#আলতোছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন_(০৩)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
বাইরে কড়া রোদ পড়েছে। তুখোর তাপে ওষ্ঠাগতপ্রাণ। এসিতে হাড়হীম করা গাড়ির সীট ছেড়ে নামতেই ইকবালের যেন গা পুড়ে গেল। গরমে অতীষ্ঠ হয়ে পরনের পাঞ্জাবির কলারটা বাতাস করার মতো ঝাঁকাল সে।
এমন পাজামা-পাঞ্জাবি ও সব সময় পরে। সাদা পাজামা,আর সাথে গাঢ় নীল পাঞ্জাবিটা থাকেই প্রতিদিন। উৎসব হোক না হোক, ইকবালের এই বেশভূষায় কোনো বদল নেই। তার ওপর এখন সে সরকার দলের লোক। গুলশান ২-এর এমপি মহোদয়ের খাস ব্যক্তি বলা যায়! আবার এই পার্টি অফিসের সভাপতি। চেহারায়,চলনে-বলনে নেতা নেতা ভাবটা ফুটে ওঠা জরুরি না? ছেলেটা ব্যস্ত চোখে আশেপাশে দেখল। ওপাশ থেকে ততক্ষণে নেমে এসে দাঁড়াল ধূসর। ইকবাল পার্টি অফিসের সাইনবোর্ড দেখিয়ে বলল,
“ দেখেছিস বন্ধু,দেখেছিস ওটা?”
“ দেখলাম।”
“ কী অদ্ভুত! দেখলি? উত্তেজিত হবি না?”
“ না।”
ইকবাল হতাশ হলো। ও ভেবেছিল,পার্টি অফিসের চাকচিক্য দেখে ধূসর আনন্দে লাফাবে। শত হলেও ওর বন্ধু এখানকার প্রধান বলে কথা!
পরপরই গলা বাড়িয়ে ডাকল,
“ সোহেল,আরিফ ছাতার মাথা কই তোরা?”
ধূসর বলল,
“ কাউকে ডাকতে হবে না। ভেতরে যাই, চল।”
“ ওরা আসুক না!”
“ ওরা এসে কী করবে?”
ইকবাল আমতাআমতা করে বলল,
“ আমাদের নিয়ে যেতো।”
“ আমাদের পা নেই?”
মুখ কালো করে মাথা নাড়ল ছেলেটা। বোঝাল, আছে। নীরস গলায় বলল,
“ চল তাহলে।”
ধূসর এগিয়ে যায়।
ইকবাল আশপাশ দেখতে দেখতে কটমটিয়ে বলল,
“ শালার বলদ গুলাকে নিয়ে রাতে কত কী প্ল্যান করেছিলাম। এখন কাজের সময় কই মরেছে! মন চাইছে একেকটা অর্কমাকে আছাড় মেরে পাছার হাড্ডি ভেঙে দিই।”
ধূসর পার্টি অফিসের চৌকাঠে পা রাখল,সঙ্গে সঙ্গে পার্টি পপার ফাটল ছোট শব্দে। দুপাশ থেকে থোকার মতো বেলুন উড়ে গেল। প্যাপু আওয়াজ নিয়ে বাঁশি বাজল একটা। হঠাৎ ব্যাপারটায় একটু চমকে উঠল ধূসর। ইকবাল নিজেও ভড়কে গেল কিছুটা। উড়ে পরতে থাকা জরিগুলো দেখেই অমনি সৎবিৎ এলো তার। হেসে,বুক ফুলিয়ে বিড়বিড় করল,
“ যাক, ভেড়াগুলোর তাহলে মনে আছে।”
ধূসর অবাক হয়ে দেখল ওর সামনে একটা বিশাল জটলা বেঁধে আছে। সব গাট্টাগোট্টা ছেলেপেলে দাঁড়ানো। মূহুর্তেই সবাই একসাথে হাত তালি দিলো। হইহই করে বলল,
“ ওয়েলকাম ধূসর ভাই,ওয়েলকাম! ”
ধূসর তাজ্জব হয়ে গেল। কপালে ভাঁজ বসল অচিরে। ওর বিস্ময়ের মাঝেই ভীড় থেকে এগিয়ে আসে আরিফ। এখানকার ইনচার্জ সে। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম, ধূসর ভাই। কেমন আছেন,আমি আরিফুজ্জামান।”
“ তোমরা আমাকে চেনো?”
“ চিনব না? কী বলেন! আপনি কোথায় পড়েছেন,কোন মাঠে খেলেছেন,কোন লেকে মাছ ধরেছেন,কোথায় কোথায় ডিবেটে অংশ নিয়েছেন থেকে শুরু করে,নিউইয়র্কে আপনি কী করতেন,না করতেন আমরা সব জানি।”
ধূসর উত্তর পেয়ে গেল। কৌতূহল মিটল রাতারাতি। বুঝল, এসব কার মহাত্ত্ব। একবার পাশ ফিরে তাকাল ইকবালের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে এদিক ওদিক মাথা ঘুরায় সে। আঙুল দিয়ে দেওয়ালের ইট গুণতে গুণতে বলে,
“ একুশ,বিশ,বাইশ…”
ঠোঁটের কোণ তুলে হাসল ধূসর। সোহেল হাত বাড়িয়ে বলল,
“ চিনতে পারছিস? সোহেল, সেই যে মানারতে এক সাথে পড়তাম, সায়েন্স- খ শাখা।”
ধূসর হ্যান্ডশেকের বদলে বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল,
“ চিনব না কেন? পালটে গেছিস যদিও।”
সোহেল বিস্মিত হয়ে বলল,
“ কী রে ভাই,বিদেশ থেকে এসেও দেখি একইরকম আছিস। ভাবসাব বাড়েনি?
“ বাড়ার কথা?”
“ নয়? মানুষ শহরের বাইরে ট্যুর দিলেই নাকি ভাবে পা মাটিতে রাখে না। আর তুই তো দেখি পুরোনো কলেজ বন্ধুকে একদম বুকে নিয়ে রাখলি।”
ইকবাল মাথা নাচিয়ে নাচিয়ে বলল,
“ হুহহু,দেখতে হবে না বন্ধুটা কার?”
সোহেল বলল,
“ তবে ধূসর, তোর দেখি দারুণ চেঞ্জ । ছোটোবেলায় তো পাতলা ছিলি,এখন পুরা হিরো। মাসল আছে?”
শার্টের ওপর থেকে ধূসরের বাহুতে হাত দিতে গেলেই, ইকবাল ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ থাকলেও তোকে দেখাবে কেন? ফোট শালা।”
সোহেল তব্দা খেয়ে বলল,
“ তোর আবার কী হলো?”
“ কিছু না। এই মালা কই? মালা এনেছিলাম না? মালা নিয়ে আয়,আরিফ।”
ইকবাল বড্ড তাড়াহুড়ো দেখায়। তার ব্যস্ততায় সব ফেলে টেলে ছেলেপেলে মালা আনতে ছোটে। সোহেল যেতেই ধূসর বলল
“ এরকম করলি কেন?”
ইকবাল বিড়বিড় করে বলল,
“ করব না? এসছে ননীর নাতি, ও আমার বন্ধুর মাসল দেখবে। কী শখ জীবনে!”
ধূসর হতবুদ্ধি হয়ে বলল,
“ তুই মেয়েদের মতো করছিস কেন?”
“ আমি মেয়েই, তোর কোনো সমস্যা? বেশি সমস্যা হলে যা সোহেলের সাথে ফ্রেন্ডশীপ কর।”
ইকবাল মুখ গোমড়া করে রাখল। ধূসর কপাল কুঁচকে বলল,
“ আশ্চর্য!”
ওদিকে পার্টি অফিসে হুলস্থুল বেঁধেছে। একের পর এক কাণ্ডে ধূসর আশ্চর্য হচ্ছে বৈকি। ও এসছিল পার্টি অফিস দেখতে,সবার সাথে পরিচিত হতে। অথচ এখানে সবাই ওকে আগে থেকেই চিনে বসে আছে? ইকবালের খাতিরে নাহয় বুঝল,কিন্তু এত কিছু কেন? একটা গাদা ফুলের মালা নিয়ে যখনই সোহেল পরাতে আসবে,হাতটা ধরে ফেলল ধূসর। জিজ্ঞেস করল,
“ এটার উপলক্ষ্য কী?”
“ তুই এলি না? তোকে আপ্যায়ন করছি।”
“ আমি এখনো এমন কেউ হইনি, যে মালা দিয়ে বরণ করতে হবে। এসব রাখ!”
ধূসর নিজেই মালা ভাঁজ করে রেখে দিলো পাশে। মোটামুটি সবার আগ্রহ,মনোযোগ, মাতামাতি ওকে নিয়ে হলেও ভিড়ের কোণে দাঁড়িয়ে রইল রওনক। তীক্ষ্ণ নজরে আপাদমস্তক চেয়ে দেখল,এই চত্বরে নতুন পা রাখা শ্যামলা ছেলেটাকে। একটা ক্রিউ নেকের সাদা গেঞ্জির ওপরে নেভি ব্লু রঙের শার্ট পরেছে। টপ বোতাম দুটো খোলা। পায়ে ঝকঝকে ডার্বি শু। মাথায় কমা হেয়ারকাট। চুলগুলো উঁচু করে আচড়ে সামনের দুপাশ থেকে কমার মতো বেঁকে কপালে এসে পড়েছে। তার সাথে চোয়ালের হাড় ঘেঁষে নিখুঁতভাবে ছাঁটা বক্সড বিয়ার্ড শেপের দাড়িটার সাথে হেয়ারস্টাইলের কম্বিনেশন মানানসই খুব। খুব বেশি ঘন নয়, হালকাও নয় ; ঠিক যেন এক মাপা শিল্পকর্ম।
এক্সট্রা আহামরি কোনো ফ্যাশন নেই। তাও রওনকের চোখ আটকাল। নজর পড়ে রইল ধূসরের হাতের ঘড়িতে। চকচকে ঘড়ির ডায়াল স্ক্রিনের ঠিক মাঝে, একটা বড়ো করে D লেখা। বলিষ্ঠ শক্ত গড়নের ,তামাটে এক পুরুষ। টানটান বুক,ফোলা মাংসপেশি! ওর বয়সিই হবে! কিন্তু ফিটনেসের জন্যে চোখে লাগছে খুব। সেই সাথে রওনকের কোথাও গিয়ে মনে হলো ওর প্রতিপক্ষ এলো না তো? হিসেবটা গিলে ফেলল রওনক। এগিয়ে এলো দুপা। হেসে বলল,
“ আরে ভাই,তুমি তো আমাদেরই লোক। রাজনীতির জন্য যখন দেশ ছেড়েছ,এত আত্মত্যাগের খাতিরে এইটুকু সংবর্ধনা পাওনা থাকে না?”
ধূসর আরো অবাক হয়ে বলল,
“ সবাই এটাও জানে?”
আরিফ বলল,
“ জানব না? ইকবাল ভাই সারাক্ষণ আপনার কথা বলে। আপনি এই, আপনি ওই। স্কুল কলেজে কী কী করেছেন সব আমাদের মুখস্থ!”
ইকবাল কথা ঘোরাতে বলল,
“ আচ্ছা এসব বাদ দাও। চেয়ার টেয়ার কই? অতিথিকে বসাও। আচ্ছা, খালেদ ভাই আসেনি?”
“ না আসছেন। রাস্তায়।”
এক গাদা টেবিল চেয়ার থেকে দুটো চেয়ার এগিয়ে দিলো মুমিন। ধূসর বসল,পাশেরটায় ইকবাল বসতে বসতে বলল,
“ বুঝলি ধূসর, আজ আমরা এলাকায় বের হব। ভাই জিতেছেন না,এবার জনগণের সাথে দেখা করতে হবে। দুটো গাড়ি যাবে। তুই আর আমি আলাদা যাব, কী বলিস?”
“ আচ্ছা।”
সোহেল আবদার করল,
“ আমাকেও নিস,ইকবাল।”
আরিফ বলল,
“ ভাই পোলাপানের গাড়িতে অনেক চাপাচাপি হবে। আপনারটায় আমারেও নিয়েন।”
পাশ থেকে আরো দুজন একই সুর তুলল।
ইকবাল নাক ফুলিয়ে বলল,
“ হ শালার পুত কিছু আমার ঘাড়েও উঠিস। এইটা আর ফাঁকা থাকবে কেন?”
ধূসরের ফোন সাইলেন্ট ছিল। তবে হাতের মুঠোয় থাকাকালীন স্ক্রিন জ্বলে উঠল হঠাৎ। ফেসবুকে নোটিফিকেশন এসেছে। লক খুলে ঢুকলো ও। একটা মেয়ে আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট এসেছে। আইডির নাম- প্রহর্ষা শিকদার পিউ। ডিপিতে ডোরিমনের ছবি। কিন্তু ধূসর বুঝে ফেলল এটা কে! এক ঝটকায় রিকুয়েস্ট রিমুভ করে দিলো। ইকবাল দেখেই বলল,
“ পিউপিউ না?
যাহ, ক্যান্সেল করলি কেন?
“ তো কী করব?”
“ এড করবি। কথা বলবি। বেচারি কত আশা নিয়ে রিকু দিলো। সুন্দরী মেয়েদের যা নখরা, ওরা সহজে কাউকে নিজে এড দেয় না।”
“ বাচ্চা মেয়ে সুন্দরী না অসুন্দরী তাও দেখে ফেলেছিস?”
“ ওমা, ছোটো থেকে দেখছি। চুচু ডায়াপার পরে চোখের সামনে ঘুরতো। দেখব না?”
ওদের কথার মাঝেই ফোনে শব্দ হলো আবার। জ্বলজ্বল করল ম্যাসেজ রিকুয়েস্টের সংখ্যাটা। ধূসর অনীহায় ক্লিক করতেই দেখল, পিউয়ের ম্যাসেজ। লিখেছে, আক্সেপ্ট করলেন না কেন? সাথে একটা কোমরে হাত দেয়া স্টিকার।
অমনি ফোনটা ছিনিয়ে নিলো ইকবাল। এক্সেপ্ট অপশনে ক্লিক করে একটা দাঁত কপাটি বের করা ইমুজি(
) পাঠিয়ে লিখল – হাই পিউ!
দু সেকেন্ড নীরবতা এরপর। পিউ তুরন্ত লিখে পাঠাল – আপনি ধূসর ভাই তো?
ইকবাল জিভ কেটে ফোন ফিরিয়ে দিলো আবার,
“ কত চালাক বাবা গো!”
ধূসর দেখল ততক্ষণে নিকনেইম পালটে দিয়েছে মেয়েটা৷ তার শিকদার ধূসর মাহতাব নাম,এখন ঝুলে আছে ধূসর ভাই হয়ে। সেই সাথে কুইক রিয়াকশনে একটা
দিতেই আহাম্মক হয়ে গেল ইকবাল। তব্দা খেয়ে বলল,
“ পিউপিউ তো ফাইভ জি স্পিডে ছুটছে রে ভাই। মিশন ধূসর ভাই, ছাইয়া টু বি তে মনে হচ্ছে না ও হারবে।”
ধূসর বিরক্ত হয়।
চ সূচক শব্দ করে বলে,
“ বাড়ি যাই,আছাড় যদি না মেরেছি!”
“ আর তারপর তোর হিটলার চাচা কি তোকে ছেড়ে দেবে নাকি! রাজকন্যার গায়ে হাত দেয়ার অপরাধে মেরে তোর হাড্ডি ভেঙে দেবে না?”
“ আমার শরীর কি তোর মত নরম, যে ধরলেই ভাঙবে?”
ইকবাল ভীষণ আপ্লুত হয়ে বলল,
“ তা অবশ্য ঠিক। আমার দেহ-মন সবই জীবন্ত ফুল। আসলে আমি নিজেও ফুল। আমার নাম যে কেন ইকবাল হলো! শেষের বাল কেটে ফুল বসালেই তো হতো বল!”
ধূসরের নজর ফোনের স্ক্রিনে। পিউ আবার রিকুয়েষ্ট পাঠিয়েছে। ম্যাসেজে লিখেছে,
ধূসর ভাই, এক্সেপ্ট করুন না!
ধূসর কপাল চুলকাল চোখ বুজে। ভাবল কী করবে! একবার ডিক্লাইনে চাপতে গেল, তক্ষুনি শোরগোল উঠল- খালেদ ভাই এসেছেন।
তাড়াহুড়োয় ফোন ওই ভাবেই পকেটে ভরল সে।
খালেদ মধ্য বয়সি লোক। ভালো, সরব নেতা। এলাকায় সুনাম খুব! দয়ালু,মিশুকে। এত এত সার্টিফিকেট ইকবালের থেকে পেয়েছে ধূসর। আর ইকবাল খুব সহজে কারো প্রশংসা করে না। ব্যক্তিগত ইকবাল একটু মেসি হলেও,প্রফেশনাল ইকবাল ভীষণ প্রখর স্বভাবে!
খালেদ ভেতরে ঢুকতেই পার্টি অফিসের হৈচৈ বাড়ল। ভদ্রলোক হঠাৎ কপাল কুঁচকে বললেন
“ ধূসর নাকি?”
ধূসর আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ আপনিও চেনেন?”
“ আরে চিনব না?, এসো এসো বুকে এসো।”
নিজেই দু পা এগিয়ে সে ওকে বুকে টানলেন খালেদ। ধূসরের আড়চোখ তখন ইকবালের ওপর। পাশে দাঁড়িয়ে পেছনে দুইহাত বেঁধে স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে হাসছে সে। বন্ধুর এই হাসি দেখতে দেখতে ধূসরের চওড়া বুক ভরে গেল তৃপ্তিতে। সাতটা বছর ও দেশে ছিল না। কোথাও ওর চিহ্ন ছিল না হয়ত। কিন্তু তবুও ও ছিল,প্রিয় বন্ধুর স্মৃতি জুড়ে। ইকবাল ওকে বাঁচিয়ে রেখেছিল,নিজের সাথে নিজের কাজে। এমন বন্ধু কতটা ভাগ্যবান হলে পাওয়া যায় ধূসর বুঝতে পারল না। শুধু বুঝল,ওর জীবনের এই পর্যায়ে একটা বড়ো অর্জনের নাম – মো: ইকবাল পাঠান ( প্রধান সভাপতি,উত্তর পার্টি অফিস,ঢাকা)
“ রিপ্লাই করল কিছু?”
পিউ ঠোঁট উলটে মাথা নাড়ল দুপাশে। বলল,
“দেখতে পারিনি। চেইক করার আগেই তো ক্লাসের ঘন্টা পড়ে গেল।”
তানহা বলল,
“ সাথে তোর ইমেজেরও ঘন্টা বেজে গেছে। আর দেখে লাভও নেই। মনে হচ্ছে না এক্সেপ্ট করবে।”
“ কুফা কথা বলবি না৷ করবে না কেন? হয়ত এখন ব্যস্ত আছেন। পরে ঠিক করবে৷”
“ তোকে বলেছে?”
“ বলতে হবে কেন! আমি বুঝি না?”
“ হুউ,ওইজন্যে তো রিকুয়েস্টটাও ডিলিট করে দিলো।”
“ তুই আসলে বুদ্ধু তানহা। এটা হচ্ছে প্রেমের লক্ষ্মণ। উনি রিকুয়েষ্ট এক্সেপ্ট করেননি ভয়ে। ভেবেছেন আমি যে আইডিতে সুন্দর সুন্দর ছবিগুলো দিই সেসব দেখে উনি প্রেমে পড়ে যাবেন। আসলে, মনে মনে হয়ত আমাকেও ওনার ভালো লেগে গেছে। এরপর দেখবি হুট করে এসে আইলাভ ইউ বলে দেবে।”
“ ওরে শখ রে! পরশু প্রথম দেখল,আর আজ আই লাভ ইউতে চলে গেছেন উনি। বিয়ের প্ল্যান করে রাখিসনি তো আবার?”
পিউ লাজুক হেসে বলল,
“ করেছি তো। কাল সারারাত জেগে জেগে ভেবেছি। বিয়েতে কী পরব না পরব! ছেলেমেয়ের দুটো নামও ঠিক করেছি জানিস।
ছেলে হলে পরশ আর মেয়ে হলে ধারা। শ্রাবণের ধারার মতো পরশ ঝরে,পরশ ঝরে…”
তানহা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ ওটা পড়ুক ঝড়ে৷ গান গাইছে ভুলভাল,আবার গোঁফে কাঁঠাল মাথায় তেল দিয়ে বসে আছে।”
“ তোর যে প্রবাদ ভুল!”
“ তোর তো গানেই ভুল।”
“ উফ, ভেটো দিস না। আমাকে উৎসাহ দে। সাহস যোগা।”
“ কচু জোগাব। পিউ তোর বয়স মাত্র পনেরো বছর। আমাদের সামনে এস এস সি ভাই। পরীক্ষা নিয়ে না ভেবে তুই প্রেম নিয়ে পড়ে আছিস। তাও অত বড়ো একটা ছেলের সাথে।
তুই অমন বড়ো ছেলেকে সামলাতে পারবি? তোর গায়ের ওপর পড়লেই তো তলে চ্যাপ্টা হয়ে থাকবি।”
তানহা ভালোর জন্যে বললেও,ওই দৃশ্য ভেবেই শিউরে উঠল পিউ। লজ্জায় দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল। তানহা হতাশ হয়ে বলল,
“ হায় আল্লাহ আমি কাকে কী বলছি?”
ক্লাস চলছে শিরিন ম্যামের। ভদ্রমহিলা খেয়াল করলেন পেছনের দুই বেঞ্চ সামনে বসা দুজন পড়া রেখে বকবক করছে। অমনি চ্যাঁচিয়ে বললেন,
“ এই, এই মেয়েরা, কী কথা বলছো? দাঁড়াও, দাঁড়াও দুজন দাঁড়াও।”
পিউ দাঁড়াতে দাঁড়াতে কটমট করল,
“ সব তোর জন্যে।”
“ আমি কী করলাম!”
শিরিন বললেন,
“ আবার কথা বলছো? কান ধরো। ধরো বলছি!”
দুজনে ঠোঁট ফুলিয়ে নিজেদের কানে হাত দিতেই উনি বললেন,
“ উহু,নিজের কান না। দুজন দুজনের কান ধরো। কী হলো? তাড়াতাড়ি!”
পুরো ক্লাস উৎসুক হয়ে চেয়ে। কেউ মিটিমিটি হাসছে। পিউ গাল ফুলিয়ে তানহার কান ধরল,তানহা ধরল ওর কান। মেয়েটার মুখ কাঁদোকাঁদো। সবাই কেমন মজা নিচ্ছে! শিরিন ম্যাম ফের পড়াতে ব্যস্ত হলেন। তানহা হঠাৎ চেয়ে দেখল পিউ ঠোঁট চেপে মিটিমিটি হাসছে। চোখাচোখি হতেই ভ্রু উঁচিয়ে জিভ দেখাল। অমনি ফিক করে হেসে ফেলল মেয়েটা। হাসির শব্দে ক্লাসের সবাই তাজ্জব চোখে ফিরে চাইল ফের। শিরিন ম্যাম ভয়ানক চটে বললেন,
“ কী বেহায়া দুটোতে। যাও, বের হও! বের হও আমার ক্লাস থেকে।”
চুপচাপ মাথা নুইয়ে বাইরে এলো ওরা। তানহা চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ ধুর ব্যাঙ, ভালো ক্লাসটা মিস হয়ে গেল। শাঁকচুন্নিগুলো তো নোট চাইলেও দেবে না।”
এমন সিরিয়াস কথার পিঠে উত্তর না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফিরল মেয়েটা। পিউ দুপাশের দুটো বেনুনির গোছা নাড়তে নাড়তে গুণগুণ করছে। তানহা কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“ কী ভাবছিস, ওই?”
পিউ স্ফূর্ত চিত্তে বলল,
“ আমি না, এখন থেকে আমার সব কিছু ধূসর রঙের করে ফেলব বুঝলি!”
“ কীহ? মানে কী?”
“ মানে, আমার যে ওনার ওপর কত মারাত্মক ফিলিংস কাজ করছে সেটা ওনাকে বোঝাতে হবে না? তাই এখন থেকে আমার জামাকাপড়, এমনকি ঘরের সব কিছু ধূসর রঙের হবে। ধর, ধূসর রঙের জামা পরব, ধূসর রঙের খাবার খাব।”
তানহা ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“ পটিও কি ধূসর রঙের করবি?”
পিউ খিটমিট করে বলল,
“ আবার? তোর মুখে কি ভালো কথা নেই?”
তক্ষুনি ক্লাসরুম থেকে চ্যাঁচিয়ে উঠলেন শিরিন,
“ এই মেয়ে, তোমরা আবার ওখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছো? প্রিন্সিপালকে ডাকব আমি?
পিউ জিভ কাটল। তানহার হাতটা ধরেই এক ছুটে করিডোর পেরিয়ে চলে গেল কমন রুমের দিকটায়।
**
গাড়ি চলছে এই রোড, ওই রোড পেরিয়ে। কোথাও কোথাও থামছেন খালিদ। চেনাজানা মানুষদের সাথে কুশল বিনিময় করছেন।
ইকবালের বেশ খিদে পেয়েছে। ব্যস্ততায় সকালের নাস্তা ভালো করে করা হয়নি। এখন খেতে নামলেও বিপদ। পেছনের গাড়িটায় ছেলেপেলে ভরতি। স্লোগান দিচ্ছে ওরা! ইকবাল নামলেই সব হুমড়ি খেয়ে পড়বে। ঘাড়ে ঝুলে বলবে,
“ ভাই, আমাদেরও খাওয়ান।”
ইকবাল গাড়ির জানলা থেকে বাইরে চাইল একবার। হঠাৎ পরিচিত সেই রাস্তাটা দেখে পিঠ সোজা করে বসল। তার উদগ্রীব চোখমুখ দেখে ধূসর বলল,
“ কী দেখছিস?”
মাথা ফিরিয়ে আনল ইকবাল।
“ কই, কিছু না।”
ধূসর কপাল কুঁচকে রোডটায় চোখ বোলায়। জিজ্ঞেস করে,
“ সামনে পুষ্পর কলেজ না?”
ইকবালের চোখের মণি আটকে গেল। ফ্যাসফ্যাসে শ্বাস নিয়েও,
সব দাঁত বের করে বলল,
“ ওমা, তাই বুঝি? আমি তো জানতামই না।”
ধূসর কিছু বলল না। ইকবাল দুই ঠোঁট ফোলায়,দম ছাড়ে। ভাবে,ধূসর কিছু বোঝেনি। ফের পাঞ্জাবির কলার ঝাঁকিয়ে নিজেকে বাতাস করল সে। হঠাৎ ড্রাইভারকে বলল,
“ জুয়ান ভাই, গাড়ির এসিটা কেন লাগিয়েছি জানেন?”
“ ক্যান লাগাইছেন ভাই?”
“ বাপের জন্মে তো এসি দেখিনি। গাড়িতে চড়তে চড়তে দেখব ভেবেছিলাম। ভালো করেছি না?”
ব্যাঁকাত্যারা কথার আভাসে ইঙ্গিত বুঝে গেলেন জুয়ান। জিভ কেটে এসি চালু করলেন দ্রুত৷
হঠাৎ সামনে খালেদের গাড়ি থামল। দেখাদেখি ওদের গাড়িতেও ব্রেক কষতে হয়। ইকবাল গাড়ির কাচ নামাতেই খালেদের সহকারি নেমে এসে বললেন,
“ এমপি স্যার এই কফিশপে সবাইকে নিয়ে আপনাকে ঢুকতে বলেছেন। ছেলেপেলে ট্রীট চাইছে তো!”
ইকবালের মুখ চকচক করে উঠল।
ধূসরকে বলল
“ বন্ধু আয়, পেট পূজো দিই।”
ধূসর নামল ঠিকই, তবে বলল,
“ আমার খিদে নেই। “
কফিশপে ছেলেপেলে শুয়ে পড়তে পারছে না। চেয়ার টেবিলে ধরছে না ওদেরকে। ইকবাল ভেতরে জায়গা নেই দেখে,বাইরে চেয়ার টেনে বসল। যদিও ও গেলেই কেউ না কেউ আসন ছেড়ে দিতো,কিন্তু ওই হুজুগে সম্মান ওর চাই না। ধূসর আগেই বসাছিল এখানে। পায়ের ওপর তোলা পা-টা নাড়তে নাড়তে এদিক-ওদিক দেখছিল সে। সাত বছরে কত কী বদলে গেছে এখানকার! এত এত ফুডকোর্ট,কফিহাউস কিচ্ছু ছিল না। ইকবাল একটা বার্গার আর কোল্ড কফির অর্ডার করেছে। তার আগে বলল, দুটো কোকের ক্যান দিয়ে যেতে। কোক এলোও ফটাফট। ও একটা ক্যান ধূসরের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ তারপর বন্ধু, বলো তোমার কী খবর? কাল হল্লাহল্লিতে ভালো করে কথাই হয়নি।”
“ কীসের খবর?”
“ পড়াশোনা তো শেষ। গ্রাজুয়েট হয়ে ফিরলি। এবার কী করবি?”
“ গাড়ি কিনব।”
“ হুম বড়োলোকের ছেলে, স্বাভাবিক ব্যাপার।”
“ নিজের টাকায় কিনব।”
ইকবাল টেবিলে থাপ্পড় মেরে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল
“ আরেব্বাস তাহলে তো আরো দারুণ ব্যাপার। কী রঙের কিনবি?”
“ মাই ফেভ্রেট,ব্লুউউউ।”
“ আরেহ মামা, অলসো মাই ফেভ্রেট! কিন্তু এখন যা দাম গাড়ির। হবে?”
“ হবে না কেন? ওখানে তো বসে ছিলাম না। পার্শিয়াল স্কলারশিপ ছিল। পাশাপাশি একটা রিসার্চ কনসাল্টিং এ ছিলাম। ইনভেস্ট করেছি ক্রিপ্টোতে। সব মিলিয়ে ব্যাংকে যা এমাউন্ট আছে তোর বউ-বাচ্চা নিয়ে কয়েক বছর বসে খাওয়া যাবে।”
“ বলিস কী হতচ্ছাড়া, এই বয়সে এত টাকা? তাহলে ব্যবসা ধর।”
ধূসর সদর্পে বলল,
“ না। আমি রাজনীতি করতে এসেছি। এসব ব্যবসায় পোষাবে না।”
ইকবালের গলায় কোক আটকে গেল।
হাঁসফাঁস করে উঠল সে। চোখ কপালে তুলে বলল,
“ রা-জনী-তিইই? কী বলিস ভাই! তোর হিটলার চাচার কথা ভুলে গেলি? যে জন্যে তোকে পিটিয়ে দেশ ছাড়া করল,এখন আবার সেখানেই আসবি। খবর শোনা মাত্রই তো ঐ ব্যাটার পেছন পুড়ে যাবে।”
ধূসর চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ ইকবাল!”
“ সরি!”
ধূসর অতীষ্ঠ শ্বাস ফেলে কোকের ক্যান খুলল৷
পাশাপাশি দীর্ঘশ্বাস টানলো ইকবাল। ওর শুকনো মুখ,আর বারবার কলার ঝাঁকানো হাবভাব ধূসর খেয়াল করেছে।
জিজ্ঞেস করল,
“ এসে থেকে দেখছি তোর চোখমুখ ঠিক নেই। কী হয়েছে?”
ইকবাল জিভে ঠোঁট ভেজাল। পুষ্পর কথাটা ও এখন অবধি তেমন কাউকে শেয়ার করতে পারেনি। সোহেল জানে অল্পস্বল্প। তবে যাকে কিছু না বললে ওর পেটের ভাত হজম হয় না, সেই ধূসরের বোনই যে পুষ্প। এটা সাপের পেছন থেকে ডিম চুরি করার মতো ভয়ানক ব্যাপার! কিন্তু এই টালমাটাল অবস্থা থেকে ওর মুক্তি দরকার। আর কতদিন মন আর মাথার সাথে লড়াই চালিয়ে যাবে? ইকবাল চোখ ঘোরাতে ঘোরাতেই মাথায় একটা দারুণ বুদ্ধি এলো। অমনি গুরুতর ভঙ্গিতে বসল সে।
জানে পানি শুকিয়ে গেছে এমন হাহুতাশ করে বলল,
“ আমি না একটা মেয়েকে ভালোবাসি,কিন্তু বলতে পারছি না।”
ধূসর অবাক হয়, ভ্রু কুঁচকে বলে,
“ তুই একটা মেয়েকে ভালোবাসিস? কবে থেকে? আমাকে তো বলিসনি।”
“ তুই নিউইয়র্কে গিয়ে আমাকে অত সময় দিয়েছিস? এসব বলার জন্যে একটা পার্ফেক্ট দিন-ক্ষণ চাই না? যাক গে শোন, আবার প্রথম থেকে শোন,আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি। তো ওর একটা জল্লাদের জল্লাদ,বজ্জাতের সাড়ে সর্বনাশ করা বড়ো ভাই আছে,আমার দেখলেই ভয় ভয় লাগে। এখন আমার করণীয় কী?”
“ তুই কি মেয়ের ভাইকে বিয়ে করবি?”
ইকবাল জিভ কেটে বলল,
“ ছি, সামলাতে পারব না।”
ধূসর নাক ফুলিয়ে চাইতেই, কাঁদোকাঁদো গলায় বলল –
“ না।”
“ তাহলে ওর ভাইয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে,ভাইয়ের বোনকে নিয়ে ভাব। যা হবে দেখা যাবে।”
ইকবাল চোখ বড়ো বড়ো করে বলল,
“ সত্যি? ওর ভাইকে নিয়ে ভাবব না,সত্যি?”
“ না। ভালোবাসা হচ্ছে অনুভূতি। আর অনুভূতি আসে মন থেকে। মনের কথা শোন; তোর মন কী বলে?”
ইকবাল দু সেকেন্ড থম মেরে রইল। পরপর অস্থির হয়ে বলল,
“ মন বলে আই লাভ হার। আই ওয়ান্ট মাই লাভ! এন্ড মাই লাভ ইজ প… !”
পুষ্পর নামটা গিলে নিলো সে। ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ আমার না ওকে ছাড়া ভালো লাগে না। গোসলে ঢুকলেও ওর কথা মনে পড়ে। মনে হয় আমি শাওয়ার ট্যাপ,ও আমার জল ; আমি বেসিন,ও আমার কল।”
“ এক লাথি মারব! এগুলো বলেছি আমি?”
“ আহহা, রেগে যাচ্ছিস কেন?
শোন না, সব কথার এক কথা মেয়ের ভাইকে নিয়ে ভাবনা না, তাইত!”
“হুঁ।”
ইকবালের ঠোঁট দুটোয় চকচকে হাসি ফুটল অমনি। ভাই নিজেই যখন বলছে তাকে নিয়ে না ভাবতে,ইকবালের আর চিন্তা কী? বুক ফুলিয়ে বলল,
“ ওক্কে, আজ থেকে এই হৃদয় হতে ওর ভাই আউট,ভাইয়ের বোন পার্মানেন্টলি ইন। তাই না রে ধূসর?”
ধূসর চ সূচক শব্দ করল। বিরক্ত হলেও কিছু বলল না। ইকবাল নিজেই মাথা নাঁচিয়ে হাসল। তার ভালো লাগছে,আর ভয় লাগছে না।
মুখটাও হাসিহাসি। গর্ব হচ্ছে নিজের বুদ্ধি নিয়ে। একটা সলিউশান পেলো,আবার ধূসরটাও কিছু ধরতে পারেনি। উজ্জ্বল চেহারায় কোকের ক্যানে চুমুক দিলো সে। অথচ ছেলেটা নিজের আনন্দ ছাপিয়ে খেয়ালই করল না,আরেক জোড়া চতুরের মতো দৃষ্টিদের। ধূসর বাঁকা হাসে। দূরদর্শী নজরে চেয়ে চেয়ে দেখে ইকবালের ঝলমলে আনন্দ। বিড়বিড় করে বলে, “গর্দভ!”
খাবার দাবার এলো। বার্গারে বড়ো বড়ো কামড় দিয়ে চোখের নিমিষে সাবাড় করল ইকবাল। ঢেকুর তোলার মাঝেই ধূসর
উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ বিল দিয়ে আসি।”
“ খালেদ ভাই দেবেন তো।”
“ আমি এখনো জয়েন করেনি,সো স্টিল নাউ আমি দলের কেউ নই। অযথা ফেবর নেবো না।”
ধূসর ভেতরে ঢুকে যায়। ইকবাল টেনে টেনে বলে,
“ ওয়াহ ওয়াহ,হতচ্ছাড়াটার কী এ্যাটিটিউড ওয়াহ! ফিদা হয়ে গেলাম।”
সেসময় রাস্তার পাশে একটা রিকশা থেমেছে। নিচে নামল দুটো মেয়ে। ইকবাল একবার একটু তাকিয়ে চোখ সরিয়ে আনল। অমনি একজন ছুটে এসে বলল,
“ আপনি, ইকবাল পাঠান না?”
কিছুটা হকচকিয়ে মাথা তুলল সে,
“ জ-জি।”
“ ফেসবুকে আপনার কত ভিডিও দেখেছি। কত স্লোগান দেখেছি, বক্তব্য শুনেছি। একটা সেলফি তুলব ভাইয়া?”
ইকবাল অপ্রস্তুত হাসল। কী করবে না করবে দ্বিধাদ্বন্দ্ব! পাঞ্জাবি ঝেড়ে ভদ্রতায় উঠে দাঁড়াল এরপর। মেয়েটি ফোন তার বান্ধবির কাছে দিয়ে এক ঝটকায় ইকবালের পাশে এসে দাঁড়াল। দুজনকে এত কাছাকাছি দেখেই দপ করে মাথার ব্রক্ষ্মতালু অবধি পুড়ে গেল পুষ্পর। কটমট করতে করতে হাতের আইসক্রিমটা জোরে চেপে ধরল মুঠোয়। ওরা এক সাথে চার -পাঁচজন ছিল। কলেজ শেষে ফুচকা খেতে এসেছিল এখানে। পাশের জন বলল,
“ আল্লাহ পুষ্প, মেয়েটা কে আবার? হায়হায় গেল, তোর বোধ হয় ইয়েটিয়ে হওয়ার আগেই গেল!”
ওপাশে মেয়েটি যখন ইকবালের সাথে হ্যান্ডশেক করল,পুষ্প আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাতের আইসক্রিম ছুড়ে ফেলেই গাড়ি-ঘোড়া মারিয়ে হনহনে করে রাস্তা পাড় হলো সে। ততক্ষণে মেয়েটি চলে গেছে। ইকবাল স্বস্তির শ্বাস নিয়ে বলল,
“ বাঁচলাম!”
যেই চেয়ারে বসতে যাবে, চোখ পড়ল সামনে। আগুনের স্ফুলিঙ্গ মাথায় বয়ে তেড়ে আসছে পুষ্প। চোখদুটোয় বারুদ। কটমটে চাউনি। ইকবালের নিঃশ্বাস গলায় ঝুলে পড়ল। ভয়ে ভয়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল ও। পুষ্প ফুঁসতে ফুঁসতে সামনে এসে থামল। আঙুল তুলে কিছু বলতে যাবে,আচমকা মাথা ঘুরে ধপ করে মাটিতে বেহুস হয়ে পড়ে গেল ইকবাল!
চলবে…
কোত্থেকে কাহিনি, কে কী এসব প্রশ্ন না করে পড়তে থাকেন। ধূসর বিদেশ থেকে আসার তিন বছরের শুরুর কাহিনী এগুলো। কিছু নতুন,কিছু পুরোনো মিলিয়ে একটা জগাখিচুরি জার্নি। প্রশ্ন না করে এঞ্জয় করুন!
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৯.খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৪
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১০