#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#পর্ব_৪৯
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
আজ শহরের উপকণ্ঠে এক সুবিশাল মাঠে আয়োজিত হয়েছে বার্ষিক কৃষক ও শ্রমিক সমাবেশ” এলাকার গণ্যমান্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেখানে। মীর পরিবারের পক্ষ থেকেও আব্রাজকে প্রধান বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। তবে আয়োজকদের বিশেষ অনুরোধ ছিল মীর পরিবারের বউ, অর্থাৎ নৈশিকেও যেন এই জনসেবামূলক কাজে আব্রাজের পাশে দেখা যায়।
সকাল থেকেই বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে সবার মধ্যে বিষয়টা নিয়ে ভীষণ উৎসাহ- উদ্দীপনা। কিন্তু পুরো বাড়ির উৎসাহের পারদ একদিকে, আর আব্রাজের মানসিক প্রস্তুতি অন্যদিকের মেরুতে!
নিজের সুবিশাল ঘরের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আব্রাজ মীর। তার পরনে আজ দামি ব্র্যান্ডের কোনো ইতালি স্যুট-প্যান্ট নেই। তার বদলে সে পরেছে একবারে তুষারশুভ্র ঝকঝকে সুতির সাদা পাঞ্জাবি এবং তার সঙ্গে একটা গাঢ় সবুজ রঙের লুঙ্গি। গলায় অত্যন্ত নিখুঁত ভঙ্গিতে ঝোলানো একটা পাতলা সুতি গামছা। মাথার পরিপাটি চুলগুলো নিখুঁতভাবে আঁচড়ানো। আয়নায় নিজের ওপর-নিচ প্রতিবিম্ব দেখে আব্রাজ আত্মতুষ্টির সঙ্গে কয়েকবার মাথা নাড়ল।
“হুম।”
তারপর নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় মহড়া দিতে শুরু করল,
“আজ আমি শুধুই একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ নই। আজ আমি শ্রমিকের ভাই, কৃষকের প্রিয় বন্ধু এবং মেহনতি মানুষের জলন্ত কণ্ঠস্বর!”
ঠিক তখনই পেছন থেকে নৈশির টিপ্পনি কাটা গলা ভেসে এলো, “আর আপনার ওই দুলতে থাকা লুঙ্গির কী খবর?”
আব্রাজ ঝটকা মেরে পেছনে ঘুরে তাকাল। দরজার কাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নৈশি। পরনে অতি সাধারণ কিন্তু দৃষ্টিনন্দন হালকা রঙের সুতি শাড়ি, হাতে একটা ছোট পার্স। তার মুখে এমন এক খিলখিল হাসি লেপটে আছে। আব্রাজ এক হাত বুকের ওপর রেখে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“লুঙ্গি নিয়ে এই তুচ্ছ হাসাহাসি কেন, নৈশি?”
নৈশি হাসি চেপে ঘরে ঢুকে বলল, “হাসছি না তো! ভাবছি, যে মানুষটা জীবনভর ব্লেজার আর স্যুট-প্যান্টের ভাজে অভ্যস্ত, সে হঠাৎ এই লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে নিজেকে আয়নায় চিনে উঠতে পারছে তো? নাকি আয়নার মানুষটাকেও অন্য কেউ মনে হচ্ছে?”
আব্রাজ ঘাড়ের গামছাটা অত্যন্ত কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে ঠিক করতে করতে বলল, “আজকের এই বিশাল জনসভার মূল থিম বা সারমর্মই হলো সাধারণ মানুষের একদম গভীরে মিশে যাওয়া। তাদের পোশাকই আমার পোশাক।”
নৈশি এক পাশের ভ্রু ওপরে তুলল। “সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হতে লুঙ্গি পরতে হয়? বাহ্!”
“অবশ্যই। এটাই রাজনীতির মূল শেকড়।”
নৈশি মুখে সিরিয়াস ভাব এনে বলল, “তাহলে তো কাল থেকে আমিও কিচেনে গিয়ে রান্নাঘর সামলাতে শাড়ির বদলে লুঙ্গি পরব! একাত্ম হওয়া বলে কথা!”
আব্রাজ এক মুহূর্ত গম্ভীর চোখে নৈশির দিকে তাকিয়ে থেকে ঠাণ্ডা গলায় বলল, “তুমি চাইলে ওয়াড্রব থেকে আমার একটা স্পেয়ার লুঙ্গি নিয়ে ট্রাই করতে পারো।”
নৈশি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। “আপনার সঙ্গে কথা বলাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভুল। ভালো কথা আপনি থেকে তুমিতে বদলি করলেন যে?”
“অনেক কিছু চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। আপনি করে বলল মনে হয় অন্যের বউয়ের সাথে পরকীয়া করছি, আর তুমি করে বললে মনে হয় নিজের বউয়ের সাথে বিক্রিয়া করছি।”
“নির্লজ্জ!”
ঠিক তখনই দরজায় হালকা কড়া নাড়ার শব্দ হলো। সামির ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে হাঁক দিল, “স্যার, কনভয় আর ড্রাইভার রেডি…” কথাটা শেষ না করতেই আব্রাজকে ওই অবস্থায় দেখে সামিরের মুখের কথা মুখে আটকে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে হা করে আব্রাজের দিকে তাকিয়ে রইল। আব্রাজ চোখ ছোট ছোট করে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এমন অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছিস কেন? কী হয়েছে?”
সামির কষ্ট করে হাসি চেপে মুখ বিকৃত করে বলল, “কিছু না, স্যার…”
“সোজা বল, সামির।”
“স্যার… মানে… আপনাকে আজকে এত নিখুঁত ‘জনগণ’ লাগছে যে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি!”
নৈশি এবার আর কোনো সৌজন্যতার খাতিরে হাসি ধরে রাখতে পারল না। সে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল। আব্রাজ সামিরকে এক কঠিন ধমকের চাহনি দিয়ে বলল,
“ফাজিলামি বন্ধ কর চুদির ভাই! সামির, আজকের সেই মহা-গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তৃতার ড্রাফট ফাইলটা এনেছিস?”
সামির দ্রুত বুক পকেট আর হাত নেড়ে একটা মোটা নীল রঙের ফাইল আব্রাজের দিকে বাড়িয়ে দিল।
“জি! একদম নিখুঁত ফন্টে প্রিন্ট করে এনেছি। কোনো ভুল থাকার সুযোগই নেই।”
আব্রাজ ফাইলটা হাতে নিয়ে গম্ভীরভাবে পাতা উল্টে বলল, “ভালো। আজকের সমাবেশে হাজার হাজার মিডিয়া আর সাধারণ মানুষ থাকবে। কোনো ভুল যেন না হয়।”
সামির নিজের বুকে হাত দিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
“চিন্তার কোনো কারণই নেই, স্যার! ভাষণটা আমি নিজে গতকাল রাতে টানা তিনবার রিভিশন দিয়ে পড়ে দেখেছি। পানির মতো মুখস্থ!”
নৈশি তখনো একপাশে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসছিল। সামিরের কথা শুনে সে মুচকি হেসে বলল, “সামির ভাই, আপনি কি সত্যিই ওই ভাষণটা তিনবার পড়েছেন?”
“জি ম্যাডাম! একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।”
নৈশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল, “তাহলে আজকের দিনে স্বয়ং আল্লাহ যেন আপনাকে আর আপনার স্যারকে হেফাজত করেন!”
সামির ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, “কেন ম্যাডাম? আমি তো সব ঠিকঠাক করেছি!”
নৈশি করুণ হেসে বলল, “কিছু না, সময় হলেই টের পাবেন।”
প্রায় এক ঘণ্টা পর আব্রাজদের বিশাল গাড়ির বহর গিয়ে পৌঁছাল শহরের উপকণ্ঠের সমাবেশস্থলে। গ্রাম আর শহরের মাঝামাঝি বিশাল এক খোলা মাঠে অগণিত মানুষের সমুদ্র। বাঁশের খুঁটি আর লাল-নীল কাপড় দিয়ে বিশাল আকারের এক রাজকীয় মঞ্চ বানানো হয়েছে। মঞ্চের ওপর টাঙানো হয়েছে বড় বড় ব্যানার। সামনে হাজার হাজার চেয়ার পাতা, যার একপাশে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন গ্রামের কৃষকেরা, আর অন্যপাশে নানা মিল-কারখানার শ্রমিকেরা। মাঠের চারপাশের মাইকগুলোতে কানফাটা আওয়াজে বারবার ঘোষণা চলছে,
“সম্মানিত উপস্থিতি! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের মাঝে পদার্পণ করবেন আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষন, তরুণ জননেতা মীর আব্রাজ রোদ!”
আব্রাজের কালো সুপরিচ্ছন্ন গাড়িটা এসে থামতেই স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের মাঝে শোরগোল পড়ে গেল। তারা ছুটতে ছুটতে গাড়ি ঘিরে ফেলল। “আসসালামু আলাইকুম, আব্রাজ ভাই!”
“আব্রাজ ভাই এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে!”
আব্রাজ গাড়ি থেকে নেমে অতি বিনীত হাসিতে সবার দিকে হাত নাড়ল। একজন বর্ষীয়ান স্থানীয় কর্মী আব্রাজের লুঙ্গি আর গামছার দিকে তাকিয়ে আবেগাপ্লুত গলায় বলল, “ভাইরে ভাই! আজ আপনাকে একদম আমাদের মাটির মানুষের মতো লাগছে!”
আব্রাজ গর্বে বুক ফুলিয়ে গামছাটা ঘাড়ে আরেকটু চেপে ধরে বলল, “মাটির মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে তো মাটির বেশেই আসতে হয়, ভাই।”
পর্দার আড়ালে থাকা নৈশি গাড়ি থেকে নেমে একটু দূরে দাঁড়িয়ে এসব পর্যবেক্ষণ করছিল। সে নিচু গলায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সামিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দেখেছেন সামির ভাই? আজকে উনার মুখ থেকে এমন সব দরদী বাণী বের হচ্ছে, যা উনি নিজের জীবনে কোনোদিন বিশ্বাসও করেন না!”
সামির মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল, “চিন্তা করবেন না ম্যাডাম, ভাষণটা পুরোটাই আমার লেখা। উনি শুধু রিডিং পড়বেন।”
নৈশি কপালে হাত দিয়ে বলল, “আমার ভয়টা তো ঠিক ওইখানেই!”
কিছুক্ষণ পর পুরো মাঠের তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে আব্রাজকে মঞ্চে আসন গ্রহণ ও ভাষণ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হলো। হাজার হাজার মানুষের হাততালির শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। আব্রাজ সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে মঞ্চের ডায়াসের সামনে এসে মাইক্রোফোনটা একটু উঁচিয়ে ঠিক করে নিল। সামির নিচ থেকে অতি তত্পরতার সাথে ফাইলের প্রথম পাতাটা খুলে আব্রাজের চোখের সামনে তুলে ধরল। আব্রাজ চোখের চশমাটা ঠিক করে, কাগজের দিকে গম্ভীর ভঙ্গিতে তাকিয়ে মাইকে হাঁক দিল,
“প্রিয় কৃষক ভাইয়েরা, আমার প্রাণপ্রিয় শ্রমিক ভাইয়েরা এবং সামনে বসে থাকা আমার পরম সম্মানিত… উম…”
হঠাৎ আব্রাজ থেমে গেল। কাগজের দিকে চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকাল। সামিরের হাতের লেখা এতই অদ্ভুত আর বিদঘুটে যে, আব্রাজ প্রথম লাইনের শব্দটাই ঠিকমতো পড়তে পারল না। সে আবার গম্ভীর মুখে মাইক্রোফোনে বলল,
“…আমার পরম সম্মানিত চেয়ার-টেবিলসমূহ!”
এক মুহূর্তে পুরো মঞ্চ আর মাঠের মধ্যে নীরবতা নেমে এলো! মঞ্চের ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সামিরের মুখের রক্ত যেন নিমেষেই হিম হয়ে গেল! সে চোখের পলকে নিজের চুল খামচে ধরে নিচু গলায় ফিসফিসিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“স্যার! স্যার! চেয়ার-টেবিল না! ওটা ‘জনগণ’! আমি স্ট্যাপল করার জায়গায় হিজিবিজি লিখে ফেলেছিলাম!”
আব্রাজ মুহূর্তের মধ্যে নিজের ভুল বুঝতে পেরে হালকা গলা ঝেড়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করল,
“হুম! অর্থাৎ… আমার পরম সম্মানিত চেয়ার-টেবিলে উপবিষ্ট সচেতন জনগণ!”
মাঠের সাধারণ মানুষ প্রথমে হতবাক হলেও, পর মুহূর্তেই বিশাল এক হাসির রোল উঠল। নিচে বসে থাকা নৈশি নিজের মুখ দুই হাতে চেপে ধরে মাথা নিচু করে ফেলল, যাতে তার অদম্য হাসি কেউ দেখে না ফেলে। আব্রাজ নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে গম্ভীর মুখে আবার কাগজের দিকে তাকাল এবং পড়ার গতি বাড়াল, “কৃষক হলো আমাদের সোনার দেশের মেরুদণ্ড। আর এই যে ঘামে ভেজা শ্রমিক ভাইয়েরা, তারা হলো আমাদের এই দেশের… উম… হাঁটুর হাড়!”
সামিরের চোখের মণি কপালে উঠে গেল! সে আতঙ্কে প্রায় মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়! সে নিচ থেকে গলা ফাটিয়ে ফিসফিস করল, “স্যার! হাঁটুর হাড় না! ওটা ‘অর্থনীতি’! আমি ‘অর্থনীতি’ বানানটা একটু পেঁচিয়ে লিখেছিলাম!”
আব্রাজ থামল। নিজের ভুলটা ধরে ফেলে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে গলার স্বর আরও উঁচিয়ে বলল,
“হ্যাঁ! শ্রমিকেরা হলো আমাদের হাঁটুর হাড়ের মতো শক্তিশালী অর্থনীতি! কারণ হাঁটুর হাড় শক্ত না থাকলে যেমন দাঁড়ানো যায় না, অর্থনীতি ছাড়াও দেশ চলতে পারে না!”
কথার এই অদ্ভুত প্যাঁচে উপস্থিত জনতা বিভ্রান্ত হলেও সাময়িক জোশে বিশাল তালি বাজিয়ে উঠল।
আব্রাজ মনে মনে নিজের উপস্থিত বুদ্ধির জন্য নিজেকে একটা ধন্যবাদ দিল। সে এবার দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে পরের চরণ পড়তে লাগল,
“যে কৃষক রোদের মধ্যে পুড়ে সোনার ধান ফলায়, সে আমাদের দেশের সোনালী ভবিষ্যৎ। আর যে শ্রমিক হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে কারখানায় ঘাম ঝরায়, সেই ঘাম শুকানোর পূর্ণ দায়িত্ব আমাদের এই সরকারের… উম… সরকারের…”
আবার আটকে গেল আব্রাজ। সামির নিচ থেকে চোখ দুটো গোল গোল করে আকুল আকুতি জানিয়ে ফিসফিস করল, “স্যার! ‘সম্মান’! ঘাম শুকানো পর্যন্ত তাদের ‘সম্মান’ প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব!”
আব্রাজ একদম না বুঝে অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে মাইকে চেঁচিয়ে বলল, “সেই শ্রমিকের ঘাম শুকানোর দায়িত্ব আমাদের সরকারের সম্মান!”
সামির নিজের দুই হাত দিয়ে পুরো মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়ল। নৈশি এবার আর কোনো কায়দাতেই নিজের হাসি আটকাতে পারল না। সে পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে প্রায় বেঞ্চ থেকে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মাঠের সাধারণ মানুষ আব্রাজের এই কঠিন কঠিন রূপক অর্থযুক্ত বাণীর কিছুই না বুঝলেও গলার তোজ দেখে ঘন ঘন হাততালি দিয়েই যাচ্ছে! আব্রাজ ভাবল, ভাষণটা ইতিহাসের সেরা ভাষণ হচ্ছে। সে বেশ গর্বের সাথে খাতার পরের পাতা উল্টাল।
“আমরা শপথ করছি, আজ থেকে আমরা কৃষকের সোনার ধানকে সরাসরি টাকায় পরিণত করব…”
সামির নিচ থেকে লাফিয়ে উঠে চোখ বড় বড় করে তাকাল, “স্যার! ওটা ‘ধানকে সোনায়’ না, ওটা ছিল ‘কৃষকের অধিকারকে বাস্তবে’ পরিণত করব!”
আব্রাজ এক মুহূর্ত থেমে গিয়ে গামছাটা ঘাড়ে একটু ঝাড়া দিয়ে বলল, “অবশ্যই! আমরা কৃষকের ধান ও অধিকারকে সুষম সোনায় পরিণত করব!”
মাঠ আবার মুহুর্মুহু হাততালিতে ফেটে পড়ল। সামির দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে জ্যান্ত লাশের মতো দাঁড়িয়ে রইল, আর নৈশি দূর থেকে সামিরের এই করুণ দশা দেখে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। বক্তৃতার প্রায় মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে আব্রাজ রাজনীতিবিদের আসল আবেগে ভেসে গেল। সে মাইক্রোফোনটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে বলতে লাগল,
“ভাইয়েরা আমার! আমি আজ আপনাদের সামনে কেবল একজন সুযোগসন্ধানী রাজনীতিবিদ হিসেবে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে আসিনি। আমি এসেছি আপনাদেরই অতি পরিচিত একজন সাধারণ নিঃস্ব মানুষ হিসেবে…”
জনতার মধ্যে ব্যাপক শোরগোল আর করতালির তোড়জোড় শুরু হলো। আব্রাজ আবেগাপ্লুত হয়ে ঘাড়ের গামছাটা একটু নেড়ে বলল,
“আমি ঠিক আপনাদের মতোই এক অতি সাধারণ মাটির…”
ঠিক তখনই ঘটল প্রথম দুর্ঘটনাটা! আব্রাজ আবেগের ঠেলায় পা দুটো একটু সরাতে গিয়েই টের পেল তার পরা নতুন সুতির সবুজ লুঙ্গিটার নিচের একটা বড় কোণা, কাঠের মঞ্চের পেরেক বেরিয়ে থাকা একটা ধারালো অংশে শক্তভাবে আটকে গেছে! আব্রাজ আচমকা থেমে গেল। সে চোখ নিচু করে নিজের পায়ের দিকে তাকাল। সাবধানে অতি সূক্ষ্মভাবে ডান পা টা একটু পেছনে নিতে গেল। কিন্তু তাতেই ঘটে গেল বিপত্তি লুঙ্গি আরও শক্তভাবে টান খেয়ে খুলে আসার একদম শেষ সীমায় পৌঁছে গেল! আব্রাজের অভিজ্ঞ চোখ দুটো পলকে ছানাবড়া হয়ে গেল! সামির নিচ থেকে আব্রাজের পায়ের এই ভয়াবহ দুলুনি আর লুঙ্গির টানটান অবস্থা দেখে মুহূর্তেই বুঝতে পারল ব্যাপারটা কত দূর গড়াতে পারে। সে কোনো কিছু না ভেবেই এক লাফে মঞ্চের পেছনের দিক দিয়ে ওপরে উঠে এলো।
“স্যার!”
আব্রাজ দাঁতে দাঁত চেপে, ঠোঁট না নেড়ে ফিসফিস করে বলল, “সামির… কালপ্রিট…”
“জি, জি স্যার?”
“কিছু একটা কর… জলদি!”
“কী হয়েছে স্যার? লুঙ্গি কি…?”
আব্রাজ চোখ দিয়ে নিজের নিচের দিকে ইঙ্গিত করে হিসহিসিয়ে বলল, “এটা শুধু লুঙ্গি নয়, এটা আমার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের জাতীয় বিপর্যয়! ধরে টান দিলে আজ পুরো মিডিয়া কভার করবে!”
সামির চোখের পলকে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করল। সে অত্যন্ত চালাকির সাথে আব্রাজের পাশ কাটিয়ে সোজা মাইক্রোফোনের সামনে এসে হাত তুলে চিৎকার করে বলল, “সম্মানিত উপস্থিতি! আপনারা আমাদের প্রিয় নেতার এই কালজয়ী বক্তব্যের সমর্থনে সবাই জোরসে একটা হাততালি দিন!”
পুরো মাঠ একযোগে বিকট শব্দে হাততালি দিতে শুরু করল। সেই প্রচণ্ড শব্দের সুযোগে সামির দ্রুত আব্রাজের হাঁটু গেড়ে পেছনে বসে পড়ল এবং পেরেক থেকে লুঙ্গির সুতোটা অতি সাবধানে, দ্রুত গতিতে ছাড়িয়ে দিল।
আব্রাজ ভেতরে ভেতরে কালঘাম ছুটে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাঁচল। সামির নিচু হয়ে ওঠার সময় আব্রাজের কানে কানে ফিসফিস করল,
“স্যার, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলছি… আজকে পর থেকে দয়া করে আপনার ‘লুঙ্গি-রাজনীতি’ চিরতরে বন্ধ করুন!”
আব্রাজ রাগে দাঁত কিটমিট করে বলল, “চুপ কর হারামী! নিচে নাম!”
সামির দ্রুত নেমে গেল। আব্রাজ আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাইকটা হাতে নিল। “হ্যাঁ! তো যা বলছিলাম… যেখানে কৃষকের প্রকৃত অধিকার আর সম্মান…”
ঠিক ওই মুহূর্তে, মাথার ওপরের খোলা আকাশ থেকে উড়ে এসে একটা বিশাল কালচে কাক মঞ্চের পাশে টাঙানো মূল ব্যানারের ওপরে এসে বসল। কাকটা মাথাটা একপাশে ব্যাঁকা করে, অত্যন্ত কৌতূহলী চোখে আব্রাজের এই অদ্ভুত রাজনৈতিক অভিনয় দেখতে লাগল। আব্রাজ সম্পূর্ণ নিজের জগতে ডুবে গিয়ে হাত নেড়ে বলতে লাগল,
“আমি দিনমজুর শ্রমিকের ভেতরের অসীম কষ্ট বুঝি…”
কাকটা ব্যানার থেকে এক চোখ গোল করে ডেকে উঠল, “কা কা কা কা।”
আব্রাজ থমকাল না, আবেগের পারদ আরও বাড়িয়ে বলল, “আমি রোদে পোড়া কৃষকের গায়ের প্রতিটি ফোঁটা ঘামের মূল্য বুঝি…”
কাকটা আবার মাথা ঝাঁকাল। এবং ঠিক তার পর মুহূর্তেই উপর থেকে এক ফোঁটা তরল বস্তু এসে সোজা আব্রাজের পাঞ্জাবির বাম কাঁধের ওপর একদম নিখুঁত নিশানায় পতিত হলো! আব্রাজের কথার খই ফোটা নিমেষেই বন্ধ হয়ে গেল। পুরো মাঠে এক মুহূর্তের নীরবতা। সাধারণ মানুষজন বুঝতে পারল না হঠাৎ নেতা থামলেন কেন। আব্রাজ আস্তে করে তার চোখের মণি দুটো বাম দিকে ঘুরিয়ে নিজের কাঁধের দিকে তাকাল। কাকটা ততক্ষণে তার কাজ শেষ করে ডানা ঝাপটে উড়ে চলে গেছে। আব্রাজের ঝকঝকে সাদা পাঞ্জাবির কাঁধে এখন এক বিশাল সাদা-কালো দাগ দৃশ্যমান! মঞ্চের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সামির দৃশ্যটা দেখে মুখের ভেতর হাসি চেপে রাখতে না পেরে ফিসফিস করে বলল,
“স্যার… পরিবেশের পাখিটাও আপনার বক্তব্যে সম্পূর্ণ একমত হয়ে নিজস্ব মতামত পেশ করে গেল!”
আব্রাজ নিচু, ভয়ানক ঠাণ্ডা গলায় বলল, “সামির… তুই যদি আর একটা শব্দ করবি, তোকে আমি এই মাঠেই পুঁতে ফেলব।”
কিন্তু সামির তখন অন্য ধান্দায়। সে তার স্যারের এই বিশ্রী অবস্থা থেকে তাকে বাঁচাতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠল।
পকেট থেকে টিস্যু বের করতে গিয়ে সে হঠাৎ দেখতে পেল মঞ্চের পাশে ভিআইপি অতিথিদের টেবিলে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপ রাখা। সেই কাপের ভেতরে ধবধবে সাদা ঘন এক পদার্থ। সামির মনে মনে ভাবল, “আহা! আয়োজকরা নির্ঘাত অতিথিদের জন্য দামি ভ্যানিলা আইসক্রিম রেখে গেছে!
সামির কোনো কিছু না ভেবেই চট করে নিজের শাহাদাত আঙুলটা সেই কাপের ভেতরে ডুবিয়ে দিল। তারপর আঙুলের মাথায় ওঠা ঘন সাদা অংশটা একটু পরখ করতে সোজা নিজের জিবের ওপর ছুঁইয়ে দিল
হঠাৎ সামিরের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো! তার মুখের পুরো রঙ এক লহমায় নীল থেকে হলুদ হয়ে গেল!
“ওয়াক্! থু… থু…”
সামির বিকট শব্দ করে জিভ বের করে হাত দিয়ে মুখ ডলতে লাগল। তার পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়ি যেন একযোগে উল্টে আসছে! আব্রাজ ভাষণ মাঝপথে থামিয়ে, চশমার ওপর দিয়ে সামিরের এই পাগলামি দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
“কী হয়েছে তোর? নাটকের নতুন কোনো অঙ্ক?”
সামির মুখ বিকৃত করে, চোখে পানি এনে কেঁদে ফেলার মতো ভঙ্গিতে বলল, “স-স্যার… ওটা আইসক্রিম ছিল না… ওয়াক্!”
আব্রাজ নিজের কাঁধের দিকে আর টেবিলের ওই কাপটার দিকে পর্যায়ক্রমে তাকিয়ে বলল, “তাহলে ওটা কী ছিল?”
সামির মুখে এমন এক বীভৎস অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলল, যেন সে মাত্র এই পৃথিবীর চরমতম কোনো অভিশাপ নিজের মুখে গ্রহণ করেছে! সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “স্যার… কাপের ওটা দেখি অদ্ভুত স্বাদের।”
আব্রাজ এক মুহূর্তে পুরো কেস বুঝে গেল! “তুই… তুই শেষ পর্যন্ত কাকের গু… চেটেছিস?!”
সামির নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে চোখে জল নিয়ে মাথা নাড়ল, “আমি আইসক্রিম মনে করেছিলাম স্যার! কত সুন্দর সাদা দেখাচ্ছিল!”
আব্রাজ নিজের বিরক্তি আর রাগের চরম সীমায় পৌঁছে ফিসফিসিয়ে বলল, “তুই কপালপোড়া রাজনৈতিক সহকারী নাকি গবাদিপশু? আইসক্রিম আর কাকের গু-এর তফাত বুঝিস না?”
সামির আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে সোজা দৌড় দিয়ে মঞ্চের এক কোণায় গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বমি করার বিকট শব্দ করতে লাগল। দূর থেকে পুরো নাটকটি প্রত্যক্ষ করে নৈশি দুই হাত দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরে বেঞ্চে বসে পড়ল। তার হাসি আর কান্নার সীমারেখা বিলীন হয়ে গেছে! এদিকে আব্রাজ মীর সম্পূর্ণ একা। তার বাম কাঁধে কাকের প্রদেয় অমূল্য উপহার, পরনে প্যান্টের বদলে আলগা লুঙ্গি-পাঞ্জাবি, হাতে ভুলভালে ভরা বক্তৃতার ফাইল, আর সামনে হাজার হাজার উৎসুক জনতা। কিন্তু সে তো মীর পরিবারের ছেলে! সে হার মানার পাত্র নয়।
আব্রাজ নিজেকে সামলে নিয়ে, মুখে সেই চিরাচরিত কৃত্রিম রাজনৈতিক হাসি ঝুলিয়ে আবার মাইক্রোফোনের সামনে এগিয়ে এলো। সে গম্ভীর গলায় মাইকে বলল, “প্রিয় কৃষক ও মেহনতি শ্রমিক ভাইয়েরা…”
মঞ্চের কোণ থেকে সামির অতি দুর্বল, নিভু নিভু কণ্ঠে আকুতি জানাল, “স্যার… দোহাই লাগে… আজকের মতো রাজনীতি আর না… চলুন বাড়ি যাই…”
আব্রাজ চোখের কোণ দিয়ে এক চরম হিংস্র চাহনি ছুড়ে দিয়ে নিচু গলায় বলল, “চুপচাপ গাল মুছে দাঁড়িয়ে থাক!”
তারপর আবার জনতার উদ্দেশ্যে ডায়াসে হাত রেখে আব্রাজ বলল, “আজকের এই পবিত্র সমাবেশ থেকে আমি আপনাদের শুধু একটাই শেষ বার্তা দিয়ে যেতে চাই…”
ঠিক তখনই, মাথার ওপরের দূরবর্তী কোনো এক গাছের ডাল থেকে সেই পরিচিত কাকটা আবার বিকট শব্দে ডেকে উঠল। পুরো মাঠের হাজার হাজার মানুষ এবার আর নিজেদের ধরে রাখতে পারল না। তারা একযোগে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হেসে উঠল!
আব্রাজ এক মুহূর্ত গম্ভীর মুখে আকাশের দিকে তাকাল। সে কাকটার অবস্থান লক্ষ্য করল। তারপর শান্ত গলায় মাইকে বলল,
“যাক… অন্তত এটুকু স্পষ্ট হলো যে, এই এলাকার পাখিরাও বিরোধী দলের পেইড এজেন্ট!”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো মাঠ হাসির তোড়ে ফেটে পড়ল! মানুষজন তালি বাজাতে বাজাতে লুটিয়ে পড়ার উপক্রম। নিচে বসে থাকা নৈশি নিজের মাথায় হাত দিয়ে শুধু বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“এই লোকটাকে নিয়ে আমি কোথায় যাবো… খোদা জানেন!”
আর মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে সামির ভেজা টিস্যু দিয়ে জিভ ডলতে ডলতে মনে মনে ভাবল আজকের দিনটা আব্রাজ স্যারের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের নয়, বরং তার নিজের পাকস্থলীর সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ কেয়ামতের দিন!
আজকের সকালটা মীর বাড়িতে যতটা স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছিল, দুপুর গড়াতেই ততটা স্বাভাবিক রইল না। কারণ দুপুর বারোটার দিকে মীর বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে থাকা বড় মায়ের ফোনে একটা কল এলো। বড় মা ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে একজন অত্যন্ত ভদ্র অথচ অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল। “আসসালামু আলাইকুম। আমি সাঁঝের কলেজের অধ্যক্ষ বলছি।”
বড় মা হাসিমুখে বললেন, “ওয়ালাইকুম সালাম। জি স্যার, বলুন।”
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। “সাঁঝের বাবা-মা কি আজ বিকেলে কলেজে আসতে পারবেন?”
বড় মা অবাক হয়ে সোজা হয়ে বসলেন। “কেন? কী হয়েছে?”
অধ্যক্ষ এবার আরও ভারী গলায় বললেন, “আপনি বরং আরযান সাহেবকে পাঠান।”
বড় মা চোখ কপালে তুলে বললেন, “আরযানকে?”
“জি।”
“কিন্তু ও তো সাঁঝের বাবা-মা নয়!”
অধ্যক্ষ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।।”আমরা জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে সাঁঝের বাবা-মায়ের চেয়ে এমন একজন অভিভাবক দরকার, যিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝবেন।”
বড় মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “স্যার… সাঁঝ কী করেছে?”
ওপাশ থেকে এবার এমন একটা দীর্ঘশ্বাস এলো, যেন মানুষটা জীবনে আর কোনোদিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন না। “সেটা কলেজে এলে বলব।”
কল কেটে গেল। বড় মা ফোনটা নামিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। ঠিক তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আরযান। তিনি তাকে দেখে বললেন,
“আরযান?”
“জি মা।””
“আজ বিকেলে সাঁঝের কলেজে যাবি।”
আরযান থেমে গেল।
“কেন?”
বড় মা শুকনো গলায় বললেন,
“ওর বিচার বসেছে।”
আরযান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর চোখ বন্ধ করল।
“আবার?”
বড় মা বললেন, “এবার নাকি ব্যাপারটা একটু বেশি গুরুতর।”
আরযান ঠান্ডা গলায় বলল, “কী করেছে?”
বড় মা মাথা নেড়ে বললেন, “জানি না।”
একটু থেমে যোগ করলেন, “তবে অধ্যক্ষ নিজে ফোন করে তোকে ডাকছেন।”
আরযান এবার বুঝল বিষয়টা সত্যিই বড়। সে খুব শান্তভাবে বলল,
“ঠিক আছে। যাব।”
কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষের বাইরে একটা চেয়ারে বসে আছে সাঁঝ। চেহারায় কোনো ভয় নেই। বরং মুখটা এমন শান্ত, যেন সে কোনো অপরাধই করেনি।
তার পাশে বসে আছে তার বান্ধবী ডালিয়া।
ডালিয়া ফিসফিস করে বলল,
“তুই নিশ্চিত তোকে কলেজ থেকে বের করে দেবে না?”
সাঁঝ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
“না।”
“এত নিশ্চিত কীভাবে?”
“কারণ আমি সাতটা বিষয়েই ফেল করেছি।”
ডালিয়া হতবাক। “এটা আবার ভালো খবর?”
সাঁঝ মাথা নেড়ে বলল, “ফেল করা অপরাধ না।”
“তাহলে?”
সাঁঝ গম্ভীর মুখে বলল, “ফেল করার পর সাতজন শিক্ষককে সাত রকমভাবে বিরক্ত করা অপরাধ।”
ডালিয়া মুখ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। “তুই সত্যিই সাতজনকে কিছু করেছিস?”
সাঁঝ একটু ভেবে বলল, “সাতজন না। অধ্যক্ষ স্যারকেও ধরলে আট।”
ডালিয়া কপালে হাত চাপা দিল। “তুই শেষ!”
সাঁঝ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি জানি।”
অধ্যক্ষের কক্ষের দরজা খুলে গেল। একজন পিয়ন এসে বলল, “সাঁঝ, ভেতরে যাও।” সাঁঝ উঠে দাঁড়াল।
ডালিয়া তার হাত ধরে বলল, “আমি বাইরে থাকব।”
সাঁঝ মাথা নাড়ল। “তুই থাক। আমার যদি জামিন লাগে, তুই ব্যবস্থা করিস।”
“কী দিয়ে?”
“তোর কান্না দিয়ে।”
সাঁঝ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। অধ্যক্ষের বিশাল টেবিলের ওপাশে বসে আছেন অধ্যক্ষ। তার সামনে সাতজন শিক্ষক। সবাইয়ের মুখ এমন গম্ভীর, যেন তারা আজ কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করতে বসেছে। সাঁঝ ঢুকেই চারদিকে তাকাল। তারপর বলল, “আসসালামু আলাইকুম।” কেউ উত্তর দিল না। সাঁঝ আস্তে করে একটা চেয়ার টেনে বসল। অধ্যক্ষ চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। “তুমি জানো, তোমাকে কেন ডাকা হয়েছে?”
সাঁঝ খুব ভদ্রভাবে বলল, “জি স্যার।”
“কেন?”
“আমি সাত বিষয়ে ফেল করেছি।”
অধ্যক্ষ বললেন, “শুধু ফেল করেছ?”
সাঁঝ একটু চুপ করে বলল, “আর কিছু?”
অধ্যক্ষ টেবিলের ওপর হাত চাপড়ে বললেন, “সাঁঝ!”
সাঁঝ সোজা হয়ে বসল। “জি স্যার।”
প্রথম শিক্ষক উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বাংলা পড়ান। উনার মুখ রাগে ও ক্ষোভে একেবারে লাল হয়ে আছে, হাত-পা কাঁপছে।
“স্যার! ফেল করা তো স্রেফ একটা বাহানা! এই মেয়ে পরীক্ষার খাতায় জিরো পেয়ে আমার জীবনে যে তান্ডব চালিয়েছে, তা কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধের চেয়ে কম না!”
অধ্যক্ষ অবাক হয়ে বললেন, “কী করেছে সে?”
বাংলা স্যার পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে থরথর করে কাঁপা হাতে টেবিলের ওপর রাখলেন।
“স্যার! পরশুদিন পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার পর এই মেয়ে কোনোভাবে আমার ফোনটা হ্যাক করেছে বা পিন কোড দেখে হাতিয়ে নিয়েছে! তারপর আমার ফেসবুক আইডি থেকে একটি বিশেষ পোস্ট করে দিয়েছে!”
অধ্যক্ষ চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বললেন, “কী পোস্ট?”
বাংলা স্যার চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যেন কথাটা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতেই উনার গায়ে জ্বর আসছে।
“স্যার… ও আমাদের কলেজের সেই সবচেয়ে কড়া আর রাগী গায়েনোকোলজি বিভাগের প্রধান, ম্যাডাম পারভীনের ছবির নিচে আমার আইডি দিয়ে দীর্ঘ এক কাব্যিক প্রেমের ইশতেহার পোস্ট করিয়ে! শুধু পোস্টই না স্যার, ট্যাগও করেছে!”
ঘরের বাকি ছয়জন শিক্ষক একযোগে চোখ ছানাবড়া করে তাকালেন। একজন শিক্ষক মুখ চেপে হাসি আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। অধ্যক্ষ চশমার ওপর দিয়ে বললেন, “কী লেখা ছিল সেই পোস্টে?”
বাংলা স্যার কাঁপা কাঁপা গলায় পড়তে লাগলেন,
“হে আমার হৃদয়ের ব্যাকরণ! পারভীন, তোমার ওই রাশভারী চশমার আড়ালে যে কোমল হৃদয় লুকিয়ে আছে, তা দেখে আমার বাংলা সাহিত্যের সমস্ত ছন্দ ভুল হয়ে যায়। ব্যাকরণে আমি ফেল মারলেও, তোমার ভালোবাসার ক্লাসে আমি প্রথম বেঞ্চের ছাত্র হতে চাই।
ইতি
তোমার বিরহী খাঁ খাঁ অনুরাগী।”
ঘরে এবার আর কেউ হাসি চেপে রাখতে পারল না। দুই-একজন শিক্ষক কাশি দেওয়ার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। অধ্যক্ষ গম্ভীর হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে বললেন, “তারপর?”
বাংলা স্যার কান্নার সুর তুলে বললেন, “আর বলবেন না স্যার! ম্যাডাম পারভীন তো কলেজে এসে আমার ওপর রাগে একবক্স চক ছুড়ে মেরেছেন! আর সবচেয়ে ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে আমার বাড়িতে!”
“কী ঘটনা?”
“আমার স্ত্রী! উনি ফেসবুকের ওই পোস্ট আর নিচে সাঁঝের কমেন্ট করা “স্যার অবশেষে মনের কথা বলেই দিলেন!’ লেখাটা দেখে মনে করেছেন আমার সত্যি সত্যিই পরকীয়া চলছে! কাল রাতে আমার সাথে তুলকালাম ঝগড়া করে, ঘরের হাঁড়ি-পাতিল ভেঙে, বাপের বাড়ি চলে গেছেন! এখন ডিভোর্সের হুমকি দিচ্ছেন স্যার! আমার ৪০ বছরের ইজ্জত, সংসার সব এই মেয়ে এক পোস্টে শেষ করে দিয়েছে!”
অধ্যক্ষ এবার সাঁঝের দিকে কঠোর চোখে তাকালেন।
“সাঁঝ! তুমি এসব কী করেছ? একজন শিক্ষকের সংসার ভেঙে দিলে?”
সাঁঝ অত্যন্ত নিষ্পাপ ও শান্ত মুখে দুই হাত কোলে রেখে বলল, “স্যার, আমি তো উনাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। স্যার ক্লাসে সবসময় বলতেন, ‘বাংলা সাহিত্য হলো অনুভূতির প্রকাশ।’ আমি ভেবেছিলাম স্যার মুখে বলতে পারছেন না, তাই উনার সুপ্ত অনুভূতিটা একটু প্রকাশ করে দিই! আর স্যারের বউ যে এত তাড়াতাড়ি বাপের বাড়ি চলে যাবে, সেটা তো স্যারের ভাগ্যের দোষ, আমার কী!”
বাংলা স্যার চিৎকার করে উঠলেন, “শোনো কথা! স্যার, এর কঠিন শাস্তি চাই! আমার বউ না ফেরা পর্যন্ত একে কলেজে ঢুকতে দেওয়া যাবে না!”
দ্বিতীয় শিক্ষক উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ইংরেজি পড়ান। ধুতি-কুর্তা পরা লোকটিকে এমনিতে বেশ জেন্টলম্যান মনে হলেও এখন রাগে উনার ফর্সা মুখ বেগুনি রূপ ধারণ করেছে। তিনি সব সময় ভাব নিয়ে একদম নিখুঁত ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে কথা বলেন, আর সুযোগ পেলেই শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বানানের ভুল ধরে অপমান করেন। তিনি ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “স্যার! এই মেয়ের অপরাধের তালিকা শুধু বাংলাতেই সীমাবদ্ধ থাকলে বাঁচতাম! ও আমার ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট আর প্রফেশনাল ইমেজের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে!”
অধ্যক্ষ অবাক হয়ে চশমা ঠিক করলেন। “কী করেছে আপনার সাথে?”
ইংরেজি স্যার গলার টাইটা একটু ঢিল করে বললেন, “স্যার, পরশু দিন ও আমার কাছে এসে খুব আকুতি-মিনতি করে বলছিল, ‘স্যার, ইংরেজিতে একটু পাস করিয়ে দিন।’ আমি তখন ওকে সোজা ভাষায় বলি, “English is a language of dignity. You don’t deserve it!” আর স্যার… ঠিক তার পরদিনই সে এক ভয়ানক জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়ে বসল!”
“কী কাণ্ড?”
স্যার পকেট থেকে কয়েকটা প্রিন্ট করা কাগজ বের করে টেবিলের ওপর ধপাস করে আছড়ে ফেললেন।
“স্যার! ও এআই আর ফটোশপ দিয়ে আমার মেসেঞ্জারের একটা সম্পূর্ণ ফেক চ্যাটের স্ক্রিনশট বানিয়েছে! তারপর সেটা কলেজের সমস্ত নোটিশ বোর্ড, লাইব্রেরি, এমনকি টিচার্স রুমের দরজায় রাতারাতি আঠা দিয়ে টাঙিয়ে দিয়ে এসেছে!”
অধ্যক্ষ অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে কাগজগুলো হাতে নিলেন। বাকি শিক্ষকরাও কৌতূহল সামলাতে না পেরে অধ্যক্ষের চেয়ারের পেছনে গিয়ে উঁকি দিলেন।
কাগজে দেখা যাচ্ছে, ইংরেজি স্যারের প্রোফাইল পিকচার দেওয়া একটা আইডি থেকে কোনো এক ভুয়া ফেসবুক আইডিতে চ্যাট করা হয়েছে। চ্যাটের ভাষাটি ছিল ঠিক এরকম,
“হেই বেব, হাউ ইজ ইউ? আই এম মিস ইউ সো মাচ টুডে। ইউ লুকিং সো বিউটিফুল ইন দিস পিক। মাই হার্ট ইজ ফ্লাইং লাইক বার্ড। আই ওয়ান্ট টু মিট ইউ ইন দা আফটারনুন, উইল ইউ কামস উইথ মি?”*
কাগজটা পড়া মাত্রই ঘরের পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। একজন শিক্ষক মুখ টিপে হাসতে গিয়ে সশব্দে কেসে উঠলেন। ইংরেজি স্যার প্রায় কান্নার সুর তুলে বললেন, “স্যার! দেখছেন কী জঘন্য ইংরেজি? যে মানুষটা সারা জীবন ‘Grammar and Syntax’ শেখাল, সেই মানুষের নামে এমন কাঁচা আর ভুল ইংরেজির চ্যাট বানাল? পুরো কলেজের স্টুডেন্টরা এখন আমাকে দেখে আড়ালে বলছে, ‘সার, হাউ ইজ ইউ?’ আমার তো কলেজে মুখ দেখানোর জো আর নেই স্যার!”
অধ্যক্ষ গম্ভীর মুখে সাঁঝের দিকে তাকালেন। সাঁঝ খুব নিষ্পাপ চোখ করে মাথা নিচু করে বলল, “স্যার, আমি তো সত্যি সত্যিই জানতাম না যে স্যার এত কাঁচা ইংরেজি বলেন। আমি ভেবেছিলাম স্যার হয়তো আবেগ সামলাতে না পেরে ভুল ব্যাকরণ ব্যবহার করে ফেলেছেন…”
ইংরেজি স্যার টেবিল চাপড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তুমি চুপ করবে?! ওই চ্যাটটা তুমি নিজের হাতে বানিয়েছো! তোমার কারণে আমার বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জেন্টলম্যান ইমেজ ধুলোয় মিশে গেছে!”
সাঁঝ একটু মিষ্টি হেসে বলল, “স্যার, আপনিই তো ক্লাসে বলেছিলেন, “English is just a medium of communication!” তা মনের ভাব প্রকাশ হলেই হলো, ব্যাকরণ দিয়ে কী হবে!”
ইংরেজি স্যার রাগে নিজের চুল টেনে ধরে বললেন, “স্যার! একে কলেজ থেকে বের করুন! নয়তো আমি ইস্তফা দেব!”
তৃতীয় শিক্ষক পদার্থবিজ্ঞানের। তিনি স্বভাবতই ভীষণ খিটখিটে আর গম্ভীর মেজাজের মানুষ। ক্লাসে ঢুকলেই ল্যাব আর সূত্র ছাড়া কিছু বোঝেন না। তিনি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “স্যার! এই মেয়ে শুধু ক্লাসের শৃঙ্খলা ভাঙেনি, ও খোদ বিজ্ঞানের অপমান করেছে! আমার সঙ্গে যা করেছে, তা কোনো ছাত্রীর পক্ষে চিন্তা করাও অসম্ভব!”
অধ্যক্ষ চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বললেন, “কী করেছে ও?”
পদার্থবিজ্ঞানের স্যার পকেট থেকে দুটো জিনিস বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন একটি স্প্রে ক্যান আর একটা পোড়া ফিউজ তার। স্যার কপালে হাত দিয়ে বললেন, “স্যার, পরশুদিন ফিজিক্স প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ও জানতে পারে যে ও ফেল করেছে। তারপর ও আমার পার্সোনাল ল্যাবরেটরিতে ঢুকে মহাবিপর্যয় ঘটিয়েছে!”
অধ্যক্ষ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বিপর্যয়?”
স্যার টেবিল চাপড়ে বললেন, “স্যার! আমি ল্যাবে একটা অত্যন্ত মূল্যবান আর স্পর্শকাতর যন্ত্রের সেটআপ করে রেখেছিলাম, ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড’ প্রমাণের জন্য। হাজার হাজার টাকার সেন্সর আর সার্কিট ছিল সেখানে। ও ল্যাবে ঢুকে আমার সেই সর্ট-সার্কিটের মোটোর কালেকশনে ভুলভাল ওয়্যারিং করে হাই-ভোল্টেজ কানেকশন লাগিয়ে দেয়!”
অধ্যক্ষ চোখ ছোট করে বললেন, “তারপর?”
স্যার কান্নার সুর তুলে বললেন, “তারপর আর কী স্যার! আমি ল্যাবে ঢুকে সুইচ অন করতেই পুরো ফিজিক্স ল্যাবে এমন এক বিকট শব্দে থান্ডার-স্টর্ম আর শর্ট সার্কিট হলো যে, আমার মাথার অর্ধেক চুল আর চোখের ভ্রু পুড়ে কোঁকড়া হয়ে গেছে! শুধু তাই নয় স্যার, পুরো কলেজের মেইন ফিউজ উড়ে গিয়ে আধ ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল!”
ঘরে উপস্থিত শিক্ষকেরা হাঁ করে ফিজিক্স স্যারের অর্ধেক পোড়া ভ্রু আর আংশিক কোঁকড়ানো চুলের দিকে তাকালেন। একজন শিক্ষক কোনোমতে নিজের হাসি সামলাতে না পেরে কাশির ভান করে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
অধ্যক্ষ হাত মাথায় দিয়ে বললেন, “সাঁঝ! তুমি এসব কী করেছ? পুরো ল্যাব আর কলেজ অচল করে দিলে?”
সাঁঝ অত্যন্ত নিষ্পাপ ও শান্ত মুখে দুই হাত কোলে রেখে বলল, “স্যার, স্যার তো ক্লাসে সব সময় বলতেন, “ফিজিক্স মানেই থিওরি না, ফিজিক্স হলো প্র্যাকটিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট!” আমি শুধু শক্তি রূপান্তরের পরীক্ষা করছিলাম। বিদ্যুৎ শক্তি যে শব্দ, তাপ আর তীব্র আলো শক্তিতে রূপান্তরিত হয় স্যারকে সেটাই বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছি!”
পদার্থবিজ্ঞানের স্যার চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমাকে কি তুমি ল্যাবের গিনিপিগ পেয়েছো?! আমার ভুরু পুড়িয়ে বিজ্ঞানের পরীক্ষা করছো!”
সাঁঝ চোখের পাতা পিটপিট করে বলল, “স্যার, সায়েন্টিফিক রিসার্চে বড় বড় আবিষ্কারের পেছনে বিজ্ঞানীদের তো একটু-আধটু ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়! আপনার ভুরু তো আবার গজাবে স্যার, কিন্তু এই প্র্যাকটিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট কি আমি কোনোদিন ভুলব?”
পদার্থবিজ্ঞানের স্যার রাগে টেবিল চাপড়ে বললেন, “স্যার! এই মেয়েকে কলেজ থেকে বের না করলে আমি কালকে থেকে ফিজিক্সের বদলে অলৌকিক বিদ্যা পড়াব!”
চতুর্থ শিক্ষক রসায়নের। তিনি টেবিলের ওপর একটা বিশাল রিপোর্ট ফাইল আর একটা ঝাল চানাচুরের খালি ঠোঙা আছড়ে ফেললেন। উনার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে, আর হাতে এখনো অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধ। রসায়ন স্যার রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “স্যার! এই মেয়ে শুধু কেমিস্ট্রি ফেল করেনি, আমার পুরো জীবনের ইজ্জত আর রসায়ন ল্যাবকে এক নিমেষে ধ্বংস করে দিয়েছে!”
অধ্যক্ষ চমকে উঠে বললেন, “কী করেছে ও?”
রসায়ন স্যার কপালে হাত দিয়ে বললেন, “স্যার, পরশুদিন রেজাল্ট দেওয়ার পর ও জানতে পারে যে ও কেমিস্ট্রিতে জিরো পেয়েছে। এরপর কাল সকালে ও খুব মিষ্টি মুখে ল্যাবে এসে আমার টেবিলে একটা সুন্দর কাঁচের বোতল রেখে বলল, “স্যার, এটা আমার নিজের হাতে বানানো কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনের এক বিরল নমুনা! বিশুদ্ধ লিকুইড সালফিউরিক এসিড আর ইথানল মিশ্রণ!’* বোতলের গায়ে বিশালাকার অক্ষরে লাল রঙ দিয়ে লেখা ছিল অতীব বিপজ্জনক রাসায়নিক বিষ! স্পর্শ করা নিষেধ!’”
অধ্যক্ষ চোখ বড় বড় করলেন, “তারপর? আপনি কি ওটা ল্যাবে রেখে দিয়েছেন?”
রসায়ন স্যার কান্নার সুর তুলে বললেন, “রাখব কী স্যার! ওই বিপজ্জনক কেমিক্যাল পুরো কলেজে ছড়িয়ে গেলে মহাবিপদ হবে ভেবে আমি ভয়ে ভয়ে স্পেশাল সেফটি স্যুট, চশমা আর গ্লাভস পরে পুরো আধঘণ্টা ধরে রাসায়নিক সতর্কতার সাথে ওই বোতল খুললাম। তারপর ওটা নিষ্ক্রিয় করার জন্য বহু হাজার টাকার দামি ল্যাব সলিউশন ঢাললাম। ঢালার পর পরীক্ষা করে দেখি… ওটার ভেতরে কেমিক্যাল তো দূরের কথা, ওটা ছিল স্রেফ ঘন ড্রেনের নোংরা পানি আর সাথে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস!”
ঘরে উপস্থিত শিক্ষকেরা হাঁ করে রসায়ন স্যারের দিকে তাকালেন। একজন শিক্ষক মুখ চেপে ধরে হেসেই ফেললেন। রসায়ন স্যার টেবিল চাপড়ে বললেন, “স্যার! ওই বিশ্রী দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি পরীক্ষা করতে গিয়ে আমার পুরো ল্যাবরেটরি আর আমার দামি স্যুট এখন পচা পানির গন্ধে ভরে গেছে! আর সে বাইরে দাঁড়িয়ে চানাচুর খেতে খেতে আমার পুরো কেমিক্যাল নিষ্ক্রিয় করার নাটক দেখছিল!”
অধ্যক্ষ গম্ভীর মুখে সাঁঝের দিকে তাকালেন। সাঁঝ অত্যন্ত নিষ্পাপ চোখ করে বলল, “স্যার, কেমিস্ট্রি ক্লাসে আপনিই তো সব সময় বলতেন, “প্রতিটি এসিডের প্রতিক্রিয়া এবং লেবেলিংয়ের প্রতি রসায়নবিদদের ১০০% সতর্ক থাকা উচিত!’ আমি তো শুধু স্যারের সতর্কতা আর কেমিক্যাল হ্যান্ডলিংয়ের ধৈর্য পরীক্ষা করছিলাম! ড্রেনের পানি যে স্যার এত মনোযোগ দিয়ে রিঅ্যাকশন করাবেন, তা কি আমি জানতাম?”
রসায়ন স্যার চিৎকার করে উঠলেন, “আমাকে দিয়ে তুমি কেমিস্ট্রির ক্লাসে ড্রেনের পানি পরীক্ষা করাবে?!”
জীববিজ্ঞানের শিক্ষকও উঠে দাঁড়িয়ে করুণ চোখে অধ্যক্ষের দিকে তাকালেন। উনার চুলগুলো উস্কোখুস্কো, চোখে চরম আতঙ্কের ছাপ। তিনি কপালে হাত দিয়ে বললেন, “স্যার… আমার কষ্টটা পুরো আলাদা। এই মেয়ে আমার বায়োলজি ল্যাবের এমন এক সর্বনাশ করেছে যে আমি রাতে ঘুমাতে পারছি না!”
অধ্যক্ষ চশমা ঠিক করে বললেন, “বায়োলজি ল্যাবে আবার কী করল?”
বায়োলজি স্যার গলা পরিষ্কার করে বললেন, “স্যার! পরশুদিন প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে আমি ব্যাঙ কাটার গঠন শেখাচ্ছিলাম। সাঁঝ সেখানে জিরো পাওয়ার পর, কাল সকালে ল্যাব সহকারী যখন ল্যাবের ড্রয়ার খোলে… দেখে সেখানে একটা-দুটো নয়, “মেলা থেকে কিনে আনা অন্তত পঞ্চাশটা তাজা, জ্যান্ত আর বিশালাকার সবুজ ডাঙ্গা ব্যাঙ ছেড়ে রাখা হয়েছে!”
অধ্যক্ষ চোখ কপালে তুললেন, “কী বলছ আপনি? পঞ্চাশটা জ্যান্ত ব্যাঙ?!”
বায়োলজি স্যার কান্নার মতো মুখ করে বললেন, “জি স্যার! ওই ড্রয়ার খোলামাত্রই সেই পঞ্চাশটা ব্যাঙ পুরো টিচার্স রুম আর বায়োলজি ল্যাবে লাফাতে শুরু করে! একটা ব্যাঙ সোজা লাফিয়ে আমার মাথার ওপর এসে বসেছিল স্যার! পুরো ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকেরা ভয়ে টেবিলের ওপর উঠে চিৎকার করছিলেন। আর সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো সাঁঝ প্রত্যেকটা ব্যাঙের পিঠে মার্কার দিয়ে লিখে রেখেছিল, ‘বায়োলজি স্যারের প্রিয় নাতি-পুতি!’
ঘরের পরিবেশ এবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। কয়েকজন শিক্ষক আর নিজেদের সামলাতে না পেরে শব্দ করে হেসে উঠলেন। অধ্যক্ষ চরম কষ্টে নিজের গাম্ভীর্য ধরে রেখে বললেন, “সাঁঝ! তুমি বায়োলজি ল্যাবে জ্যান্ত ব্যাঙ ছেড়ে টিচারদের লাফাতে বাধ্য করলে?”
সাঁঝ হাত দুটো সোজা করে অত্যন্ত নম্রভাবে বলল, “স্যার, স্যার ক্লাসে সব সময় বলেন বইয়ের ভেতরের মৃত ব্যাঙ কেটে জীববিজ্ঞান শেখা যায় না, প্রাণীর আসল আচরণ বুঝতে হলে তাদের প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশে দেখতে হয়।’ আমি তো ল্যাবটাকে জীবন্ত অভয়ারণ্য বানিয়ে দিয়েছিলাম! আর স্যাররা যেভাবে টেবিলের ওপর লাফিয়ে উঠছিলেন, আমি তো স্যারদের রিফ্লেক্স অ্যাকশন আর স্নায়ুতন্ত্রের প্র্যাকটিক্যাল টেস্ট নিচ্ছিলাম!”
বায়োলজি স্যার রাগে নিজের মাথা ধরে বসে পড়লেন, “আমার স্নায়ুতন্ত্রের পরীক্ষা পাড়াগাঁয়ের ব্যাঙ দিয়ে করবে?! স্যার, এর কঠিন থেকে কঠিনতম বিচার করুন!”
ষষ্ঠ শিক্ষক হিসাববিজ্ঞানের। তিনি দাঁড়িয়ে খুব গম্ভীরভাবে বললেন,
“আমার সঙ্গে ও যা করেছে, সেটা ক্ষমার অযোগ্য। আমি ওদের ডিপার্টমেন্ট একটা প্রক্সি ক্লাস নিতে গিয়েছিলাম। সাইন্সের সব শিক্ষকরা বিজি থাকায় দেলোয়ার স্যার আমাকে একটু ক্লাস সামলাতে বলেছিল।”
সাঁঝ এবার একটু ভয় পেল। স্যার বললেন, “আমি ক্লাসে বলেছিলাম, ‘জীবনে হিসাব না জানলে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
অধ্যক্ষ বললেন,
“তারপর?”
স্যার একটা কাগজ বের করলেন। “ও আমার কাছে একটা হিসাব জমা দিয়েছে।”
“কী হিসাব?”
স্যার পড়তে লাগলেন,
“সাত বিষয়ে ফেল = সাতটি দুঃখ।
সাতজন শিক্ষক = সাতটি সমস্যা।
সাঁঝ = এক।
অতএব, সমস্যা ÷ সাঁঝ = শিক্ষক।”
ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর জীববিজ্ঞানের স্যার বললেন,
“এই হিসাবের মানে কী?”
সাঁঝ বলল, “আমার জীবনের সব সমস্যার মূল আপনারা।”
ছয়জন শিক্ষক একসঙ্গে বললেন, “সাঁঝ!”
এবার উঠে দাঁড়ালেন হায়ার ম্যাথের শিক্ষক। তার মুখটাই সবচেয়ে গম্ভীর। তিনি টেবিলের ওপর একটা প্রিন্ট করা ছবি রাখলেন।
অধ্যক্ষ ছবিটার দিকে তাকালেন। তারপর সাঁঝের দিকে তাকালেন।
“এটা কী?”
সাঁঝ মুখ নিচু করল। হায়ার ম্যাথের স্যার বললেন,
“স্যার, আমার একটা ছবি নিয়ে ও একটা হাস্যকর এডিট বানিয়েছে। পাশে একটা কার্টুন চরিত্র বসিয়ে এমনভাবে বানিয়েছে যেন আমি কোনো সিনেমার নায়ক!”
অধ্যক্ষ কপালে হাত দিলেন।
“কেন?”
সাঁঝ আস্তে বলল,
“স্যার, আপনার মুখে সবসময় এমন ভাব থাকে যেন আপনি পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান জানেন। তাই আপনাকে একটু নায়ক বানিয়েছিলাম।”
স্যার বললেন,
“আমি নায়ক হতে চাইনি!”
সাঁঝ বলল,
“আপনি চাইলে ভিলেনও বানাতে পারি।”
“চুপ!”
অধ্যক্ষ এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেললেন। “শেষ অভিযোগ।”
তিনি নিজের চেয়ারে হেলান দিলেন। “অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কী করেছে?”
সাঁঝ এবার সত্যিই চুপ হয়ে গেল। ডালিয়া বাইরে থাকলেও দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল।
অধ্যক্ষ বললেন, “বল।”
সাঁঝ খুব আস্তে বলল,
“স্যার… আপনার ব্যাপারটা একটু ভুল হয়ে গেছে।”
“কী ভুল?”
“আপনার অফিসের সামনে যে বোর্ডে লেখা ছিল ‘Silence Please’…”
অধ্যক্ষ বললেন,
“হ্যাঁ?”
“আমি নিচে ছোট করে লিখে দিয়েছিলাম, ‘অধ্যক্ষ স্যার ঘুমাচ্ছেন।'”
ঘর নিস্তব্ধ। অধ্যক্ষের মুখের রং বদলে গেল।
“তুমিইইই!”
সাঁঝ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, আমি কিন্তু পরে মুছে দিয়েছিলাম!”
অধ্যক্ষ দাঁত চেপে বললেন,
“কতজন দেখেছে?”
সাঁঝ আঙুল গুনে বলল,
“আনুমানিক…”
অধ্যক্ষ হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
“থাক।”
ঠিক তখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। সবাই ঘুরে তাকাল। দরজা খুলে আরযান ভেতরে ঢুকল।
সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার, হাতে ঘড়ি, চোখে চশমা।
তার মুখে এমন গাম্ভীর্য যে ঘরের সাতজন শিক্ষকও কিছুটা সোজা হয়ে বসলেন। সাঁঝ আরযানকে দেখেই মাথা নিচু করে ফেলল। আরযান প্রথমে অধ্যক্ষের দিকে তাকাল।
“আসসালামু আলাইকুম।”
অধ্যক্ষ বললেন, “ওয়ালাইকুম সালাম। আসুন।”
আরযান বসার আগে সাঁঝের দিকে তাকাল। “কী হয়েছে?”
সাঁঝ খুব ছোট গলায় বলল, “কিছু না।”
সাতজন শিক্ষক একসঙ্গে বললেন, “অনেক কিছু!”
আরযান ধীরে ধীরে চেয়ারে বসল। অধ্যক্ষ সামনে সাতটা কাগজ সাজিয়ে দিলেন।
“আপনার বোন সাতটি বিষয়ে ফেল করেছে।”
আরযান মাথা নাড়ল। “জানি।”
“তার ওপর সাতজন শিক্ষককে সাত রকমভাবে বিরক্ত করেছে।”
আরযান আবার মাথা নাড়ল। “এটাও বুঝতে পারছি।”
অধ্যক্ষ বললেন, “আর আমাকে পর্যন্ত ছাড়েনি।”
আরযান এবার সাঁঝের দিকে তাকাল। সাঁঝ মাথা নিচু করে নিজের জুতার দিকে তাকিয়ে আছে। আরযান ধীরে ধীরে বলল,
“সাঁঝ।”
“জি?”
“তুই সাতজন শিক্ষককে সাত রকমের ঝামেলায় ফেলেছিস?”
“জি।”
“অধ্যক্ষকেও?”
সাঁঝ একটু থেমে বলল, “জি।”
“কেন?”
সাঁঝ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কারণ সাত বিষয়ে ফেল করেছি।”
আরযান চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
“তোর মেধা পড়াশোনায় না থাকলেও বিপদ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে অসাধারণ।”
ঘরে হালকা হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সাঁঝ মুখ কুঁচকে বলল,
“ভাইয়া, আপনি আমার পক্ষ নেবেন না?”
আরযান শান্ত গলায় বলল, “না।”
সাঁঝের মুখ মলিন হয়ে গেল। “কেন?”
“কারণ আজকে তোর পক্ষ নেওয়ার মতো কোনো পক্ষ নেই।”
সাতজন শিক্ষক একসঙ্গে মাথা নাড়লেন। আরযান এবার অধ্যক্ষের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্যার, ওর শাস্তি কী হবে?”
অধ্যক্ষ একটু ভেবে বললেন, “সাত বিষয়ে আবার পরীক্ষা দিতে হবে। আর প্রত্যেক শিক্ষকের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।”
সাঁঝের চোখ কপালে। “সাতজনের কাছে?!”
আরযান বলল, “হ্যাঁ।”
“ভাইয়া!”
“আর একটা কথা।”
সাঁঝ চুপ। আরযান খুব শান্তভাবে বলল, “যে সাতজন শিক্ষককে সাতভাবে বাঁশ দিয়েছিস, আগামী সাত দিন তাদের প্রত্যেকের ক্লাসে প্রথম বেঞ্চে বসবি।”
সাঁঝের মুখ এক মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। “প্রথম বেঞ্চ?”
“হ্যাঁ।”
“প্রতিদিন?”
“হ্যাঁ।”
“সাত দিন?”
“হ্যাঁ।”
সাঁঝ চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করল, “আল্লাহ, আমি মনে হয় আজকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি।”
হায়ার ম্যাথের স্যার হঠাৎ বললেন, “স্যার, একটা অনুরোধ।”
আরযান তাকাল।
“জি?”
“ওকে প্রথম বেঞ্চে বসানোর পাশাপাশি হোমওয়ার্কও দেব।”
আরেকজন বললেন, “আমিও।”
তারপর আরেকজন, “আমিও।”
সাঁঝের মুখের অবস্থা দেখে ডালিয়া দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসছে। সাঁঝ হঠাৎ আরযানের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, আমাকে বাঁচান!”
আরযান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চল।”
সাঁঝ ছুটে তার পেছনে গেল। দরজা পার হওয়ার সময় সে পেছনে ফিরে সাতজন শিক্ষককে দেখে হাত জোড় করে বলল, “স্যার, আমি সত্যিই দুঃখিত।”
হায়ার ম্যাথের স্যার বললেন, “আগামীকাল প্রথম বেঞ্চ।”
সাঁঝের মুখ কালো। “জি স্যার।”
করিডোরে বেরিয়ে আরযান হাঁটছে সামনে। সাঁঝ পেছনে পেছনে। কিছুদূর যাওয়ার পর সাঁঝ খুব আস্তে বলল,
“ভাইয়া?”
“হুম?”
“আপনি খুব রাগ করেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“খুব বেশি?”
“খুব বেশি।”
সাঁঝ মাথা নিচু করল। কিছুক্ষণ পর আবার বলল,
“তবে একটা কথা।”
আরযান তাকাল না। “কী?”
সাঁঝ মৃদু হেসে বলল, “সাতজন স্যারের সাতটা কাণ্ডের মধ্যে কোনটা আপনার কাছে সবচেয়ে মজার লেগেছে?”
আরযান হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল। ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
“কোনোটাই না।”
সাঁঝ মুখ গোমড়া করল। আরযান দুই সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“তবে অধ্যক্ষের বোর্ডের ঘটনাটা…”
সাঁঝের চোখ চকচক করে উঠল। “সত্যি?”
আরযানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। “ওটা একটু ভালো ছিল।”
সাঁঝ খুশিতে লাফ দিয়ে উঠল। “আমি জানতাম!”
আরযান সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বলল, “কিন্তু পরেরবার করলে কলেজ থেকে সরাসরি বাসায় এনে নিজে পড়াব।”
সাঁঝের মুখের হাসি মুহূর্তে উধাও। “না ভাইয়া!”
আরযান হাঁটা শুরু করল। সাঁঝ তার পেছনে ছুটতে ছুটতে বলল, “কলেজে শাস্তি মেনে নেব! আপনার কাছে পড়ব না!”
আরযান শান্ত গলায় বলল, “কেন?”
সাঁঝ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “আপনার কাছে পড়লে সাত বিষয়ে ফেল না, সাতবার জীবন থেকে ফেল হয়ে যাব!”
করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন কর্মচারী মুখ চেপে হাসতে লাগল। আরযানও শেষ পর্যন্ত মুখ ঘুরিয়ে হাসি লুকাল। এই মেয়েটার সঙ্গে তর্কে জেতা যায় না। শুধু শাস্তি দেওয়া যায়। আর সাঁঝ?
সে শাস্তি খেতে খেতেও নতুন কুকাজের পরিকল্পনা করতে পারে।
চলবে… See less
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩৯
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৭+৩৮
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৯
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩০(বিবাহ স্পেশাল পর্ব)
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪৮
-
প্রেমতৃষা সমাপ্ত পর্ব (১ম অংশ+ শেষাংশ)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২১+২২