Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৫৩


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৫৩
“সিয়া! সিয়া! উঠছিস না কেন? ফাইলটা সই করিয়ে আনবি না?”
রূপার ঝাঁকুনিতে ধড়ফড় করে চোখ মেলল সিয়া। চারিদিকে বিমানের এয়ারকন্ডিশনারের হালকা সোঁ সোঁ শব্দ আর যাত্রীদের মৃদু গুণগুণানি। সিয়া চোখ ডলে এদিক-ওদিক তাকাল। ককপিটের বাইরে ট্রলির পাশে সে ট্রে হাতে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে! তার কপালে জমে উঠেছে সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু, আর বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন এখনো রেসট্র্যাকের ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে।
“অ্যাঁ? আমি… আমি কোথায়?” সিয়া তোতলাতে তোতলাতে বলল।
রূপা অবাক হয়ে সিয়ার কপালে হাত দিয়ে বলল, “তুই কি আকাশে উঠে পাগল হয়ে গেলি নাকি? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ককপিটের দরজার দিকে তাকিয়ে ঘুমাচ্ছিলি নাকি? তোকে তো বললাম ক্যাপ্টেন তাজ স্যার ইমার্জেন্সি ফাইলে সাইন করার জন্য ডেকেছেন। ফাইল নিয়ে ককপিটে যা!”
সিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের বুকের হাত রেখে আবিষ্কার করল এতক্ষণ সে যে তিন হাজার ফুট উঁচুতে রোমান্টিক বাসর আর তাজের সেই গা জ্বালানো চটুল হাসি দেখছিল, তার পুরোটাই ছিল তার আতঙ্কিত মনের দিবাস্বপ্ন! নিজে নিজেই একটা কাল্পনিক দৃশ্য বানিয়ে অতদূর ভেবে ফেলার লজ্জায় সিয়ার নিজেরই গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সে হাত দিয়ে গাল দুটো চেপে ধরে মনে মনে বলল, ‘ইয়া মাবুদ! আমি এসব কী হাবিজাবি ভাবছিলাম? ওই হিটলার তাজ স্যার.. আই মিন তাজ, আমার সাথে ককপিটে এসব করবে?! অসম্ভব! বাস্তবে উনি ফাইলে সাইন করতে গিয়ে হয়তো আমাকে তিনটে ফ্লাইটের রুলস মুখস্থ করিয়ে দেবেন!’

সিয়া ফাইলটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা পায়ে ককপিটের ভারী দরজার পাসকোড ডায়াল করল…

সাইকোলজিস্ট রাজ তাঁর স্টাডি টেবিলের চেরি কাঠের বিশাল রিডিং চেয়ারটায় বসে আছে। টেবিলে সাইকোলজিক্যাল ফিলোসফির একখানা মোটা বই খোলা, কিন্তু গত আধা ঘণ্টা ধরে রাজের দৃষ্টি সেই বইয়ের পাতায় স্থির নেই। তাঁকে মুগ্ধ করে রেখেছে ঘরের এক কোণে থাকা প্রকাণ্ড আয়নাটা। আয়নার সামনে সুতি লাল-সাদা শাড়ির আঁচল মেঝেতে ছড়িয়ে বসে আছে অবনী। স্নাত চুলগুলো পিঠের ওপর কৃষ্ণবর্ণের মেঘের মতো এলিয়ে রাখা। অবনীর কোলজুড়ে কাঁচের একখানা পুঁচকে আলতার শিশি। সে খুব মনোযোগ দিয়ে তুলি ডুবিয়ে পায়ের পাতায় আলতা পরার চেষ্টা করছে, কিন্তু প্রতিবারই তার আঙুল কেঁপে উঠছে। আলতার লাল রঙ আঁকাবাঁকা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তার ধবধবে চরণে। অবনী হালকা একটু বিরক্তি প্রকাশ করে নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে চেপে ধরল। হঠাৎ আয়নার ভেতর দিয়ে রাজের চোখ দুটো তার ওপর নিবদ্ধ হতেই অবনীর বুকের ভেতর হাজারটা প্রজাপতি ডানা ঝাপটাতে শুরু করল। সে চট করে লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। রাজ চশমাটা ধীরেসুস্থে খুলে বইয়ের ওপর রাখলেন। যে মানুষটা প্রতিদিন মানুষের মনের জটিল থেকে জটিলতম জট এক তুড়িতে ছাড়িয়ে দেন, সেই সাইকোলজিস্ট আজ নিজের রূপসী স্ত্রীর এক ফোঁটা আলতার কাছে থমকে গেছে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মেঝেতে অবনীর ঠিক মুখোমুখি এসে হাঁটু মুড়ে বসল রাজ। রাজের এত কাছে আসায় অবনীর নিঃশ্বাসের গতি দ্রুত হয়ে গেল। সে অবচেতনভাবেই হাত দুটো কোলের শাড়ির কুঁচিতে জড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “আ-আপনি না কেস স্টাডি করছিলেন? পড়াশোনা ছেড়ে এখানে কেন এলেন?”
রাজ কোনো মৌখিক উত্তর দিলো না। সে অত্যন্ত নমনীয় ভঙ্গিতে অবনীর কোল থেকে আলতার শিশি আর তুলিটা নিজের আয়ত্তে নিল। তারপর আলতো করে অবনীর লাল পাড় শাড়ির সীমান্ত একটু সরিয়ে তার ডান পায়ের গোড়ালিটি তুলে নিজের সুগঠিত কোলজুড়ে রাখল। রাজের এই উষ্ণ, পুরুষালি স্পর্শে অবনীর পুরো শরীর এক লহমায় শিউরে উঠল! অবনী চঞ্চল হয়ে বলে উঠল, “এ কী করছেন আপনি?! ছাড়ুন… আমার পায়ে হাত দেবেন না, এতে পাপ হবে! আমি নিজেই পরতে পারি।”
রাজ তাঁর সেই সুগভীর, নীল সমুদ্রের মতো শান্ত চোখ তুলে অবনীর দিকে তাকাল রাজ সুরেল কণ্ঠে বললেন, “শ্রদ্ধা আর ভক্তির জায়গাটা যদি পায়েই আটকে থাকে অবনী, তবে প্রেমের দর্শন কোথায় যাবে? সাইকোলজি বলে সংসারে পুরুষ যখন নারীর মন জয় করতে চায়, তখন তাকে মাথার মুকুটে বসায়, কিন্তু পুরুষ যখন নারীর প্রেমে নিজেকে সমর্পণ করতে চায়, তখন সে সসম্মানে তার চরণে স্থান খোঁজে। মনস্তত্ত্বের এত কঠিন নিয়ম বুঝি, আর আমার ভালোবাসার মানুষের পায়ে এক ফোঁটা লাল রঙ এঁকে দেওয়ার অধিকার আমার থাকবে না?”
অবনীর কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। রাজের এই অতল দর্শনের সামনে তার সমস্ত কুণ্ঠা মুহূর্তেই বাষ্প হয়ে উবে গেল। সে মাথা নিচু করে রাজের ওপর নিজেকে সঁপে দিল। রাজ আলতার ভেজা তুলিটা আবার শিশিতে ডুবাল। তারপর পরম যত্নে অবনীর ডান চরণের আঙুলের চারপাশে তুলির আলতো আঁচড় দিতে লাগল। ভেজা, ঠান্ডা রঙের স্পর্শ আর রাজের আঙুলের উষ্ণতায় অবনী রাজের চওড়া কাঁধের ওপর নিজের ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। সে মৃদু স্বরে বলল, “রাজ… আপনার তুলির ছোঁয়ায় আমার শরীরে অদ্ভুত এক কাঁপন হচ্ছে…”
রাজ না হেসে খুব নিবিড় স্বরে বললেন, “তুমি জানো অবনী, এই লাল রঙটার গুরুত্ব কী? মানুষ রক্তকে ভয়ের প্রতীক মনে করে, কিন্তু প্রেমে এই লাল রঙটাই হলো সমর্পণের প্রতীক। আলতা শুধু সাজের অনুষঙ্গ নয়; এটা হলো একটা পুরুষের কাছে নারীর চিরন্তন সৌন্দর্যের স্বীকৃতি।”
রাজ তুলি দিয়ে অবনীর পায়ের চারপাশ রাঙিয়ে দিয়ে ঠিক মাঝখানে এঁকে দিলেন একখানা রক্তিম চাঁদ।
“তুমি আমাকে ‘আপনি’ করে ডাকো,” রাজ বাঁ পা-টি নিজের কোলে টেনে নিতে নিতে মৃদু হেসে বললেন, “সবাই ভাবে এতে আমাদের মাঝে কোনো দূরত্ব রয়ে গেছে। কিন্তু তারা বোঝে না, এই ‘আপনি’ ডাকটার ভেতরে কতখানি নিখাদ সম্ভ্রম আর গোপন রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রেমগুলো কিন্তু অতি-অভ্যাসে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু আমাদের এই ভালোবাসায় সেই সম্মানের আভিজাত্য কখনো কমবে না।”
অবনী এক দৃষ্টিতে রাজের এই অপরূপ রূপের দিকে তাকিয়ে রইল। বাঁ পায়ের আলতা আঁকা শেষ করে রাজ তুলিটা নামিয়ে রাখল। অবনীর ধবধবে রূপোলি চরণে এখন লাল আলতার এক অপূর্ব সাজ
রাজ এবার কিছুটা ঝুঁকে এলো। সে নিজের দু’হাতে অবনীর দুটি পা আগলে ধরে, সেই লাল আলতা-রাঙানো চরণের ওপর নিজের তপ্ত ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিল। “রাজ…!”
রাজ মাথা তুলল। রাজ অবনীকে এক ঝটকায় নিজের বুকের খুব কাছে টেনে নিল। অবনীর পিঠ ঘেঁষে গেল রাজের চওড়া বুকে। রাজ তার ভেজা, চন্দনের সুবাস ছড়ানো চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। “মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করি অবনী,” রাজ ফিসফিস করে অবনীর কানের লতিতে নিজের স্পর্শ রেখে বললেন, “কিন্তু প্রতিদিন দিনশেষে আমি বুঝতে পারি, আমার নিজের কোনো যুক্তি বা বুদ্ধিমত্তা তোমার সামনে এসে কাজ করে না। আমার সমস্ত সাইকোলজি তোমার এক চিলতে হাসির কাছে এসে দেউলিয়া হয়ে যায়।”
অবনী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের দু’হাত রাজের গলার চারপাশে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে তাঁর বুকে মুখ লুকাল। “আমি আপনাকে ভালোবাসি, রাজ,” অবনী ভেজা গলায়, আকুল হয়ে বলল, “আপনার এই গভীরতা, আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি… আমাকে প্রতিদিন নতুন করে আপনার প্রেমে অন্ধ করে দেয়। আপনি এত সুন্দর করে ভালোবাসতে পারেন কেন?”
রাজ অবনীর চিবুক ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। তারপর তার কপালে, গালে এবং সবশেষে তার লাল ঠোঁটে এক দীর্ঘ প্রেমের সিলমোহর এঁকে দিলেন।
“কারণ তুমি আমার মন নও অবনী, তুমি আমার আত্মা। আর আত্মাকে ভালোবাসতে কোনো বই বা বিজ্ঞানের প্রয়োজন হয় না,” রাজ নিচু স্বরে বললেন।
বিকেলের শেষ আলোটুকু তখন মীর বাড়ির সেই ঘরে এক মায়াবী আবহের সৃষ্টি করেছে। বাইরে বাতাসে তখন নিমগাছের পাতাগুলো মিষ্টি গান গাইছে, আর ঘরের ভেতর দুটো রূপকথা-তুল্য মন গভীর ভালোবাসায় একে অপরের মাঝে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

রাত তখন পৌনে বারোটা। বিকেলের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত তাণ্ডব ও মীর বাড়িতে নেমে আসা নীরবতার পর পুরো বাড়ি যেন নিঝুম হয়ে গেছে। পাত্রীপক্ষ চরম অপমান আর বিস্ময় নিয়ে বিদায় নিয়েছে, ঘটক জসিম একপ্রকার পা দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়েছে, আর বুড়ো দাদাজান নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। সাঁঝ সারাসন্ধ্যা নিজের ঘরে সিঁটিয়ে বসে ছিল। বিকেলের পর থেকে আরযানের সাথে তার আর দেখা হয়নি। কিন্তু বুকের ভেতর যে তোলপাড় শুরু হয়েছিল, তা কোনোভাবেই শান্ত হতে চাইছিল না। বিশেষ করে সবার সামনে আরযানের সেই শক্ত মুঠিতে হাত ধরা আর সুদৃঢ় ঘোষণা, “মনে যাকে ধরবে সে যে কেউ হোক না কেন, আমার বউ তাকে করেই ছাড়ব!”
নিজের ঘরের ছটফটানি সহ্য করতে না পেরে সাঁঝ ধীরপায়ে তিনতলার স্টাডি রুমের দিকে পা বাড়াল।
স্টাডি রুমের দরজাটা সামান্য হাঁ করা। ভেতরে কোনো আলো জ্বলছে না, কেবল জানালার পর্দা ঠেলে আসা এক চিলতে আবছা জোৎস্না আর তিনতলার বারান্দার হালকা আলো মেঝেতে এসে পড়েছে। সাঁঝ দরজার ফ্রেমে হাত রেখে ফিসফিস করে ডাকল, “আ-আরযান ভাইয়া…?”
স্টাডি রুমের আধো-অন্ধকারে রিডিং টেবিলের পাশের বিশাল কাঁচের জানালার সামনে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মীর আরযান হোসেন। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, হাত দুটো পকেটে গোঁজা। তার সেই দীর্ঘ সুপুরুষ অবয়বটা জোৎস্নার আলোয় এক প্রকাণ্ড শীতল ছায়ার মতো দেখাচ্ছে। সাঁঝ ভেতরে এক পা বাড়াতেই পেছন থেকে বাতাস এসে ঠাস করে দরজাটা ভেজিয়ে দিল।
“আজও কি ঘটকের কোনো বায়োডাটা মুখস্থ করাতে এসেছিস, সাঁঝ?”
অন্ধকারের ভেতর থেকে আরযানের গম্ভীর, শীতল এক মাদকতাময় কণ্ঠ ভেসে এলো।
সাঁঝের পায়ের তলার মাটি যেন সামান্য কেঁপে উঠল। সে তোতলে উঠে বলল, “ন-না… আপনি বিকেলের পর থেকে কিছু খাননি। বড় আম্মা আপনাকে ডাকতে বললেন…”
“বড় আম্মা ডাকতে বলেছেন, নাকি তুই নিজের চোখের সামনে আমার ওই রাগী মুখটা দেখতে এসেছিস?”
আরযান আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। জানালার আলোয় তার চশমা ছাড়া চোখ দুটো স্ফটিকের মতো জ্বলজ্বল করছে। সে ধীর পায়ে সাঁঝের দিকে হেঁটে আসতে লাগল। সাঁঝ অজান্তেই এক পা এক পা করে পেছাতে লাগল, কিন্তু পেছানোর জায়গা বেশি ছিল না। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকতেই সাঁঝ আটকে গেল।
পর মুহূর্তেই আরযান তার দুই হাত দিয়ে সাঁঝের মাথার দু’পাশে দেওয়ালে ভর দিয়ে তাকে একদম নিজের দেহের কড়া খাঁচায় বন্দি করে ফেলল। দুই দেহের দূরত্ব এখন শূন্যের কোঠায়। সাঁঝের বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আরযানের শরীর থেকে আসা সেই চেনা দামী পারফিউমের তীব্র সুবাস আর তপ্ত নিঃশ্বাস সাঁঝের মগজকে মুহূর্তে অসাড় করে দিল।
“বিকেলে সবার সামনে তোর হাতটা ধরে যখন কথাটা বললাম তখন তোর অত হাত কাঁপছিল কেন? ভয় লাগছিল? নাকি বুক ঢিপঢিপ করছিল?”
সাঁঝ লজ্জা আর আতঙ্কে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। “আপনি… আপনি সবার সামনে ওভাবে হাত ধরলেন কেন? আর ওই কথাগুলো…”
“কোন কথাগুলো?” আরযান নিজের এক হাতের আঙুল দিয়ে সাঁঝের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল, “যে আমার জীবনে অন্য কোনো নারীর অধিকার নেই? এই সত্যিটা কি এখন নতুন করে শোনানোর কিছু আছে, সাঁঝ?”
সাঁঝের পলক কাঁপছে। সে চোখ খুলে আরযানের গভীর সেই চোখের দিকে তাকাল। যে মানুষটাকে পুরো মীর পরিবার এক নামে ‘হিটলার’ বলে ভয় পায়, যে মানুষটা অর্গানিক কেমিস্ট্রির কঠিন বিক্রিয়া ছাড়া কিছু বোঝে না সেই মানুষটার সামনে আজ সে প্রথমবার অন্য কোনো কারনে এমন করে কাপছে।
“চিকু ভুল কিছু বলেনি।” আরযান কাছে এসে সাঁঝের হাত ধরে। সেই স্পর্শে সাঁঝের পুরো শরীরে এক হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল। তার হাত দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আরযানের চওড়া শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। সে চোখ বন্ধ করে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আপনি বড্ড খারাপ, আরযান ভাইয়া… আমাকে এভাবে তিলে তিলে মারেন কেন?”
“তোর এই অনুভূতির নাম যদি মরণ হয়, তবে তোকে সারাজীবন এভাবেই মারব,”

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। পুরো তালুকদার বাড়ি নিঝুম শান্ত। লোডশেডিং শেষ হলেও কারেন্ট বিল বাঁচানোর জন্য আলাউদ্দিন সাহেব মেইন সুইচ থেকে পুরো বাড়ির লাইন কেটে দিয়েছেন! তেজ আর আর্যা তীব্র গরমে আর সাপের ভয়ে খাটের ওপর জড়সড় হয়ে বসে আছে। তেজের পেটের ভেতর তখন ক্ষিধের চোট্ট বিকট শব্দ হচ্ছে। দুপুরে সেই হাড্ডি চোষা আর নীল স্যালাইন খাওয়ার পর থেকে তার পেটে এক দানা খাবারও পড়েনি! “আর্যা… আমি আর পারছি না,” তেজ পেটে হাত দিয়ে কাতর গলায় বলল, “আমার পেটে ডাইনোসর ডাকছে। রান্নাঘরে কি কিছু পাওয়া যাবে?”
আর্যা কান্নাকাটি করার মতো মুখ করে বলল, “তেজ, রান্নাঘরে গিয়ে লাভ নেই। আব্বু সব সিন্দুকে আর ফ্রিজে প্রকাণ্ড দুটো তালা মেরে চাবি নিজের বালিশের নিচে নিয়ে ঘুমায়!”
“তালা মেরে ঘুমায়?!” তেজ অবাক!
“হ্যাঁ! তুহিন যেন মাঝরাতে উঠে কিছু চুরি করে না খেতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা!”
তেজ আর সহ্য করতে পারল না। “আমি এই বাড়িতে আর এক সেকেন্ডও থাকব না! চলো, এখনই আমরা ঢাকা ফিরব!”
“এখন? মাঝরাতে?”
“হ্যাঁ! মাঝরাতে! এখানে থাকলে কাল সকালে আমি ক্ষিধেয় আর গরমে কঙ্কাল হয়ে যাব!”
তেজ আর আর্যা চুপিচুপি নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে খালি পায়ে করিডোর ধরে দরজার দিকে এগোতে লাগল।
কিন্তু আলাউদ্দিন তালুকদার সাহেবের ছ্যাঁচড়ামির শেষ যে এখানেই নয়, তা তেজ কল্পনাও করতে পারেনি!
করিডোর পার হওয়ার সময় তেজের পা গিয়ে পড়ল মেঝেতে পেতে রাখা কিসের ওপর যেন! বিকট শব্দে সারা বাড়ি কেঁপে উঠল! তেজ নিচে তাকিয়ে দেখল, আলাউদ্দিন সাহেব কারেন্ট বিল বাঁচানোর সাথে সাথে চোর ধরার জন্য করিডোরের মেঝেতে সার সার পুরোনো পিতলের থালা আর খালি টিনের কৌটা সাজিয়ে রেখে দিয়েছেন! সামান্য ধাক্কা লাগলেই যেন বিকট অ্যালার্ম বাজে!
মুহূর্তের মধ্যে ঘরের সব আলো জ্বলে উঠল। আলাউদ্দিন সাহেব মেইন সুইচের কাছেই শুয়ে ছিলেন আলাউদ্দিন তালুকদার হাতে প্রকাণ্ড একখানা বাঁশের লাঠি নিয়ে দৌড়ে বের হয়ে এলেন। পেছনে শাশুড়ি আমেনা বেগম হাতে ঝাড়ু আর শালা তুহিন হাতে ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে হাজির!
“চোর! চোর! আমার বাড়ি থেকে টাকা চুরি করতে এসেছে!” আলাউদ্দিন সাহেব চিল্লাতে লাগলেন।
কিন্তু সামনে তাকাতেই সবাই স্তব্ধ!
বড় দুলাভাই তেজ আর বড় মেয়ে আর্যা হাতে ব্যাগ নিয়ে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে!
আলাউদ্দিন সাহেব লাঠি নামিয়ে চশমাটা ঠিক করে বললেন, “আরে! তেজ বাবাজি? তুমি মাঝরাতে ব্যাগ হাতে নিয়ে থালাবাসন ভেঙে কী করছ?”
তেজ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে হাত দুটো জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলল, “শ্বশুরমশাই! আমাকে ক্ষমা করুন! আপনার স্যালাইন-শরবত, কোলেস্টেরল-মুক্ত হাড্ডি, থালাবাসন ধোয়ার শ্যাম্পু, তালপাতার পাখা আর গোখরো সাপ সবকিছুকে আমার শেষ সালাম!”
তুহিন সামনে এগিয়ে এসে তেজের পায়ের কাছে রাখা ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে বলল, “দুলাভাই! যাচ্ছেন যান, কিন্তু আমার মিষ্টির কার্টনটা তো রেখে যান!”
তেজ ব্যাগ থেকে মিষ্টির দ্বিতীয় কার্টনটা বের করে সোজা তুহিনের মুখের ওপর ছুঁড়ে দিল।
“এই নাও তোমার মিষ্টি! আর শুনুন শ্বশুরমশাই, আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি, আমার গাড়ির পেট্রোল আমার বাবার টাকায় কেনা! আপনার কোনো কারেন্ট বিল আমি খরচ করিনি!”
তেজ আর্যার হাত ধরে এক টানে দরজার বাইরে নিয়ে এলো।
আলাউদ্দিন সাহেব পেছন থেকে দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, “আরে তেজ বাবাজি! শোনো শোনো! যাওয়ার সময় গেটটা ভালো করে আটকে দিয়ে যাও! বাইরের লাইটের সুইচটা নিভিয়ে যেও! কারেন্ট বিল উঠতাছে!”
চলবে? See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply