#অসম্ভব_রকম_ভালোবাসি_তোমায়
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী
#পর্ব ৭৩
সেই গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর শুনে ঈশান আর শুভ্রা দুজনেই চমকে উঠে ঝটপট একে অপরকে ছেড়ে দিল। তারা ধড়ফড় করে পেছনের দিকে ঘুরে সামনে তাকাতেই তাদের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। সামনে ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং নির্ভান। সে একা নয়, তার পেছনে কালো পোশাক পরা বেশ কয়েকজন হৃষ্টপুষ্ট বডিগার্ড দাঁড়িয়ে আছে। যাকে এক বছর আগে পুলিশ ধরে জেলে পুরেছিল, সেই নির্ভানকে এভাবে হঠাৎ জেলের বাইরে মুক্ত অবস্থায় দেখে ঈশান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে তীব্র বিস্ময় আর ক্ষোভ নিয়ে বলে উঠল,
“তুইইই”
নির্ভান তার চেনা সেই কুৎসিত, শয়তানি হাসিটা দিল। সে ধীরপায়ে এক পা এগিয়ে এসে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“অবাক হচ্ছিস আমি জেলে না থেকে এই মাঝরাতে ব্রিজের ওপর কেন। আসলে তোদের এই অমর পিরিতটা একটু নিজের চোখে লাইভ দেখতে আসলাম।”
ঈশান নিজের চোয়াল শক্ত করে রাগে ফেটে পড়ে বলল,
“ফালতু কথা একদম বলবি না, নির্ভান”
নির্ভান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“বাহ্, সত্যি কথা বললেও এখন ফালতু হয়ে যায়, জানতাম না তো। যাই হোক, একটা হিন্দু আর মুসলিমের প্রেম ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং, কী বলিস”
ঈশান শুভ্রাকে নিজের শরীরের আড়ালে টেনে নিয়ে একদম মারমুখী গলায় বলল,
“এখানে কেন এসেছিস তুই, কী চাস”
নির্ভান এবার তার সেই বিষাক্ত শয়তানি নজরটা ফেলল শুভ্রার ওপর। তার সেই লোলুপ দৃষ্টি দেখে শুভ্রা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে ঈশানের শার্টের পেছনটা খামচে ধরে আরও ভালো করে তার পেছনে লুকিয়ে পড়ল। নির্ভান এবার ঈশানের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আরে ভাই, তোদের এই অধরা ভালোবাসাটাকে পুর্নতা দিতে এসেছি। অর্থাৎ তোর এই কলিজার টুকরো ভালোবাসা শুভ্রাকে একটু বিশ্রাম দিতে এসেছি”
নির্ভানের মুখের এই মারাত্মক কথাটি শোনা মাত্রই ঈশানের আত্মাটা যেন ধক করে উঠল। এক তীব্র আশঙ্কায় তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। সে পেছনের হাত দিয়ে শুভ্রার নরম হাতটা লোহার মতো শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। নির্ভানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলল,
“ওকে টাচ করার বিন্দুমাত্র সাহসও দেখাবি না নির্ভান, আমি তোকে শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিচ্ছি”
নির্ভান এবার আর দূরে দাঁড়িয়ে রইল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে একদম ঈশানের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ঈশানের চোখের ওপর চোখ রেখে হিংস্র গলায় বলল,
“সাহস, আমার সাহস দেখবি তুই, তাহলে দেখ।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই নির্ভান চিতা বাঘের মতো এক ঝটকায় হাত বাড়িয়ে ঈশানের হাত থেকে শুভ্রাকে টান মেরে নিজের দিকে নিয়ে নিল। শুভ্রা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্ভান তাকে এক হাতে জাপটে ধরল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, ঈশান শুভ্রাকে বাঁচাতে যাবে তার আগেই নির্ভানের সাথে থাকা আটজন হৃষ্টপুষ্ট গার্ড একসাথে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ঈশানকে চারপাশ থেকে শক্ত করে চেপে ধরল। তারা ঈশানের দুহাত, কোমর আর ঘাড় এমনভাবে লক করে দিল যে ঈশান আর এক চুলও নড়তে পারল না। আচমকা এই আক্রমণে শুভ্রা চরম আতঙ্কিত হয়ে ছটফট করতে করতে চিৎকার করে উঠল,
“ছাড়ুন আমাকে, ছাড়ুন বলছি, ঈশান ভাইয়া”
ঈশান তখন ওই আটজন পাহাড়সম গার্ডের মাঝখান থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে মোচড়ামুচড়ি করছে। কিন্তু তাদের শক্তির সাথে সে একলা পেরে উঠছে না। নিজের অসহায়ত্ব আর শুভ্রার কান্না দেখে ঈশান এবার বাঘের মতো গর্জে উঠে নির্ভানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“দেখ নির্ভান, তোর যত শত্রুতা, যত ক্ষোভ সব আমার সাথে থাকতে পারে। কিন্তু এই নিষ্পাপ মেয়েটার সাথে তোর কোনো শত্রুতা নেই। ওকে ছেড়ে দে তুই, ও কোনো অন্যায় করেনি। যা করার, যে প্রতিশোধ নেওয়ার তুই সব আমার ওপর নে, কিন্তু প্লিজ ওকে তুই ছেড়ে দে”
নির্ভান ঈশানের এই অসহায় আকুতি শুনে এক পৈশাচিক আনন্দ পেল। তর্জনী নেড়ে চ্ছু চ্ছু শব্দ করে বলল,
“চ্ছু চ্ছু ইস, কী গভীর ভালোবাসা। কিন্তু আফসোস রে ঈশান, তোদের এই তথাকথিত পবিত্র ভালোবাসা আজীবন অপূর্ণতাই রয়ে যাবে। কোনোদিন তোরা পূর্ণতার মুখ দেখবি না, আর তোদের সেই সাজানো দুনিয়া ধ্বংসের মূল কারিগর হব আমি নির্ভান”
ঈশানের চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরতে লাগল। সে মাথা খাটিয়ে কোনো কুলকিনারা পাচ্ছে না। এই নির্জন ব্রিজে একা এতগুলো অস্ত্রধারী মানুষের সাথে সে কীভাবে লড়বে? ঠিক তখনই ব্রিজের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি থেকে আরও দুজন গার্ড নেমে আসল। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় দেখা গেল, তাদের সবার হাতে চকচকে আগ্নেয়াস্ত্র। তা দেখে ঈশানের বুকের ভেতরটা ভয়ে ছ্যাত করে উঠল। গার্ড দুটো এগিয়ে আসতেই ঈশান নিজের জীবনের পরোয়া না করে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
“নির্ভান, দেখ, শুভ্রার কোনো ক্ষতি করিস না তুই, যা করার আমার সাথে কর। দোহাই লাগে তোর, ওকে কিচ্ছু করিস না”
শুভ্রার অবশ হয়ে আসা মস্তিষ্কটা এবার তীব্র একটা ধাক্কা খেল। এতক্ষণ ভীতি আর আতঙ্কে সে পুরো পরিস্থিতি ঠিকঠাক বুঝতে না পারলেও, এখন ধারালো অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে তারা দুজন আজ এক ভয়ানক মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। সে নির্ভানের দিকে তীব্র ঘৃণার চোখে তাকিয়ে কাঁপানো গলায় বলল,
“আমি জানি না আপনি কে, বা আমাদের সাথে আপনার কিসের এত পুরনো শত্রুতা। আমি শুধু এইটুকুই বলব, আমার শরীরে এক ফোঁটা প্রাণ থাকতে ঈশান কে কিছু করবেন না।”
নির্ভান এক বিকট অট্টহাসি দিয়ে বলল,
“রিলাক্স বোন, এত ভালোবাসা-বাসা ভালো না। কারণ দুনিয়ার নিয়ম হচ্ছে যারা বেশি ভালোবাসে, তারা কোনোদিন পূর্ণতা পায় না।”
ঈশান এবার চরম এক অসহায়ত্বে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নির্ভানের দিকে তাকিয়ে কাতর গলায় বলল,
“ভাই তোর হাতজোড় করে বলছি, তুই শুভ্রাকে এখান থেকে ছেড়ে দে, প্লিজ”
নির্ভান ঈশানের দিকে এক রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“ওকে, ফাইন, তোর এই ইচ্ছাটা আমি রাখলাম। ওকে ছেড়ে দিলাম।”
বলেই নির্ভান এক ঝটকায় শুভ্রাকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল। শুভ্রা ছিটকে গিয়ে ব্রিজের রেলিংয়ের সাথে ধাক্কা খেল। ঈশান শুভ্রাকে মুক্ত হতে দেখে চিৎকার করে বলল,
“শুভ্রা, পালাও, এখান থেকে এক্ষুনি চলে যাও, প্লিজ চলে যাও”
কিন্তু শুভ্রা এক পা-ও নড়ল না। সে একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ জোড়া শুধু ঈশানের ওপর আটকে আছে। নির্ভান এবার তার গার্ডদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল,
“তাক্”
নির্ভানের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই ঈশানের বুক থেকে কয়েকজন গার্ড এক সেকেন্ডের মধ্যে সরে দাঁড়িয়ে দুপাশে চলে গেল। আর ঠিক তখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন গার্ড নিজের হাতের লোডেড রিভলবারটা একদম ঈশানের বুক বরাবর তাক করল। লোহার সেই ঠান্ডা অস্ত্রের নল ঈশানের বুকের ওপর সোজা হয়ে তাক হওয়া মাত্রই শুভ্রার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে গেল। সে সমস্ত শক্তি এক করে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
“নাহহহহহহহ, প্লিজ, আল্লাহর দোহাই লাগে, ঈশান ভাইয়াকে ছেড়ে দিন, প্লিজ ওকে কিছু করবেন না।”
শুভ্রার এই আর্তনাদ শুনে নির্ভান এক কুৎসিত হাসিতে নিজের ঠোঁট দুটো বাঁকাল। সে ধীর পায়ে শুভ্রার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ তীব্র বিষাক্ত গলায় বলল,
“শুভ্রা তুমি কি সত্যিই তোমার এই ঈশানকে বাঁচাতে চাও”
শুভ্রা আর এক সেকেন্ডও নিজের আত্মসম্মানের কথা চিন্তা করল না। বংশের মর্যাদা, অহংকার সব কিছু ধুলোয় মিশিয়ে সে এক ঝটকায় নির্ভানের পা জড়িয়ে ধরল। তার দুহাতের শক্ত মুঠোয় নির্ভানের পা চেপে ধরে, চোখের নোনা জলে নির্ভানের জুতো ভিজিয়ে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“প্লিজ, আমার ঈশানকে ছেড়ে দিন, ওকে মারবেন না, ওর প্রাণের সাথে আমার এই অভাগা প্রাণটাও জড়িয়ে আছে, আমি আপনার পায়ে পড়ছি, দয়া করে ওর প্রাণটা আমাকে ভিক্ষা দিন প্লিজ।”
শুভ্রার এই করুণ দশা আর মাটিতে লুটিয়ে পড়া দেখে ঈশানের বুকের ভেতরটা যেন শত টুকরো হয়ে ভেঙে গেল। সে নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে চারপাশের গার্ডদের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে চিৎকার করে উঠল,
“শুভ্রা, প্লিজ আমাদের ভালোবাসার দিব্যি, তুমি এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাও, প্লিজ শুভ্রা, চলে যাও”
নির্ভান এক কুৎসিত, পৈশাচিক হাসি দিয়ে শুভ্রার দিকে তাকাল। তার পা থেকে শুভ্রার নরম হাত দুটো এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে নিষ্ঠুর গলায় বলল,
“ওকে ভিক্ষা দেবো তবে একটা শর্তে।”
শুভ্রা রাস্তা থেকে মাথা তুলে ব্যাকুল চোখে তাকাল। এক মুহূর্তও না ভেবে কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“কী শর্ত, বলুন, আপনার পায়ে পড়তে হলেও আমি রাজি, আমি আপনার সব শর্তে রাজি”
নির্ভান পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ঈশানকে ভালোবাসো”
শুভ্রা বুকভরা বিশ্বাস আর কান্না নিয়ে বলল,
“খুব বেশি নিজের জীবনের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসি”
নির্ভান হালকা শয়তানি হাসি হেসে বলল,
“প্রমাণ দাও।”
শুভ্রা কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“কী কী প্রমাণ চান আপনি আমার কাছে”
নির্ভান তার তর্জনী উঁচিয়ে ঈশানের বুক বরাবর তাক করা সেই কালো রিভলবারের দিকে ইশারা করল। তারপর এক অদ্ভুত শান্ত অথচ পিশাচের গলায় বলল,
“আমার গার্ড ঠিক এই মুহূর্তে ঈশানের বুকে লক্ষ্য করে ট্রিগার চাপবে, গুলি ছুঁড়বে। আর তুমি গুলিটা ঈশানের বুকে লাগার ঠিক আগের মুহূর্তে, বিদ্যুতের গতিতে দৌড়ে গিয়ে ঈশানের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ, গুলিটা ঈশানের বুকে না লেগে সোজা তোমার বুকে লাগবে। যদি এই প্রমাণ দিতে পারো, তবেই ঈশান আজ জ্যান্ত বাড়ি ফিরবে। বলো, রাজি”
নির্ভানের মুখ থেকে এই ভয়ানক, পৈশাচিক শর্ত শোনার সাথে সাথে ঈশান যেন আক্ষরিক অর্থেই এক উন্মাদ পশুতে পরিণত হলো। তার চোখের মণি দুটো রাগে, ক্ষোভে আর তীব্র আতঙ্কে লাল টকটকে হয়ে উঠল। সে আটজন গার্ডের কামড় আর লক ভেঙে ফেলার জন্য হিংস্রভাবে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে কান্নার সুরে চিৎকার করে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে বলল,
“না, না, শুভ্রা, একদম না, তোমাকে কোনো ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হবে না, আমাদের এই পবিত্র ভালোবাসা ওপরে যিনি থাকেন তিনি জানলেই হবে, এই পিশাচকে দেখানোর কিচ্ছু নেই, দোহাই তোমার শুভ্রা, তুমি পালাও এখান থেকে, প্লিজ শুভ্রা, তুমি দৌড়ে চলে যাও, আমার কথা ভেবো না”
শুভ্রা ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো ভয় নেই, আছে শুধু এক বুক শান্ত আর পবিত্র ভালোবাসা। সে তার অশ্রুভেজা চোখ জোড়া দিয়ে ঈশানের মুখের দিকে তাকাল। ঈশান তখন চারপাশের গার্ডদের শক্ত বাঁধনের মাঝেই অনবরত নিজের মাথাটা ডানে-বামে নাড়িয়ে চোখের ইশারায় ‘না’ করতে লাগল। নির্ভান নিজের হাতঘড়ির দিকে এক পলক তাকিয়ে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“তোমার হাতে কিন্তু সময় কম শুভ্রা। তুমি চাইলে এখনি এই ব্রিজ থেকে পালিয়ে যেতে পারো, আমি তোমাকে আটকাবো না।”
ঈশান সাথে সাথে কান্নাভেজা গলায় চিৎকার করে বলল,
“শুভ্রা, আমাকে যদি সত্যিই একটুখানি ভালোবেসে থাকো, তবে আমার এই শেষ কথাটা রাখো, তুমি এক্ষুনি চলে যাও এখান থেকে, প্লিজ শুভ্রা”
শুভ্রা এবার কাঁদছ না। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী আর স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। সে ঈশানের সেই লাল হয়ে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে পরম শান্ত গলায় বলল,
“আপনাকে তো আমি ভালোবেসেছি ঈশান ভাইয়া। আর আপনাকে আমি আপনার ভালো সময়ের চেয়ে, আপনার এই সবচেয়ে খারাপ সময়ে অনেক বেশি ভালোবাসি। এখন এই মুহূর্তে আমি আপনাকে আরও শতগুণ বেশি ভালোবাসি ঈশান ভাইয়া। নিজের ভালোবাসার মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে, ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে যদি আমি আজ শহীদ হয়ে যাই তবে তাতে ক্ষতি কী বলুন”
কথাটা শেষ করেই শুভ্রা নির্ভানের দিকে নিজের দৃষ্টি ঘোরাল। সে নিজের চোখের অবাধ্য জলটুকু হাত দিয়ে মুছে নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি আপনার এই শর্তে রাজি”
শুভ্রার মুখ থেকে এই কথাটি শোনা মাত্রই ঈশানের পায়ের সব শক্তি যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল। সে ওই আটজন গার্ডের মাঝেই ধপ করে হাঁটু গেড়ে পিচঢালা রাস্তার ওপর বসে পড়ল। সে পাগলের মতো মাথা খুঁড়তে খুঁড়তে আকুতির সুরে বলল,
“নাহহহহহ শুভ্রা, দোহাই তোমার, এরকম পাগলামি করো না, ফিরে যাও শুভ্রা, ফিরে যাও”
কিন্তু নির্ভানের ইশারায় নিষ্ঠুর গার্ডরা ঈশানকে আবার রাস্তা থেকে হেঁচকা টান মেরে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল, যাতে গুলিটা সরাসরি তার বুকেই লাগে। নির্ভান তার বন্দুকধারী গার্ডদের ঠিকঠাক পজিশন নিয়ে তাক করতে বলে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“তাহলে তোমার পরীক্ষা শুরু করো।”
বলেই নির্ভান এক অদ্ভুত পৈশাচিক উল্লাসে জোরে জোরে গুনতে লাগল,
“ওয়ান”
শুভ্রা নিজের ভারী লেহেঙ্গাটা একহাতে সামান্য ওপরে তুলে ধরে ধীর পায়ে ঈশানের দিকে এগোতে শুরু করল।
“টু”
শুভ্রার প্রতিটি কদমে এগিয়ে আসা দেখে ঈশানের মনে হতে লাগল এক জ্যান্ত জল্লাদ এসে তার কলিজাটা বুক থেকে টেনে ছিঁড়ে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। সে ছটফট করতে করতে বন্ধ হয়ে আসা গলায় বলতে লাগল,
“শুভ্রা, প্লিজ, না”
শুভ্রা যখন হাঁটতে হাঁটতে ঈশানের একদম কাছাকাছি চলে এসেছে, ঠিক তখনই নির্ভান তার শেষ কাউন্টডাউন দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“থ্রি”
নির্ভানের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই, সেই যমদূত গার্ড নিজের হাতের রিভলবারের ট্রিগারে সজোরে চাপ দিল। আর ঠিক সেই একই সেকেন্ডে, শুভ্রা তার দেওয়া কথামতো বিদ্যুতের গতিতে দৌড়ে গিয়ে ঈশানের চওড়া বুকের ঠিক সামনে নিজের দুই হাত ডানা মেলে দিয়ে, বুক চিতিয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। পরপর দুটি তীব্র “ঠাসসস, ঠাসসস” শব্দে পুরো পুরান ঢাকার রাতের আকাশ-বাতাস যেন এক লহমায় কেঁপে উঠল। লোহার তপ্ত নলের ভেতর থেকে ছিটকে আসা দুটো বুলেটের প্রথমটি শুভ্রার ডান বুকের পাশে আর দ্বিতীয়টি বাম বুকের পাশে চামড়া-মাংস ভেদ করে সজোরে ঢুকে গেল। বুলেটের তীব্র আঘাতে শুভ্রার শরীরটা একবার ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। আর তার ক্ষতবিক্ষত বুক থেকে ফিনকি দিয়ে ছুটে আসা তাজা, গরম রক্ত চারপাশের অন্ধকার বাতাস চিরে ঈশানকে ধরে রাখা গার্ডদের মুখে আর ঈশানের ধবধবে সাদা শার্টের বুকে ছিটকে লেগে গেল।
নিজের চোখের সামনে নিজের কলিজার টুকরো, নিজের শুভ্রার বুকটা এভাবে ঝাঁঝরা হয়ে যেতে দেখে ঈশান নিজের ভেতরের মানুষের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলল। আসমান-জমিন, খাল-বিল, নদী-নালা আর পুরো পৃথিবী কাঁপিয়ে, বুকের সমস্ত খাঁজ থেকে নিজের আত্মাটাকে ছিঁড়ে বের করে নেওয়ার মতো এক ভয়ঙ্কর, বুকফাটা চিৎকারে গর্জে উঠল ঈশান,
“শুভ্রাআআআহ্হ্হ্হ্হ্হ্হ্”
ধীরে ধীরে শুভ্রার অবশ হয়ে আসা শরীরটা নিথর হয়ে পিচঢালা খসখসে রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়ল। বুলেটের তীব্র আঘাতে তার সারা শরীর মুহূর্তে বরফের মতো ঠান্ডা হতে শুরু করেছে, চারপাশের চেনা ল্যাম্পপোস্টের আলো আর শুভ্রার মুখটা ক্রমশ ঝাপসা থেকে আরও ঝাপসা হয়ে আসছে। তীব্র যন্ত্রণায় ফুসফুস ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসলেও, সে নিজের শেষ শক্তিটুকু এক করে নির্ভানের দিকে তাকাল। বুকভরে শেষবারের মতো এক চিলতে তপ্ত নিঃশ্বাস টেনে, হাঁপাতে হাঁপাতে ভাঙা-অস্পষ্ট গলায় বলল,
“আ-আমি আমি আমার ক-কথা রেখেছি। এ-এবার এবার অন্তত ঈ-ঈশানকে ছেড়ে দিন। ওর কোনো ক্ষতি করবেন না প্লিজ।”
শুভ্রার দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে ঈশান আক্ষরিক অর্থেই এক হিংস্র পশুতে পরিণত হলো। সে আটজন গার্ডের লোহার মতো শক্ত মুঠোর মাঝেই পাগলের মতো শরীর ঝাঁকিয়ে ছটফট করতে লাগল। তার চোখ ফেটে নোনা জলের বদলে যেন রক্ত ঝরছে। সে অবাধ্যের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল,
“আমাকে ছেড়ে দে তোরা, তোদের পায়ে ধরি, দোহাই লাগে আমাকে একটুখানি ছেড়ে দে, আমার শুভ্রা মরে যাবে রে ও বড্ড কষ্ট পাচ্ছে, আমাকে ওর কাছে যেতে দে, ওকে এখনই হসপিটালে নিতে হবে, তোদের পায়ে পড়ি ছেড়ে দে আমাকে”
কিন্তু সেই পাষাণ, অনুভূতিহীন গার্ডরা ঈশানের কোনো আকুতিই কানে তুলল না। তারা আরও শক্ত করে ঈশানের শরীরটা লক করে ধরে রাখল। নির্ভান এবার রাতের কালচে আকাশের দিকে মুখ তুলে এক পৈশাচিক, শয়তানি হাসিতে মেতে উঠল। সে পুরো ব্রিজের নিস্তব্ধতা চুরমার করে দিয়ে চিৎকার করে বলল,
“শুভ্র, এবার তুই খুব ভালো করে বুঝবি কত ধানে কত চাল। নিজের বোনকে হারানোর তীব্র যন্ত্রণা কেমন হয়, এখন থেকে তুইও নিজের হাড় দিয়ে টের পাবি। অনেক তো বিয়ে নিয়ে মাতামাতি করলি, এবার একটু মন ভরে বোনের শোক খা”
মাটিতে পড়ে থাকা শুভ্রার শরীরটা যন্ত্রণায় অনবরত ছটফট করতে লাগল। তার গভীর চোখ জোড়ার কোণ বেয়ে শেষ অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে পিচঢালা কালো রাস্তায় মিশে যেতে লাগল। চারপাশের তীব্র কোলাহল যেন তার কানে আস্তে আস্তে স্তব্ধ হয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুভ্রা নিজের ভেতরের অনুভূতি দিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারল আজ তাকে সত্যি সত্যি এই মায়ার পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে বিদায় নিতে হবে। কিন্তু এত মৃত্যুর যন্ত্রণার মাঝেও, তার রক্তাক্ত ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অপার্থিব, স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল।
ওদিকে ঈশানের অবস্থা তখন পুরো এক উন্মাদ পাগলের মতো। সে নিজের রক্ত-মাংসের শরীরটাকে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে, তবুও পারছে না। আট-আটজন হৃষ্টপুষ্ট গার্ড মিলে এই মুহূর্তে ঈশান নামক এক ভালোবাসার উন্মাদকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছে না। অবিরাম ধস্তাধস্তি আর নিজেকে মুক্ত করার বন্য চেষ্টায় ঈশানের শরীরের সেই ধবধবে সাদা শার্টটা টেনে-হিঁচড়ে ছিঁড়ে একবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তার ভেতরের আত্মাটা প্রতিটা সেকেন্ডে চিৎকার করে বলছে শুভ্রা তাকে চিরতরে একা ফেলে চলে যাচ্ছে। সে শুভ্রার ওই হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে এক বুক হাহাকার নিয়ে পাগলের মতো কান্নাভেজা গলায় বলতে লাগল,
“শুভ্রা, প্লিজ এভাবে মাঝরাস্তায় আমাকে একা ফেলে চলে যেও না, আমার ভালোবাসার সাথে এমন বেইমানি অন্তত করো না শুভ্রা, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, আস্ত একটা পাগল হয়ে যাব আমি, This fucking love is killing me, Shuvra”
শুভ্রা পিচঢালা রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে থেকেই নিজের নিষ্প্রাণ চোখ জোড়া ঈশানের দিকে মেলল। তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে তখনো তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে অনেক কষ্টে, নিজের জীবনের শেষ মায়াটুকু এক করে ম্লান হেসে এক অদ্ভুত ভালোবাসার চাদরে ঈশানকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
“এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা অব্দি আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত, আমার সমস্ত সত্তা, আমার এই পুরো হৃদয়টা একমাত্র আপনার নামেই বাঁধা ছিল ঈশান ভাইয়া। এখন, মৃত্যুর ওই অন্ধকার ওপারেও যদি কোনোদিন কোনো প্রতীক্ষার দুয়ার খোলা থাকে, তবে সেই প্রতীক্ষার প্রতিটি প্রহর, অনন্তকালের প্রতিটি ক্ষণ আর প্রতিটি মুহূর্ত জুড়ে, আমি শুধু আপনাকে ঘিরেই অপেক্ষা করব।”
মুহূর্তে শুভ্রার নিথর ও রক্তাক্ত অবস্থা দেখে একজন গার্ড নির্ভানের দিকে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“বস, মনে হচ্ছে মেয়েটা আর বেশিক্ষণ বাঁচবে না। এখন আর এক মুহূর্তও এখানে থাকা ঠিক হবে না, আমাদের দ্রুত চলে যাওয়া উচিত।”
নির্ভান পকেটে হাত দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে ঈশানের সামনে এসে দাঁড়াল। ঈশান ততক্ষণে চোখের সামনে শুভ্রার এই দশা দেখে আধমরা হয়ে গেছে। সে পিচঢালা রাস্তার ওপর হাঁতু গেড়ে বসে পড়েছে, গার্ডরা শুধু তার দুহাত শক্ত করে ধরে খাড়া করে রেখেছে। নির্ভান ঈশানের ঠিক সামনে হাঁটু গেড়ে বসল, তারপর তার চুলে মুঠি ধরে মুখটা টেনে তুলে শয়তানি হেসে বলল,
“আসলে তোকে মেরে ফেলার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না ঈশান। আমাদের মেইন টার্গেটই ছিল শুভ্রাকে শেষ করা। শুধু তোকে আরও বেশি তিলে তিলে মারার জন্য, তোর ভালোবাসার শুভ্রাকে একটা মিথ্যে নাটকের শর্ত দিয়ে বোকা বানালাম। কারণ আমি চেয়েছিলাম, তোকে বাঁচাতে গিয়েই যেন শুভ্রার এই পরিণতি হয়। আজীবন এই অপরাধবোধ তোকে কুড়ে কুড়ে খাবে। মেয়েটা চাইলে খুব সহজেই আজ এখান থেকে পালিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারত, কিন্তু মেয়েটা তোকে সত্যিই বড্ড বেশি ভালোবাসে রে, স্বীকার করতেই হবে।”
নির্ভান এক মুহূর্ত থামল, তারপর ঈশানের গালে আলতো চাপড় দিয়ে বলল,
“এখন তুই প্রতিটা সেকেন্ডে বুঝবি নিজের ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা কেমন হয়, আর ওদিকে ওই শুভ্র বুঝবে তার আদরের একমাত্র বোনকে হারানোর কষ্ট। বাই বাই ঈশান, এবার সারাজীবন এই শোক নিয়ে অনেক আনন্দ কর”
বলেই নির্ভান তার গার্ডদের দিকে চোখের ইশারা করল। সাথে সাথে সব গার্ড ঈশানকে এক ঝটকায় ছেড়ে দিল। নির্ভান আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে তার পুরো দলবল নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি চড়ে রাতের অন্ধকারের বুকে milie গেল। বাঁধন মুক্ত হতেই ঈশান বন্য পশুর মতো চিৎকার করে হামাগুড়ি দিয়ে দৌড়ে আসলো শুভ্রার কাছে। সে রাস্তার ধুলোবালি আর রক্তের মাঝ থেকে শুভ্রার মাথাটা পরম যত্নে তুলে নিজের কোলে রাখল। শুভ্রার গালে হাত বুলিয়ে পাগলের মতো বলল,
“এই তো শুভ্রা, এই তো দেখো, আমি তোমার কাছে চলে এসেছি। কিচ্ছু হবে না তোমার, কিচ্ছু হতে দেব না আমি তোমার। আমি এখনই তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি, ডাক্তার বাবুরা তোমাকে এক্ষুনি সুস্থ করে দেবে। তুমি চোখ বন্ধ কোরো না শুভ্রা, প্লিজ চোখ খোলো”
বলেই ঈশান নিজের গায়ের সমস্ত শক্তি এক করে শুভ্রার রক্তাক্ত শরীরটাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল এবং ব্রিজের ওপর দিয়ে মেইন রোডের দিকে পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করল। ঠিক তখনই শুভ্রা নিজের শরীরের শেষ অবশিষ্ট এক চিলতে শক্তি এক করে খুব ক্ষীণ, অস্পষ্ট কণ্ঠে ডেকে উঠল,
“ঈশান”
শুভ্রার মুখ থেকে নিজের নামটা শোনা মাত্রই ঈশানের পায়ের গতি থমকে গেল। সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘাড় নিচু করে কোলের মধ্যে থাকা শুভ্রার মুখের দিকে তাকাল। শুভ্রা তখন মরণ যন্ত্রণার মাঝেও চোখ দুটো সামান্য মেলে ঈশানের দিকে চেয়ে রইল। সে খুব আস্তে করে বলল,
“খুব ভালোবাসি আপনাকে। একটু জড়িয়ে ধরবেন আমাকে, খুব শক্ত করে আপনার ওই বুকের মাঝে আমাকে একটু লুকিয়ে নিন না”
ঈশান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে চলন্ত রাস্তার মাঝেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে শুভ্রার রক্তাক্ত দেহটাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে মুহূর্তের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। শুভ্রাও তার অবশ হয়ে আসা দুহাত কোনো রকমে বাড়িয়ে ঈশানের পিঠটা শক্ত করে খামচে ধরল। শুভ্রা ঈশানের বুকের ওম নিয়ে, তার হৃদস্পন্দন শুনতে শুনতে বলল,
“আমাকে কথা দিন, কখনো নিজের ক্ষতি করবেন না। আজ রাতে এই ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে যে আত্মহত্যাটা আপনি করতে গিয়েছিলেন এই পাপ কাজটা ভুলেও আর কোনোদিন নিজের মনে আনবেন না। আমাকে কথা দিন,। নাহলে কিন্তু আমি আপনার ওপর খুব অভিমান করব, কোনোদিন আর আপনার সাথে কথা বলব না।”
ঈশান শুভ্রাকে নিজের ক্ষতবিক্ষত বুকের সাথে আরও মরিয়া হয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার অশ্রু আর বৃষ্টি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে শুভ্রার কানের কাছে মুখ রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“কথা দিলাম শুভ্রা, আমি আর কখনো নিজের ক্ষতি করবো না। তুমি যা বলবে আমি সব শুনবো, আর কখনো তোমাকে থাপ্পড় মারবো না। নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসবো তোমাকে, যদি সমাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে আমি মুসলমান গ্রহণ করে তোমাকে বিয়ে করবো, সারাজীবন তোমার সাথে সংসার করবো, ছোট্ট একটা পৃথিবী গড়ে তুলবো তোমার সাথে। কিন্তু প্লিজ তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেও না। তুমি চলে গেলে আমি পাগল হয়ে যাব শুভ্রা, আস্ত একটা পাগল হয়ে যাব, তোমার ঈশান পাগল হয়ে যাবে।”
শুভ্রা তার ফুরিয়ে আসা জীবনের শেষ অবশিষ্টাংশটুকু উজাড় করে দিয়ে ঈশানের পিঠটা আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। চরম তৃপ্তিতে চোখ দুটো বুজে, হাঁপাতে হাঁপাতে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
“যা-ব না, আ-আমাকে এভাবেই জড়িয়ে ধরে থাকুন। খুব ভা-ভালো লাগছে ঈশান ভাইয়া। প্লিজ আমাকে আপনার এই বুক থেকে আ-আলাদা করবেন না, এইভাবে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকুন বড্ড শান্তি পাচ্ছি আমি। আপনার শুভ্রা খুব শান্তি পাচ্ছে।”
ঈশান শুভ্রাকে বুকের মাঝে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে থাকল। সে তার নিজের কান্নার বেগ আর উন্মাদনায় বুঝতেই পারল না যে শুভ্রা তাকে চিরতরে ফাঁকি দিয়ে, তার সমস্ত কষ্ট আর যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে ওপারে পাড়ি জমালো। ঠিক সেই মুহূর্তেই ব্রিজের চারপাশের সেই থমথমে নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রচণ্ড জোরে এক কালবৈশাখী ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করল। আকাশের বুক চিরে মেঘের দল এমনভাবে ডেকে উঠল, যেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও এই দুই পবিত্র আত্মার নির্মম ভালোবাসার শেষ পরিণতি দেখে নিজের জানান দিচ্ছেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আকাশ ভেঙে প্রচণ্ড বেগে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমে পড়ল। তপ্ত বৃষ্টির জলের ছাট গায়ে লাগতেই ঈশানের অবশ হয়ে যাওয়া মস্তিষ্কটা হঠাৎ যেন সাড়া দিয়ে উঠল তাকে যে যেকোনো মূল্যে শুভ্রাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে শুভ্রাকে আবার রাস্তা থেকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে মেইন রোডের দিকে অন্ধের মতো দৌড়াতে শুরু করল।
কিন্তু এবার আর শুভ্রা তাকে শক্ত করে ধরে রইল না। ঈশানের পিঠ খামচে ধরে থাকা শুভ্রার দুটো নিথর হাত আলগা হয়ে আচমকা দুই পাশে ঝুলে গেল। শুভ্রার হাত দুটো ওভাবে ঝুলে পড়তে দেখে ঈশানের পায়ের গতি ধপ করে আবারো থেমে গেল। চারদিকের ওই মুষলধারে বৃষ্টির মাঝেই সে নিজের কোলের দিকে তাকাল। অঝোর বৃষ্টির ধারায় শুভ্রার মুখটা ধুয়ে যাচ্ছে। ঈশান নিখুঁতভাবে খেয়াল করে দেখল মেয়েটা বড্ড শান্ত, বড্ড মায়াবীভাবে চোখ জোড়া বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো অনবরত তার মুখের ওপর চোখের পাতায় আর ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু প্রতিটা ফোঁটা পড়ার সাথে সাথে তার চোখের পাপড়ি কিংবা ঠোঁটের কোণ আর বিন্দুমাত্র কাঁপছে না। সেখানে কোনো স্পন্দন নেই, কোনো প্রাণের ছোঁয়া নেই। ঈশানের ভেতরের পৃথিবীটা এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না, শুভ্রাকে কোলে নিয়েই ব্রিজের পিচঢালা রাস্তার ওপর ঠাসস করে বসে পড়ল। সে শুভ্রাকে নিজের কোলে শুইয়ে দিয়ে, কাঁপা কাঁপা দুই হাত শুভ্রার বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া দুই গালে রাখল। ঈশান নিজের কান্নার আওয়াজ হারিয়ে এক অদ্ভুত, রুদ্ধ ও কাঁপানো গলায় ডেকে বলল,
“এই, এই শুভ্রা, এই, এই শুভ্রা, তুমি এইভাবে হুট করে চোখ বন্ধ করলে কেন, এই শুভ্রা, চোখ খোলো, দেখো, এভাবে আমার সাথে একদম বাজে মজা করবে না, প্ল-প্লিজ শুভ্রা, চোখটা খোলো একবার, আমার দিকে তাকাও”
কিন্তু শুভ্রার কোনো সাড়া নেই, কোনো শব্দ নেই। সমস্ত সমাজ, ধর্ম আর পৃথিবীর সব পিছুটান থেকে মুক্ত হয়ে মেয়েটা বড্ড চুপচাপ, বড্ড শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঈশান অবশ, কাঁপা কাঁপা হাতটা শুভ্রার রক্তহীন ঠোঁটের ওপর, তার নাকের পাশে রাখল। আর হাতটা রাখা মাত্রই যেন পুরো মহাবিশ্ব, পুরো পৃথিবীটা তার চোখের সামনে বনবন করে ঘুরে উঠল। শুভ্রার কোনো নিঃশ্বাস নেই। বুকের যে খাঁচায় এতক্ষণ তার নাম ধরে ধুকপুকানি চলছিল, সেখানে এক মহাশূন্যতা। ঈশানের আর বুঝতে বাকি রইল না তার শুভ্রা যে তাকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুকে একা ফেলে চিরতরে, বহু দূরে চলে গেছে। সে আর সহ্য করতে পারল না। বৃষ্টির জলে ভেজা শুভ্রার নিথর দেহটা নিজের কোলে শক্ত করে চেপে ধরে, কালচে আকাশের দিকে মুখ তুলে এক আহত জানোয়ারের মতো বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল ঈশান,
“শুভ্রাআআআআআ”
বলেই সে শুভ্রার কপালে, গালে নিজের মুখ ঘষতে ঘষতে পাগলের মতো বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“কেন এমন বেইমানি করলি আমার সাথে শুভ্রা, কেন তোর এই ঈশানকে শুধু শুধু বাঁচিয়ে রেখে এভাবে জ্যান্ত মেরে দিয়ে গেলি, আমি তোকে ছাড়া কীভাবে বাঁচব রে, আমি আস্ত একটা পাগল হয়ে যাব, আমি তোকে ছাড়া একটা মুহূর্তও থাকতে পারব না, শুভ্রা, চোখ খোল, প্লিজ চোখ খোল রে”
চারিদিকে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ ভেঙে যেন আজ কোনো এক মহাসর্বনাশের কান্না নামছে। ঈশান শুভ্রার লাশ কোলে নিয়েই সেই বৃষ্টির দিকে, আকাশের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“হ্যাঁ আল্লাহ, আজ একজন হিন্দু হয়ে, তোমার দরবারে হাত তুলে তোমাকে ডাকছি, শুনতে পাচ্ছো তুমি আমার কথা, এই দুনিয়ার সবাই বলে তুমি বড্ড দয়ালু, তোমার দয়ার নাকি কোনো শেষ নেই। তোমার কাছে তো কোনো কিছুই অসম্ভব নয় আল্লাহ, তাহলে আজ।”
বলেই ঈশান দুই হাত এক করে মোনাজাতের মতো করে আকাশের দিকে তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
“তাহলে আমার এই শুভ্রাকে তুমি আমার বুকে ফিরিয়ে দাও আল্লাহ, আমি তোমার কাছে হাত জোড় করে ভিক্ষা চাচ্ছি, আমার জীবনে যতটুকুন আয়ু বাকি আছে, তার সবটুকু তুমি কেড়ে আমার শুভ্রাকে দিয়ে দাও, ওর শরীরের প্রাণটা তুমি ফিরিয়ে দাও আল্লাহ, ওকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে, আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে ফেটে যাচ্ছে, আমি সইতে পারব না এই নরক যন্ত্রণা কিছুতেই সইতে পারব না, তিলে তিলে, প্রতিটা সেকেন্ডে শেষ হয়ে যাব আমি।”
সেদিন ঈশানের সেই বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নার রোলও সৃষ্টিকর্তা শোনেননি। কারণ, নির্মম হলেও এটাই এই নশ্বর পৃথিবীর আসল বাস্তব। একবার যে জীবনের ওপারে চলে যায়, সে আর কোনোদিন, কোনো অবস্থাতেই ফিরে আসে না। নিজের সবটুকু ভালোবাসা, এক বুক হাহাকার আর শূন্যতা নিয়ে এভাবেই চিরতরে এই মায়ার পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো নিষ্পাপ মেয়ে শুভ্রা। পাগল বানিয়ে গেল ঈশান নামক পুরুষটাকে। যে ঈশানকে বাঁচাতে সে নিজের বুক চিতিয়ে দিয়েছিল, সেই ঈশান আজ বেঁচে থেকেও প্রতিটা মুহূর্তে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক এক নরক যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে রইল। এই নিষ্ঠুর সমাজ আর পৈশাচিক প্রতিহিংসা শেষ পর্যন্ত বাঁচতে দিল না শুভ্রা নামক, নিষ্পাপ মেয়েটাকে। ব্রিজের ওপর অঝোর ধারায় ঝরতে থাকা বৃষ্টির জল আর শুভ্রার বুকের তাজা রক্ত সেদিন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল, যা সাক্ষী হয়ে রইল এক অসমাপ্ত, রক্তাক্ত ও অমর ভালোবাসার মহাকাব্যের।
_______________
চৌধুরী বাড়ির গমগম করতে থাকা শোরগোলটা এখন একদম স্তব্ধ। আত্মীয়-স্বজন যে যার মতো বিদায় নিয়ে চলে গেছে। তূর্যও পাখিকে সাথে নিয়ে নিজের গন্তব্যে রওনা দিয়েছে। পুরো মস্ত বড় বাড়িটায় এখন এক শ্মশান নীরবতা নেমে এসেছে। রাতের এই সুনসান ছাদে একলা দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র। চারপাশের এই নিস্তব্ধতা তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করছে। কোনো কিছুই যেন ভালো লাগছে না তার। মনটা বারবার এক অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, একটা তীব্র ছটফটানি মনের ভেতর অনবরত মোচড় দিয়ে উঠছে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ঈশানের নাম্বারে বারবার ডায়াল করে যাচ্ছে, কিন্তু ওপাশ থেকে সেই একই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে,
“আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।”
তার ফোনের ওপাশ থেকে বারবার এই কথা শুনে শুভ্রের বিরক্তি আর চিন্তা আরও বেড়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল, এই মাঝরাতে ঈশানের ফোন কেন বন্ধ থাকবে। হঠাৎ তার পিঠে কারো নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে শুভ্র চমকে উঠল। চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল রিদি দাঁড়িয়ে আছে। রিদি শুভ্রের মুখের চিন্তার রেখাগুলো খেয়াল করে মৃদু স্বরে বলল,
“আপনি কোনো কারণে চিন্তিত”
শুভ্র নিজের ভেতরের ঝড়টা আড়াল করার চেষ্টা করে ছোট করে বলল,
“না, আমি ঠিক আছি। চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি।”
রিদি শুভ্রের পাশে এসে ছাদের রেলিংটা ধরে রাতের কালচে আকাশের দিকে তাকাল। একটা ঠাণ্ডা বাতাস তার চুলগুলো ছুঁয়ে গেল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“জানেন শুভ্র ভাইয়া, কেমন জানি একটা অদ্ভুত ভয় লাগছে আমার। বুকটা কাঁপছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই, রিদির কথার রেশটুকু শেষ হতে না হতেই শুভ্রর হাতের ফোনটা ‘টোন টোন’ শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে আলো জ্বলতেই শুভ্র দেখল একটা অচেনা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে। এক বুক কৌতুহল আর আশঙ্কা নিয়ে সে মেসেজটা ওপেন করল। ভেতরে যা লেখা ছিল, তা পড়া মাত্রই শুভ্রের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল।
“হেইই শুভ্র, তোর জন্য একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে রে। তাড়াতাড়ি পুরান ঢাকার ওদিকের ব্রিজে যা, সারপ্রাইজটা তোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এত সুন্দর একটা সারপ্রাইজ যে, তুই দেখার পর পাগল হয়ে আমাকে খুঁজবি, দেরি না করে তাড়াতাড়ি যা। আর আমি কে জানিস, তোর পুরনো মিত্র নির্ভান।”
মেসেজটা পড়া শেষ হওয়ামাত্রই শুভ্রের বুকের ভেতরটা তীব্র একটা মুচড় দিয়ে উঠল। তার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এতদিন পর, এই মাঝরাতে নির্ভানের মেসেজ। কিন্তু নির্ভান তো জেলে থাকার কথা, তাহলে ও কীভাবে জেলের বাইরে এসে মেসেজ পাঠাতে পারল? আর ব্রিজে সারপ্রাইজ মানে কী, কিসের সারপ্রাইজ? হঠাৎ করেই শুভ্রের মাথায় শুভ্রার কথা মনে পড়ে গেল। শুভ্রা কি তবে কোনো বিপদে পড়েছে? এই পিশাচটা কি তবে শুভ্রার কোনো বড় ক্ষতি করে ফেলল? শুভ্র আতঙ্কে শিউরে উঠল। রিদি শুভ্রের মুখের অবয়ব এক নিমেষে ফ্যাকাসে হয়ে যেতে দেখে চরম ভয় পেয়ে গেল। সে শুভ্রর একটা হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে বলল,
“কী হয়েছে শুভ্র ভাইয়া, সব ঠিক আছে তো, প্লিজ কিছু বলুন”
শুভ্রের তখন মনে হচ্ছে তার পায়ের নিচের শক্ত ছাদটা দুলছে, পায়ের নিচের মাটি যেন ধসে যাচ্ছে। সে রিদির দিকে তাকিয়ে কাঁপানো গলায় বলল,
“আমাকে এখনি বের হতে হবে”
কথাটা শেষ করেই শুভ্র এক সেকেন্ডিও দেরি করল না। সে পাগলের মতো ছাদের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে একছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে রিদি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সে-ও আর কিছু না ভেবে নিজের শাড়ির কুঁচিটা একহাতে শক্ত করে ধরে শুভ্রের পেছন পেছন দৌড়ে সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে আসল। শুভ্র গ্যারেজে এসে গাড়ির লক খুলে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। সে রিদিকে আটকানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই, রিদিও হন্তদন্ত হয়ে গাড়ির ওপাশের দরজা খুলে তার পাশের সিটে বসে পড়ল। শুভ্র কোনো কথা বলার সময় পেল না। সে এক ঝটকায় গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিল, আর ক্লাচ চেপে এক্সিলারেটরে সজোরে পাড়া দিতেই গাড়িটা চাকার টায়ার ঘষার বিকট শব্দ করে তীব্র গতিতে মেইন রোডের দিকে ছুটে চলল।
ওদিকে সোহান চৌধুরী এতক্ষণ ড্রইংরুমের সোফায় বসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঝিমোচ্ছিলেন। হুট করে শুভ্র আর রিদিকে এভাবে পাগলের মতো দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দৌড়ে যেতে দেখে তার খটকা লাগল। তিনি সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জোরে হাক ছাড়লেন,
“কী হলো, ওরা ওভাবে কোথায় যাচ্ছে এই মাঝরাতে”
কোনো উত্তর না পেয়ে সোহান চৌধুরী আর ঝুঁকি নিলেন না। তিনি তড়িঘড়ি করে বাইরে এসে নিজের পার্সোনাল ড্রাইভারকে ডেকে বললেন,
“জলদি গাড়ি বের করো, ওই দেখো শুভ্রের গাড়ি যাচ্ছে, জলদি ওর গাড়িটা ফলো করো, এক মুহূর্তও যেন চোখের আড়াল না হয়”
ড্রাইভারও তৎক্ষণাৎ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে শুভ্রের তীব্র গতিতে ছুটে যাওয়া কালো গাড়িটার পিছু নিল। রাতের ফাঁকা রাস্তা চিরে দুটো গাড়ি তখন এক অজানা ঝড়ের দিকে ধেয়ে চলেছে।
এক ঘণ্টার তীব্র গতির ড্রাইভ শেষে পুরান ঢাকার সেই নির্দিষ্ট এরিয়াতে এসে পৌঁছাল শুভ্রের গাড়ি। কিন্তু ব্রিজের কাছাকাছি আসতেই শুভ্র আর রিদি দুজনেই চরম অবাক হয়ে গেল। তাদের নিজেদের এলাকায় আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল, অথচ এই এরিয়াতে পা রাখতেই দেখা গেল এখানে আকাশ ভেঙে মুষলধারে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত রূপ দেখে তারা স্তব্ধ হয়ে গেল। আসলেই, আল্লাহ চাইলে মুহূর্তে কী না করতে পারেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুভ্র সেই ব্রিজের ওপর এসে সজোরে ব্রেক কষল। চাকার টায়ার পিচঢালা রাস্তায় ঘষে গিয়ে বিকট এক শব্দ হলো। ঠিক তার পেছন পেছন সোহান চৌধুরীর গাড়িটাও এসে কড়া ব্রেক কষল। গাড়ি থামতেই এই কালবৈশাখী ঝড়-বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে শুভ্র আর রিদি তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে নেমে পড়ল। আর নামতেই ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো আর বৃষ্টির ঝাপসার মাঝেই ব্রিজের এক কিনারায এক লোমহর্ষক,দৃশ্য তাদের চোখে পড়ল। শুভ্রার রক্তে ভেজা নিথর শরীরটা নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে একা বসে আছে ঈশান। সেই দৃশ্য দেখে রিদির চোখ মুহূর্তে কপালে উঠল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠতেই সে একছুটে গিয়ে ঈশানের ঠিক পাশে হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে বলল,
“ঈ-ঈশান ভাই-ভাইয়া, আপনি এখানে, আ-আর শুভ্রার কী হয়েছে, ও এভাবে নিথর হয়ে আছে কেন, আপনি ওকে এইভাবে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন কেন”
বলতে বলতেই রিদি যেই না শুভ্রার গায়ে হাত দিয়ে তাকে স্পর্শ করতে গেল, অমনি ঈশান এক ঝটকায় শুভ্রাকে নিজের দিকে আরও টেনে নিয়ে রিদির থেকে দূরে সরে গেল। তার চোখ জোড়া তখন এক উন্মাদের মতো হিংস্র আর আতঙ্কিত। সে একদম ছোট বাচ্চাদের মতো অবুঝ গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল,
“হুশশশ, একদম চুপ, ও ঘুমিয়েছে, ওকে একদম ছুঁবে না, বলে দিচ্ছি, ওকে যদি ছুঁয়েছ তো আমি তোমার হাত ভেঙে দেব”
ঈশানের মুখ থেকে এমন অদ্ভুত, পাগলামি ভরা কথা শুনে রিদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার সারা শরীর ভয়ে আর আশঙ্কায় কাঁপতে লাগল। ওদিকে শুভ্র ধীর পায়ে এগিয়ে আসল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা তার মাথায় এসে পড়ছে। সে ঈশানের কোলে নিথর, নিস্পন্দ হয়ে থাকা শুভ্রার দিকে তাকাল। শুভ্রার পুরো বুকটা রক্তে ভেসে গেছে, যা বৃষ্টির জলে ধুয়ে ধুয়ে চারপাশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে। শুভ্র আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না, সে হাঁটু গেড়ে বসে তীব্র ব্যাকুলতায় ঈশানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঈশান, শুভ্রার কী হয়েছে, ও এভাবে তোমার বুকে মাথা নিচু করে কেন শুয়ে আছে, ও কথা বলছে না কেন”
ঈশান এবার এক পৈশাচিক আর করুণ হাসি হাসতে হাসতে বলল,
“ও আমার বুকে ঘুমিয়েছে বস। ও বড্ড ক্লান্ত, তাই ঘুমিয়ে পড়েছে। প্লিজ ওকে কেউ ডাকবেন না, নাহলে ওর ঘুম ভেঙে যাবে।”
ঠিক তখনই সোহান চৌধুরীও গাড়ি থেকে নেমে এই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসলেন। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় নিজের আদরের একমাত্র কলিজার টুকরো মেয়েকে এভাবে রক্তেভেজা অবস্থায় ঈশানের বুকে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে বাবার বুকটা যেন এক মুহূর্তে খাঁ খাঁ করে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
“শুভ্রাআআআআ”
শুভ্র এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে বুঝতে পারছে বড় কোনো অঘটন ঘটে গেছে। সে জোর করেই ঈশানের লোহার মতো শক্ত বুক থেকে শুভ্রার দেহটাকে ছাড়াতে লাগল। কিন্তু ঈশান কিছুতেই, কোনো অবস্থাতেই শুভ্রাকে নিজের বুক থেকে আলাদা করতে দেবে না। সে নিজের গায়ের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে শুভ্রার নিথর শরীরটাকে জাপটে ধরে রেখেছে। সোহান চৌধুরীও এবার শুভ্রের সাথে যোগ দিলেন, তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে শুভ্রাকে ঈশানের মুঠো থেকে টানতে লাগলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দুজন শক্তিশালী পুরুষ মিলে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও ঈশানের বুক থেকে শুভ্রাকে এক চুলও আলাদা করতে পারছে না। ভালোবাসার মানুষকে হারানোর ভয়ে ঈশানের শরীরে যেন হাজারটা অসুরের শক্তি এসে ভর করেছে। সে এবার সমস্ত দুনিয়ার ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে পশুর মতো চিৎকার করে উঠল,
“আমি ছাড়ব না ওকে, আমি কিছুতেই ওকে আমার বুক থেকে ছাড়ব না, ছাড়লেই ও আমাকে ফাঁকি দিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে, আমি কিছুতেই ছাড়ব না আমার শুভ্রাকে”
শুভ্র রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে চিৎকার করে বলল,
“ঈশান, ওকে ছাড়ো বলছি, আমাদের দেখতে দাও ওর কী হয়েছে, ও এভাবে নিথর হয়ে আছে কেন, ওর গা দিয়ে এত রক্ত পড়ছে কেন”
তবুও ঈশান ছাড়ছে না। তার শরীরে তখন এক অতিপ্রাকৃতিক শক্তি কাজ করছে, যে শুভ্র নামক শক্তিশালী পুরুষটাও ধস্তাধস্তি করে তার সাথে পেরে উঠছে না। সোহান চৌধুরী নিজের মেয়ের এই অবস্থা দেখে এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তিনি রাগে, আতঙ্কে আর বুকফাটা যন্ত্রণায় শুভ্রাকে নিজের দিকে টানতে টানতে ঈশানের ওপর চড়াও হয়ে চিৎকার করে বললেন,
“কুত্তার বাচ্চা, আমার মেয়েকে ছেড়ে দে, কী করেছিস তুই আমার মেয়ের, কী হয়েছে ওর, ও এত নিথর কেন, আমরা এত টানাটানি করছি, এত চিৎকার করছি,তবুও ও কেন একটুও নড়াচড়া করছে না? কথা কেন বলছে না,শরীর এত অস্বাভাবিক ঠান্ডা কেন?কী হয়েছে আমার শুভ্রার?!”
প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির মাঝে ঈশান তখন আক্ষরিক অর্থেই এক উন্মাদ পশুতে পরিণত হয়েছে। চারপাশের কোনো চিৎকার, কোনো আকুতি কিংবা সোহান চৌধুরীর গালাগাল কোনো কিছুই তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। সে শুধু পাথরের মতো শক্ত হয়ে শুভ্রার নিথর দেহটাকে বুকের মাঝে আরও গভীরভাবে লুকিয়ে রাখতে চাইছে। ঈশানের এই অবুঝ আর হিংস্র জেদ দেখে শুভ্র এবার নিজের ধৈর্যের সব সীমা হারিয়ে ফেলল। বোনের এই রক্তাক্ত দশা আর ঈশানের এমন পাগলামি দেখে সে রাগে-ক্ষোভে জ্ঞান হারিয়ে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল ঈশানের গালে।
“ঠাসসস”
বৃষ্টির শব্দের মাঝেই সেই থাপ্পড়ের আওয়াজটা প্রতিধ্বনিত হলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় একটা থাপ্পড় খাওয়ার পরও ঈশানের মাঝে কোনো হেলদোল নেই। তার গালে শুভ্রের আঙুলের দাগ বসে গেলেও সে শুভ্রাকে বুক থেকে বিন্দুমাত্র আলগা করল না। বরং আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইল। এই ভয়ঙ্কর আর অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সোহান চৌধুরীর পার্সোনাল গার্ড আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে পকেট থেকে ফোন বের করে কাঁপতে কাঁপতে তড়িঘড়ি করে পুলিশকে ফোন লাগাল এবং ব্রিজের পুরো ঘটনাটা জানাল।
রাতের নিস্তব্ধতা আর ঝড়-বৃষ্টির শব্দ চিরে কিছুক্ষণের মধ্যেই সাইরেন বাজিয়ে গুনে গুনে দুটো ভ্যান ভর্তি পুলিশ এসে হাজির হলো সেই ব্রিজে। ওদিকে মাঝরাতে ব্রিজের ওপর পুলিশের সাইরেন, গাড়ির আলো আর এত চিল-চিৎকার শুনে আসেপাশের ফ্ল্যাটে যত মানুষ ভাড়া থাকত, তারা সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠল। কী ঘটেছে তা দেখার জন্য মানুষজন তড়িঘড়ি করে হাতে ছাতা নিয়ে ব্রিজের দিকে ছুটে আসতে লাগল। দেখতে দেখতে পুরো ব্রিজটা মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে থমকে গেল। হাজারটা চোখ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মাঝরাস্তায় ঘটে যাওয়া এই ট্র্যাজেডির দিকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গুনে গুনে ছয়জন পুলিশ সদস্য একসাথে ঈশানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা চারপাশ থেকে ঈশানকে জাপটে ধরে জানপ্রাণ দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে, তার আঙুলগুলো একটা একটা করে ছুটিয়ে অবশেষে শুভ্রার রক্তাক্ত দেহটাকে ঈশানের বুক থেকে আলাদা করতে সক্ষম হলো। শুভ্রাকে নিজের বুকে থেকে কেড়ে নেওয়া মাত্রই ঈশান ফাঁকা খাঁচার পশুর মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল। ওদিকে একজন পুলিশ দ্রুত হাঁটু গেড়ে বসে শুভ্রার নিথর শরীরের সামনে ঝুঁকে পড়লেন। তিনি শুভ্রার হাতের কবজি আর নাকের পাশে আঙুল রেখে খুব নিখুঁতভাবে তার নিঃশ্বাস ও পালস চেক করলেন। চারপাশের পুরো ভিড়, শুভ্র আর সোহান চৌধুরী তখন বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। শুভ্রার হাতটা আলতো করে ছেড়ে দিয়ে, সেই পুলিশ সদস্য অত্যন্ত গম্ভীর ও বিষণ্ণ মুখে তাদের অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“স্যার, পালস পাওয়া যাচ্ছে না, মেয়েটা আর বেঁচে নেই।”
চলবে…!
রাগ করিও না কেউ কারন এটাই হওয়ার কথা ছিল,,অনেকে জানে হয়তো
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫০
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৯(সমাপ্ত)
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় গল্পের লিংক
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৪