দুইজনাতেই
পর্ব_০৪
লেখনীতেঃ অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ কে ওয়াইফ? কার সাহস নিভাবেন হুহ? ”
দ্বিতীর ভ্রু জোড়া কুঁচকানো। এই প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে তাকাতেই সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকাল। দেওয়ালের দিকে একটা হাত রেখে দ্বিতীর দিকে আরেক কদম পা বাড়াল। অতঃপর একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়েই গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিল,
“ সম্ভবত আমার স্টুডেন্ট হয় সে। আবার হয়তো অদিতি আন্টির মেয়ে ও হতে পারে। শিওর জানা নেই। ”
দ্বিতী ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিল আবারও। অদিতি আন্টির মেয়ে তো সে নিজেই।সোজাসুজি বললে কি পাপ হতো?নাকি দ্বিতী এই লোকের মাথায় উঠে বসত? এইটুকু ভেবেই ভ্রু কুঁচকে জানাল,
“ স্টুডেন্ট? তাও সম্ভবত ? নিজের ওয়াইফ, অথচ ভালোভাবে চিনেন না অব্দি? ছিঃ ছিঃ!”
“ চিনে নিতে দুই সেকেন্ডও সময় লাগবে না সাক্ষ্য এহসানের। ”
দ্বিতী হাসল। বিদ্রুপ করে হেসে বলল,
“ দেখা গেল যখন বউকে চিনে নিতে চাইবেন তখন বউ ফুরুৎ হয়ে গেল।”
সাক্ষ্য চোখে হাসল বোধহয়৷ আবার চেহারা কেমন গম্ভীর ও দেখাল। এই লোকের এই এক সমস্যা। রাগ,জেদ, দুঃখ কষ্ট কিছুই তো মুখে ফুটে না। এমন কেন মুখটা? প্রকাশ করলে কি হয় হুহ? দ্বিতী বুঝার চেষ্টা করল না আর। সাক্ষ্য ঠিক তখনই ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ এতোটা দুঃসাহস হবে তার? রিয়েলি? আফটার অল সাক্ষ্য এহসানের নামে তুলে রাখা তো। এমন ভাবনা মাথায় আনতেও তাকে শত-সহস্রবার ভাবতে হবে। ”
দ্বিতী ভ্রু নাচাল। ফের শুধাল,
“ সাক্ষ্য এহসান নামটা নিয়ে কি দাপট দেখাচ্ছেন? ”
“ ধরে নাও তাই। ”
“ তাহলে আমিও বলি। আপনার বউ টিকবে না স্যার। দেখবেন, আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর যে আপনার বউ টিকবে না। ভালোই হয়েছে আপনার বউকে চেনার সুযোগ হয়নি৷এমন নাক উঁচু মানুষদের চেনার সুযোগ না হওয়াটাই ভালো । আমি হাত তুলে দোয়া চাই যাতে আপনি আপনার বউকে না চিনতে পারুন। ”
সাক্ষ্য শুনল। অতঃপর হুট করেই মাথাটা নুইয়ে আনল একদম দ্বিতীর মুখের কাছে। ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ তাই নাকি? ”
” হ্যাঁ, তাই।”
সাক্ষ্য ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। দ্বিতীর মুখের সামনে থেকে মুখটা একটু একটু করে গলার দিকে এগোতে এগোতেই দ্বিতীকে একদম দেওয়ালের সাথে মিশিয়ে শুধাল,
“ আই গেইসস সুযোগ না হলেও সুযোগ তৈরি করে নেওয়া উচিত আমার। রাইট ? ”
যদিও সাক্ষ্য মুখ এগোলেও যথেষ্টই দূরত্ব আছে তবুও দ্বিতীর মনে হলো যেন সাক্ষ্যর নিঃশ্বাসের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। সাক্ষ্য বোধহয় ঝুঁকে তার কাঁধেই মুখ রাখবে। দ্বিতী এইটুকু ভেবেই মুহুর্তের মধ্যেই সাক্ষ্যকে দুই হাতে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই সাক্ষ্য সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুখচোখ গম্ভীর রেখে উল্টোদিকে ঘুরতে ঘুরতেই গম্ভীর কন্ঠে বলে গেল,
“ আপনার হাতে পাঁচ মিনিট সময় আছে মিসেস সাক্ষ্য এহসান। এর মধ্যেই গাড়িতে গিয়ে বসবেন। আরেকবার যদি দেখি কোন ছেলের সামনে গিয়ে তাদের চক্ষুশীতল করছেন তো আপনার একদিন কি আমার একদিন দেখবেন। ”
দ্বিতী মুখ ভেঙ্গাল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। দ্রুত পা চালিয়ে ওয়াশরুমের দরজাটা লক করতে করতেই জানাল,
“ পাঁচ মিনিট কি, পঞ্চাশ মিনিট হলেও আমি যাব না। কি করবেন দেখা যাবে।”
সাক্ষ্য বোধহয় শুনল তা, তবে উত্তর এল না। দ্বিতী ভেতর থেকে শান্তিই পেল। যেটা সাক্ষ্য নিষেধ সেটা প্রয়োজনে দ্বিতী একশোবার করবে। করবে না কেন? দ্বিতী সাক্ষ্যর কথা মতো চলবে কেন হুহ? যে লোক এমন উঠতে বসতে অপমান করে তার কথা শোনার প্রশ্নই আসে না।
.
দ্বিতী মিনিট দুই সময় নিয়ে শাড়ি পরিষ্কার করল। কিন্তু সমস্যা হলো শাড়িটার সাদা রংয়ের। স্টোন গুলো চকচক করলেও তরকারির হলুদ দাগটা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। দ্বিতী কিঞ্চিৎ এই নিয়ে মন খারাপও করল। কত সুন্দর শাড়িটা। নষ্ট করে দিল একদম। এর জন্য, এর জন্য দ্বিতীর কি করা উচিত? কি করলে রাগ মিটবে? এইটুকু ভাবতে ভাবতেই ওয়াশরুম ছেড়ে বের হলো সে। অতঃপর দ্বিতী সাদা শাড়িতে তরকারির হলুদ দাগ নিয়ে যখন দুঃখের সাগরে ভাসল তখনই সাক্ষ্যর গম্ভীর একরোখা স্বর ভেসে এল কানে,
“ দুই মিনিটের মধ্যে গাড়িতে গিয়ে বসুন মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম। এপাশ ওপাশ পা বাড়াবেন তো সোজা তুলে নিয়ে বসিয়ে রাখব গাড়িতে। ”
দ্বিতী চোখ বড়বড় করে তাকাল। কপাল কুঁচকে বলল,
“ কিডন্যাপ করবেন নাকি? ”
“ করতে হলে করলাম। ”
দ্বিতী শ্বাস ফেলে বলল,
“ তাই বলে একটা মেয়ে স্টুডেন্টকে? মানসম্মান থাকবে আপনার? ”
” স্টুডেন্ট যদি আমায় শুরু থেকেই স্যার নজরে দেখত তবে নাহয় মানসম্মান নিয়ে ভেবে দেখতাম মিসেস সাক্ষ্য এহসান। কিন্তু স্টুডেন্ট তো নিজেই… ”
দ্বিতী মুহুর্তেই ফিরল। বলল,
” কি? ”
“ নাথিং।”
এইটুক বলতে না বলতেই দেখা গেল কোথাও থেকে একটা এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক সাক্ষ্যরই পাশে। সাক্ষ্যকে দেখেই মুহুর্তের মধ্যে ছটফট করে বলে উঠল,
“ আরেহ সাক্ষ্য ভাইয়া, তোমায় কত করে খুঁজছিলাম। অথচ তুমি এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছো৷ ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়। এ আবার কে? সাক্ষ্যকেই বা এত খোঁজাখুঁজির কি কারণ তার? এইটুকু ভাবতে ভাবতেই দেখা গেল মেয়েটা হাত বাড়াল। সাক্ষ্যর দিকেই হাতটা বাড়িয়ে সাক্ষ্যর হাতটা টেনে ধরে বলল,
“ ভাইয়ার সাথর ছবি তুলব৷ তুমি যাবে না? চলো, ছবি তুলব সাক্ষ্য ভাইয়া। ”
সাক্ষ্য এতোটা সময় চুপ থাকলেও এবার হাত ছাড়িয়ে নিল। সৌজন্যতা দেখিয়ে বলল,
“ তুমি যাও, ছবি তুলো মিনি। আমি পরে গিয়ে ছবি তুলব। ”
“ এখন গেলে কি হবে? ”
“ কিছু হবে না, কিন্তু আমি এখন ছবি তুলব না মিনি। ”
দ্বিতীর ইচ্ছে হলো না এদের এসব কথাবার্তা শুনতে। আবার বিয়েবাড়িতে আম্মুর সাথে এত ভীড়ে দাঁড়িয়েও থাকতে ইচ্ছে হলো না। শুধু রাগ ফুঁসল। ভেতরে ভেতরে অদৃশ্য এক রাগ তার শরীর মন জ্বালিয়ে দিল যেন। অথচ প্রকাশ করল না। একটুও না।
.
দ্বিতী সেদিন বাড়ি ফিরেছে একা একাই। পরদিন ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠে ভার্সিটিতে ও গিয়েছে। কিন্তু সাক্ষ্যর ক্লাস না থাকায় ঐ লোকটার সাথে মুখোমুখিও হতে হয়নি আর। দ্বিতী মনে মনে শান্তি অনুভব করেছিল আবার একইভাবে ভার্সিটির চারপাশে চোখও বুলিয়েছে সাক্ষ্যকে দেখা যায়
কিনা। অবশেষে না দেখতে পেয়ে ছোটশ্বাস ফেলল। খেয়াকে পড়ায় ডুবে থাকতে দেখে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ কি এত পড়িস ভাই? আমারে বুঝা, একটা মানুষ চব্বিশঘন্টা কিভাবে পড়ে? ”
খেয়া চাইল। দ্বিতী আর মিহু দুইজনের দিকে ফিরেই বলল,
“ যেভাবে তোরা সারাদিন সুন্দর সুন্দর ছেলে দেখিস। ”
মিহুই এবার জবাব দিল,
“ সারাদিন? আমরা সারাদিন কই ছেলে দেখি? ”
“ যেটুকু দেখিস ঐটুকু কি সারাদিনের থেকে কম নাকি? ”
দ্বিতী উত্তরে বলল,
“ আমি তো সুন্দর সুন্দর ছেলেদের দেখতেই পাই না। ক্যাম্পাসে সব বান্দর বান্দর ছেলে। একটাও তো সুন্দর ছেলে নেই। ”
ঠিক তখনই পেছন থেকে কিয়ান আর সাদাত এল । কিয়ানই মুখচোখ কুঁচকে উত্তর করল,
“ আমরা কি তাহলে ছাগল? ভালো করে দেখ, পাবি এমন সুন্দর ছেলে? ”
দ্বিতী নাক মুখ কুঁচকাল। বমি পেল এমন ভঙ্গিতে জানাল,
” তোদের দুটোকেই তো গাঁজাখোর লাগছে। না না, একটা সিগারেটখোর, একটা মেয়েখোর। রাইট না? ”
সাদাব খানিকটা দূরে বসল। কপার কুঁচকে উত্তর করল,
“ মেয়েখোর হওয়ার চাইতে সিগারেটখোর হওয়া হাজারগুণে ভালো। ”
কিয়ান এবারে মুখ বাঁকাল। বলল,
“ পল্টিবাজ! জ্বরে পড়ে রইলি মেসে। আনল কে তোরে? আর এখন এসেই পল্টি মেরে গেলি। আমিই বলদ! ”
মুহুর্তেই হাসির রোল পড়ল। খেয়া হাসতে হাসতেই সাদাবের দিকে চাইল। চোখমুখ শুকনো। চুলগুলোও এলোমেলো কিছুটা। গত তিনদিন ভার্সিটিতে আসেনি দেখেই কল দিয়েছিল দুয়েকবার অথচ কল তুলেনি। অবশ্য তুলবে না এটা খেয়া আগে থেকেই তো জানত। তবুও বেহায়ার মতো কল দেওয়ার প্রয়োজন ছিল? খেয়া ছোটশ্বাস ফেলে। এই যে এখন আবারও বেহায়ার মতো প্রশ্ন করল,
“ জ্বর কমেছে সাদ? বেশি অসুস্থ ছিলিস? ভার্সিটিতেই আসলি না। ”
সাদাব মুখচোখ গম্ভীর করে আগের মতোই বসা। ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে খেয়ার প্রশ্নটা সম্পূর্ণই এড়িয়ে গিয়ে মিহুকে বলল,
“ মিহু? তুই এমন হুলোবিড়ালের মতো বসে আছিস কেন? কথা বল। ”
“ দ্বিতীও তোর মতো পল্টি খেল তাই। ও নাকি সুন্দর ছেলর দেখেই না। এদিকে সাক্ষ্য স্যারকে পারে না চোখ দিয়ে গিলে নিতে। ”
ঠিক ঐ সময়টাতেই কিছুটা দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল সাক্ষ্য। সাদাবের নজর পড়া মাত্রই দ্রুত বলে উঠল,
” আরেহ, আরেহ! ঐ তো সাক্ষ্য স্যার…”
সাদাবের গলাটা শুধু মিহুদের শোনানোর জন্য হলেও পৌঁছাল সাক্ষ্যর কানে ও। তবুও ফিরল না সাক্ষ্য। তাকাল না। নয়তো খেয়া আর দ্বিতী ব্যাতীত উপস্থিত সকলের চোখের চাহনি যে তারই উপরে তা দেখত। সাক্ষ্য দূর থেকেই শুনল,
“ দ্বিতী কি সাধু হয়ে গেছে ভাই! সাক্ষ্য স্যারের দিকেও ফিরে চাইল না? কি ভয়ংকর ব্যাপার! এটা দ্বিতী হতে পারেই না। ”
.
দ্বিতী ভার্সিটি থেকে ফিরল বিকালে। অতঃপর ফ্রেশ হয়ে একটা লম্বা ঘুম দিবে ঠিক তখনই কল এল ফোনে। আননোন নাম্বার। দ্বিতী বিরক্তি নিয়ে যখন কল তুলল তখনই জানানো হলো একটা পার্সেল আছে। সে যেন পার্সেলটা রিসিভড করে। অথচ দ্বিতী অর্ডার করেনি কিছুই। কোনকিছুর পার্সেল আসার কথাও না। দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলল। যখন ডেলিভারী বয়কে বারবার বলার পরও ডেলিভারী বয় জোর দিয়ে বলল এটা তারই পার্সেল তখন দ্বিতী হেলে দুলে গেল তা আনতে। অতঃপর আনল ও। বড় আশা নিয়ে প্রাপকের নাম ঠিকানা দেখতে যেতেই দেখল কোন এক শপের নাম। দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলে। আগ্রহ দমাতে না পেরে পার্সেলটা খুলেই সর্বপ্রথম পেল একটা সাদা স্টোনের কাজ করা সাদা শাড়ি। হুবুহু তার শাড়িটার মতোই। একদম হুবুহু একই রকম। কি আশ্চর্য! একই রকম শাড়ি কেন আসবে? কেই বা পাঠাল? এতসব ভাবতে ভাবতেই দ্বিতীর হাতে এল একটা চিরকুট।
চলবে….
[ বলেন তো চিরকুটে কি লেখা থাকবে?
আর হ্যাঁ, গল্পের প্রথম দুই পর্বে দেখলাম ৪+ কে রিয়েক্ট। অথচ তৃতীয় পর্বে এমন বেহাল দশা কেন? গল্প কি সুন্দর হচ্ছে না? এই পর্বে রিয়েক্ট না করলে কষ্ট পাব। আর ছোট্ট একটা অনুরোধ, যারা যারা পড়বেন, অবশ্যই কমেন্ট করিয়েন প্লিজ। ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমাদৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ। ]
Share On:
TAGS: অলকানন্দা ঐন্দ্রি, দুইজনাতেই
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দুইজনাতেই পর্ব ৪০
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৮
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৭
-
দুইজনাতেই পর্ব ৫
-
দুইজনাতেই পর্ব ৬
-
দুইজনাতেই সূচনা পর্ব
-
দুইজনাতেই পর্ব ২৩
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৩
-
দুইজনাতেই পর্ব ২৮
-
দুইজনাতেই পর্ব ৩৫