#কালারব্লাইন্ড — ১৩
#সোফিয়া_সাফা
দুটো দিন কেটে গেছে। এখন সকালবেলা। ইছাপূর্ণা ও তার স্বামী ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা দুজন এখন আলতার ঘরেই আছেন।
“তুই যদি আমারে টাহা-পয়সাই দিতে না পারোস, তাইলে এত্তবড় বাড়ির বউ হইয়া লাভডা কী হইলো?”
বাবার এই ধরনের কথা শুনে আলতা একরাশ ঘৃণাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। তার এমন চাউনি দেখে ক্ষেপে গেলেন মাহমুদ রেহবার। তেড়ে গিয়ে খাটের ওপর বসে থাকা আলতার চুলের মুঠি টেনে ধরতেই ইছাপূর্ণা তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
“কী করছেনটা কী? ছাইড়া দেন ওরে। বিয়াইত্তা মাইয়াডার গায়ে অন্তত হাত তুলবেন না।”
“বিয়া অইছে দেইখা কি ওরে মাথায় তুইলা নাচোন লাগবো? ওরে ক টাহা দিতে।”
“ওয় তো কইলো টাকা নাই ওর কাছে। তারপরও আপনারে কইত্তে দিবো?”
“না থাকলে ওর ভাতারের কাছ থাইকা আইনা দিতে ক। আমি তো আইছিই টাহার লাইগা। ওরে যে এত্তো বড় করছি, এত্তদিন আমার মাথার উপ্রে বইয়া বইয়া খাইছে। এহন হেই ঋণ তো ওরে শোধ করতেই হইবো।”
মাহমুদ রেহবার আরও শক্ত করে চুলের গোছা টেনে ধরলেন। ব্যথায় ককিয়ে উঠল আলতা। ইছাপূর্ণা ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই মাহমুদ রেহবার তাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিলেন। ছিটকে গিয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়লেন ইছাপূর্ণা।
দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন আরিজ মাহতাবির। চোখের সামনে ইছাপূর্ণাকে ওভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন তিনি। চোখ ফিরিয়ে আলতার দিকে তাকাতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তার।
মাহমুদ রেহবার তখনো অনর্গল বলে চলেছেন,
“যেই বেডার লগে তোর বিয়া ঠিক করছিলাম, হেই বেডায় কইছিলো আমারে একবিঘা জমি আর দুই লাখ টাহা দিবো। কিন্তু না, তুই কী করলি? বুড়া বেডা বিয়া করবি না কইয়া পলাইয়া গেলি। ছয়ডা জুয়ান বেডার লগে হুইয়াও মন ভরে নাই। কই থাইকা আবার একটা জুয়ান বেডা খুঁইজ্যা আইনা বিয়া বইলি। এহন নাকি টাহাও দিতে পারবি না। তাইলে পারবি ডা কী? খালি বেডাগো লগে হুইয়া তোর পেট ভরলেও আমগো পেট তো ভরবো না।”
“জনাব রেহবার!”
আকস্মিক গম্ভীর কণ্ঠে মাহমুদ রেহবার দরজার দিকে চোখ ফেরাতেই থমকে গেলেন। আরিজের কণ্ঠ শুনতেই তার রাগ উধাও হয়ে গেল। আলতার চুলের মুঠি থেকে হাতটা আপনা-আপনি আলগা হয়ে গেল। লজ্জায় নাকি ঘৃণার বশবর্তীতে ষোড়শী হাঁটুতে মুখ গুজলো তা বোঝা গেল না।
আরিজ মাহতাবিরের মুখাবয়বে রাগ স্পষ্ট, তবে তিনি তা সংবরণ করে রেখেছেন। একবার মেঝে থেকে উঠতে থাকা ইছাপূর্ণার দিকে তাকিয়ে তিনি নিরাসক্ত গলায় বললেন,
“আপনাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে। দ্রুত চলুন, নয়তো পায়ে হেঁটেই রাস্তা মাপতে হবে।”
কথাটা বলেও আরিজ মাহতাবির ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
মাহমুদ রেহবার জোরপূর্বক হেসে বেরিয়ে গেলেন। ইছাপূর্ণা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। নিজের শাড়ির আঁচল সামলে আলতার দিকে তাকালেন। মুখে কিছু বলতে পারলেন না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল।
আলতা মুখ তুলে তাকাল না। মায়ের সঙ্গে চোখাচোখিও করল না।
মাহমুদ রেহবার হেঁটে যাচ্ছিলেন, আরিজ মাহতাবির ছিলেন তার পেছনেই। করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই আরিজ প্রসঙ্গ তুললেন,
“কতো টাকা লাগবে আপনার?”
এমন প্রশ্নে প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরমুহূর্তেই লোভে চোখজোড়া চকচক করে উঠল মাহমুদের। আরিজ মাহতাবির আবার বললেন,
“কতো টাকা পেলে বউমার কাছে ক্ষমা চাইবেন?”
মাহমুদ অবিশ্বাসভরা চোখে তাকালেন।
“কী কইতাছেন এগুলা? মাইয়ার কাছে ক্ষমা চামু মানে?”
“আপনি ওর সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। সেই জন্যই ক্ষমা চাইবেন।”
মাহমুদ আচমকা হেসে উঠলেন।
“আরে কী কন, মাইয়ার লগে তো আমি এমনেই কথা কই।”
“বলবেন না।”
“তয় কেমনে কমু?”
“যেভাবে মায়ের সাথে কথা বলেন।”
মাহমুদ অবাক হয়ে গেলেন। তার চাউনি দেখে আরিজ থেমে দাঁড়ালেন।
“বুঝতে পারেননি?”
মাহমুদ রেহবার ত্যক্ত সুরে বললেন,
“মার চেহারাই মনে নাই, হের লগে ক্যামনে কথা কইছি হেইয়া মনে থাকবো ক্যামনে? তয় বাহেরে দেখছি আমার বুইনেগো লগে এমনেই কথা কইতো। মাইয়া মানুষ হইলো দাসীর জাত, ওগো লগে এমনেই কথা কইতে অয়।”
মাহমুদের কথার পর আরিজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। এই লোকের মানসিকতা বদলানো যে তার সাধ্যের বাইরে, সেটা তিনি বুঝে গেছেন।
“শুধু বলুন, কতো টাকার বিনিময়ে ক্ষমা চাইবেন?”
“আরে আপনে টাহা দিতে চাইলে এমনেই দেন। বাপ হইয়া মাইয়ার কাছে ক্ষমা চাইলে আপনের বউমারও গুনাহ হইবো।”
আরিজ মাহতাবিরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“ও আচ্ছা, কোন বইয়ে লেখা আছে এটা?”
মাহমুদ থতমত খেয়ে গেলেন।
আরিজ বললেন,
“বলুন, কোন বইয়ে লেখা আছে যে বাবা তার মেয়েকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করলে গুনাহ হবে না, কিন্তু বাবা সেই ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইলে উল্টো মেয়ের গুনাহ হবে?”
মাহমুদ রেহবার কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আরিজ নিচু স্বরে বললেন,
“শুধুমাত্র আত্মীয় হন বলেই টাকা অফার করছি, নইলে অন্য উপায়ও জানা আছে আমার।”
আরিজের গলার স্বরের এমন পরিবর্তনে মাহমুদ ভয় পেয়ে গেলেন। তার অভিব্যক্তি দেখে আরিজ চোখ সরু করে বললেন,
“আমি খুব ভালো করেই জানি, আমার ছেলের দেওয়া দেনমোহরের পুরো টাকাটা আপনিই হাতিয়ে নিয়েছেন। আপনি এতো জ্ঞানের কথা জানেন, আর এটা জানেন না যে স্বামীর থেকে পাওয়া দেনমোহরের ওপর শুধু স্ত্রীর অধিকার আছে?”
মাহমুদ চমকে গেলেন।
“কেডা কইছে আমি হেই টাহা নিছি? আমার মাইয়া কইছে, তাই না? ওয় মিছা কইছে। আমি হেই দশ লাখের একটা টাহাও নেই নাই।”
“মিথ্যা কথা আপনি বলছেন।”
“মন গড়া কথা কইবেন না আরিজ সাহেব। আপনি কী জানেন একটা মাইয়া ডাংগর করতে কতো খরচা হয়? মাইয়া তো নাই আপনের। দুইডাই পোলা। মাইয়াডা যে এতবড় কইরা আপনেগো দিয়া দিলাম, কোনো কিছু কি দাবি করছি?”
“প্রথমত, আমি মন গড়া কিছু বলিনি। দেনমোহরের টাকা হাতিয়ে নিয়েই আপনি আর আপনার ভাই উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। আপনাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
একটু থেমে আরিজ মাহতাবির শান্ত গলায় যোগ করলেন,
“আর রইলো দেনা-পাওনার কথা, আপনি নিজে বিয়ে করার সময় আপনার শ্বশুরকে পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তো?”
“দেনা-পাওনা মানে?”
“বা রে, এই যে বললেন কন্যাসন্তান লালন-পালন করতে পুত্রসন্তানের চেয়েও বেশি খরচ হয়। নিজের স্ত্রীর বেলায় সেই খরচ আপনি পরিশোধ করেছিলেন তো?”
মাহমুদ রেহবার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। তিনি দেবেন শ্বশুরকে? উল্টো ইছাপূর্ণাকে বিয়ে করার সময় মোটা অংকের যৌতুক নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এটা বললে তো তিনি নিজেই ফেসে যাবেন।
“কী হলো? মনে করার চেষ্টা করছেন নিশ্চয়ই। করুন। এটাও মিলিয়ে নিন, আপনার বউকে অনেক আদরযত্নে বড় করেছিলেন তার বাবা। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনাও করিয়েছিলেন। আর আপনি বাবা হিসেবে কতটুকু করেছেন নিজের মেয়ের জন্য? পড়াশোনার ধারেকাছেও তো যেতে দেননি মেয়েটাকে।”
“পোলা হইলে লেহাপড়া করাইতাম। মাইয়া মাইনষে লেহাপড়া কইরা করবো ডা কী? লেহাপড়া না কইরাই যেমনে চুনকালি মাইখা দিল আমগোর মুখে, এহনো যে বাঁচাইয়া রাখছি হেইডাই অনেক।”
পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে দেখে আরিজ থেমে যেতে চাইলেন। কিন্তু মাহমুদ থামলেন না।
“সমাজে মুখ দেহাইতে পারিনা ওর লাইগা। হগ্গলে থুতু দেয়। বেডাগো লগে ফুর্তি কইরা জঙ্গলে পইড়া আছিল, হিয়াল হগুনেও তো ছিড়াবিড়া খাইয়া ফালাইতে পারতো। মাডি দিয়া মাইনষের মুখ বন্ধ কইরা দিতাম। এমনে মান যাইতো না আমগো। ভাইবা কূল পাইনা, যেই মাইয়ারে হগুনেও মুখ লাগায় নাই, হেই মাইয়ারে দিয়া আপনের পোলা এহনো কী করে। আর আপনেই বা সব জাইনা ওই মাইয়ারে পোলার বউ করার লাইগা পাগল হইয়া গেছিলেন ক্যা?”
আরিজ মাহতাবিরের চেহারা রাগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। তবুও রাগ নিজের মধ্যে চেপে রাখলেন তিনি। এদিকে তার নীরবতায় প্রশ্রয় পেয়ে মাহমুদ বিশ্রীভাবে হাসলেন। তারপর বললেন, “মনে হয় আপনার পোলার কোনো সমস্যা আ—”
আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। তার আগেই আরিজ মাহতাবির সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিলেন তার গালে। থাপ্পড়টা বেশ জোরেশোরেই পড়ল। মাহমুদের রুগ্ন শরীরটা ফ্লোরে ছিটকে পড়তে চাইলেও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি।
“আপনে আমারে থাপ্পড় মারলেন?”
আরিজ আঙুল উঁচিয়ে কাঠকাঠ গলায় বললেন, “একদম চুপ! আর একটা অসংলগ্ন কথা বললে আমি আপনার মুখটাই ভেঙে ফেলবো।”
মাহমুদ চুপ হয়ে গেলেও মনে মনে আওড়ালেন, “হুহ্! যেই পোলার কথা কইছি অমনি ছ্যাৎ কইরা উঠছে। এমন করলেই কী আর সত্য মিথ্যা হইয়া যাইবো? পোলার কোনো দোষ না থাকলে কী আর শখ কইরা ধ`র্ষিতা মাইয়া বিয়া করায়? ভালা সাজতে চাইলে কী হইবো নাকি, কয়ডা দিন যাউক, আমিও দেহি কতো দিন ভালা মানুষ সাইজা থাকতে পারে।”
আরিজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর মুখ খুললেন, “খাওয়াদাওয়া বাবদ কত খরচ হয়েছে বলুন, আমি দিয়ে দিচ্ছি। বিনিময়ে বউমার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবেন।”
“আপনে যা কইতাছেন ভাইবা কইতাছেন তো?”
আরিজ মাহতাবির মাথা নাড়লেন।
এদিকে ইছাপূর্ণা এখনো মেয়ের কক্ষেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটা হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে না পেয়ে তার কাছে যেতে পারছেন না ইছাপূর্ণা।
তন্মধ্যে মাহমুদ আবার ফিরে এলেন। এবার এসেই তিনি ছুটে গিয়ে মেয়ের সামনের মেঝেতে বসে পড়লেন। ক্ষমা চাইতে শুরু করলেন অবিরত,
“আমাকে ক্ষমা কইরা দে আলতা। আমি তোর লগে খারাপ ব্যবহার করছি। বুঝবার পারি নাই তুই কষ্ট পাবি।”
আলতা ফট করে মুখ তুলে বাবার দিকে চাইলো। বিশ্বাসই করতে পারল না কথাগুলো তার বাবা বলছে। মনে হচ্ছিল, সে ভুল শুনছে কিংবা সবটাই কল্পনা করছে।
মাহমুদ আরও কিছুটা আদিখ্যেতা দেখিয়ে নাছোড়বান্দার মতো একটানা ক্ষমা চাইলেন, “ক্ষমা করেছিস তো আমাকে?”
আলতা আনমনেই মাথাটা হালকা হেলিয়ে সায় জানাতেই মাহমুদ খুশিতে আত্মহারা হয়ে বেরিয়ে গেলেন।
ইছাপূর্ণা নির্বাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর খানিকটা সন্দিহান চোখে স্বামীর পিছু নিলেন।
আজ সকাল সকালই অফিসের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল রঞ্জক। ঘণ্টা খানেক আগে তার বাবা কল করে জানিয়েছিলেন, শ্বশুর-শাশুড়িকে বিদায় জানিয়ে তারপর কাজে বের হতে। জবাবে রঞ্জক জানিয়ে দিয়েছিল, সে দেখা করতে চায় না।
রঞ্জক একবার ঘড়ির কাঁটায় চোখ বুলিয়ে সামনে তাকাতেই নজরে এলো একটি অভাবনীয় দৃশ্য। পার্কিং এরিয়ার লন ধরে এগোতে এগোতে তার চোখে পড়ল, আরিজ মাহতাবির আর ইছাপূর্ণা কোনো বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করে চলেছেন। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল, আরিজ বারবার ইছাপূর্ণার হাত ধরে তাকে কোনো কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু ইছাপূর্ণা যেন কিছুতেই বুঝতে চাইছেন না।
রঞ্জক নিজের অফিস ব্যাগের বেল্ট চেপে ধরে ঘাড় কাত করে চেয়ে রইল নিজের বাবা আর শাশুড়ির দিকে।
শেষ পর্যন্ত আরিজ মাহতাবির হার মেনে নিয়ে ইছাপূর্ণাকে যেতে দিলেন। টাকাভর্তি ব্যাগটা বুকে চেপে ধরে গাড়িতে বসে ছিলেন মাহমুদ রেহবার। ইছাপূর্ণা গাড়িতে চড়ে বসতেই ড্রাইভার ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন। কিছু সময়ের মধ্যেই গাড়িটা দৃষ্টিসীমার বাইরে পাড়ি জমাল।
আরিজ একধ্যানে তাকিয়ে ছিলেন সেদিকেই।
রঞ্জক নিঃশব্দ পায়ে তার পাশাপাশি এসে দাঁড়াল। লনের পাথরখচিত পথের ওপর দৃষ্টি রেখেই বলল, “গার্লফ্রেন্ডকে মোটেও ছাড়তে ইচ্ছা করছে না, তাই না?”
আরিজ মাহতাবিরের শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো। পাশ ফিরে রঞ্জককে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন তিনি।
রঞ্জক সেইভাবে তাকিয়ে থেকেই বলল, “ফুপির সন্দেহ তাহলে ঠিকই ছিল, তুমি আমার শাশুড়ির সাথে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত ছিলে?”
আরিজ মাহতাবির কথাটা না শোনার ভান করে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই রঞ্জকের তিক্ত কণ্ঠ তার শ্রবণে আঘাত হানল।
“তুমি না তোমার প্রথম বউকে জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে? শুনেছি সেই জন্যই নাকি দ্বিতীয় বউকে ভালোবাসতে পারোনি কখনো। অথচ পরকিয়ায় জড়াতে তো ঠিকই পেরেছিলে।”
রঞ্জক থামল। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে যোগ করল,
“নিজের চরিত্রের এমন বিচিত্র অবস্থা নিয়ে তুমি আমাকে লয়্যাল থাকার উপদেশ দিয়েছিলে? হাউ শেইমলেস ইউ আর।”
“রঞ্জক! মুখে লাগাম টানো। যা জানো না, তা নিয়ে কথা বলতে এসো না।”
“কিছুক্ষণ আগে নিজের চোখে যা দেখলাম, তারপর আর কিছুই জানার বাকি নেই। সবটাই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।”
“দিনের আলো তোমার চোখে কতোটা পরিষ্কার, তা জানা নেই আমার। কিন্তু তোমার উচিত আমার ক্যারেক্টার নিয়ে বিশ্লেষণ না করে নির্বাচনের প্রচারে মন দেওয়া। নমিনেশন তো পাইয়েই দিলাম, বাকিটা নিজের যোগ্যতায় অর্জন করো।”
“প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করো না। স্বীকার করে নাও যে মিসেস রেহবারের সাথে তোমার অবৈধ সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক এখনো নিজের মনের মধ্যে পুষে রেখেছো তুমি। তাই তো তার মেয়েকে বিপদে পড়তে দেখে তুমি হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে। আমাকে ঠকিয়ে মেয়েটাকে সাহায্য করেছো শুধুমাত্র মিসেস রেহবারের কাছে মহান সাজার জন্য।”
আরিজ মাহতাবির কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। অনুধাবন করলেন, ব্যাপারটা এখন আর সাধারণ ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে নেই। রঞ্জক নিজের দেখা দৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে, যেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল না তার।
আরিজ টের পাচ্ছেন, সবকিছু ক্রমশ তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্যাপারটা আর বেশিদূর গড়াতে দেওয়া যাবে না।
“তুমি ভুল ক্যালকুলেশন করছো। তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না আমাদের মধ্যে। পূর্ণাকে আমরা ছোট থেকে বড় হতে দেখেছি। ওর বাবা আমাদের বাড়িতে কাজ করতেন। তোমার দাদা তাকে ভালো জানতেন। তারপর হঠাৎ একদিন ওর বাবা-মা ওকে নিয়ে গ্রামে ফিরে যায়। তারপর ওখানেই বিয়ে দিয়ে—”
“এরপরের ঘটনা আমিই বলছি। বিয়ের পর মিসেস রেহবার আবার ফিরে আসেন শহরে। তখন তাদের অভাব-অনটন ছিল, তাই আমাদের বাড়িতে কাজ নিয়েছিলেন। তারপর আবার একদিন হঠাৎ করে কাউকে কিছু না বলে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। সেই দিনের পর থেকে আর দেখা যায়নি তাকে। কী, তাই তো?”
“তোমাকে কি এগুলো আরজু বলেছে?”
“হ্যাঁ।”
“আর কী কী বলেছে ও?”
“তা জেনে তুমি কী করবে? সত্যিটা তো সামনে চলেই এলো।”
“যা মুখে আসছে, তাই বলে দিচ্ছো কেন?”
“কারণ তোমাকে আমি ঘৃণা করি।”
“আমি বললাম তো, মিসেস রেহবারের সাথে আমার কোনোকালেই সম্পর্ক ছিল না। শুধু পূর্বপরিচিত আমরা। এর বাইরে আর কিছুই না। আলতার সাথে তোমার বিয়ে দেওয়ার কারণ শুধুমাত্র মেয়েটাকে উদ্ধার করা ছিল।”
“ও আচ্ছা, তুমি কি ওর মতো পুরো ভ্যালেনিয়ার সব কয়টা ধ`র্ষিতাকে আমার সাথে বিয়ে দিয়ে উদ্ধার করার প্ল্যান করছো নাকি? নিশ্চয়ই না? তাহলে মিসেস রেহবারের মেয়ের বেলাতেই কেন করলে? অফকোর্স অন্য কোনো ব্যাপার অবশ্যই আছে। তুমি চাইলেই অন্য কোনোভাবে মেয়েটার সাহায্য করতে পারতে। কিন্তু তুমি তা না করে একেবারে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েই শান্তি পেলে।”
“তুমি এসব বলে শুধু শুধু জল ঘোলা কোরো না, রঞ্জক। মিসেস রেহবার নিজের মেয়েকে কাজের লোক হিসেবে আমার হাতে তুলে দিতে রাজি ছিলেন না।”
রঞ্জক ক্লান্ত হয়ে পড়ল। মনের মধ্যে অস্বস্তি ভর করল। সে কি আসলেই বেশি বেশি ভাবছে?
হঠাৎ একটা প্রশ্ন মাথায় আসতেই সে ছুড়ে দিল,
“কোনো সম্পর্ক না-ই থেকে থাকলে তুমি ওনার হাত ধরে টানাটানি করছিলে কেন?”
আরিজ মাহতাবির কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। অতঃপর নিচু গলায় বললেন, “আমি হাত ধরেছি? কখন ধরলাম? আমি আসলে ওনাদের আরও কিছুদিন থাকতে বলছিলাম। কথায় কথায় হয়তো ভুলবশত হাত ধরে ফেলেছি।”
রঞ্জক পাংশুটে মুখে বলল, “সবই তোমার চরিত্রের দোষ। তুমি একটা চরিত্রহীন পুরুষ। প্রথম স্ত্রীকে এতোই ভালোবাসলে নিশ্চয়ই আমি জন্ম নিতাম না। যখন দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে গিয়েছিলে, তখন কোনো সমস্যা হয়নি। সমস্যাটা শুরুই হলো আমি জন্মের পর। কারণ সবাই তো তখন বুঝতে শুরু করল, তোমার চরিত্রের ঠিক নেই। শুধুমাত্র নিজের ইমেজ ক্লিন রাখতে আর মহান সেজে থাকতে ভালোবাসো তুমি।”
বলতে বলতেই রঞ্জক নিজের বাইকের দিকে এগিয়ে গেল।
আরিজ মাহতাবির শুধু তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। আর কোনো কথা বললেন না।
এরপর কেটে গেল পুরো একটা দিন।
আজ আলতাকে কলেজে ভর্তি করাতে নিয়ে যাবেন আরিজ মাহতাবির।
আলতা সকাল সকাল গোসল সেরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে পড়েছে। তার অনাবৃত শরীরে শুধুমাত্র একটা তোয়ালে প্যাঁচানো। শরীরের দাগগুলোর ওপর মোটা করে ফাউন্ডেশনের প্রলেপ লাগানো শেষে আলতা উঠে এগিয়ে গেল আলমারির দিকে।
একটা শাড়ি বের করার উদ্দেশ্যে কপাট খুলতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
দরজার ওপাশ থেকে ধারা বলে উঠল, “আলতা, দরজা খোলো। আমি এসেছি। তোমাকে কলেজের জন্য রেডি হতে সাহায্য করব।”
আলতা প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেও পরক্ষণেই আরেকবার আয়নায় নিজেকে দেখে নিল সে। না, দাগগুলো দেখা যাচ্ছে না।
শাড়িটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলে দিতেই ধারা নিজের হাতে থাকা বেশ কয়েকটা শপিং ব্যাগ উঁচিয়ে ধরে চওড়া হেসে বলল, “এই দেখো, তোমার জন্য কী এনেছি।”
“কী এগুলো?”
“এখানে তোমার জন্য কলেজ ড্রেস ও জুতোসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে।”
বলেই ধারা ব্যাগগুলো খাটের ওপর রেখে সবকিছু মেলে দেখাতে লাগল।
আলতা ড্যাবড্যাব চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। প্রথমেই বের হলো সাদা ধবধবে শার্ট। তারপর গাঢ় সবুজ রঙের স্কার্ট, সঙ্গে একই রঙের টাই।
আলতা নিচের ঠোঁটে দাঁত চেপে পোশাকগুলো দেখে যাচ্ছিল। অতঃপর আনমনেই বলে উঠল, “এগুলো কি সত্যিই মেয়েদের পোশাক? আমি তো ছেলেদেরকে এমন পোশাক পরতে দেখেছি।”
ধারা অবাক হয়ে বলল, “অবশ্যই এগুলো মেয়েদের পোশাক। আর তোমাকে এগুলো পরেই কলেজে যেতে হবে।”
আলতার গলা শুকিয়ে গেল। ছোটবেলা থেকে শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরেনি সে। এখন এগুলো কীভাবে পরবে?
“বলছিলাম কী, এই শাড়িটাও তো ভালোই লাগছে। এটা পরে গেলে কি খুব সমস্যা হয়ে যাবে?”
“শোনো মেয়ের কথা, একবাটি চালের মধ্যে একটা ডালের দানা যতটা বেমানান লাগবে, তুমি কলেজে শাড়ি পরে গেলে ঠিক ততটাই বেমানান লাগবে। বুঝলে? শাড়ি পরে গেলে বাকি স্টুডেন্টরা তোমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকবে, যেন এলিয়েন দেখছে। তখন তোমার কেমন লাগবে বলো। তাছাড়াও কলেজের নিয়ম আছে। সেখানে যা মন চায়, তা পরে যাওয়া যায় না, আলতা। তাই তোমাকে কলেজ ড্রেস পরেই যেতে হবে।”
আলতা বুঝতে পারল, এটা আবশ্যক। সে বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল।
রঞ্জক ফোনে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। তার পরনে অফিসের পোশাক, গলায় আইডি কার্ড, হাতে অফিস ব্যাগ। ফোনের ওপাশে ছিল কঙ্কা।
“আর রাতে আমরা একসাথে ডিনার করি তাহলে?”
কঙ্কার প্রস্তাব রঞ্জক সূক্ষ্মভাবে নাকোচ করে দিয়ে বলল, “আজ রাতে পার্টির কয়েকজন সদস্যদের সাথে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বসবো। তাই সম্ভব হবে না।”
“ওহহো আরএম, তুমি লাঞ্চও করতে পারবে না, ডিনারের সময়েও বিজি থাকবে! তাহলে কী করা যায় বলো তো?”
“সেই জন্যই বলেছিলাম, আমি খুব বিজি হয়ে যাবো। তুমি অন্য কাউ—”
বলতে বলতেই মাঝপথে থেমে গেল রঞ্জক।
দ্বিতীয় তলার সিঁড়িতে পা রাখতেই নজরে এলো, আলতাকে নিয়ে ধারা ও ইরা আগে আগে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে।
পেছন থেকে আলতাকে দেখে চিনতে একটু অসুবিধাই হলো রঞ্জকের। মেয়েটার বেশভূষা দেখে তাকে চেনার উপায়ই নেই। গায়ে সাদা শার্ট, সঙ্গে কুচিওয়ালা লং স্কার্ট। পায়ে কালো কেটস জুতো। পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলগুলো—কিছুই যেন সেই আলতার সঙ্গে মিলছে না। ধারা বারবার আলতাকে নাম ধরে সম্বোধন না করলে রঞ্জক হয়তো খেয়ালই করত না তাকে।
রঞ্জক অজান্তেই পিছু নিল তাদের।
ইরা হাসতে হাসতেই বলল, “উফফ, তোমাকে কী যে সুন্দর দেখাচ্ছে না মিমু। আমি তো চোখই সরাতে পারছি না।”
ইরার কথার রেশ ধরেই রঞ্জকের ফের আরেকবার মনে পড়ে গেল তুষারের করা প্রশংসাগুলো।
“ওর দুটো পান্নার মতো সবুজ চোখ আছে। চুলগুলোও রক্তের মতো লাল। গালের ওপর টোকা দিলেই মনে হয় রক্ত—”
রঞ্জকের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সবকিছু যেন থমকে গেল চোখের সামনে।
সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখার আগেই আকস্মিকভাবে পেছন থেকে কেউ আলতার কোমর পেঁচিয়ে ধরল।
ষোড়শী কিছু বুঝে ওঠার আগেই রঞ্জক তাকে কাঁধে তুলে নিল। তারপর দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে আবার উপরে উঠে গেল।
চলবে…
(খুব একটা মন দিয়ে লিখতে পারিনি পর্বটা। বিয়ে বাড়িতে বসে লেখায় কন্সেন্ট্রেশন করা খুবই মুশকিল ছিল। পর্বগুলো খুব সময় নিয়ে আর মন দিয়ে লিখতে হয়। পরবর্তী পর্বটা আমি নিরিবিলি লিখতে চাইবো। দোয়া করবেন আমার জন্য আর হ্যাঁ রেসপন্স করুন প্লিজ।)
Share On:
TAGS: কালারব্লাইন্ড, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৯
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৯
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫