলো। ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ আসলে, ইকবাল রাজনীতি করে তো! আব্বু রাজনীতির বাইরের লোক। এইজন্যে তো ধূসর ভাইয়ের সাথেও ঝামেলা লেগে থাকে। দেখলে না কাল?”
মারিয়া চট করে সতর্ক গলায় বলল,
“ ইকবাল? এত সিনিয়র, নাম ধরে ডাকছো যে।”
থতমত খেয়ে গেল পুষ্প।
এমনিই ওর ভয়,অস্থিরতায় মনের অবস্থা সংকীর্ণ। তাই বানিয়ে বলার মতো আপাতত মাথায় কিছু এলো না। তুতলে তুতলে বলল,
“ আ-আম্মু মনে হয় ডাকছে। আসছিইইইই,আয়াম্মু আসছিইইই!”
পুষ্প তড়বড়িয়ে চলে গেল মায়ের কাছে৷ মারিয়া বেশ বুঝল,কেউ ডাকেনি। কথা কাটাতে চলে গেছে। হাসল ও। হাসতে হাসতেই চোখ পড়ল সাদিফের দিকে। মাথায় ক্যাপ উলটো করে পড়েছে। গায়ে কালো শার্ট! কোক খাচ্ছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুভ্র ছেলেটা অতীব সুদর্শন,অথচ একবার চেয়েই ‘হুহ’ বলে মুখটা ফিরিয়ে নিলো ও।
পরপর টের পেলো,ওরও গলা শুকিয়ে এসেছে। ওরও একটা কোক খাওয়া উচিত!
পিউ মুগ্ধ হয়ে চারপাশে দেখছে। এত ভোর! অথচ চারদিকে লোকজন কম কিছু নেই। এই ভোর ভোরও এত মানুষ ঘুরতে আসে এখানে? কাছেই শান্ত নদী। ঢেউ নেই খুব একটা! ফেব্রুয়ারির শুরু বলে( গত পর্বে সেপ্টেম্বর ভুল করে লিখেছিলাম,গল্পে ফেব্রুয়ারি চলছে)
পানির ওপর কুয়াশা ভাসছে মৃদূ। আশেপাশে পরোটা আর ইলিশের গন্ধ। কত সরব একটা জায়গা! হাওয়া,মিষ্টি আবহাওয়া মিলিয়ে পিউয়ের ঠোঁটে এক ছটাক মিহি হাসি ছুটে এলো। হাঁটছিল এদিক-ওদিক চেয়ে। খেয়ালই করেনি সামনে একটা বড়ো ইট পড়ে আছে। পায়ে বাঁধলেই হুমড়ি খেয়ে পড়বে মাটির ওপর।
বেখেয়ালি মেয়েটা সেই পথে এগোচ্ছিলই,ইটের সাথে লাগতোই পা-টা,ঠিক তক্ষুনি পেছন হতে পনিটেইলের একটা জোরসে টেনে ধরল কেউ একজন। চুলে টান খেয়ে ব্যথায় দাঁড়িয়ে গেল পিউ। উফ, বলে ফিরে চাইল পেছনে। পরপর
ধূসরকে দেখে মৃগনয়ন ছলকাল খানিক। আরো বড়ো বড়ো করে চাইল পিউ। এক হাতে ওর বা পাশের পনিটেইলটা ধরে,আরেক হাত পকেটে ঢুকিয়ে, কপালে দুটো ভাঁজ নিয়ে বলল,
“ চোখ কই তোর?”
পিউ ঘাবড়ে মিনমিন করে বলল,
“ ন-নাকের ওপর!”
ধূসর প্রশ্নটা শক্ত মুখে করেছিল। কিন্তু জবাব শুনে চেহারা বদলাল তুরন্ত। পোক্ত কপালের ভাঁজ মিলিয়ে শিথিল হতে দেখা গেল একটু। পাতলা ঠোঁট দুটো টিপল এক পাশে তুলে। যেন কোনো গম্ভীরতার আড়ালে থামাল হাসিটা। পনিটেইলটা আলতো করে ছেড়ে দিলো অমনি। ষোড়শীর লম্বা চুলের একাংশ ধূসরের খসখসে মুঠো থেকে গড়াতে গড়াতে এসে ফের ওর পিঠে লুটিয়ে পড়ল।
ধূসর ফিরতে পা বাড়াল, অমনি উদ্বেগ নিয়ে ডাকল পিউ
“ ধূসর ভাই!”
থামে মানুষটা। জবাব দেয় না। ও নিজেই বলল,
“ কেউ কি নাস্তা করবে না? কোন হোটেলে বসবে,কখন খাবে? সবাই তো ঘুরেই যাচ্ছে,ঘুরেই যাচ্ছে।”
ধূসর ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল এবার। জিজ্ঞেস করল,
“ খিদে পেয়েছে?”
ওপর নিচে মাথা ঝাঁকায় পিউ।
ধূসর একবার বাকিদের চেয়ে দেখল। পুষ্প আর ইকবাল নেই। এছাড়া সবাইকেই কিছু না কিছু করতে দেখা যাচ্ছে।
ও বলল,
“ আয় “
সাথে সাথে ওর পেছনে হাঁটা ধরল পিউ। ধূসর শুধায়,
“ কী খাবি?”
“ হালকা কিছু। সবার সাথে আবার খেতে হবে তো!”
ধূসর ওকে নিয়ে একটা বেকারি শপে এসে দাঁড়াল। ফুড ডিসপ্লে কেস থেকে পেস্ট্রি,কেক,স্যান্ডউইচ আরো অনেকগুলো খাবার দেখা যাচ্ছে। পিউ বলল,
“ স্যান্ডউইচ!”
“ স্যান্ডউইচ!”
“ কটা স্যার?”
“ একটা।”
পিউ বলল,
“ আপনি খাবেন না?”
“ ইকবাল আসুক।”
স্যান্ডউইচ গরম হচ্ছিল ওভেনে। আশেপাশে একবার চেয়ে কী যেন খুঁজল ধূসর। পিউ নিজেই বলল,
“ আচ্ছা,ইকবাল ভাই এখানে এলো কী করে?”
“ পায়ে হেঁটে।”
পিউ গাল ফুলিয়ে বলল,
“ সে তো সবাই পায়ে হেঁটেই আসে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,আপনি এনেছেন? কিন্তু উনি গুলশান থেকে না উঠে,অতদূর থেকে উঠলেন কেন? তবে জানেন উনি যখন বাসের ভেতর ঢুকলেন, আমি তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম। আব্বু না এখন রেগেমেগে বাসই ভেঙে ফেলে। আবার ট্যুরটাই না ক্যান্সেল করে দেয়। আব্বুর যা রাগ!”
ধূসর জবাবে কিছু বলল না। সে বেশিরভাগ সময় চুপ থাকে। গরম গরম স্যান্ডউইচ,সস আর পানির বোতল সার্ভ হলো সেসময়। অদূরে রাদিফ ছুটছিল, আজমল খেলছিলেন ওর সাথে। দুজনকে দেখতে দেখতে পিউ মুচকি হাসে। ওভাবেই স্যান্ডউইচে কামড় বসায়। খাবার মুখে নিয়েই বলতে যায়,
“ দেখু…”
তবে ধূসরের দিক চাইতেই,ওর সেই কথা থামল। মানুষটা ধারালো নজর সরিয়ে নিলো তার চেয়েও দ্রুত। আর আজকেও গুলিয়ে গেল পিউ। বুঝতে পারল না,এটা ভ্রম না ভাবনা? ধূসর ভাই কি আসলেই ওকে দেখে?
বেকারির পাশে স্টেশনারি শপ ছিল একটা। পাশাপাশি, লাগোয়া দালান। ধূসর উঠে গেল সেখানে। ওখানে বসেই কিছুটা গলা তুলে বলল,
“ সিগারেট আছে?”
তুরন্ত খাবার গলায় আটকে গেল পিউয়ের। বিষম খেল মেয়েটা। নিজেই নিজের মাথার তালুতে দু-চারটে বাড়ি দিয়ে সামলাল নিজেকে। বিকট চোখে চেয়ে চেয়ে দেখল,মুখোমুখি দুরুত্বে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে। ধূসর একটা সিগারেট নিলো,পাতলা রক্তাভ ঠোঁটে গুঁজে লাইটার দিয়ে জ্বালাল সেটা। সিগারেটের এক মাথায় ধরে যাওয়া আগুন যেন দাউদাউ করে উঠল পিউয়ের মনেও। হতবিহ্বল হয়ে ভাবল- ধূসর ভাই সিগারেট খান?
ওকে সামনে রেখেই মানুষটা টান বসায় তাতে। ধোয়া উড়তে উড়তে হারিয়ে যায়। তামাটে মুখটা ঢেকে দেয় কখনো। পিউ শুধু চেয়েই রইল! আহতের মতো নিস্তব্ধ নয়নে। ফাঁটা বুক ছাপিয়ে গলা থেকে আর খাবার নামতে চাইল না। ঢোক গিলল ও। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ বিল কত হয়েছে?”
দোকানির আগে ধূসর বলল,
“ আমি দিয়ে দেব, যা।”
উঠোনে একটা সাদা কুকুর ঘুরঘুর করছিল। বাকি আধখাওয়া স্যান্ডউইচটা ওর সামনে রেখে, নরম পা চালিয়ে কোথাও একটা চলে গেল পিউ। ওর ছোট্ট শরীরের ছায়া অদৃশ্য হওয়া মাত্রই হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে দিলো ধূসর। এসে দুই দোকানেরই বিল মেটাল। তারপর আরেকবার ঘাড় ভেঙে চাইল অদূরে।
পিউ এত আস্তে আস্তে হাঁটছে! পা যেন চলে না। দুঃখ হতাশায় জর্জরিত মেয়েটা। শেষে কিনা ধূসর ভাইও সিগারেট খান? পিউ এখন কী করবে? এত কাল ও যা নিয়ে নিজের অপছন্দ প্রকাশ করল,সেটাই এভাবে ঘুরে এলো জীবনে? তাও ঐ মানুষের মাঝে,যাকে খুব বেশি ভালোবাসে! পিউ কোনোদিন বাবা-চাচা- মামা কারো হাতে এসব ছাইপাশ দেখেনি। সাদিফ ভাইও খাননা। কেউ ছোঁয়-ই না এগুলো। সেখানে উনি! এখন কী হবে? কী করবে পিউ! মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে কোনো এক হোটেলের বরাদ্দ এক ছাউনির চেয়ার টেনে বসল। ফোন মেলে ঢুকল নিজের ইনস্টাগ্রাম আইডিতে। অনেক ঘেটেঘুটে,স্ক্রল করে,খুঁজে খুঁজে আড়াই বছর আগে ওর শেয়ার করা একটা পোস্ট বের করল সেখানে। পিউয়ের পছন্দের এক হিরো মদ আর সিগারেট একইসাথে খাচ্ছিল বলে,পিউ তাকে পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। বিশাল একটা পোস্টও লিখেছে তাকে নিয়ে। তারপরদিন অন্ধকার রাতের একটা ছবি পোস্ট করেছিল। ক্যাপশন ছিল,
“ I hate smoking. If you’re a smoker, keep your distance….”
পোস্ট দেখে পিউয়ের প্রহৃত হৃদয়টা আরো প্রকাণ্ড হলো। মুখে অন্ধকার নিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল সেথায়। এই সিগারেট ওর দু চোখের বিষ। যার প্যাকেটে লেখাই থাকে ধূমপান মৃত্যুর কারণ,তা পছন্দ করবে কোন দুঃখে?
তাছাড়া বাবা বলেন,ভালো ছেলেরা এসব খায় না। আর আজ? আজ পিউয়ের সাথে এত বড়ো দূর্ঘটনা ঘটে গেল? প্রিয়র চেয়েও প্রিয় ধূসর ভাই,আপনাকেই ছুঁতে হলো এসব?
পিউ কতক্ষণ মাথা নুইয়ে রাখল টেবিলে। তারপর মুখ তুলে দম নিলো। যেন জোর বাড়াল বুকের। ফের ফোন মেলে, সঙ্গে সঙ্গে আগের ঐ পোস্টদুটো ডিলিট করে দিলো। যাকে এত ভালোবেসে ফেলেছে,তার খারাপটাও বাসবে নাহয়! ভালোবাসা তো হয়ই এমন অন্ধ,তাই না!
( এক সমুদ্র প্রেমে ধূসরের সিগারেটের ব্যাপারটা নিয়েই অনেকে সন্দিহান ছিলেন না? নিন,এবার যথেষ্ট ভেঙে লিখলাম। যারা বুঝে নেবেন,বোঝা যাবে গল্প তারাই মন দিয়ে পড়েন।)
চলবে…
বিশাল পর্ব হচ্ছিল,তাই অর্ধেক দিলাম।
#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন___(২৬.খ)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
দুই হোটেলের মাঝখানের ছোটো চাপা গলির মতো জায়গা। সেখানে পুষ্পর দুটো হাত ওরই পিঠের সঙ্গে চেপে ধরে আছে ইকবাল। পুষ্প ব্যথা পাচ্ছে না, তবে ভয়ে ভয়ে চারপাশ দেখছে বারবার। শেষে মুচড়ে বলল,
“ কী হচ্ছে! সবাই আছে তো!”
ইকবালের মধ্যে বদল এলো না। উলটে দৃঢ় গলায় বলল,
“ থাকুক না! তাতে কী?”
“ খুব সাহস দেখানো হচ্ছে! বাসের মধ্যে আব্বুর ভয়ে কে যেন ভাই ভাই করে ধূসর ভাইয়ার পেছনে গিয়ে লুকাল?”
নিষ্পাপ চেহারায় ঠোঁট কামড়ে হাসল ইকবাল। এক চোট চোখের মণি নাড়িয়ে ঘুরে এলো পুষ্পর মুখশ্রী হতে।
বড্ড ব্যাকুল স্বরে বলল,
“ একটু সোজা হয়ে দাঁড়াও না,মাই লাভ! ভালো করে দেখি। কতগুলো দিন তোমায় দেখিনি! কতদিন তোমার এই খ্যাকখ্যাক শুনিনি।”
ইকবালের দৃষ্টি ঘোলাটে। বড্ড তৃষ্ণা নিয়ে চেয়ে আছে ছেলেটা। লজ্জায় নুইয়ে যেতে যেতেও মুখচোখ কঠিন করে আরেক দিকে চাইল পুষ্প। থমথম করে বলল,
“ চারদিন আমাকে কষ্টে রেখে এখন ভালোবাসা উথলে পড়ছে?”
“ কষ্ট পেয়েছ তাহলে?”
অভিমানি চোখে ফিরল পুষ্প। বলল,
“ তুমি আমাকে ব্লক করতে পারলে ইকবাল?”
“ একটু তো কষ্ট হচ্ছিলই। কিন্তু কী করব? ওইটুকু কষ্ট না দিলে আজ এমন সারপ্রাইজ হতে, মাই লাভ?”
“ এরকম সারপ্রাইজ! জান হাতে চলে আসাটা কেমন সারপ্রাইজ?”
ইকবাল হাসল আবার। ডাকল স্বরে আফিম মিশিয়ে,
“ মাই লাভ!”
পুষ্প খ্যাক করে বলল,
“ কী?”
“ আহ,এখনো খ্যাচখ্যাচ করছো? তোমার উচিত না আমাকে জাপটে ধরে চুমু খাওয়া?”
“ ইকবাল, যেভাবে টেনে এনেছ ভয়ে যে আমি মরিনি এই অনেক! “
“ আনব না? তোমাকে সামনে রেখে বেশিক্ষণ চুপ থাকা যায়! জেনেশুনে হিটলারের গুহায় এসে ঢুকেছি,শুধুমাত্র তোমাকে দেখার জন্যে।”
পুষ্প সন্দেহী চোখে বলল,
“ মিথ্যে কথা!”
“ তিন সত্যি মাই লাভ। একশো কথায় যে দুটো সত্যি বলি,তা তোমার সাথেই বলি।”
“ তোমার মতলবটা আসলে কী?
এখানে কী চাই? এসেছো কেন?”
“বললাম না,তোমার জন্যে!”
“ উহু, আমাকে পাহাড়া দিতে, যাতে শুভর সাথে না মিশি তাই না?”
ইকবাল বেখেয়ালে বলল,
“ হ্যাঁ!”
“ কীইইইই?”
“ এই না,
মিথ্যে কথা। পাহাড়া তো ধূসরকে দিতে এসেছি মাই লাভ। ও যদি আমাকে ফেলে অন্য কাউকে বন্ধু বানিয়ে নেয়!”
“ মিথ্যুক!” বলেই মুচকি হেসে ফেলল পুষ্প।
হাসলো ইকবাল নিজেও।
পুষ্প পরপরই চিন্তিত মুখে বলল,
“ কিন্তু বাবা যে কী করবে ইকবাল! কী যে হবে! দেখলে তখন কত রেগে গেল !”
“ ওসব নিয়ে চিন্তা করো না। ধূসর আছে না? আমার বাহুবলী!”
পুষ্প আবার হেসে ফেলল ওর দেয়া নাম শুনে। জিজ্ঞেস করল,
“ ধূসর ভাই জানতেন তুমি আসছো?”
“ জানতোই তো। ও না জানলে আমি এখানে পা ফেলতে পারি? ওই তো বলল, গুলশান থেকে না উঠে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে উঠতে!
ব্যাটাকে বোকা বানিয়েছি,মাই লাভ। বুঝতেই দিইনি,আমি আমার মাই লাভের জন্যে যাচ্ছি।”
তারপর একটু দম নেয় ইকবাল। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দেখে পুষ্পর হাসিহাসি, স্নিগ্ধ মুখ। মেয়েটার দুই চোখ বলে দিচ্ছে, ওকে দেখে; ওকে পেয়ে মাত্রার চেয়েও বেশি খুশি সে। ইকবাল শ্বাস তুলে ডাকল,
“ মাই লাভ!”
“ আবার ক-কী”
“ সভাপতি ইকবাল তোমায় একটা চুমু দিতে চাইছে।”
পুষ্প আঁতকে বলল,
“ ইকবাল! মাথা খারাপ তোমার? “
“ একটা দেব,প্লিজ!”
“ বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে না? বসতে দিলে শুতে চাও কেন। বুকে এত্ত সাহস কোত্থেকে আসছে?”
“ তোমার প্রেমে পড়ে আমি বোধ হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।
Ye dil pagal bana beitha
Ise ab tu hi samjha de
Dikhe tujhme meri duniya
Meri duniya tu banjare
Hoon khushkismat jo kismat se
Tumhein aise main paya hoon
Main tumse ishq karne ki
Ijazat rabb se laaya hoon….”
ফিসফিসে গান শুনে পুষ্প ভেতর জুড়িয়ে গেলেও,এত কাছাকাছি থেকে লজ্জা পেলো ভীষণ। চিবুক নুইয়ে আড়চোখ তুলতেই, খেয়াল করল ইকবালের ধৈর্য্যচ্যুতি। কেমন তাড়াহুড়ো আর অগোছালো দৃষ্টি নিয়ে ঠোঁট দুটো ছুটে আসছে তার। ঘাবড়ে গেল মেয়েটা। ইকবাল তো আগাগোড়াই এমন। কেয়ারলেস বড্ড! কিন্তু বাড়ির সবাই আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কেউ দেখলে সর্বনাশ! তাছাড়া পাব্লিক প্লেস,এটা কি চুমু খাওয়ার জায়গা? ভীতসন্ত্রস্ত চোখে ইকবালের পেছনে চেয়েই চ্যাঁচিয়ে উঠল ও,
“ আব্বু!”
তুরন্ত, চমকে পেছন ফিরল ইকবাল। দুহাত ঢিলে হলো তাতে। অমনি ওর বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে,ছুট্টে বেরিয়ে গেল পুষ্প। বেচারা ভড়কে যায়, ডাকতে নিয়েও থামে। হাত ফস্কে দামি জিনিস বেরিয়ে যাওয়ার আক্ষেপে চ সূচক শব্দ করে মুখে। পরপর মাথা চুলকে বলে,
“ হিটলারের মেয়েও হিটলারি শুরু করে দিলো রে,ইকবাল।”
“ পালাও মাই লাভ, অনেক উপোসে রেখেছ। এইবার চুমু তো একটা খাবই!”
****
ধূসরের পকেটে টম ফোর্ডের মিনি বোতল ছিল। নিকোটিনের কড়া গন্ধ তাড়াতে স্প্রে করল শরীরে। এর মাঝেই পাশ হতে গলা ঝেরে কাশলেন আমজাদ। ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরল ও। জিজ্ঞেস করল,
“ কিছু বলবেন,চাচ্চু?”
আমজাদের মুখচোখ পালটে গেল অমনি। ধূসরই বাড়ির একমাত্র ছেলে যে ওনাকে বড়ো আব্বু ডাকে। কিন্তু দেশে আসার পর থেকেই এই চাচ্চু,চাচ্চু ডেকে কী বোঝাতে চাইছে ছেলেটা? উনি বড়ো আব্বু হওয়ার যোগ্য নন!
আমজাদের মেজাজ মূহুর্তে চটে গেল। নাক ফুলিয়ে বললেন,
“ শোনো,শুধু আর শুধু মাত্র সুমনার সম্মান রক্ষায় আমি তোমার ঐ বানর সেনাটাকে ট্যুরে যেতে এলাউ করলাম। নাহলে আজ এই মূহুর্তে গলা ধাক্কা দিয়ে এখান থেকে বের করে দিতাম,বুঝেছ!”
ধূসরের চোখমুখ নড়ল না। চিবুকের চামড়াও সরল না। শুধু অস্পষ্ট বলল,
“ হু।”
আমজাদ আরো ক্ষেপে বললেন,
“ হুম হুম করে কী বোঝাতে চাও?”
“ কী বোঝাব?”
আমজাদ ওর মুখের সামনে আঙুল তুলে বললেন,
“ তোমার ঐ লাফাঙ্গা বন্ধুকে আমার সামনে আসতে বারণ করে দেবে। একদম যেন আমার কাছাকাছি না থাকে। ওর ঐ দাঁত বার করা হাসি যদি দেখেছি! বলে দিও,বরিশালে নদী-নালার অভাব নেই। কোনটাতে ফেলে চুবাব,আমি কিন্তু নিজেও জানি না।”
ভদ্রলোক গজগজ করতে করতে ফিরে গেলেন আবার। ঠিক ক সেকেন্ড পরেই পেছন হতে এসে ওর গলা দুই হাতে প্যাঁচিয়ে ধরল ইকবাল। ধূসর ফিরতেও পারল না,আবার ঘাড় ছেড়েই ইকবাল সামনে এসে দাঁড়াল। নাকচোখ কুঁচকে মাথা নুইয়ে শুশুকের মতো ওর গায়ের গন্ধ শুকে বলল,
“ সিগারেটের স্মেল আসছে কেন?”
“খেয়েছি।”
আকাশ থেকে পড়ল ইকবাল। আর্তনাদ করে বলল,
“ কীহ!”
ধূসর ওর মুখটা ঠেলে সরিয়ে দেয় নিজের থেকে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
“ যা শুনেছিস তাই।”
ইকবাল হড়বড়িয়ে বলল,
“ তুই আর সিগারেট? কী বলিস ভাই!
না না,ফাজলামো করছিস তাই না?”
“ না।”
“ হুহ,বললেই হলো?
আরে,যে ছেলে ফ্রেন্ডসদের আড্ডাতেও কোনোদিন একবার ফিরে সিগারেট দেখেনি,সাধলেও হাত দিয়ে ঠেলে দিয়েছে,বলেছে আই হেইট স্মোকিং; সে আজ সিগারেট কী উপলক্ষ্যে খাবে শুনি?”
পদ্মার পাড়ে ছোটো ছোটো মাছের নৌকা ভিড়ছে। সেই ব্যস্ত পারাপারের পথে চেয়ে রইল ধূসর। ইকবাল গা ঝাঁকিয়ে বলল,
“ কী রে ব্যাটা,বল কিছু!”
“ লেট ইট বি, ইকবাল।”
ইকবাল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হতচ্ছাড়াটা ছাড়তে বলেছে,তার মানে এই ব্যাপারে আর মুখ খুলবে না। প্রসঙ্গ কাটাতে বলল,
“ হিটলার ব্যাটা কী বলছিল?”
ধূসর চোখ রাঙিয়ে চাইতেই বলল,
“ সরি,মানে আঙ্কেল কী বলছিল তোকে? নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে কিছু তাই না?”
“ না।”
“ মিথ্যে বলে লাভ নেই। সব শুনেছি। কিন্তু আমাকে পানিতে ফেলে চুবাবে শুনেও তুই কিছু বললি না ধূসর?”
ধূসর চোখ সরু করল,
“ কী বলব?”
“ কেন? বলে দিতি,আমি সাঁতার জানি। চুবানো অত সোজা না।”
বুক ফুলিয়ে বলল ইকবাল। ওর চোখমুখের ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলল ধূসর। মাথায় চাটি মেরে বলল,
“ গাধা!”
ইকবালও তাল মিলিয়ে হাসল। চোখ নাঁচিয়ে বলল,
“ তোমার মাথায় এত ঘিলু মামা! ঠিক জা্নো কোন মাছের কোন টোপ হাঁ? এজন্যেই ওয়াজিদ সাহেব বাসে ওঠার পর,আমাকে উঠতে বলেছিলি! যাতে আত্মীয়র সামনে আঙ্কেল রিয়্যাক্ট না করতে পারেন। ভালো ভালো। তুই-ই দেশের ভবিষ্যৎ।
কিন্তু তোর ছোটো মাকে ম্যানেজ করলি কী করে?”
“ ম্যানেজ করতে হয়নি। বলেছি,রাজি হয়ে গেছে।”
“ হাউ সুইট শী ইজ! আমার পক্ষ থেকে একটা লম্বা ধন্যবাদ দিয়ে দেবো।”
অদূর হতে আজমল হাত তুলে ডাকলেন সেসময় ,
“ ধূসর,ইকবাল নাস্তা করতে এসো। বড়ো ভাবি ডাকছেন।”
মারিয়া একটা ছোট কোক কিনেছে। ফিরে এসে দেখল মাঠে কেউ নেই। হয়ত,
হোটেলের ভেতর ঢুকে গেছে সবাই।
ও যাচ্ছিলই,হঠাৎ চোখ পড়ল অদূরে। একটা দেওয়ালে পিঠ ঠেসে দাঁড়িয়ে আছে পিউ। চোখেমুখে ভয় খুব।
মহাবিপদে পড়ে গেছে মেয়েটা । তখন কুকুরকে রুটি খেতে দেয়ার পর থেকে, আর পিছু ছাড়ছে না। ঘুরঘুর করছে চারপাশে। আর কুকুরে পিউয়ের ভীষণ ভয়! কুকুরটাকে এড়িয়ে সামনে পা ফেলতে পারছে না,ছুটতেও পারছে না। আর না পারছে জায়গা থেকে নড়তে। কুকুরটা অনেকক্ষণ লেজ নাড়ল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। শেষে দু পা গুছিয়ে মাটিতে বসে পড়ল। পিউ আরো ঘাবড়ে পিছিয়ে গেল দু পা। হাত নাড়িয়ে বলল,
“ সুহ সুহ,যাহ যাহ!”
কুকুর যায় না। বসে বসে লেজ নাড়ে। বড়ো করে হাই তোলে একটা। ওর দাঁতকপাটি দেখে পিউয়ের আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড়। এই দাঁত দিয়ে কামড় দিলে ওর গল্প এখানেই শেষ।
তুঁতলে তুঁতলে বলল,
“ দেখো ভাই বসেছ যখন,বসে থাকো। আমার ধারেকাছেও কিন্তু আসবে না।”
কুকুর একটু নড়ল। পিউ হড়বড়িয়ে বলল,
“ বেয়াদবি করলে কিন্তু মারতে মারতে কুত্তা বানিয়ে দেবো।”
কুকুরটা এসব বুঝল না। বসে রইল পা লটকে। পিউ অনুনয় করে বলল,
“ যাও না এখান থেকে। যাও না!”
মারিয়া হেসে ফেলল ওর অবস্থা দেখে। সামনের টেবিলটায় কোকের বোতল নামিয়ে রেখে এগোলো সেদিক। অমনি ভূতের মতো সেখানে এসে দাঁড়াল সাদিফ। কোকের ছিপি খুলে,পকেট থেকে একটা সাদা ট্যাবলেট বের করে চুবিয়ে দিলো ওতে। কোক ফ্যানা তোলার আগেই ছিপি টাইট করে আটকে, জায়গায় রেখে দিলো। একপল সতর্ক চোখে চারপাশটা দেখল,সুড়ুৎ করে পালিয়ে আসার মতো ভেগে গেল আবার।
মারিয়া হাসতে হাসতে এসে দাঁড়াতেই পিউ আর্তচিৎকার ছুড়ল,
“ আপু,আপু বাঁচাও!”
“ পিউ,একটা কুকুরে কেউ এত ভয় পায়? কিচ্ছু করবে না। এসো,আমার হাত ধরো।”
পিউ জোরে জোরে মাথা নাড়ল।
“ না,আগে এটাকে ভাগাও। একটা কামড় দিলে,চৌদ্দটা ইঞ্জেকশন দিতে হবে। প্লিজ,প্লিজ!”
“ আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়াও।”
মারিয়া এদিক-ওদিক চেয়ে ঢিল খুঁজল। ইটের খোয়া হাতে নিয়ে ভয় দিতেই,উঠে ছুটে গেল কুকুরটা। পিউ বুকে হাত দিয়ে শ্বাস ফেলল। যেন খুব বাঁচা বেঁচেছে। তক্ষুনি
হোটেলের বাইরে এসে রাদিফ দুহাত ওপরে নাড়তে নাড়তে চ্যাঁচাল,
“ মারিয়াপু,পিউপু পরোটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছেএএ!”
যাবার আগে টেবিল থেকে নিজের কোক নিয়ে যায় মারিয়া। হোটেলের ভেতরে দুটো টেবিল নিয়ে বসেছে সকলে। একটায় গুরুজনরা,অন্যটায় বাড়ির ছোটোরা। তবে,সুমনা নিজেকে এখনো গুরুজন ভেবে ওঠেননি। ঐ ঘুরেফিরে গিয়ে পুষ্পদের সাথেই বসে গেছেন তিনি। সবাই বসার পর আরো দুটো চেয়ার ফাঁকা ছিল এখানে। মারিয়া পিউয়ের হাত ধরে হাজির হতেই,সাদিফের ভারি মেজাজ খারাপ হলো। এক পল বিরক্ত চোখে দুজনের হাতের দিকে দেখল সে। পিউকে মানা করল,তাও এ মেয়ের সাথে মিশছে। সুইট মেয়েটাকে এই ম্যালেরিয়া নিজের মতো ঝগড়ুটে না বানিয়ে ছাড়বে না!
পিউ,মারিয়া দুজনেই হলুদ জামা পরেছিল। তফাৎ শুধু পিউয়েরটা জর্জেট মারিয়ারটা প্রিন্টের ফারসি স্যুট। কিন্তু সাদিফের কাছে এই তফাত আহামরি লাগল। পিউকে হলুদে যতটা কুটু লাগছে,মারিয়াকে লাগছে? একদম না। উল্টে মনে হচ্ছে একটা হলুদ গিরগিটি বসে আছে এখানে। হুহ!
ফাঁকা চেয়ারের একটায় মারিয়া বসল,পাশেরটায় পিউ। নাস্তা হিসেবে পরোটা,ডিম, ডাল ভাজি, আর কেউ কেউ মাছ ভাজা দিয়ে খিচুড়িও নিয়েছে। পিউ খাবার না দেখে,সবার আগে আড়চোখ তুলে একবার কোণায় দেখে নিলো। সাদিফ,ইকবাল এরপরের চেয়ারে বসেছে ধূসর। পরোটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে বাম হাতে ফোন ছিল তার। স্ক্রল করছিল কিছু একটা! হুট করে ধূসরের সেই হাতের আঙুল থামল। মুখের ভেতর চিবোতে থাকা খাবারটাও থমকাল সহসা। কেমন ঝট করে পিউয়ের দিকে মুখ তুলে চাইল তারপর। মেয়েটা চেয়েইছিল,ধূসরও তাকাবে বোঝেনি। হঠাৎ ব্যাপারটায়,ঘাবড়ে সোজা হলো পিঠ। তড়িঘড়ি করে চিবুক নামিয়ে নিলো বুকে।
ইকবাল খেতে খেতে বেখেয়ালি চোখে একবার ধূসরের ফোনের স্ক্রিনে দেখল। মাথা সরিয়ে আনতে আনতেও চটক কাটার মতো চাইল আবার। এক পল সবাইকে দেখে ওর কানের কাছে কণ্ঠ চেপে বলল,
“ তুই আবার পিউপিউয়ের আইডি ঘাটছিস?…”
ধূসর চোখ রাঙিয়ে চাইল। নীরবে কালো মণি দুটো নাড়িয়ে বোঝাল,চুপ করে যেতে।
ইকবাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ মামা,কী যে চলছে তোমার মনে! খেয়ে নিই দাঁড়াও।”
ইকবাল বড্ড দ্রুত খাওয়া শেষ করল। আপাতত এখানে আর দেখার কিছু নেই। বাকিদের খাওয়াদাওয়া শেষে হলেই সোজা রওনা করা হবে। এদিকে রোদের তাপ বেলার সাথে সাথে বাড়ছে। ইকবাল মুখ-হাত মুছতে মুছতে বাইরে এসে দাঁড়াল। তক্ষুনি পেছনে এসে মিহি স্বরে ডাকল পিউ,
“ ভাইয়া!”
ফিরল ইকবাল। ওকে দেখেই ঠোঁটে লম্বা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“ পিউপিউ,হাই কিউটিপাই! কত দিন পর কথা হচ্ছে!”
“ আপনি খুব চালাক! এত্ত অভিনয় জানেন বাপ রে। আমি আপু দুজনেই ঘোল খেয়ে গেছি।”
ইকবাল পাঞ্জাবির কলার টেনে টেনে বলল,
“ তাই না বলো? আমি আসলে আমার মামার মতো অভিনেতা হতে চেয়েছিলাম।”
পিউ অবাক হয়ে বলল,
“ আপনার মামা এক্টর?”
“ না,উনিও হতে চেয়েছিলেন।”
হেসে ফেলল পিউ। বলল,
“ কিন্তু আপনি এটা একদম ঠিক করেননি। এভাবে কেউ সারপ্রাইজ করে? এ কদিন আপু কত কেঁদেছে জানেন!”
বিহ্বল চোখে চাইল ইকবাল,
“ কেঁদেছে?”
পিউ সেদিনের সব ঘটনা বলল। আর হাঁ করে শুনলো ইকবাল। অদূরের পুষ্পর পানে চাইল ফাঁকে। মেয়েটা খাচ্ছিলো তখনো। ও বিস্ময় নিয়ে বলল,
“ মাই লাভ আমাকে এত ভালোবাসে পিউ!”
“ বিশ্বাস হয় না? মেয়েরা এরকমই,ভেতরে ভালোবাসা যা থাকে সামনাসামনি তার এক বিন্দুও প্রকাশ করতে পারে না।”
বলতে বলতে নিরাশ শ্বাস ফেলল পিউ। ইকবাল খেয়াল করতেই বলল,
“ কী ব্যাপার পিউপিউ,মন খারাপ?”
মলিন মুখে মাথা নাড়ল মেয়েটা। আবার নিজেই বলল,
“ একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“ করো না!”
পিউ দৃষ্টি নত করল। ওরনার সুতোয় আঙুল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,
“ ধূসর ভাই কবে থেকে সিগারেট খান?”
ইকবাল হাঁ করল কিছু বলতে, পিউ সময় দিলো না। ব্যস্ত গলায় বলল,
“ এই দু বছরে কখনো খেতে দেখিনি। ওনার রুমেও তো কিছু পাইনি কখনো। কিন্তু আজ হঠাৎ দেখলাম,আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলো। উনি কি তাহলে বাইরে গিয়ে খেতেন?”
ইকবাল সতর্ক চোখে বলল,
“ তোমার সামনে খেয়েছে?”
পিউ মাথা নাড়ল।
“ আর কেউ ছিল না তখন?”
“ না,আমি আর উনিই।”
ইকবাল কী যেন ভেবে ভেবে বলল,
“ আচ্ছা, সিগারেট নিয়ে তোমার ধারণা কী?”
পিউ মন খারাপ করে বলল,
“ আমার খুব অপছন্দ! যারা খায় তাদেরও অপছন্দ। শুধু ধূসর ভাইয়ের বেলায়ই অপছন্দ করতে পারছি না।”
ইকবাল গলা ঝারল থতমত মুখে। সিগারেট তো ও গোরুর মতো টানতেই থাকে। সেসব তো পিউকে বোঝানো যাবে না। বলল,
“ আমারো একদম পছন্দ না। এটা খাওয়ার মতো কিছু? তোদের খেতে হলে ঘাস খা,তাও বিড়ি খাস না।”
পিউ ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ ওনাকে যদি বুঝিয়ে বলা যায়,উনি কি ছেড়ে দেবেন না?”
“ আমি কথা বলে দেখব পিউপিউ। ডোন্ট বি স্যাড হা? এসব নিয়ে ট্যুরের আনন্দ মাটি করো না। কেমন?”
চার আঙুলে আলতো করে পিউয়ের এক গালে চাপড়ে দিলো ইকবাল। ঘাড় কাত করে হাসল মেয়েটা। মা ডাকলেন সেসময়, ও ‘আসছি’ বলে চলে গেল সেদিকে। ইকবাল ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে ধূসরকে খুঁজল। পাওয়া গেল না। ওকে দাঁড়াতে বলে,কই গেল আবার? সে যাক গে,
ধূসর কোনোদিন মদ-সিগারেট খায়নি। অন্তত ও খেতে দেখেনি। এতদিন নিউইয়র্ক এর মতো একটা উন্নত দেশে থেকেও ছোঁয়নি এসব। উলটে ওকে খেতে দেখলে ধমকেছে! ছাড়তে বলেছে। ঐ শুধু একবার! ভাবতেই ইকবালের ভ্রু কপালে উঠে বসল। সেবার আনিস-সুমনার বৌভাতে, ধূসর যখন বুঝতে পেরেছিল পিউ ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসে,সেসময় ওর রুমে বসে সিগারেট চাইছিল না?
হ্যাঁ, ইকবাল সাথে সাথে হাত সরিয়ে বলেছিল -কখনো খাসনি, তোর সহ্য হবে না!
এর মানে কী? ওইদিন নাহয় দিকদিশা পাচ্ছিল না। কিন্তু হতচ্ছাড়াটা আজ সিগারেট কেন খেলো? তাও পিউয়ের সামনেই?
উম,জানতে হচ্ছে তো!
মারিয়া কোক খাওয়ার সময় পায়নি এতক্ষণ। নাস্তা শেষ করে একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে আনমনে ছিপি ধরে মোচড়াল,সঙ্গে সঙ্গে শ্যাম্পেইনের মতো ফ্যানা তুলে ওপরে ছিটকে উঠল সব। এক ঝটকায় গিয়ে মারিয়ার গোটা মুখ ভিজে একশা হয়ে গেল। হকচকানোর তোড়ে হাত থেকে কোকের বোতলটা খসে পড়ল নিচে। মারিয়া আহাম্মক বনে গেল কিছু ক্ষণের জন্যে। ততক্ষণে কোক মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ভিজে গেছে মারিয়ার ওরনাও। মুখ ভরতি আঠালো পানি নিয়ে ভড়কে এদিক-ওদিক দেখল মেয়েটা। কী হয়েছে,মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে সব। ঠিক তক্ষুনি ওপাশ থেকে হুহা হাসিতে ফেটে পড়ল কেউ একজন। চমকে ফিরে চাইল মারিয়া। খ্যাকখ্যাক করে হাসতে হাসতে নুইয়ে গেল সাদিফ। যে হাসি দেখেই গা জ্বলে গেল ওর। ঢেড় বুঝল,এটা কার কাজ! কোমরে হাত দিয়ে খিটমিট করে বলল,
“ আপনাকে আমি দেখে নেব।”
সাদিফের ক্যাপ ছিল উলটো। ঘুরিয়ে ঠিক করে মাথায় পড়ল আবার। বিদ্রুপ করে বলল,
“ সামনে থেকে তো দেখছেনই। বললে পেছন ঘুরেও দেখাই?”
মারিয়া ফুঁসতে ফুঁসতে গালি দিলো,
“ বাদরমুখো ছেলে একটা!”
সাদিফের হাসি দপ করে নিভে গেল অমনি। চেয়ে রইল হতভম্ব হয়ে। ও বাদর মুখো? অথচ সবাই বলে শিকদার বংশের পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন সে। ব্রিটিশদের মতো গায়ের রং ওর। আর এই মেয়ে কিনা!
রেগেমেগে জবাব দেয়ার আগেই,মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল মারিয়া। সাদিফ তাও চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে বলল,
“ আর আপনি কী? আপনি তো একটা … পেঁচিমুখি!”
****
বাসে মারিয়া সবার আগে উঠেছে। একটু তাড়াহুড়ো করে, সতর্ক চিত্তে। একবার পিছু ফিরে দেখে নিয়েছে,সাদিফ ত্রিসীমায় আছে কিনা! না,দেখা যাচ্ছে না ওকে। হয়ত গিয়েছে কোথাও। মারিয়ার মুখে চুইংগাম ছিল। সাদিফ আসার সময় বসেছিল B সীটে। এবারেও তো এসে এখানেই বসবে। মারিয়া কায়দা করে মুখের চুইংগামটা লাগাল সিটের সঙ্গে। যাতে বসা মাত্রই সাদিফের চুলে লেগে যায়। আর এই চুইংগামের এতই ক্ষমতা,সহজে ছাড়ানো যাবে না!
মাথা ন্যাড়া না করা অবধি রক্ষে পাবে না পোল্ট্রিটা। পৈশাচিক আনন্দে হাসল ও। দুহাত ঝেরে,নিজের সীটে ফেরার জন্যে পিছু ফিরল, তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল অমনি। ওর সিরিয়াল ছিল, সীট নং – E।
এবার সেখানে বসেছে সাদিফ। মারিয়ার তাজ্জব মুখটা দেখে হাত নেড়ে বলল – “ হ্যালো,মিস ম্যালেরিয়া! চুইংগামটা এখানে লাগান প্লিজ! আমি এবার এই সীটে বসব।”
মারিয়ার চেহারা ছোট হয়ে বসল। নিজেই সীট থেকে চুইংগাম খুলে আনলো আবার। শয়তান ছেলেটার মাথায় এত বুদ্ধি! উফ। ও এগিয়ে এসে বলল,
“ আপনি এখানে কেন বসেছেন,আপনার সীট তো ওটা। এটা আমার সীট!”
সাদিফ আবার খোঁজার ভান করে বলল,
“ ওপ্স কিন্তু এখানেও আপনার নাম নেই।”
মারিয়ার অসহায় লাগল। এত হাড়েবজ্জাত ছেলে ও দুটো দেখেনি। কিন্তু লড়াই করার মতো এনার্জি এখন নেই। তাই মেনে নিলো চুপ করে। তবে ওর কাঁধব্যাগ ছিল মাথার ওপরের তাকের ভেতর ঢুকানো।
রুক্ষ স্বরে বলল,
“ সরে বসুন, ব্যাগ নামাব।”
সাদিফ ত্যারামি করে বলল,
“ আপনার কথায়? পারব না।”
মারিয়া বিড়বিড় করে ফের গালি দেয়। বাধ্য হয়ে ব্যাগ নামাতে যায় ওভাবেই। হাত দুটো ওপরে তুলল,তাকের ভাঁজে ঢুকাল, কিন্তু ব্যাগ বাঁধল না। সে কী,এখানেই তো রেখেছিল!
ওর চেয়ে বাসের তাক অনেকটা উঁচুতে। মারিয়া পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে যায়,ব্যাগ কোথায় আছে। নিশ্চয়ই বাসের ধাক্কায় এদিক-সেদিক নড়ে গিয়েছিল। হাত প্রায় কনুই সমান ঢোকাল,শরীরও এগোলো সাথে। তক্ষুনি দুষ্টুমি করে জোরসে একটা হাঁচি দিলো সাদিফ। অর্ধেক ভাঁজ হয়ে এলো ওর শরীরটা। মারিয়া ভাবল,সাদিফ ওকে ছুঁতে এসেছে। নিজেকে সরিয়ে নিতে গিয়ে শেল্ফ হতে হাত ছুটে গেল অমনি। শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না। তুরন্ত ঝুপ করে ওর কোলের ওপর পড়ে গেল মেয়েটা। হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল সাদিফ। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনায় চমকাল, থমকাল ওদের চোখমুখ। বড়ো বড়ো দৃষ্টিতে চশমার কাচ ভেদ করে সাদিফ চেয়ে রইল মারিয়ার পানে। ওর হাত কীভাবে যেন মেয়েটার কোমরে চেপে বসেছে। কীভাবে কীভাবে যেন আকড়ে ধরেছে ওকে। মারিয়া পাংশুটে মুখে একবার সাদিফকে দেখল,একবার নিজের সরু কোমর প্যাঁচিয়ে ধরা ওর হাত।
দুজনের এই বাকরুদ্ধ,বিব্রতকর পরিস্থিতির মাঝেই ধুপধাপ পা ফেলে লাফিয়ে বাসে উঠল রাদিফ। যেই সীটের ভেতরের দিকে চাইল, অমনি দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটা। ওর পায়ের শব্দে সাদিফ-মারিয়ার সৎবিৎ ফিরল এবার। ছিটকে উঠে এলো মারিয়া। সাদিফও ঠেলে কোল থেকে সরিয়ে দিলো ওকে। ড্যাবড্যাব করে একবার ভাইকে দেখল,আরেকবার মারিয়াকে দেখল রাদিফ। সন্দিহান গলায় বলল,
“ কী করছিলে তোমরা?”
লজ্জায়-অস্বস্তিতে চোখ খিচে পরের সীটে বসে পড়ল পড়ল মারিয়া। সাদিফ জানে ওর ভাই সুবিধের নয়। এক্ষুনি ঢোল পিটিয়ে সবাইকে বলে বেড়াবে। উঠে এলো তিরের বেগে।
ভাইয়ের হাতে একশো টাকার নোট দিয়ে বলল,
“ ধর এটা।”
“ ঘু্ষ? তাও এত কম! পাঁচশো দিলে একটা কথা।”
সাদিফ নাকমুখ কুঁচকে ফের টাকার নোট বদল করল। পাঁচশোই দিয়ে বলল,
“ যা দেখেছিস,কাউকে বলবি না।”
রাদিফ সহাস্যে মাথা নেড়ে বলল
“ ওক্কে বস!”
সাদিফ আবার জায়গায় বসল। এক পল পিছু চেয়ে দেখল মারিয়া মাথা নিচু করে আছে। অমনি দুষ্টুমি করে বলল,
“ এখন থেকে একটু কম কম খাবেন!”
মারিয়া মুখ তুলল। গমগম করে বলল,
“ কোন দুঃখে?”
“ দেখে বোঝা যায় না, আপনি এত ভারি!”
মেয়েটা কটমটিয়ে বলল,
“ আপনাকে দেখেও বোঝা যায় না,আপনি এত অসভ্য!”
সাদিফ তেড়েমেরে জবাব দিতেই যাচ্ছিল,জবা উঠতেই থেমে গেল অমনি। বিড়বিড় করে বলল,
“ পরে মজা বোঝাব।”
বাস আবার রওনা করেছে। পদ্মা সেতু পেরিয়ে এসেছে কিছুক্ষণ হলো।
তবে এইবার,বুক চওড়া করে সীটে বসেছে ইকবাল। তাও একেবারে সীট-A-3/4 সাড়িতে।
পদ্মা পাড় হওয়ার পর ব্যস্ত রাস্তা কম। তারওপর সুমনাদের এলাকা ক্ষেত-খামারে ভরতি। একেকটা সরু রাস্তার এক পাশে ধানের জমি,অন্যপাশে চিকণ নালার মতো।
সেই সাথে প্রচণ্ড বাতাস আর ছায়া। গাড়ির অর্ধেক লোক তখন ঘুমে জবুথবু। তবে এবার আর পিউ করিমুলের পাশে বসেনি। একা এক সীটে বসেছে জানলার পাশে।
ড্রাইভার হঠাৎ পিছু ফিরে বললেন,
“ ভাই,একটু এমার্জেন্সি,থামাব?”
প্রশ্নটা ধূসরকে করেছিল। পাশে ছিল ইকবাল। বলল,
“ ঘাটে যাওনাই মিঁয়া?”
“ তখন তো পায়নাই।”
ধূসর বলল, “ আচ্ছা,দাঁড়ান।”
বাস এক পাশে গিয়ে থামল। ধূসর পেছনে তাকিয়ে দেখল সব ঘুমে কাদা। এমনকি আমজাদ,আফতাব এদেরও খবর নেই। সেই ফজরে উঠেছিলেন! তাই বেশিসময় চোখ মেলে রাখতে পারেননি। শুধু জেগে আছে হাতে গোণা কয়েকজন। সাদিফ মোবাইলে ব্যস্ত! গেম খেলছিল। পুষ্প দেখছে জানলার বাইরে। মারিয়া ঘুম। আনিস-সুমনা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছেন। বিয়ের এতদিন পরেও এদের প্রেম একইরকম সতেজ!
ধূসর সবাইকে দেখার পর কোণাকুণি পিউয়ের দিকে চাইল। জানলা থেকে মাথা বের করে কিছু একটার ছবি তুলছে মেয়েটা। কৌতূহলে ভ্রু কুঁচকে নিজেও সেদিকে তাকাল ধূসর। সরষে ক্ষেতের মধ্যে একটা কাকতাড়ুয়া লাগানো। ও বুঝল না,এটার ছবি তোলার কী আছে?
ড্রাইভার উঠলেন সেসময়। সব দাঁত বার করে হাসতেই ধূসর বলল,
“ আপনি বসুন,এবার আমি চালাব।”
ভদ্রলোকের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ও বলল,
“ ভয়ের কিছু নেই। আমার ড্রাইভিং-এর হাত ভালো। এসব এলাকায় সার্জনও থাকবে না। আপনি বিশ্রাম নিন।”
“ কিন্তু ভাই…”
“ বললাম তো,ভয় নেই। আমার গাড়ি আমি নিজেই ড্রাইভ করি।”
ভদ্রলোক এ যাত্রায় একটু আশ্বাস পেলেও,পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হলেন না। প্রাইভেট কার আর বাস! দুটো হ্যান্ডেল করার সিস্টেম তো আর এক না। কিন্তু কী আর করা যাবে!
ফোস করে শ্বাস ফেলে A-1 এ এসে বসলেন তিনি। ইকবাল এই ফাঁকে নিজের ফোন বের করল। হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে ম্যাসেজ করল,
“ আই লাভ ইউ,মাই লাভ!”
কিন্তু পুষ্প অনলাইনেই নেই। পেছন ফিরে চাইল ইকবাল। পুষ্প ছিল C-1 এ বসে।
এদিক-ওদিক দেখছিল। হঠাৎ সামনে ফিরে ইকবালকে নিজের দিক তাকিয়ে থাকতে দেখেই চোখ পাঁকাল সে। ফোনে টেক্সট পাঠাল,
“ এভাবে বারবার পেছনে তাকাবে না। কেউ দেখলে সন্দেহ করবে।”
ম্যাসেজটা পড়ে এক টুকরো পোড়া শ্বাস ঝেরে সীটের সঙ্গে মাথা এলিয়ে রাখল ইকবাল।
ড্রাইভারকে সরিয়ে ধূসর এবার নিজে সেই সীটে বসেছে। সামনের চারকোণা ফ্রন্ট মিররটাকে হাত দিয়ে ঘুরিয়েছে কোথাও। যেখানে তার তামাটে মুখটা ভেসে উঠতে দেখেই নড়েচড়ে বসল পিউ। সুবিধেই হলো ওর। মানুষটাকে সোজাসাপটা দেখতে পাবে এখন!
বাস চলছিল হুহু করে ধেয়ে আসা বাতাস ছিড়ে-খুঁড়ে। পিউ আড়চোখ তুলে, মুগ্ধতার আবেশ মিশিয়ে ছোট্ট মিররে ভেসে থাকা ঐ শ্যামবর্ণ পুরুষকে দেখবে বলে তাকাল,অমনি ধক করে কেঁপে উঠল বুকটা৷ ধূসরের ঠান্ডা-ছুরির মতো চোখ দুটো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আয়নায় ফেলে রাখা আগেই। যেন কাউকে দেখছে সে, ভীষণ-গভীর মনোযোগে; স্বীয় চিকণ দৃষ্টির পরতে-পরতে লিখে রাখছে তাকে!
বাসের সাউন্ড সিস্টেমটা কম আওয়াজে চলছিল তখনো। ভিনদেশী ভাষায় গাইছিল ক লাইন,
পিউ হিসেব মেলাতে বসলো। ওর এখান থেকে আয়নায় ধূসরকে দেখা গেলে,ওনার ওখান থেকে কী ওকে দেখা যাচ্ছে? কিন্তু
মেয়েটা নিশ্চিত হতে পারল না,ধূসর ভাই ওকেই দেখছে কিনা! ওকে দেখবে এভাবে,সেই সময় বা সিগনাল কিছুই যে পায়নি এখনো। তবে ধূসরকে তো দেখতে পাচ্ছে, এই ঢেড়। পিউয়ের জন্যে এটুকুই যথেষ্ট। মেয়েটা সব ভুলে ওই আয়নাতেই চেয়ে চেয়ে রইল। ইকবাল চেষ্টা করছিল ঘুমানোর। রাত থেকে কী হবে না হবে সেই চিন্তায় দু চোখ এক করতে পারেনি। কিন্তু এখন ঘুম ধরা দেয় না। মাথাটা এদিক-ওদিক নাড়াতে গিয়ে নজর পড়ল পিউয়ের ওপর। কেমন বিবশ চোখে ধূসরের দিকে বারবার তাকাচ্ছে মেয়েটা। অমনি মিটিমিটি হাসল ইকবাল। হাসতে হাসতেই মাথা নাড়ল দুপাশে।
ড্রাইভার উৎফুল্ল স্বরে বললেন,
“ ভাই তো ভালোই চালান। অবশ্য আপনেরে দেখলেই বুঝোন যায়,ট্যালেন্ট অনেক।”
“ আমার বন্ধু না কাকা। ট্যালেন্ট তো থাকবেই।”
“ হ হ। রাস্তা বেশি নাই আর। এই কালভার্টের পরই বাজার। এরপর কাচা রাস্তা। বাস ওদিকে যাওন যাবে না। বাজারের পরই নামতে হবে মনে হয়!”
ধূসর হুইলের ওপর হাত ব্যস্ত রেখে বলল,
“ সবাইকে ডেকে দিন।”
ড্রাইভার দাঁড়িয়ে গলা তুলে বললেন,
“ চাচারা উঠেন,আইসা পড়ছি।”
এক ডাকে সবাই নড়েচড়ে উঠল। ওদিকে সুমনার বাবা ফোন করেছেন অনেকবার। ওয়াজিদ বললেন,
“ আব্বা,শুভ ওনারা বাজারেই আছে। নিতে এসেছে সবাইকে!”
ইকবালের গলার শিরা দাঁড়িয়ে গেল শুভর নাম শুনে। এবার তাকে আরো সজাগ থাকতে হবে। বাস ব্রেক কষল এক সাইডে গিয়ে। সুমনা ফোনে বলছিলেন,
“ আব্বা, এই তো লাল রঙের বাস। হ্যাঁ হ্যাঁ এই পাশে।”
আস্তে আস্তে সবাই নেমে দাঁড়াল। ড্রাইভারের ছুটি আপাতত। কোথাও ঘুরতে গেলে ডাকা হবে। আমজাদ,আফতাবের কানে কানে কী যেন বললেন। ভদ্রলোক জানালেনলিস্ট ধরেই কিনেছি ভাইজান! একদম চিন্তা নেই।”
ধূসর নেমে এসে দাঁড়ায়। দুহাত মেলে আড়মোড়া ভাঙে। আচমকা দেখল ইকবাল ওর দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে। কপাল কুঁচকে বলল,
“ হাসছিস কেন?”
“ সিগারেট কি পিউকে দেখাতে খেয়েছিলি?”
ধূসর জবাব দিলো না। শ্যামলা থুতনিতে হাত ঘষলো আরেকদিকে চেয়ে। ও নিজেই বলল,
“ পরীক্ষা নিচ্ছিস?
কী দেখছিলি,অপছন্দের জিনিস পছন্দের ধূসর ভাইয়ের হাতে দেখে পিউ কতটা বদলায়?”
এরপর বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল ইকবাল। কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
“ ধূসর! সারাটা পথ পিউ শুধু তোর দিকে চেয়েছিল। একবারও চোখ সরায়নি। বাসে ওর পুরো পরিবার বসে। তাও না! ভাবেওনি একবার কেউ দেখলে কী ভাববে!
যে মেয়ের পুরোটা জুড়ে তুই,সে এত অল্পতে নিজের জায়গা থেকে নড়বে না।”
ধূসর চুপ। কেবল আড়চোখ ঘুরিয়ে পাশ ফিরে চাইল। বাসের বক্স থেকে একেকটা লাগেজ বের করা হচ্ছে। দুপাশে পনিটেইল করা ষোড়শী মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই। নিজের লাগেজ নেয়ার জন্যে বেশ মনোযোগী সে।
ইকবাল ফের বলল,
“ এসব পরীক্ষা-টরীক্ষা নিয়ে লাভ নেই।
মেয়েদের বয়ঃসন্ধির প্রেম অনেক ভয়ানক হয়। মনে হয় না এর থেকে তুই এত সহজে বাঁচতে পারবি!”
“ বাঁচতে চাইছে কে!”
একটা ছোট্ট জবাব। বেরিয়ে এলো ওই নিরেট স্বর হতে। অথচ কিংকর্তব্যবিমুঢ় বনে গেল ইকবাল।
অস্পষ্ট বলল,
“ কী?”
হতবিহ্বল চোখ ঝাপটাল ছেলেটা। তবে উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ধূসর। বক্স থেকে বের করা নিজের কালো শোল্ডার ব্যাগটা তুলল কাঁধে। ইকবাল হেসে ফেলল এবার। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“ গেছে রে গেছে,হতচ্ছাড়াটা ডুবে গেছে! কংগ্রাচুলেশনস পিউপিউ ,কংগ্রাচুলেশনস! “
চলবে…
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৬
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ২৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৮
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪২
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৯