#যে_পাখি_মন_বোঝে_না
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
____________________
রাহাত ভাই চলে যাওয়ার পরও আমি স্থির দাঁড়িয়ে আছি বেশ কিছুক্ষণ। দুচোখ টলমল করছে। কিন্তু আমি মোটেও কাঁদতে চাচ্ছি না। অন্তত এই মানুষটার দেওয়া কষ্টে তো আমি কখনোই কাঁদতে চাই না।
মাঝে মাঝে আমি আসলে বুঝতে পারি না যে, আমি কার ওপর রাগ করব? রাহাত ভাইয়ের ওপর, বাবা-মায়ের ওপর নাকি নিজের ভাগ্যের ওপর? অনেক ভাবলে রাগটা গিয়ে বাবা-মায়ের ওপরই বর্তায়। সারাজীবন যদি দুটো মানুষ একসাথে থাকতেই না পারে তবে কেন তারা বিয়ে করেছিল? আর কেনই বা আমায় দুনিয়ায় এনেছিল? আজ তারা দুজনই দুজনের জীবন নিয়ে আলাদা সুখে আছে, ভালো আছে। আর এদিকে আমি হয়ে আছি অন্যের বাড়ির আশ্রিতা। রাহাত ভাই তো একদম ভুল কিছু বলেনি। ঠিকই বলেছে। তবে আমার যদি যোগ্যতা আর টাকা থাকত তাহলে আমি কখনোই রাহাত ভাইয়ের অপমান শুনে এই বাসায় থাকতাম না। আল্লাহ্ কবে যে আমার সহায় হবে কে জানে!
হৃদি ব্যাগ নিতে এসে আমার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। কণ্ঠস্বরেও বিস্ময় রেখে বলল,
“আপু, কাঁদতেছ কেন তুমি? চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে কেন? ভাইয়া আবার কিছু বলেছে তোমাকে?”
আমি বাম হাতের উলটো পিঠে চোখ মুছে বললাম,
“উঁহু। স্কুলে যা তুই। আমিও গেলাম।”
আমি বাইরে বেরিয়ে দেখি চাচ্চু ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে উবারের গাড়ি। আমাকে দেখেই চাচ্চু তাড়া দিয়ে বললেন,
“এসেছিস? উঠ উঠ জলদি গাড়িতে উঠ।”
চাচ্চু ছাতাটা আমার মাথায় ধরলেন। চার, পাঁচ কদম আগালেই উবার অথচ তাও চাচ্চু ছাতা নিয়ে এসেছেন, শুধু মাত্র আমি যেন একটুও না ভিজি। আমার গলা ধরে আসছে। আবারও কান্না পাচ্ছে খুব। এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ আমাকে এত ভালোবাসে, এত আদর করে। তাহলে রাহাত ভাই কেন সবসময় এমন করে আমার সাথে? এমনকি রাহাত ভাইয়ের ছোটো চাচ্চুর বাসার সবাইও আমাকে খুব আদর করে।
এক বুক হাহাকার নিয়ে আমি গাড়িতে উঠে বসলাম। বামপাশের জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম, সিনথিয়া আপুও রাহাত ভাইয়ের গাড়িতে উঠতেছে। সিনথিয়া আপু রাহাত ভাইয়ের ছোটো চাচ্চুর মেয়ে। ভীষণ সুন্দরী এবং তুখোড় ভালো ছাত্রী। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে এখন। আমাকে একদম পুতুলের মতো করে ট্রিট করে। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় অনেক সময়ই আপুর সাথে দেখা হয় আমার, ঘুরতে যাই, আড্ডা দেই। আমার খারাপটা এখানেই লাগে। মাঝে মাঝে এটাও খুব জানতে ইচ্ছে করে যে, রাহাত ভাই আসলে ঠিক কোন কারণে আমাকে এতটা অপছন্দ করে?
চাচ্চু আমাকে একদম কলেজের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে হাতে পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে বললেন,
“যাওয়ার সময়ও যদি বৃষ্টি থাকে তাহলে সিএনজিতে করে চলে আসিস। রিকশায় উঠিস না। ভিজে যাবি।”
“টাকা তো আছে আমার কাছে।”
“এটাও রাখ।”
বলে চাচ্চু বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমার ক্লাস তিন তলায়। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার সময় দেখতে পেলাম জামিলা খালা সিঁড়ি ঝাড়ু দিচ্ছেন। তিনি আমাদের কলেজের আয়া। তার মতো অমায়িক মানুষ আমার এই ছোট্ট জীবনে খুব কম দেখেছি। আল্লাহ্ আমার থেকে আমার বাবা-মাকে কেড়ে নিলেও জীবনে এমন কিছু মানুষও দিয়েছেন, যারা প্রত্যেকে আমায় খুব ভালোবাসে। তাদের মধ্যে জামিলা খালা একজন। কোনো এক অদ্ভুত কারণেই তিনি আমায় ভীষণ ভালোবাসেন। অবশ্য তার কাছে একটা ভ্যালিড রিজন আছে। আমার চেহারা নাকি তার মেয়ে মণির মতো। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে খুব কম আসা হয়। প্রায়ই খালা মেয়ের গল্প করেন আমার কাছে, আবার কিছুক্ষণ পরই আমার মুখে হাত রেখে বলবেন, ‘তুমিও আমার মণি।’
জামিলা খালা এখনো আমায় খেয়াল করেননি। ধুলাবালিতে আমার এলার্জি আছে। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে পেছন থেকে জিজ্ঞেস করলাম,
“কেমন আছেন খালা?”
খালা পেছনে তাকিয়ে আমায় দেখে হাসলেন। সঙ্গে সঙ্গে ঝাড়ু দেওয়া বন্ধ করে বললেন,
“ভালো আছি, মা। এইহানে এহন অনেক ধুুলাবালি। তুমি কেলাসে যাও। টিফিনের সময় কথা কমুনে। যাও যাও।”
খালা এত তাড়া দিলেন যে আমি আর দাঁড়াতেও পারলাম না। শুধু যাওয়ার আগে বলে গেলাম,
“টিফিনের সময় দেখা করিয়েন কিন্তু।”
ক্লাসে গিয়ে দেখি মিতা, সায়রা সামনের বেঞ্চে বসে আছে। পাশের সিট ফাঁকা। এই বেঞ্চটা অবশ্য আমাদের জন্যই বরাদ্দ। আমরা কেউ দেরি করে আসলেও কেউ এখানে বসে না। সায়রা সরে বসে বলল,
“দেরি করলি কেন আজ?”
ব্যাগ রেখে পাশে বসে বললাম,
“বৃষ্টির জন্য একটু দেরি হয়ে গেল।”
“ফিজিক্স হোমওয়ার্কটা করেছিস?”
আমি ঠোঁট উলটালাম। ম্যাথ জিনিসটাই আমার ভীষণ অপছন্দ। তবুও সায়েন্স নিতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। এমন না যে, আমাকে বাসার কেউ জোর করেছে। কিন্তু যেদিন জানলাম, চাচিমনির খুব ইচ্ছে আমাকে ডাক্তার বানাবে সেদিন থেকেই মনে মনে পণ করেছিলাম, ম্যাথভীতি আমার চুলায় যাক; আমি সায়েন্সই নেব। কারণ চাচিমনিকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু দিনদিন ম্যাথের জন্য আমার যা অবস্থা হচ্ছে এতে করে ডাক্তার হওয়া তো দূরে থাক সায়েন্স নিয়ে টিকে থাকতে পারব কিনা সন্দেহ!
“না, করিনি। পারি না।” দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম আমি।
মিতাও করুণস্বরে বলল,
“আমরাও তো করিনি। স্যার আজকে জানে মে’রে ফেলবে একদম! ক্লাসের বাইরে নিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখবে। কী রকম লজ্জার ব্যাপার হবে ভাব একবার!”
বিষয়টা আসলেই লজ্জার। কিন্তু না পারলে কী করার আছে? সায়রা আশ্বস্ত করে বলল,
“একটা উপায় কিন্তু আছে।”
আমি ও মিতা দুজনই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম সায়রার দিকে। সায়রা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু তোর হেল্প লাগবে।”
“আরে বা’ল! আমি ম্যাথ পারলে না হেল্প করব?”
“উফ! তোকে ম্যাথ করতে বলেছি নাকি? তুই জীবনের কাছে ওর হোমওয়ার্ক খাতাটা চাইবি। ফিজিক্স ক্লাস টিফিনের পর হবে। টিফিন টাইমে ওর খাতা দেখে অংক করে ফেলব।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করলাম। এর পেছনেও কারণ আছে। জীবন ক্লাসের টপার। সব টিচারদের পছন্দের ছাত্র। যেমন মেধাবী এই ছেলে, তেমন সুদর্শন আবার তেমনই ভাবওয়ালা। এত অল্প কথা বলে! ভালো ছাত্র বলে সবাই ওর বন্ধু হতে চায়, ওর সাথে বসতে চায়। ও যে ফিরিয়ে দেয় বিষয়টা এমনও না। কিন্তু ওর স্বল্পভাষী বিষয়টাই কেমন যেন অহংকার অহংকার মনে হয়। এগুলো অবশ্য খুবই সিলি কারণ বললাম। আসল বিরক্তিকর কারণটা হলো, জীবন আমাকে পছন্দ করে। কখনো মুখ ফুটে না বললেও ক্লাসের সবার নজরেই বিষয়টা পড়েছে। যেই ছেলে কখনো পরীক্ষার সময় কাউকে হেল্প করে না, সেই ছেলে গতবার সেকেন্ড ক্লাস টেস্টে যেচে আমাকে ম্যাথ দেখিয়েছে। তখন আমি খুশিতে গদগদ হয়ে গেলেও পরে যখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম, জীবন আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে তখন থেকেই আমি দমে গেছি। প্রয়োজনীয় কথাটুকুও বলি না। ও সবসময় যেচে এসে কথা বলতে চায়, বলেও। সবসময় তো আর ইগনোর করতে পারি না। এসব দেখেই পুরো ক্লাস জেনেছে। ক্লাসের কত মেয়ে যে এজন্য আমাকে দেখতে পারে না, হিংসা করে তারও কোনো হিসাব নেই।
মিতা পারে না শুধু আমার পা ধরে বলে,
“প্লিজ এইটুকু হেল্প কর!”
আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। ‘না’ মানে ‘না’। কিছুতেই না। প্রয়োজনে আমি ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব। তবুও জীবনের থেকে হেল্প নেব না। এই রাগে টিফিনের আগের পুরো চারটা ক্লাসেই সায়রা আর মিতা আমার সাথে কথা বলেনি।
টিফিনের ঘন্টা বাজতেই সবাই হুড়মুড়িয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। আকাশ তখন সামনে এসে ঠাস করে একটা খাতা বেঞ্চের ওপর রেখে বলল,
“নে গরিবের দল, অংক তো মনে হয় না করছিস? ঝটফট তুলে ফেল।”
বিস্ময়ে চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল আমার। খাতার ওপর আকাশের নাম দেখে আমি আরো বেশি অবাক হলাম। এই গাধাটা তো আমার চেয়েও অংকে খারাপ। বিশেষ করে ফিজিক্সে। ও তাহলে অংকটা করল কীভাবে?
মিতাও বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুই অংক করেছিস?”
“হ্যাঁ, করেছি আর তোদেরও করতে দিলাম। কারণ আমার মনটাও আমার নামের মতোই বিশাল। আমরা এসিতে বসে ক্লাস করব আর তোরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবি এটা আমার ভালো লাগত না।”
সুমন এসে তখন আকাশের পিঠে চাপড় দিয়ে বলল,
“আরে শা’লা! আর কত ভাব নিবি?”
এরপর আমার দিকে তাকিয়ে সুমন বলল,
“আকাশ জীবনের কাছ থেকে খাতা নিয়ে হোমওয়ার্ক করেছে।”
সায়রা জিজ্ঞেস করল,
“আকাশ চাইল আর জীবন হোমওয়ার্ক খাতা দিয়ে দিল?”
“হু, দিল কারণ আকাশ বলছে খাতাটা প্রিয়তা চাইছে। আর প্রিয়তা চাইলে জীবন তো ওর নিজের জীবনও দিয়ে দিতে প্রস্তুত। হোমওয়ার্ক খাতা আর এমন কী?”
আমি অন্তত এই শেষ টুইস্টটুকুর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। এভাবে আমার নাম ভাঙানোর কোনো মানে হয়? রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আমি আকাশকে ধাওয়া শুরু করতেই, আকাশও বাঁচতে তখন দৌঁড় দিল। এক সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে ওকে আমি ধরেও ফেলি। চুল টেনে ধরে পিঠে ইচ্ছেমতো মা’রার সময় জামিলা খালা সেখানে চলে আসে। আমার হাত থেকে আকাশকে অনেক কষ্টে ছাড়াতে সক্ষম হয়।
আকাশ মাথায় হাত রেখে বলল,
“এত নিষ্ঠুর তুই প্রিয়তা! মাথা ব্যথা করছে আমার। জীবনের সত্যিই আর জীবন থাকবে না, যদি তুই ওর জীবনসঙ্গী হোস।”
“লা’থি খাওয়ার আগেই চোখের সামনে থেকে দূর হ।”
আকাশ চলে যাওয়ার পর জামিলা খালা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“আহা! কথায় কথায় এত রাগ করলে হয় মা? একটু শান্ত থাকতে পারো না?”
“আরে ওরা কাজই করে এমন! যাই হোক, আপনি দুপুরে খেয়েছেন?”
“না, খামু এহন। তোমার কাছেই যাইতেছিলাম।”
একটা বাটি তিনি আমার হাতে দিয়ে বললেন,
“তোমার না মরিচ ভর্তা আর শুঁটকি ভর্তা অনেক পছন্দ? আজকে বানাইছি। আর খিচুড়ি রান্না করছি। বন্ধুদের নিয়া খাও যাও।”
“এসব কেন করেছেন আবার?”
“করমু না? মাইয়ার জন্য করতে পারুম না?”
আমি হেসে ফেললাম। বললাম,
“অবশ্যই পারবেন।”
তারপর ইউনিফর্মের পকেট থেকে চাচ্চুর দেওয়া সেই পাঁচশো টাকার নোটটা খালাকে দিয়ে বললাম,
“এটা রাখেন। বাজার কইরেন।”
খালা হাতের মুঠ খুলে টাকা দেখে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফেরত দিয়ে বললেন,
“না, না আমি টাকা নিমু ক্যান?”
“আমি দিয়েছি তাই।”
“তুমি ক্যান টাকা দিবা? নিয়া যাও।”
“আপনি যে আমার জন্য মাঝে মাঝে রান্না করে আনেন আমি কি খাই না?”
“তুমি এর বিনিময়ে টাকা দিবা?”
“এটা বিনিময় না, খালা। আমি তো আপনাদের অবস্থা জানি। বাসায়ও গিয়েছি। খালু অসুস্থ, কোনো কাজকর্ম করে না। আপনার একার এটুকু বেতনের টাকা দিয়ে সংসার আর কতটুকুই বা ভালো চলে? আমি যদি চাকরি করতাম তাহলে আপনাদের সব দায়িত্বই নিয়ে নিতাম। কিন্তু একদিন দায়িত্ব নেব অবশ্যই। শুধু দোয়া করবেন আমার জন্য। আর টাকাটা রাখেন। যদি ফিরিয়ে দেন তাহলে আমি আর কখনো আপনার দেওয়া খাবার খাব না।”
জামিলা খালা খুব আবেগী ও অভিমানিনী। এখনো আবেগে কাঁদছেন তিনি। আমি আদুরে হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,
“কাঁদবেন না একদম। এখন যান গিয়ে খেয়ে নিন। আমিও যাচ্ছি। টিফিনের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
“আচ্ছা, আচ্ছা মা যাও।”
আকাশের ওপর থেকে আপাতত রাগটা দমিয়ে রেখে, ওদের নিয়েই খালার রান্না করা খিচুড়ি খেলাম। খালা এত ভালো রান্না করেন যে, যতই খাই না কেন মন ভরে না!
টিফিনের পরে তিনটা ক্লাস হয়। এই তিনটা ক্লাস করার মধ্যে যে এত বিরক্তি আর ক্লান্তি কাজ করে! ঘুমে দুচোখ বুজে আসে। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে ক্লাস করি। আজ তো আরো বেশি ঘুম পাচ্ছে। বাইরে যেভাবে রিমঝিম বৃষ্টি হচ্ছে! এখন যদি একটু বালিশে শুধু মাথাটা রাখা যেত, কী যে ভালো লাগত! আমার অপেক্ষার প্রহর ফুরিয়ে ক্লাস তিনটা শেষ হলো। মিতা, সায়রা, আকাশ, সুমন ওরা বাস দিয়ে যায়। কারণ ওদের বাসা আমার বাসা থেকেও অনেক দূরে। আমার কাছে এখন যা টাকা আছে মনে হয় না যে সিএনজি দিয়ে যেতে পারব। তার মধ্যে আবার বৃষ্টি হচ্ছে। ভাড়াও নিশ্চয়ই চাইবে আকাশচুম্বী। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা হওয়ার হবে রিকশা দিয়েই যাব।
ওরা বাসে ওঠার পর দরদাম করে একটা রিকশা ঠিক করেছি, পেছনে কখন যে জীবন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। ও যখন বলল,
“আমি কি তোমার সাথে যেতে পারি?”
আমি পিছু ফিরে তাকালাম। জীবনের মাথার চুল কিছুটা ভিজে কপালে লেপ্টে আছে। তীক্ষ্ণ ওর দৃষ্টি। মেয়েরা পাগল হবেই না বা কেন! আমি স্থির হয়ে বললাম,
“আমি তো বাসায় যাচ্ছি।”
“আমিও বাসায় যাব।”
আমার চোখদুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। খুব সম্ভবত আমার এরকম রিয়াকশন দেখেই জীবন হেসে বলল,
“ভয় নেই। তোমার বাসায় যাব না। আমার বাড়িতেই যাব। বৃষ্টির জন্য কোনো রিকশা পাচ্ছি না। তুমি তো আমার বাড়ির সামনে দিয়েই যাও। তাই বলছিলাম। তবে তোমার যদি আপত্তি থাকে তাহলে ইট’স ওকে।”
এভাবে তো বিপদে একটা মানুষকে মুখের ওপর না করা যায় না। তাই আমিও পারলাম না। বললাম,
“ঠিক আছে।”
রিকশায় উঠে পাশাপাশি বসলেও জীবন একদম আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। ওর হাভভাব দেখেই অস্বস্তি লাগছে আমার। মনে হচ্ছে আমিই ছেলে আর ও মেয়ে। যাই হোক, আমি কোনো কথা বললাম না। এমনকি জীবনও না। দুজনই চুপ করে ছিলাম পুরোটা পথ।
জীবনের বাসার সামনে আসার পর রিকশা থামাতে বলল জীবন। নামার পর ভাড়া দেওয়া নিয়ে একচোট কথা বেজে গেল আমাদের। শেষ পর্যন্ত ভাড়াটা জীবনই দিল। ও চলে যাওয়ার পর আমি রিকশার হুট নামিয়ে দিলাম। বৃষ্টির ছাট এসে চোখেমুখে পরছিল আর অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল আমার। কিছুটা শীত শীতও করছিল কিন্তু ভালো লাগছিল। বৃষ্টিটাই যেন আসলে কেমন। কখনো মন ভালো করে দেয়, আবার কখনো মন খারাপ করে দেয়। তবে এখন আমার ভীষণ ভালো লাগছে।
এই ভালো লাগার স্থায়ীত্বকাল খুব কম হলো। বাড়িতে ফিরে গোসল করে শুয়ে ছিলাম। ঘুমানোর পর আর আমার হুঁশ নেই। নিভু নিভু দৃষ্টিতে চোখ মেলে তাকানোর পর বুঝতে পারছিলাম, শরীরটা তেমন সায় দিচ্ছে না। গরম হয়ে আছে শরীর। নিশ্চয়ই জ্বরটর বাঁধিয়ে বসেছি। কোনো রকমে শরীরটাকে টেনে-হিঁচড়ে তোলার পর আমি চাচ্চু আর চাচিমনির রুমে গেলাম। দরজা খোলা কিন্তু ভেতরে কেউ নেই। হঠাৎ করে মনে পড়ল, চাচ্চুদের আজ একটা দাওয়াত ছিল। আমি বাড়িতে এসেই কাউকে পাইনি। ওদের ফিরতে ফিরতে রাত হবে। পুরো একা বাসায় জ্বর নিয়ে এখন আমি করবটা কী বুঝতে পারছি না। আমার কাছে তো জ্বরের ওষুধও নেই। শরীরটাকে টেনে আর নিজের রুম পর্যন্ত নিতে পারলাম না। চাচ্চুদের রুমের পাশেই বসার রুম। আমি সেখানে গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়লাম। শরীর এত খারাপ লাগছে, কখন না আবার জ্ঞান হারিয়ে বসি।
মেইন দরজা খোলার শব্দ পেয়ে মনে হলো কেউ এসেছে। চাচ্চুরা চলে এসেছে নিশ্চয়ই। আমি নিস্তেজ কণ্ঠে বললাম,
“চাচিমনি এসেছ?”
কোনো জবাব এলো না। উত্তপ্ত চোখের পাতা দুটো মেলতেই দেখতে পেলাম সামনে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে রাহাত ভাই। আমি ঘোলাটে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম। তিনি নিজেই ভরাট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“এখানে শুয়ে আছো কেন?”
“এমনিই।”
“বাসার কেউ এখনো আসেনি?”
“না।”
তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন,
“তুমি কি অসুস্থ?”
“উঁহু! ঠিক আছি।”
“দেখে তো মনে হচ্ছে না।”
তিনি বোধ হয় কিছুটা অস্বস্তি নিয়েই আমার কপালে হাত রাখলেন। নির্লিপ্তি কণ্ঠে বললেন,
“জ্বর বাঁধিয়েছ? বৃষ্টিতে ভিজে?”
আমি জবাব দিলাম না। তিনি নিজেই সেধে জিজ্ঞেস করলেন,
“মেডিসিন খেয়েছ?”
“না।”
“চলো ডাক্তারের কাছে যাই।”
“না।”
“না মানে?”
“যাব না। আশ্রিতাদের প্রতি এত দয়া দেখাবেন না।”
রাহাত ভাইয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে তবে, পড়ে পড়ে ম’রো। আমার কী!”
তিনি রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমে চলে গেলেন।
জ্বরের উত্তাপে শরীর পুড়ছিল ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি পুড়ছিল আমার মন। কারণ মন অন্তত এটা বুঝে গিয়েছে যে, কিছু মানুষ কাছে থেকেও কোনোদিন নিজের হয় না।
জ্বরের প্রকোপে কখন আমার চোখ লেগে এসেছিল জানিনা। শরীর ঝাঁকুনি দিচ্ছিল, মাথা ব্যথা করছিল। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে যখন চোখ মেলে তাকালাম, তখন ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম আমি রাহাত ভাইয়ের খুব নিকটে। আরো কয়েক সেকেন্ড পর বুঝতে পারলাম, আমি আসলে রাহাত ভাইয়ের কোলে। সে আমাকে কোলে নিয়ে খুব দ্রুত পা ফেলে হাঁটছে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমি জানিনা, তবে আমি কি খুব বেশি ভারী? চাচিমনির খোকা নিশ্চয়ই আমার ভারী শরীরটাকে ঠিকঠাক কোলে নিতে পারছে না। এই প্রচণ্ড অসুস্থতার মাঝেও আমি হেসে ফেললাম। রাহাত ভাই ভীষণ বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বললেন,
“এভাবে হাসবে না তো প্রিয়তা, খুবই বিরক্ত লাগছে।”
চলবে.
Share On:
TAGS: মুন্নি আক্তার প্রিয়া, যে পাখি মন বোঝে না
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৯
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩০
-
তুষারিণী পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (১ম অংশ)
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৫