Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৬৫


আদিল মির্জা’স বিলাভড

৬৫.

–

প্রাসাদের ওপরে যে চাঁদটা উঠেছিল, তা ডুবে গিয়েছে কালো মেঘের আড়ালে। এতক্ষণের ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি রূপ নিয়েছে ঝড়ো বৃষ্টিতে। সে বৃষ্টির আওয়াজ ভেতরেও এসে পৌঁছেছে। ভেঙেছে পিনপতন নীরবতা। এই গানটাই সেদিন আওড়েছিল আদিল। বিপরীতে রোযার মুখ থেকে আজ শোনার পর পৃথিবী থমকে গিয়েছে তার। শক্ত হয়েছে চোয়াল। ঝাড়বাতির আলোয় ক্রমশ ধারালো হচ্ছে ধূসর চোখজোড়া। মণির চারপাশ র ক্তিম হয়ে উঠছে। হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে বেসামালভাবে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি হৃৎপিণ্ড বেরিয়ে আসবে। কানে এখনো বেজে যাচ্ছে রোযার একেকটা শব্দ। আদিলের হাতটা চলে গেল রোযার থুতনির নিচে। চেপে ধরতে গিয়েও ধরতে পারল না। যদি দাগ বসে যায়? ব্যথা পায়? অগত্যা আঙুল দিয়ে রোযায় মাথাটা উঁচিয়ে ধরল। মুখজুড়ে চোখ বুলিয়ে তাকাল গোলাপি ঠোঁটের দিকে। গলার গভীর থেকে বেরিয়ে আসা শব্দগুলো দাঁতের ফাঁক গলে পিষে পিষে বেরিয়ে এল –

‘আমাকে বাঁচতে দেবে না, তাই তো?’

রোযা দমে না। এক হাতে খামচে ধরে রাখে আদিলের পরনের কোট। মিশে যায় শক্ত বুকের সাথে। চোখের দিকে চেয়ে থাকে একগুঁয়ে দৃষ্টিতে। আওড়ায় –

‘আমাকে তো বাঁচতে দিচ্ছেন না। পুড়িয়ে ছারখার করছেন প্রতিনিয়ত।’

মুহূর্তেই আদিল মুখ নুইয়ে আনলেই, নিজের মাথাটা ঘুরিয়ে ফেলল রোযা। ঢোক গিলে আওড়ায়, ‘ছুঁতে নিষেধ করেছিলাম।’

‘অন্য সবকিছু মেনে নেব। এটা বাদে।’

রোযা চোখ রাঙিয়ে তাকাল, ‘এটাই আপনার শাস্তি ছিল।’

‘শাস্তিটা একটু বেশিই কঠিন!’

রোযা হঠাৎ আদিলের দু’পায়ের ওপরে উঠে গেল। চোখের পলকে তার পা-জোড়ার ওপর নিজের দু’পায়ের পাতায় ভর দিয়ে, মুখ বাড়িয়ে আদিলের চোয়ালে কামড় বসাল। আদিল নিঃশব্দে শক্ত এক শ্বাস টেনে নিল নিজের মধ্যে। একমুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ফেলল। দু’হাতে নিজের সঙ্গে আগলে রাখল পাতলা শরীরটা! রোযা এক ইঞ্চি সরে এল পরপরই। খোঁচা-খোঁচা দাড়ির ভিড়ে তার দাঁতের দংশন পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। হালকা-পাতলা যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, ততটুকুই। আদিল চোখ মেলে তাকাল। রোযার থমথমে মুখের দিকে চেয়ে আওড়াল –

‘বলুন, কী করতে হবে? কী করলে আমার মিসেস শান্ত হবেন? কী বললে রাগ কমতে পারে?’

রোযা তাকাল ধূসর চোখ দুটোর দিকে। ওই চোখে নিজের মরণ ব্যতীত আর কিছুই সে দেখতে পায় না!

‘অনুতপ্ত হোন।’

বিপরীতে, কিয়ৎক্ষণের নীরবতার পর সূক্ষ্ম হাসির আওয়াজ ভেসে বেড়াল দেয়ালের কোণায় কোণায়। যা বিঁধল রোযার কানে। রাগে নাক ফুলে উঠল। আদিলের জবাব এল বেশ সময় নিয়ে –

‘অনুতপ্ত? আর আপনার কাছে?’

আদিলের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গাঢ় হলো। রোযা একদৃষ্টিতে চেয়ে দেখল তা। মন চাইল আরেকটা কামড় বসাতে। আদিল কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজের মাথাটা বাড়াতে বাড়াতে অবশেষে বলল –

‘আপনি চাইলে অনুতপ্তও হতে পারি। তবে একটা সমস্যা আছে!’

রোযা মাথাটা পিছিয়ে নিচ্ছে।

‘কী?’

‘ক্ষমা চাওয়ার মতো অপরাধ আমি করেছি ঠিকই… কিন্তু আপনাকে নিয়ে করা কোনো সিদ্ধান্তের জন্য আজও আমার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। ভবিষ্যতেও হবে না।’

রোযা নাক ফুলাল। আরেকটা কামড় বসিয়ে আদিলের কপালে তিনটে ভাঁজ দেখে অবশেষে সন্তুষ্ট হলো। নিজেকে ছাড়িয়ে নিল জোরপূর্বক। কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে নাক ফুলিয়ে বলল –

‘আপনার মতন বাজেলোক জীবনে আমি দুটো দেখিনি।’

আদিল দূরত্ব ঘোচাতে ব্যস্ত বড্ড, ‘দুটো কীভাবে দেখবেন? আদিল মির্জা এক পিস।’

রোযা উত্তর করবে, তার আগেই আকস্মিক তাকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল আদিল। রোযা চোখ বড়ো বড়ো করে কোলে মুচড়ে উঠল। কিছু বলতে চাইলে পরমুহূর্তেই মুখ বন্ধ করে দেওয়া হলো তার। বৃষ্টির আওয়াজ ব্যতীত আর কোনো শব্দ শোনা গেল না…

–

পিনপতন নীরবতার মতোই পুরো জায়গাটা ডুবে আছে ঘন অন্ধকারে। সামনের মানুষটিকে ঠিকমতো দেখতে পারছে না জিহাদ। শুধু আবছাভাবে বুঝতে পারছে, তার সামনে একজন নারী বসে আছে। যে সে নারী নয়! অন্ধকারের আড়ালেও এই নারীর উপস্থিতিটা অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট। চলনে-বলনে এক ক্ষমতার আবহ। কথার ধরন তীক্ষ্ণ। প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য হুমকির ছায়া।

নারীটি যতবার কথা বলছে, ততবারই জিহাদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠছে! এই জীবনে এমন দৃশ্য সে কখনো দেখেনি। এত গাড়ি। এত বডিগার্ড! চারপাশে এমন কড়া নিরাপত্তা তো সাধারণ কোনো মানুষকে ঘিরে হতেই পারে না। জিহাদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। অন্ধের মতো টেবিল থেকে একগ্লাস পানি তুলে গিলে নিয়েছে। তাতেও শান্ত হতে পারছে না। নানান ব্যাপার ভেবেই শিউরে উঠছে সে। কোনো ভাবে কি আদিল মির্জার সাথে জড়িত? অন্ধকারের আড়ালে বসে থাকা এই নারী আসলে কে? কীভাবে চিনল তাকে? আর রোযাকেই বা কীভাবে চেনে? সহস্র প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।

এতসব চিন্তার মাঝেই জিহাদ অস্পষ্টভাবে দেখল, নারীটি উঠে দাঁড়িয়েছে মাত্র। ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে তার দিকেই। পরমুহূর্তেই ঘাড়ে অনুভব করল নরম আঙুলের স্পর্শ। কানের কাছে এসে থামল উষ্ণ নিঃশ্বাস। ক্রমশ তার অস্তিত্বের ওপর বাহাদুরি দেখিয়ে গেল। নিচু স্বরে শুধাল –

‘ফিয়ন্সেকে ফিরে পেতে চান তো, জিহাদ?’

জিহাদ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। মাথাটা সামান্য সরিয়ে এনে উল্টো জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে? আমাকে, রোযাকে কীভাবে চেনেন?’

সঙ্গে সঙ্গে কোনো জবাব এল না। শুধু টের পেল, নারীটি তার আশেপাশে ধীর পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেভাবে সিংহ শিকার করার পূর্বে তার শিকারির আশেপাশে ঘুরতে থাকে, ঠিক তেমন। শান্ত অথচ ধারালো কণ্ঠে বলল –

‘সেটা তো মুখ্য বিষয় নয়, জিহাদ। ইজ ইট? ইটস ন্ট। আপনি যা চান, আমি তা আপনাকে পেতে সাহায্য করব। এবং আপনি চাইলে আমি আরও অনেক কিছু আপনায় অফার করব। আপনি যা চান তাও আমি দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আই বিলিভ চেষ্টা করতেও হবে না, দেয়ার সামর্থ্য আমার আছে।’

জিহাদের কণ্ঠে এবার সংশয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘আপনার তাতে লাভ? আপনার স্বার্থ কী? স্বার্থ ছাড়া আপনি কেনই বা আমাকে সাহায্য করবেন?’

নারীর কণ্ঠ আরও নিচে নেমে এল, ‘অবশ্যই স্বার্থ আছে। গিভ অ্যান্ড টেক বলতে তো একটা কথা আছে, তাই না? তবে তা আপনার জেনে কোনো লাভ নেই। বরং ক্ষতি। আপনি শুধু প্রস্তুতি নিন কীভাবে ম্যানুপুলেট করবেন! কীভাবে ছিনিয়ে আনবেন আপনার রোযাকে। বিপরীতে আপনি আমার আন্ডারে কাজ করলে যা চাই, তাও পাবেন।’

জিহাদ ধড়ফড়িয়ে ওঠে। আরও প্রশ্ন করতে চায়, কিন্তু সুযোগ দেওয়া হয় না তাকে। নারীটি যেভাবে এসেছিল, তার চেয়েও দ্রুত সেভাবেই চলে যায়। দরজা খোলার মুহূর্তে মৃদু আলোয় তাকে অল্প কিছুটা দেখতে পেল জিহাদ। অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আঁটসাঁট বডিকন ড্রেস, যেন শরীরের সঙ্গে মিশে আছে। হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত অনাবৃত। মৃদু আলোয় চিকচিক করছে তা। হাঁটার তাল, বলার ঢং জানিয়ে গেল, স্বাভাবিক কোনো নারী সে নয়। পরক্ষণেই জিহাদের চোখজোড়া বেঁধে দেওয়া হলো। তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো ঠিক যেভাবে আনা হয়েছিল। ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে তার। ভয় আছে, অনিশ্চয়তা আছে। তবু রোযাকে ফিরে পেতে হলে, অন্তত একবার তার সঙ্গে দেখা করতে হলে, এতটুকু ঝুঁকি তো নিতেই হবে।

–

রাজপুরের নদীর জলে পড়েছে চাঁদের প্রতিচ্ছবি। তীব্র কুয়াশার প্রলেপে চারপাশ অস্পষ্ট হয়ে আছে। সেই অস্পষ্ট মেঠোপথ ধরে তড়িঘড়ি করে হাঁটছেন নাসির শিকদার। কুড়ি মিনিটের পথ তিনি দশ মিনিটেই পেরিয়ে এলেন।

বাড়ির প্রধান ফটকে পৌঁছাতেই দেখলেন, দুয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে আছে ছোটো ভাই জব্বার। বড়ো ভাইজানকে দেখেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন জব্বার শিকদার। তাড়া দিলেন ভেতরে ঢোকার জন্য। ছোটো ভাইয়ের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা দেখে ভেতরের দিকে এগোতে এগোতে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন –

‘হয়েছে কী? এত তাড়া কেন?’

জব্বার সাহেব কপাল ডললেন, ‘শান্ত আসতেসে, ভাইজান। কইল ব্যাগপত্র গোছাইতে দ্রুত। আমাগো ঢাকার লইজ্ঞা রওনা দিতে হইব আজ রাতের মধ্যেই।’

বাড়ির ভেতরে তখন রীতিমতো হুলুস্থুল কাণ্ড। বসার ঘরটা ল্যাগেজ দিয়ে ভরতি। গুরুজন থেকে কনিষ্ঠ, সবাই ছুটোছুটি করছে ল্যাগেজ গোছাতে। নাসির সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। বিস্মিত স্বরে আওড়ালেন –

‘ক্যান?’

জব্বার সাহেব নিজেও জানেন না। ছেলে দুটো শব্দ আওড়েই কল কেটে দিয়েছিল। বাইকের শব্দে বুঝেছিল ঝড়ের গতিতে গ্রামে ফিরসে সে।

‘এত কিছু বলে নাই ফোনে। আইসা জানাইব।’

নাসির সাহেব হতবিহ্বল না হয়ে পারলেন না।

‘জানা নাই, শোনা নাই সবাই ল্যাগেজ গুছাইয়া কই যাইতেসে?’

কথাটা বলতে বলতে তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সোফায় বসা মায়ের দিকে। আর তাতেই চমকে একাকার হয়ে গেলেন নাসির সাহেব। জাহানারা বেগম এই রাতবিরেতে শুভ্র রঙের কাতানের নতুন শাড়ি পরে দিব্যি তৈরি হয়ে বসে আছেন। আয়েশ করে পান চিবোচ্ছেন। দুহাতে লাঠি আঁকড়ে ধরে নিজের ল্যাগেজে কী কী নিতে হবে, তার একের পর এক আদেশ দিয়ে যাচ্ছেন! আর তা মন দিয়ে শুনে পালন করছেন কাকলী বেগম। দৃশ্যটা দেখে নাসির সাহেবের কপালে হাত ঠেকাতে ইচ্ছে করল।

‘আম্মা!’

সবে বোধহয় বড়ো ছেলেকে দেখতে পেয়েছেন বৃদ্ধা। এক হাত তুলে ডাকলেন –

‘এই নাসির, দেখ ল্যাগেজটা। আর কিছু নেওয়া লাগব? সবই বুইঝাশুইনা নিছে কাকলী। ওগো লাইগা কি নেয়া যায়? গাছগুলো দেখছস? গ্রামের ফলমূল নিতাম। পাঁক ধরসে বেশ কিছুতে।’

নাসির সাহেব গিয়ে বসলেন মায়ের পাশে। বিস্মিত কণ্ঠে বললেন –

‘কিছু না জাইনা, না বুইঝা… এইভাবে তৈরি হয়ে আছেন কেন, আম্মা? আর কার জন্য কি নিবেন?’

‘এইখানে শোনার আর বোঝার আছেটা কী? নাতি বাড়ি যামু।নাতিডারে দেহি না কতকাল!’

জব্বার সাহেব মায়ের মুখ দেখে আস্তে করে মনে করিয়ে দিলেন –

‘ওইটা আদিল মির্জা, আম্মা।’

জাহানারা বেগম সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। ছেলেটা বড্ড বাড় বেড়েছে তো!

‘আমার নাতির নাম কি আমি জানি না?’

জব্বার সাহেব থমকে পড়েন। এরপর আর কথা বাড়ালেন না। বড়ো ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসলেন। আড়চোখে বড়ো ভাইয়ের চোখে তাকিয়ে ইশারা করলেন। ঢাকা যাওয়া নিয়ে সবার মধ্যে তখন নীরব উত্তেজনা। তাদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, সাক্ষাৎ আদিল মির্জাই বুঝি দাওয়াত করে নিজের প্রাসাদে তুলে নেওয়ার জন্য লোক পাঠিয়েছে! এও কি সম্ভব? নাসির সাহেব মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করলেন—পরিবারকে সব বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলবেন। কিন্তু তার আর প্রয়োজন পড়ল না।

পরক্ষণেই বাইক, গাড়ির গর্জনে কেঁপে উঠল শিকদার বাড়ির উঠোন। তড়িৎ উঠে দাঁড়ালেন জব্বার সাহেব ও নাসির সাহেব। কদম বাড়ানোর প্রয়োজন হলো না তাদের। ততক্ষণে শান্ত প্রবেশ করেছে। তার পেছনে একদল বডিগার্ডস। যারা দাঁড়িয়ে পড়েছে বাইরেই। শান্তর পরনে কালো লেদারের রাইডিং পোশাক। ভেতরে ঢুকেই প্রথমে দাদিকে সালাম করল সে। তারপর ছুটে আসা মাকে বুকে আগলে নিল। আয়েশা বেগম ছেলের খবরাখবর জানতে ব্যাকুল। মায়ের চোখে সন্তান যেন সবসময়ই শুকিয়ে যাচ্ছে—কতই না রোগা হয়ে গেছে! আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।

জাহানারা বেগম নাতিকে পাশে বসার তাগাদা দিলেন। শান্তও দেরি না করে তার পাশেই বসল। কাকলী বেগম গরম জল এনে দিলেন সাথে সাথে। বাইরে কী তীব্র শীত! এর মধ্যে ছেলেটা এতটা পথ বাইক চালিয়ে এসেছে! শান্ত গরম জলটুকু একটানে গিলে অবশেষে তাকাল বাবা আর চাচার ফিকে মুখের দিকে। নাসির সাহেবের কৌতূহল আর চাপা রইল না।

‘ঢাকা কেন যাওয়া লাগব, বাপজান?’

শান্ত মৃদু হাসল। জবাব দেওয়ার আগেই জাহানারা বেগম নাতির হাত টেনে কাছে নিয়ে এলেন। উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন –

‘নাতি, নাতবউ, আমার বড়ো মা কেমন আছে রে? ওরা ভালো আছেতো? নাতবউয়ের মন কি একটু গলছে?’

শান্ত রহস্যময় ভঙ্গিতে অল্প হাসল। ধীরে বলল –

‘তা তো তোমার জন্য সারপ্রাইজ। গিয়েই না হয় দেইখো!’

জব্বার সাহেব চমকে উঠলেন।

‘মির্জা বাড়ি যামু নাকি?’

শান্তর চোখমুখ নরম হয়ে এলো –

‘তাহলে? মির্জা ম্যানশনে যাইবা।’

নাসির সাহেব ভাইপোর চোখমুখে চেয়ে জানতে চাইলেন, ‘ম্যানশন? যেইখানে বসের আম্মা-আব্বা থাকতেন ওইটা?’

মাথা নাড়ায় শান্ত, ‘হু, তোমাদের দাওয়াত করসে।’

‘কে? বস?’

ক্রমশ ঠোঁটের কোণে্র হাসির রেখা বাড়তে থাকল শান্তর, ‘ম্যাডাম, ম্যাডাম দাওয়াত করেছেন।’

মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন জাহানারা বেগম। চোখ দুটো তার ছলছল করে ওঠে হঠাৎ। তড়িঘড়ি করে কিছু একটা বলতে চাইল –

‘নাতব…নাতবউ সব ম…’

বোঝে শান্ত। দাদির হাতের ওপরে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলে, ‘নিজ চোখে দেইখো। গতকাল ভবন থেকে ম্যানশনে শিফট হয়েছে। ম্যাডাম দাদিমাকে, সুপ্তিকে খুব মিস করছেন। বললেন, সবাইকে নিয়ে যেতে।’

সুপ্তির আনন্দিত চিৎকারের আওয়াজ ভেসে বেড়াল চারপাশে। মায়ের পেছনে মেয়েটা রীতিমতো লাফাচ্ছে। শান্ত তাকিয়ে চোখ রাঙাতেই লাফানোঝাপানো থামল তার। পরমুহূর্তেই এক দৌড়ে চলে গেল ওপরে। তৈরি হয়ে নামবে বলে।

শান্তর কথা শুনে জাহানারা বেগম নিজেকে স্বাভাবিক করলেন। নিজেকে সামলে বৃদ্ধা ততক্ষণে আবার পুরোদমে নিজের ল্যাগেজ গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। একটার পর একটা জিনিসের কথা মনে পড়ছে, আর তিনি উচ্চস্বরে নির্দেশ দিয়ে চলেছেন –

‘আমার বড়ো মা সেবার আইসা খুব পছন্দ করছিল আয়নাটা। ওই ছোটো আয়নাটা ভইরা দে। খুশি হইব দেইখা। গাছে ফলমূল ধরছে কি না দেইখো। বড়োই পাকছে কিছু। ওগুলাও নিমু। নাতবউ কাকলীর হাতে হাঁস ভুনা পছন্দ করে। আমাগো কয়টা হাঁস নিয়ে নাও। ওইখানে রাইঁধা দেয়া যাইব।’

শান্ত কিছু একটা বলতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত আর বলল না। চুপ করে রইল। নাসির সাহেব নিজেও ততক্ষণে কাপড়চোপড় বদলাতে ছুটেছেন। পেছনে পড়ে রইলেন না জব্বার সাহেবও। ছোটো ভাইকে সঙ্গে নিয়ে তিনিও ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

শান্ত নরম দৃষ্টিতে দেখে গেল পরিবারের এই আকস্মিক উচ্ছ্বাস। ঢাকায় যাওয়ার জন্য নয়, মির্জা ম্যানশনে যাওয়ার আনন্দে তাদের ঘরের প্রতিটি কোণ যেন হঠাৎ করেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

–

আলিশান ঘরের ভারী পর্দাগুলো মেলে দেওয়া। তাই সবে উদিত হওয়া সূর্যের আলো এখনও পুরোপুরি ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। ঘরের অধিকাংশটাই আবছা আলোয় ঢাকা, বিশেষ করে বিছানার দিকটায় আধো-অন্ধকার জমে আছে। বিছানায় বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চাটা হঠাৎ একটু নড়েচড়ে উঠল। ক্ষীণ গোঙানির মতো শব্দ করে আধো-অন্ধকারে একপলক চোখ মেলে ফের বুজল। ঘুম তখনও কাটেনি। স্বভাবসুলভভাবেই মুখ বাড়িয়ে খুঁজল মায়ের বুকের পরিচিত উষ্ণতা।

কিন্তু মায়ের নরম শরীরের বদলে পেল নগ্ন, শক্তপোক্ত বুক। শক্ত বুকে মুখ গুঁজতেই মেয়েটার টনক নড়ল। ঘুম একেবারে কেটে গেল। পিটপিট করে চোখ মেলে মাথা তুলে তাকাতেই দেখতে পেল বাবার ঘুমন্ত মুখ। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভরে হেসে ফেলল বাচ্চাটা। উচ্ছ্বাস নিয়ে উঠে বসতে চাইলে চঞ্চল মেয়েকে একহাতে বুকের কাছে আরও গভীর ভাবে টেনে নিল আদিল। ছোট্ট মাথাটায় হাত বুলিয়ে আবার ঘুম পাড়াতে চাইল। চোখজোড়া তখনও বন্ধ তার। হৃদি ততক্ষণে পুরোপুরি সজাগ। নড়েচড়ে উঠে এল বাবার মুখের কাছে। দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরে পাখির মতো কিচিরমিচির করে উঠল –

‘গুড মর্নিং, ড্যাডি।’

আদিলের সদ্য ঘুমভাঙা কণ্ঠ অত্যন্ত গম্ভীর শোনাল, ‘মর্নিং, মাই বেবি। ডিড ইউ স্লিপ ওয়েল?’

‘ভীষণ। আমি কি রাতে এখানে ঘুমিয়েছি, তোমার সাথে?’

আদিল অবশেষে চোখ মেলে তাকাল। মুখের সামনে থাকা ছোট্ট মুখজুড়ে রাজ্যের আনন্দ। বাবার সাথে ঘুমিয়েছে এটাই যেন তার আনন্দের চাবিকাঠি। হৃদির ধূসর চোখজোড়া চকচক করছে। আদিল মেয়ের মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে ফের টেনে নিল বুকে।

‘হু, আমার ফিরতে লেট হয়েছিল, সোনা। তুমি তখন অলরেডি গভীর ঘুমে ছিলে।’

হৃদি বাবার বুকের ওপর শুয়ে আছে। সেখান থেকে মাথা তুলে তাকিয়ে বড়োদের মতো করে বলল –

‘যত দেরিই হোক, তুমি ফিরে আমায় ওঠাবে। আই ওয়ানা সি ইউ।’

আদিলের গম্ভীর মুখটা ঠিক ভোরের সূর্যের মতো নরম হয়ে এল। ধূসর চোখদুটোতে হাসি ফুটল। হৃদি ততক্ষণে বাবার গালে গাল ঘষছে আর একই আবদার পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে –

‘বলো, বলো… বলো না! বলো তুমি আমার ঘুম ভাঙাবে এসে। প্রমিজ মি!’

আদিল অসহায় হয়ে মেয়ের দিকে তাকাল।

‘কিন্তু মাম্মা, একবার ঘুম ভাঙালে তো আপনার ঘুম আর আসবে না। আর তা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য হার্মফুল।’

‘আই ডোন্ট কেয়ার। আই ওয়ান্ট টু সি মাই ড্যাড। আমি আরও অনেক অনেক সময় স্পেন্ড করতে চাই।’

হৃদির একগুঁয়ে জবাব শুনে আদিল নিঃশব্দে হাসল। আনন্দে ভরে উঠল তার পাথুরে হৃদয়। মেয়ের এলোমেলো চুলগুলো একহাতে গুছিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বলল –

‘ওকে…’

হৃদি রীতিমতো লাফিয়ে উঠল আনন্দে, ‘ওকে? ড্যাড, তুমি ওকে বললে তো?’

‘হু। তাহলে আজ আমার বেবির সাথে সময় কাটালে কেমন হয়?’

হৃদি মুহূর্তেই বুঝে ফেলল কথার মানে। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল সে। চোখেমুখে আনন্দ ধরে না, ‘তুমি বাসায় থাকবে আজ? ইজ ইট ট্রু?’

‘ইট ইজ…’

ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ হলো। করিডোরের বাতির আলো অল্প একটু ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ভেসে এল রিনরিনে কণ্ঠ –

‘কী ট্রু? কী নিয়ে আলাপ হচ্ছে?’

বলতে দেরি, পর্দা সরাতে দেরি হলো না। মুহূর্তেই সূর্যের সমস্ত আলোয় ভরে উঠল বিশাল ঘরটি। সেই তীক্ষ্ণ সকালের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল আদিলের ধূসর চোখের মণিজোড়া। রুমের ভেতর ব্যস্ত পায়ে পায়চারি করা মানুষটিকে অনুসরণ করে গেল তার ধারালো দৃষ্টি। রোযার পরনে লাল রঙের শাড়ি। গলায়, কানে, হাতে মানানসই অলংকার। লম্বা চুলগুলো এখনও ভেজা। ব্লো-ড্রাই করার সময় হয়ে ওঠেনি বোধহয়। হাঁটতে হাঁটতে হাত নাড়তেই সোনার চুড়ির মৃদু রিনিঝিনি শব্দ ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘরজুড়ে। হৃদি ততক্ষণে বিছানার ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে। উচ্ছ্বাসে মাকে জানায় –

‘মম, তুমি শোনোনি, না? ড্যাড আজ বাড়িতেই থাকবে বলেছে। কোথাও যাবে না। ড্যাড প্রমিজড মি।’

আদিল উঠে বসেছে। পিঠটা বিছানার হেডবোর্ডে এলিয়ে রাখা। কম্ফোর্টার পড়ে আছে কোলে। নগ্ন, পেশিবহুল বুকে নখের সুস্পষ্ট আঁচড়ের দাগ। রোযার চোখ সেখানে পড়তেই মুহূর্তেই দৃষ্টি নেমে গেল। আর ভুলেও ওপরে তুলল না। এড়িয়ে গেল আফিমের চেয়েও নেশীয় চোখের দৃষ্টি। রোযা মেয়ের উচ্ছ্বাস বাড়াতে জানায় –

‘আজ বাড়িতে অতিথি আসবে।’

মুহূর্তে বাচ্চাটা তড়িঘড়ি করে ছুটে এল মায়ের কাছে, ‘কোন অতিথি আসবে মাম্মা? ডু আই নো দেম?’

রোযার মেয়ের মুখ বুলিয়ে দিয়ে বলে, ‘তুমি যেন কাদের খুউব মিস করতে?’

হৃদি গালে হাত দিয়ে বড়োদের মতন ভাবছে। রোযা হেসে মেয়ের নাক ছুঁয়ে বলে, ‘ড্যাডের সাথে ফ্রেশ হয়ে নাও দ্রুত। তারা কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে।’

মায়ের থেকে উত্তর না পেয়ে হৃদি ছুটে গিয়েছে বাবার কাছে। আদিল ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। পরনে শুধু ঢোলা ট্রাউজার। ছুটে আসা মেয়েকে কোলে তুলে নিয়েছে ঝট করে।

‘তুমি আমাকে বলো, কারা আসছে ড্যাড?’

রোযা আলগোছে বেরিয়ে এসেছে। বেরুতে বেরুতেও অনুভব করতে পারল একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি। যা সে সকাল থেকে এড়িয়ে বেরাচ্ছে। গতকাল রাতের ঘটনা মনে পড়তেই লজ্জায় ফর্সা কান থেকে গলা পর্যন্ত লাল হয়ে গেল।

–

কড়া রোদের আলোয় ঝলমল করছে ম্যানশন। সূর্যের সূক্ষ্ম রশ্মি এসে পড়েছে ওয়াটারফলের স্বচ্ছ জলের ওপর। তার পাশেই আজ সকালে স্থাপন করা হয়েছে সিংহের বিশাল মূর্তিটি। সূর্যের আলোয় মূর্তির চোখদুটো ঝিকমিক করছে।

ড্রাইভওয়েতে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি। চতুর্দিকের কড়া নিরাপত্তায় পুরো ম্যানশনটি সুরক্ষিত আজ। একটি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে এলেন। কালো স্যুট পরনে, চোখে সানগ্লাস। আজ তার ঠোঁটের কোণ থেকে হাদি নড়ছে না। অপ্রয়োজনে তাকে হাসতে দেখা যায় না সচরাচর। আজ দেখা যাচ্ছে। অবশ্য গতকাল থেকে কমবেশি সবাই-ই ভীষণ বিগলিত। এলেন, শান্ত, ওরা দুজনই তো এই বাড়িতেই প্রথম এসেছিল আদিলের বডিগার্ড হয়ে। তখন দুজনেই হাঁটুর বয়সী ছেলে। কতশত স্মৃতি জমে আছে এই বাড়ির প্রতিটি কোণে! যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই কোনো না কোনো স্মৃতি হাতছানি দেয়। এত কিছু হয়ে গেল। সব পরিবর্তন হলো, বুকের ভেতর কষ্ট জমল। তারপরও এই জায়গাটাকেই আপন নিবাস বলেই মনে হচ্ছে।

এলেন বাকিদের উদ্দেশে নির্দেশ ছুড়ছে। তার আদেশ পেয়ে কয়েকজন বডিগার্ড গাড়িগুলো একে একে গ্যারেজে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। ড্রাইভওয়েটা ফাঁকা করা হচ্ছে আরকি। ক্লান্ত আড়চোখে ম্যানশনের প্রধান দরজার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল –

‘কতদূর আছে যেন বলছিল? চলে আসবে মনে হয়?’

এলেন হাতঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়ির কাঁটা তখন সাতটা নয় মিনিট ছুঁইছুঁই।

‘এই তো, ঢুকবে বোধহয়…’

কথা শেষ হওয়ার আগেই অদূর থেকে কয়েকটি গাড়ি এগিয়ে আসতে দেখা গেল। একে একে সেগুলো এসে থামল ম্যানশনের ঠিক সামনে। ততক্ষণে ভেতরেও খবর পৌঁছে দিয়েছে ক্লান্ত। সর্বপ্রথম গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল শান্ত। গাড়িটা সেই-ই চালিয়ে এসেছে। এলেন এগিয়ে গিয়ে ব্যাকসিটের দরজাটা খুলে ধরল। ভেতরে চোখ পড়তেই আচমকা থমকে গেল সে। সোজা এসে পড়ল একজোড়া কালো চোখের মণিতে। দৃষ্টি আদান-প্রদান হতেই এলেন খানিক হকচকাল। চিনতে তার এক মুহূর্ত সময় লাগল। শান্তর চাচাতো বোন। দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে দরজাটা আরও মেলে ধরল সে। সুপ্তি বেরিয়ে আসতে আসতে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল –

‘ভালো আছেন তো, ভাইয়া?’

এলেনের কণ্ঠটা কেমন নির্বাক শোনাল। দায়সারা ভাবে জবাবটুকু এল –

‘ভালো।’

এক শব্দের জবাব। সুপ্তির অবশ্য সেদিকে কোনো মনোযোগ নেই। তার দৃষ্টি আটকে গেছে বাড়ির দরজার দিকে। ভেতর থেকে একটি শরীর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। তার পেছনেই রয়েছেন আরও দুজন নারী। শাড়ি পরিহিত রোযাকে চোখে পড়তেই সুপ্তি থমকে গেল। পরমুহূর্তেই ছুটতে ছুটতে সশব্দে ডাকল –

‘ভাবিই!!’

রোযা হেসে ফেলল। ছুটে আসা মেয়েটিকে দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল। সুপ্তিও শক্ত করে তাকে আঁকড়ে ধরে বলে গেল ট্রেনের গতিতে –

‘আমি তোমাকে কত মিস করেছি! খোদার কাছে দোয়া করছিলাম, এই জীবনে আর একবার হলেও যেন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়।’

রোযা মৃদু হেসে বলল, ‘শুধু একবার মাত্র?’

সুপ্তি লাজুক কণ্ঠে আওড়াল, ‘বিয়ের বয়স হয়েছে না? আজ বাদে কাল বিয়ে করব। স্বামী যদি আসতে না দেয়?’

রোযা ভ্রু তুলে বলল, ‘তোমার ওই স্বামীকে এনে বেঁধে রাখব। আসতে দেবে না মানে?’

সুপ্তি দুহাতে মুখ চেপে হতবিহ্বল চোখে তাকাল রোযার দিকে। আপদমস্তক তাকিয়ে বলে –

‘ভাবি, তুমি তো গুন্ডি হয়ে গিয়েছো!’

রোযা মৃদুস্বরে হেসে বলল। পেছনে দাঁড়ানো নূরজাহানও হাসছে। রোযাকে বলতে শোনা গেল –

‘গুন্ডার সঙ্গে সংসার করলে গুন্ডি একটু হতে হয়।’

এবারে জুলেখা বেগমের ঠোঁটের কোণও প্রসারিত হয়ে এসেছে। রোযা বলতে বলতেই তাকাল সামনে। ওদিকে শান্ত হাত ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনছিল জাহানারা বেগমকে। বৃদ্ধার পা মাটিতে পড়তেই তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে থামল রোযার ওপর। মুহূর্তেই ছলছল করে উঠল তার দুটো চোখ।

সুপ্তি ধীরে ধীরে সরে দাঁড়াল। রোযাও আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। এগিয়ে গেল তার দিকে। জাহানারা বেগম দুর্বল দুহাত বাড়িয়ে দিতেই রোযা ঝুঁকে তাকে জড়িয়ে ধরল।

রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই তাদের মধ্যে। দীর্ঘদিনের চেনাজানাও নেই তার সাথে। অথচ তারপরও কী এক সূক্ষ্ম টান! যেন রক্তের সম্পর্ককেও ছাড়িয়ে গেছে এই মায়া। গ্রামের ওই দুটো দিন এই জীবনে রোযা ভুলতে পারবে না। পারবে না জাহানারা বেগমকে ভুলতে। যে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে আদিল মির্জাকে। যার সাথে তার কোনো র ক্তের সম্পর্ক নেই।

রোযা আলতো গলায় ডাকল –

‘দাদিমা!’

বৃদ্ধার বাম চোখ থেকে হঠাৎ একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ক্রমাগত হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন রোযার মাথায়। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। শান্ত আড়চোখে দুবার তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে রাখল। ঢোক গিলল অল্প। কাকলী বেগম, আয়েশা বেগম, নাসির শিকদার, জব্বার শিকদারসহ বাকিরাও দাঁড়িয়ে আছেন নিঃশব্দে। দেখছেন অপলক! নীরবতা ভাঙল একটি চঞ্চল কণ্ঠে –

‘মম…’

হৃদি সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে। রোযা ধীরে ধীরে সরে এল। জাহানারা বেগমের দৃষ্টি গিয়ে থামল রোযার পেছনে। হৃদির দুরন্ত কদম সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। পরমুহূর্তেই আনন্দে ডেকে উঠল –

‘বড়ো মাআয়ায়ায়া!’

জাহানারা বেগম আর নুইতে পারেন না। কোমর ধরে যায়। তবুও ছুটে আসা হৃদিকে কোলে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। নিলেনও। বৃদ্ধার দুর্বল শরীরটা সামলে রাখল রোযা। হৃদি দুই হাত দিয়ে জাহানারা বেগমকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল –

‘তুমি কেমন আছো, বড়ো মা? ডিড ইউ মিস মি? তুমি কি জানো, আমি তোমাদের কত মিস করেছি? জানো? অনেক, অনেক বার তোমার কথা ভেবেছি। জিজ্ঞেস করেছি। ইউ ক্যান আস্ক মাই মম!’

জাহানারা বেগম কাঁদছেন। কান্নার কোনো কারণ নেই। বয়স হয়েছে তো! অল্পতেই চোখ ভিজে ওঠে। কী বুঝলেন কে জানে! চুমু খেলেন হৃদির ফুলো গালে। দুটো চুমু দিয়ে তিনি দুহাতে সারামুখে আদর করে দিয়ে বললেন –

‘আমিও আমাকে বড়ো মারে অনেক মনে করছি।’

রোযা ফিরে তাকাল পেছনে। গিয়ে সবার সাথে টুকটাক আলাপ করে ভেতরে নিয়ে এল। বিশাল বসবার ঘরের ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করছে সব। জাহানারা বেগম নরম সোফায় বসেই চতুর্দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করেন –

‘নাতি কই? বাসায় নাই?’

শান্তর শ্বাস গলায় আটকে গেল। গতবার বসের গাল টেনে দিয়েছিলেন। এবার তার দাদিমা কী করেন, একমাত্র মাবুদই জানেন! রোযা জবাব দেওয়ার আগেই পদচারণার শব্দে সবার দৃষ্টি সেদিকে উঠল। আদিল ওপরতলা থেকে নেমে আসছে।

পরনে কালো ট্রাউজার, কালো টি-শার্ট। মুখের স্বাভাবিক গাম্ভীর্যটুকুও আজ আরও স্পষ্ট। নাসির শিকদার, জব্বার শিকদার, লুৎফর শিকদার সঙ্গে সঙ্গে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। আদিল নিচে নেমে এসে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল –

‘বসুন।’

সবাই আবার বসে পড়ল। জাহানারা বেগম ইশারায় আদিলকে কাছে ডাকলেন। আদিল আপনমনে একবার দম টেনে নিল। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে গিয়ে ঠিক তার পাশেই বসল।

সঙ্গে সঙ্গেই বৃদ্ধা আদিলের হাতের ওপর হাত রেখে বলে উঠলেন –

‘নাতিডা আমার আর পরিবর্তন হইল না। আগের মতোই চোখমুখ গম্ভীর কইরা রাখে। একটা কথার বেশি দুইটা কথা কয় না।’

আদিল নির্বিকার। শান্তর চোখেমুখে তখন কেমন আতঙ্ক।

বৃদ্ধা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আপনমনে বলে চললেন –

‘এই নাতি, বউয়ের সোহাগে এইবার অন্তত একটু গম্ভীরতা কমাও।’

পিনপতন নীরবতা নেমে এল বসার ঘরে। রোযা সবেমাত্র নূরজাহানের হাত থেকে ট্রেটা নিয়ে টি-টেবিলের ওপর রেখেছিল। কথাটা কানে যেতেই হাত থেমে গেল তার। থতমত খাওয়া শান্তর শ্বাস আটকে এল গলায়। হৃদি ছাড়া সবাই যেন একেবারে চুপসে গেছে। জাহানারা বেগম অবশ্য কারও মুখের ভাব দেখার প্রয়োজনই বোধ করলেন না। তিনি আদিলের হাতটা নিজের হাতে ধরে রেখেই বলে চললেন –

‘এখন তো বউয়ের মোহাব্বত পাইতাছো। ওই মোহাব্বতে মন, মুখ তো নরম হওয়ার কথা। হয় না ক্যান?’

রোযার কান দুটো ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল। আদিল জাহানারা বেগমের প্রশ্নবোধক চাহনি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ফেলল রোযার ওপর। চারিপাশ থমকে গেল তার নির্বাক কথায় –

‘সম্ভবত আপনার নাতবউ আমার মন গলানোর মতো মোহাব্বত করছে না। আপনি শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়ে গেলে কেমন হয়, দাদিমা?’

রোযা চমকে তাকাল। আদিল চেয়েইছিল। দৃষ্টিতে দৃষ্টি পড়তেই কাঁপল রোযার ঠোঁট। শান্ত তখন হতবিহ্বল। ততক্ষণে জাহানারা বেগম গদগদ হয়ে বললেন –

‘নাতবউ ছুডো মানুষ। জামাইয়ের মনোরঞ্জন বুজে না। আমি শিখাইয়া দিমু যে কয়দিন আছি। শোনো নাতবউ, তোমার দাদা ছিলেন কাঠখোট্টা মানুষ। মুখে হাসি নাই, দুটো নরম কথা নাই। তারপর আমি জাহানারা এমন মোহাব্বত করছি আসতে-যাইতে খালি হাসতো। সবাই ভাবতো হাঁসের ডিম খাইসে। কথা কইতো ফটরফটর। আমি ছাড়া সে কিচ্ছু বুঝতো না। সারাদিন পিছু ঘুরতো। ডানে যাইতে বললে যাইতো ডাকে, বামে যাইতে বললে যাইতো বামে।’

সবে ঝুমুর এসে পৌঁছেছিল দুয়ারের সামনে। দাদিমার কথা শুনে ও ফিক করে হেসে উঠল। তার হাসির তালে হাসল সুপ্তি। বড়োরা মুখ চেপে রেখেছেন। পরমুহূর্তেই একগুচ্ছ প্রাণোচ্ছল হাসির আওয়াজে পুরো প্রাসাদ ঝলমল করে উঠল। রোযা লজ্জায় হাঁসফাঁস করছে। একপর্যায়ে দাঁতে দাঁত পিষে আড়চোখ চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই আদিল ডান ভ্রু তুলল। বধূ রূপে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে আপদমস্তক দেখল অনেকক্ষণ। বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দৃষ্টি রাখল রোযার রাঙানো চোখের দিকেই। পরবর্তীতে যা বলল তাতে থমকে পড়ল সব –

‘তাহলে আমি অপেক্ষায় রইলাম। ইশারা মোতাবেক ডানে-বায়ে যাওয়ার জন্য।’

এবারে হাসলেন জাহানারা বেগম। হাসতে হাসতে চোখে জল জমেছে তার। আদিল যাওয়ার পথেরোযার কাঁধ ঘেঁষে গেল।

_____________

চলবে –

® নাবিলা ইষ্ক।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply