ভালোবাসি সুচরিতা— ১০
ঢাকার আবহাওয়া তপ্ত বেশ। একই দেশেরই অন্য একটা জেলাতে যে ভারি বর্ষণ হচ্ছে তা ঢাকায় থেকে বোঝা মুশকিল।
তবে আবহাওয়ার জন্য সুচরিতা ঘামাচ্ছে না ঠিক। সুচরিতা ঘামাচ্ছে অন্য কারণে। তার থেকে কয়েক সিঁড়ি নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নোমান ভাইকে দেখে তার ঘাম কপাল চুইয়ে পড়ছে।
অপরদিকে মেজবাহ্’র কণ্ঠ তখনও স্পষ্ট। ফোনেই কিছুটা রুষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করছে, “কে ডাকল? আপনাকে ডাকল? টেপি বলে? কে উনি? হ্যালো?”
পর পর অধৈর্য গলায় প্রশ্ন করছে লোকটা। টেলিফোন কিছুটা কান হতে আলাদা থাকলেও জোহরার কান অব্দি ঠিক পৌঁছাচ্ছে সেই একের পর এক প্রশ্ন গুলো।
নোমান এগিয়ে এলো এক সিঁড়ি। তার চোখে মুখে অবিশ্বাস্য ভাব ফুটে উঠেছে পরিষ্কার করেই। জোহরার হাতের টেলিফোনটাই যে সেই অবিশ্বাস্য দৃষ্টির কারণ তা সুচরিতা জানে ঢের। কিন্তু সাহস করে যে কিচ্ছু বলবে তা বলতে পারছে না। কোনো এক অদৃশ্য বলে তার কণ্ঠে আটকে গিয়েছে সমস্ত কথা।
“তুমি টেলিফোন হাতে নিয়ে কারো সাথে কথা বলছ, টেপি? তোমাদের না টেলিফোন তোলা নিষেধ?” নোমানের অবিশ্বাস্য প্রশ্নে মনে মনে হাঁফ ছাড়ল জোহরা। যাক, তাহলে নোমার ভাই বুঝতে পারেনি বেশি কিছু। স্বল্প মিথ্যে বলে কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে পরিস্থিতি।
জোহরা একবার বাঁকা চোখে বাবার ঘরটা দেখল। এরপর চাপা গলায় বলল,
“মনে হলো টেলিফোনে কল এসেছে। রিং শুনেই তো ছুটে এসেছিলাম।”
“কিন্তু ফোন তোলা নিষেধ ছিলো না তোমাদের?”
জোহরা টেলিফোন শীগ্রই রেখে দিলো। বিনা উত্তরেই মেজবাহ্ দেখল ওপাশের ফোনটা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। অধৈর্য, উতলা হয়ে উঠল সে। ব্যাপারটা কী হচ্ছে তার সাথে? মেয়েটা ফোন করলেই এর বাড়ির কেউ না কেউ হাজির হতে ভুলছে না। এদের সমস্যাটা কী?
সিকান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে ভাইয়ের ভাঁজযুক্ত কপালটি দেখল। চিন্তিত ও কিছুটা দিকভ্রান্ত লাগছে ভাইকে। সে দু’কদম এগিয়ে এলো। মগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে এগিয়ে দিলো ভাইয়ের সামনে,
“ভাবীর ঠিকানা দেন ভাই। আমি নিয়ে আসব ভাবীকে। আপনি তবুও এমন ভাঁজ ফেলবেন না কপালে।”
মেজবাহ্ পানির গ্লাস তুলে ঢকঢক করে গিলে নিলো পানি। চোখ উল্টে সিকান্দারের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো, “ঠিকানা জানলে তোর যাওয়ার অপেক্ষা করতাম? আমিই তুলে নিয়ে আসতাম না?”
মেজবাহ্ শেখের উচ্চারিত শব্দগুলো যেন ধাঁধার মতো লাগল সিকান্দারের কাছে। ভাই এসব কী বলছে? ঠিকানা জানে না মানে? ঠিকানা না জেনেই একটি মেয়েকে হোম মিনিস্টার বলে গলা শুকিয়ে ফেলছে? মেজবাহ্ শেখ এমন করেছে?
“ভাই! মজা করেন?”
“হ্যাঁ। তুইতো আমার বেয়াইসাহেব, তোর সাথে মজা না করলে কার সাথে করব।”
মেজবাহ্’র চোখ-মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে সে মজা করার মতো অবস্থায় নেই। তার মানে সিকান্দার যা শুনেছে তা সত্যিই। তাদের ভাই না দেখেই একটা মেয়েকে তার ভাবী বানিয়ে দিলো? কীভাবে পারল? মেয়েটা যদি মেয়ে না হয়ে মহিলা হয়?
“ভাই কী করলেন এটা আপনি? জানেন কতগুলা প্রবাসীদের বিবি যে আজকাল রং নাম্বারে এমন দেখতে সুন্দর ছেলেদের প্রেমের জালে ফাঁসায়? এরপর ছেলেরা দেখা করতে গিয়ে দেখে প্রেমিকা না, প্রেমিকাদের মায়েদের মতো দেখতে মহিলারা চৌত্রিশটা দাঁত বের করে হাসছে। আপনি একটাবার ভাবছেন, আপনার সাথে এমন হলে কী হবে? এক মাস তো সংবাদপত্রের শিরোনাম এটাই থাকবে যে— প্রবাসীর বউয়ের জালে ফেঁসে পথ ভুলেছেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মেজবাহ্ শেখ! আল্লাহ্! ভাই…”
“আর একটা কথা বলবি তাহলে আমি সত্যি সত্যি চাবুক নিয়ে এসে তোর পিঠ লাল করব, অসভ্য। কাকে নিয়ে কী বলছিস? তোর ভাবী হয় মেয়েটা। তাছাড়া আমি কি রামবলদ যে মহিলা আর মেয়ের পার্থক্য বুঝব না? হ্যাঁ?” মেজবাহ্’র কণ্ঠে প্রকট রাগ দেখে নিভে এলো সিকান্দারের অহেতুক ভাবনা। তবুও দমল না। মিনমিন করে বলল,
“তা তো বুঝবেনই। কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে কি সব বোঝা যায়? বুঝলে সেদিন আরেক মেয়েকে বুকের ঝড়, বন্যার কথা বলতেন না-কি? মেয়েও একটা সে’রম। বলে কি-না অধিদপ্তর খুলেছে কি-না। এ কী জন্তু ভাই! নিশ্চয় ভাবির কাছের কেউই হবে? এরই কথার ধার এমন না জানি আমাদের হবু নেত্রীর কথা কেমন।” কথা বলে থামল সিকান্দার। যেন বেশ ভালো একটা কথা মনে পড়েছে এমন একটা ভঙ্গি করে মেজবাহ্’র দিকে তাকিয়ে বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আসলেই কেমন ভাই কণ্ঠ? এমনই ঝাড়ু পেটার মতো বাচনভঙ্গি?”
“ঝাড়ুপেটা বাচনভঙ্গি আবার কী?”
“ঠুন্ডা ঝাড়ু চেনেন? সেই ঠুন্ডা ঝাড়ু যেমন ঝনঝন করে রসকষহীন, তেমনই কারো কারো কণ্ঠ রসকষহীন, কাঠখোট্টা। মনে হয় যেন ঝাড়ু দিচ্ছে এমন কর্কশ শব্দ। ভাবীরও কি তা-ই?”
সিকান্দারের এসব বেফাঁস কথায় মেজবাহ্ হতবিহ্বলের মতো তাকিয়ে রইল। এই ছেলে দিনের বেলা কোনো কিছু খেয়ে এসেছে না-কি? এসব কী বকছে? ভুলভাল কথা বলেই যাচ্ছে!
মেজবাহ্ টেবিল থেকে তার ব ন্দু কটা তুলে নিলো। ডান ভ্রু উঁচু করে ঘাড় নাড়িয়ে বলল,
“বলতো যা বলছিস। শুনি তোর বাকি মনের কথা।”
সিকান্দার থেমে গেলো। জিভ কাটলো সঙ্গে সঙ্গেই, “বলেছি ভাবী হলেন মায়ের জাত। মায়ের মতো শ্রদ্ধার। ভাবী আমার মায়ের মতো। ভাবীর কণ্ঠ অনেক সুন্দর।”
কথা থামিয়েই ভোঁ দৌড় দিলো ও। গিয়ে দাঁড়াল দরজার কাছে। ছাতাটা ব্যস্ত হাতে খুলতে খুলতে বলল, “ভাই, বাকি প্রশংসা রাতে করব এখন আসেন। ছয়টা বেজে গিয়েছে।”
জোহরা নোমানের দিকে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল, “আস্তে বলো, বাবা ঘুমাচ্ছে।”
নোমান যাবের শিকদারের রুমের দিকে তাকালো। দরজাটা আটকানো ভেতর থেকে। ও মাথা নাড়িয়ে বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা। ফোন কে দিয়েছিলো, জানো কিছু?”
জোহরা মিথ্যে বলল একটি শুদ্ধ হাসির সঙ্গে, “না। আমিতো হ্যালো, হ্যালো করছিলাম আর কেটে গেলো।”
নোমান আরেক সিঁড়ি উপরে উঠল, “দাও আমার কাছে টেলিফোনটা। দেখি আমি।”
জোহরা থমকালো। টেলিফোন দেখবে মানে? তাছাড়া লোকটা যদি আবার কল দিয়ে বসে? সে সামলাবে কী করে?
নোমানের পূর্ণ আগ্রহ টেলিফোনে। কিন্তু একটা কেলেঙ্কারি ঘটার আগেই টুইটুবানি এসে উপস্থিত। সিঁড়ির শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে মুরব্বিদের মতো করে ডাকল,
“নোমান ভাই, এদিকে আহেন দেখি।”
নোমান সিঁড়ির উপর থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ভ্রু উঁচু করল খানিক। একবার জোহরা আরেকবার টুইটুবানির দিকে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় বলল, ”কী হয়েছে টুনির মা?”
“আপনে নাকি ছোটো আপারে বকছেন?”
“হ্যাঁ বকছি। পড়ালেখা না করে টেলিভিশন ছেড়ে বসেছিলো।”
“ছোটো আপা এহন মন খারাপ কইরা রাখছে।”
“তো? আমি কী করব? সত্যি কথা কারো সহ্য হয় না। তোর আপারও হয়নি।”
“আপারে বকবেন না আপনে। কেউ ছোটো আপারে বকে না।”
“এজন্য তো বাঁদর হয়ে কাঁধে ঝুলছে।”
“নোমান ভাই, ছোটো আপার কিন্তু মানে লাগছে।”
“টুনির মা, তুই সবচেয়ে বেশি বদ বানাচ্ছিস ওকে। আহ্লাদ আসে কোথা থেকে এত?”
জোহরা বুঝতে পারল টুইটুবানি এখন বেজায় বিরক্ত নোমান ভাইয়ের উপর। জোহরা, প্রেমা কিংবা ইমন এই তিনজনকে নিয়ে কেউ কোনো মন্তব্য করলেই টুইটুবানি সেই মানুষটিকে দেখতে পারে না। তাছাড়া নোমান ভাই বাড়িতে এলেই প্রেমাকে শাসন করে বলে টুইটুবানি একটু কমই পছন্দ করে লোকটাকে।
তাই ও পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেই নেমে এলো সিঁড়ি দিয়ে। তাড়া দিয়ে বলল, “চলোতো নোমান ভাই, দেখে আসি। ওর আজকাল বড্ড রাগ হয়েছে। কেউ কিছু বললেই কথায় কথায় রাগে।”
নোমানও সিঁড়ি দিয়ে নামলো জোহরার পিছু পিছু। খুব হেয় করে বলল, “ওর রাগে কী আসে যায়? পৃথিবী ধ্বংস হয় নাকি বায়ুমণ্ডল উল্টে যায়? আসছে রানি ভিক্টোরিয়া।”
টুইটুবানি মুখ ভেংচালো অলক্ষ্যে। এই লোকটার বড়ো বাড়াবাড়ি। কে বলেছে এসব শাসন করতে? ওরা কি ছোটো? না ওদের বাপ-ভাই নেই? উড়ে এসে জুড়ে বসে শাসন করতে।
নোমান এগিয়ে গেলো ওদেরও আগে। পেছনে রইল জোহরা ও টুইটুবানি পাশাপাশি। টুইটুবানি বারংবার মুখ ভেংচাচ্ছে। ওর কিছু একটা পছন্দ না হলে ও এমন-ই করতে থাকে।
জোহরা আঁড়চোখে খেয়াল করল তা, “তুই মুখ এমন করছিস কেন বার বার? নোমান ভাই দেখলে খারাপ বলবে।”
“বলুক। হেরে কি আমি ভয় পাই?”
“ভয় পাস না?”
“না। পাই না।”
“কেন?”
“ভয় পামু কেন? আমার কাছে ইমন ভাই আছে না?” ফট করে কথা বলেই থামল টুইটুবানি। ছোটো ছোটো হয়ে এলো জোহরার চোখ,
“কী?”
“মানে কইতাছি আমার কাছে ইমন ভাই, আপনে, আব্বা, ছোটো আপা আছে না? আমি ভয় পামু কেন?”
“আমরা নিজেরাও কিন্তু নোমান ভাইরে সমীহ করে চলি।”
“তা চলেন গিয়া। আমি যা সইত্য তা বলি। হেরে বেলা বারোটার দিকে দেহি বারান্দা দিয়া পাশের বাড়ির রেখার লগে হাইস্যা হাইস্যা কথা বলতে। কয় কি-না রেখার হলুদ জামাডা মানাইছে খুব। রেখা এমন আমার চেয়েও কালা মাইয়া, অরে কি হলুদ জামাতে মানায় কন? অথচ বেকুব বানাইলো মাইয়াটারে।”
“আহা! নোমান ভাই সকলেরই প্রশংসা করতে ভালোবাসে।”
“প্রশংসা না এডি। সবার লগে বেডা মানুষ হা হা হি হি করব কেন? এই স্বভাব আমার পছন্দ না।”
“মিশুক স্বভাব। এমন বলছিস কেন?”
“জানি না, কিন্তু আমার সুবিধার লাগে না। কালা মাইয়ারে বলে কি-না হলুদ জামা পরতে, ভালো লাগবে। এটা কোনো কথা হইলো?”
জোহরা হাসলে প্রতিত্তোনে। টুইটুবানিটা মাঝে মাঝে এত বুঝদারের মতো কথা বলে যে ওরতো মাঝে মাঝে মনে হয় মুরব্বির সাথে কথা বলছে। এত বুদ্ধি খাঁটিয়ে বলবে কথা!
…
শেখ বাড়িটি যথারীতি তিনতলা বিশিষ্ট বলে বাহির থেকে দেখলেই যে কেউ বুঝবে এই বাড়ির ধন-সম্পদ ঠিক কতটুকু। নিচ তালাটুকু কেবল ড্রয়িং রুম, পেইন্টিং, তামার ফুলদানি, সেন্ট্রাল টেবিল আর একটি ঝাড়বাতি দিয়ে সাজানো। বাহিরের কোনো বড়ো গেস্ট এলে তাদের বসানো হয় এই নিচ তালাতেই।
দোতালায় ড্রয়িং রুম একদিকে, ডাইনিং রুম অপরদিকটায়। তার পাশাপাশি একটি বিশাল রান্নাঘর। সাথে বেড রুম রয়েছে ছয়টা। তিন তলায় বেড রুম রয়েছে নয়টা। সাথে একটি বিশাল বারান্দা। যেখান থেকে বাহিরের দৃশ্য দেখায় সিনেমার মতো। মূলত তিন তালাতেই সকলের বেড রুম। দোতালায় থাকে কেবল টুপু বেগম আর দাদা-দাদী।
টুপু বেগম আজ রান্না তদারকি করছেন। রিমঝিম সকাল থেকে বের হয়নি ঘর ছেড়ে। কেউ ডাকবার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করেনি যদিও। তবে বার দুয়েক ডেকেছে টুপু। মেয়েটা সাড়াশব্দ করেনি। হিমেলও আজ সকাল থেকে বাড়ি নেই। যেদিনই হিমেল বাড়ি থাকে না, সকলে ধরে নেয় ওদের দাম্পত্য জীবনে নিশ্চয় কলহের সৃষ্টি হয়েছে। ঝামেলা হলেই হিমেল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
সন্ধ্যার গাঙচিল ফিরে গিয়েছে বাড়ি। দাড়কাকগুলোর হট্টগোল থেমেছে শেখ বাড়ির বাহিরে থাকা বিশাল তালগাছটির মাথাতে। জোট বেঁধে বসে জিরুচ্ছে এখন। সাংসারিক আলাপ বোধহয় তাদের ছোটো বাসাটিতেও হয়। পরস্পর তাই মিলে আছে কেমন!
টুপু চা করেছে সকলের জন্য। ভেজেছে সিঙ্গারা ও মোগলাই পরোটা। সিলেটের মানুষ টাটকা চা-পাতার স্বাদ পায়। শেখ বাড়িতো চা বলতে পাগলপ্রায়।
এখন বাড়ির পুরুষরাও কেউ কেউ ফিরবে ঘরে। তাই আগেই তিনি নাস্তাগুলো সাজাচ্ছেন। এদের আবার খাওয়া-দাওয়াতে খানদানি একটা ব্যাপার।
ড্রয়িং রুমে উপস্থিত নেই বাড়ির কেউই। টুপু বসেছে এসে সোফাটায়। দু’টো ফ্যানই ছেড়ে দিয়েছে। আটকে দিয়েছে রান্নাঘরের দরজাটাও। রান্নাঘরের গরম হাওয়ায় লাল হয়ে গিয়েছে ওর শ্যামলা মুখটি। গোলাপি শাড়ির আঁচলটি দিয়ে ও ঠোঁটের উপরের ঘাম মুছে নিলো আলগোছে। কাজের মেয়েগুলোর কেউও নেই এখন। টুপু একটু টেলিভিশনটা অন করার কথা ভাবল। হাতে রিমোর্টও নিলো সেইজন্য। কিন্তু তন্মধ্যেই ড্রয়িং রুমে, সোফার পাশটাতে থাকা টেলিফোনটা বেজে উঠল।
টুপু সচারাচর ফোন এলে ধরে না। তার তেমন পছন্দ নয় ফোন তোলা। তাই চোখ ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকালো। কোনো কাজের মেয়েদের পেলে ফোন তোলাবে সে আশাতে। কিন্তু পেলো না কাউকে। তা অগত্যা নিজেকেই তুলতে হলো ফোনটি।
অপরপাশ থেকে ভেসে এলো একটি পরিচিত পুরুষালি কণ্ঠস্বর। বেশ শুদ্ধ বাচনভঙ্গিতে পুরুষটি কথা বলার আহ্বান জানিয়ে বললেন, “হ্যালো…”
আঁচল দিয়ে ঘাম মুছতে থাকা টুপুর হাত আটকে গেলো যেন কোনো এক অদৃশ্য বলে। মুখের সামনেই ধরে রাখল সে আঁচলটি। কণ্ঠটি গিয়ে বিঁধল ঠিক তার বুকে। কেমন ধারালো ভাবেই।
টুপু মুখ খুলে উত্তর দিতে পারল না। দাঁতে যেন লেগে গিয়েছে দাঁত।
এই কিছু সেকেন্ডের নীরবতাতেই বিপরীত পক্ষের মানুষটা বোধহয় আঁচ করে ফেলল ফোন ধরা ব্যক্তিটিকে। অদ্ভুত কণ্ঠে শুধাল, “টুপু?”
টুপু ফের চমকালো তার নাম শুনে। সে তো একটি কথাও বলেনি। ভুল করে কোনো শব্দ অব্দি করল না। তাহলে লোকটা বুঝল কীভাবে সে? তার নীরবতা আজও কি মানুষটা এমন করেই বুঝে?
টুপু ঘামটুকু মুছল। নিজেকে যথেষ্ট স্থির করল বার কয়েক শ্বাস ফেলে। এরপর ধীরে উত্তর দিলো,
“আসসালামু আলাইকুম। হ্যাঁ, আমি.. টুপু।” ভেঙে ভেঙে, রয়েসয়ে বলল সে।
বিপরীত পাশে তখন নীরবতা। দীর্ঘতম কথা জমে গেলে মানুষের বুকে জমে যায় যেমন নীরবতা ঠিক তেমন। এরপর আচমকাই সেই কণ্ঠটি শক্ত হয়ে উঠল। বেশ গম্ভীর ও ক্রুদ্ধ স্বর ভেসে এলো সাথে সাথে,
“রূপসাকে কলটা দাও। ওকে ফোন করছি ধরছে না। ওর জন্য এত চিন্তা করতে পারি আমি এই ব্যস্ততাতেও? ডাকো ওকে।”
টুপু ভড়কে গেলো। রূপসা বেগম যে বাড়িতে নেই। বেরিয়েছেন কোনো এক বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। তিনি প্রায়ই বের হন। বাড়িতে ছোটো বউয়ের তেমন বাঁধা-নিষেধ নেই বলেই তিনি মুক্ত বিহঙ্গের মতোই উড়েন।
টুপু বলতে চাইল সেই বাহিনে যাওয়ার কথা। কিন্তু বিপরীতের কষ্ঠটি এতই কর্কশ ছিলো যে তার অভিমানে গলা ভার হয়ে গেলো। কথা এলো না মুখ থেকে। কথা বললেই ওপাশের মানুষটা বুঝে যাবেন টুপু আজও বোকাটি। সামান্য ধমকেও কাঁদে।
টুপু যখন অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে তখনই সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলেন তাহমিনা বেগম। ঠোঁটে গাঢ় রঙের লিপস্টিক মেখে। দামী কোনো পারফিউমও বোধহয় মেখেছেন। কড়া ঘ্রাণ ছড়িয়ে গিয়েছে চারপাশে।
টুপু আর একটা অক্ষরও না বলে তাহমিনা বেগমকে ডাকল, ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“বড়ো ভাবী, আপনাদের কল এসেছে।”
তাহমিনা বেগম আবার ফোন তুলতে পছন্দ করেন। ফোনে কথা বলা তার শখ। তাই প্রায় প্রফুল্ল বদন নিয়েই ছুটে এলেন। আপ্লূত স্বরে ফোন কানে দিতে দিতে বললেন, “কে রে?”
যদিও টুপু জানে কে লোকটা তবুও বলল না সে। ঠোঁট উল্টে এমন করল যেন কস্মিনকালেও চেনে না সে লোকটাকে। এরপর হনহনিয়ে চলে গেলো হিমেলের ঘরের দিকটায়। বড়ো ভাবী যখন জানবেন লোকটা কে তখন বাঁকা চোখে তাকাবেন হয়ত। এরচেয়ে চোখ লুকিয়ে পালানোই মঙ্গল।
তাহমিনা গদোগদো হেসে ফোন কানে নিলেন,
“কে বলছেন? হ্যালো?”
কিন্তু ওপাশ থেকে ততক্ষণে কেটে দেওয়া হয়েছে ফোনটি। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে কথার অভাবে।
তাহমিনা বেগম বুঝতেই পারলেন না টুপু তার সাথে ফাজলামো করল কি-না! অদ্ভুত তো! উনি কি ফাজলামো করার মতো মানুষ? নিজের পেটের ছেলের বয়সী ননদ তার সাথে ইয়ার্কি করল?
টুপু বেগম রিমঝিমের দরজায় দু’বার টোকা দিলেও দরজা খুলল না রিমঝিম। কপাল কুঁচকে এলো টুপুর। সকাল থেকে একটা মেয়ে এমন ঘরকুনো হয়ে পড়ে রয়েছে অথচ কেউ ডাকল না? এ বাড়ির মানুষগুলোও যেন কেমন!
সে আরেকবার না ডেকে দরজা ধাক্কা দিলো। দু’বার জোরে ধাক্কা দিতেই দরজা খুলল হা হয়ে। দরজা খুলতেই টুপু বেগম চিৎকার করে উঠলেন ভয়ে, আতঙ্কে। সেই চিৎকারে শেখ বাড়ি সজাগ হয়ে উঠল।
…
মেজবাহ্দের মিটিং শেষ হয়েছে বেশ ভালো ভাবেই। ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা এখন আর নেই। তবে আবহাওয়াটা একটু নরম, মোলায়েম। বাতাস এত ফুরফুরে এসে লাগছে শরীরে যে মুহূর্তেই যে কারো মন ভালো হয়ে উঠবে।
অফিস রুমে কবির শেখ, দোলন শেখ, হিমেল, মেজবাহ্ হতে শুরু করে দলের অনেক বড়ো বড়ো লোকই রয়েছেন। সকলে অবশ্য মেজবাহ্দের শুভাকাঙ্খী নয়। তবে মুখ দেখলে বুঝবার উপায় নেই সেটি।
কেউ কেউ তো অত্যাধিক বিনম্রতা দেখাচ্ছেন যেন মুখ দিয়ে মধু গড়িয়ে পড়বে। তবে মেজবাহ্ সেই মধুতে ভুলবার ছেলে নয়।
দলের প্রবীণ প্রেসিডিয়াম সদস্য মালেক সাহেব আবার মেজবাহ্’র প্রকল্প নিয়ে অসন্তুষ্ট বলে তার মুখে তেমন হাসি নেই। তিনি কাগজপত্র ধীরে ধীরে ভাঁজ করতে করতে বললেন,
“কবির, তোমায় আমি বারবার বলছি, প্রকল্পটা নিয়ে মেজবাহ্’র কথাতে সায় দেওয়ার আগে ভেবো। আমি তোমার সময়ের আগ থেকে এই দলের হয়ে কত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার অভিজ্ঞতা কম নয়। আমি সবচেয়ে প্রবীণ লোক।”
মেজবাহ্ হেলান দিয়ে সবে চেয়ারটায় বসেছিলো। মালেক সাহেব আজ পুরো মিটিং জুড়ে এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেছেন। এমনকি এখনও করছেন। তাই বাবার বলার আগে মেজবাহ্ নিজেই আগ বাড়িয়ে বলল,
“প্রবীণ মানেই কি পার্ফেক্ট? অভিজ্ঞতা আপনার আছে বলেই কি আপনারটা সঠিক আর আমাদেরটা ভুল?”
মেজবাহ্’র সোজা ছোড়া প্রশ্নে মালেক সাহেব ওর মুখের দিকে তাকালেন। হাত দুটো টেবিলের উপর রেখে খুব বিজ্ঞ স্বরে বললেন,
“চেয়ারম্যানের ছেলে বলে কি তোমার বিপরীতে বলা যাবে না?”
মেজবাহ্ও একই ভঙ্গিতে হাত রাখল টেবিলে। মালেক সাহেবের মুখোমুখি চেয়ারটা থেকে বসেই অবলীলায় উত্তর দিলো,
“অবশ্যই বলা যাবে। তবে আমি কেবল জানতে চাচ্ছি কেন আপনি নিষেধ করছেন?”
“দেখো মেজবাহ্, সিলেটে জেলায় একটা, দুটো গ্রাম নয় বরং বেশ বড়ো সংখ্যক গ্রাম রয়েছে। প্রতিটা গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছানো খুব বড়ো বাজেটের কাজ। এত বড়ো বাজেট কে দিবে?’
“কেন? সরকার দিবে।”
“কেন দিবে সরকার। আর এত সহজে বললেই দিতে হবে?”
“দিবে না-ই বা কেন তা বুঝতে পারছি না আসলে! এই অঞ্চল টা লন্ডন নামে পরিচিত। সবাই শহরের দিকে বিত্তশালী। বাহিরের পর্যটকরা বেছে নেয় এই সিলেটকেই। এবং বাহির থেকে পর্যটক আসা মানে সরকারের অর্থনীতিকেও উপকৃত করে নিশ্চয় বড়ো অঙ্কেই। তাহলে যে অঞ্চল দিয়ে সরকার লাভবান হচ্ছে, সে অঞ্চলে তিনি বিনিয়োগ করবেন না-ই-বা কেন?”
“সব এত সহজ নয়।”
“সহজ বানিয়ে নিন। ফ্যানের নিচে বসে থেকে সব কঠিন ভাবছেন আর ভাবুনতো যারা অন্ধকারে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে তাদের জীবনটা কতটা কঠিন? জনগণের জন্য গদিতে বসে জনগণকে বাদ দিলে তো হচ্ছে না, মালেক সাহেব।” মেজবাহ্’র কণ্ঠ কিছুটা উগ্র। তাকাচ্ছেও বাজপাখির মতো ধাঁরালো চোখে।
মালেক সাহেব ঠান্ডা মস্তিষ্কে উত্তর দিলেন, “আগে কি মানুষ থাকতো না অন্ধকারে?”
“থাকতো। তার মানে এই নয় আগে কষ্ট হতো না। আগেও কষ্ট হতো। তবে আগে ব্যবস্থা ছিলো না বলে সকলে কষ্ট করেছে। এখন ব্যবস্থা আছে তাই কষ্ট করার প্রশ্নই নেই। করবে না। আমি করতে দিবো না।”
“রাজনীতিতে এই তেজে বারো দিন টিকবে। বারো বছর আর না।”
“বারো দিন টিকলে বারোদিনে উপকার করে দিবো জনগণের। অন্তত গদিতে বসে বারো বছর ভুঁড়ি বের করা আর টাক চকচকে করার চেয়ে বারোদিনের টেকাটা ভালো। কী বলেন?”
মেজবাহ্ এবার ঠাট্টা করেই বলল। ইঙ্গিত করল মালেক সাহেবের ভুঁড়ি ও টাকটিকেই।
কবির শেখ মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে মনোনিবেশ করলেন হাসি আটকাতে। বাকিরাও এমন ভাণ করলেন যেন শুনেনই নাই কিছু। মালেক সাহেব রেগে গেলেন। পারছেন না গালি দিতে। কত অসভ্য ছেলে তাকে এসব বলে! ওর বাপ চেয়ারে বসার আগে উনি রাজনীতিতে এসেছেন আর এখন এই ছেলে এত বড়ো বড়ো কথা বলে!
মেজবাহ্ও মুখ টিপে হাসল। পাশের পানির গ্লাসটা থেকে পানি নিলো পান করার জন্য। কিন্তু তন্মধ্যেই সিকান্দার হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করল রুমে। শেখ বাড়ির পুরুষদের দিকে তাকিয়ে হাঁপানো স্বরে বলল,
“ভাই, বড়ো ভাবীকে তো হসপিটাল নেওয়া হয়েছে। ভাবীর নাকি শ্বাস চলছে না। রক্তে মাখামাখি শরীর।”
মেজবাহ্’র হাত আটকে গেলো সেখানেই। দু’টো সেকেন্ড আর সে অপেক্ষা করল না। টেবিলের পাশে ডেস্ক থেকে ব ন্দু কটা নিয়েই ছুটল সে সর্বপ্রথম। পর পর বের হলে কবির শেখ, দোলন শেখও। হিমেল তখনও বসা থম মেরে।
মালেক সাহেব তর্কের বিপরীতে রাগ মেটানোর অজুহাতে হাসতে হাসতে বললেন,
“এ যে দেখছি মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি! যার স্ত্রী সে বসে আছে আর দেবর ছুটছে! ইন্টারেস্টিং!”
চলবে…
-মম সাহা See less
Share On:
TAGS: ভালোবাসি সুচরিতা, মম সাহা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ৭
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ৩
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ৯
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ৮
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ৫
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ১
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ৪
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ২
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ৬
-
ভালোবাসি সুচরিতা গল্পের লিংক