#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;৪৪
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
মাগরিবের নামাজ শেষ করে চুলোতে চা-য়ের পানি বসালো তরী। তরঙ্গ বাইরে নামাজ পড়তে গেছে। পানি ফুটতেই চা-পাতি দিয়ে দিলো সে। মূদ্যু আঁচে চা ফুটতে দিয়ে, ঝুড়িতে জমা ময়লা গুলো এক সাথ করে নিলো তরী। বাড়ির সামনেই ময়লার ডাস্টবিন রাখা। প্রতিদিন রাতে কাজ থেকে ফিরে তরঙ্গের ময়লা গুলো ফেলে আসে। আজ যেহেতু দুজনে সন্ধ্যায় বেরোবে। তাই সে-ই আজ নিচে নামলো। ময়লার পলিথিন টা ডাস্টবিনে রেখে ঘুরতেই কপালে বাড়ি খেলো তরী। হঠাৎ, পেছনে দেয়াল এলো কোথা থেকে তা ভাবতে যেতেই দেখলো, হাসি হাসি বদনে একটা জবা ফুল তার কানে গুঁজে দিচ্ছে তরঙ্গ।
–” নিচে নামতে গেলি কেন? তুই হারিয়ে গেলে কি করবো আমি?”
–” ময়লা ফেলতে। নামাজ শেষ?”
–” হ্যাঁ,”
কথা শেষ করে, হুট করে তরীর কপালে চুমু এঁকে দিলো তরঙ্গ। চমকে কপালের হাত চেপে চারপাশে তাকালো মেয়েটা। রাস্তা পুরো ফাঁকা। মাঝে মধ্যে এক, দুটো সাইকেল রিকশা শা শা করে তাদের পাশ ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। ল্যাম্প পোস্টের আলোয় পুরোটা এলাকা জ্বল জ্বল করছে। এই একটা কারণে এই এলাকাটা তরীর এতো ভালো লাগে। নয়তো সারাদিন শব্দ দূষণে কানে তালা লাগার উপক্রম হয়।
–” মাঝ রাস্তায় এসব কি?”
–” চুমু? চিনিস না? আরেক বার দিয়ে দেখাবো?”
তরঙ্গের কথায় বেজায় বিরক্ত তরী। কথার প্রতিউত্তর না করে তার হাত টেনে নিজের সাথে নিয়ে গেটের ভেতর ঢুকে পড়লো। বকতে বকতে সিঁড়িতে পা রাখলো সে। তরীর বকা খেয়ে ও তরঙ্গ হেসে কুটিকুটি। তার তরকারি জানটা সব কিছুতে ভয় পায়। অবশ্য তরী সাহসী হলে সে তরীর প্রেমে পড়তো না।
–” সাহসী মেয়েদের আগুন ঝরা চোখ গুলো দেখলে প্রেম প্রেম পায় না। বরং, ভয় হয় কখন না বুকে ছু*রি চালিয়ে দেয়। ভীতু মেয়েদের তেমন লাগে না। তারা ভর্য়াত ডাগর ডাগর চোখে তাকালে ইচ্ছে করে হাতের আজলায় গালটা পুরে টপাটপ কটা চুমু এঁকে দেয়।”
চিপা রাস্তা ধরে পাশাপাশি হেঁটে চলেছে তরী – তরঙ্গ। তরীর পরণে কালো বোরকা। মাথায় হিজাব বাঁধা, মুখে মাস্ক। আজ এই পোশাক পরার কারণ তরঙ্গ। ছেলেটার কাজ শেষে গত পরশু রাতে ফেরার সময় তার জন্য এই বোরকা আর হিজাব নিয়ে এসে ছিলো। তবে তা তরীর অগোচরে ওয়ারড্রবের শেষ ড্রয়ারে লুকিয়ে রেখে ছিলো। আজ সন্ধ্যার নাশতা শেষ করেই তরীকে নিয়ে বারান্দায় উপস্থিত হয়ে ছিলো সে। শীতময় সন্ধ্যা লগ্নে এক জোড়া দম্পতি বারান্দায় উপস্থিত হতেই চাঁদের আলো এসে পড়লো তাদের উপর। বারান্দায় গিয়ে আগে থেকে পেতে রাখা চেয়ারটাতে বসে পড়লো তরঙ্গ।
–” তুই যে আমার! তা মানিস?”
গ্রিলে হাত রেখে চাঁদ দেখ ছিলো তরী। তরঙ্গের প্রশ্নে চাঁদের পান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তরঙ্গের পানে তাকালো তরী।
–” হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
গ্রিলে পা ঝুলিয়ে আয়েশি ভঙ্গিমায় বসলো ছেলেটা। তরীর বেণীর শেষ প্রান্তটা নাকের ডগায় নিয়ে সুভাষ টানলো। পরক্ষণেই হেঁচকা টানে নিজের কোলের উপর এনে ফেললো মেয়েটাকে। টাল সামলাতে না পেরে তরঙ্গের বুকে আছড়ে পড়লো তরী। পুনরায় উঠে যাওয়ার আগেই তরীকে জাপ্টে ধরলো তরঙ্গ। নিজের বলিষ্ঠ দু’খানা হাত দিয়ে তরীর কোমর জড়িয়ে গলায় মুখ গুজলো।
–” হ্যাঁ নাকি না?”
তরঙ্গের হঠাৎ স্পর্শে কুপকাত তরী। কোমরের নিচ থেকে, হাত – পা অবশ হয়ে আসছে তার। সাথে পরিচিত এক ভালো লাগায় দুলে উঠলো মন। ছেলেটার বক্ষবিভাজন উন্মুক্ত। তবুও শরীর থেকে মিষ্টি সুভাষ ছড়াচ্ছে। আড়ষ্টতা পাশে রেখে, নিজের ভারসাম্য রক্ষা করতে কাঁপা কাঁপা হাতে তরঙ্গের গলা জড়িয়ে ধরলো।
–” হ্যাঁ,”
–” তাহলে প্লিজ, এমন খোলামেলা ভাবে আর চলা ফেরা করিস না। আমার সামনে তোর যেই সৌন্দর্য প্রকাশের কথা। তা অন্য কারো সামনে প্রকাশ পাক। কেউ তোকে আমার মতো করেই দেখুক। তা আমার পছন্দ না। এক কথায় বলবো, আমার সহ্য হয় না। আর ইসলামে ও আছে। নিজের স্ত্রীকে নিজের শেষ বিন্দু র*ক্ত ফোঁটা দিয়ে ননমাহরাম পুরুষদের থেকে আগলে রাখার নির্দেশ।”
–” আমি যদি রাজি না হই?”
তরীর প্রশ্নে মাথা নামিয়ে নিলো তরঙ্গ। হৃদয় পুড়িয়ে বেরিয়ে আসা দীর্ঘ শ্বাসটা গোপন করতে চাইলো সে। তবে কোলে বসে থাকা তরী সবটা বুঝলো। হৃদয়ের নিকট থাকা মানুষেরা তো বোঝে। তবে সবাই না। এমন বিশেষ দুই, একজনের সাধ্যি থাকে বোঝবার।
–” আমি জোর করবো না। ভালোবাসি তোকে, ভালোবাসি যেহেতু বলেছি। তবে আমার সিদ্ধান্ত তোর উপর চাপিয়ে দিবো না।”
ছল ছল চোখে তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে থেকে। তরঙ্গ কে চমকে দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলো। নিজেদের বাহ্যিক সমস্ত দূরত্ব গুছিয়ে তরঙ্গ কে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো সে।
–” কি ভালোবাসেন আপনি? ভালোবাসলে অধিকার খাঁটাতে হয়। আপনি আমাকে এতো ছাড় দিয়ে রাখেন কেন? যদি হারিয়ে যাই?”
তরঙ্গ হাসলো। তরীর বেণুণী করা চুল গুলো আলতো হাতে খুলে দিলো। পরমুহূর্তে দুজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়লো চুল গুলো।
–” ছাড় কই দিলাম? তোমাকে উড়তে দিয়েছি। তবে পা জোড়া আমার বুকের সাথে শক্ত করে শিকলে বাঁধা। তরঙ্গ দেওয়ান কে গোল খাইয়ে পালানো এতো সোজা না তরকারি জান।”
শব্দ করে কেঁদে উঠলো তরী।
–” এমন পাগল ছেলেকে আমি ভালোবাসবো না। ও আল্লাহ্, ওনি আমাকে এতোটা ভালো কেন বাসলেন?”
–” উড়তে দিয়েছি তোমাকে পাখি। যতোটা পারো উড়ো। তোমার বুকের নিচে সর্বদা তরঙ্গের দু’হাতের অস্তিত্ব থাকবে। তুমি তোমার অস্তিত্ব আকাশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় রেখে এসো। উড়া শেষ হলে আবার ফিরে এসো তোমার স্বামীর নীড়ে।”
তরীর কাঁধ পেঁচিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে তরঙ্গ। আলো আঁধারির পথ ধরে শীতল আবহাওয়া হেঁটে চলেছে দুজনে। এই রাস্তাটা ঢালাই বিহীন। আশেপাশে সব নতুন ভবন। কিছু ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে। কিছু এখনি সম্পূর্ণ কমপ্লিট করা হয়নি। হঠাৎ, তরঙ্গ দাঁড়িয়ে পড়লো। দৌড়ে গিয়ে একটা গাছ থেকে ডাল ভেঙে ফিরে এলো। পেছন থেকে ভেসে এলো কর্কশ কন্ঠের চিৎকার;-
–” এই কে রে? কে রে গাছের ডাল ভাঙলো।”
চিৎকার শুনতেই তরীর হাত ধরে ভৌ দৌড় দিলো তরঙ্গ। ছুটতে ছুটতে বাজারে এসে থামলো দু’জনে। থামতেই বুকে হাত চেপে হাঁপাতে শুরু করলো তরী। এইটুকু সময়ে কি হলো! তার মস্তিষ্ক এখনো তা ধরতে পারেনি।
–” কি হলো এটা?”
পিঠের পেছনে রাখা হাতটা সামনে এনে চকচকে চোখে জবাব দিলো তরঙ্গ।
–” চুরি।”
সন্ধ্যা সাতটা বাজে। শীতের সন্ধ্যা হওয়াতে বিভিন্ন রকমের পিঠা, ডিম সিদ্ধের দোকান বসেছে। মানুষ সেসব দোকানের সামনে ভীড় জমিয়েছে। বাজারের মধ্যে মানুষ আর আলোতে জমজমাট হয়ে আছে। নিচু কণ্ঠে তরঙ্গের পিছনে দাঁড়িয়ে তরী সুধালো।
–” ফুচকা খাবো।”
–” চল,”
ফুচকার ঠেলার পাশে এসে এক প্লেট ফুচকা অর্ডার দিয়ে তরীকে নিয়ে সাইড হয়ে দাঁড়ালো তরঙ্গ। জবার ডাল টা সামনে এনে উল্টে পাল্টে দেখলো।
–” বুঝলি তরকারি জান। সন্ধ্যায় নামাজ পড়ে এদিক দিয়ে এসে ছিলাম। তখনি টার্গেট করে গিয়ে ছিলাম। তোর জন্য এই গাছটা থেকে ডাল নিবো।”
–” রোপণ করবো কিভাবে? টব কই?”
–” কিনে নিবো।”
–” মামা ফুচকার পেলেট নেন।”
–” দাঁড়া ফুচকা নিয়ে আসছি।”
–” নে,”
ফুচকার প্লেট তরীর হাতে দিয়ে। তার পার্সটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো সে।
–” আপনি খাবেন?”
ডান হাতে থাকা জবা গাছের ডাল গুলোকে বাম হাতে চালান করে তরীর পার্সটা ডান ঘাড়ে তুলে নিলো সে। চোরা চোখে তরীর দিকে তাকিয়ে সুধালো সে।
–” কেউ খাইয়ে দিলে খেতে পারি!”
তরঙ্গের কথায় হাসলো তরী। ফুচকার মধ্যে টক নিয়ে তরঙ্গের মুখের সামনে ধরলো।
–” নিন,”
হা করে এক গালে ফুচকা টা মুখে নিয়ে। কামড় দিয়ে চোখ বুঁজে ফেললো সে। টকে তার গালের দু’পাশ আটকে গেছে। তরীর দেওয়া ফুচকা হওয়াতে কোনো মতে গিললো তরঙ্গ। খাওয়া শেষে চেঁচিয়ে উঠলো সে।
–” উফফ, আল্লাহ্ গোওও। এসব কি বাল চাল খাচ্ছিস? এত টক কেন? আমার মুখ শেষ।”
আয়েস করে নিজের মুখে একটা ফুচকা নিয়ে হেসে উঠলো তরী।
–” আপনার মুখ তো বোম তৈরির কারখানা। যা বলেন, সব ব্লাস্ট করে। সেই বোম তরীর কারখানা সামান্য টক সহ্য করতে পারছে না?”
থ হয়ে তাকিয়ে রইলো তরঙ্গ। কিছুক্ষণ মস্তিষ্ক হাতড়ে ও কোনো কথা না খুঁজে পেয়ে আমতা আমতা করে বললো।
–” এভাবে আমার সম্মানে আঘাত করতে পারিস না তুই।”
#চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
এতোদিন আমি একটু অসুস্থ ছিলাম। তাই গল্প দিতে পারিনি। তার জন্য দুঃখিত। গল্প কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! আর অবশ্য মন্তব্য করবেন!) See less
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৫
-
জল তরঙ্গের প্রেম গল্পের লিংক
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৭
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১০
-
She is my Obsession পর্ব ৩৩
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৮
-
She is my Obsession পর্ব ২২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১১
-
She is my Obsession পর্ব ৩