Golpo romantic golpo আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৮


#আলতোছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন_(১৮)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
রওনক এক পা টানটান করে বিছানায় শুয়ে আছে। ক্ষত-ব্যথা কিছুই এখনো সাড়েনি। না একটু নাড়াতে পারছে। নড়চড় এমন রুদ্ধ হওয়ার কারণে,আপাতত কাজের মধ্যে খাওয়া দাওয়া আর এই শুয়ে থাকা। রওনক আগে মোবাইল তুলে দেখল ক-টা বাজে। দেওয়ালে ঘড়ি নেই তো! তারপর মোলায়েম স্বরে ডাকল,
“ মারিয়া,মারিয়া?”
দুপুরে খেয়ে মাত্রই শুয়েছিল মেয়েটা। ভাইয়ের এক ডাকে ছুটে এলো তড়িৎ। তৎপর হয়ে শুধাল,
“ হ্যাঁ ভাইয়া,কিছু লাগবে?”
“ কী করছিলি?”
“ এমনি শুয়েছিলাম। কী লাগবে বলো না!”
“ বোর হচ্ছি,একটা বই পড়ে শোনাবি?”
মারিয়া বুক ভরে হাসল। ফের এক ছুটে নিজের রুমে গিয়ে শরৎচন্দ্রের দেবদাস তুলে আনল হাতে। নাম দেখেই রওনক নাক কুঁচকে বলল,
“ এটা? এটা তো সিনেমাই দেখেছি। একটুও ভালো লাগেনি।”
“ আরে ভাইয়া বই আর সিনেমা একদম আলাদা। আমি পড়ছিলাম,দেখোই না ভালো লাগবে।”
মারিয়া দুই পা আসন করে বিছানার পাশের চেয়ারটায় বসল। জোরে জোরে পড়ার মাঝে মা দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
রওনকের চোখে চোখ পড়তেই ছেলেটা নজর সরিয়ে নিলো। মা হেসে ঢুকলেন ভেতরে। মারিয়া উঠে মাকে বসার জায়গা দিলো। ভদ্রমহিলা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ রাগ করেছিস?”
মারিয়া এসব জানে। শুনেছে পরে। বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ও।
রওনক পাশ ফিরে বলল,
“ করার কথা নয় বলছো? আমার বন্ধুরা আমাকে দেখতে এসেছিল মা,তুমি ওদের সামনে ওসব না বললে পারতে না?”
“ একটু রাগ হয়েছিল বাবা। ওসব কাজে তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছিলি দেখেই তো এক্সিডেন্টটা হলো।
আচ্ছা আর বলব না।”
মারিয়া বলল,
“ ভাইয়া থাক,মা ছোটো মানুষ। মাফ করে দাও।”
রওনক হেসে ফেলল।
মা বললেন,
“ আসলে সব জায়গাতেই তো ভালো মন্দ থাকে। রাজনীতির মাঝেও আছে। আমরা ভালোটা কম দেখি,খারাপটা বেশি দেখি এই যা।”
রওনক সন্দেহী চোখে বলল,
“ বাবাহ,কথার সুর একটু বদল বদল লাগছে না রে মারিয়া?”
ও জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝাল- হ্যাঁ হ্যাঁ । মা বললেন,
“ না, আসলে সেদিন দাওয়াতে তোর লোকজন যখন এলো,তখন খেয়াল করেছিলাম। ওদের কথাবার্তা বেশ ভালো,সভ্য। কত পরোপকারী একেকজন। কত ভাবে একে অন্যকে নিয়ে। ভালোই লাগল! তবে…”
দম নিলেন ভদ্রমহিলা। রওনক শুধায়,
“ তবে আবার কী?”
“ কাল একটা ছেলেকে খুব খেয়াল করেছি। গলার স্বর আর একেকটা কথা এত চোখে লাগছিল! কাজবাজও বেশ ভালো লেগেছে। জানিস,ছেলেটা যাওয়ার সময় আমার থেকে তোর প্রেসক্রিপশন দেখতে চাইল। এরপর ছবি তুলল। ওরা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ওষুধ গুলো বাসায় হাজির।”
রওনক সাগ্রহে শুধাল,
“ কার কথা বলছো বলোতো,
ইকবাল?”
মারিয়া হেসে হেসে জানাল,
“ না না ভাইয়া,ঐ শ্যামলা করে লম্বা মতো ভাইয়াটা। হালকা একটু দাঁড়ি আছে যে!”
“ ওওও ধূসর! হ্যাঁ ও ওরকমই। কার কী লাগবে না লাগবে সবেতে এত খেয়াল। ছেলেটা অনেক ভালো জানো মা! কিন্তু আমি প্রথম দিকে এত ভুল ভেবেছিলাম। অবশ্য এখন আমরা বন্ধু হয়ে গেছি।”
রওনকের মুখ উচ্ছ্বল দেখাল। ভদ্রমহিলা বললেন,
“ এরকম বন্ধুবান্ধব পাশে থাকলে তো আর কোনো মা-বাবাই চিন্তা করে না রে। সবাই কেন এমন হয় না কে জানে! কথাবার্তা শুনেই বুঝা যায় বংশ ভালো,শিক্ষা ভালো তাই না?”
“ হুম্ম, ওরা তো অনেক টাকাপয়সার মালিক। গুলশানের টপ থ্রি বিজনেসম্যানদের মধ্যে ওর বাবা-চাচারা একজন। ওর ছোটো চাচাও তো নামকরা উকিল। আর সেজো চাচা শুনেছি ফরেস্ট অফিসার।”
মারিয়া বলল,
“ বাবারে, কতগুলো চাচা? সবাই কি একসাথে থাকে?”
রওনক মাথা নাড়ে।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ আজ যদি তোর বাবা থাকতেন,আমাদের অবস্থাটা আরেকটু ভালো হতো বল। তখন মারিয়ার জন্যে এমন একটা ছেলেকেই তো খুঁজতাম আমরা। কত দারুণ লাগতো না?”
রওনক চট করে মায়ের পানে চাইল। তারপর চাইল বোনের দিকে। মারিয়া বিব্রত হয়ে পড়ল বোধ হয়। চিবুক নুইয়ে ত্রস্ত পা চালিয়ে ঘর ছাড়ল সহসা। রওনক ঠোঁট কামড়ে ভাবল কিছু একটা। মায়ের হাতে হাত রেখে বলল,
“ কথাটা মাথায় রাখলাম!”


শুভ কটাদিন এই বাড়িতে থাকবে; এই খবর শোনার আগে মরে কেন গেলাম না,শূন্য দৃষ্টিতে আকাশ পথে চেয়ে চেয়ে ভাবছিল ইকবাল। কিন্তু হায় পোড়া কপাল,সামিয়ানার জন্যে আকাশও দেখা যাচ্ছে না। প্যান্ডেলের এক কোণে একটা নীল প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেছিল ও। মন-মেজাজ ভালো নেই। পুষ্পর সাথে ছোটো কাজী নজরুলের ভীষণ ভাব জমেছে। কী গল্প দুজনের! বড়ো তরকারির ব্যোলটা পুষ্প যখন আনতে গেল,কেমন নেচে নেচে শুভও হেল্প করতে গেল সেসময়। পুষ্পর তখনকার হাসিটা মনে করলেই ইকবালের বুক জ্বলে খাক হয়ে যাচ্ছে। একে তো ছেলেটার হাত ধরেছে,আবার হেসেছেও দাঁত কেলিয়ে। তুমি তুমি করে কথা বলছে। এসব কী? মেয়েটার একজন
প্রেমিক আছে না? তার বুক ব্যথা করে না ওসবে! ইকবালের গলা থেকে মুখ তেতো হয়ে আসছে। আরেকদিক চেয়ে চেয়ে পাঞ্জাবির পকেট হাতাচ্ছিল, সিগারেট বার করবে বলে। সেসময়ই পেছন হতে আমজাদের গলা শোনা যায়। ফোনে কথা বলতে বলতে আসছেন। ইকবাল জিভ কেটে উঠে দাঁড়াতে গেল,ঝট করে পকেটের ভেতর হতে হাতটা সরাতেই লাইটারটা ছিটকে এসে পড়ল নিচে।
ঠিক পায়ের কাছে লাইটার পড়তেই দাঁড়িয়ে গেলেন আমজাদ। ইকবালের জিভ তখন এক হাত বাইরে ঝুলে এলো। মাথাটা ভো ভো করে চক্কর কাটছে। এই অজ্ঞান হবে হবে ভাব! আমজাদ একবার লাইটার দেখল একবার ওর মুখে। অমনি ও দিশাহারা হয়ে হড়বড় করে বলল,
“ আঙ্কেল আসসালামু আলাইকুম। হেহেহে, লাইটার আমার না আঙ্কেল! না না আমারই। ওই আসলে এখানে রান্নাবান্নার জন্যে তো চুলা-টুলা জ্বলবে। তখন ভাবলাম যদি রাধতে গিয়ে আগুন জ্বালানোর কিছু খুঁজে না পান। তাই এটা কিনে নিয়ে এসেছিলাম! লাগেনি হেহে।”
আমজাদের চোয়াল শক্ত হতে দেখা গেল। চোখমুখ দূর্বোধ্য। ইকবাল বিড়বিড় করে ভাবল,
“ ব্যাটা হিটলার কি কনভেন্স হয়ে গেছে,নাকি আর কিছু বলব?
তবে মুখ খোলার আগেই আমজাদ কর্কশ বাক্যে বলে দিলেন,
“ সাফ বেয়াদবের সর্দার একটা!”
তারপর হনহনিয়ে পাশ কাটালেন তিনি। ইকবালের মুখটা চুপসে গেল। ঠোঁট উল্টানোর মাঝেই কানে এলো আমজাদ ফোনের ব্যক্তিকে বলছেন,
“ আজকালকার ছেলেপেলে এত বজ্জাত বুঝলেন! এদের কোনো সুশিক্ষা নেই। আমরা এখন অবধি সিগারেট ছুঁয়েও দেখিনি, আর এরা পকেটে লাইটার নিয়ে ঘুরছে। থাপড়ে কান লাল বানিয়ে দিতে হয়।”
ইকবাল ওর কান চেপে ধরল। আমজাদ যেন বললেন না,থাপ্পড়টা সত্যিই মারলেন এখানে।
খুব নিষ্পাপ মুখে বলল,
“ দেখেছ পৃথিবী, হিটলার ব্যাটা আমার মত নাদান বাচ্চাটার সাথে কী ব্যবহারটাই না করে!”
তারপর লাইটার মাটি থেকে তুলে পকেটে রাখল। বুকে বল নিয়ে বিড়বিড় করল,
“ যত যাই বলেন না কেন হিটলার শ্বশুর,
আপনার মেয়ে জামাই হয়ে তবেই এই ইকবাল দম ফেলবে।”


খাওয়া দাওয়ার জন্যে যখনই বাইরে থেকে লোকজন আসা শুরু করল,মিনা বেগম মেয়েদের বাড়ির ভেতর পাঠিয়ে দিলেন।
মোটামুটি কাছের-দূরের বহু মানুষ এসেছে। আরিফ, সোহেল থেকে সাদিফের বন্ধু বাঁধন আর ফায়াজ অবধি। ফায়াজ নিজের মতো রইলেও,বাঁধনের উশখুশে চাউনি চারপাশে ঘুরছে। হন্যে দৃষ্টিতে যেন খুঁজছে কাউকে।
বাঁধন দেখতে চমৎকার।
ফর্সা,লম্বাটে মুখ, পরিষ্কার ত্বক। স্পষ্ট চোয়াল, চোখা নাক। আর ডান চোখের কোণে একটা মাঝারি সাইজের তিল। চুল সব সময় জেল দিয়ে ওপরে আচড়ানো থাকে। বন্ধুর এসব খুশখুশ দেখার সময় সাদিফের নেই।
তখন মহাব্যস্ত সে। চাচারা দু দণ্ড দম নিচ্ছে না, ধূসর ভাইও কাজবাজে তটস্থ, সেখানে ও বন্ধুদের নিয়ে হইচই করবে কখন? এমনকি ইকবালটাও হাতে হাত লাগাল। নিজেদের লোকেরা খায়নি এখনো। খাচ্ছে কেবল আশেপাশে যত সুবিধা বঞ্চিত মানুষজন ছিলেন। লম্বা লম্বা চাটাইয়ের মতো কাপড় বিছিয়ে দুপাশে লাইন ধরে বসানো হয়েছে তাদের। মাঝখানে বড়ো গামলা,বাটিতে করে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। কারো কাছে ভাত,কারো কাছে ডাল,কারো কাছে মাংস।
এই পালা শেষ হতে হতেই বেলা যেন অর্ধেক গড়িয়ে গেল আজ। তিনটার দিকে খেতে বসল হর্তাকর্তা সকলে মিলে। ছেলেপেলে সব বসল এক টেবিলে। আর মেয়েরা বসলেন অন্য দিকে।
এদিকে পিউ খেতে পারছে না। সব তরকারিতে এত ঝাল হয়েছে আজ! মেয়েটা একদম ঝাল খেতে পারে না। টক পছন্দ ওর। গোরুর মাংসের মশলার ঝাঝে নাক চোখ ডুবে গেল জলে। শেষে প্লেটে অর্ধেক খাবার রেখেই উঠে গেল পিউ। ঠিক সেই মূহুর্তে অদূরের টেবিল থেকে বাঁধনও নিজের চেয়ার ছেড়ে এলো। এক রকম ছুটন্ত ঘোড়ার বেগে হাঁটা ধরল হাত ধোঁয়া জায়গার দিকে।
এখানে বেসিন নেই। বড়ো একটা ড্রাম ভরতি করে পানি রেখে,তাতে ট্যাপ বসানো হয়েছে। পিউ সেই ট্যাপ ছেড়ে পানি দুইহাতে নিয়ে মাথা ভেজাল কিছুক্ষণ। এরপর নাকেমুখে দিলো। এত যাচ্ছে তাই অবস্থা! রান্না করল কে?
ঠোঁট জ্বলছে, কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। পিউ ঝালে হিসহিস করতে করতে পিছু ফিরল, চমকে উঠল একটু। সুন্দর, ভীষণ সুন্দর ছেলেটা ঠিক মুখের সামনে দাঁড়িয়ে হাসল ওর। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ হাই, প্রহর্ষা তাই না?”
পিউয়ের ঝালে মনে পড়ল না এ কে! জিজ্ঞেস করল,
“ জি, আপনি যেন কে?”
“ আমি বাঁধন হায়দার। সাদিফের বন্ধু। হায়দার চৌধুরীর নাম শুনেছ না? আমার আব্বু। আচ্ছা ওয়েট, রিসেপশনের পার্টিতে তো কথা হয়েছিল মনে নেই?”
“ না আসলে খেয়াল নেই,সরি!”
“খেয়াল করোনি বলে খেয়াল নেই। আচ্ছা,তুমি আমাকে খেয়াল করোনি কেন? আমি খেয়াল করার মতো নই!”
পিউ একটু অপ্রস্তুত চোখে চাইল।
“ জি?”
হাসল বাঁধন। কথা ঘোরালো চট করে,
“ তুমি এবার কলেজে উঠবে না?”
“ জি।”
“ আয়োজনের একটা কারণ তো তোমার ভালো রেজাল্টও, তাই না?”
এ যাত্রায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল পিউ। এই রেজাল্ট ওর কাছে কোনো মানে রাখে না। বাঁধন নিজেই বলল,
“ এবার কোন কলেজে পড়বে? নাকি ওখানেই? মানার‍তে পড়ো তো,তাই না!”
পিউ বুঝতে পারল না,ছেলেটার এত আগ্রহ কেন! কোথায় পড়ে,কী সে পড়ে সব এমন জেনে বসে আছে কী করে? কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে তো জবাব দিতে হবে। হাঁ করতে নিলো,
সুপ্তি এসে দাঁড়াল অমনি। খুব ব্যস্ত ভাবে বলল,
“ পিউপুউ, তোমাকে ফুপি ডাকছে।”
পিউ আগে বাঁধনকে উত্তর দিতে চাইল,কিন্তু ফের হাঁ করার আগেই সুপ্তি বলল,
“ এক্ষুণি এক্ষুণি। খুব জলদি!’’
অগত্যা বাঁধনের পাশ কাটিয়ে তাড়াহুড়ো পায়ে চলে এলো পিউ। বাঁধন বিরক্ত হলো ভারি! চ সূচক শব্দ করে ভাবল,
“ যখনই কথা বলতে যাব,কিছু না কিছু হচ্ছে!”
পিউ এসে দেখল মিনা বেগম খাচ্ছেন তখনো। খেতে খেতে আবার জায়েদের সাথে কত গল্প! ও পাশে এসে বলল,
“ আম্মু, ডেকেছ?”
“ এই তুই না খেয়ে চলে গেলি কেন? ঝাল-টাল লাগলে একটু পায়েস খা। পায়েসটা মজা হয়েছে।”
পিউ নাক কুঁচকে বলল,
“ এটা বলার জন্যে এত জরুরি ভাবে ডাকলে?”
মিনা অবাক হয়ে বললেন,
“ আমি কই ডাকলাম? ডাকিনি তো।”
পিউ অবাক হলো তার চেয়েও বেশি। ডাকেনি,তাহলে সুপ্তি অত তাড়া দিয়ে বলল কেন? ও এদিক-ওদিক চাইল খুঁজল পিচ্চিটাকে। ওইতো ছোটাছুটি খেলছে রাদিফের সাথে। দুটোতে একই ক্লাসে কিনা!
পিউ গিয়েই ওর এক হাত ধরে নিজের দিকে ফেরাল।
“ কী রে,মা যে বলল ডাকেনি। তুই তাহলে মিথ্যে বললি কেন?”
সুপ্তি একটু ঘাবড়ে গেল। পিউয়ের চোখদুটো খুব বড়ো! তারওপর চোখ রাঙালে আরো বড়ো লাগে! মিনমিন করে বলল,
“ আমাকে তো বলতে বলেছে।”
পিউ কপাল কুঁচকায়,
“ কে বলেছে?”
সুপ্তি আঙুল তুলে দেখাল,
“ ওই যে উনি।”
ফিরল পিউ। কিন্তু সেখানে একটা পিলার ছাড়া কিছু নেই দেখে বলল,
“ কই? কেউ তো…”
সামনে ফিরতেই হোচট খেল। সুপ্তি পালাচ্ছে,ছুটে যাচ্ছে প্রানপণে। পিউ কোমরে হাত দিয়ে বলল,
“ মিথ্যুক মেয়ে,ধরতে পারলে দেখিস!”
সুপ্তি আর থামেনি। ভেগে গেছে খুব জোরে।
পিউ নিজের দিকে চাইল। মাথায় পানি দিতে গিয়ে জামার গলা,,ওরনা সব ভিজে গেছে। চেঞ্জ করা দরকার। এখন ওর কতগুলো চুরিদার! সব একে একে পরবে। কিন্তু কার জন্যে পরবে? সে তাকায়ই না। পিউ নীরস শ্বাস ফেলে সেইদিকে ফেলল,যেখানে ইকবাল-ধূসর একইসাথে খাচ্ছিল বসে। কিন্তু না,টেবিল খালি হয়েছে অনেকক্ষণ। নেই কেউ!
পিউ খোঁজার আগ্রহে এগিয়ে এলো মূল ফটকের দিকে। চেয়ে দেখল ছেলেপেলে সব সহ ওরা রাস্তা পার হয়ে ওইপাড়ে যাচ্ছে। ইকবালের হাতটা ধূসরের কাঁধ প্যাঁচানো।
বকবক চলছেই। পিউ ফোস করে শ্বাস ফেলে ফিরে এলো অন্দরে।


সন্ধ্যে হতে হতে বাড়িঘর নীরব হতে শুরু করল। মোটামুটি কাছ থেকে যারা এসেছিলেন তারা চা-পানি খেয়ে বিদেয় নিয়েছেন। রাশেদরাও ফ্লাইট ধরবেন আগামীকাল। শান্তার অর্ধ-বার্ষিক ধেয়ে আসছে। টিউশন মিস দেয়া যাবে না।
তখন গোধূলির সময়। মিনা হঠাৎ বললেন,
“ গাছে পানি দিয়েছিলি? নাকি হইহল্লায় সব গিলে খেয়ে ফেলেছিস?”
পিউয়ের চেহারা বিবর্ণ দেখাল।
“ দিসনি তাইত? কী হয়েছে বল তো শুনি। এমনি তো বলেও দিতে হয় না। কাল থেকে কীরকম কীরকম করছিস।”
পিউ চুপ। মিনা বললেন,
“ যা তাড়াতাড়ি যা। আযান দিতে দেরি আছে,এর মধ্যে গিয়ে দিয়ে আয়। যা রোদ পড়ছে,গাছগুলো নাহলে শুকিয়ে মরে যাবে।”
পিউ উঠে দাঁড়াল। বিকেলে গাছে পানি দেয়ার ডিউটিটা ওর স্বেচ্ছায় নেয়া কাজ। কিন্তু কালকের ওই ঘটনার পর যা ভয় লাগছে। জ্বীন যদি ধূসরের বেশ ধরে এসে কথা বলতে পারে,না জানি সে আরো কত কী পারবে!
পিউ রাদিফকে বলল,
“ আমার সাথে চল না একটু!”
ছেলেটা এক বাক্যে রাজি। সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা ধরল। রাদিফ বড্ড রোগা। মাথায় আর্মি ছাট! চুল বড়ো হলেই ও অসুস্থ হয়ে যায়। তাই জবা এই কাট দিয়ে রাখেন। তবে গাল দুটো অজ্ঞাত কারণে ফোলা ফোলা। কিছু হলেই বোনেরা ধরে টানাটানি করে।
প্রচুর কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল সে। তবে পিউয়ের নজর ভীত! ডাগর ডাগর চোখদুটো প্রকট করে ও ছাদের চারিদিক দেখল। অন্ধকার এখনো নামেনি। এর মধ্যেই কাজ সারতে হবে। রাদিফ এক ফাঁকে ছাদের কোণে থাকা ডালিম গাছের কাছে গেল। ডালিম এখনো পাঁকেনি। পাঁকলেই টুপ করে ছিঁড়ে পকেটে ভরে ফেলতো।
পিউ একে একে গাছে পানি দেয়া শুরু করে।
সবই ফুল গাছ। পাতাও ছাটা হয় নিয়ম করে। পুষ্প আর ও মিলে লাগিয়েছিল। বাগানের গাছ তো হাকিম চাচা দেখাশোনা করেন,তবে এগুলো ওদের হাতেই বড়ো হয়েছে বলা যায়! শিকদার বাড়ি ঘেরাও করে থাকা এত এত গাছ থাকে বলেই,দিনের বেশিরভাগ ঠান্ডা থাকে বাড়িটা। আমজাদ শিকদার গাছ ভালোবাসেন। এতে নাকি ঘুম ভালো হয়!
পিউ তাড়াহুড়ো করছিল। যত সময় যাচ্ছে অন্ধকার হচ্ছে। জ্বীন চলে এলে? সূরা পড়ছিল বিড়বিড়িয়ে। গোলাপ কাছটায় পানি দিতে গেলেই, হঠাৎ পায়ের তলায় বিঁধল কিছু একটা। খালি পায়ে থাকায় একটু লাগল সেখানে। পা তুলল পিউ। একটা চারকোণা সবুজ রঙের বোতাম চকচক করছে। পাথরের মতো মসৃণ, কিন্তু ভেতরে হালকা-গাঢ় সবুজের প্রাকৃতিক ছোপছোপ দাগ বসানো। যেন ছোট্ট এক টুকরো সবুজ পাথর কেটে বোতাম বানানো হয়েছে। চারপাশের কিনারাগুলো সামান্য গোল, তাই দেখতে বেশ আলাদা।
পিউ চোখ ঝাপ্টে পানির ঝাঁঝরি নিচে নামিয়ে রেখে বোতাম হাতে তুলল। এই বোতামটা!
কী যেন ভাবতে ভাবতে ওর চোখমুখ টানটান হলো অমনি। আরো ভালো করে লক্ষ্য করল ওটাকে। এই বোতাম ধূসর ভাইয়ের সেই সবুজ জামাটার না? কাল সন্ধ্যায় ছাদে বসে ওনার গায়ে তো ওরকম একটা জামা-ই দেখেছিল ও!
পিউ নিশ্চিত হতে বোতাম হাতে রেখে দিলো। এটাই সব ধাঁধার সমাধান হতে পারে!


বাড়ির সবাই তখন বসার ঘরে। শিকদার বাড়ির আসল সৌন্দর্যই বোধ হয় ওদের লিভিংরুমের গল্প করার দৃশ্য।
কিন্তু পিউ তিনতলায় দাঁড়িয়ে তখন। ভালো করে সব দেখে এসেছে,ধূসর এখনো ফেরেনি। ঘর ফাঁকা। এই সুযোগে সব ঘেটে আসবে। কারণ পিউয়ের মনে হচ্ছে সন্ধ্যায় ধূসর ভাই-ই ছাদে এসেছিলেন। ওর সাথে কথা বলেছিলেন! অত জীবন্ত অনুভূতি মিথ্যে হতে পারে?
এই বোতাম ওনারই। পিউ তার সব ঠোঁটের ডগায় মুখস্থ করে রেখেছে। একটা ঘড়ির স্ট্রিপ অবধি চিনে যাবে দেখলে। যার কাপড়চোপড় নেড়েচেড়ে, মনের সাধ মিটিয়ে ঘ্রাণ শুষেছে তার একটা বোতাম কেন চিনবে না?
আর কাল থেকে বাড়ির কোনো ছেলেই ছাদে যায়নি। চাচারা কেউ এমন বোতামের জামা পরেই না। তাদের কাপড় বেশ সাদামাটা।
পিউ খুব দ্রুত ধূসরের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দেখল এদিক-ওদিক। শার্টটা কাল পরেছিলেন উনি!
কোথায় থাকবে তাহলে? আজ ধুয়ে দিলে, ছাদ থেকে পারভীন কাপড় এনে সোফায় রেখে যায়। মেজো মা ঘর গুছিয়েছিলেন। এর মানে কাবার্ডে। পিউ কাবার্ড খুলল ত্রস্ত হাতে। পুরো একটা দেওয়াল কেটে বসানো কাবার্ড। এক পাশে শার্ট, এক পাশে স্যুট,এক পাশে টি শার্ট,আর প্যান্টগুলোও আলাদা রাখা। পিউয়ের খুঁজতে গিয়ে দিশা হারিয়ে গেল। ধূসরের অর্ধেক শার্টই কালো/রংচটা নীল,ধূসর, হাল্কা সবুজ!
সবুজ শার্টই চার-পাঁচটা! কোনটা পরেছিল? ও হাতাগুলো দেখল ধরে ধরে। সব শেষে যেটায় হাত পৌঁছায় ওটা ধরতেই থমকাল পিউ। এটার সব বোতামের নকশা চৌকশ। ঠিক ছাদে পাওয়া বোতামের মতো। তার চেয়েও বড়ো কথা কনুইয়ে ফোল্ড করে রাখা হাতার ওখানটায় একটা বোতাম নেই। কিছুর সাথে বেঁধে ছিঁড়ে পড়ে গেছে! ছেঁড়াটা ত্যারছা! যেন ধারালো কিছুতে আটকে গেছিল। বোতাম ও ছাদের দরজার পাশে যে গোলাপের চারা,সেটার নিচে পেয়েছে! এর মানে…. পিউ কতক্ষণ নিস্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল। ছাদে কাল ধূসরই এসেছিল। তবে আজ মিথ্যে বলল কেন ওকে?
সে কি পিউয়ের শেষ কথার মানে বুঝে ফেলেছিল? তাই ধরা দিতে চায়নি! কিন্তু কী চলছে ওনার মনে?
পিউয়ের এই অতল ভাবনার রেশ কাটল,বাইরে জুতোর শব্দ পেয়ে। কেউ আসছে যেন! পিউ ধড়ফড় করে কাবার্ডের দরজা আটকে দেয়। ছুটে বের হতে নেয়,ওপাশ থেকে আসা জেসমিনের সুবাসে বুঝে যায়- ধূসরই আসছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পিউ। এখন ধূসর ওকে দেখে ফেললে কী হবে? পিউয়ের মাথায় যা এলো,তাই করল ও। চটজলদি লুকিয়ে পড়ল ওয়ার্ড্রবের ফাঁকে। ধূসর পর্দা ঠেলে ঘরের ভেতরে এলো,ঝুঁপ করে লোডশেডিং নামল বাড়িতে। নিচে সবার গল্প-আড্ডা একটা শব্দ করে থেমে গেল অমনি। আমজাদ চ্যাঁচালেন – হাকিইইম জেনারেটরের সেন্সরটা দেখো তো। আজকেও ঝামেলা হলো কিনা!”
এদিকে চৌকাঠে নিজেও দাঁড়িয়ে পড়ল ধূসর।
বিরক্ত হলো একটু! ইদানীং এত লোডশেডিং হচ্ছে দেশে! পকেট হাতিয়ে ফোন বের করতে গিয়েও থামল হঠাৎ। কেন যেন মনে হলো ঘরে কেউ আছে। প্রকৃতি থেকে আসা জ্যোৎস্নার আলোয় যতটুক দেখা যায়,তাতে বোঝা গেল
ওয়ার্ড্রবের ওখানে একটা ছায়ামূর্তি নড়ছে। শব্দ আসছে নিঃশ্বাসের। সারা বাড়ি তখন অন্ধকার! অথচ ধূসর নিজের তীক্ষ্ণতা দিয়ে কীভাবে যেন বুঝে ফেলল,সেই মানুষের অবস্থান কোথায়! অন্ধকারে তির ছোড়ার মতো আন্দাজ করে, হাতটা বাড়িয়েই খপ করে তাকে চেপে ধরল ও। কিন্তু ওইপাশের মানুষটা এতই দূর্বল,এমন বলিষ্ঠতার তোড়ে হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ল বুকের মাঝে। ধূসর এই হামলার জন্যে তৈরি ছিল না। টাল হারিয়ে তাকে সমেত ধপাস করে তুলতুলে বিছানায় ছিটকে পড়ল অমনি। পিউয়ের মাথা গিয়ে খাটের কাঠে লাগল। যখন টের পেলো একটা পেটানো দেহ ঢেউয়ের মতো আছড়ে শীর্ণ গায়ের ওপর পড়েছে,মনে হলো হাড়গোড় ওখানেই ভেঙে গেছে ওর! অপ্রস্তুতিতে ধূসরের ঠোঁটটা ওর ঠোঁটে ঠুকে যেত, তবে সঙ্গে সঙ্গে এক হাতে ভর দিয়ে নিজেকে আটকে ফেলল ধূসর। তক্ষুনি সারা বাড়ির আলো জ্বলে উঠল। লোডশেডিংয়ের দরুণ ঘর ভরা অন্ধকার দূর হতেই চমকে গেল দুজন দুজনকে দেখে। তার চেয়েও চমকাল বিছানার ওপর দুজনের এই অপ্রত্যাশিত অন্তরঙ্গ মূহুর্তের অবস্থান দেখে! থমকে চেয়ে রইল পিউ। চোখমুখ শূন্য হয়ে গেল ধূসরের ঠোঁট, নাক চোখ সব এত কাছ থেকে দেখে। নিঃশ্বাস আর চলল না যেন!
তবে ধূসর তড়াক করে ওর ওপর থেকে উঠে গেল অমনি। পিঠ ফিরিয়ে উল্টোদিকে ঘুরে দাঁড়াল। চোখদুটো মেঝেতে রেখে তাকাল এদিক-ওদিক। হঠাৎ টের পেলো পেছনে সাড়াশব্দ নেই। কৌতূহলে ফিরে চাইল আবার। পিউ মরার মতো পড়ে আছে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে সিলিং ফ্যানের দিকে। চোখে পলক পড়ছে না, শরীর নড়ছে না। জ্যান্ত লাশ যেন! ধূসর কপালে ভাঁজ ফেলল। একটু স্বর নামিয়ে ডাকল – পিউ?
মেয়েটা সাড়া দেয় না। অমন নিষ্পলক, নিথরের মতো চেয়ে চেয়ে কী যেন দেখে। ধূসর এক পা এগোয়। ডাকে। লাভ হয় না। শেষে আরেকটু কাছে ঝুঁকে এলো ধূসর। গাল চাপড়ে ডাকল – পিউ?
অন্যমনস্ক জবাব এলো – হু?
ধূসরের ভ্রু টানটান হলো। চোয়ালের ধরণ বদলাল। ধমকে কিছু বলবে,পূর্বেই যেন হুশ ফিরল পিউয়ের। কেমন তড়াক করে শোয়া থেকে উঠে দমকা হাওয়ার মতো ছুটে বেরিয়ে গেল ও। যাওয়ার সময় দরজার হাতলে খুব জোর কনুইয়ে বাড়ি খেল একটা। কিন্তু পিউকে আজ কেউ থামাতে পারল না। মনে হলো,এখান থেকে পালিয়ে গেলে বাঁচবে!
ধূসর চেহারা গুছিয়ে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বিছানায় চোখ যেতেই দেখল ওরনা ফেলে গেছে। ও ওরনা তুলল হাতে। ঘরের বাইরে রেখে আসবে ভেবেও থামল,কী যেন ভেবে ধরল নাকের কাছে। ওরনা থেকে জেসমিনের ঘ্রাণ আসছে। কিন্তু ওর পারফিউম থেকে একটু কম তীক্ষ্ণ,কম কড়া ঘ্রাণ! এটা তো মেইল পারফিউম নয়। একই ব্রাণ্ডের লেডিস ভার্সন সম্ভবত। মানে কী? ওর সাথে মিলিয়ে পারফিউমও কিনে ফেলেছে? বাইরে পেতে রাখা চেয়ারটায় ওরনা রেখে দরজা খুব জোরে আটকে দিলো ধূসর। গায়ের শার্ট খুলতে খুলতে টের পেলো বুকের কোথাও একটা জ্বলছে। পুরো শার্ট খুলতেই, নিজের খোলা বুকের ডান পাশে চোখ আটকায়। ধূসরের শ্যামলা মুখটা কিছু সময়ের জন্যে নিবিড় হয়ে গেল সহসা।
একটা নখের আঁচড় লম্বালম্বি বসেছে। এরপর খেয়াল করল ওর ঘাড়েও নখের আঁচড় আছে একটা। যা ধূসরের ২৬ বছরের জীবনে,ওর এই পেটানো দেহে কোনো নারীর দেয়া প্রথম দাগ,প্রথম কোনো চিহ্ন!
চলবে… See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply