#যে_পাখি_মন_বোঝে_না
#পর্ব_৪
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
________________
গত দুদিন ধরে টানা বৃষ্টি হওয়ার পর এখন উঠেছে গরমে সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো রোদ। এত বেশি গরম বাইরে যে ,ইচ্ছে করে সারাক্ষণ পানির মধ্যে শুয়ে বসে থাকি। চাইলে অবশ্য এই ইচ্ছেটা পূরণ করা যেত ,যদি পড়াশোনা না থাকত। ক্লাস করার জন্য হলেও এই গরমের মধ্যে বের হতে হয়।
সকালে উঠেই আগে ত্রিশ মিনিট ধরে গোসল করে নিয়েছি। আপাতত শরীর ঠান্ডা। তাছাড়া বাসায় এসি আছে বলে এমনিও গরম বোঝা যায় না। বারান্দায় আর ছাদে গেলেই আসল গরম টের পাওয়া যায়। একেবারে রেডি হয়ে আমি খেতে গেছি। ইতোমধ্যে সবাই খেতে বসে পড়েছে। চাচিমনি আমাকে দেখে বললেন,
“এত দেরি কেন? খেতে বোস।”
আমি চেয়ার টেনে হৃদির বামপাশে বসলাম। আমার সামনের চেয়ারে রাহাত ভাই। সে নিজের মনে খাবার খাচ্ছে। চাচ্চুকে একটু অন্যমনস্ক লাগছে অবশ্য। কিছুটা দ্বিধান্বিতও লাগছে। চাচিমনি আমার প্লেটে পরোটা আর ভাজি দিয়েছেন। আমি একটুখানি ছিড়ে মুখে দেওয়ার পর চাচ্চু রাহাত ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোর কাজকর্ম এখন কেমন চলছে?”
রাহাত ভাই খাবার থেকে একবার মুখ তুলে চাচ্চুর দিকে তাকাল। এরপর আবার খাবার মুখে নিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ভালো।”
“তাহলে কি এখন বিয়েশাদি নিয়ে ভাবছিস?”
রাহাত ভাইকে দেখলাম খুব বিস্ময় নিয়ে তাকাতে।
“হঠাৎ বিয়ে কেন?” জিজ্ঞেস করলেন রাহাত ভাই।
চাচ্চু বললেন,
“হঠাৎ কোথায় দেখলি? তুই চাকরিতে জয়েন করার পরপরই তো বিয়ের জন্য বলছিলাম আমরা। তুই-ই তো বলতি ,এখনই না। আরেকটু সময় লাগবে।”
“হ্যাঁ, আমার আরো সময় লাগবে।”
“আরো সময় মানে কত সময়? বয়স হচ্ছে তো।”
“এখনো এত বুড়ো হও নাই। আর দাদা-দাদি মানুষজন বুড়োকালেই হয়। বয়স বাড়লেও সমস্যা নেই।”
চাচ্চু দাঁত-মুখ খিঁচে বললেন,
“আমার বয়সের কথা বলিনি বে’য়া’দ’ব! তোর বয়সের কথা বলেছি।”
এই পর্যায়ে আমি খাবার মুখে নিয়েই ফিক করে হেসে ফেলেছি। চাচিমনি দেখলাম, চোখ গরম করে তাকাচ্ছে আমার দিকে। বহু কষ্টে নিজের হাসিটা সংযত করলাম।
রাহাত ভাই কিন্তু এখনো বেশ নির্বিকার আছেন। তার মাঝে কোনো হেলদোল দেখতে পাচ্ছি না আমরা কেউ। চাচ্চু কিছুটা সময় নিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“তোর কি পছন্দের কেউ আছে? ভালোবাসিস কাউকে?”
“থাকলে তো জানতে।”
“না থাকলে বিয়েতে এত আপত্তি কীসের তোর? আর থাকলেও আমাদের বল। তাহলে ঐ মেয়েকেই তোর বউ করে বাড়িতে নিয়ে আসব।”
রাহাত ভাই নিশ্চুপ। চাচ্চু ধীরে ধীরে রেগে যাচ্ছে বুঝা যাচ্ছে। কখন যে একটা তুলকালাম বাঁধবে আমি সেই অপেক্ষায় আছি। রাহাত ভাইকে নিরুত্তর দেখে চাচ্চু নিজেই বললেন,
“তার মানে তোর পছন্দের কেউ নেই? তাহলে ঘটক যেই মেয়েটার কথা বলেছে তাকে দেখি আমরা? আমি অবশ্য ছবি দেখেছি। তোর মা-ও দেখেছে। মেয়ে বেশ সুন্দরী ,শিক্ষিত, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও ভালো। তুই বললে তাহলে আমরা এই শুক্রবার মেয়ের বাসায় যাব। তোরও অফিস অফ থাকবে ঐদিন।”
আমি ফট করে বললাম,
“আমার আর হৃদিরও তো স্কুল ,কলেজ অফ ঐদিন। আমাদের নেবে না চাচ্চু?”
চাচ্চু হেসে জবাব দিলেন,
“অবশ্যই।”
রাহাত ভাই খুব বিরক্ত হয়ে বললেন,
“তোমরা কে কী করবে, কোথায় যাবে তোমাদের ইচ্ছা। কিন্তু আমি কোথাও যাচ্ছি না। আর বিয়েও এখন আমি করব না। এটাই আমার শেষ কথা।”
কথা শেষ করে রাহাত ভাই চলে যাচ্ছিল। চাচ্চু তখন রেগেমেগে পেছন থেকে বলতে লাগল,
“মেয়ে তো আমরা দেখতে যাবই। আর এবার তোর বিয়েও করিয়ে ছাড়ব। দেখি তুই এবার বিয়ে না করে কোথায় যাস। এটা আমারও শেষ কথা।”
বাপ-ছেলের লড়াইয়ের মধ্যে চাচিমনিকে ভীষণ হতাশ দেখাচ্ছে। তিনি হয়তো খুব এই হতাশটা রাহাত ভাইয়ের ওপরেই।
ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে বিধায় বিয়ের কথাবার্তা এখন কতদূর আগাবে জানতে পারলাম না। খাওয়া শেষ করেই বিদায় নিয়ে আমি চলে গেলাম। বাড়ির বাইরে বের হয়ে দেখি রাহাত ভাইও তার গাড়ি নিয়ে অফিসে যাচ্ছে। একবার জানালা দিয়ে আমার দিকে তাকাল। এখনো রেগে আছে। আমি এতদিন জানতাম, ছেলেরা বিয়ের জন্য সবসময় নাচানাচি করে, বিয়ে করতে চায়। এদিকে এই মানুষটাকেই দেখলাম এত অদ্ভুত। পছন্দের কেউ থাকলে তাকেই বিয়ে কর ,আর না থাকলে বাবা-বাবা-মা যাকে পছন্দ করে তাকে বিয়ে কর। তাহলেই তো ল্যাটা চুকে যায়। যাই হোক ,আমার এত মাথাব্যথা করে কাজ নেই।
কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হেলতে-দুলতে চলে যাওয়ার সময় পেছন থেকে রাহাত ভাই গাড়ির হর্ণ বাজাল। আমি ভ্রু কুচকে পেছনে তাকালাম। রাহাত ভাই এবার গাড়ি নিয়ে সামনে আগাতে লাগল। আমি সঙ্গে সঙ্গে সরে গিয়ে সাইডে দাঁড়ালাম। এই লোক আমাকে মা’র’তে চায় নাকি আশ্চর্য! আমি কী করেছি?
গাড়ি আমার পাশে দাঁড় করিয়ে তিনি বামপাশের দরজাটি খুলে দিয়ে বললেন,
“উঠে বসো।”
আমি ভারী অবাক হয়ে তাকালাম। কানে ঠিক শুনেছি কিনা সেটাও বুঝতে পারছি না। উনি কি সত্যিই আমাকে গাড়িতে উঠতে বলল? আর যদি এটা বলেই থাকে, তাহলে কেন বলল? ওনার নিজের টাকায় কেনা এই গাড়িতে ওঠার ভাগ্য আমার শুধু দুবারই হয়েছিল। তাও চাচ্চু ও চাচিমনি সাথে ছিল তাই। উনি নিজে থেকে আমাকে কখনো ওনার গাড়িতে ওঠাননি। আর এটাই তো স্বাভাবিক। উনি তো আমাকে সহ্যই করতে পারেন না।
“অফিসে লেইট হচ্ছে আমার।”
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে আছি। তিনি এতক্ষণ সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এবার বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“উঠবে নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কল্পনাই করবে শুধু?”
আমি সংবিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলাম। এমনিতে আমারও ক্লাসে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
“দরজা লাগাও।”
“অ্যাঁ?”
“গাড়ির দরজা লাগাতে বলছি।” বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ করে বললেন রাহাত ভাই।
আমি তড়িঘড়ি করে বললাম,
“ওহ, হ্যাঁ।”
এরপর দ্রুত টেনে দরজা লাগালাম। রাহাত ভাই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মেইন রোডে এলেন। এতক্ষণ নির্বিকার থেকে অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসল এবার,
“কাউকে ভালোবাসো?”
আমার মনে হলো কেউ বুঝি আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে আকাশ থেকে মাটিতে ফেলল। এই মানুষের সাথে আমার কথাই হয় না তেমন। যা হয় তার দিক থেকে থাকে অপমান ,আর আমার দিক থেকে জেদ। সেই মানুষ যদি হঠাৎ করে এই ধরনের প্রশ্ন করে বসে অবাক হবো না তাহলে?
“কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি। উত্তর দিতে সমস্যা?”
আমার দম আটকে আসার উপক্রম। হাসফাস লাগছিল খুব। রাহাত ভাই বোধ হয় আমার অস্বস্তি বুঝতে পেরে এসিটা অন করে দিলেন। আমি বড়ো নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম,
“না, না একদম না। আমি এসবের মধ্যে একদম নেই!”
তিনি স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে ড্রাইভ করতে করতেই সামনে তাকিয়ে বললেন,
“এত অস্থির হওয়ার মতো কিছু জিজ্ঞেস করিনি। শান্ত হও।”
আমি কেন যেন তাও শান্ত হতে পারছিলাম না। দম আটকে বসে ছিলাম। আর ভাবছিলাম, পথ কেন ফুরাচ্ছে না?
“তোমাকে কেউ ভালোবাসে না?”
তার একের পর এক উদ্ভট প্রশ্নে কখন যেন আমি জ্ঞান হারাই। নিঃশ্বাস আটকে বললাম,
“আমি জানি না।”
“আচ্ছা! তুমি কেন কাউকে ভালোবাসো না? কখনোই কি কাউকে ভালোবাসোনি?”
এবার আমার হাত-হাত-পা স্বাভাবিক হয়ে গেল। দম আটকে আসা অনুভূতিটা এখন আর হচ্ছে না। অদ্ভুত একটা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। রাহাত ভাই আমার দিকে তাকালেন। আমিও এবার তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“না, ভালোবাসি না কাউকে। আর বাসিওনি কখনো। এত বড়ো দুঃসাহস আমার কখনো হয়নি।”
“দুঃসাহস?”
“হ্যাঁ, কাউকে ভালোবাসাটা আমার জন্য দুঃসাহস-ই।”
“কেন?”
“কারণ এই দুনিয়ায় সত্যিকার অর্থে আমার কেউ নেই। আমি এতিম। অনাথ। আর আপনাদের বাড়ির আশ্রিতা।”
শেষ কথাটা বলার সময় আমি তাচ্ছিল্য করে মৃদু হাসলামও। গাড়িও ততক্ষণে কলেজের সামনে চলে এসেছে। তিনি ব্রেক করার পর আমি আর কিছু না বলেই গাড়ি থেকে নেমে গেলাম।
ক্লাসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অলরেডি আজ আমার দশ মিনিটের মতো লেইট হয়ে গেছে। স্যারও ক্লাসে চলে এসেছেন। আমি অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকে ধপ করে সায়রার পাশে বসলাম। সায়রা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“আজ তো খরস্রোতা রোদ, বৃষ্টি নাই। দেরি করলি ক্যান?”
আমি মিথ্যে করে বললাম,
“জ্যাম ছিল।”
ক্লাসে আর কোনো বাড়তি কথা হয়নি আমাদের। একদম টিফিনের টাইমে আমরা সবাই একসাথে খেতে বসেছি। ঐ সময়ে জানতে পারলাম, আকাশের বড়ো ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখছে। বিয়ে করাবে। আমার তখন রাহাত ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,
“কীরে চারদিকে কি এখন বিয়ের মৌসুম শুরু হয়েছে নাকি?”
“কেন, তোরও বিয়ে নাকি?” জিজ্ঞেস করল আকাশ।
আমি ধমক দিয়ে বললাম,
“আরে না। রাহাত ভাইয়ের। আজ সকালেই চাচ্চু বলছিল।”
সায়রা বিস্ময় নিয়ে বলল,
“তোর সাথে নাকি?”
“কী আমার সাথে?”
“বিয়ে।”
“আরে না! পাগল হলি নাকি তোরা?”
সুমন তখন বলল,
“আসল পাগল তো তুই গাধী। এক বাড়িতে থেকেও এতদিনে রাহাত ভাইকে পটাতে পারলি না।”
“আজেবাজে কথা বলতেছিস কেন? আমি তাকে কোন দুঃখে পটাতে যাব?”
“এত সুদর্শন ছেলে চোখের সামনে ঘুরঘুর করে তাকে পটাবি না তো কাকে পটাবি? তোর জায়গায় আমি থাকলে সেই কবেই রাহাত ভাইকে পটিয়ে বিয়েটিয়ে করে ফেলতাম! কিছুদিন পর হয়তো তোরা খালা, মামা-ও হতি।”
কথাগুলো হাসতে হাসতে বলল সায়রা। বাকিরাও ওর সাথে হাসছে। কিন্তু আমার কেন জানি মোটেও হাসি পাচ্ছে না। উলটো বিরক্ত লাগছে। কথাগুলো শুনেই গা গুলাচ্ছিল। এত ফ্যালনা নাকি আমি? মিতু বলল,
“কথা বলছিস না কেন? রাগ করলি নাকি?”
“রাগ করার মতোই কথা বলছিস তোরা। আমার এত খারাপ দিন চলে এসেছে যে আমার এখন কাউকে পটাতে হবে? বাবা-মা নেই বলে কি আমি সত্যিই মূল্যহীন?”
সায়রা এবার আমার হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে বলল,
“তুই আমাদেরকে ভুল বুঝতেছিস দোস্ত। আমরা এমন কিছু মিন করে বলিনি। রাহাত ভাই সুদর্শন ,তুই সুন্দরী, তোরা একসাথেই থাকিস তোদের বিয়ে হলেও ভালো হবে। মানাবেও দুজনকে।”
পাশ থেকে আকাশ বলল,
“হ্যাঁ, এটাই। যদিও জীবনের সাথেও তোকে মানায়।”
আমি দাঁত কিড়মিড় করে বললাম,
“রাহাত ভাই, জীবন কাউকে নিয়ে কোনো কথা বলবি না আর কেউ।”
সুমন বলল,
“সারাজীবন একা থাকবি নাকি?”
“এসব নিয়ে তোদের ভাবতে হবে না।”
টিফিনের সময়টা আজ আড্ডার থেকে সবার সাথে তর্কাতর্কি করেই কেটে গেল। কীসব চিন্তাভাবনা আসে ওদের মাথায় আমি বুঝি না। আমি তো কখনো কল্পনাতেও রাহাত ভাইকে নিয়ে এসব কিছু ভাবিনি।
ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরে দেখি চাচিমনি বেজায় রেগে আছে। কারণটা জানতে পারলাম হৃদির থেকে। চাচিমনি নাকি রাহাত ভাইকে হোয়াটসঅ্যাপে পাত্রীর ছবি পাঠিয়েছেন। রাহাত ভাইকে কল করেও বলেছেন ছবিগুলো দেখতে। কিন্তু তিনি ছবিগুলো দেখেননি। এরপর থেকে নাকি কলও ধরছে না। এজন্যই চাচিমনি এখন রেগে আছেন। আমি আর তাই চাচিমনিকে ঘাটালাম না। নিজের রুমে চলে গেলাম।
বরাবর যা করি আজও তাই করলাম। গোসল করে খেয়েই ঘুম। কিন্তু এই ঘুম আজ আর পুরোপুরি হলো না। আমি মোটামুটি সন্ধ্যার আজানের আগ পর্যন্ত ঘুমাই। কিন্তু আজ তার আগেই ঘুম ভেঙে গেছে। ভেঙে গেছে ঠিক তা নয়, ঘুম ভাঙানো হয়েছে। চাচিমনি হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকে লাইট জ্বালিয়ে বলতেছেন,
“রাহাতকে একটা কল দে তো। তোর চাচ্চুর ,আমার ,হৃদির কারো কল ধরতেছে না।”
আমি ঘুম ঘুম চোখেই খুব হতাশ হয়ে তাকালাম চাচিমনির দিকে। মায়াও লাগছিল। আহারে! ছেলের চিন্তায় চাচিমনির বোধবুদ্ধি সব উধাও হয়ে গেছে। রাহাত ভাই তার সবচেয়ে কাছের মানুষদেরই কল ধরছে না, সেখানে নাকি সে আমার কল ধরবে! কী অদ্ভুত!
“এভাবে বোকার মতো তাকিয়ে আছিস কেন? কল দে রাহাতকে।”
আমাকে ধমকে বললেন চাচিমনি। হতাশাকে এক সাইডে রেখে আমি শোয়া থেকে উঠে বসলাম। বালিশের পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে ভাবলেশহীনভাবেই রাহাত ভাইকে কল দিলাম। কারণ আমি জানি সে কল ধরবে না। দুবার ,তিনবার ,চারবার ধরে রিং হচ্ছে। কল তুলছে না রাহাত ভাই। চাচিমনি এতে আরো রেগে আ’গু’ন হয়ে যাচ্ছেন। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
“হত’চ্ছা’ড়া’টা’র সমস্যা কী!”
“তুমি এত চিন্তা করছ কেন? রাতে তো বাসায় আসবেই।”
“আসুক। এখন কেন ফোন ধরছে না?”
আমি ফোনটা রেখেই দিতে যাব, ঠিক তখনই লাস্ট রিং হওয়ার সময় রাহাত ভাই কল রিসিভ করলেন। আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে নিজে নিজেই বললেন,
“আম্মুকে বলো এত অস্থির না হতে। এর ,ওর নাম্বার থেকে এতবার কল দিতে হবে না। ব্যস্ত আমি।”
কথা শেষে আবার নিজেই খট করে কলটা রেখে দিলেন। আমি ভয়ে ভয়ে চাচিমনির মুখের দিকে তাকালাম তার রিয়াকশন দেখার জন্য। একদম রায় বাঘিনী লাগছে চাচিমনিকে। আমি ফোনটা রেখে চাচিমনিকে শান্ত করে বললাম,
“তুমি একটু মাথা ঠান্ডা করো। ভাইয়া বাসায় আসলে তখন সব রাগ দেখিও।”
“এই ছেলেটা আমাকে একদিন পাগল বানিয়ে ফেলবে দেখিস!”
চাচিমনি রাগ করে রুম থেকে চলে গেলেন। সাথে করে নিয়ে গেল আমার ঘুমও। এই অর্ধসমাপ্ত ঘুমটা তো আর আসবে না এখন। কী করব এখন আমি? আপাতত উঠে ফ্রেশ হয়ে ভাবলাম পড়তে বসি। অনেকগুলো হোমওয়ার্ক আছে আজ। সেগুলো আজ আগে আগে করে ফেলি। যেই ভাবনা ,সেই কাজ। এক মগ কফি বানিয়ে এনে আমি পড়তে বসে গেলাম।
রাত ন’টা নাগাদ আমার পড়া শেষ হয়েছে। এখন আমি ল্যাপটপে আমার পছন্দের গান শুনব। রাতে খেয়ে মুভিটুভি দেখব। গান ছেড়ে আমি একা একা নাচছিলাম, হৃদি তখন দরজায় নক করে বলল,
“আসব আপু?”
“হ্যাঁ, আয়।”
হৃদি ভেতরে ঢুকে অস্থির হয়ে বলল,
“মা তো অস্থির হয়ে যাচ্ছে আপু।”
“কেন? কী হয়েছে?”
“ভাইয়ার অফিস ছুটি হয় পাঁচটায়। এখন বাজে প্রায় সাড়ে নয়টা। ভাইয়া এখনো বাসায় আসেনি। আবার ফোনও ধরছে না।”
“এ তো দেখছি মহা মুসিবত! চল তো যাই চাচিমনির রুমে।”
প্রায় বিশ মিনিট চাচিমনিকে বুঝিয়ে-বুঝিয়ে-সুঝিয়ে খাইয়ে তারপর শুইয়ে দিয়ে এলাম নিজের রুমে। চাচ্চুও রাহাত ভাইয়ের ওপর ক্ষিপ্ত। সত্যি বলতে আমার নিজেরও এখন তার ওপর কিছুটা রাগ হচ্ছে। এভাবে শুধু শুধু বুড়ো মানুষ দুটোকে মানসিক অত্যাচার করার কোনো মানে হয়?
রুমে এসে দেখি ল্যাপটপ বন্ধ না করেই আমি চলে গেছিলাম। এখনো গান চলছে। দেব-শ্রাবন্তীর একটা রোমান্টিক গান ‘এগিয়ে দে, এগিয়ে দে/ দু,এক পা এগিয়ে দে…”
ল্যাপটপ টেবিলের ওপর রেখে বিছানা ঝাড়ছিলাম শুবো বলে ,তখন আবার দরজায় নক হলো। আমি বললাম,
“দরজা খোলাই আছে, হৃদি। ভেতরে আয়।”
“আমি।”
রাহাত ভাইয়ের ভরাট কণ্ঠ শুনে আমি ঝাড়ু রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। তিনি ভেতরে ঢুকে সোজা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ঝাড়ুটা খাটের নিচে রেখে বললাম,
“এত দেরি করলেন কেন আজ? জানেন ,চাচিমনি কত দুশ্চিন্তা করছিল আপনার জন্য?”
তিনি কোনো জবাব দিলেন না। কয়েক পলক আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“প্রিয়, জীবনে প্রথমবারের মতো কাউকে ভালোবাসার দুঃসাহস করবে? এই বাড়ির বউ হবে? বিয়ে করবে আমায়?”
আমার চোখ বিস্ময়ে বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। হা করে তাকিয়ে আছি আমি রাহাত ভাইয়ের দিকে। ল্যাপটপে তখন গান বাজছে,
‘কিছু আবদারের জানি নেই মানে…’
চলবে…
Share On:
TAGS: মুন্নি আক্তার প্রিয়া, যে পাখি মন বোঝে না
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৪
-
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (২য় অংশ)
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৯
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৪