Uncategorized

আমার আলাদিন পর্ব ২৬


#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২৬

আজ একদম সকাল সকাল জিমে চলে এসেছে সাইবান। সারারাত ঘুম হয়নি। শেষে সারিকা জোর করে তাকে গেস্টরুম থেকে নিয়ে অন্য রুমে শুইয়ে দিয়েছিল। তবুও দুই চোখের পাতা এক করতে পারেনি সে কোনোমতেই। এক ফ্লাস্ক ভর্তি কফি নিয়ে সে এসেছে জিমে। প্রতিদিনের তুলনায় অতিরিক্ত শক্তি খরচ করে ব্যায়াম করছে সে। তার ট্রেনার অব্দি কিছুক্ষণ আগে সাবধান করে দিয়ে গিয়েছে শরীরে এত ধকল না দিতে। কিন্তু সাইবান থেমে নেই। এক হাত মেঝেতে ঠেকিয়ে একের পর এক পুশ আপ দিয়ে যাচ্ছে। শরীর প্রায় ভেঙে আসছে তার। তবুও থামছেনা। বুক এবং কপাল বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম গড়াচ্ছে ম্যাটের উপর।

—আমরা ভিন্ন যুগের মানুষ, ভিন্নভাবে ভাবি। তোমার কাছে যেটা বন্ধুত্ব রক্ষা, আমার কাছে সেটা বিষ! তাই বলছি, দূরে থাকো, ভালো থাকো।

—আর একটা বছর সহ্য করো। আমি কিছু একটা করি। তারপরই তুমি মুক্তি পেয়ে যাবে। তখন যা ইচ্ছা হয় করো, যার সাথে মনে হয় ঘুরে বেড়াও, রোখার মতন কেউ থাকবেনা।

কথাগুলো এখনও গমগম করে কানে বাজছে তার। একটা সময় সাইবান আর নিতে পারলনা। ম্যাটের উপরেই উপুড় হয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। এক হাতে প্রবল এক ঘুষি বসিয়ে দিল শক্ত পাথুরে মেঝেতে। ব্যথায় টনটন করে উঠল সর্বাঙ্গ। দাঁতে দাঁত পিষে সে বিড়বিড় করল,

“স্বার্থপর! আস্ত একটা স্বার্থপর মহিলা!”

সকাল আটটা বাজতে শুরু করেছে। মানুষজন সবে জিমে আসতে শুরু করেছে ওয়ার্কআউটের জন্য। অথচ সাইবান তখন জিম থেকে বেরোচ্ছে। একদম নীরবে নিজের টি শার্ট গায়ে চড়িয়ে সে হনহন করে বাইরে বেরোল। মাথা থেকে ব্যক্তিগত চিন্তা সরিয়ে জোরপূর্বক একটা নতুন গানের কম্পোজিং সাজাচ্ছে সে। বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত হয়নি। জীবনটা আগের মতো বাউন্ডুলে থাকলেই সেও ভালো থাকত। সংসার করার সাধ মিটে গিয়েছে তার। একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুঁকতে ফুঁকতে সাইবান যখন গাড়ির দিকে এগোচ্ছে তখনি পিছন থেকে একটা চড়া গলার মেয়েলী ডাক ভেসে এলো,

“জিনি! ওয়েট!”

সাইবান থমকাল। পিছন ঘুরে তাকানোর প্রয়োজন হলনা। সে জানে সে আসছে। দৌঁড়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল তিতলি। একটা ট্রাউজার আর ফ্রক পরনে। চুলগুলো খোলা, দুলছে বাতাসে। চোখে খানিক উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। হাঁপাচ্ছে সে।

“অনুরাগ বলল তোকে এখানেই পাওয়া যাবে।”

তিতলি জানাতেই সাইবান ভ্রু কুঁচকে ইংরেজিতে একটা গাল দিল বুঝি।

“শালাকে আজকেই ব্লক মারব!”

“জিনি। আমার ফোন ধরিসনি। অন্তত কথাটা একটু শোন!”

“কি শুনব তোর কথা? আমার ম্যারেজ লাইফে আগুন লাগিয়ে দেয়ার জন্য থ্যাংক্স। আর কিছু?”

“আমি সরি জিনি! প্লীজ!”

সাইবান চলে আসছিল কিন্তু তিতলি তার হাতের কব্জি চেপে ধরল। বলতে লাগল,

“আমি সত্যিই জানতাম না বাবা মা তোদের বাড়িতে সোজা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে চলে যাবে। বখতিয়ারের ঘটনাটার পর থেকেই আমার জন্য তাড়াহুড়ো করে সম্বন্ধ দেখা শুরু করেছে। আমি বলেছিলাম এখনি বিয়ে করতে চাইনা। তোর বিয়ের কথাটা ওদের জানানোর বিষয়টা আমার মাথায় একদমই ছিলনা রে। ফ্যাশন শো নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম অনেক। আমি বাবা মাকে খুব বকেছি বিশ্বাস কর। আমাকে না বলেই এত বড় একটা কান্ড করার জন্য। আমার তোর ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিলনা। একটু বোঝার চেষ্টা কর আমাকে।”

এবার একটু থামল সাইবান। খানিক দ্বিধায় পড়ে গেল। মনোযোগী দৃষ্টিতে তিতলির দিকে তাকাল।

“তুই সত্যি বলছিস?”

“কার কসম দিলে তুই বিশ্বাস করবি, বল?”

তিতলির কাছ থেকে নিজের হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল সাইবান। তারপর কপালে আঙুল ঘষে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আপনমনে বলল,

“ঠিক এই কারণেই আবেগ অনুভূতি একদম ভালো লাগেনা আমার।”

তিতলি খানিকটা সচেতন কন্ঠে শুধাল,

“কি হয়েছে? তোর বউ এসব নিয়ে ঝামেলা করেছে?”

সাইবান জমে গেল। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। শেষমেষ গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। সিগারেটটা ধীরে ধীরে সেবন করতে লাগল। তিতলি চলে গেলনা। বন্ধুর পাশে সেও হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দুজনের দৃষ্টিই আবদ্ধ দূরের আকাশপানে। সকাল হওয়ায় এখনো সূর্যের তেজ বাড়েনি বিধায় আলোটা স্নিগ্ধ লাগছে।

“আমি মেয়ে। আমাকে বলতে পারিস। মেয়ে হয়ে মেয়েকে বুঝবনা?”

তিতলির আশ্বাসে সাইবানের অন্তরে খানিক চির ধরল। অবশেষে সে মুখ খুলল,

“তোকে আমি সবসময় কি বলে এসেছি তিতলি?”

সুদর্শনার মুখে খানিক বিষণ্নতার ছায়া পড়ল।

“দ্যাট ইউ আর নট সিরিয়াস অ্যাবাউট ফিলিংস।”

“ঠিক তাই। তোকে আমি অনেক আগেই বলেছি, এসব প্রেম ভালোবাসা আমার জন্য না। আমি কমিটমেন্টে থাকতে পারবনা। তুই সব জেনেবুঝেই আমার পাশে ছিলি। অস্বীকার করতে পারবি?”

“না। পারবনা। আমি সব জেনেই তোর পাশে ছিলাম।”

“তাহলে উনি কেন বুঝতে পারছেনা? উনি কেন বারবার একটা সিম্পল বিষয়কে চিউইং গামের মতন টেনে হিঁচড়ে লম্বা করছেন? আই মেসড আপ, আই নো! কিন্তু তার মানে তো এই না আমি ওনার এক্স হাসবেন্ডের মতন পরকীয়া করে বেড়াচ্ছি।”

“ওনার এক্স হাসবেন্ড পরকীয়া করত?”

অবাক হয়ে গেল তিতলি। সাইবান খানিক বিব্রত বোধ করল, কাঁধ তুলে জানাল,

“আমি বিস্তারিত জানিনা। মম এটুকুই বলেছে, আমিও এটুকুই জেনেছি। কখনো ওনাকে সরাসরি এর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু সেটা বিষয় না। বিষয় হলো উনি অন্য কারো ছাঁচে ফেলে আমাকে মাপছেন। অন্য কারো দোষের বোঝা আমি কেন টানব বলতে পারিস?”

“তুই তো জেনেবুঝেই বিয়ে করেছিস।”

“মমের কথাতে বিয়ে করেছি।”

শুধরে দিল সাইবান। যদিও তার নিজের অন্তরই তখন থেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছে সে মিথ্যা কথা বলছে!

“তো, উনি কি এখন তোকে সন্দেহ করছেন?”

তিতলির প্রশ্নে মাথা নাড়ল সাইবান। সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে বলল,

“আমি জানিনা। উনি কি ভাবছেন, কি করছেন, কেন করছেন আমি কিছুই বুঝতে পারিনা আর।”

সব শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তিতলি। তারপর একটি নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“দেখ জিনি, রাগ করিস না। তোর বন্ধু বলেই বলছি, তোর উত্থান পতন আমি দেখেছি সবটাই। এখনো আমি আগের কথাই বলব। এইজ ম্যাটার্স। ওনার জেনারেশনের সঙ্গে আমাদের জেনারেশনের অনেক ফারাক। ওই সময়ে বাবা মায়ের সন্তানের উপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া জায়েয ছিল, স্রেফ ভদ্রতার দোহাই দিয়ে সবাই সবকিছু চুপচাপ মেনে যেত। আমাদের জেনারেশন সেটা মানতে পারেনা। আমরা প্রতিবাদ করে ফেলি। সেই প্রতিবাদ আবার আমাদের মুরুব্বিদের কাছে বেয়াদবি মনে হয়। আজকালকার ছেলেমেয়েরা নাকি উচ্ছন্নে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ঠিক অনেকাংশে। কিন্তু আজকালকার ছেলেমেয়েরা নিজেদের ইচ্ছামত বাঁচতেও শিখছে। উই আর ব্রেকিং দ্যা ট্রমা সাইকেল।”

সাইবান নিঃশব্দে শুনে গেল।

“তোর বউও নিজের মতন করে ভাবছে। ওনাদের সময়কার চিন্তাভাবনা থেকে উনি বের হতে পারছেন না। এজন্য ওনার কাছে তোকে অপরাধী লাগছে। এটা আজ নাহয় কাল হওয়ারই ছিল। পার্টিতে আমার কথা শুনে হয়ত তুই রাগ করেছিলি, কিন্তু এটাই সত্য যে তোদের সম্পর্কে অনেক ইচ্ছাশক্তি না থাকলে মানিয়ে চলাটা কষ্টকর হবে। আজ স্পষ্ট হলো, তোদের সম্পর্ক নামে থাকলেও ইচ্ছাশক্তির অভাব। ভবিষ্যতে ব্যাপারগুলো আরও জোরালো হবে। তখন তোর নিজেকে শৃঙ্খলিত মনে হবে। এই শৃঙ্খলিত জীবন তোর জন্য না। তুই মুক্ত স্বাধীন পাখি, যে উড়তে ভালোবাসে। তার জন্য খাঁচা নয়।”

“তো কি করব আমি? কি করতে বলিস? নষ্ট করে ফেলব? ডিভোর্স দিয়ে দেব ওনাকে?”

“সেটা কে বলেছে? তুই একটু ভাব। নিজের সিদ্ধান্তের উপর প্রতিফলন ঘটা। ঠান্ডা হয়ে ভেবে দেখ তোর জন্য কোনটা সঠিক। সেটাই তোর সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।”

সাইবান মুখ তুলে তিতলির দিকে তাকাল। শান্ত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, তিতলি যেভাবে তাকে বুঝেছে, সেভাবে ইরাম কোনোদিন বুঝতে চায়নি! তৎক্ষণাৎ অন্তরে মহা আতঙ্ক ভর করল তার। এসব কি ভাবছে সে? মাথা চেপে ধরল সে এক হাতে, সিগারেট হাতের আঙুল ফসকে পড়ে গেল রাস্তায়। তিতলি তার অভিব্যক্তির হঠাৎ পরিবর্তনে বেশ ঘাবড়ে গেল।

“কি হয়েছে তোর জিনি?”

সাইবান টলে উঠতেই তিতলি জাপটে ধরে ফেলল বন্ধুকে।

“দাঁড়া, আমি পানি নিয়ে আসছি। কাউকে ডেকে আনছি এক্ষুণি।”

তিতলির কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের কাছ থেকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল সাইবান। মেয়েটার দিকে তাকাতে পারছেনা সে। বুকের ভেতর মারাত্মক এক গ্লানি খামচে ধরেছে। ক্ষণিকের জন্য হলেও কীভাবে সে পারল অমন একটা জিনিস চিন্তা করতে?

“দূরে, তিতলি প্লীজ। আই নিড টু গো হোম।”

এক সেকেন্ডও আর অপেক্ষা করলনা সাইবান। নিজের গাড়িতে উঠে বসল। ইঞ্জিন অন করে স্বাভাবিকের তুলনায় খানিকটা বেশি গতিতে গাড়ি চালিয়ে সে রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল। তিতলি নিজের জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে বন্ধুর চলে যাওয়া দেখে গেল যতক্ষণ না সে দৃষ্টির আড়াল হয়।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

সারারাত ঘুম হয়নি ইরামের। অসংখ্য চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে। ইযান গত রাতে খুব বেশি বিরক্ত করেনি। মাত্র একবার কি দুইবার শুধু খাওয়ার জন্য উঠেছিল। অথচ এরপরেও ইরামের বিশ্রাম হয়নি। মনে হচ্ছে যেন হাজার বছর ধরে ঘুমায়না সে। শরীরে এতটাই ক্লান্তি। সাড়ে আটটা বাজতে না বাজতেই উঠে ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। সকালের বাতাস যদি তার উদ্ভ্রান্ত মনটাকে একটু শান্ত করতে পারে তবে ক্ষতি নেই।

বেশ খানিকটা সময় নীরবে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি দেখে গেল ইরাম। কাল রাতে বুকের ভেতর শুরু হওয়া যন্ত্রণাটা এখনো যায়নি তার। বরং মনে হচ্ছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ক্রমশ। বাতাসের ঝাঁপটা তার গায়ে লাগছে ঠিকই। তবে আরামটুকু সে গ্রহণ করতে পারছেনা। মনে হচ্ছে মাথায় একটা ভারী চাপ নিয়ে ঘুরছে সে। এমন সময়েই বাড়ির গেটের ভেতরে এসে থামল একটা গাড়ি। চিনতে অসুবিধা হলোনা ইরামের, ওটা সাইবানের গাড়ি। গ্যারেজ অব্দি গেলনা সে, ইটের ঢালাই দেয়া পথের একপাশে থামাল। অতঃপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো সাইবান। পরনে কালো হাফ হাতা টি শার্ট। বেশ টাইট ফিটিং হওয়ায় শরীরের গঠন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ঠোঁটে ঝুলছে একটা আধখাওয়া সিগারেট। তামাটে ধোঁয়া বাতাসে ছেড়ে বাড়ির দিকে এগোল সে। ঠিক তখনি উপরে নজর গেল তার।

ইরামকে বারান্দায় দেখে পরনের টি শার্টটা টেনে খুলে ফেলল সাইবান। সদ্য জিম থেকে আসায় তার শরীর এখনো সেই উত্তেজনার মাঝে রয়ে গিয়েছে। টি শার্ট কাঁধে ঝুলিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে দুহাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গি করল সে। তাতে তার বাহুর মাংসপেশি ভীষণ ফুলেফেঁপে উঠল। উজ্জ্বল ত্বকে আলোর প্রতিফলনের কারণে চিকচিক করতে লাগল। শক্ত পাথরের মতন উদরে মাংসপেশীর খাঁজকাটা ভাঁজ। ধীরে ধীরে হেঁটে বাড়ির দিকে এগোল সে। ভাবখানা এমন যেন ইরামকে সে দেখতেই পায়নি চোখে। অপরদিকে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সকাল সকাল এমন দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে হতবাক হয়ে গেল ইরাম। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। সাইবান এখনো বাড়ির ভেতরে ঢোকেনি। একেবারে অহেতুকভাবে থামের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এখন নিজের ফোন ঘাঁটার ভং ধরেছে সে। টি শার্টটা কাঁধেই ঝুলছে। উদাম শরীর তার। স্নিগ্ধ আলোর প্রতিফলনে সবকিছু একদম স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। কোনো রাখঢাক নেই।

ইরাম চোখ সরু করে ফেলল। রেলিংয়ে চেপে বসল তার হাত। আপনমনে সে সন্দিগ্ধ কন্ঠে ফিসফিস করল,

“এই ছেলে কি আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করছে? অবিশ্বাস্য!”

সাইবান আরও একটু আয়েশ করে হেলান দিল। যতবার সে নড়চড় করছে, তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সঞ্চালন আকর্ষণীয়ভাবে চোখে পড়ছে। ইরাম ঝট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। পরক্ষণেই আবার চোরের মতন ফিরে তাকাল। তার চোখজোড়া সাইবানের বুক বেয়ে উদরে এসে থামল। গুণতে লাগল সে,

“এক…দুই…তিন…চার…ইশ ছিঃ!”

নিজের প্রতি বিরক্ত হয়ে নিজেই আবার চোখ বুঁজে গালমন্দ করল ইরাম। মাথা চেপে ধরল। সরাসরি না তাকালেও আড়চোখে স্ত্রীর প্রত্যেকটা প্রতিক্রিয়া বেশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সাইবান। বাঁকা একটি হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। আরেকটু হেলে দাঁড়িয়ে নিজের অ্যাবসে হাত বুলিয়ে আপনমনে বিড়বিড় করল,

“জিনিস তো আপনারই। শুধু দেখলে হবে? টেস্ট করে দেখবেন না?”

ইরাম ফিরে তাকাল। এবার একেবারে সরাসরি। উজ্জ্বল শ্যামলা মুখে হালকা লালিমার পরদ। সাইবান আরও একটু ভাব নিয়ে দাঁড়াল। ঠোঁটে সিগারেট পুরে ফ্যাশন ম্যাগাজিনের মডেলদের মতন পোজ দিল। ইরাম বোধ হয় কিছু বলতে চাইছিল। তবে ভাগ্য এবার সহায় হলোনা। অতিরিক্ত ভাব নিতে গিয়ে একটু বেশিই হেলে গিয়েছে সাইবান। থামের সঙ্গে তার পিঠ একেবারে হঠাৎ করেই পিছলে গেল! ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল সাইবান।

“মাদারফাদার!”

গর্জে উঠল সে। তারপরই অমন দস্যু শরীর নিয়ে ধপাস করে বাড়ির সিঁড়ির গোড়ায় আছড়ে পড়ে গেল সে। টি শার্টটা লুটিয়ে পড়ল কাছে কোথাও। একেবারে হাত পা ছড়িয়ে চিৎপটাং হয়ে গিয়েছে সে। ব্যথা পেয়েছে বেশ। তবে সেই অনুভূতি তার নেই। উজ্জ্বল ত্বক তার লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। বারান্দা থেকে ইরাম হতভম্ব হয়ে দৃশ্যটা দেখছে। ঠোঁট কয়েক ইঞ্চি ফাঁক হয়ে রয়েছে তার বিস্ময়ে। দুহাতে মাথা চেপে ধরে সাইবান হিসিয়ে উঠল,

“আল্লাহ! ইটস মি ওয়ান্স অ্যাগেইন! সবাইকে বাঁচাও আর আমার বেলায় শুকনা রাস্তায় পিছল খাওয়াও! এ কেমন নাইনসাফি?”

“ভাইজান! ছ্যাঁচা খাইছেন?”

রীতিমত বুলেটের গতিতে বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে এলো সুগন্ধা। লাফিয়ে পরে সাইবানের বাহু চেপে ধরে টানাটানি শুরু করল।

“ও আম্মা! ক্রেন আনেন! ভাইজান চ্যাপ্টা হইয়া গেছে রে! তুলতে হবে!”

“সর দুর্গন্ধের বাচ্চা!”

সাইবান অত্যন্ত রাগে সুগন্ধাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে উঠে বসতে চাইল। অনিয়ন্ত্রিত পায়ে উঠতে গেলে আরেকটা হোঁচট খেয়ে এবার সোজা থামের গায়ে বাড়ি খেল! সুগন্ধা পিছন থেকে তার পিঠ চেপে ধরায় এবার উল্টে পড়া থেকে বেঁচে গেল সে। সুগন্ধা সাইবানের কপালে হাত চেপে আরেক দফায় হাহাকার করে উঠল,

“ভাইজান! ও ভাইজান আপনার স্মৃতিশক্তি ঠিক আছে? দেখি, বলেন দেখি আমি কে? আপনার চোখের সামনে এখন কয়টা আঙুল আছে দেখেন তো?”

এবার আর হাসি ধরে রাখতে পারলনা ইরাম। শব্দ করে হেসে ফেলল। রেলিং চেপে ধরে হাসতে হাসতে সে মেঝেতেই বসে পড়ল। সাইবানের মুখটা পুরোপুরি টমেটো হয়ে গেল। যেকোন মুহুর্তে বি*স্ফোরণ হবে।

“জরিনার আম্মা সকিনা! দুর্গন্ধা! তোর উপর ঠাডা পড়ুক! তোর চুল উঠে টাকলা হয়ে যাক! তোর গায়ের চামড়া পশমে ভরে যাক! তোর মুখে গু পড়ুক শালী, তিন দিনের শুকনো বাসি শক্ত শক্ত গু! হারামজাদি!”

এক দৌঁড়ে বাড়ির ভেতর আড়াল হয়ে গেল সাইবান। অপরদিকে সুগন্ধাও হাসতে হাসতে পিছন পিছন গেল। ইরাম রেলিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে রইল। হাসির দমকে শরীর কাঁপতে শুরু করেছে তার।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

দুপুরবেলা।

দেড়টা বেজে এসেছে প্রায়। আজকে ইরামের ফ্রিল্যান্সিং কোর্সের প্রথম ক্লাস। তাই একটু আগেভাগেই তৈরি হয়ে নিয়েছে সে। ইযানকে পেটপুরে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। সারিকা কিছুক্ষণ পরেই চলে আসবে। সুগন্ধা আপাতত খেয়াল রাখছে। নিজের জিনিসপত্র ব্যাগে গুছিয়ে নিতে নিতে ইরাম সকালের ঘটনাটা ভাবল। প্রেজটিজ পাম্পচার হয়ে গিয়েছে একজনের। এসেছিল সিডিউস করতে, কিন্তু সম্মান খুঁইয়ে বিদায় নিয়েছে। সারা সকাল আর সাইবানকে দেখেনি ইরাম। তার সামনে ভুলেও আসেনি। এখন বোধ হয় বাড়িতে নেই। কোথাও গিয়েছে। ইরাম টেক্সট মেসেজ করেছে।

—কম্পিউটার ক্লাসে যাচ্ছি আমি।

কিন্তু সাইবান কোনো উত্তর করেনি। সিন করে ফেলে রেখেছে। সেটা আজকের সকালের রাগ থেকে নাকি গতকালের পোষা রাগ ইরাম বুঝতে পারছেনা। ইরামের ঠোঁট থেকে ধীরে ধীরে মুছে গেল হাসিটা। একটি নিঃশ্বাস ফেলে সে চুপচাপ ফোনটা আবার ব্যাগে ভরে রাখল। ব্যাপার না, গাড়িতেই তো যাবে। ড্রাইভার আছে। ইযান যেহেতু বাসায় তার চিন্তার কোনো কারণ নেই। এর মধ্যেই সারিকা এসে পড়েছে। অ্যাপ্রোন খুলতে খুলতে ভেতরে ঢুকল সে। ইরামকে পুরোদস্তুর তৈরি দেখলেও বিশেষ কোনো মন্তব্য করলনা। চুপচাপ হেঁটে ভেতরে যাচ্ছিল এমন সময় ইরাম তাকে ডাকল,

“সারিকা?”

সারিকা থামল। খানিকটা অবাক হয়ে তাকাল পিছনে। ইরাম ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে।

“তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।”

সন্দিগ্ধ হলো সারিকা।

“বলুন।”

“ধন্যবাদ।”

একদম সহজ গলায় বলল ইরাম। সারিকার ভ্রুজোড়া উঁচু হলো। কয়েক সেকেন্ড সে কথাই বলতে পারলনা। ইরাম একটি হাত বাড়িয়ে তার বাম হাতটা আলতোভাবে ধরল,

“সত্যি বলতে আমি তোমাকে দোষ দেই না। আমার ভাইয়ের সাথে কেউ জোর করে বয়সে বড়, ডিভোর্সি, এক বাচ্চার মাকে বিয়ে দিতে চাইলে আমিও তোমার মতই প্রতিবাদ করতাম। তোমার রাগ জায়েজ ছিল।”

“তবে ধন্যবাদ কেন দিচ্ছেন? আপনি তো জানেন আমি আপনাকে পছন্দ করি না আর কোনোদিন করবও না।”

সারিকা মুখ ঘুরিয়ে নিলেও নিজের হাতটা সরিয়ে নিলনা। ইরামকে ধরতে দিল। ইরাম মৃদু হাসল। তার হাতটা খানিক চেপে জানাল,

“ধন্যবাদ এই কারণে যে তোমার রাগ, তোমার অভিমান তোমার মনুষ্যত্বটাকে বিসর্জন দিতে পারেনি। সেদিন তুমি ফাস্ট থিংকিং না করলে আজ আমি সুস্থ শরীরে, বিনা আঘাতে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না। তুমি না থাকলে আজ আমি চিন্তামুক্তভাবে আমার ছেলেটাকে তার ফুফির ভরসায় ছেড়ে কম্পিউটার ক্লাসে যেতে পারতাম না। ইউ আর আ গার্লস গার্ল। অ্যান্ড ইউ ডিজার্ভ দিস। থ্যাংক ইউ। তোমার জন্য আমার মন থেকে শুধু দোয়াই আসে।”

সারিকা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকল। ইরাম নিজের হাতটা ছাড়িয়ে দূরে সরে দাঁড়াল। তারপর আস্তে করে ফিরে তাকাল সারিকা। হঠাৎ করে তীর্যক হেসে বলল,

“ফুফিমণি হয়ে লাভ কি? সেই বড় হলে তো কূটনীই মনে করবে!”

সারিকার হাসিটুকু দেখে ইরামও মোলায়েম হাসল।

“আপনার ধন্যবাদ সাদরে গ্রহণ করা হলো। তবে তার মানে এই না যে আমি আপনাকে মেনে নিয়েছি।”

তবে সারিকার এই কথার মাঝে কোনো তপ্ত আঁচ পাওয়া গেলনা। সে হেঁটে ভেতরে চলে গেল। ইরাম কিছুক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেদিকে। তারপর উল্টো ঘুরে বাড়ির বাইরের দিকে এগোল। সে যখন সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে, তখনি গেট পেরিয়ে উল্টো দিক থেকে ছুটে এলো একটা ফিনফিনে পাতলা শরীরের অধিকারী ছেলে। ইরাম মুখ তুলে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। চিনতে বেগ পোহাতে হলনা। সাইবানের বন্ধু আফনান।

“আসাসালামু আলাইকুম, ভাবী।”

ইরাম অবাক হয়ে আফনানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আফনান তুমি? আলাদিন তো বাসায় নেই। বাইরে কোথাও গিয়েছে। আমি জানিনা কোথায়।”

“উঁহু। আপনি ভুল ভাবছেন। আমি সাইবানের জন্য আসিনি। আপনার জন্য এসেছি।”

“আমার জন্য?”

অবাকের চূড়ান্ত সীমা পেরিয়ে গেল ইরাম। ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে এসে পাশে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। সেই গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে আফনান হাসিমুখে আমন্ত্রণ জানাল তাকে,

“আমি আপনাকে পৌঁছে দেয়ার ডিউটিতে আছি আজ। সিকিউরিটি পারপাজ।”

“কে নিযুক্ত করেছে তোমাকে এই ডিউটিতে?”

তীর্যক হেসে আফনান ঠোঁটে আঙুল ছুঁয়ে জানাল,

“বসের নাম মুখে নেয়া বারণ, ভাবী।”

—চলবে—

Share On:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 


0 Responses

Leave a Reply