[পর্ব ৮০]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
রাত নেমেছে বার্সেলোনার আকাশে।
Mediterranean Sea এর জলে চাঁদের আলো পড়ে রুপালি রেখা এঁকে দিয়েছে। ঢেউগুলো যেন নিঃশব্দে কোনো গোপন কথা বলছে এক শহর থেকে আরেক শহরে, এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে।
Port Vell এর গভীর জলে ভেসে আছে কয়েকটি বিলাসবহুল ইয়ট। সেগুলোর কাঁচের দেয়ালের ভেতর আলো জ্বলছে, কিন্তু সেই আলোয় উষ্ণতা নেই আছে হিসাব, ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার ঠান্ডা হাসি।
একটি কালো রঙের জাহাজ ধীরে ধীরে নোঙর ফেলে। তার গায়ে কোনো নাম নেই, পতাকা নেই শুধু অন্ধকার।
ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে শহরের আলো প্রতিফলিত হলেও, তাদের ভেতরে জ্বলছে অন্য আগুন।
দূরে, বন্দরের ধারে এক নারী দাঁড়িয়ে আছে। তার চুলে সমুদ্রের হাওয়া। সে জানে আজ রাতের এই সাক্ষাৎ কাকতালীয় নয়।
এই শহরে মানুষ যেমন প্রেমে পড়ে, তেমনি শত্রুতাতেও জড়ায়। ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় পাথুরে বাঁধে। ঠিক সেই মুহূর্তে দুই ভিন্ন দুনিয়ার মানুষ একে অপরের সামনে এসে দাঁড়ায় একজন ক্ষমতার অন্ধকার থেকে, আরেকজন নিজের অতীতের আলো বুকে নিয়ে।
বার্সেলোনার রাত এখন গভীর, তবু জেগে আছে জলরাশি। জাহাজটি নোঙর করে আছে Mediterranean Sea এর গাঢ় নীল বুকে, শহরের বন্দর Port of Barcelona এর ধাতব আলো পেছনে ফেলে। ঢেউ এসে জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়ছে নরম, কিন্তু সতর্কবার্তার মতো।
খোলা ডেকের কিনারায় এসে দাঁড়ায় আফরিদ এহসান। মাফিয়া কিং।
নামটি উচ্চারণের আগেই যার উপস্থিতি সকলে জমে ওঠে ভয়ে।
কালো স্যুটের ওপর কালো হুডি। হাওয়ায় কাপড় উড়ে উঠে আবার থিতিয়ে পড়ে , তার চোখ দুটো সমুদ্রের রাতের থেকেও গভীর; তীক্ষ্ণ, নির্ভুল, শীতল। তাকানো মানেই যেন অদৃশ্য দাগ কেটে দেওয়া।
এই শহর তার অচেনা নয়। দূরে শহরের আলো, আর আরও দূরে বয়ে চলেছে নদী নিঃশব্দ সাক্ষী। নদী আর সমুদ্রের মিলনরেখায় দাঁড়িয়ে আছে সে; যেন অতীত আর বর্তমানের সীমান্তে। পেছনে এসে থামে ইদ্রান। তার পাশে ঈশান। দু’জনের শরীরে প্রস্তুতির টান, চোখে হিসেবি সতর্কতা। তবু আফরিদের ছায়া এতটাই দীর্ঘ যে তাদের উপস্থিতিও যেন তার ইশারার অপেক্ষায়।
ইদ্রান দু’হাত ভাঁজ করে নিচু স্বরে বলে,
“তাহলে তাকে ডেকে নেওয়া হোক?”
বাতাসের গতি যেন মুহূর্তে বদলে যায়। তীব্র হয় আরো। কাকে ডাকার কথা বলছে ইদ্রান তা ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে।
আফরিদ ধীরে মাথা কাত করে। নাকের নিচে আঙুল ছুঁয়ে হালকা ঘষে তার স্বাক্ষর ভঙ্গি। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত বাঁক। হাসি না হুমকি বোঝা কঠিন।
তার কণ্ঠ নেমে আসে নিচু, কর্কশ,
“হোয়াই নট?”
ইদ্রান হাসলো। অবশেষে দেখা হতে চলেছে আরো একবার মাফিয়া কিং সামনে আসতে চলেছে। তবে এবার কোনো গ্যাংয়ের সামনে নয়, একজন পুলিশের সামনে। সেই পুলিশের সামনে যে হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে এই নীল চোখের, ঈগল পাখির অধিকারীকে!
_____________
আজ দু’দিন অতিক্রান্ত। আফরিদ এহসান বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে স্পেনের বার্সেলোনায় অবস্থান করছে। যাওয়ার আগে ন্যান্সি শত অনুরোধ করেছিল তাকেও যেন সঙ্গে নিয়ে যায়। অভিমান, অনুযোগ, ক্ষোভ সবটুকুই উজাড় করে দিয়েছিল সে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে আফরিদ একটিও প্রতিবাদ করেনি। নীরব, স্থির দৃষ্টিতে কেবল তার প্রতিটি অভিযোগ শুনে গিয়েছিল।
সকালের পর থেকেই ন্যান্সির শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত অবনতির দিকে। বারবার বমি, মাথা ঘোরা আর অস্বস্তিতে পুরো শরীর ভেঙে পড়েছে। তবে তার অন্তরের গভীরে জন্ম নেওয়া আশঙ্কা ছিল আরও ভয়ংকর।
অবশেষে সমস্ত দ্বিধা উপেক্ষা করে সে একটি প্রেগন্যান্সি কিট সংগ্রহ করল।
কাঁপতে থাকা আঙুলে পরীক্ষাটি সম্পন্ন করতেই সময় যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।টকটকে লাল দুটি রেখা।
এক নিমিষেই সমস্ত রক্ত যেন মুখমণ্ডল থেকে সরে গেল। বিস্ফারিত নয়নে সে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিটটির দিকে। মস্তিষ্ক যেন বাস্তবতাকে গ্রহণ করতেই অস্বীকার করছে।তার অন্তরে,সত্যিই আরেকটি প্রাণের স্পন্দন জন্ম নিয়েছে!
সমস্ত দেহে অদৃশ্য শিহরণ বয়ে গেল। কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।এবার কী হবে?আফরিদ এহসান জানতে পারলে কী করবে?
হয়তো সেই দুর্ধর্ষ, অনুভূতিহীন মাফিয়া কিং আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠবে। কারণ এই মুহূর্তটির জন্যই তো সে প্রতীক্ষা করেছে দীর্ঘদিন। বারবার বলেছে নিজের অস্তিত্বের একটি অংশ ন্যান্সির মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে দেখতে চায়।
আজ সেই অসম্ভব কল্পনাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ,
“ইলহাম আপু,আসব?”
তিতলির কণ্ঠস্বর শুনে যেন সম্বিৎ ফিরে পেল ন্যান্সি। চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে প্রেগন্যান্সি কিটটি বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেলল।
“হ্যাঁ?”
কণ্ঠে অন্যমনস্কতার স্পষ্ট ছাপ।তিতলি পুনরায় মৃদু স্বরে বলল,
“বলছিলাম, ভেতরে আসব?”
ন্যান্সি নির্বাকভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
তিতলি ধীরপায়ে কক্ষে প্রবেশ করল। ন্যান্সির মুখশ্রী গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেই তার মনে অস্বস্তি জন্ম নিল। আজকের ইলহামকে যেন চেনাই যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সে প্রশ্ন করল,
“ইলহাম আপু,তুমি কি কোনো কারণে আমার ওপর রাগ করেছ?”
প্রশ্নটির অন্তর্নিহিত কারণ ন্যান্সির অজানা নয়।
সেই ঘটনার পর থেকেই সে সচেতনভাবে দূরত্ব তৈরি করেছে স্মাইলি, কল্পনা, তিতলি এমনকি মাইমুনা এহসানের সঙ্গেও।
অন্যদিকে আফরিদ, ইদ্রান ও ঈশান স্পেনে গেলেও স্মাইলিকে সঙ্গে নেওয়া হয়নি। আফরিদ বলেছিল, তারা ফিরে এলে ইদ্রান তাকে স্থায়ীভাবে নিয়ে যাবে।
ন্যান্সি সংযত কণ্ঠে উত্তর দিল,
“না, রাগ করব কেন?”
তিতলি উত্তর শুনেও আশ্বস্ত হতে পারল না। ইলহামের আচরণে আজ এক অচেনা শীতলতা। যে মানুষটি সর্বদা তাকে আপন বোনের মতো আগলে রাখত, আজ সে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে দূরত্ব সৃষ্টি করছে।
অবশেষে দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“আমি, কোনো ভুল করেছি, ইলহাম আপু?”
ন্যান্সি ধীরে ধীরে শয্যা ত্যাগ করে দাঁড়াল। অধরের কোণে এক রহস্যময়, ক্লান্ত হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তুমি কী ভুল করবে, তিতলি? অযথা এত কিছু ভেবো না।”
বাক্যগুলো যতটা স্বাভাবিক শোনাল, অন্তরে ততটাই প্রবল ঝড় বয়ে চলেছে।সে আর একা নয়। তার অস্তিত্বের ভেতর আরেকটি নিষ্পাপ প্রাণ আশ্রয় নিয়েছে।
এখন থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে ভেবেচিন্তে ফেলতে হবে। যে করেই হোক এই সংবাদ গোপন রাখতে হবে। ঘুণাক্ষরেও কাউকে টের পেতে দেওয়া চলবে না যে ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা মাতৃত্বের প্রথম প্রহরে পদার্পণ করেছে।
কিন্তু আফরিদ?তাকে কি জানানো উচিত?প্রশ্নটি হৃদয়ের গভীরে বজ্রাঘাতের মতো প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।সে কি সত্যিই এই সংবাদ জানার অধিকার রাখে?
যে মানুষটির হাত র’ঞ্জিত অসংখ্য অপরাধে, যার জীবন রক্ত, প্রতিশোধ আর অন্ধকারের সমার্থক সে কি আদৌ একজন সন্তানের পিতা হওয়ার যোগ্য?
_______________
মস্কোর আকাশটা আজ অস্বাভাবিক।
সন্ধ্যার আলো নিভে এসে শহরটাকে গিলে খাচ্ছে ধূসর কুয়াশা। উঁচু অট্টালিকার কাচে লেগে থাকা ঠান্ডা বাতাস যেন আগাম কোনো রক্তাক্ত অধ্যায়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
মিখাইল জানালার সামনে দাঁড়িয়ে। এক হাতে ফোন, অন্য হাত মুঠো হয়ে আছে। কণ্ঠে গাম্ভীর্য, অথচ গভীরে লুকিয়ে থাকা দোলাচল স্পষ্ট।
“Everything is ready?”
ফোনের ওপাশে নরম, মোলায়েম কণ্ঠ। সেই আগুন্তক নারী। ঠোঁটে আজ পিংক লিপস্টিক রক্তিম নয়, যেন অদ্ভুত এক নিরীহ রঙ; অথচ তার হাসির ভাঁজে লুকিয়ে আছে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।
“বেইবি, আমি তো ভাবতেই পারছি না,মাফিয়া কিং ম’রতে চলেছে!”
কথাটা বলে সে অদ্ভুত এক খিলখিল হাসি হাসে। সেই হাসি আনন্দের নয়, বরং প্রতিশোধের গোপন উল্লাস। পরনে শর্ট স্কার্ট, কিন্তু তার চেয়েও ছোট তার সহানুভূতি। চোখদুটো ঝলমল করছে উত্তে’জনায়।
মিখাইল চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
স্পেনের বার্সেলোনায় নতুন টিম প্রস্তুত। পরিকল্পনা নিখুঁত। তবুও অদৃশ্য এক ভয় তাকে গ্রাস করছে।
“আই ডোন্ট নো সুইটহার্ট,আমরা যা করতে যাচ্ছি, সেটা আদৌ হবে কি না।”
কথাগুলো তার কণ্ঠে অনিশ্চয়তার রেখা এঁকে দিচ্ছে। মিখাইল সত্যি শিও্যর হতে পারছেনা আদতেও কি তারা কোনো ক্ষ’তি করতে পারবে?
নারী আবার হাসল, এবার একটু ধীরে, একটু গভীরভাবে।
“নো নো, বেইবি এত টেনশন করতে হয় না। আমাদের প্ল্যান অবভিয়াসলি সাকসেসফুল হবে। তুমি শুধু নিজের উপর ভরসা রাখো।”
মস্কোর ঠান্ডা বাতাস যেন জানালার কাচে কাঁপন ধরায়। সেখানটায় হাত ছোঁয়ায় মিখাইল!
মিখাইল জানে এই আক্রমণ শুধু একজন মাফিয়া কিংয়ের বিরুদ্ধে নয়; এটা ক্ষমতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
তাকে সরাতে পারলেই খেল খতম। এতদিন ধরে এই মাফিয়া তাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে! উঁহু এতসহজে তো সে ছেড়ে দেব না!
র’ক্ত ঝরবে হয়তো, কিংবা বিশ্বাস। মিখাইল গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
“টাইম?”
“মিডনাইট। যখন শহর ঘুমাবে, তখন ইতিহাস জেগে উঠবে। আবারো সেই ভয়ংকর ইতিহাস যা বহু বছর আগে ঘটেছে!”
কথাটা শুনে মিখাইলের চোখে ক্ষীণ আ’গুন জ্বলে উঠল। ঠোঁটের কোণে খেলে গেল বাঁক! এই নারী সাধারণ কেউ নয়, মারাত্মক! এক শব্দে ভয়ংকর!
_________________
রজনীর গভীরতা ততক্ষণে সমগ্র এহসান মঞ্জিলকে নিস্তব্ধতার আবরণে ঢেকে ফেলেছে। চারদিকে এমন এক স্তব্ধতা, যেন সময় নিজেও পদচারণা থামিয়ে দিয়েছে।
অথচ সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই বিছানার ওপর অস্থির হয়ে বারবার পার্শ্ব পরিবর্তন করে চলেছে ন্যান্সি।
গত দু’টি রাত্রি ধরে তার নয়নে ঘুমের লেশমাত্র নেই।
এ কি কেবল নিদ্রাহীনতা?নাকি পাশের মানুষটির অনুপস্থিতিই তাকে এমন অস্থির করে তুলেছে?
বক্ষগহ্বরের অন্তস্থলে এক অদ্ভুত শূন্যতা ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। আফরিদ থাকলে প্রতিটি রাতের পরিণতি হতো এক কখনও সে দু’বাহুর দৃঢ় বলয়ে ন্যান্সিকে আবদ্ধ করে রাখত, কখনও বা শিশুর মতো তারই বক্ষে আশ্রয় নিয়ে নিশ্চিন্তে নিদ্রায় তলিয়ে যেত।
সেই উষ্ণ উপস্থিতির অভাব আজ যেন পুরো বিছানাটাকে শীতল ও প্রাণহীন করে তুলেছে।তার ওপর রয়েছে আরেক দহন।
এক অদৃশ্য আতঙ্ক। কে সেই নারী, যে একই ছাদের নিচে অবস্থান করেও প্রতিনিয়ত তার অগোচরে বিশ্বাসঘাতকতার জাল বুনে চলেছে?
আর শুয়ে থাকতে পারল না ন্যান্সি।ধীরে ধীরে উঠে বসে বালিশের নিচে চাপা পড়ে থাকা মুঠোফোনটি হাতে তুলে নিল।
স্ক্রিনে আঙুল বুলাতেই অভিমান আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।অদ্ভুত মানুষ!সারাক্ষণ সুযোগ পেলেই তাকে বিরক্ত করা যার স্বভাব, সেই মানুষটিই আজ সারাদিন একটি কল পর্যন্ত করল না!
ফোনের নিভু নিভু পর্দার দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে নিঃশব্দে ডান হাতটি নিজের উদরের ওপর স্থাপন করল।
স্নিগ্ধ, দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। এখানেই,এই ক্ষুদ্র অস্তিত্বের ভেতরেই আফরিদ এহসান তার নিজের অংশ রেখে গেছে।
অবশেষে নিজের প্রবল আকাঙ্ক্ষার কাছেই জয়ী হয়েছে সে। ন্যান্সিকে নিজের সন্তানের জননী করে তবে থেমেছে।
ভাবতেই এক অনির্বচনীয় বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে।
তার অন্তরে সত্যিই একটি ক্ষুদ্র প্রাণ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। এখনও সে সেই স্পন্দন অনুভব করতে পারে না। কিন্তু সময়ের স্রোত যত এগোবে, ততই হয়তো সেই অদেখা প্রাণের প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি স্পন্দন নিজের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিশে যেতে অনুভব করবে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই টুন শব্দ হলো।মোবাইলের ক্ষীণ বার্তাধ্বনি নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল।চমকে উঠে স্ক্রিনের দিকে তাকাল ন্যান্সি।বার্তাটি এসেছে একমাত্র সেই মানুষের কাছ থেকেই। Afarid Ehsan.
দ্রুত ইন্সটার ইনবক্সে প্রবেশ করতেই মাত্র দুটি শব্দ দৃষ্টিগোচর হলো,
“জেগে আছিস?”
বাক্যটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অভিমান যেন আবারও জেগে উঠল।এখন মনে পড়েছে?
এতক্ষণ কোথায় ছিল এই মানুষটা?চোখের কোণে অকারণ জল চিকচিক করে উঠল।অধর বাঁকিয়ে বিরক্তি মিশ্রিত এক চাপা হাসি হাসল ন্যান্সি।তারপর সমস্ত অভিমান, ক্ষোভ আর অপ্রকাশিত ভালোবাসাকে আড়াল করে কীবোর্ডে আঙুল ছোঁয়াল।প্রত্যুত্তরে লিখল মাত্র একটি শব্দ,
“তো?”
ওপাশে থাকা মানুষটি ক্ষণিকের জন্য বিস্মিত হয়ে পড়ল। ঘুমকাতুরে মেয়েটি এখনও জেগে আছে বিষয়টি তার কাছে অপ্রত্যাশিতই ছিল। তবে বিস্ময়ের রেশ মিলিয়ে যেতেই অধরের প্রান্তে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক প্রশান্ত, স্নিগ্ধ হাসি।
ঠিক তখনই টুন! ফোনের রিংটোন নীরবতা ভেঙে উঠল।
ন্যান্সি চমকে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। অপর প্রান্তে ভেসে উঠেছে পরিচিত নাম।কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে কল রিসিভ করতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো চিরচেনা প্রফুল্ল কণ্ঠ,
“হেই, মাই পার্সোনাল পিরানহা ফিশ, এখনও জেগে আছিস কেন?”
ন্যান্সি মুখ গম্ভীর রেখেই শুষ্ক স্বরে জবাব দিল,
“আমার ইচ্ছা।”
উত্তর শোনামাত্রই আফরিদ আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না।হঠাৎই কল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
বিষয়টি এতটাই আকস্মিক ছিল যে ন্যান্সি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে রইল।
পরমুহূর্তেই আবার ফোন কেঁপে উঠল। এবার একটি ভিডিও কল।ভ্রুকুটি করে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল সে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে অবশেষে কলটি গ্রহণ করল।
“কী চাই? কল করেছেন কেন?”
স্ক্রিনের ওপারে আফরিদ ফিচেল ভঙ্গিতে হেসে উঠল। গভীর, নিবিড় দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ন্যান্সির মুখশ্রী অবলোকন করে নিম্নস্বরে বলল,
“তোর গায়ের মিঠে ঘ্রাণটা খুব মিস করছি।”
ন্যান্সি সঙ্গে সঙ্গে গাল ফুলিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করল।
“যত্তসব ঢং!”
আফরিদের হাসি আরও প্রশস্ত হয়ে উঠল।
“রেগে আছিস কেন? ওহ বেবি, একটা উড়ন্ত চুমু দিই?”
ন্যান্সি চোখ রাঙাতেই আফরিদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
হাসি সামলে নিয়ে বলল,
“আচ্ছা, তোকে একটা ভিডিও দেখাই। মন দিয়ে দেখ।”
কথা শেষ করেই সে পাশে রাখা ল্যাপটপটি খুলল।কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্ক্রিনে একটি ভিডিও চালু হলো।আফরিদ ফোনটি ল্যাপটপের সামনে ধরে রাখল।
ন্যান্সি গভীর মনোযোগে তাকিয়ে রইল।
ভিডিওর শুরুতেই দেখা গেল চার-পাঁচ বছরের এক ফুটফুটে কন্যাশিশু। গালজোড়া টকটকে গোলাপি, চোখে অপরিসীম সরলতার হুটোপুটি, কোঁকড়ানো সোনালি চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। পরনে হালকা ক্রিম রঙের ফ্রিলওয়ালা ফ্রক, কোমরে ছোট্ট রিবন বাঁধা। পায়ে সাদা মোজা আর ক্ষুদ্র স্নিকার্স। মাথার এক পাশে মুক্তোর ছোট্ট হেয়ার ক্লিপ ঝলমল করছে। শিশুটির হাসিতে যেন পুরো পরিবেশ আলোয় ভরে উঠেছে।
মেয়েটিকে দেখেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও ন্যান্সির চোখে মুগ্ধতার আভা নেমে এল।আফরিদ মৃদু হেসে প্রশ্ন করল,
“বল তোমেয়েটা কিউট না?”
ন্যান্সি যেন ভিডিও থেকেই চোখ সরাতে পারছিল না।
অবচেতনেই তার অধর নড়ে উঠল,
“হ্যাঁ,ভীষণ কিউট। মাশাআল্লাহ।”
স্ত্রীর মুখে “মাশাআল্লাহ” শব্দটি উচ্চারিত হতেই আফরিদের চোখদুটো অদ্ভুত কোমল হয়ে উঠল। অজান্তেই অধরের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কোমলমতি পাক্কা মুসলিম! আফরিদ যখন দেখেছিল তখন মেয়েটাকে বলেছিল “বিউটিফুল” আর ন্যান্সি বলছে “মাশআল্লাহ” এখানে তো দুজনের আকাশ পাতাল পার্থক্য!
আজ সকালেই বার্সেলোনার এক প্রশস্ত রাজপথে শিশুটির সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ হয়েছিল তার।নিয়ম শৃঙ্খলার বেড়াজাল ভেঙে সেদিন ঈশানকে সঙ্গে নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে বেরিয়েছিল আফরিদ।ঠিক তখনই ছোট্ট মেয়েটি টলমল পায়ে দৌড়ে এসে তার তর্জনী শক্ত করে মুঠোবন্দী করেছিল।সেই ক্ষুদ্র, উষ্ণ স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে যেন সময় হঠাৎ বারো বছর পেছনে ফিরে গেল।
সেই বারো বছর আগেও আরো এক কন্যা তার বুড়ো আঙ্গুল চেপে ধরে নিদারুণ ভঙ্গিতে প্রশংসা বাক্য ছুঁড়ে দিয়েছিল।
দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা এক বিস্মৃত স্মৃতি বজ্রপাতের মতো আঘাত হানল তার মস্তিষ্কে।এক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গিয়েছিল আফরিদ।আর সেই বিরল দৃশ্য কঠোর, নির্দয় মাফিয়া কিংয়ের মুখে অচেনা কোমলতার ছাপ নিঃশব্দে ক্যামেরাবন্দী করে নিয়েছিল ঈশান।
শিশুটির সঙ্গে আফরিদের স্নেহমাখা, নির্ভেজাল মুহূর্তগুলো সে যত্ন করে ভিডিও করে রেখেছিল হয়তো এই কারণেই, যেন কোনো একদিন সেই মানুষটিও নিজের হৃদয়ের অচেনা দিকটি আবার দেখতে পারে।ন্যান্সির বক্ষগহ্বর জুড়ে যেন অদ্ভুত এক আবেগের ঢেউ আছড়ে পড়ল।
সে তো ইতোমধ্যেই আফরিদ এহসানের একটি ক্ষুদ্র অস্তিত্ব নিজের অন্তরে লালন করছে একটি ছোট্ট প্রাণ, যার আগমনের সংবাদ এখনও অজানা সেই মাফিয়া কিংয়ের কাছে।ঠিক তখনই আফরিদ হঠাৎ মৃদু হেসে প্রশ্ন করল,
“তুই কবে প্রেগন্যান্ট হবি?”
প্রশ্নটি শুনে ন্যান্সির অধরের কোণে রহস্যময় এক হাসি ফুটে উঠল। অন্তরের গোপন সত্যটি বুকের গভীরে লুকিয়ে রেখে দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলল,
“এখনই।”
আফরিদ ভ্রু উঁচিয়ে আগের মতোই নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“তাহলে এখনই প্রেগন্যান্ট হয়ে আমাকে একটা বেবি দিয়ে দে।”
ন্যান্সিও আর ছাড় দেওয়ার পাত্রী নয়। দীর্ঘদিন এই দুরন্ত মানুষটার সান্নিধ্যে থাকতে থাকতে তার মধ্যেও খানিকটা দুষ্টুমি বাসা বেঁধেছে। কথায় আছে সঙ্গদোষে স্বভাব বদলে যায়।
মুহূর্তেই পাশের কুশনটি টেনে নিয়ে কামিজের ভেতর গুঁজে দিল সে। পেটটা খানিকটা উঁচু করে অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে ঘোষণা করল,
“ছু… মান্তার ছু! প্রেগন্যান্ট হয়ে যা, অ্যাঞ্জেলিনা!”
এরপর নিজের কৃত্রিম স্ফীত উদরের দিকে তাকিয়ে গর্বভরা কণ্ঠে বলল,
“হয়ে গেলাম প্রেগন্যান্ট।”
দৃশ্যটি দেখে আফরিদ কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে রইল।
তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না।প্রাণখোলা হাসিতে পুরো ঘর মুখরিত হয়ে উঠল।
নিজের অবাধ্য, ছেলেমানুষি স্বভাবের স্ত্রীটি যে অভিনয়েও তাকে টেক্কা দিতে শুরু করেছে, সেটা ভেবেই যেন আরও বেশি আনন্দ পেল সে।হাসি থামিয়ে গভীর স্নেহমাখা দৃষ্টিতে ন্যান্সির দিকে তাকিয়ে নিম্নস্বরে বলল,
“এখন যদি তোর কাছে থাকতাম, ওই মসৃণ পেটটায় আলতো করে একটা চুমু খেতাম।”
কথাটি শুনে ন্যান্সি ঠোঁট বাঁকিয়ে ভান করা বিরক্তি প্রকাশ করল। অথচ বুকের ভেতরটা অদ্ভুত কোমলতায় ভরে উঠছে। আফরিদ ধীরে ধীরে ল্যাপটপের শাটার বন্ধ করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। পর্দার ওপার থেকেও তার চোখ যেন শুধু ন্যান্সিকেই খুঁজে ফিরছে।
আবেশঘন, ক্লান্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“মিস করছি, জান।”
ন্যান্সির হৃদয় মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল।অভিমান যেন আর ধরে রাখতে পারল না।খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে ফেলল,
“আমিও!”
শব্দটি কর্ণগোচর হতেই আফরিদের মনে হলো সে বুঝি ভুল শুনেছে। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল, মুখাবয়বে ছড়িয়ে পড়ল শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস।
“কী? কী বললি? আরেকবার বল!”
নিজের মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া স্বীকারোক্তি টের পেতেই ন্যান্সি তড়িঘড়ি করে মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
ভান করা উদাসীনতায় বলল,
“নাথিং।”
আফরিদ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পর্দার ওপারে থাকা নিজের জেদি স্ত্রীর দিকে। তারপর ঠোঁট ফুলিয়ে, একেবারে বাচ্চাদের মতো অভিমানী ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল,
“আই লাভ ইউ… মিস ইউ… ডার্লিং… সোনা… সুইটহার্ট… বেবি… জানকি বাচ্চা… মাতারি… বোকা বান্দি… মাই হার্ট… ওয়াইফি…
প্রতিটি সম্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে ন্যান্সির মুখের কোণে চাপা হাসির রেখা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।সে কিছুই বলল না।
শুধু নিঃশব্দে নিজের উদরের ওপর আলতো করে হাত রেখে ভাবল,
“শুনছেন, মিস্টার এহসান? আপনি শুধু আপনার স্ত্রীকেই নয় অজান্তেই আপনার ছোট্ট মানুষটাকেও ‘আই লাভ ইউ’ বলে ফেললেন।”
চলবে…………।
( ন্যান্সি প্রেগন্যান্ট হলো, আফরিদ বাবা হলো, পাঠক পাঠিকারা খালামনি,ফুপি হলো। এদিকে লেখিকা সিঙ্গেল থেকেও দাদী হয়ে গেল! কংগ্র্যাচুলেশন!)
(চলো এখন জি বাংলার কাহিনীতে ফিরে যাই। ন্যান্সি প্রেগন্যান্ট হয়েছে আফরিদকে গুলি করা হবে। বাচ্চা দেখার আগেই সে টপকে যাবে, তারপর তার বাচ্চা বড় হবে, দেখতে একদম তার মতো। পিছনে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হবে থুমতানাননা টাইপ। একদিন ন্যান্সি মাম্মা থেকে সব কাহিনী জানবে এরপর প্রতিশোধ নেবে।এখানেই খেল খতম পয়সা হজম! এটাই গল্পের এন্ডিং।
এখন বলো এন্ডিং এমন হলে খুশি হবে?)
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৩
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৯
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৬
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬৭
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬৩+৬৪
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৬
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২১