#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(২৫)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
সাদিফের কপালের এক পাশ ফুলে উঠেছে। যেন গোল আলুর চাষ করেছে কেউ। বাড়িটাতো মারিয়া মাথার এক পাশে মেরেছিল,রিয়াকশন এখানে কেন হলো কে জানে! মেয়েটা কাচুমাচু চেহারায় দাঁত দিয়ে নখ খুটতে খুটতে মাথা নিচু সাদিফকে দেখল আবার। চাদর নেই,তবে পরনে আলখাল্লা জুব্বাটা রয়ে গেছে এখনো।
আপাতত বসার ঘরে একটা তুখোড় শালিশ বসেছে। রাত-বেরাতে এই ঘটনার একটা যথাযথ সুরাহা যে চাই,আমজাদ দুইপাশে দুই ভাইকে নিয়ে বসেছেন সেজন্যে। বাকিরা দাঁড়িয়ে আছে যে যার জায়গায়। পুষ্পর চোখদুটো ফোলা ফোলা এখনো। কাঁদছিলই। শব্দ শুনে নেমে এসেছে। মাথা ব্যথা করছে এখন। কিন্তু ঘটনার ও কিছুই জানে না। পিউকে জিজ্ঞেস করবে সেই সুযোগও নেই। পিউকে সাদিফ তার ঘরে পাঠিয়েছে চশমা আনার জন্যে। ছেলেটার মাইনাসে প্লাসে ঝামেলা। কাছের-দূরের সবেতেই ঝাপ্সা দেখে।
সবার নীরবতার মাঝে জবা-ই প্রথম শব্দ তুললেন। রেগে রেগে বললেন,
“ আমার ছেলের যে এত অধঃপতন হবে,এ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। শেষমেশ কিনা বাড়িতে আসা গেস্টদের ভূতের ভয় দিচ্ছে। ছি ছি!”
জবা হা-হুতাশে মরে গেলেন।
সাদিফের মাথা আরো নত হয়ে বসলো। যা করেছে তা নিয়ে ওর আফসোস নেই,কিন্তু ধরা পড়েই যত সমস্যা। কাকে কী জবাব দেবে এখন! ভেবেছিল চুপচাপ ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়বে। কে জানতো নসীব এভাবে ঘুরে যাবে। উফ,বাইরে থেকেই গায়ের এসব খুলে আসতো যদি! যদি এই সস মাখা গ্লাভসটা খুলে ওখানেই ফেলে দিত,তাহলে আর ধরা পড়তে হতো না। ব্লান্ডার ব্লান্ডার, মস্ত বড়ো ব্লান্ডার।
আফতাব বললেন,
“ মন তো চাইছে তোর কান টেনে ছিঁড়ে দিই। হ্যাঁ রে,তুই এমন কী করে হলি? তোকে নিয়ে আমাদের ভাইদের কত গর্ব। কত নরম ভদ্র ছেলে তুই আমাদের। আর শেষে কিনা একটা মেয়েকে ভয় দিচ্ছিলি? ছি সাদিফ, ছিহ!”
মারিয়া মজা পাচ্ছিল। বেশ হয়েছে! একেই বলে শ্যাখরার ঠুকঠাক আর কড়াইয়ের এক ঘা।
কত বড়ো শয়তান, শয়তান সেজে ওকে ভয় দেখাচ্ছিল। যদি মরে যেত ? মারিয়ার ইচ্ছে করছে বাড়ি এখন গিয়ে আরো একটা মারতে।
জবা বললেন,
“ বড়ো ভাইজান, আপনি চুপ করে আছেন কেন? এ ছেলেকে একটা কঠিন শাস্তি দিন। যাতে এরকম বাঁদড়ানো আর না করে। একদম ধরে হাতপা বেঁধে রাখুন এখানে।”
সাদিফ মনমরা হয়ে মিনমিন করল,
“ সব দোষ আমার হবে কেন মা? সবই কি আমার দোষ! আমি তো দূর থেকে ভয় দেখিয়েছিলাম। কিন্তু
উনি যে বাড়ি মেরে আমার মাথা আলু করে দিলেন,সেটা? এক ঘন্টা বেহুশ ছিলাম আমি। বিচার করলে এই অর্ধহ-ত্যার বিচার আগে করতে হবে।”
মারিয়া উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ আমি কি আপনাকে সেধে মেরেছি? পিউয়ের মুখটাকে অমন ডাকাতের মতো চেপে ধরেছিলেন বলেই না মারলাম।
আর মারলেও বা, বেশ করেছি! অসভ্যের মতো ভয় দেখালেন তার বেলা? আমি তো ভয় পেয়ে হার্ট ব্লক হয়ে মরেও যেতে পারতাম।”
“ যেতেন। কে আটকেছিল?”
“ সাদিইইইফ! এসব কী কথা?”
“ দেখেছেন আন্টি? কী খারাপ লোক দেখেছেন?”
সাদিফ হিঁসহিঁসিয়ে উঠল,
“ আপনি একদম চুপ থাকুন,ম্যালেরিয়া!’’
“ আপনার কথায় চুপ থাকব?”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, এটা আমার বাড়ি।”
“ বাড়ি আপনার হলেই কী আপনার সাত খুন মাফ হয়ে যাবে? কী আশ্চর্য!’’
সাদিফ চিড়বিড় করে বলল ,
“ আপনাকে আমি কী করব,আমি কিন্তু নিজেও জানি না…”
“ ওহ হো,আর আমি বুঝি আপনাকে ছেড়ে দেব? অবলা মেয়ে ভাবছেন আমাকে?”
“ সে আপনি কোন বলা দেখে নিয়েছি। ভূতের ভয়ে মা,বাপ ভাইয়ায়ায়ায়া বলে দৌড়ে পালিয়েছেন।”
দুটোতে ভুলেই বসেছিল বসার ঘর মানুষ দিয়ে ভরতি। ধাওয়া পালটা ধাওয়া চলছিল সমানে। সবাই হাঁ করে একবার মারিয়াকে দেখলেন,একবার সাদিফকে। জবা মুখে হাত দিয়ে ফিসফিস করলেন,
“ আপা,মেজো আপা এ আমি কোন সাদিফকে দেখছি? আমার ছেলেটা এমন ঝগড়ুটে হলো কবে থেকে? এ নিশ্চয়ই কেউ পালটে দিয়েছে আপা। কেউ নিশ্চয়ই পালটে দিয়েছে।”
মারিয়া-সাদিফ লড়ছিল তখনো। সাদিফ অনেকটা এগিয়েও এসেছে। ঠিক তক্ষুণি,আমজাদ হাত তুলে গর্জে উঠলেন,
“ আহ,চুপ করো!”
মূহুর্তে থেমে গেল ওরা। নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল বসার ঘর। মারিয়ার মাথায় এলো এটা মানুষের বাড়ি। জিভ কেটে মাথা নুইয়ে নিলো ত্রস্ত। আমজাদ খুব কঠিন চোখে বললেন,
“ তোমাদের আমি পরে দেখে নিচ্ছি!”
তারপর সোজাসুজি চাইলেন অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক শ্যামলা যুবকের দিকে। পিলারের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে যে। নির্লিপ্ত চোখমুখ যার। এত কিছু ঘটে গেল কিন্তু ধূসরের মুখ থেকে একটা টু শব্দও বের হয়নি এতক্ষণ।
ঠিক তক্ষুণি আমজাদ সরাসরি বললেন,
“ আগে তুমি বলো ধূসর,তোমার কাছে পিস্তল এলো কোত্থেকে?”
অমনি চমকে চাইল ধূসর। দাঁড়াল সোজা হয়ে। ছেলেটাকে সহজে চমকানো যায় না। সব সময় কেমন দ্বায়সারা চোখমুখ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাই আমজাদ আজ ভারি উপভোগ করলেন এদৃশ্য । বাঁকা হেসে বললেন,
“ নিজেকে খুব চালাক ভাবো, তাই না?”
ধূসর কপালে ভাঁজ ফেলে চাচার দিকে চেয়ে রইল। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে ভাবল কিছু একটা!
এদিকে বসার ঘরে বাজ পড়েছে। ছোটোদের চক্ষু চড়কগাছ,আর বড়োদের চোখ কপালে। সবাই সব ভুলে ঠোঁট ফাঁকা করে ঐ একজনের দিকেই চেয়ে রইল এবার।
আফতাব হতবুদ্ধির ন্যায় আওড়ালেন,
“ পিইইস্তল? ওর কাছে পিস্তল আছে!”
“ তুমি জানতে না?”
দুইপাশে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক। আমজাদ রুবার দিকে চাইলেন,
“ তুমি জানতে?”
তিনিও মাথা দোলান। মিনাকে বললেন,
“ আর আপনি, সারাক্ষণ ছেলে ছেলে করে ঘুরে বেড়ান যিনি,আপনি জানতেন এ কথা?”
মিনার মুখটা আগে থেকেই শুকনো। চিবুক নামাতেই তুচ্ছ হাসলেন আমজাদ,
“ বাহ,তাহলে দেখছি কেউই জানতো না। ভালো,ভালো! অবশ্য সন্তান গোল্লায় গেলে তো আর জনে জনে বলে যাবে না। এভাবেই একা একা যাবে। আর সাথে ছোটোগুলোকেও নিয়ে যাবে। নাহলে বাড়ির অন্যতম পলাইট ছেলেটাও এভাবে মেহমানদের ভূত সেজে ভয় দেখায় কখনো? কোত্থেকে শিখছে এসব? বড়ো ভাইকে দেখেই। বলে না,নৌকার সামনের মাথা যেদিকে যায়,পেছনেরটাও সেদিকে ধায়। এইত, উদাহরণ সামনেই আছে।”
জবা ছোটো গলায় বললেন,
“ কিন্তু ভাইজান,সাদিফ তো কচি বাচ্চা না। ধূসর এখানে কী করল?”
আমজাদ চ্যাঁচিয়ে উঠলেন অমনি,
“ কী করল আবার প্রশ্ন করো?
সন্ত্রাসী ও! কোমরে পিস্তল নিয়ে ঘুরছে কেন? আবার বাড়ির সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছে। ক্যানো,কী জন্য? ও কি ডাকাত দলের সর্দার? এজন্যে ওকে বিলেতে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচা করে পড়তে পাঠানো হয়েছিল,যাতে দেশে ফিরে বন্দুক হাতে ঘুরে বেড়ায়?”
চেয়ারের হাতলে কনুইয়ে ঠেস দিয়ে,দুই আঙুলে কপাল গুঁজলেন আফতাব। হতাশ তিনি! ভাইজান ক্ষেপেছেন। এখন ধূসরও খেপবে। তারপর জবাব দেবে মুখে মুখে। আর তারপর একটা যুদ্ধ হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। পিউ সাদিফের চশমা নিয়ে নেমে এলো দ্রুত। বাবা এত চ্যাঁচাচ্ছেন কার সাথে? যখন বুঝল,ঘটনা ধূসরের ওপর ঘুরে গেছে, মুখটা চুপসে গেল অমনি। গিয়ে রাদিফের পাশে দাঁড়াল ও। জিজ্ঞেস করল ফিসফিসিয়ে,
“ কী হয়েছে রে?”
রাদিফ হইহই করে বলল,
“ ধূসর ভাইয়ের কাছে পিস্তল আছে। ঢাই,ঢাই,ঢাই!”
পিউ আঁতকে উঠল। বিকট চোখে চাইল ধূসরের দিকে। ঢোক গিলে ভাবল,
“ পিইইইইইস্তল?
হায় আল্লাহ,ও তো মাত্র একবারই খাতায় পুকি লিখেছিল। সেটার বিরুদ্ধাচারণ করতে প্রকৃতি এভাবে উঠেপড়ে লেগে গেল ক্যানো?”
ধূসর জিভে ঠোঁট ভেজায়। ভেবে ভেবে বুঝে যায়,বড়ো চাচা কীভাবে দেখে ফেলেছেন। ও যখন ফ্লোরে বসে সাদিফের মুখে পানি ছেটাচ্ছিল,আমজাদ তখন ওর পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখনই হয়ত বা! এমনিতেও সাদিফ জ্ঞান হারানোর তাড়াহুড়ায় ও ঠিক করে পিস্তল হোলস্টারে গুজে রাখতে পারেনি। আমজাদ বললেন,
“ কী হলো,চুপ করে আছো কেন? ধরা পড়ে মাথা কাজ করছে না,তাইত!”
ধূসর ফোস করে শ্বাস ফেলে। বেশ শান্ত গলায় বলে,
“ চাচ্চু এটা লাইসেন্স প্রাপ্ত। ফর মাই সেইফটি ,আমি এটা সাথে রেখেছি। এতে বিশেষ কিছু নেই যার জন্যে আপনার এত উত্তেজিত হওয়া উচিত!”
আমজাদ ভয়ানক রেগে গেলেন। তড়াক করে দাঁড়ালেন বসা থেকে। বাজখাই গলায় বললেন,
“ কী উচিত,, না উচিত তুমি আমায় শেখাবে? কতটুক বয়স তোমার,কী এমন মহাকাজ করছো যার জন্যে সেইফটির দরকার? এত কীসের সেইফটি যে প্যান্টের ভেতর পিস্তল রাখতে হয়! শেখাচ্ছ আমায়? দুনিয়া শেখাচ্ছ? পুচকে ছেলে,নাক টিপলে দুধ বের হবে। ও আমাকে শেখায়। তুমি আমার ভাইয়ের ছেলে নাহলে,চড়িয়ে সব দাঁত ফেলে দিতাম!”
পুরো বসার ঘর থমকে গেল। পিউয়ের বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম করছে। ভয়ে-আতঙ্কে ওষ্ঠাগতপ্রাণ! একবার কাঁপা চোখে বাবাকে দেখল,আরেকবার ধূসরকে। আনিস অস্থির হয়ে বললেন,
“ ভাইজান,ভাইজান শান্ত হন! প্রেসার বেড়ে যাবে।”
হাতটা ঝারা মারলেন আমজাদ। ফুঁসতে ফুঁসতে দেখছিলেন ধূসরকে৷ আফতাব বললেন,
“ হলো? একটা না একটা অশান্তি তোমার করতেই হবে!”
ধূসর চাচাকে বলল,
“ আপনার সমস্যাটা আমার পিস্তল নিয়ে,নাকি অন্য কিছু?”
“ অন্য কিছু মানে!”
“ আমি আপনাকে চিনি। আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন,এসব কিছু আমার কাজের জন্যে হচ্ছে। যেহেতু আমি পলিটিক্যাল ইস্যুতে জড়িত তাই আমার প্রাণ সংশয় আছে। এইত?”
“ যদি এরকম ভাবিও,ভুল তো ভাবব না। তোমার এইটুকু বয়সে এত শত্রু কোত্থেকে আসবে যারা তোমাকে প্রাণে মারতে চাইবে? কোত্থেকে জুটাবে তাদের? বলো? পলিটিক্সে কী কী হয় না হয় আমরা জানি না,আমরা বাচ্চা?”
“ না জানেন না। আর আমি আপনাদের বিস্তারিত জানাতেও চাই না। ওয়েপন রাখা এমন আহামরি কিছু নয়। ছোটো চাচ্চু আইনের লোক,ওনার থেকেই শুনুন। আমার ইচ্ছে হয়েছে আমি এটাকে সাথে রেখেছি। এ নিয়ে আমি কাউকে আর কোনো কৈফিয়ত দেবো না।”
আফতাব ফুঁসে উঠলেন,
“ আবার! ভাইজানের মুখে মুখে আবার তর্ক করছো ধূসর? কী চাও,বাবা এই বয়সে তোমাকে ধরে পেটাই?”
আমজাদও ভয়ানক চটে বললেন,
“ দেখেছ,কত বেয়াদব?”
আনিস বললেন,
“ ধূসর, তোর মাত্র ২৭ বছর বয়স,এই বয়সে তো…”
ধূসর চোখের ইশারায় কথা এগোতে মানা করল। অমনি থেমে গেলেন আনিস। আমজাদ খেয়াল করতেই বললেন,
“ কী বললে, এই তোমরা চোখে চোখে কী বললে?”
“ না মানে ভাইজান,লাইসেন্স করে পিস্তল রাখা ওরকম কিছু না।”
“ আনিস,তুমি কি আমাকে ঘাস খাওয়া গোরু ভাবো? ২৭ বছরের ছেলেকে কোন আইন লাইসেন্স প্রাপ্ত বন্দুক দেয় হ্যাঁ? এই পিস্তল আসলে কার আমি জানতে চাই।”
ধূসর চোখ বুজে শ্বাস ফেলল।
ফের শক্ত গলায় বলল,
“ আমি এ নিয়ে কোনো জবাব দেবো না।”
“ বেয়াদব! কত বড়ো সাহস ওর? থাপড়ে কান ফাটিয়ে দিতে হয়। এই তুমি আমার সামনে থেকো যাও,ধূসর। আমার তোমাকে সহ্য হচ্ছে না। যাও,এক্ষুনি যাও।”
এক কথায় ধূসর হনহন করে ঘরের দিকে হাঁটা ধরল। কোনো কাকুতি মিনতির লক্ষ্মণ, কিংবা কোনো সৌজন্যতা ঐ হাঁটায় নেই। ভদ্রলোক আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“ দেখলে,ওর হাবভাব দেখলে? হাঁটার ভঙ্গিমা দেখলে? ও কী নিজেকে হিরো মনে করে হ্যাঁ!”
মিনা কাচুমাচু করে বললেন,
“ আহা হয়েছে তো! সবাই মিলে বকলেন তো। খেলোও না। শুধু শুধু ছেলেটাকে…”
আমজাদ কড়া চোখে চাইতেই,ভদ্রমহিলা কথা গিলে চুপ করে গেলেন। আফতাব টেনেটুনে ওনাকে বসালেন ফের। আনিস পানি এগিয়ে দিলেন। পিউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওপর তলায় চাইল৷ ইস,ধূসর ভাইয়ের নিশ্চয়ই খুব মন খারাপ হলো। সবার সামনে এত ঝারি খেয়েছে,হবেই তো। ও কি যাবে একটু সান্ত্বনা দিতে? কিন্তু পিউয়ের সাহস হলো না। মানুষটা যা রাগী! যদি ওকেই ধমকে দেয়?
তবে ধ্যান ফিরল রাদিফের কথায়। হূলস্থুল বাঁধিয়ে বলল,
“ বড়ো চাচ্চু, ভাইয়ার কোনো বিচার হলো না তো!”
সাদিফ কটমট করে চাইল ওর দিকে। এটা ছোটো ভাই? না শত্রু!
আফতাব বললেন,
“ হ্যাঁ ভাইজান,ও ছেলের কথা বাদ দিন। এবার এটা শেষ করুন। অনেক রাত হয়েছে।”
আমজাদের মাথা থেকে ধূসরের বিষয় যাচ্ছিল না। কিন্তু এটারও সুরাহা দরকার।
গলা ঝেরে বললেন,
“ সাদিফ,কেন করেছ এসব?”
সাদিফ ছোটো করে বলল,
“ সরি চাচ্চু!”
“ এটা প্রশ্নের উত্তর হলো না। একা একটা মেয়েকে মাঝরাতে এসব উদ্ভট জামাকাপড় পরে ভয় দেখিয়েছ,তোমার সাথে এসব যায়? আমি তোমার কাছে এগুলো আশা করিনি। হতাশ করলে আমাকে।”
সাদিফ বুঝল চাচা কষ্ট পেয়েছে। মাথা নিচু করে এগিয়ে এলো। আনিসের কাছে এসে আরো আনত হয়ে বলল,
“ আম রেইলি ভেরি সরি চাচ্চু। আমাকে ক্ষমা করে দিন”
আনিস বিব্রত মুখে ওর শরীরটা ধরে আমজাদের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন,
“ ভাইজান ওদিকে।”
সাদিফের টনক নড়ল । জিভ কেটে বলল,
“ সরি আসলে চশমা নেই তো!”
পুষ্প,মারিয়া, রাদিফ ফিক করে হেসে ফেলল অমনি। পিউয়ের হাসি এলো না ধূসরের শোকে। তবে খেয়াল করল,ওর হাতে এখনো সাদিফ ভাইয়ের চশমা। তুরন্ত ছুটে গিয়ে চশমা এগিয়ে দিলো সে।
“ সরি ভাইয়া,দিতে মনে নেই।”
সাদিফ চশমা চোখে দেয়।
পরনে ইয়া বড়ো ঢিলেঢালা সাদা জুব্বাটার অর্ধেক মাটিতে ঝুলছে। মাথার চুল আলুথালু। কপালের এক পাশ ফোলা,চোখে চশমা পরা ছেলেটাকে দেখে মারিয়ার মনে হলো, সত্যিই ওর দেয়া নাম সার্থক হয়েছে আজ।
আমজাদ বললেন,
“ আমাকে এসব সরি টরি বলে লাভ নেই। অন্যায় যার সাথে করেছ সরি তাকে বলো যাও।”
আঁতকে চাইল সাদিফ। ও সরি বলবে,ম্যালেরিয়াকে? অসম্ভব! কিন্তু এই অসম্ভব মুখে আনতে পারল না। ভদ্র ছেলের মতো মাথা কাত করে মারিয়ার দিকে ইউটার্ন নিলো সে। দাঁড়াল গিয়ে মুখোমুখি। তবে কটমট করে বলল,
“ সরি মিস মারিয়া!”
মারিয়া ঠোঁট চেপে হাসে। পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে বলে,
“ ইটস ওকে।”
সাদিফ ক্ষুব্ধ চোখে চেয়ে রইল৷ মারিয়া সন্তর্পণে বিড়বিড় করে বলল,
“ এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই৷ পরেরবার আমাকে হেনস্তা করতে এলে গায়ে একটু স্ট্যামিনা বাড়াবেন। নাহলে কড়াই আর হাত,দুটোতে যা জোর! সব সময় কিন্তু টার্গেট মিস হবে না।”
সাদিফ নিজেও হাসল। বলল,
“ আমার স্ট্যামিনা যেদিন দেখাব,কেঁদে কূল পাবেন না।”
“ এই আবার কী বলছিস ওকে?”
মারিয়া ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“ সরি বলছে আন্টি। খুব বিনয়ী লোক যে!”
আনিস বললেন,
“ তাহলে সব মিটলো? যাই, এবার তাহলে শুতে যাই, কী বলেন ভাইজান! সাদিফ যা ফ্রেশ ট্রেস হয়ে ঘুমা।”
“ দাঁড়াও দাঁড়াও, এখনো শেষ হয়নি।”
সবাই আবার আমজাদের দিকে চাইল এই কথায়। সাদিফ বলল,
“ সরি তো বললাম চাচ্চু!”
“ সরি নাহয় বলেছ,কিন্তু গেস্ট রুমের বৈদ্যুতিক তার গুলো যে কেটে দিয়েছ তার কী হবে?
গরমে ঘুমোবে কীভাবে মেয়েটা?”
“ কীই এই বাঁদড়ামোও করেছে? আমার জুতোটা কি তুই পায়ে রাখতে দিবি না বাবা?”
মায়ের হুমকিতে সাদিফ চুপসে থাকে। আমজাদ বলেন,
“ সাদিফ,তুমি আজ রাতে গেস্টরুমে ঘুমাও। আর মারিয়া যাও,সাদিফের রুমে ঘুমাও। যে অকাজ করেছে,গরম সেই উপভোগ করুক।”
সাদিফের সাদা মুখ লাল হয়ে উঠল। যেন এক্ষুনি কেঁদে দেবে ছেলেটা। ওর ঘরে,ওর ঘরে ম্যালেরিয়া ঘুমোবে? ইয়াক, না!
মারিয়া নিজেই আপত্তি জানাল এবার,
বলল,
“ আঙ্কেল, আমি বরং পুষ্পর ঘরে শুই?”
“ আচ্ছা শুতে পারো। তবে সাদিফ আজ রাতে এখানেই ঘুমাবে দিস ইজ ফাইনাল।”
মিনা বললেন,
“ একটু বেশি হয়ে যায় না?”
রুবাও সাফাই দিলেন একটু। আমজাদ চোখ রাঙালেন দুজনকেই। শেষ ঘোষণা দিয়ে ঘরের পথ ধরলেন পরপর। বাকি ভাইয়েরাও পিছু পিছু চললেন।
জবা বিড়বিড় করলেন,
“ ঠিকই আছে! যেমন গাল তেমন চড়।”
সাদিফ মহাবিপন্ন হয়ে বলল,
“ কিন্তু মা,আমি এসি ছাড়া ঘুমোতে পারি না।”
“ সেটা এসব করার আগে মনে রাখা উচিত ছিল। এখন রাত জেগে বসে বসে তার জোড়াতে থাক।”
সাদিফকে রেখে সবাই আস্তে আস্তে ঘরের দিকে গেল। শুধু পিউ এসে বলল,
“ তোমাকে যে কোন ভূত ধরল,সাদিফ ভাই! কী দরকার ছিল এসব করার?”
সাদিফকে দেখে অনুতপ্ত মনে হলো না। বরং গমগম করে বলল,
“ বেশ করেছি৷ ওটাকে কেউ চিনিস? পিউ শোন,মেয়েটা সুবিধার না। তুই কিন্তু এত গলে যাস না ওর প্রতি। হাড়েহাড়ে শয়তান,দেখেশুনে রাখিস! “
পিউ পড়ল চিন্তায়। মারিয়া হাড়েহাড়ে শয়তান? সে কী!
সাদিফ গজগজ করতে করতে গেস্টরুমে ঢুকল। এই রুমে এত গরম! পরনের জুব্বা খুলে গেল গোসলে। কিন্তু ওয়াশরুমে তো আলো নেই। কী মুশকিল,কপাল চাপড়াল ছেলেটা! কে বলেছিল তার কেটে দিতে? কোথায় ভাবল,ভয় দেখাবে। আর আতঙ্কে ম্যালেরিয়াটা ভেগে যাবে সকালে। ধুর!
বিছানায় একটু শুতেই গরমে অস্থির হয়ে গেল সাদিফ। এসি,ফ্যান কিছুই চলে না। বাইরে থেকে বাতাসও আসে না। সাদিফ বেরিয়ে এসে বলল,
“ পারভীন আপা,হাতপাখা আছে?”
পারভীন নিজের ঘর হতে জানাল,
“ ভাইজান আপনেরে পাখা দিতে সেজো খালায় মানা করছে!”
সাদিফ কাঁদোকাঁদো চেহারায় কামরায় ফিরে এলো আবার। গায়ে গেঞ্জি রাখা দুষ্কর। ওটাও খুলে ফেলল। সফেদ বুক-পিঠ ছুঁয়ে নেমে যাওয়া ঘাম মুছতে মুছতে বিড়বিড় করল,
“ ঘুমান ম্যালেরিয়া, ঘুমান আজকে। আপনার এই আরামের ঘুম যদি হারাম না করেছি,নিজের নাম বদলে রেখে দেবো।”
***
আজ বৃহস্পতিবার। শিকদার বাড়ির বরিশাল যাওয়ার দিন। আর এ নিয়ে
গোটা নিবাস যেন চঞ্চল পাখির ডানায় ভর করেছে। সকাল থেকে ব্যাগ গোছানো আর তৈরি হওয়ার হৈচৈ-এ রমরমে অবস্থা। আজমল রাস্তা থেকে উঠবেন। যাওয়ার জন্যে
একটা লাল রঙের রাইডার বাস ভাড়া করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২৯ আসন বিশিষ্ট এটা। লোকও তো কম নয়! ওনাদের সাথে ওয়াজিদও যাচ্ছেন। শুভ আর দোলা আগেই গ্রামে চলে গেছে। ওয়াজিদ ছুটি নিয়েছেন গতকাল,যাবেন আজ। তবে রওনা করার তাগিদ
গৃহীনিদের বেশি। মিনা,রুবায়দা,জবা,সুমনা ঘুরে ঘুরে পুরো বাড়ির জানলা,দরজা সব আটকালেন। বসার ঘরের লাইটটা জ্বলবে,বাকি সব সুইচ অফ রাখা হলো। গৃহকর্মীদের মধ্যে পারভীন আর মুরিদ যাচ্ছে। থাকছে কেবল গেইটের রক্ষী দুজন। বাস হাজির হয়েছে ভোর ছটায়। নাস্তা করারও ফুরসত নেই যেন। এতটা রাস্তা,জ্যাম থাকলে তো কথাই নেই। তারওপর বাচ্চাকাচ্চাদের ইচ্ছে পদ্মা নদী কাছ থেকে দেখবে। সেখানেও বাস দাঁড়াবে কিছুক্ষণ। সব মিলিয়ে খুব হূলস্থুল বাঁধিয়ে একেকজন রওনা শুরু করল। যে যেভাবে পারল,লাগেজ তুলল হাতে।
আমজাদ লাগেজ ভাগে পাননি। তাই বড়ো ক্যারি ব্যাগটা নিতে গেলেন। কিন্তু হাতে তুলতেই দম ছুটল এক চোট। মিনার দিকে চেয়ে বললেন,
“ এত ভারি ক্যানো? আস্ত বাড়ি ভরেছ নাকি এর মধ্যে?”
ভদ্রমহিলা মৃদূ রুষ্ট গলায় বললেন,
“ কী আক্কেল! আপনিই না বললেন বাসে চা-টা খাবেন! সেজন্যে ফ্লাস্ক আর কাপ নিয়েছি।”
“ কাপ টেনে নিতে হয়? ওয়ান টাইম নিয়ে নিতাম।”
“ আপনারা ওয়ান টাইমে খান?”
আমজাদ কথা বাড়াতে পারলেন না। স্বামীর ভোঁতা চেহারা দেখে মিনা ‘হুহ” বলে মুখ বেঁকালেন। মাথায় আঁচল টেনে বললেন,
“ মুরিদকে পাঠিয়ে দিই! দাঁড়ান।”
মুরিদ সকাল থেকে ব্যাগপত্র টানছে। বেচারাকে আর কত খাটাবে? আমজাদ নিজেই আবার নিতে গেলেন ব্যাগটা। পেছন থেকে হঠাৎ কেউ এসে হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সামনে হেঁটে গেল। ভদ্রলোক ভড়কে গেলেন। একবার নিজের হাতে দেখে, আবার ফিরলেন সামনে। ধূসরের এক কাঁধে কালো বড়ো পিঠব্যাগ,আর বা হাতে ওনার ক্যারি ব্যাগটা। তড়বড় করে হেঁটে যাচ্ছে সে। আমজাদ ফোস করে শ্বাস ফেললেন।
বিড়বিড় করলেন,
“ একটা কথাও শোনে না,আবার দরদ দেখো!”
মারিয়া বেছে বেছে যে পাশে রোদ পড়বে না,তেমন একটা সীট বেছে বসেছে। পাশেরটা খালি রেখেছে পুষ্পর জন্যে। এর মাঝেই দুজনের জমে গেছে ভারি! সাদিফ বাসের ভেতর এলো সেসময়। ওকে দেখেই মুখটা ঘুরিয়ে নিলো মারিয়া। সাদিফের পর ঢুকতে যাচ্ছিল,রাদিফ। কিন্তু পিঠে গিটারের ব্যাগটার জন্যে দরজায় বেজে যাচ্ছে বেচারা। বিপদগ্রস্থ ছেলেটাকে দেখে মারিয়া নিজেই উঠে এলো। ওর পিঠ থেকে গিটারের ব্যাগ খুলে হাতে নিতেই,ফুরফুরে ভঙ্গিতে হাসল রাদিফ। বলল,
“ ইউ আর সো সুইট, মারিয়াপু।”
“ তুমি এত ছোটো মানুষ হয়ে এত ভারি গিটার নিয়েছ কেন? হাঁটতেই তো পারছিলে না।”
“ আরে ওসব কোনো ব্যাপার না। ক্লাস নাইনে পড়ি,অতও ছোটো না আমি। যাও, গিয়ে বসো তুমি।”
মারিয়া ফেরার জন্যে ঘুরল,তব্দা খেল অমনি। ওর সীট দখল করে বসে আছে সাদিফ। একটায় নিজে বসেছে,আরেকটায় দুই পা মেলে দেয়া। মারিয়া ছুটে এসে বলল,
“ এটা আমার সীট!”
সাদিফ তৎপর হয়ে সীটের গায়ে কী যেন খুঁজল। মাথা নুইয়ে,ঝুঁকিয়ে সব খানে উঁকি দিয়ে বলল, কই? কোথাও তো ম্যালেরিয়া লেখা নেই।”
মারিয়া কটমট করে বলল,
“ অসভ্য একটা!”
“ সেম টু ইউ!”
মারিয়া হার মানল আজ। যাদের বাড়ি থাকছে,তাদের ছেলের সঙ্গে এত ঝগড়া করা ভালো দেখায় না। তাই নিজের কাঁধ ব্যাগটা নামিয়ে নিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে গিয়ে অন্য সীটে বসল সে। বিজয়ী হাসল সাদিফ। ক্যাপ দিয়ে মুখ ঢেকে চোখ বুজে প্রস্তুতি নিলো একটা আরামদায়ক ঘুমের।
পিউ হাঁটছিল বারবার পিছু দেখতে দেখতে। ধূসর ভাই এখনো বাড়ি থেকে বের হননি। সে বাসের কোন সীটে বসবে ওটা দেখেই না ত নিজের জন্যে একটা জায়গা বেছে নিতো পিউ। কিন্তু তার তো খবরই নেই আজ।
ঠিক সেসময়ই বেরিয়ে এলো ধূসর। মূহুর্তে লম্বা লম্বা পা ফেলে ওর পাশ কাটিয়ে গেল।
পিউ খেয়াল করল,তার দুই হাতেই দুটো ভারি ভারি ব্যাগ। মায়ায় হুহু করে উঠল মেয়েটার বুক খানা। একটা মানুষ দুটো ব্যাগ টানছে? আর কেউ দেখছেও না! না,ওনার ওপর সব খেয়াল শুধু পিউকেই রাখতে হয়।
মেয়েটা ছুটে এলো তড়িৎ। দরদে উত্থলে পড়ে ডাকল,
“ ধূসর ভাই!”
হাঁটতে হাঁটতেই পাশ ফিরে চাইল ধূসর। পিউ বলল,
“ আপনি একা মানুষ দুটো ব্যাগ নিয়েছেন! আমাকে একটা দিন,আমি নিয়ে দিই। সত্যি বাবা,বাড়ির কারো কোনো চিন্তাই নেই। এই ব্যাগ কি আপনি একা বইতে পারেন? দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে কত ভারি!
কী আশ্চর্য!”
ধূসর জবাব দিলো না। পিউ আরো নরম সুরে বলল,
“ আমায় দিন না ধূসর ভাই।”
“ নিজের কাজে যা।”
“ আমার কাজেই তো আছি। দিন না আমায়।”
“ না।”
“ আহা, এমন করছেন ক্যানো? দিন না। আপনি কী ভাবছেন আমি সাইজে ছোট দেখে,গায়ে শক্তি নেই? প্রতিদিন একটা সেদ্ধ ডিম খাই। ঘুমানোর আগে এক গ্লাস দুধ খাই। শাকসবজি মাছ মাংস সব খাই। আমার গায়ে অনেক শক….”
ওর বকবকের মাঝেই ধূসর ঝুপ করে নিজের শোল্ডার ব্যাগটা পায়ের কাছে ফেলল।
কথা থামিয়ে চাইল পিউ। ধূসর ভ্রু দিয়ে ইশারা করে। ব্যাগ নিতে বোঝায়। মহা আনন্দে খলবলিয়ে উঠল পিউ। স্ফূর্ত চিত্তে মাটি থেকে ব্যাগ তুলতে গেল,কিন্তু শরীরটা হাওয়া ছেড়ে দিলো মূহুর্তে। এত্ত ভারি! এটা ওর মতো দশটা পিউ এলেও তুলতে পারবে কিনা সন্দেহ।
করুণ চোখে চাইল মেয়েটা। ধূসরের মুখটা শক্ত দেখে আর কথা বাড়াতে পারল না।
খিচে ব্যাগের হাতল ধরে এক টান মারল,ব্যাগ এক ইঞ্চিও ওপরে তোলা গেল না। পিউ আবার চোরা চোখে চাইল। এক হাতে ক্যারি ব্যাগ নিয়ে,আরেক হাত পকেটে গুযে কপাল কুঁচকে চেয়ে আছে মানুষটা। ও তাকাতেই ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ কী? তোল!”
“ তু-তুলছি।”
পিউ মহাবিপদে পড়েছে। এত বড়ো বড়ো কথা বলল এতক্ষণ,না পারলে ইজ্জত থাকবে না। চোখ বুজে গায়ে শক্তি আনল। জোরসে ‘’ ইয়া আলী” বলে এক টানে ব্যাগটা তুলে কাঁধে নিতে গেল,ব্যাগের ভারে পা টালমাটাল হয়ে চক্কর কেটে ধপাস করে পড়ে গেল মাটিতে।
পেছনে জবা আসছিলেন। এই দৃশ্যে অদূর হতেই খিলখিল করে হেসে উঠলেন তিনি। হাসতে হাসতেই বললেন,
“ পিউ, এসব নেয়া কি তোর কম্য রে মেয়ে?”
পিউ মুখ অন্ধকার করে ধূসরের দিক চাইল আবার। মানুষটা হাসল না। কিছু বললও না। যেন জানতো এটাই হবে। পিউয়ের মতো পুঁটি মাছের থেকে এসবই আশা করা যায়। শুধু মাটি থেকে ব্যাগটা তুলে ফের কাঁধে নিয়ে হেঁটে গেল সামনে। জবা এসে ওকে তুললেন৷ পিউ কামিজের ধুলো ঝারলো। ঠোঁট উলটে ভাবল,
“ ক্যানো যে যেচে মান-সম্মান খোয়াতে এসেছিলাম! ধুর…”
***
পুষ্প জানলা থেকে একবার বাইরেটা দেখল। বুকের ভেতর সুদ্ধ হুহু করে উঠল প্রিয় সেই পুরুষের তরে। ইকবালের সাথে কতগুলো দিন দেখা হবে না,কথা হবে না। তাও ছেলেটা এত নির্বিকার! সে তো জানতো,আজ যাচ্ছে ওরা।
তাও একবার দেখা করল না? কথাও বলল না?
ইকবাল তবে সত্যিই মাই লাভকে ভুলে যাচ্ছে!
পুষ্পর চোখ ফেটে কান্না আসতে চাইল। ফাঁকা ঘর হলে হাউমাউ করে উঠতো নির্ঘাত। নেহাৎ বাস ভরতি মানুষ বলে!
পুষ্প এক পল পেছনে চাইল৷
আমজাদ,আনিস,আফতাব তিন ভাই নিজেদের সহধর্মিণী নিয়ে একদম বাসের পেছন দিকে বসেছেন। আরও একটা সীট ফাঁকা আছে,আজমলের জন্যে৷ আমজাদ লক্ষ্য করেন
পুষ্পকে। মিনাকে বলেন,
“ মেয়েটাকে খেয়াল করেছ,খুব চুপচাপ হয়ে আছে।”
“ পুষ্প? ও তো শান্তই। পিউয়ের মতো দুরন্ত না।”
“ উহু,আজ একটু বেশিই মনমরা। আমার মেয়েকে আমি চিনব না?”
আমজাদ কথা শেষ করেই, ওর নাম ধরে ডাকলেন। “ পুষ্প!”
মেয়েটা পিছু ফিরতেই হাত তুলে কাছে যেতে বোঝালেন। উঠে গেল পুষ্প। আমজাদ পাশে বসিয়ে মাথায় হাত রেখে বললেন,
“ শরীর ভালো তোমার?”
“ জি আব্বু!”
“ ঘুম পাচ্ছে?”
“ একটু!”
“ আচ্ছা,বাবার কাঁধে মাথা রেখে শোও। সামনে কোথাও দাঁড়ালে নাস্তা করে নেবো।”
পুষ্প বাবার ঘাড়ে মাথা রাখল। সুন্দর দৃশ্যে জানলায় ফিরে মুচকি হাসলেন মিনা ।
এদিকে পিউ, রাদিফ পাশাপাশি বসেছে। জানলার সীটটাও ভাগে পায়নি ও। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। মেয়েটা উশখুশ করে বারবার লক্ষ্য করছে ধূসরকে। বাস চলতে শুরু করেছে। মানুষটা এখনো কোথাও বসেনি।৷ বসবে না? দাঁড়িয়ে আছে ক্যানো! বাস চালাবে নাকি! উনি বসলেই পিউ ঝোঁপ বুঝে কাছাকাছি সীটে বসতো! এদিকে ডান পাশে রোদ পড়েছে খুব। এখন সকালের রোদও এত কড়া! ত্যারছা ভাবে ওই জানলা থেকে রোদটা সরাসরি ঠিক পিউয়ের চোখমুখে পড়ছিল। তাকাতে ঝামেলা হওয়ায় বারবার মুখ কুঁচকে নিচ্ছিল মেয়েটা। তারপর কপালে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দেখল আশেপাশে।
কোথায় গিয়ে যে বসবে! বাসে এতগুলো সীট। কিন্তু পেছন দিকে গেলে ধূসরকে দেখতে পাবে না। আবার সামনে একা বসলে মা ধমকাবেন। জায়গা ছেড়ে নড়বে টা কীভাবে?
পিউয়ের রোদ নিয়ে এই বিরক্তি বাসের কেউ লক্ষ্য করল না। তবে আচমকা ধূসর ওর সীটের পাশে এসে দাঁড়াল। তার বলিষ্ঠ শরীর সূর্য আর পিউয়ের মাঝে পড়ায়,রোদ আড়াল হলো মূহুর্তে। ছায়া পড়ল মেয়েটার চেহারার ওপর। চকিতে মুখ তুলে চাইল পিউ। ধূসরকে একদম কাছে দাঁড়িয়ে দেখে,হোচট খেলো একটু। ধূসর বাসের হ্যান্ড স্ট্র্যাপ ধরে দাঁড়ানো। কানে ফোন রেখে বারবার রাস্তর এদিক-ওদিক দেখছিল। পরপর কাউকে জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায়?”
কিন্তু পিউয়ের মুখ ভরে এলো আলোতে। এত খুশি কোথায় রাখবে ও? সুবিধেও হলো খুব। আর উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে হচ্ছে না, আড়চোখ তুললেই কাছেই আছে মানুষটা। ধূসরের গায়ে ধূসর রঙেরই টিশার্ট আজ। মাসল গুলো বেরিয়ে আছে হাতের। হ্যান্ড স্ট্র্যাপ ধরে দাঁড়ানোয়,গেঞ্জিটা ওপর দিকে উঠে এসছে একটু। ঈষৎ উঁকি দিচ্ছে শ্যামলা মেদহীন পেট।
পিউ গলা ঝেরে মাথা ঘুরিয়ে নিলো। চোখ খিচে ভাবল- ছি,আমি এত বেহায়া কেন?
বাস ব্রেক কষল তক্ষুনি। রাদিফের পাপা পাপা চ্যাঁচানোতে পিউয়ের ঘোর ছুটে গেল। চটক কেটে চাইল সেও। আজমল ছুটে বাসের ভেতর ঢুকলেন। পরনে ফরমাল জামাকাপড়! গাল ভরা হাসি। তার চেয়েও দ্রুত গিয়ে ভাইদের একে একে জড়িয়ে ধরলেন,কুশলাদি বলে পাশে বসলেন জবার। রাদিফ আর পিউয়ের পাশে বসল না। বাবাকে দেখে ওকে ফেলে পেছনে ছুটে গেল। দখল করল কোলটাকে।
পিউ তাকাল ধূসরের দিকে। বাসের দরজার পাশে যে একা সীটটা থাকে,এখন সেখানে বসেছেন তিনি। পিউ জানলার পাশে সরে বসল দ্রুত। এক্স আকাশে চেয়ে অনুনয় বিনয় করল,
“ আল্লাহ, ধূসর ভাইকে এনে বসাও। প্লিজ ওনাকে এনে আমার পাশে বসাও।”
প্রার্থনা কবুল হবার আগেই,বাস আবার ব্রেক কষল। এবার ওয়াজিদ এলেন। তবে ভদ্রলোক একা নন। সাথে ওনার চাচা করিমুল আছেন। দুজন এসে সালাম দিলেন সবাইকে। বোনের ভাসুরদের সাথে কোলাকুলি সাড়ার পর, ওয়াজিদ বসলেন পেছনে। ওখানে ধাক্কাধাক্কি বেশি। করিমুল বয়ষ্ক মানুষ। তাই ওনাকে বসানোর জন্যে সামনে নিয়ে এলেন আফতাব। পিউয়ের পাশের সীটটা খালি! ভালো জায়গা বুঝে ধপ করে বসে পড়লেন করিমুল। পিউয়ের সব উত্তেজনা,উচ্ছ্বাস ফুস করে উবে গেল অমনি। মুখ কালো করে তাকাতেই হাসলেন বৃদ্ধ। ওপরের পাটিতে দুটো দাঁত নেই। ওইভাবেই বললেন,
“ ভালো আছো?”
পিউ মাথা নাড়ল। তবে মনের দুঃখে কিছু বলতে পারল না।
আনিস পেছন হতে ড্রাইভারকে বললেন,
“ কী ভাই,পিকনিকে যাচ্ছি। গান টান নেই? বাজান কিছু।”
“ ডিভাইস কানেক্ট করুন স্যার।”
ধূসর বলল,
“ আমি করছি।”
ওর প্লে লিস্ট থেকে গান বাজানো হলো। রাদিফ উঠে এলো দ্রুত। খুব স্ফূর্ত স্বরে আবদার করল,
“ ভাইয়া ভাইয়া, ওই গানটা চালাও না,ব্লু আইস হিপনোটাইজ!”
ধূসর কপাল কুঁচকে বলল,
“ তুই এই বয়সে এসব গান শুনিস!”
রাদিফ থতমত খেয়ে বলল,
“ আমি না তো। পিউপু দিতে বলেছিল।”
নিজের নাম শুনে আহাম্মক হয়ে চাইল পিউ।
আর্তনাদ করল মিহি স্বরে,
“ এই আমি কখন বললাম?”
“ ঐ যে তখন,তুমিই তো বললে। নাহলে আমি এসব গানের নাম জানি?”
পিউ নাক ফুলিয়ে চেয়ে রইল। তাতে রাদিফের বিশেষ যায় এলো না। বাস ঢুলতে ঢুলতে চলছিল তখন। সকালে রাস্তায় জ্যাম নেই, তবে রোদ আছে পুরোদস্তুর। এসি বাস,তাও প্রকৃতি উপভোগ করার জন্যে আমজাদ কাচ টানতে দেননি। এমনিও তো আজ গরম তেমন নেই। বাচ্চারা আনন্দ করবে,গাছাপালা রাস্তাঘাট দেখবে তবেই না সফরের আসল মজা!
বাসে তখন কেবল পুরুষদের আলাপ-আলোচনা আর গল্পের শব্দ। মারিয়া ঘুমোচ্ছে। তার তিন সীট আগে বসেছিল সাদিফ। মুখ তখনো ক্যাপ দিয়ে ঢাকা। ও হয়ত এ শহরে নেই। স্বপ্নে ঘুরছে কোথাও। বাবা এলেন,আত্মীয়রা এলেন ঘুমে কিছুই টের পায়নি। পুষ্প চুপচাপ বসে আছে বাবা মায়ের পাশে। তবে পিউ পড়েছে মহাজ্বালায়।
করিমুল উচ্চশব্দে একটু পরপর কাশছেন। ঘুমোলেও নাক ডাকছেন তুখোড় ভাবে। পিউ উঠে যেতেও পারছে না,পাছে উনি অসম্মানিত বোধ করেন! তাই কানে হেডফোন গুজে সীটে মাথা এলিয়ে বসে রইল। তক্ষুণি টুং করে শব্দ হলো ফোনে। ফের ম্যাসেজ এসেছে।
পিউ ইনবক্স খুলল। সেই একটা আনসেভ নম্বর হতে এসেছে,
“ প্রহর্ষা,সাবধানে যেও। মিস করব তোমায়!”
পিউ চমকাল মাথায় বাজ পড়ার মতো। চট করে চাইল চারিপাশে। ওকে সত্যিই কেউ ফলো করছে। নাহলে জানলো কী করে,ওর যাওয়ার কথা? উদ্রগ্রীব হয়ে খুঁজতে খুঁজতে চোখটা হঠাৎ ধূসরের পানে পড়ল৷ মানুষটা কপালে ভাঁজ ফেলে সরু দৃষ্টিতে দেখছিল ওকেই। মূহুর্তে পিউ ঠিকঠাক হলো আবার। বসল মাথা নুইয়ে।
পদ্মার পাড়ে ওদের সকালের নাস্তা করার কথা। তাও ডিম সেদ্ধ,আর পাউরুটির টোস্ট নিয়ে উঠেছিলেন মিনা-রা। যারা যারা জেগে,খেতে দিলেন তাদের। নদীর পাড়ে বাস থামলে চাও খাবেন এক দফা। বাস এর মাঝে আর থামার কথা ছিল না। তবে হুট করে ধুসরের ইশারায় সেই বাস ব্রেক কষে ফেলল।
আমজাদ আশপাশ দেখে বললেন,
“ এখানে থামল যে?”
আফতাব ধূসরকে ইশারায় দেখালেন। ভদ্রলোক আর কিছু বললেন না। তবে,এই নীরবতা রইল না বেশি সময়। হুট করে বাসের দোর খুলে পিঠে ব্যাগ নিয়ে লাফিয়ে ভেতরে এলো ইকবাল। সহাস্যে উঁচু স্বরে বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম!”
কণ্ঠ শুনে নিস্তেজ চোখদুটো চমকাল পুষ্পর। ঝট করে বাবার কাঁধ থেকে মাথা তুলে সামনে চাইল সে। একইরকম তাজ্জব হয়ে গেল সকলে। সাদিফের ঘুম শেষ। ইকবালের শব্দে মুখ থেকে ক্যাপটা তুলে হতচকিত হয়ে চাইল সেও। মহাশ্চর্য হয়ে আওড়াল,
“ ইকবাল ভাই!”
মিনা,রুবায়দা একে অপরকে দেখলেন। আনিস,আজমল,আফতাবের মুখ শুকিয়ে এলো। পিউ চোখ প্রকট করে কান থেকে হেডফোন নামাল। তারপর এক যোগে সবাই মিলে ঘুরে চাইল আমজাদের দিকে। ভদ্রলোকের এতক্ষণের সব হাসি,সব উচ্ছ্বাস উড়ে গেছে কোথাও। চোয়াল বদলেছে মূহুর্তে। কঠিন মুখে কিছুক্ষণ ইকবালের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি। যেন চাইলেন আরো নিশ্চিত হতে।
টুকুস টুকুস করে দুইচোখের পাতা ঝাপটাল পুষ্প। অবিশ্বাস সারামুখে। ইকবাল? এটা ইকবাল তো? ইকবাল হাসছিল দাঁত বার করে। আমজাদকে ও দেখবেই না। আর না দেখলে ভয়ও করবে না। ধূসর বলেছে বাকিসব ও সামলে নেবে। ব্যস,তাহলেই সব ভয় ; ইকবাল করে ফেলবে জয়। ফের বলল,
“ আমি সালাম দিয়েছিলাম,কেউ জবাব দিলেন না!”
সঙ্গে সঙ্গে মিনা-রা সবাই মিনমিন করে উঠলেন,
“ ওয়ালাইকুমুসসালাম!
ইকবাল একটা সীট দেখে বসতেই যাবে,
এক চিৎকার ছুড়লেন আমজাদ,
“ এই,
এই ছেলে এখানে কী করছে? নামাও,নামাও একে।”
ঘাবড়ে ঝট করে দাঁড়িয়ে গেল ইকবাল। মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে বসল। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বিড়বিড় করল,
“ লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম।”
চলবে!
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৭.১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২১
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব (০১+০২)
-
হেই সুইটহার্ট গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৬