Golpo romantic golpo অন্তরালে আগুন

অন্তরালে আগুন পর্ব ৫৭


অন্তরালে_আগুন

পর্ব:৫৭

তানিশা সুলতানা

“তোমায় একটা প্রশ্ন করবো চাঁদ? মন চাইলে উত্তর দিও না মন চাইলে দিও না।

বেওথা ব্রিজের উপর থেমেছে নওয়ান তালুকদারের গাড়ি খানা। ঠিক ল্যামপোস্টের নিচে৷ নিস্তব্ধ অন্ধকারে দুজন মানুষের উপস্থিতিও কেমন ভয়ংকর লাগছে৷ চারিদিক থেকে ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ ভেসে আসছে। দূরে কোনো সাউন্ড বক্সে গান বাজছে ” একদিন তোমায় ঘিরে হবে উতলা এতো
বুঝি নি জীবনে ভাবনা যত”
নুপুর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। মনে তার ভয়। নওয়ান তালুকদারের শত্রুর অভাব নেই। কেউ যদি আক্রমণ করে বসে? আজকে তো বল্টুর সাথে নেই। নুপুর কিভাবে প্রটেক্ট করতে পারবে?
এসব ভেবেই কলিজা কাঁপছে। হঠাৎ নওয়ান এর আবেগ মাখানো প্রশ্ন শুনে চমকালো। এদিক ওদিক দৃষ্টি ঘোরানো বাদ দিয়ে নওয়ান এর মুখ পানে তাকায়।
এলোমেলো চুল গুলো কপাল ছুঁয়েছে। ঠোঁট ফেঁটে চৌচির। চামড়া উঠে আসছে। নাকের ঠিক ওপর লাল ব্রণের দেখা মিলেছে। ফর্সা গালে ফুটে উঠেছে৷ ঘন কালো দাঁড়ি গুলোও বেশ বড় হয়েছে।
যেনো কতোদিন হলো সেলুনে যাওয়া হয় না।
নুপুর গভীর মনোযোগে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে মানুষটাকে।
বেওথা নদী এবং ব্রিজের সৌন্দর্য চোখে লাগে এই রাতের বেলায়। যদি জোছনা থাকতো তাহলে এই সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করতো৷
অমাবস্যার রাতেও মন্দ লাগছে না৷
নওয়ান তাকিয়ে আছে নুপুরের মুখ পানে৷ পিংক কালারের টিশার্ট এবং ঢিলাঢালা প্লাজুতে অন্য রকম সুন্দর লাগছে৷ ওর চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। সময়কে এখানেই থামিয়ে দিতে মন চাচ্ছে। অনেকটা সময় নিয়ে দেখতে মন চাচ্ছে। কি আছে এই মেয়ের মাঝে?
কিভাবে নওয়ান তালুকদার পাগল হয়ে যাচ্ছে? ডুবে যাচ্ছে অতল গভীরে।
মৃ/ত্যু ছাড়া এই মুগ্ধতা শেষ হবে না।

নুপুর চোখ নামিয়ে নেয়। জিভ দ্বারা ঠোঁট ভিজিয়ে বলে
” করুন

নওয়ান গাড়ির জানালা খুলে সিগারেট জ্বালায়। তাতে টান দিতে দিতে গাড়ির সিটে মাথা এলায়। আঁখি পল্লব বন্ধ করে বলে
“তোমায় আর কতোটা ভালোবাসলে আমার ভালোবাসা তোমার হৃদয় করবে?
তোমার জন্য আর কি করলে আমায় একটু মায়া করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর নুপুরের জানা নেই। তবে সে নওয়ান তালুকদারকে ভালোবাসে। হয়ত স্নেহার মতো করে নয় তবে একটুখানি হলেও ভালোবাসে। মায়া হয় এই মানুষটার জন্য। বুকের ভেতরটা কাঁপে। কিন্তু এই কথাগুলো মুখে বলার সাহস নেই।
অগত্য চুপ করেই থাকে নুপুর। না নওয়ানের পানে চোখ তুলে তাকায় আর না তার প্রশ্নের জবাব দেয়।
নওয়ান এর সিগারেট শেষ। বেঁচে যাওয়া অংশ টুকু ছুঁড়ে ফেলে আরেকটা সিগারেট জ্বালায়।

” আমায় একটু ভালোবাসবে চাঁদ?
ঠিক আমার মতে করে।
আমি তোমায় যতটা ভালোবাসি ঠিক ততোটা।
তোমার চোখে একটুখানি ভালোবাসা দেখার লোভে বেঁচে আছি।
যদি লোভ পূরণ হওয়ার আগেই মরে যাই। মৃত্যুতেও বিষাদ লেগে থাকবে।
কে বলতে পারে?
লোভী নওয়ান হয়ত পরকালেও তোমার কাছে ছুটে আসলো ভালোবাসা পাওয়ার লোভ পূরণ করতে।

অদ্ভুত আবদার। এমন শক্তপোক্ত সুপুরুষের মুখে আকুতি মোটেও মানায় না। তাকে বাঘের মতো গর্জনেই মানায়৷
নুপুরের নিঃশ্বাস আটকে আসছে। সে জোরে জোরে শ্বাস টেনে বলে
“এখানে ভালো লাগছে না চলুন

নওয়ান হাসলো। গাড়ির স্ট্যারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলে
” অথচ দুই দিন অনাহারি থাকা আমি তোমার কাছে ছুটে এসেছি তোমার সঙ্গে একান্তে একটু সময় কাটাতে। তোমায় প্রাণ ভরে দেখতে।
তুমি আমার সঙ্গে থাকতেই চাও না। আর আমি তোমাকে না দেখতে পেলে বাঁচতেই পারি না।

বলতে বলতেই গাড়ি চালানো শুরু করে। নুপুরের খুব করে বলতে ইচ্ছে করছিলো “আমিও দুই দিন কিছু খায় নি। আমারও আপনার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে। আমিও আপনাকে না দেখতে পেলে পাগল হয়ে যাই।
পার্থক্য এতোটুকুই আপনি মুখ ফুঁটে বলতে পারেন। আমি পারি না”


তালুকদার বাড়িতে স্নেহার সব থেকে পছন্দের জায়গা হচ্ছে ছাদ। এখান থেকে বেওথা ব্রিজ এবং নদী দুইটাই স্পষ্ট দেখা যায়। গভীর রাতে ফুরফুরে বাতাসে কলিজা ঠান্ডা হয়। দুই একটা গাড়ি ছুটতে দেখা যায়।
আজকেও রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে। মনটা সব সময়ই খারাপ থাকে। তবে আজকে যেনো একটু বেশিই। সিনথিয়া দেশে এসেছে বড়মাকে দেখতে। আবার চলে যাবে কালকেই।
আজকে কিছুটা মুহুর্ত বোনের সঙ্গে কাটাবে বলে ঠিক করে।
দু’বোন ছাঁদের রেলিং ধরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
সিনথিয়া বলে
“তারপর প্ল্যানিং বলো। ফিউচার নিয়ে কি ভাবছো?

স্নেহা আসমান পানে তাকায়
” ম/রে যেতে চাই আপু৷ আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।

“এভাবে বলছো কেনো?

স্নেহা একটু হাসে। দুই চোখ বেয়ে দু ফোঁটা অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ে। তা হাতের উল্টো পিঠে মুছে নেয়। যেনো সিনথিয়ার সামনে দুর্বল হতে চাচ্ছে না৷ তবে ভেতরের কথা গুলোও চেপে রাখতে পারছে না৷

“আমার জন্য আমার অনেক মায়া হয় আপু। নিজের মাথায় হাত বোলাতে গেলেই কান্না পেয়ে যায়। আমি বোধহয় দুনিয়ার সব থেকে বড় পাপী। তাইতো পৃথিবীর সব দুঃখ আমার ভাগে এসে পড়েছে৷ আমি আমার জীবনকে ঘৃণা করি।
মৃ/ত্যু ছাড়া এই ঘৃণিত জীবন থেকে মুক্তি মেলবে না।

সিনথিয়া কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে স্নেহার মুখ পানে। বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না।
” আমার চাওয়া পাওয়া তো বেশি ছিলো না। প্রতিটা মেয়ের জন্য সৃষ্টিকর্তা একজন পার্টনার নির্ধারণ করে রেখেছে। আমি শুধু সেই পার্টনার হিসেবে নওয়ানকে চেয়েছিলাম। আর কিচ্ছু না। অনেক বছর বাঁচতে চাই নি। ওনার সাথে দুইটা দিন বাঁচলেই শান্তি পেতাম।
আমার আর কিছু চাওয়া ছিলো না। কারো প্রতি কোনো অভিযোগ থাকতো না।
আমি যেভাবে বেঁচে আছি এভাবে বাঁচা যায় না কি?
এতো দুঃখ সয়ে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।
আমার খুব ঘুমোতে ইচ্ছে করে। খুব শান্তিতে।
ঘুমের মধ্যে সুন্দর স্বপ্ন দেখব। দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যাবে না।
মাঝরাতে ছটফট করতে করতে জেগে উঠবো না। কিন্তু পারি তো না।
কি হয়ে গেলো আমার জীবনটা। কেনো হলো এমন?
কি দোষ আমার?
যদি আমি এতো পাপী হয়ে থাকি তাহলে ম/রে যাচ্ছি না কেনো?

সিনথিয়া স্নেহার কাঁধে হাত রাখে। পরপরই জড়িয়ে ধরে।
“রিলাক্স স্নেহা। এতো হাইপার কেনো হচ্ছো?
আর এতো অভিযোগই বা কিসের? জীবন খুব ছোট। এখানে তুমি যেটাই পাবে সেটা নিয়ে সারা জীবন কাটাতে পারবে না। এতবার করে ম/র/তে চাচ্ছো। যখন মৃ/ত্যু তোমার দুয়ারে এসে দাঁড়াবে তখন বাঁচার জন্যই ছটফট করবে।
সৃষ্টিকর্তা কাউকে নিরাশ করে না।
অপেক্ষা করো দেখবে আজকে যেমন অভিযোগ করছো, অভিমান করছো মৃ/ত্যু কামনা করছো
একদিন এসবের জন্যই আফসোস করবে।

একটু থামে সিনথিয়া। পূণরায় বলে
“জীবন নিয়ে এতো অভিযোগ রেখো না। সন্তুষ্ট থাকো।

” আর কতো আপু?
আমার যে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। আর সন্তুষ্ট থাকতে পারবো না।
এবার এই গল্পটা শেষ হওয়া প্রয়োজন।
আমার মুক্তি চাই।
এতো সুন্দর দুনিয়া আমার জন্য না।

তখনই গাড়ির হর্ন বেজে ওঠে। স্নেহা জানে নওয়ান এসেছে নুপুরকে নিয়ে। তার মন বলছে “ছুটে চলে যা”
আর মস্তিষ্ক বলছে “যাস না স্নেহা। একদম যাবি ন”

সিনথিয়া বুঝলো যেনো। সে সহসা হেসে বলে
“হিংসা হচ্ছে তোমার স্নেহা। যেটা একদম ঠিক নয়। হিংসা মানুষকে ধ্বংস করে।
মেনে নিতে শিখো।
মানিয়ে নাও।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply