#কালারব্লাইন্ড — ১৪
#সোফিয়া_সাফা
দোতলায় আলতার ঘরেই তাকে নিয়ে আসে রঞ্জক। দরজাটা লাগিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে কিশোরীকে চেপে ধরে দরজার সাথেই। আলতার চোখজোড়া শান্ত, নিস্তরঙ্গ, যেন কোনো এক গহীন অতল দীঘির জল। সেই নির্বিকার চোখের অন্তরালে কেমন যেন অবহেলাভরা অনুভূতি ভেসে বেড়াচ্ছে, যা রঞ্জকের শরীরে জ্বলতে থাকা আগুনটাকে আরও উসকে দিল।
ষোড়শী মেয়েটা নিজেকে মুক্ত করার জন্য ছটফট করেনি, না তো মুখ খুলে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছে। তারপরও তার শীতল চোখের দৃষ্টির অভিমুখে রঞ্জক তার হাতজোড়া মাথার ওপর নিয়ে চেপে ধরল। চুলের দিকে ইশারা করে হুমকির স্বরে বলল, “চুল বাঁধিসনি কেন? কেটে ফেলব, অন্য কেউ তোর চুল দেখলে কেটে ফেলব একেবারে।”
কথার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে আলতার চোখের কাছাকাছি ঝুঁকে এল সে। চোখে চোখ রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে যোগ করল, “অন্য কারও দিকে এই চোখ দিয়ে তাকালে চোখদুটোও তুলে ফেলব।”
তার কণ্ঠস্বর ক্রমেই আরও নিচু হয়ে এল। হাস্কি টোনে বলল, “কেউ তোকে দেখে মুগ্ধ হলে আমি তোকেই আগে শেষ করে ফেলব। তারপর শেষ করব সেই কু`ত্তাটাকে, যে তোর দিকে তাকানোর স্পর্ধা দেখাবে।”
আলতার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসির রেখা ফুটে উঠল। কেমন যেন ঠান্ডা গলায় বলল, “আপনি এগুলো কেন করবেন? আমার চুল, চোখ, পুরো শরীরটাই শুধুমাত্র আমার নিজের। আপনি কেন হস্তক্ষেপ করতে আসছেন? আমি কে হই আপনার? আমাকে দেখে অন্য কেউ মুগ্ধ হলেই বা আপনার সমস্যা কোথায়?”
রঞ্জকের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠতে লাগল। আসলেই তো, সে কেন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে? আলতা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে চলাফেরা করুক গিয়ে। সে কেন বাধা দিতে চাইছে? কেন তার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? মেয়েটা সামনে এলেই কেন আশপাশের জগৎটা ধোঁয়াটে হয়ে যায়, এমনকি সময়ের সাধারণ গতিতেও স্থিরতা আসে?
“আপনি বর্ণান্ধ বলেই কি আমার চুল আর চোখের রং দেখতে না পারার আক্ষেপে এমন আচরণ করছেন? সেটাই বা কেন করবেন? কেন আমাকে পরিপূর্ণভাবে দেখতে না পারার ব্যর্থতা আপনাকে দগ্ধ করবে?”
রঞ্জকের হাতের মুষ্টি আলতার কবজিতে আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল, হাতের রগে টান পড়ল আলতার। তবুও ব্যথার কোনো ছাপ ফুটে উঠল না কিশোরীর চোখে। গাঢ় বাদামি চোখজোড়া যেন এখনও বিদ্রুপ করছে সামনে দণ্ডায়মান পুরুষকে।
“আপনার হাত আবার নোংরা হয়ে যাচ্ছে। ছাড়ুন আমাকে। আরও কিছুক্ষণ আমার সংস্পর্শে থাকলে পচন ধরতে শুরু করবে।”
রঞ্জকের গায়ে কাঁটা দিল। মাথা তুলে আনমনে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বলল, “ধুয়ে নেব…আমি ধুয়ে নেব।”
“সব নোংরা ধুয়েমুছে সাফ করা যায় না। যদি যেত, তাহলে আমিও নিজেকে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলতে পারতাম। আপনি আমাকে নোংরা-আবর্জনা বলে অপমান করার সুযোগ পেতেন না।”
রঞ্জকের নিঃশ্বাস থমকে গেল। শরীরটা যেন অবসন্ন হয়ে প্যারালাইজড হয়ে আসছে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল তার। একবার চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিয়ে ফের আলতার দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার মুখ এক লহমায় বদলে গেছে, পেলব সুশ্রী মুখশ্রী জুড়ে এখন শুধুই কালো দাগের ছড়াছড়ি। হঠাৎ এমন পরিবর্তনে রঞ্জক দিশেহারা হয়ে পড়ল। হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে! কী হচ্ছে তার সাথে? সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে?
আলতা তখনও নির্বিকার। আশ্চর্য! মেয়েটার হাত তো সে চেপে ধরে রেখেছে, নিজেও মেকআপ তোলার চেষ্টা করেনি, তবুও কীভাবে দাগগুলো দেখতে পাচ্ছে সে?
“এ-এই দাগগুলো?”
আলতা বিষাদময় কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, এই দাগগুলো; এগুলোই তো দেখতে চেয়েছিলেন আপনি। দেখুন এবার, ভালো করে দেখুন।”
“না! না! আমি দেখতে চাই না এগুলো!” রঞ্জক আতঙ্কে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, “ঢাকো! ঢেকে ফেলো এগুলো! আমি দেখতে চাই না!”
দৃশ্যটা সহ্য করতে না পেরে রঞ্জক পুনরায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। অস্থিরতায় একই কথা আবৃত্তি করতে লাগল বারবার।
সময় যেন আবার প্রবহমান হলো।
নিস্তব্ধতা চিরে কেউ একজন তার বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিল, “রঞ্জু! এই রঞ্জু?”
চোখ মেলে তাকাতেই এক অনাস্বাদিত স্তব্ধতায় থমকে গেল রঞ্জক। কান আর গালের মাঝে চেপে রাখা ফোনটা একঘেয়ে শব্দে বেজে চলেছে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রঞ্জক চারপাশে তাকাল। সিঁড়ি, রেলিং… সামনে শঙ্কিত মুখে দাঁড়িয়ে ফুপু—আরজু বেগম।
আলতা কোথায়? কোথায় সেই বন্ধ দরজা? সেই আঁচড়ের কালচে দাগে ভরপুর মুখটা?
“কী রে, কী হয়েছে তোর? এভাবে চোখ-মুখ খিঁচে সিঁড়ির মাঝপথে দাঁড়িয়ে কী বিড়বিড় করছিস?”
রঞ্জক হতবিহ্বল চোখে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখল। কঙ্কা কল করে যাচ্ছে। মেয়েটা রঞ্জকের সাড়াশব্দ না পেয়ে ভেবেছিল নেটওয়ার্কে সমস্যা, তাই কল কেটে দিয়ে আবার একাধারে কলব্যাক করে যাচ্ছে।
আরজু বেগম চিন্তিত সুরে বিলাপ করলেন, “ঘেমে-নেয়ে কী অবস্থা করেছিস নিজের! ওদিকে ফোনটা যে কতক্ষণ ধরে বাজছে, সেই দিকেও খেয়াল নেই!”
রঞ্জক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে কলটা কেটে দিয়ে ফোনটা সুইচড অফ করে রাখল।
আরজু বেগম তার বাহু ধরে সিঁড়ি থেকে নিচে নামানোর প্রয়াস করে বললেন, “আয়, নিচে আয় আমার সাথে।”
রঞ্জক পা বাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু মনে হলো শরীরের হাড়-মাংসগুলো যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই তাতে। তবুও কোনোরকমে জং-ধরা পা দুটো টেনে টেনে ড্রয়িংরুমের সোফা পর্যন্ত গিয়ে গা এলিয়ে দিল সে। কনুই তুলে শার্টের হাতা গুটাল, কলারের টাইটা টেনে আলগা করে কবজির হাতঘড়িতে চোখ রাখল।
সময় দেখে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল সে। প্রায় আধা ঘণ্টা! এতক্ষণ ধরে সে সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হ্যালুসিনেশনে ভাসছিল?
“এবার বল, কী হয়েছে তোর?” ফুপুর প্রশ্নে রঞ্জক চমকে উঠে চারপাশটা একবার দেখে নিল। ধারেকাছে কেউ নেই।
তারপর শুষ্ক কণ্ঠে উচ্চারণ করল, “জানি না।”
“কোনো বিষয় নিয়ে টেনশনে আছিস?”
রঞ্জক কিছুক্ষণ নিস্পন্দ থেকে আস্তে করে ডানে-বামে মাথা নাড়ল।
“যতই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করিস না কেন, আমি কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারছি।”
রঞ্জক শুকনো ঢোক গিলে নিজের থুতনিটা একটু উঁচিয়ে বলল, “কী…বুঝতে পারছ?”
রঞ্জকের কাঁধে হাত রেখে আরজু বেগম বললেন, “টেনশনে থাকারই কথা, এমন একটা বিয়ের ফাঁদে আটকে থেকেও চিন্তামুক্ত থাকা যায় নাকি? ভাইয়াকে দেখলাম, মেয়েটাকে নিয়ে আদিখ্যেতার শেষ নেই, এখন আবার নিয়ে গেছে কলেজে ভর্তি করাতে। মেয়েটাকে নাকি পড়াশোনা করাবে। হাহ! ঢং দেখলে বাঁচি না। নিজের ছেলের সর্বনাশ করে অন্যের মেয়েকে নিয়ে মাথায় তুলে নাচছে।”
রঞ্জক বুকের ওপর দু-হাত গুটিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে মৃদু স্বরে জানতে চাইল, “ওনারা… চলে গেছেন?”
“হ্যাঁ, মাত্রই তো বেরোলেন।”
রঞ্জক উঠে দাঁড়াল। আরজু বেগম তড়িঘড়ি বললেন, “আরে কোথায় যাচ্ছিস? ব্রেকফাস্ট করে যা।”
রঞ্জকের মুখখানা বিবর্ণ। বিরসমুখে বলল, “ক্ষুধা নেই ফুপি।”
“বেলা এগারোটা বাজে রঞ্জু! এখনও বলছিস ক্ষুধা নেই?”
“যখন ক্ষুধা লাগবে তখন খেয়ে নেব। এখন দেরি হয়ে যাচ্ছে ফুপি। যেতে হবে আমাকে।”
রঞ্জক আর কিছু বলার সুযোগ দিল না। ত্রস্ত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
‘গ্রিনল্যান্ড কলেজ অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি’—রাজধানী অ্যাল্টানিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এখানে পড়ার সুযোগ পাওয়া যেমন কঠিন, তার চেয়েও কঠিন এর বিপুল খরচের বোঝা বহন করা। অবশ্য আলতার ক্ষেত্রে কোনোটাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আরিজ মাহতাবির নিজের প্রভাব ও আধিপত্যের জেরে মেয়েটার ভর্তি নিশ্চিত করেছেন। মাহতাবির বংশের প্রায় সব ছেলেমেয়েই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, অবশ্য রঞ্জক বাদে।
আলতাকে ভর্তি করিয়ে আরিজ মাহতাবির অফিসে চলে গেছেন। ফারিশ আলতাকে নিয়ে যাচ্ছে ক্লাসরুমের দিকে। তাদের সাথে একজন প্রফেসরও আছেন। ফারিশ আর প্রফেসর নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। কথার মাঝেও ফারিশের দৃষ্টি বারবার পিছে পড়ে থাকা আলতার দিকে চলে যাচ্ছিল। প্রতিবারই অবশ্য দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল সে।
আলতা সেসব খেয়াল করছে কি না বোঝার উপায় নেই। মাথা নিচু করে হাঁটছিল সে। অপরিচিত জায়গা, চারপাশে অচেনা মানুষ; তার হাঁটার ভঙ্গিতেই জড়তা আর আড়ষ্টতা স্পষ্ট।
তারা ক্লাসরুমে ঢুকতেই লেকচার দিতে থাকা শিক্ষক থেমে দরজার দিকে ফিরলেন। একে একে পুরো ক্লাসের দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো তাদের ওপর। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বসে থাকা শিক্ষার্থীরা উঠে দাঁড়াল।
প্রফেসর এবার সবার সামনে আলতার পরিচয় তুলে ধরলেন, “এভরিওয়ান, মিট ইওর নিউ ক্লাসমেট—মানতাশা রেহবার আলতা। আজ ওর প্রথম ক্লাস। আই হোপ এভরিওয়ান উইল হেল্প হার আউট, রাইট?”
আলতাকে দেখার পর পুরো ক্লাসরুমে এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। মেয়েরা একে অন্যের সঙ্গে নিচু স্বরে কানাকানি শুরু করল। কয়েকজন ছেলে আবার উৎসুক চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
আলতা তখনও সংকোচ কাটিয়ে কারও দিকে তাকাতে পারেনি। প্রফেসর এবার আলতার দিকে ফিরে বললেন, “মিস রেহবার, প্লিজ টেইক ইওর সিট।”
ইংরেজি কথাটার মানে আলতা বুঝল না। ফারিশ পরিস্থিতি সামলাতে আলতার কানের কাছে ফিসফিস করল, “স্যার তোমাকে আসন গ্রহণ করতে বলেছেন।”
আলতা একবার ফারিশকে দেখে নিয়ে যান্ত্রিক গতিতে হেঁটে চলে গেল ক্লাসের পেছনের সারিতে। সামনের ও মাঝের সারিতে কয়েকটা ফাঁকা আসন চোখে পড়লেও সে সেসব এড়িয়ে গিয়ে বসল একদম শেষ বেঞ্চে। তার পাশেই বসে ছিল একটা মেয়ে।
আলতাকে নিজের পাশে এসে বসতে দেখে মেয়েটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শুধু সেই মেয়েটিই নয়, উপস্থিত সবার চোখ আবার আলতার দিকে ঘুরে গেল; তবে এবার তাদের দৃষ্টিতে কৌতূহল নয়, বরং ফুটে উঠল এক ভয়ার্ত আর্তি!
আলতা নিচের ঠোঁটে দাঁত বিঁধিয়ে মাথাটা আরও নিচু করে ফেলল। একসঙ্গে এতগুলো চোখ নিজের ওপর স্থির হয়ে থাকায় বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল তার। কেন সবাই এভাবে তাকাচ্ছে? বুঝে উঠতে পারল না সে। বুকের ভেতরে নেতিয়ে পড়ে থাকা শঙ্কাটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, ‘আমার চেহারার দাগগুলো কি দেখা যাচ্ছে?’
কিশোরীর গলার কাছে একদলা কান্না এসে আটকে গেল। তাদের প্রত্যেকের এমন অদ্ভুত চাউনিতে ফারিশও অবাক হলো। পরিস্থিতি থমথমে হয়ে ওঠার আগেই সে গলা খাঁকারি দিয়ে গমগমে গলায় জানিয়ে দিল, “ও আমার কাজিন হয়। ক্লাসের সবাই যেন এই কথাটা মাথায় রাখে।”
সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকে নিজেদের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আলতাকে দেখে তারা ভুলেই গিয়েছিল মেয়েটা ফারিশের সঙ্গে এসেছে। গ্রিনল্যান্ড কলেজের বিশাল ক্যাম্পাসে ফারিশ মাহতাবিরকে চেনে না, এমন কাউকে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরাও তার ব্যতিক্রম নয়। মাত্র এক মাস হলো তারা কলেজে ভর্তি হয়েছে, এর মধ্যেই ফারিশের ব্যক্তিত্ব আর দাপুটে পরিচিতি সবার জানা।
আলতা ব্যাগের চেইন খুলে ভেতরে হাত ঢোকাল। একের পর এক বইয়ের মলাটে আঙুল ছুঁয়ে গেল তার। কোনটা বের করবে বুঝতে পারল না। শেষ পর্যন্ত চোরাচোখে পাশে বসা মেয়েটার দিকে তাকাল। কিন্তু পরক্ষণেই ভড়কে গিয়ে চোখ সরিয়ে নিল; কারণ মেয়েটাও তার দিকেই তাকিয়ে ছিল!
মেয়েটা হালকা গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “তুমি কি চুলে রং করেছ?”
আলতা থতমত খেয়ে গেল। তবুও তার বুকে স্বস্তির বাতাস বয়ে গেল এটা ভেবে যে, দাগগুলো হয়তো দেখা যাচ্ছে না। দাগগুলো চোখে পড়লে নিশ্চয়ই মেয়েটা দাগের কথা জিজ্ঞেস না করে চুলের কথা জানতে চাইত না।
আলতা নাবোধক মাথা নাড়তেই মেয়েটা ফের শুধাল, “আমি কি জানতে পারি, ক্লাসের এতগুলো ফাঁকা সিট ফেলে রেখে তুমি ঠিক আমার পাশেই এসে বসলে কেন?”
আলতা এবার সাহস সঞ্চয় করে একটু চোখ তুলে তাকাল পাশে বসা মেয়েটার দিকে। দেখতে-শুনতে মেয়েটা ফর্সা সুন্দর, মিষ্টি দেখতে। শার্প জ’লাইন আর মাথায় একরাশ কোঁকড়ানো চুল; সব মিলিয়ে বেশ একটা আধুনিক আর স্টাইলিশ ভাব আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে।
আলতাকে নীরব দেখে মেয়েটা ভুরু জোড়া সামান্য কুঁচকে তাগাদা দিল, “কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি।”
আলতা আমতা আমতা করে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “ত-তেমন কোনো কারণ নেই। আজ প্রথম দিন তো… তাই ভাবলাম…”
“তাই ভাবলে পেছনের সিটে বসা কম্ফোর্টেবল হবে?”
আলতা কথাটার পুরো মর্মার্থ বুঝতে পারল না, তাই আড়ষ্ট হয়ে চুপ করেই রইল। মেয়েটা আবার বলল, “তা, তোমার কাঙ্ক্ষিত কম্ফোর্ট পেয়েছ কি?”
আলতার ভীষণ অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। সে বুঝেই উঠতে পারছে না ‘কম্ফোর্ট’ মানে মেয়েটা ঠিক কী বোঝাতে চাইছে। মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড নির্নিমেষ চোখে আলতার আড়ষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমার চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি উল্টো আনকম্ফোর্টেবল ফিল করছো।”
আলতার কপালে এবার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে চিকচিক করে উঠল। মেয়েটার প্রশ্নের কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারল না সে। ঠোঁট দুটো কয়েকবার নড়ে উঠলেও কোনো শব্দ বের হলো না। শেষ পর্যন্ত মেয়েটাও আর কিছু বলল না। ক্লাস চলাকালীন তাদের মাঝে আর একটা শব্দও আদান-প্রদান হলো না।
অবশেষে ছুটির ঘণ্টা বাজল। আলতা সিটে বসেই ফারিশের জন্য অপেক্ষা করছিল। পাশে বসে থাকা মেয়েটা নিজের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে আসন ত্যাগ করে আলতার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি নিশ্চয়ই পরেরবার আমার পাশে বসবে না?”
আলতা প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চাইল। মেয়েটা তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমি জানি তুমি বসবে না। তবে আজকে আমার পাশে বসার জন্য ধন্যবাদ তোমাকে।”
আলতা কথাটার মানে পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও মেয়েটার আন্তরিক হাসির উষ্ণতায় নিজের জড়সড় হাতটা এগিয়ে দিল। করমর্দন শেষে মেয়েটা একটা মুচকি হাসি উপহার দিয়ে উল্টো ঘুরে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল। আলতা তখনও অবাক চোখে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল; আরে, মেয়েটার নামটাই তো জানা হলো না!
তন্মধ্যে আলতার গায়ে দুটো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এসে বিঁধল। সে খেয়াল করল, সামনের দুটো ছেলে বাইরে না বেরিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। শুধু তাই নয়, আশপাশের কয়েকজন মেয়েও হয়তো কিছু বলতে চাইছে কিন্তু সাহস পাচ্ছে না।
আলতার কপালে ভাঁজ পড়ল। বুকের ভেতর আবার ভয়ের প্রকম্পন সৃষ্টি হলো। সে তড়িঘড়ি ব্যাগ থেকে একটা ছোট আয়না বের করে নিজের মুখখানা খুব কাছ থেকে খুঁটিয়ে দেখল। না, মেকআপ তো একদম ঠিকঠাকই আছে! কোথাও দাগগুলোর ছাপ ফুটে ওঠেনি। তবে সবাই কেন এভাবে তাকাচ্ছে?
ঠিক তখনই ক্লাসের দরজায় এসে দাঁড়াল ফারিশ।
সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদুটো দৃষ্টি সরিয়ে কেটে পড়ল। মেয়েগুলোও আরও দূরত্ব বাড়িয়ে দিল। আলতা দ্রুত ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে গেল ফারিশের দিকে। ফারিশ পকেটে হাত গুঁজে তার পাশাপাশি হাঁটা ধরল।
“আজকে কলেজের প্রথম দিন কেমন লাগল?” ফারিশ সহজ গলায় জানতে চাইল।
আলতা তপ্তশ্বাসে বলল, “স্যারের কথা আমি কিছুই বুঝিনি। আমার পাশে একটা মেয়ে বসেছিল। কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু আমি কী বলব খুঁজেই পাইনি। সব মিলিয়ে একদমই ভালো ছিল না। আমার মনে হয় না আমি এই কলেজে পড়ার যোগ্য।”
ফারিশ নাক কুঁচকে বলল, “এভাবে বোলো না, আস্তে আস্তে তুমিও সব শিখে যাবে।”
আলতা উদাস ভঙ্গিতে ঠোঁট ফুলিয়ে আওড়াল, “কবে যে সেই দিন আসবে।”
ফারিশ পাশ ফিরে তাকিয়ে অন্য প্রসঙ্গে গেল, “তোমাকে আমি নাম ধরে ডাকলে কিছু মনে করবে না তো?”
আলতার পা থেমে গেল। ফারিশ ব্যাখ্যা টেনে বলল, “বয়সে তুমি আমার ছোট হলেও সম্পর্কে বড়। আমার হয়তো নাম ধরে ডাকা ঠিক হবে না। অন্যদিকে মেজো ভাইয়া তোমাকে বউ হিসেবে মেনেই নেয়নি, তাই ভাবিও ডাকতে পারব না। কী করব তুমিই বলো।”
আলতা মলিন হেসে বলল, “আপনি আমাকে নাম ধরেই ডাকতে পারেন, ভাইয়া।”
ফারিশ আঁড়চোখে তাকাল। মেয়েটা এই প্রথম ভাইয়া বলে ডেকেছে তাকে। খারাপ লাগেনি, ভালোই লেগেছে বেশ।
ফারিশ আলতো হেসে বলল, “ঠিক আছে, আলতা। চলো, তোমাকে গাড়িতে তুলে দিই। তাঁরার সাথে চলে যাও।”
“আপনি যাবেন না?”
ফারিশ হাতের ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে জবাব দিল, “আমার আরও একটা ক্লাস আছে।”
“ও আচ্ছা, তাঁরা আপু কোথায়?”
“গাড়িতে অপেক্ষা করছে।”
এরপর আর কোনো কথা হলো না তাদের মাঝে। কলেজের মূল ফটক পেরিয়ে তারা দুজন পার্কিং এরিয়ার দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই কারও আকুতিভরা কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“আর পারছি না… এবারের মতো ছেড়ে দিন!”
আলতা থমকে দাঁড়াল। মূল ফটকের পাশের উঁচু ঢিবিটার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল, তিন-চারজন তরুণ মিলে একটা ছেলেকে জোর করে কান ধরে উঠবস করাচ্ছে। এক লিডার গোছের যুবক ঢিবির ওপর আয়েশ করে বসে ঠান্ডা পানীয়ের ক্যানে চুমুক দিতে দিতে সেই দৃশ্য উপভোগ করছে। লোকটার দৃষ্টি ইতোমধ্যে আলতার ওপর স্থির হয়েছে। যুবকের চেহারা নজরে আসতেই আলতা নিষ্পলক হয়ে গেল। এই যুবককে আগেও দেখেছে সে।
উঠবস করতে থাকা ছেলের উদ্দেশ্যে গ্যাংয়ের অন্য একজন বলে উঠল, “চুপচাপ করে যা! যতক্ষণ না শ্রেয়ান ভাইয়ের মন ভরছে, ততক্ষণ থামবি না!”
ফারিশ লক্ষ করল, শ্রেয়ান নামের ছেলেটা এখনো আলতার দিকে তাকিয়ে আছে। আলতা মাথা নিচু করে নিলেও শ্রেয়ানের দৃষ্টি সরেনি।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ফারিশ এবার গলা চড়িয়ে বলল, “ওই হ্যালো, ওভাবে কী দেখিস? ও আমার কাজিন। বুঝলি?”
ফারিশের গলা শুনেই শ্রেয়ান হাতে থাকা পানীয়ের ক্যানটা ছুড়ে ফেলল। তারপর উঠবস করতে থাকা ছেলেটার পিঠে দুটো আলতো চাপড় মেরে বলল, “যা, ভাগ এখান থেকে! আজকের মতো মাফ করে দিলাম।”
কথাটা শোনামাত্রই ছেলেটা দৌড়ে স্থান ত্যাগ করল।
শ্রেয়ান ফারিশের দিকে এগোতেই আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফারিশের অনুসারী কয়েকজন ছেলে দ্রুত এগিয়ে এসে ফারিশের পেছনে জড়ো হলো। কারও হাতে ভারী ব্যাগ, কারও কাঁধে লেদার জ্যাকেট। এক অদ্ভুত টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি হলো চত্বরে। ফারিশ হাতের সূক্ষ্ম ইশারায় আলতাকে নিজের পেছনে সরে যেতে নির্দেশ করল। আলতা ফারিশের পিঠের আড়ালে কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল।
শ্রেয়ান নিজের কাঁধ টানটান করে একগাল হেসে বলল, “আরে ফারিশ! কুল ডাউন ম্যান! তুই কি ভাবছিস আমি তোর সাথে গণ্ডগোল পাকাতে এসেছি?”
ফারিশ ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল, “তাহলে কেন এসেছিস?”
শ্রেয়ান ফারিশকে টপকে পিছে লুকিয়ে থাকা আলতার ওপর গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “এই মেয়েটা আমার পরিচিত।”
ফারিশ কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে ভুরু উঁচিয়ে আলতার দিকে ঘুরে তাকাল, “আলতা… তুমি কি ওকে চেনো?”
আলতা প্রথমে মাথা নাড়তে গিয়েও থেমে গেল। কী ভেবে যেন ধীরে ধীরে ‘না’ সূচক মাথা দোলাল। শ্রেয়ান ফিক করে হেসে ফেলল, “ওহহো, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না, আলতা?”
আলতা চমকে তাকাল, “আ-আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?”
শ্রেয়ান বলল, “মাত্রই তো ফারিশ ডাকল নাম ধরে।”
আলতা আবার চোখ তুলে তাকাল শ্রেয়ানের দিকে। শ্রেয়ান তাকিয়ে ছিল তার দিকেই। ফারিশ এক কদম এগিয়ে শ্রেয়ানকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে শক্ত গলায় বলল, “মনে তো হচ্ছে না আলতা তোকে চেনে। আগ বাড়িয়ে খাতির করতে এলে কিন্তু পরিণতি ভালো হবে না, শ্রেয়ান।”
শ্রেয়ানের লোকেরা এগিয়ে আসতে চাইলে শ্রেয়ান হাত উঁচিয়ে বারণ করল, “সবসময় হাতাহাতির মুডে থাকলে পোষায় নাকি?”
শ্রেয়ানের মুখে কথাটা শুনে আশপাশের ছেলেগুলোর কয়েকজন মুচকি হেসে ফেলল। যে লোক সুযোগ পেলেই ক্যাম্পাসে তুলকালাম কাণ্ড বাধায়, তার মুখে এমন শান্তির বাণী সত্যিই বড় বেমানান!
ফারিশ চোখ ছোট ছোট করে প্রশ্ন করল, “তুই ওকে কীভাবে চিনিস, শ্রেয়ান?”
“ডেলভিয়ায় পাহাড় দেখতে গিয়েছিলাম, তখন দেখা হয়েছিল।”
“ব্যস? এমন ভাব করলি যেন আত্মীয়ের সম্পর্ক আছে ওর সাথে।”
শ্রেয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তা নেই। কিন্তু তোর সাথে ওর কিসের সম্পর্ক শুনি? কোথায় পেলি ওকে?”
ফারিশ গম্ভীর গলায় বলল, “বললামই তো, শুনিসনি? ও আমার কাজিন হয়।”
শ্রেয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। গম্ভীর গলায় শুধাল, “কেমন কাজিন?”
ফারিশ ঝটপট বলল, “অতশত জেনে তুই কী করবি? রাস্তা থেকে সর। আলতার সামনে আমি কোনো ঝামেলা করতে চাই না।” শেষ কথাগুলো ফারিশ বেশ নিচু স্বরে, চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল।
শ্রেয়ান কয়েক সেকেন্ড ফারিশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসিটা ফিরিয়ে এনে সামনে থেকে সরে দাঁড়াল।
ফারিশ আলতাকে নিয়ে গাড়ির দিকে এগোতে লাগল। পেছনে ফারিশের অনুসারী ছেলেগুলোও এবার সাথে সাথে হাঁটছে। আলতা ভয়ে নিভু নিভু চোখে একবার তাদের দেখে নিয়ে পা টিপে টিপে ফারিশের কাছাকাছি হাঁটতে লাগল।
অতঃপর গাড়িটার কাছে পৌঁছে আলতাকে পেছনের সিটে তুলে দিল ফারিশ। তারপর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে নিজে আবার ক্যাম্পাসের দিকে পা বাড়াল।
গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার যান্ত্রিক শব্দ হতেই পাশের সিটে বসে থাকা তাঁরা বিরক্ত চোখে আলতার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, “কী করছিলে এতক্ষণ? কতক্ষণ ধরে বসে আছি জানো?”
আলতা কোলের ওপর রাখা ব্যাগের চেইনে অপরাধীর মতো আঙুল বোলাতে বোলাতে মিনমিন করে বলল, “আমি কিছুই করিনি, ভাইয়াই দেরি করে আনতে গিয়েছিল।”
“তুমিই বা ওর অপেক্ষায় বসেছিলে কেন? নিজে নিজে চলে আসতে পারোনি?”
“আমি তো ভালো করে চিনি না, তাই বের হইনি।”
আলতার উত্তর শুনে তাঁরা বিরক্তিতে অদ্ভুত শব্দ “চিঁছ!” উচ্চারণ করে মুখ ফিরিয়ে নিল। বাকি পথটুকু নীরবেই কাটল তাদের।
সন্ধ্যার ঘনঘটা ফুরিয়ে ততক্ষণে রাতের আঁধার নেমে এসেছে ধরণীর বুকে। অফিস ছুটির পর রঞ্জক আর তুষার চলে এসেছে তাদের সিক্রেট প্লেসে। খোলা ছাদের রেলিং থেকে শূন্যে পা ঝুলিয়ে দুজন পাশাপাশি বসে আছে।
“তোকে আজ অফ মুডে দেখাচ্ছে। কী হয়েছে বল তো? সারাটা দিন মনমরা হয়ে আছিস। পার্টির মিটিংয়েও গেলি না। এমন করলে কী হবে?”
রঞ্জক কোনো উত্তর না দিয়ে পেছনে হেলে ফ্লোরের ওপর শুয়ে পড়ল। ওপরের আলোয় ঝলমলে আকাশের পানে তাকিয়ে রইল নিষ্পৃহ চোখে, “আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না রে তুষার…”
“কী হয়েছে তা না বললে বুঝব কীভাবে?”
“আমি নিজেই তো বুঝতে পারছি না। তোকে কীভাবে এক্সপ্লেইন করব?”
তুষারও আর বসে না থেকে রঞ্জকের পাশে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল, “কোন বিষয় নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছিস, সেটা অন্তত বল। আমার জানামতে, তোর তো এখন মন খারাপ করে বসে থাকার কথা না! কোমর বেঁধে নির্বাচনের প্রচারের কাজে নামবি, তা না করে বসে বসে ঝিমাচ্ছিস!”
আকাশে স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে দেওয়া একফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে রঞ্জক একদম বেখেয়ালে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা তুষার… মেয়েটার চোখজোড়া অনেক সবুজ, তাই না রে?”
এহেন অযাচিত প্রশ্নে তুষার হতবুদ্ধি হয়ে গেল। ভ্রূদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলে পাশ ফিরে রঞ্জকের দিকে তাকাল সে। রঞ্জক আবার বিড়বিড় করল, “লাল চুল? খুব লাল? অনেক সুন্দর দেখায়, তাই না?”
তুষার শুধু শুনেই গেল। বলল না কিছুই। বন্ধুর এই অসংলগ্ন, ভাঙাচোরা কথাগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগল সে।
“মেয়েটার বয়স কত জানিস?” রঞ্জকের প্রশ্নের উত্তরে তুষার পাল্টা প্রশ্ন করল, “কত?”
“ষোলো বছর ষোলো দিন।”
“ওহ।”
“আরও একটা জিনিস জানিস?”
“কী?”
“এএম ওকে গ্রিনল্যান্ডে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে!”
“ভালো তো।”
রঞ্জক ফট করে লাফিয়ে উঠে বসল। বিস্ময়ের সাথে বলল, “সত্যিই ভালো করেছে? গ্রিনল্যান্ড হচ্ছে কো-এড কলেজ, ছেলেমেয়েরা সব একসাথে পড়াশোনা করে তুষার। একই ক্লাসে, একপাশে ছেলে একপাশে মেয়ে। লাঞ্চ ব্রেকে ছেলেমেয়েরা একই ক্যান্টিন ইউজ করে। পরীক্ষার হলে সিটপ্ল্যান করার সময় জেন্ডার বাছবিচারই করা হয় না।”
তুষারও উঠে বসল। রঞ্জকের দিকে তাকিয়েই কথার রেশ ধরল, “হুমম… সুন্দরী মেয়েরা নিশ্চয়ই প্রতিদিনই লাভ লেটার পায় সেখানে। ইঁশ, আমি যদি ওই কলেজে পড়ার সুযোগ পেতাম, আমারও দেখতি ১০-১৫ টা গার্লফ্রেন্ড থাকত। কিন্তু তা তো তোর জন্যই হলো না। তোর মতো নিরামিষাশীর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাকেও শেষমেশ সেই বয়েজ কলেজেই ঘাঁটি গাড়তে হলো!”
রঞ্জক চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর গলায় বলল, “সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট বয়স আর সময় আছে তুষার! স্টুডেন্ট লাইফ কখনোই প্রেমে পড়ার কিংবা গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সঠিক সময় নয়!”
“এসব নীতিবাক্য আমাকে না শুনিয়ে তোর সেই মেনে-না-নেওয়া পিচ্চি বউটাকে গিয়ে বোঝা ভাই! কে বলতে পারে এসব নীতিকথা শুনে হয়তো ডিভোর্সের আগ পর্যন্ত মেয়েটা তোর প্রতি লয়্যাল থাকলেও থাকতে পারে!”
রঞ্জক রক্তচোখে তাকাতেই তুষার নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল, “সরি সরি! টাং স্লিপিং ব্রো! আমি ইচ্ছে করে বলিনি!”
“আমি জানতাম তোর সাথে শেয়ার করলে উল্টো মেজাজ খারাপ হবে আমার। সেই জন্যই বলতে চাইনি।”
তুষার হড়বড়িয়ে গিয়ে সুর বদলে ফেলল, “আরে তুই সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন? বল আমাকে, আমি শুনছি তো।”
“শুনতে হবে না তোকে।”
“আরে বল না ভাই। রাগ করছিস কেন?”
“আমি বলতেই পারি, তবে একটা শর্তে।”
“হুম বল, কী শর্ত?”
“তুই আমাকে জাজ করবি না।”
তুষার চওড়া হাসল, “করব না, শুধু বলে ফেল, কোন বিষয় নিয়ে এত ওরিড?”
রঞ্জক এবার গড়গড়িয়ে বলতে শুরু করল, “আমি বিয়েটা মানি না ঠিকই! কিন্তু তুষার… মেয়েটা তো আমার বিয়ে করা বউ, তাই না? আমি সমস্ত সামাজিক রীতিনীতি আর আইনি নিয়ম মেনেই ওকে কবুল বলেছি! আমার সেই বিয়ে করা বউয়ের দিকে অন্য কেউ কুনজরে তাকাবে—এই সম্ভাবনাটাই অশান্তি দিচ্ছে আমাকে। এএমকে সাজেস্ট করেছিলাম সেন্ট মেরিজের কথা, কিন্তু উনি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মেয়েটাকে স্বীকৃতি পাইয়ে দিতে চাইলেন। তুই-ই বল, উনি কি কাজটা ঠিক করেছেন?”
তুষার মনে মনে হাসল খুব। তবে সেই হাসি মুখে ফুটতে দিল না। মুখটাকে গম্ভীর রেখে বলল, “একদমই ঠিক করেননি। ঘোর অন্যায় করেছেন উনি।”
“হ্যাঁ, সেটাই তো বলছি!” রঞ্জক সায় পেয়ে বলে চলল, “তারপর আমি এএমকে বললাম, মেয়েটা অন্তত কলেজে গিয়ে নিজেকে ‘বিবাহিতা’ হিসেবে ইন্ট্রোডিউস করাক, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই! কিন্তু এএম সেটাও কানে তুললেন না! উল্টো সাফ জানিয়ে দিলেন, আমি যদি প্রকাশ্যে নিজেকে বিবাহিত ঘোষণা করি, তবেই নাকি মেয়েটাও নিজেকে বিবাহিতা বলবে! আরে, আমি উনাকে কীভাবে বোঝাব? ও তো একটা মেয়ে! অন্তত ‘বিবাহিতা’ ট্যাগটা থাকলে বাজে ছেলেদের কুনজর থেকে কিছুটা হলেও বাঁচতে পারত। কিন্তু না, উনি তো কিছু বুঝতেই চাইবেন না।”
তুষার বহু কষ্টে হাসি চেপে রেখে বিজ্ঞদের মতো বলল, “আমার কী মনে হয় জানিস ব্রো? তোর বাপ ডিভোর্সের পরপরই মেয়েটাকে অন্য কোথাও ধামাধাম বিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করে রেখেছেন। সেই জন্যই তোদের বিয়েটা গোপন রাখা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।”
“বিয়ে দিয়ে দেবেন?”
“হ্যাঁ! তুই যেমন ডিভোর্সের পরপরই কঙ্কাকে বিয়ে করে নিবি, ঠিক তেমনি তোর মেনে-না-নেওয়া বউকেও উনি অন্য কারও হাতে তুলে দেবেন! মিলিয়ে নিস আমার কথাটা!”
রঞ্জক বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর গা-ছাড়া ভাব নিয়ে বলল, “হাহ্! ওকে আবার কে বিয়ে করবে?”
তুষার আড়চোখে চেয়ে বলল, “তুই বলতে চাইছিস ওকে কেউ বিয়ে করবে না?”
“শুধু বলতে চাইছি না, এটাই হবে দেখিস। ওকে কেউ বিয়ে করবে না।”
“তোর মনে হয় না তুই একটু বেশি বেশিই বলে ফেলছিস?”
“একদম না।”
“এতটা জোর দিয়ে কীভাবে বলছিস?”
রঞ্জক উত্তর দিল না। তুষার তাগাদা দিয়ে ফের জানতে চাইল, “বল না, কেন কেউ মেয়েটাকে বিয়ে করবে না?”
রঞ্জক ধুপধাপ করে উঠে দাঁড়াল। এই মুহূর্তে আর এসব নিয়ে একটা কথাও বলতে ইচ্ছে করছে না তার। সে হনহন করে হাঁটা ধরতেই তুষারও তার পিছু নিল।
“আমি একটা জিনিস মেলাতেই পারছি না, মেয়েটার মধ্যে কোনো ত্রুটি আমার চোখে পড়েনি। মানলাম তুই কালারব্লাইন্ড, ওর চুল আর চোখের বিশেষত্ব হয়তো তোর চোখে ধরা পড়েনি। তবুও কি স্রেফ এই একটা কারণই যথেষ্ট বিয়ে করা বউকে তালাক দেওয়ার জন্য?”
রঞ্জকের পায়ের গতি সহসা দ্বিগুণ হয়ে গেল। দ্রুত গিয়ে সে লিফটে ঢুকে লিফটের বোতাম চেপে দিতেই তুষারও কোনোমতে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
“তুই কি এড়িয়ে যাচ্ছিস? শুধুমাত্র নিজের ব্যর্থতার জন্য বউকে তালাক দিয়ে দিবি? একবার ভেবে দেখ না, তুই ওকে প্রোপারলি দেখতে পাচ্ছিস না, এখানে ওর দোষটা কোথায়?”
“তোর মনে হচ্ছে শুধুমাত্র এই কারণে আমি ওকে ডিভোর্স দেব?”
তুষার রঞ্জকের কাঁধে হাত রেখে বোঝানোর সুরে বলল, “আমি বুঝতে পারছি, মেয়েটা তোর চেয়ে অনেক ছোট, উচ্চতাও কম, পড়াশোনাও হয়তো করেনি। কিন্তু এগুলোও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত নয়। মেয়েটা এখনও বাচ্চা, বয়সের সাথে সাথে হাইটও বাড়ার পসিবিলিটি আছে। পড়াশোনাও করানো যাবে। ওর শুধু প্রয়োজন তোর কেয়ার আর সাপোর্টের।”
রঞ্জক আসল কারণটা বুকজমিনে চাপা দিয়ে গুমরে উঠে বলল, “আমি কোনো বাচ্চার বেবিসিটার হতে পারব না।”
তুষার আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই লিফটটা টুং শব্দে গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে থেমে গেল। দরজা খুলতেই রঞ্জক ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, “তুই বাড়িতে চলে যা।”
তুষার অবাক হয়ে পিছু পিছু এসে বলল, “সে কী! কাল-পরশু উইকেন্ড! ভাবলাম দুজন মিলে লেট-নাইট আড্ডা মারব… আর তুই কী না এখনই বলছিস বাড়ি চলে যেতে?”
রঞ্জক নিজের বাইকের দিকে যেতে যেতে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল, “আমি এখন ‘দ্য ফল্ট’-এ যাব।”
তুষার চাপা গলায় শুধাল, “ওখানে না গেলেই কি নয়?”
রঞ্জক বাইকে উঠে বসে মাথায় হেলমেট গলানোর মুহূর্তে তেরছা চোখে তাকাতেই তুষার মৃদু গলায় বলল, “আমি বলতে চাইছিলাম… সম্ভাব্য এমপি-মন্ত্রীদের কি আন্ডারগ্রাউন্ড বক্সিং রিংয়ে মানায়? যদি ‘দ্য ফল্ট’-এ যেতেই হয়, তবে তাদের যাওয়া উচিত সম্মানীয় দর্শক হিসেবে, ফাইটার হিসেবে নয়!”
রঞ্জক হেলমেটের কাচটা টেনে নামিয়ে ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, “আমি এখনো এমপি হয়ে যাইনি, তুষার। যেদিন হব, সেদিন তোর কথাটা ভেবে দেখব।”
চলবে…
Share On:
TAGS: কালারব্লাইন্ড, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৪
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৬
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৫
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৫(ক+খ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬ (বর্ধিতাংশ)
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮