Golpo romantic golpo আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১২


#আলতোছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন(১২)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
কাল ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখ। পিউয়ের জন্মদিন। পনেরো পেরিয়ে ষোলোর কোঠায় পা দেবে এবার। কিন্তু প্রতি বছর বাড়িতে এ নিয়ে উৎসব লাগলেও এবারে কোনো আয়োজন হচ্ছে না। মিনা বেগম সবাইকে কড়া ভাবে মানা করেছেন,পরীক্ষার মধ্যে এসব অনুষ্ঠান-ফনুষ্ঠান বাদ। পড়াচোর মেয়েটা সবে সবে টেবিলের সঙ্গ ধরেছে৷ পরে দেখা যাবে, ওসব বাদ দিয়ে আবার প্রোগ্রাম নিয়ে লাফাবে। কী পরবে,কী খাবে, কোন ফ্লেভারের কেক বানাবে!
পিউয়ের অবশ্য এ নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই।
কারণ,কোনো পার্টি না হলেও সবাই যে ওকে গিফট দেবে, তা ও জানে।
কাল পিউয়ের অংক পরীক্ষা। এরপর সায়েন্সের কটা সাব্জেক্ট শেষ হলেই,আর চিন্তা নেই। এখন রাত এগারোটা বাইশ বাজে। কারেন্ট নেই। জেনারেটরেও ঝামেলা চলছে। আই-পি-এসে ফ্যান,আর লাইটটা জ্বলছে কোনোরকম। এত বড়ো বাড়িতে এভাবে সাপ্লাইয়ের কারণে এসি বন্ধ!
সেজন্যে গরমে ভারি অস্থির হয়ে পড়ল পিউ। এত ঘন লম্বা চুল সামলানো কষ্টের। সেজন্যে ও সব সময় পাঞ্চক্লিপে আটকে তালুতে তুলে রাখে। স্কুলে গেলেও দু ভাঁজ করে পনিটেইল করে যাতে চুল পিঠ না ছোঁয়।
মিনা বেগম তক্ষুনি নিজের ঘর হতে চ্যাঁচালেন,
“ পিউ,এখন ঘুমা। কাল পরীক্ষা না? পরীক্ষার রাতে এত পড়তে নেই।”
পিউ কথা কানে নিলো না। সম্পাদ্য মুখস্থ করছিল। জবাব দিলো,
“ আর কিছুক্ষণ আম্মু।”
মিনা ভারি আশ্চর্য হলেন। বিড়বিড় করে বললেন,
“ কী যে হলো মেয়েটার! কোন জাদুবলে এমন পড়ার রোগ ধরেছে কে জানে!”
পড়তে পড়তে পিউ বারবার ঘাড় চুলকাচ্ছিল। অস্থিরতায় বইটা ঝুঁপ করে বন্ধ করেই, পাখির মতো ফুরুৎ করে পুষ্পর রুমের পানে চলল হঠাৎ।
পুষ্পর ঘর তখন অন্ধকারে মাখা। ফিসফিস করে ফোনে কথা বলছে। দরজায় ছায়ামূর্তি দেখেই কান থেকে ফোন নামিয়ে ফেলল তড়িৎ। পিউ ঢুকল লাফিয়ে-চড়িয়ে। বলল,
“ ওমা, লাইট বন্ধ কেন?”
পুষ্প হাঁপ ছেড়ে বলল,
“ ওহ তুই!”
পিউ লাইট জ্বালাল। দরজা চাপিয়ে কাছে এসে বসল ওর। পুষ্প কানে ফোন ধরে বলল,
“ পিউ এসেছে।”
ইকবাল ওপাশ থেকে মজার কিছু শোনাল,হেসে ফেলল পুষ্প। পরপর খেয়াল করল পিউয়ের ঠোঁটে হাসি নেই। গলা-ঘাড়- মুখে ঘাম চিকচিক করছে। পুষ্প বোনের গালে হাত দিয়ে বলল,
“ কী হয়েছে পিউ? শরীর খারাপ!”
পিউ দুপাশে মাথা নাড়ল।
বলল,
“ আপু কাল তো আমার জন্মদিন। আমাকে কোনো গিফট দিবি না?”
“ দেবো কিনা সেটাতো আগেভাগে বলা যাবে না। কেন, তোর কি বিশেষ কোনো ডিমান্ড আছে?”
পিউ বেজার মুখে ঘাড় নেড়ে বোঝাল,আছে।
“ কী?”
“ আপু আমি চুল সামলাতে পারছি না। এত তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যায় কেন? দ্যাখ এইটুকু গরমে গলায় র‍্যাশ উঠে গেছে। তুই
আম্মুকে একটু রাজি করিয়ে দে না,
চুলটা কাঁধ সমান করব।”
পুষ্প দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ ক্ষেপেছিস? এই কথা বললে আম্মু তোকেও মারবে সাথে আমাকেও মারবে।”
পিউ ওর হাঁটু চেপে অনুনয় করল,
“ প্লিজ আপু,আমি তোর একটা মাত্র বোন। আমার জন্যে একটু মার খেতে পারবি না! আমার ভালো লাগে না এত বড়ো চুল। প্লিজ কিছু কর প্লিজ!”
পুষ্প বিপন্ন মুখে বলল,
“ আচ্ছা আচ্ছা, দেখছি।”
“ পাক্কা?”
পুষ্প হাসল,
“ আচ্ছা।”
পিউ ডানা মেলে উড়তে উড়তে চলে গেল আবার।
ওপাশে ইকবাল বলল,
“ কী হয়েছে মাই লাভ! আমার বোন কাঁদছে কেন?”
“ কাঁদছে না। বায়না করছে। ওর চুলের এত গ্রোথ! ছোটো মানুষ তো, সামলাতে পারে না। আবার আম্মুর ভয়ে কাটতেও পারে না। ঘাড় সমান করবে বলছে। আমাকে বলল জন্মদিনের গিফট হিসেবে আমি যেন আম্মুকে রাজি করিয়ে দিই।”
ইকবাল দুই মিনিট চুপ থেকে বলল,
“ আচ্ছা,মাই লাভ আমার একটা জরুরি কল এসেছে। রিসভ করব?”
“ ইকবাল! এভাবে পারমিশন চাইছ কেন? আমি মোটেও টক্সিক গার্লফ্রেন্ড নই। আচ্ছা তাহলে এক কাজ করি,কাল তো দেখা হচ্ছেই। আজ তবে ঘুমা…”
“ নায়ায়া, আমি পাঁচ মিনিটেই কল ব্যাক করছি।”
লাইন কেটে দিতেই পুষ্প হেসে ফেলল। তারপর ঝট করে চাইল ঘড়ির দিকে। ১১: ৫৬ বাজে! আর তো চার মিনিট বাকি…
ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে। স্ক্রিনে ইকবালের কল দেখে ভ্রু কুঁচকে ধরল পিউ।
“ হ্যাঁ ভাইয়া!”
“ পিউপিউ, খবর কী সত্যি? তুমি চুল কাটতে চাইছ?”
“ হ্যাঁ মানে ঐ…এত লম্বা চুল ভালো লাগে না তো।”
“ কিন্তু তুমি কি জানো,ধূসরের লম্বা চুল পছন্দ?”
পিউ চমকে বলল,
“ হ্যাঁ? সত্যি!”
“ য়েস।”
ও গাল ফুলিয়ে বলল,
“ আপনি আপুর হয়ে আবার মিথ্যে বলছেন না তো ভাইয়া? ধূসর ভাই কখনো বলেছে এই কথা?”
“ উম,মানছি আমি দশ কথায় দুটো সত্যি কথা বলি। কিন্তু তোমার সাথে কেন মিথ্যে বলব পিউপিউ? আম অনেস্ট,ধূসর আসলেই লম্বা চুল পছন্দ করে। সেই কলেজে থাকতে একবার বলেছিল। তোমাদের দুবোনের কথায় মনে পড়েছে।”
পিউ চুপ করে হাতের নখ কামড়াল। ইকবাল বলল,
“ এখন তুমিই ভাবো, কী করবে! রাখি হ্যাঁ?”
ইকবাল লাইনও কাটল,সঙ্গে সঙ্গে দরজার চৌকাঠ হতে পার্টি পপার ফাটল ভীষণ শব্দে। ছলকে পিছু ফিরল পিউ। মূহুর্তে কতগুলো কণ্ঠ সমস্বরে চ্যাঁচাল – “ হ্যাপি বার্থডে!”
বাবা থেকে রাদিফ পর্যন্ত সবাই আছে। পিউ হেসে,উঠে দাঁড়াতেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল পুষ্প। কেক জবার হাতে।
সকলে মিলে উইশ করল ওকে। আমজাদ চুমু দিলেন,মিনা আদর করলেন। চাচা-চাচিরা উপহার দিলো। সাদিফ উইশ করার সাথে সাথে ফোম স্প্রেটা সারামুখে মেখে দিলো পিউয়ের।
জবা তা নিয়ে ধমকালেন ওকে। নিজের আঁচল দিয়ে মেয়েটার মাথা-মুখ মুছে দিলেন।
রুবায়দা কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
“ শুভ জন্মদিন মা। এইত পুচকে ছিলি এত বড়ো কবে হলি হ্যাঁ?”
আফতাব শিকদার ওর গলায় একটা স্বর্ণের চেইন পরিয়ে দিলেন। পিউ বেশ অবাক হলো!
ভদ্রলোক হেসে বললেন,
“ এবার প্রোগ্রাম হয়নি তো,তাই পুষিয়ে দিলাম।”
মিনা বললেন,
“ এত দামি উপহার কেন দিলে ভাই?”
“ কী যে বলেন ভাবি,আমাদের মেয়ের কাছে দাম শব্দটা আবার কী হ্যাঁ?”
ভদ্রমহিলা পিউকে চোখ রাঙিয়ে সতর্ক করলেন,
“ হারায় না যেন! সাবধানে।”
পিউ চেইনে হাত বুলিয়ে ভাবল,
“ হারাবে কেন? হবু শ্বশুর মশাইয়ের দেয়া উপহার,আমি কাছ ছাড়া হতেই দেবো না।”
তারপর কেকটা রাখা হলো সামনে। সাদিফ ওপরে মোম সেট করে ওর হাতে ছুরি দিলো। কিন্তু পিউ খেয়াল করল গোটা বাড়ির মানুষের মাঝে ঐ একটা মানুষ নেই। ধূসর ভাই কি ওর সাথে কেক কাটতেও আসবেন না? জিজ্ঞেস করেই বসল,
“ ধূসর ভাই কোথায় মেজো মা?”
সাদিফ বলল,
“ কতগুলো কল দিলাম,ধরল না।”
“ ওনার জন্যে অপেক্ষা করি?”
আফতাব গমগম করে বললেন,
“ দরকার নেই। সে তো তার মতো সারাদিন ব্যস্ত থাকে। তুমি কাটো!”
অগত্যা পিউ কেকে ছুরি বসাল৷ কিন্তু মোমের ন্যায় শুভ্র মুখটা কালো হলো ওর। আমজাদ খেয়াল করে বললেন,
“ মন খারাপ করো না। পরের জন্মদিন অনেক বড়ো করে সেলিব্রেট করব,কেমন?”
পিউ মলিন চোখে হাসে। যুতসই কোনো উত্তর দিতে পারে না!


১০০০ টাকা,তাও আবার ভাংতি। দুশো,একশো টাকার নোটগুলো সবুজ থুতু দিয়ে গুণল। রাখল পকেটে। বলল,
“ আপু চিন্তা নেই। কাজ হয়ে যাবে। আমাদের রেকর্ড কত ভালো সুহানা আপু বলছে না আপনাকে!”
মারিয়া বলল,
“ বলেছে। ওর থেকে শুনেই তো তোমাদের ডেকেছি। তোমরা নাকি মারপিটে এক্সপার্ট! ওদের এলাকায় তোমাদের নাকি অনেক নাম!”
“ তাইলে আবার! হইতে পারে কলেজে পড়ি,দেখতে ছোটো খাটো। কিন্তু বুকের পাটা আশি ইঞ্চি আপু।”
মারিয়া বলল,
“ আপাতত এক হাজার দিলাম,বাকিটা কাজ শেষ হলে পাবে। দেখো,আবার ঝুলিও না আমাকে।”
“ আরে না না। রিল্যাক্স করেন। আজকে ঐ শালার হাত-পা ভাঙব দাঁড়ান।”
মারিয়া আঁতকে বলল,
“ না না,হাত পা ভাঙতে হবে না। শুধু ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিলেই হবে। কথা বলার সময় ওটা বেশি ফোলায় তো!”
সবুজ বলল,
“ আচ্ছা তাহলে একটা দাঁত অন্তত ফালাব। নাহলে তো আমাদের রেকর্ড থাকবে না। কী রে কী বলিস!”
সাথে দাঁড়ানো চারজন হ্যাঁ হ্যাঁ করল।
মারিয়া পড়ল চিন্তায়। দাঁত ছাড়া কি ছেলেটাকে ভালো দেখাবে? তারপর ভাবল,তাতে আমার কী? হোক যা খুশি।
চাপা কণ্ঠে বলল,
“ আচ্ছা মেরো। কিন্তু বেশি কিছু করো না। নাকে স্টিচ লাগালেই যেন সেরে যায় কেমন!
আর শোনো, আমি ঐ গাছের আড়ালে থাকব। তোমরা তোমাদের কাজ করবে। জেনে নিয়েছ তো ব্যাটা কখন আসে না আসে!”
সবুজ শার্টের হাতা গুটিয়ে বলল,
“ জি সব খোঁজ খবর নেয়া শেষ। এই সময় এই রাস্তা দিয়ে যায়। কালো-সবুজ রঙের মোটরসাইকেল। চিন্তা কইরেন না,আমাদের ভরসা করছেন সম্মান রাখব।”
মারিয়া হাসল একটু। মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল ওইপাড়ে গাছের কাছটায়। সাদিফকে মারার জন্যে ও কিছু ছেলেপেলে ভাড়া করেছে। মাটির ব্যাংক ফাটিয়ে হাদিয়া দিচ্ছে ওদের। এখন শুধু কাজ হলে হয়!
মারিয়া দুইহাতের তালু ঝারতে ঝারতে চিড়বিড় করল,
“ ব্যাটা ফার্মের মোরগ, তোর দাঁত সহ শেষ দিন আজ।”
রওনক ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আজ পার্টি অফিসে তেমন কাজ ছিল না।
বাইক বেঁচে দেয়ায়, যাতায়াতে সমস্যা হয় একটু। মিখাইলদের বললেই লিফট দিতো,কিন্তু অহেতুক এই ফেবর নেয়া রওনকের পছন্দ নয়। তার চেয়ে এখান থেকে বাস ধরে চলে যাবে! পথের দিকে ওর উদগ্রীব চাউনির মাঝেই,আচমকা একটা মোটরবাইক ব্রেক কষল পাশে। কিছুটা স্ফূর্ত গলায় বলল,
“ আপনি রওনক না?”
রওনক পাশ ফিরে চাইল। মাথায় হেলমেট, চোখে চশমা, লাল টিশার্ট পরা ছেলেটাকে দেখে
ভাবল- হয়ত ওকে চেনে।
রাজনীতির দরুন ও চেনে না,অথচ ওকে চেনে এমন ছেলেপেলে অভাব নেই। বলল,
“ জি।”
মূহুর্তে হেলমেট খুলল সাদিফ। হেসে বলল,
“ আমি সাদিফ। ধূসর ভাই? ওনার কাজিন।”
রওনকের গোছানো ভ্রু ছড়িয়ে গেল। পালটা হেসে বলল,
“ আরে,তাই?হ্যালো হ্যালো…”
দুজন হ্যান্ডশেক করল।
“ কিন্তু তুমি আমাকে চিনলে কী করে?”
“ ইকবাল ভাইয়ের ইনস্টায় ছবি দেখেছিলাম। সম্পাদক নির্বাচনে উইশ করে পোস্ট করেছিল। তারপর থেকে তো ধূসর ভাইয়ের সাথেও কত ছবি দেখছি! বাই দ্য ওয়ে,আপনি এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন যে। কোনো হেল্প দরকার?”
“ হ্যাঁ আসলে বাসের জন্যে। বাসায় ফিরব তো।”
“ গুলশানে থাকেন না? আসুন আমি পৌঁছে দিচ্ছি।”
সহযাত্রীর হেলমেট বাড়িয়ে দিতেই,রওনক সহাস্যে উঠে বসল পেছনে। অমনি সাই করে বাইক ছুটল রাস্তায়।


দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মারিয়ার পায়ে ঝিম ধরে যাচ্ছে। ওদিকে ফুটপাতের ওপর বসে আছে সবুজ আর তার সঙ্গীরা৷ কিন্তু সাদিফের দেখা নেই। সবার নেতিয়ে পড়ার মাঝেই হর্ন বাজিয়ে, ধুলো উড়িয়ে বাইকের ছাঁয়া মিলল। ছেলেপেলে তড়াক করে দাঁড়িয়ে গেল অমনি। ওদের হাতে হকিস্টিক আর ব্যাট! মারিয়াও উৎসুক চোখে চেয়ে থাকে। বাইক যেই কাছাকাছি এলো,সবুজ ব্যাট দিয়ে হেডলাইটে বাড়ি মারল সজোরে। মূহুর্তে গতি হারিয়ে বাইকসহ পিচের ওপর কাত হয়ে পড়ে গেল সাদিফ। রওনক থুবড়ে পড়ল আরো এক হাত দূরে। মাথায় থাকা হেলমেটটা খুলে গড়িয়ে পড়ে যেতেই,বিস্ময়ে দুইহাতে মুখ চেপে ধরল মারিয়া।
“ ভাইয়া! ইইই আল্লাহ,ভাইয়া এখানে কী করছে?”
সাদিফ হকচকিয়েছে ভীষণ রকম। চশমার গ্লাস ফেটেছে উপুড় হয়ে পড়ায়। ঝাপসা চোখে ঠিক করে তাকানোর আগেই সবুজ গিয়ে ওর গেঞ্জির কলার ধরে তুলল। অমনি পেছন থেকে এসেই ওর ঘাড় খপ করে চেপে ধরল রওনক। ভড়কে চাইল ছেলেটা। রওনককে দেখেই ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,
“ ভাই,আপনে?”
রওনক কটমটিয়ে বলল,
“ তোরা পাশের এরিয়ার না? তোর বাপের নাম সাহাবুদ্দিন না?”
সবুজ ভয়ে ভয়ে তার দলবলের দিকে চাইল। তুরন্ত, হোচট খেল চোখে। কেউ নেই! সব রওনককে দেখে পালিয়েছে আগেই। সবুজ মূহুর্তে কাইকুই করে উঠল,
“ ভাই সরি ভাই,বুঝিনাই আপনের লোক। সরি সরি!”
ঘাড় তখনো ধরে রাখল রওনক।
“ ওর সাথে তোদের কীসের শত্রুতা? মারতে এসছিলি কেন?”
সাদিফ বলল
“ এদের আমি চিনিও না। দেখে তো আমার চেয়ে জুনিয়র মনে হচ্ছে।”
বলতে বলতে বাইক দাঁড় করল নিজের। যেই দেখল হেডলাইট চুরমার হয়ে গেছে, মাথাটা চটে গেল অমনি। তড়বড়িয়ে এসেই
সবুজের কলার ধরে বলল,
“ আমার হেডলাইট ভেঙেছিস,জরিমানা দে। কুইক!”
সবুজ অসহায় এখন। বিনা বাক্যে পকেট থেকে ওই এক হাজার টাকাই বের করে দিয়ে বলল,
“ আর নাই!”
এই দৃশ্যে মারিয়া গাছের সাথে কপাল ঠুকল নিজের। ওর ব্যাংক ভেঙে যাকে মারতে টাকা দিলো,টাকা শেষে তার পকেটেই ঢুকেছে?
রওনক বলল,
“ এবার বল শত্রুতা কী?”
“ কোনো শত্রুতা নাই। আমরা তো ওনাকে মারতে সুপাড়ি নিছিলাম।”
মারিয়ার মাথায় হাত পড়ল।
ছটফট করে বলল – হায় আল্লাহ এখন আবার আমার নাম বলে দেবে নাকি!”
সাদিফ আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ সুপাড়ি,তাও আমাকে মারতে? কে,কে দিয়েছে?”
মারিয়া হাঁসফাঁস করে ওরনা কামড়ায়।
“ আমার নাম বলিস না রে! বলিস না।”
সবুজ বলল,
“ নাম বলা যাবে না। এইটা কাজের রুলস।”
রওনক ঠাস করে ওর মুখে থাপ্পড় মারল। সবুজের হাতটা চলে গেল গালে। ভেজা গলায় বলল,
“ নাম বলাই যাবে না ভাই। তবে, দেখাইতে পারব।”
মারিয়ার মাথা চক্কর দেয়। বুঝতে পারে বিপদ ধেয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে থলির মতো ব্যাগটা বুকে চেপে কেটে পড়ল ও। সবুজ আঙুল দিয়ে দেখাল,
“ ওই আপা…এ কী কই গেল? ওইখানেই তো ছিল। বলল মাইরা হাড়গোড় নড়াই দিতে যাতে আর কোনোদিন তার সাথে লাগতে না পারে।”
সাদিফ ভ্রু কুঁচকে ভাবছিল। চোখমুখ টানটান হয়ে গেল অমনি। রওনককে সরিয়ে দিয়ে নিজে সবুজের কলার হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“ ওই মেয়ের মাথায় কি একটা সাপের মতো বেনুনি করা থাকে? একটা পোটলার মতো ব্যাগ থাকে হাতে?”
সবুজ ঘাড় নাড়ল। সাদিফ ওর কলার ছেড়ে
মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,” বুঝেছি, সব বুঝে গেছি।”
রওনক বলল,
“ কে বলো তো? তোমার কোনো এক্স…”
“ ছি ইয়াক,না। চিনিও না ঠিক করে। ভারি অসভ্য, ঝগড়ুটে একটা মেয়ে। কথায় কথায় ফোসফোস করে। পায়ে পা লাগিয়ে গ্যাঞ্জাম করে। আর কিছু হলেই আমাকে নিজের ভাইয়ের ভয় দেখায়। ওর ভাই নাকি কোন হরিদাস পাল,দেখা হলেই আমার বা…”
সাদিফ ফুঁসতে ফুঁসতে থেমে গেল। ওদের কথার ব্যস্ততায় সবুজ লেজ গুটিয়ে ভেগে গেল এক ফাঁকে। রওনক বলল,
“ কোন ভাই! আমাকে দেখিও তো। দেখব কার বুকে এত জোর,আমার বন্ধুর ভাইকে মারবে হাঁ!”
সাদিফ বলল,
“ আপনাকে লাগবে না ভাইয়া। আমি একাই যথেষ্ট এদের জন্যে। ওই ভাইবোনকে যেদিন পাব,মেরে একেবারে থেতলে দেব দুটোকে। যাতে বাপের নাম ভুলে গেলেও,এই সাদিফ হাসানের নাম মনে রাখে।”
রওনক বলল,
“ সত্যিই অবাক করা ব্যাপার। এমন মেয়েও আছে যে লোক ভাড়া করে ছেলেদের পেটায়? পরিবার কোনো শিক্ষাই দেয়নি এদের। যাক গে,তুমি প্যারা নিও না। আমরা আছি।
যাও,রিল্যাক্সে বাড়ি যাও!”


মারিয়া খুব তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ঢুকল। চটি খুলে নিয়ে এলো ভেতরে। ব্যাগ রাখল ড্রয়ারের ভেতর। মা ঘুমোচ্ছেন দেখে বুকে হাত দিয়ে শ্বাস ফেলল। এর মধ্যেই ঢুকল রওনক। কপাল কুঁচকে বলল,
“ দরজা খোলা কেন?”
মারিয়া চমকে গেল হঠাৎ আওয়াজ শুনে,
“ হ্যাঁ!”
রওনক অবাক হয়ে বলল,
“ কী হয়েছে? এভাবে চমকে উঠলি কেন?”
ঠোঁট টেনে হাসল মেয়েটা।
“ কই না,চমকাব কেন? তুমি গেইট দিয়ে চুকছিলে দেখলাম,তাই খুলে রেখেছি। যাও,যাও ফ্রেশ হও।”
রওনক খেয়াল করল মারিয়ার চোখমুখ অশান্ত। হাঁপাচ্ছে খানিক। কাছে এসে মাথায় হাত রেখে বলল,
“ কিছু নিয়ে চিন্তায় আছিস?
এডমিশন নিয়ে তাই না! ভাবছিস,ভাইয়া ভালো কোনো ভার্সিটিতে পড়াতে পারব না!”
মারিয়ার মুখটা বসে গেল। উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ না না ভাইয়া,এমন কেন ভাবব? তুমি আমাকে যেখানে পড়াবে,যা পড়াবে আমি তাতেই খুশি।”
রওনক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ তুই ভাবিস না,এখন তো ইনকাম একটু বাড়বে। ঠিক তোকে একটা ভালো সাব্জেক্ট নিয়ে পড়াব আমি। দেখিস তুই!”
মারিয়ার বুক টলমল করে উঠল। রওনক চলে গেল ফ্রেশ হতে। ঠোঁট দুটো ভেঙে এলো ওর।
ভাইয়া ওকে পড়াবে,সেজন্যে সব করবে। কিন্তু নিজের,নিজের জন্যে কিচ্ছু ভাববে না।
আর মূহুর্তে মারিয়ার সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ল ফের সাদিফের ওপর। একটা ব্যক্তিগত ঝামেলার জন্যে ওর চাকরিটা খেয়ে দিলো!
ওই লোককে ও কোনোদিন ক্ষমা করবে না।


দুপুর বারোটার দিকে সুমনাদের পরিবার পা রাখলেন শিকদার বাড়ির মাটিতে।
ওনার ভাই, ভাবি আর চাচা এসেছেন। ছেলে পক্ষের ঘর-বাড়ি, আচরণ দেখার প্রসঙ্গ,একজন মুরুব্বি থাকা জরুরি। তবে ভাইয়ের ছেলে, তামজিদ আসেনি। বিশ্বকাপের মৌসুম,বন্ধুদের নিয়ে সে আজকাল ব্যস্ত ভীষণ।
সুমনার ভাইয়ের নাম ওয়াজিদ রহমান। একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরিরত তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের। তবে গ্রামে বাবার ভালো নাম-ডাক আছে। তাও শিকদার বাড়ির প্রাসাদ তূল্য ভবন দেখতেই ভদ্রলোকের চেহারা পালটে গেল। শুকনো মুখে এক পল চাইলেন বোনের দিকে।
বাড়ির পুরুষেরা মূল ফটকেই হাজির তখন। আজ আর কেউ কাজে যায়নি। মিনা বারবার করে বলাতে,ধূসরও রয়ে গেছে। চাচাদের সাথেই ছিল সে। শিকদার বাড়ির একটা সুন্দর ব্যাপার হলো,এখানে কোনো বিশেষ আয়োজন হলেই বাড়ির কর্তারা একইরকম জামাকাপড় পরেন। এই যে,আফতাব-আমজাদ কী সুন্দর ইস্ত্রি করা টানটান পাজামা পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছেন এখানে। আজমল ছুটির কারণে আসতে পারলেন না। তবে স্ত্রী আর ভাইদের থেকে প্রতি মূহুর্তের তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন।
সাদর আপ্যায়নে সুমনাদের বাড়ির ভেতর নিয়ে গেলেন তারা। ভেতরের একেকটা ইন্টেরিয়র ডিজাইন, চকচকে দামি আসবাব,আর বড়ো ওই লিভিংরুমের বিলাশবহুল ক্লাউড সোফাসেট দেখেই সুমনা ভাইয়ের বাহু চেপে ধরলেন। ফিসফিস করে বললেন,
“ ভাইজান চলো,আমরা ফিরে যাই। ওনারা অনেক ধনী। আমাদের সাথে যায় না।”
ওয়াজিদ বললেন,
“ তা বললে হয়? এভাবে যাই কী করে?
এখন অবধি তো আন্তরিক মনে হচ্ছে। দেখি কথাবার্তা এগিয়ে। চিন্তা করিস না।”
সুমনা তাও আশ্বস্ত হতে পারলেন না। ওইটুকু গায়ের মেয়ে উনি। ছোটো থেকে কম্প্রোমাইজ আর অ্যাডযাস্টমেন্টের মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠা, এরকম একটা বাড়িতে তাকে মানাবে!
অত লোভ তো তার নেই।
ভদ্রমহিলার হঠাৎ চোখ পড়ল আনিসের দিকে। সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি,গালে চাপদাড়ি থাকা ভদ্রলোক যেন হুশে ফিরলেন অমনি। এতক্ষণ ওনার দিকে চেয়ে থাকা ব্যাকুল চোখদুটো সামলে নিলেন গতিতে।
সুমনা ভারি লজ্জা পেলেন। আমজাদ বললেন,
“ বসুন বসুন। প্লিজ বসুন। তুমিও বসো বোন। ছোটোই বয়সে, তুমি করে বললাম।”
“ জি জি কোনো অসুবিধে নেই।”
বসা মাত্রই সামনের টেবিল নাস্তা-শরবতে ভরে গেল। বাড়িতে বানানো পিঠা,সন্দেশ কয়েক রকমের ফল থেকে শুরু করে যত যা আছে গৃহিণীরা যেন হাজির করলেন সব ।
বড়োদের কথাবার্তার মাঝে মাত্রই তৈরি হয়ে এসে দাঁড়াল পিউ। চুল সেই পাঞ্চক্লিপে আটকে ঘাড়ের সাথে ঝুলছে। পরনে পিংক টপ্স,হোয়াইট কোটি,আর জিন্স দেখেই মিনা কণ্ঠ চেপে বললেন,
“ আজকেও এসব পরেছিস? বাড়িতে এত লোকজন এলো একটু থ্রিপিস পরতে পারলি না?”
“ থ্রিপিস কই পাব? আমার তো নেই। আপুরটা ধরলে ক্যাটক্যাট করে। তুমিতো কিনেও দিলে না কিছু।”
মিনা আর কিছু বললেন না।
পুষ্প হঠাৎ পিউকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল,
“ দ্যাখ দ্যাখ, চাচ্চু কীভাবে ছোটোমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে দ্যাখ।”
তাকাতে গিয়ে পিউয়ের চোখ পড়ল অন্য কোথাও। ফরসা টকটকে সাদিফের পাশে বসা শ্যামলা ছেলেটাকে ও প্রানভরে দেখে মুক্ত শ্বাস টানলো। কিন্তু ধূসর ভাই আজ বাড়িতে? সকালে তো খাবার টেবিলে বলেছিল থাকতে পারবে না। ইশ,উনি থাকবেন জানলে পিউ আজ একটু ভালো করে সেজেগুজে আসতো।
জবা বললেন,
“ আপা, ওদের আলাদা কথা বলার সুযোগ করে দেবে না?”
“ ও হ্যাঁ হ্যাঁ, দাঁড়া।”
মিনা গলা ঝেরে বললেন,
“ ইয়ে বলছিলাম যে আমরা কথাবার্তা এগোই। সুমনা ততক্ষণে আমাদের বাড়িটা ঘুরে দেখুক?”
সবাই স্বায় দিতেই বললেন,
“ আনিস, যাও ভাই ওকে নিয়ে ছাদে যাও দেখি।”
সুমনা ভাইয়ের দিকে তাকালে ওয়াজিদ যেতে বোঝালেন। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। আনিস পথ দেখিয়ে বললেন,
“ আসুন,এদিকে।”
ধূসরের একটা গুণ আছে। ও ভালো চা বানায়। টি পট থেকে চা ঢেলে চিনি-দুধ মিশিয়ে একেকজনকে এগিয়ে দিচ্ছিল সে। আমজাদ এ যাত্রায় প্রসন্ন হলেন। যাক! একঘরে ছেলেটা,এখন একটু উন্নতির দিকে যাচ্ছে। মিশছে আস্তে আস্তে। এবার শুধু কোনো একটা ছক কষে ওই কূটনীতি থেকে ওকে বের করে আনার অপেক্ষা।
রাদিফ হঠাৎ দেখল পিউ-পুষ্প পিলপিল করে ওপরের দিকে যাচ্ছে। বুদ্ধি দিয়ে ধরে ফেলল,ওরা চাচ্চুর ওখানে যাবে। অমনি মেজো চাচার কোল থেকে এক লাফে বেরিয়ে ছুটল সে পথে। ব্যাপারটা খেয়াল করল ধূসর। ক্ষুরধার নয়ন তুলে চাইল সে। দেখল
চোর একটা না,আরো দুটো আছে।
তক্ষুনি কানে এলো সুমনার চাচার প্রশ্ন। জিজ্ঞেস করলেন,
“ আপনাদের তো জয়েন ফ্যামিলি। কোন ছেলে কার? এটা নিশ্চয়ই আপনার ছেলে?”
সাদিফের কথা বলেছেন তিনি। আমজাদ হাসিহাসি চেহারায় বললেন,
“ আমারই ছেলে। তবে বায়োলজিক্যালি আমার সেজো ভাইয়ের বড়ো ছেলে ও। এবার মাস্টার্স শেষ করল। আর ও হলো আমার মেজো ভাইয়ের ছেলে,ধূসর মাহতাব। একটাই ছেলে ওদের। দারুণ ব্রেইন জানেন না! এইত কলেজ শেষ করে নিউইয়র্কে গিয়েছিল। ওখানেই পড়াশোনা। তবে ভর্তিতে যা ঝোক্কি পোহালাম। গোটা এক বছর লেগেছে এই পেপার ওই পেপার কর‍তে। লাস্ট ইয়ার গ্রাজুয়েশন শেষ করে ফিরল কয়েক দিন হবে। ওরা দুভাই তিন বছরের ছোটো বড়ো। আর আমার দুই মেয়ে….”
আমজাদ পেছনে তাকিয়ে দেখাতে গেলেন,কিন্তু ফিরে দেখলেন দুই বিড়ালের একটাও নেই। মিনাকে শুধালেন,
“ এ কী,ওরা কোথায়?”


আনিস,সুমনাকে নিয়ে ছাদের খোলা হাওয়ায় দাঁড়াননি। এক কোণে যে সিমেন্টের চেয়ার-টেবিল ছাউনি সহ পাতানো,মুখোমুখি বসেছেন সেখানে। দুপুর বেলা যা রোদ! আর ঠিক সেইসময় ছাদের দরজায় গুপ্ত হামলা পড়ল। পিউ-পুষ্প উকিঁ মারল দুপাশ থেকে।
রাদিফ দাঁড়াল পেছনে। হাতে চিপ্স। দুবোনের এই আঁড়িপাতা নিয়ে ভীষণ কৌতূহলী সে। ছোটো চাচ্চু তো এমনিও কত কথা বলে,কই তখন তো আপুরা এত আগ্রহ নিয়ে শোনে না!
পুষ্প চাপা কণ্ঠে বলল,
“ কিছু শুনতে পাচ্ছি না রে।
চাচ্চু এত আস্তে কথা বলে কেন?”
পিউ ওকে সরিয়ে দিয়ে নিজে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“ আমার কান অনেক সজাগ। আমি ঠিক শুনে নেব। দাঁড়া!”
রাদিফ চোখ পিটপিট করে একবার ওকে দেখল একবার পুষ্পকে। আবার একটা চিপ্স তুলে মুখে পুরল। কুড়মুড়ে শব্দে পুষ্প জিভ কেটে বলল,
“ আল্লাহ আস্তে আস্তে খা। শুনতে পাবে!”
“ পেলে কী হবে?”
পিউ তক্ষুনি ফিসফিসিয়ে চ্যাঁচাল,
“ হাত ধরেছে,হাত ধরেছে।”
পুষ্প উদগ্রীব চিত্তে উঁকি মারে। আনিস সুমনার হাতের ওপর হাত রেখেছেন। ও বুকে হাত দিয়ে বলল,
“ হায়হায় রে,চাচ্চু তো দেখি পুরোই
রোমান্টিকের ঝাল ফ্রাই!”
পিউ বেজার মুখে বিড়বিড় করল,
“ কিন্তু ভাইপো তো নিরামিষের চচ্চড়িও না।”
রাদিফের হঠাৎ নজর গেল পেছনে। রাশভারি চেহারার মানুষটাকে ওপরে আসতে দেখেই চোখ প্রকট করে ফেলল। আঙুল দিয়ে গুঁতো দিলো পুষ্পর পিঠে। ও
বিরক্ত হয়ে ফিরে চায়। বলতে যায়,
“ কী হয়ে?”
পরপর ধূসরকে দেখেই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল। হাঁ করার আগেই চোখ রাঙিয়ে চুপ থাকতে বোঝাল ধূসর। মাথার সাথে ভ্রু নেড়ে বোঝাল,
“ যা!”
পুষ্প কাচুমাচু করে পিউয়ের দিকে দেখল একবার। মেয়েটা আঁড়িপাতায় মত্ত। ঝুলতে ঝুলতে দরজার ওইপাড়ে চলে যাচ্ছে প্রায়। পুষ্প আলগোছে পিউয়ের টপের লেজ ধরে টানল,মেয়েটা তাও টের পেলো না। উলটে চাপা কণ্ঠে বলল,
“ চাচ্চু কী ডায়লগ দিচ্ছে রে আপু।
বলছে,আপনি আমাকে ভরসা করে দেখতে পারেন। আমি মানুষ খারাপ নই!”
পুষ্প ধূসরের চোখ দুটো দেখে শব্দ করার সাহস পেলো না। নির্দেশ মতো রাদিফকে নিয়ে চুপচাপ নিচে নেমে গেল।
পিউ দরজায় ঝুলে রইল তখনো।
ঠোঁট চেপে হাসল মুখে হাত দিয়ে। খুশি খুশি গলায় বলল,
“ চাচ্চু, একটা গান শুনিয়ে দাও না।
ছোটো মা আরো ইম্প্রেস হয়ে যাবে।”
তারপর আবার বলল,
“ ছোটো মা কিছু বলছে আপু। আরে ছোটো মা, এত আস্তে কেউ কথা বলে? আরেকটু জোরে প্লিজ,আমরা শুনব তো।”
হঠাৎ ওর খেয়াল পড়ল পেছনে কোনো সাড়াশব্দ নেই। সব কেমন থমথমে নীরব।
ভ্রু কুঁচকে ঘুরে চাইল পিউ। মুখের সামনে অপ্রত্যাশিত লম্বা-দেহী মানুষটাকে দেখেই বুকের ধার ছ্যাৎ করে উঠল।
ধূসর একদম পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
বলিষ্ঠ এক বাহু সিঁড়ির হাতলে ঠেস দিয়ে, হাস্যহীন ধারালো চেহারায়। হিমশীতল – রুক্ষ দৃষ্টি, পরনে নেভি ব্লু শার্ট। ঠোঁটে কোনো হাসি নেই, এক জোড়া গম্ভীর চোখ সোজাসুজি নিবদ্ধ। যা দেখে এতটাই ভড়কে গেল পিউ,নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল। দরজার হাতল থেকে ছুটে গেল হাত। টলমলে হলো পা। ঠিকঠাক হয়ে দাঁড়াতে চাওয়ার বদলে কেমন এঁকেবেঁকে ঝুপ করে পেছন দিকে চিৎ হয়ে পড়তে নিলো মেয়েটা। পিউ আজ চাইলও না নিজেকে বাঁচাতে। পড়ুক ও। তাহলেই তো সিনেমার নায়কের মতো কোমরে হাত রেখে ধরবেন ধূসর ভাই। ঝুঁকে আসবেন ওর কাছে। পিউ ভেসে থাকবে তার পেশিবহুল বাহুতে। আর যখনই শ্যামলা মুখটা পিউয়ের খুব কাছাকাছি আসবে,কী করবে ও?
পিউ সত্যিই সিঁড়ি গড়িয়ে পড়তে নেয়,অবস্থা বেগতিক দেখে ঝুঁকে আসে ধূসর। তবে কোমর ধরল না,কব্জিও না। বরং খপ করে ওর এক কান টেনে ধরল। কান যখন ছিড়বে ছিড়বে ভাব,ওইভাবেই টেনে এনে শীর্ণ ছোট্ট শরীরটা আগের জায়গায় দাঁড় করাল।
কিন্তু বিমুঢ়,বিস্মিত হয়ে গেল পিউ! কানের ব্যথা পালাল বহুদূরে। এতো আঘাত নয়,এটা ওর প্রেমের বৃষ্টিতে এক ঝটকা বজ্রপাত।
মেয়েটা আহত চিত্তে চেয়ে চেয়ে ভাবল – শেষমেশ কান? আটকানোর জন্যে আর কিছু ধরার জায়গা পেলেন না, ধূসর ভাই?
চলবে… See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply